মান্টোর তিনটি গল্প


উর্দু সাহিত্যের বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক সাদাত হাসান মান্টো দাঙ্গা ও দেশভাগের রক্তাক্ত ক্ষত যার প্রতিটি আখ্যানকে করেছে উজ্জ্বল। আন্দালিব রাশদী অনূদিত তার বিখ্যাত তিনটি গল্প।


খুল দো

দুপুর দুটোয় অমৃতসর থেকে স্পেশাল ট্রেন ছেড়ে লাহোর মুঘলপুরা পৌঁছল আট ঘণ্টা পর। রাস্তায় ট্রেন আটকে অনেককে হত্যা করা হলো, আহত অনেকে নিরুদ্দিষ্টের সংখ্যা অনেক বেশি। খোলা মাঠে ক্রন্দরত নারী শিশু ও আহত মানুষের মাঝখানে সিরাজুদ্দিনের জ্ঞান ফিরল পরদিন সকাল দশটায়। তারও অনেকক্ষণ পর তিনি চিৎকার শুরু করলেন, সখিনা, সখিনা। হতবুদ্ধি দশা কিছুটা কাটতে জনতার কাছ থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে তিনি বসে বসে মনে করার চেষ্টাথান্দা। কোথায় স্ত্রী ও কন্যার সঙ্গে তার শেষ দেখা।

সখিনার মার কথা মনে পড়ল। পেটে ছুরি চালানোর পর নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে এসেছে। তার চোখের সামনে মৃত্যুবরণ করার আগ মুহূর্তে বলেছে, আমি এখানেই পড়ে থাকি। তুমি এক্ষণ মেয়েটাকে নিয়ে চলে যাও। মেয়ের হাত ধরে সিরাজুদ্দিন দৌড়াচ্ছেন। মেয়ের ওড়না পড়ে গেল। তুলতে গেলে মেয়ে বলল থাক বাবা। তারপরও এক হাতে ওড়না টেনে ধরে। তাহলে মেয়েটা নিরুদ্দিষ্ট হলো কখন? মেয়ে কি তার সঙ্গে অমৃতসর স্টেশন পর্যন্ত আসতে পারেনি? কিংবা ট্রেন থামিয়ে দাঙ্গাবাজরা কি তাকে তুলে নিয়ে গেছে?

সিরাজুদ্দিন মনে করতে পারেন না। তিনি কাঁদতে চান, কান্না আসে না। এর মধ্যে অস্ত্রবাহী আট যুবকের একটি দল ওপারে ফেলে আসা শিশু ও নারী ফিরিয়ে আনার কাজ করছে বলে জানায়। সিরাজুদ্দিন মেয়ের বর্ণনা দেন। `মেয়েটি কী যে সুন্দর! না না সে দেখতে মোটেও আমার মতো নয়, তার মায়ের মতো। বয়স প্রায় সতের। বড় চোখ, কালো চুল, বাম গালে একটা কালো তিন। আমার মেয়ে খুঁজে বের করে আনো। আল্লাহ তোমাদের রহম করবেন।`  যুবকরা বলল, মেয়ে বেঁচে থাকলে নিয়ে আসব।

আবার যখন যুবকরা অমৃতসর যায়, রাস্তার পাশে আতঙ্কিত মেয়েটিকে দেখতে পায় গাড়ির শব্দ শুনে মেয়েটি ছুটে পালাতে থাকে। তারা মেয়েটিকে ধরে ফেলে, বাম গালে তিল দেখতে পায়, তাদের অনেক প্রচেষ্টার পর মেয়েটি স্বীকার করে সেই সখিনা। যুবকরা মেয়েটির ব্যাপারে সদয় হয়। তাকে খাবার দেয়। ট্রাকে উঠিয়ে নেয়। ওড়নাহীন সখিনা দু`হাত আড়াআড়ি ধরে স্তনযুগল ঢেকে রাখে।

তারপর অনেকদিন যায়। সিরাজুদ্দিন মেয়ের খবর আর পায় না। যুবকরা সেই পুরনো আশ্বাসই দেয়, যদি বেঁচে থাকে নিয়ে আসব। সেই সন্ধ্যায় সিরাজুদ্দিনের চোখে পড়ে চারজন মানুষ এক অজ্ঞান তরুণীকে ক্যাম্প হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। তিনিও পেছন পেছন যান। কিছুক্ষণ হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন, আবার ভেতরে যান। স্ট্রেচারে শায়িত কেউ একজন। কেউ একজন আলোর সুইচ টিপতেই তার চোখে পড়ল বাম গালে তিল। তিনি চিৎকার করে উঠেন, সখিনা।

যে ডাক্তার সুইচ টিপে ছিলেন, বুড়ো সিরাজুদ্দিনের দিকে তাকান।
আমি এই মেয়ের বাবা।
ডাক্তার মেয়েটিকে পরীক্ষা করলেন, জানলাটা দেখিয়ে বুড়োকে বললেন, খুলে দাও… খুল দো।

তখন স্ট্রেচারে শোয়া মেয়েটি নড়ে উঠল। এই অজ্ঞানাবস্থাতেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার হাত পড়ল সালোয়ারের ফিতেয়। যন্ত্রণাকাতরতার মধ্যই সে ফিতে খুলে সালওয়ার নামিয়ে দিল, বেরিয়ে এলো তার ঊরুদেশ। সিরাজুদ্দিন আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন, বেঁচে আছে… আমার মেয়ে বেঁচে আছে!

 

খুদা কি কসম

দেশ ভাগ হয়ে গেছে। হাজার হাজার মুসলমান আশ্রয়ের খোঁজে পাকিস্তান যাচ্ছে, হাজার হাজার হিন্দু ভারতে আসছে। অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরে তিল ধারণের ঠাঁই নেই, তবুও মানুষ আসছে। এর মধ্যেই ঢুকে পড়ছে। খাদ্য থেকে শুরু করে ওষুধ-হাহাকার সকল কিছুর। ১৯৪৮ সাল শুরু হলো। অপহৃত নারীদের উদ্ধার করার জন্য হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হলো। তারা দল বেঁধে পাকিস্তান-ভারত আসা যাওয়া করছে, উদ্ধার করেও নিয়ে আসছে।

যারা তাদের মেয়েদের অপহৃত ও ধর্ষিত হতে দিয়েছে তারা এখন তাদের ফেরত চাচ্ছে কোনো পাপস্খলনের জন্য। আঙুলে লেগে থাকা রক্ত লেহন করে ফেললেই কি খুনের চিহ্ন মুছে যায়? একজন শরণার্থী লিয়াজোঁ অফিসার জানিয়েছে। শাহরানপুরে অপহৃত দুটি মুসলমান মেয়ে পাকিস্তানে তাদের পিতা-মাতার কাছে ফিরে যেতে অস্বীকার করেছে। জলন্ধরে একটি মেয়েকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে পরিবারের সদস্যরা এমনভাবে তাকে বিদায় জানিয়েছে যেন, একজন গৃহবধূকে দূরের যাত্রায় শুভকামনা করছে। পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে শুধু এই আশঙ্কায় বেশ ক`টি মেয়ে ফেরার পথে আত্মহত্যা করেছে। মানসিক হাসপাতালে ঢুকেছে অনেকেই।

যখনই অপহৃত মেয়েদের কথা ভাবি আমার সামনে ভেসে ওঠে তাদের স্ফিত উদর। ভেতরের সন্তানের দায় কে নেবে, পাকিস্তান না ভারত? ঈশ্বরের নির্যাতিতের খাতায় যদি কোনো খালি পৃষ্ঠা থেকে থাকে, সেখানে কী তাদের কারও নাম তালিকাভুক্ত হবে? লিয়াজোঁ অফিসার বলল, শতবার তাকে ভারতে যাওয়া আসা করতে হয়েছে। এক বিধ্বস্ত মহিলার সাথে তার বহুবার দেখা হয়েছে ভারতে। প্রথমবার দেখা হয় জলন্ধরের বস্তিতে। চোখ দেখে মনে হয়েছে কাকে যেন খুঁজছে। স্বেচ্ছাসেবকদের একজন বলেছে, পাতিয়ালায় দাঙ্গার সময় তার একমাত্র মেয়েকে ধরে নিয়ে গেছে। মেয়েটা খুন হয়ে থাকতে পারে এটা কোনোমতেই সে বিশ্বাস করছে না। মাসের পর মাস ধরে মেয়েকে খুঁজে চলেছে।

দ্বিতীয়বার দেখা শাহরানপুরে, বাসস্ট্যান্ডে মেয়েকে খুঁজছে। ঠোঁট ফেটে গেছে, চুলে জট লেগেছে। লিয়াজোঁ অফিসার তাকে বলল, এভাবে খুঁজে কোনো লাভ হবে না, তোমার মেয়েকে হয়তো মেরেই ফেলেছে। খুন? না, কেউ আমার মেয়েকে খুন করতে পারে না। তৃতীয়বার দেখার পর লিয়াজোঁ অফিসার আবারও বলে, এবার থাম। মেয়ে খুন হয়ে গেছে। তার কথার পাত্তা না দিয়ে মহিলা বলল, মিথ্যুক। কেউ আমার মেয়েকে খুন করতে পারে না।
কেন?
কারণ সে অনেক সুন্দর। এত সুন্দর মেয়েকে কেউ খুন করতে পারে না। এত সুন্দর মেয়েকে কেউ আঘাতও করতে পারে না।
লোকজন লিয়াজোঁ অফিসারকে বলে, তাকে পাকিস্তানে নিয়ে কোন মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে দাও। সে এখন পুরো পাগল।

আরও কয়েকবার তার সাথে দেখা হয়। শেষবার দেখা হয় অমৃতসরে। পাকিস্তানে নিয়ে আসার প্রস্তাবে লিয়াজোঁ অফিসার সাড়া দেয়নি। এখানে তো তার বেঁচে থাকার অন্তত একটি কারণ রয়েছে, মেয়েকে খুঁজছে। কিন্তু পাকিস্তানে গিয়ে কি করবে?
শেষবার অমৃতসরের ফরিদ চকে। বুড়ি আধেক অন্ধ হয়ে গেছে। একটি অপহৃত মুসলমান মেয়েকে উদ্ধারের চেষ্টা তখন চলছে।

লিয়াজোঁ অফিসারের চোখে পড়ে একটি দম্পতি–যুবক সুন্দর ও হ্যান্ডসাম, তার স্ত্রীর মুখ শাদা চাদরে অংশিক ঢাকা। যুবকটি শিখ।

বৃদ্ধাকে অতিক্রম করার সময় যুবক হঠাৎ থামল, দু এক পা পিছিয়ে এল। চাদর সরে গেলে লিয়াজোঁ অফিসার দেখল মেয়েটি সত্যিই সুন্দর।

যুবক মেয়েটিকে বলল, তোমার মা।

মেয়েটি একদণ্ডের জন্য পেছনে তাকিয়ে চাদরে মুখে ঢেকে যুবকের হাত ধরে বলল, চল তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যাই।

মহিলা চিৎকার করে উঠল, ভাগবরী, ভাগবরী।

ভাগবরী মানে ভাগ্যবতী।

লিয়াজোঁ অফিসার দ্রুত তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, কাকে দেখেছ?

উন্মাদিনী বলল, আমার মেয়ে ভাগবরীকে।
তার চোখ আলোকে উদ্ভাসিত।
লিয়াজোঁ অফিসার বলল, মিথ্যে কথা। তোমার মেয়ে মৃত।
না, তুমি মিথ্যে বলছ।
লিয়াজোঁ অফিসার তখন বলল, খোদার কসম, খোদাকি কসম তোমার মেয়ে মৃত। বৃদ্ধা তখনই রাস্তায় পড়ে গেল। তখনই তার দমও বেরিয়ে গেল।

 

ঠাণ্ডা গোস্ত

অনেকদিন পর ভরা যৌবনবতী কুলবন্ত কাউরের হোটেল কক্ষে ঢুকল ঈশ্বর সিং, তখন রাত বারটা, শহর নিঝুম। কুলবন্ত তেজী নারী, থলথলে নিতম্ব, উদ্ধত স্তন। ঈশ্বর সিং-এর পাগড়ি প্যাঁচ শিথিল হয়ে আসছে, হাতে কম্পমান কৃপাণ। যে কেউ বলবে তারা পরস্পরের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে।

কিন্তু ঈশ্বর সিং এতদিন কোথায় ছিল? কুলবন্ত কাউরের প্রশ্নের জবাবে জানায়, জানি না।
কুলবন্ত বলে, এটা পুরুষ মানুষের জবাব হতে পারে না।
তারপর কুলবন্তের শরীরে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। কুলবন্ত বলে, নিশ্চয়ই অনেক লুটপাট করেছ।
কিছুদিন আগেই লুটের স্বর্ণালঙ্কার কুলন্তের গায়ে চাপিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে যায়। তারপর আর খবর নেই।

মধ্যরাতে ঈশ্বর সিং কুলন্তকে দলিতমথিত করে জাগিয়ে তুলল, কিন্তু জাগরণ হলো না তার নিজেরই। নিজেকে শারীরিকভাবে সক্রিয় করতে যত পন্থা তার জানা ছিল, সব চেষ্টা একে একে ব্যর্থ হল। তার ব্যর্থতা ক্ষিপ্ত করে তুলল কুলবন্ত কাউরকে।

ঈশ্বর সিং যখন দেখল তার উত্থিত হওয়ার আর সম্ভাবনা নেই, নিশ্চুপ শুয়ে রইল বিছানায়। অতৃপ্ত কুলবন্ত চেঁচিয়ে উঠল, কোন হারামজাদিকে সব দিয়ে এসেছিস? কসম, আমিও সর্দার লেহাল সিংয়ের বেটি, মিথ্যে বললে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলব। বল কে সে নারী যে তোর সকল জীবনীশক্তি শুষে নিয়েছে?

এক পর্যায়ে ক্ষিপ্ত কুলবন্ত ঈশ্বর সিংয়ের কৃপাণ খুলে তাকে আঘাত করল, ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হল। অতৃপ্ত নারী, যত প্রিয়জনই হোক, ভয়াবহ হয়ে উঠে।

কুলবন্ত ঈশ্বরের চুলের মুঠি ধরে আছড়াতে থাকে। একজন নারী নিশ্চয়ই তার আর ঈশ্বরের মাঝখানে ঢুকে পড়েছে।
ঈশ্বর সিং নিরুত্তর।
কুলবন্ত জিজ্ঞেস, বলছিস না কেন? সে কি তোর মা?
এই ভয়াবহ রূঢ়তার মধ্যে ঈশ্বর সিং মুখ খুলে, কুলবন্ত এই কৃপাণ দিয়ে আমি ছ`জনকে হত্যা করি।

খুন আর লুটতরাজের কাহিনীর দরকার নেই তার। সে শুধু নিশ্চিত হতে চায় কোন নারী ঈশ্বর সিংকে নিঃশেষ করেছে তার পরিচয়। কৃপাণের আঘাতে রক্তপাত হচ্ছে তারও। ফিনকি দিয়ে গোঁফের উপর উপর ছিটকে পড়া রক্ত ফুঁ দিয়ে সরিয়ে ঈশ্বর সিং বলে, ছ`জনকে খুন করেছি আর খুব সুন্দর একটি মেয়েকে তুলে নিয়ে এসেছি।

ঈশ্বর সিং বলে, কুলবন্ত আমি তাকেও খুন করতাম কিন্তু একবার মনে মনে হল তোকে তো প্রতিদিনই পাই। এমন সুন্দর একটি মেয়েকে একবারও ভোগ করব না?

ঈশ্বর সিং সেই সুন্দরীকে কাঁধে নিয়ে খালের ধারে একটি ঝোপের আড়ালে শুইয়ে দিল। তারপর শুরু করল প্রাক শৃঙ্গার পর্ব। তারপর যখন ব্যাপারটা ঘটতে যাবে ঈশ্বর সিংয়ের বর্ণনা হঠাৎ নিষ্প্রাণ হয়ে গেল।
কুলবন্ত জিজ্ঞেস করল, তারপর কি হল?
ঈশ্বর সিং বলল, টের পেলাম এটা একটা মৃতদেহ। আগেই সে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। পুরোপুরিই ঠাণ্ডা গোস্ত।
কুলবন্ত যখন ঈশ্বর সিংয়ের হাতে হাত রাখে অনুভব করে হাতটাও ঠাণ্ডায় জমে গেছে।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত