ত্রিভুজ প্রেম

একটা ত্রিভুজ প্রেমের গল্প বলতে চাই আপনাদের নিখুঁত ত্রিভুজ প্রেমের গল্প এটা। সিনেমাতে যেমন দেখা যায় দুইটা ছেলে একটা মেয়ের প্রেমে অথবা দুইটা মেয়ে একটা ছেলের প্রেমে পড়ে প্যাঁচ লাগিয়ে দেয়, আমরা ভ্রু কুঁচকে ভাবি দুনিয়ায় কী আর মাইয়া নাই পোলা নাই? তেমন গল্প নয় এটা, এই গল্পের শেষে আপনাদের মনে হবে ত্রিভুজ প্রেম হলে এমনি হওয়া উচিত। গল্পের শুরু তিন নায়ক নায়িকার ছোটবেলায়, কিন্তু প্রায় ত্রিশ বছর বয়সে তারা আসলে পুরোপুরি জানতে পারে যে, তাদের প্রেম ছিল এবং সেটা খাঁটি ত্রিভুজ ছিল। মানে মালেক আর আনিস পাপিয়ার প্রেমে আর পাপিয়া, মালেক আর আনিসের প্রেমে পড়েছিল। পড়েছিল মানে পড়েই ছিল, কখনও ওঠেনাই।

তারা তিনজন একই বছরে জন্মেছিল, এক গ্রামে এক পাড়ায়। তাদের পাড়ায় সে বছর আর তার আগের পরের তিন চার বছরে পাপিয়া ছাড়া আর কোনো মেয়ে জন্মায় নাই। কাজেই পাপিয়ার খেলার সাথীরা সব ছেলে। জিয়া আমল দেখেনাই তারা, শুনেছে। আর টি শার্টের মত সাদা গেঞ্জি সানগ্লাস আর টুপি মাথায় ছবি দেখেছে। একবার নাকি তাদের গ্রামের পাশেই থানা সদরে যে কলেজ যেখানে এসেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া, পাপিয়ার বড় ভাই দিদারের সাথে হ্যান্ডশেকও করেছিলেন। মানে দিদার ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্যেই তিনি বেলকুচি এসেছিলেন, ঘটনা তেমন নয়। কলেজের মাঠে যে স্কুলের বাচ্চারা দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের মধ্যে দিদার ভাই ছিল এবং হ্যান্ডশেক হয়েছেকিন্তু গল্পটা দিদার ভাই এমনভাবে করত যে এরশাদ আমলে বসেও রোমাঞ্চিত হত ছোটরা সে গল্পে দিদার ভাই আর প্রেসিডেন্ট জিয়া ছাড়া বাকি সবাই মুছে যেত। পাপিয়া, মালেক, আনিসরা কল্পনায় দেখত, বেলকুচি কলেজের মাঠে মেঘলা দুপুরে একলা দাঁড়িয়ে আছে দিদার ভাই, হেলিকপ্টার থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে এসে প্রেসিডেন্ট জিয়া দিদার ভাইয়ের সাথে হ্যান্ডশেক করছেন। দিদার ভাই তখন ক্লাস সিক্স।

তারা তিনজন যখন ক্লাস ফাইভ পাশ করে সিক্সের জন্য অপেক্ষা করছে, তখন এরশাদ আমল শেষ হয়ে গেল। সেই ছুটিতে একইদিনে আনিস আর মালেকের খৎনা হল, আর পাপিয়ার মাসিক হলোফলে তিনজনেরই বিকেলের গোল্লাছুট খেলা স্থগিত হয়ে গেল। তখন তারা বাঁশ দিয়ে ক্যারাম বোর্ডের স্ট্যান্ড বানিয়ে ক্যারাম খেলা শুরু করল। সপ্তাহ খানেক পরে তিনজনই সুস্থ হয়ে গেল আর গোল্লাছুটে ফিরে গেল। কিন্তু পরের মাসে পাপিয়া বলল যে, মাসে কয়েকটা দিন বিকালবেলা তাদের ক্যারামই খেলতে হবে আনিস আর মালেক অবাক হয়ে বলল যে, তাদের নুনুতো শুকিয়ে গেছে, দৌড়াতে আর অসুবিধা নাই। কিন্তু পাপিয়া তাদের বলল, তারতো প্রত্যেক মাসে কাটা পড়বে! ফলে তারা তিনজন একসাথে বুঝতে পাড়ল যে তারা তিনজন  আসলে দুইরকম। আর তিনজন দুইরকম হয়ে দুই স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়তে গেল।

তারা কেউই বেশি ভাল নয় লেখাপড়ায়, সবারই বিশের উপরে রোল। ইংরেজিতে তিনজনই কাঁচা। শুধু পাপিয়া অঙ্কে ভালো, আশির উপরে পায়। পাপিয়ার চাচা ইলিয়াস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, তাদের গ্রামের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। চাচা ছুটিতে বাড়ি এলেই পাপিয়ার অঙ্ক নিয়ে বসে। লম্বা ঝাঁকড়া চুলের ইলিয়াস চাচা জাসদ করে, হাতের দুইটা নখ বড়। তাকে দেখলে ভয় পায় গ্রামের ছেলে ছোকড়ারা চাচা ছুটিতে বাড়ি এলে পাপিয়া বিকালে খেলতে আসে না, অঙ্ক করে। তারা যখন এইটে উঠল তখন ইলিয়াস চাচা পাশ করলেন, আর বিয়েও করে ফেললেন। চাচী ইলিয়াস চাচার ক্লাসমেট এবং বেজায় সুন্দরী। গ্রামের মানুষ এতদিন শুধু শুনেছে চোখ ফেরানো যায় না, এবার সত্যি বুঝল চোখ ফেরানো যায় না সুন্দরী কাকে বলে। চাচী এসেই পাপিয়াকে নিয়ে পড়লেন। ব্রেশিয়ার কিনে আনলেন। পাপিয়া বিকেলে খেলতে এসে বলল, ‘ওই তোরা খেলার সময় আমার বুকের দিকে তাকাস?’ মালেক বলল, ‘তাকাইতো! অল্প অল্প নড়ে!’ পাপিয়া বলল, পিঠে হাত দিয়ে দ্যাখ, আর নড়বে না! একে একে পিঠে হাত দিতে শক্তমত কিছু পেল তারাপাপিয়া বুক ফুলিয়ে বলল, ‘এর নাম ব্রেশিয়ার!’ আনিস ঠোঁট উল্টে বলল, ‘আচ্ছা বুঝলাম, এর নাম ব্রেশিয়ার, চল এবার খেলি।’ পাত্তা না পেয়ে পাপিয়া বলল, ‘ওই চাচী বলছে, তোরা আর আমারে ছুঁতে পারবি না, আমি এখন বড় হইচি।’ মালেক বলল, তুইও আর আমাদের ছুঁতে পারবি না, আমরাও এখন প্যান্টের নীচে জাঙ্গিয়া পরি! ছোঁয়াছুঁয়ি বাদ দিয়েই বিকালবেলার গোল্লাছুট ছুটে চলে

নাইনে উঠে সায়েন্স নিল পাপিয়া, আনিস আর মালেক আর্টস। পাপিয়ার চাচী বেলকুচি কলেজে জয়েন করল তারা এখন গোল্লাছুট খেলে কম ক্যারাম বেশি দেখতে দেখতে ক্লাস টেন এসে গেল, প্রিটেস্ট হয়ে টেস্ট পরীক্ষাও হয়ে গেল। সেই সময় একদিন স্কুলে মালেকের হাতে এল একটা চটি। মালেক আর আনিস লুকিয়ে পড়লপড়ে ঘোলা চোখে মালেক বলল, ‘আনিসরে আমারতো পাপিয়ারে জড়ায়ে ধরে চুমা খাইতে মন চাইতেছে!’ আনিস বলল, ‘আমারও।’ তারপর দুইজন মিলে ঠিক করল, কালকেই তারা পাপিয়াকে বলবে চুমা-ইচ্ছার কথা। পরের দিন বিকালে পাপিয়া বোমা ফাটাইল, মালেক আর আনিসকে বলল, ‘ওই ম্যাট্রিক পরীক্ষার আর সাতাশ দিন বাকি। আমি এই সাতাশ দিন ঘরের বাইরে যাব না, ইস্কুলেও না। তোরা আমারে একদম ডাকবি না, আমাদের বাড়ির বগল দিয়া যাওয়ার সময় আস্তে কথা কবি, আমার কানে যেন তোদের গলা না যায়!’

ঘরে ঢুকে গেল পাপিয়া। সে সময় হিরু চাচা রাজনীতিতে সক্রিয় হলো আর ইলিয়াস চাচা রাজনীতি ছেড়ে দিল। পুরা জিয়া-এরশাদ আমল তাদের এলাকার চেয়ারম্যান ছিল আজম দাদা। পাপিয়াদের গ্রামের সবচেয়ে আকর্ষণীয় লোক তিনিঅস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা গ্রামের একমাত্র ফ্রিডম ফাইটার। ছয়ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা আজম দাদা ঘিয়া রঙের তিন পকেটওয়ালা পাঙ্গাবী আর সাদা চেকের লুঙ্গি পরেনডান হাতের দিন আঙ্গুলে সাদা পাথরের তিনটা আংটি, পায়ে দেন রাবারের এক রকমের শু। অভিজাত বলতে তাকেই চেনে এ এলাকার লোক। কিন্তু খালেদা জিয়া আমলে এসে ক্লান্ত হয়ে গেলেন তিনি। তার ছেলেরাও কেউ চেয়ারম্যান হতে আগ্রহী হল না। হিরু মালেকের চাচাএলাকার সবাই হিরু চাচার মধ্যে আগামী চেয়ারম্যান খুঁজতে লাগলো

এই যে এত জিয়া এরশাদ আর চেয়ারম্যানি আলাপ পাড়তেছি দেখে মনে করবেন না যে পাপিয়াদের গ্রামের মানুষের রাজনীতি নিয়ে বেশি কিছু আসে যায় আসলে গ্রামের জীবন এক রকমই চলে কিন্তু আনিস আর পাপিয়ার বন্ধু মালেক এক সময় চেয়ারম্যান হবে, তাই এত কথা বলা সে গল্প পরে করব, আগে ম্যাট্রিকের রেজাল্ট শুনুন

পাপিয়া সেই যে ঘরে ঢুকল, সাতাশ দিন পর মালেক আর আনিস তাকে দেখতে পেল প্রথম পরীক্ষার দিন সকালে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে চাচীর সাথে পাড়াতো চাচীদের সালাম করতে বেড়িয়েছিল পাপিয়া মালেক, আনিসের সাথে পাড়ার লোকও অবাক হয়ে গেল! সাতাশ দিন গায়ে রোদ না লাগলে এই রকম সাদা হয়ে যায় শ্যামলা মেয়ে! পরীক্ষার এক মাসে পাপিয়া আরো সাদা হয়ে গেল মালেক আর আনিসের মনে হতে লাগল, পাপিয়াকে আর কোনোদিন চুমা খাওয়া হবে না তাদের

পরীক্ষার পর ইলিয়াস চাচার ঢাকায় চাকরি হয়ে গেল ঢাকায় বাসা নিয়ে বউ আর পাপিয়াকে নিয়ে গেল চাচী কলেজের মাস্টারি ছেড়ে দিয়ে ঢাকায় গিয়ে স্কুলের মাস্টার হল তিনমাস পরে রেজাল্ট বেরোলে চমকে গেল গ্রামের সবাই! রাজশাহী বোর্ডের আঠারতম স্ট্যান্ড করেছে পাপিয়া! মালেক আর আনিস সেকেন্ড ডিভিশন একটা সাতাশ দিন তাদের তিনজনের মধ্যে বেলকুচি কলেজ আর ঢাকা সিটি কলেজের ব্যাবধান এনে দিল। ছুটিতে বাড়ি এসে প্রত্যেকবার একবার হলেও মালেক আর আনিসের সাথে গল্প করতে বসে পাপিয়া। সেসব গল্পে ঢাকা আর পড়ার গল্পই থাকে শুধু। পাপিয়া একবারও বলে না, তোদের ছেড়ে থাকতে কষ্ট হয়! মালেক আর আনিস একসঙ্গে থাকলেই পাপিয়ার নিষ্ঠুরতার গল্প করে। পাপিয়াকে ছাড়া তাদের বুক ভেঙ্গে যেতে চায়।

আইএসসিতে স্ট্যান্ড করল না পাপিয়া কিন্তু অনেক ভালো রেজাল্ট এবারও। মালেক ফেল করল আর আনিস সেকেন্ড ডিভিশন। বুয়েটে ভর্তি হয়ে গেল পাপিয়া। মালেক বলল সে আর লেখাপড়া করবে না, রাজনীতি করবে। আনিস বেলকুচি কলেজে ডিগ্রি ভর্তি হল। সেই সময় তাদের গ্রামের ময়না ভাই মালেশিয়া গেল। আর আনিস মনে মনে ভাবতে লাগলো, সেও চলে যাবে। ময়না ভাই যাওয়ার আগে গোপনে আনিস ময়না ভাইকে বলল, ‘তুমি ফিট হইয়া আমাক লিয়া যাইও।’ ময়না ভাই কথা দিয়েছিল, কিন্তু কথা রাখে নাই মালেক এখন রাতদিন হিরু চাচার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে, বাজারে গিয়ে বড়দের সাথে দোকানে বসে চা খায় মালেক আর পাপিয়া দুজনকে হারিয়ে দিশেহারা আনিস দুয়েক বোতল ফেন্সিডিল চেখে দেখা শুরু করল নকল করে বিএ পাশ করে মাকে গিয়ে বলল, মালেশিয়া যেতে চায় সে মা রাজি হয় হয় সেই সময় ফিরে এল ময়না ভাই ময়না ভাইকে দেখে গ্রামের লোক যত জোরে চমকাল, তত জোরে আর কোনোদিন চমকায় নাই তারা দেড় বছরে নায়ক জসিমের মত তাগড়া একটা ছেলে দিলদারের মত হতে পারে! কোনো রকমে হাড্ডির উপরে চামড়া শুকিয়ে গেলে যে মানুষ খাটোও হয়ে যায় আগে জানে নাই তারা

দেড় বছরে চুল দাড়িতে কাঁচি পড়েনাই ফিরে তিনদিন একটু খাওয়া দাওয়া করে সুস্থির হলে  ময়না ভাইয়ের বাবা নাপিত ডেকে ছেলের চুল দাড়ি কামিয়ে দিল আগা গোড়া আনিস সব দেখছিল, চুল দাড়ি কামানো হয়ে গেলে আনিস আর অন্যদের ঘর থেকে উঠানে বের করে দিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল সবাই বুঝে গেল অন্যসব ক্ষৌর কর্মও করিয়েছিল বাপ দাঁড়িয়ে থেকে কয়েকদিন পরে গ্রামের ছেলেরা ঘিরে ধরল তাকে গল্প শুনে শিউরে উঠল সবাই দালাল ধরে গিয়েছিল ময়না ভাইদের লট ঢাকা থেকেই কষ্টের শুরু লিগাল ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট ছাড়াই পৌঁছে গিয়েছিল গিয়েই ধরা পড়েছিল জাহাজ ভরে এইসব দাগি আসামিদের একটা দ্বীপে ফেলে দিয়ে এসেছিল মালেশিয়ার আইন মাঝে মাঝে কিছু পাউরুটি ফেলে দিয়ে আসত, আর খাবার হিসেবে ছিল অচেনা পাতা গ্রামের মানুষ দুর্ভিক্ষ দেখেনাই, কিন্তু ময়না ভাইকে দেখে তাদের জয়নুল আবেদীনের ছবির কথা মনে পড়ল আর ময়না ভাইকে দেখে বেঁকে বসল আনিসের মা সেও আর মালয়েশিয়া যাওয়ার সাহস করল না মালেক রাজনীতিতে ঢুকে গেলে তার রাতদিন পাপিয়াকে মনে পড়তে লাগল পাপিয়া আর অধরা মালয়েশিয়া আর মালেকের রাজনীতি তাকে ঠেলে ফেন্সিডিলের আরো কাছে নিয়ে গেল সেই সময় খবর এলো সরকারি উদ্যগে ট্রেনিং দিয়ে মালেশিয়ায় বাথরুম ক্লিনার পাঠানো হবে খরচাপাতিও কম। ততদিনে ময়না ভাইয়ের হাড্ডির উপর খানিক মাংস লেগেছে। ক্লাস এইট পড়ুয়া বিড়াল চোখের এক মেয়ের সঙ্গে ময়না ভাইয়ের বিয়ে দিয়েছেন তার বাবা। ধুম প্রেম তাদের। কাজেই মালেশিয়া খুব খারাপ দেশ, এই ছবি প্রায় মুছে গেল আনিসের মায়ের চোখ থেকে। সে তুলনায় ছেলের ফেন্সিডিল খাওয়া ঘোলা চোখ দেখে তার অন্তর কাঁদতে লাগল।  

ছেলেকে ফেন্সিডিল থেকে বাঁচাতে রাজি হল মা আনিস যে পাপিয়ার জন্যও কাবু মা তা জানে না তবু পাপিয়ার সাথে তার দেখা হয়ে গেল মালেশিয়ায় সে গল্প পরে করব, মালেকের সাথে বসে মালেক ছাড়া আনিসের পাপিয়া কাহিনি কোনোদিন জমে নাই পাপিয়া ততদিনে ঢাকার পড়া শেষ করে বিদেশ পড়তে চলে গেছে। অভিমান করে কোন দেশে গেছে জানতে চায় নাই আনিস।

ঢাকা গিয়ে ট্রেনিং নিল আনিস, কীভাবে এপ্রোন পরে মাথা ঢেকে বিশেষ ধরনের স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে একটুও হাত না লাগিয়ে বাথরুম ধুতে হয় বড় বড় হোটেলের আলিশান বাথরুম ধোয়ার বিশেষ ধরনের সাবান আর লাঠি জাতীয় ঝাড়ু ব্যাবহার করা শিখে গেল ভিডিও দেখালেন ট্রেনার। 

সহি পথে সহি সালামত পৌঁছে গেল কুয়ালালামপুর সেখান থেকে মেলাকা মেলাকার সাথে ঢাকার মিল আছে নামে মেলাকাও আগে মেলাক্কা ছিল আর মালেকের নামের সাথেও মিল তাই তার ভালো লাগতে লাগল দা ম্যাজেস্টিক মালাক্কা নামের হোটেলে পোষ্টিং পেল এই হোটেলওয়ালারা দেখেন কি মিষ্টি, নতুন নাম পেয়ে আগের নাম ভোলে নাই এমন হোটেল কোনোদিন দেখে নাই সে

মালেকের সাথে প্রথমবার ফোনে কথা বলতে গিয়ে আনিস বলল, ‘পরিষ্কার বলতে যেমন আমরা ঝকঝকা তকতকা বুঝি, তেমন না যেমন বানের পানি, ঘোলা কিন্তু দেখলে শান্তি হয় বুঝাইতে পারলাম না তো? ধর, ম্যাট লিপস্টিক, যে ঠোঁটে দিল তাকে ব্রাইট লাগবে, কিন্তু ওটা নিজে চকচকা না।’ মালেক হাসতে হাসতে বলল, ‘শালা তুই ম্যাট লিপস্টিক ক্যামনে চিনলি?’

যাই হোক, কাজের জায়গা পছন্দ হল আনিসের একটাই অসুবিধা এই হোটেলে মনে হয় সে ছাড়া ভারত- বাংলাদেশের কেউ নাই মানে কথা বলার মানুষ নাই ভালোই হয়েছে, তার অত কথা বলা পছন্দও নয় পাঁচতলার পাঁচটা বাথরুম পরিষ্কার করার দ্বায়িত্ব তার এর মধ্যে একটা ভিআইপি স্যুটের দিনে তিনবার প্রথম মাস কয়েকজনের সাথে ভাগাভাগির এক রুমে থাকল, হোটেলের কাছাকাছি এক বাড়িতে রুমমেটরা সব কন্সট্রাকশন লেবার কার বাড়ি যে কোথায়! কালো ধলা মিলিয়ে, এদের কারো সাথে তেমন খাতির হল না প্রথম মাসের বেতন পেয়ে, ইন্টারনেট ঘেঁটে, এখানকার ইউনিভার্সিটির এক পিএইচডি স্টুডেন্টের সাথে দুইরুমের এক পুরান বাড়িতে উঠে গেল হোটেল থেকে একটু দূরই হলো যদিও বেতনের টাকার প্রায় অর্ধেক চলে যাবে থাকা খাওয়ায়, তবুও তিন মাস পরে হাতে কিছু টাকা জমলে একটা ফোন কিনল আর মাকে পাঠিয়ে দিল অল্প কিছু এক সপ্তাহে মালেকের সাথে, পরের সপ্তাহে মায়ের সাথে কথা বলে সে মার কাছ থেকেই শুনল চেয়ারম্যান হয়েছে মালেক। বিএনপি করা হিরু চাচার ভাতিজা মালেক লীগার হয়েছেনতুন চেয়ারম্যান পেয়ে মা খুশি হয়েছে, মালেশিয়া থেকে পনেরদিনে একবার ফোন করলে, মা বলে, মালেক ভালই কাজ করতেছে, গ্রামের পুকুর ঘাটগুলাতে শান বাঁধানো সিঁড়ি বানায়ে দিতেছে, কাঁচা রাস্তা সব পাকা করতেছে আহা পুকুর ঘাট! পাপিয়ার খুব শান বাধানো পুকুর ঘাটের শখ ছিল।

চার বছর মন দিয়ে কাজ করল আনিস। মাসে একদিন ছুটি নিল, বাকি তিন সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কাজ করলভালই টাকা জমল হাতে, এবার একবার বাড়ি যাওয়া যায়। সামনে ঈদ, ছুটির দরখাস্ত জমা দিল আর এক মাসের ছুটি পেয়ে গেল। টিকিট কাটা হয়ে গেল, পনের দিন পরে ফ্লাইট। তখন একদিন এক বাথরুম পরিষ্কার করতে ঢুকে শিউরে উঠল আনিস, পাপিয়ার গায়ের গন্ধ! সকাল দশটার দিকে রুমের বাসিন্ধা বাইরে বেরিয়ে গেলে রুম সার্ভিসের লোক আর হোটেল ম্যানেজমেন্টের লোক একসাথে আসে। রুম সার্ভিস রুম পরিষ্কার করে, আনিস বাথরুম পরিষ্কার করে আর ম্যানেজমেন্টের লোক তদারকি করে। আনিস ততদিনে মালয়েশিয়ার ভাষা শিখেছে ভালই ইংরেজিও শিখেছে অল্প রুম সার্ভিসের লোকটাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে জানতে পারল, এই রুমে যে উঠেছে তার নাম পাপিয়া সুলতানা! শুনে আনিসের বুকের ভেতর এত জোড়ে ড্রাম পেটাতে লাগল যে তার ভয় হল, রুম সার্ভিস ছোকরা মনেহয় শুনে ফেলবে! মালেককে ফোন করে বলল, পাপিয়ার মায়ের কাছ থেকে জানতে যে, পাপিয়া এখন কোথায়! হ্যাঁ পাপিয়া ইংল্যান্ড থেকে একটা কনফারেন্সে এসেছে মালেশিয়ায়, সামনের সপ্তাহে বাড়ি যাবে! আনিসের মনে হল সে মরে যাবে, এই উত্তেজনা সে বহন করতে পারছে না একটা কাগজে নিজের নাম আর ফোন নম্বর লিখে রিসেপ্সনের যেখানে চাবি রেখে বোরডারা বাইরে যায় সেখানে রেখে দিল, রুম সার্ভিস ছেলেটা হেল্প করল সন্ধ্যাবেলা ফোন করল পাপিয়া, ‘আনিস?’

আনিসের গলায় কি যেন দলা পাকিয়ে উঠল, কথা বলতে সময় লাগল আবার পাপিয়ার গলা, ‘কই তুই?’ আনিস এবার কথা বলল, ‘সত্যি তুই পাপিয়া, আমাদের পাপিয়া?’ ‘এখনি আয় হোটেলে’, পাপিয়া বলল, হ্যাঁ পাপিয়াই বলল আনিস ছুটে এসে দেখল হোটেলের মেইন গেটে পাপিয়া হাঁটাহাঁটি করছে আনিসকে নিয়ে রুমে গেল পাপিয়া রুমে গিয়ে আনিস প্রথমেই বলল, ‘মালেক চেয়ারম্যান হইছে আর তোর জন্য গ্রামের সব পুকুরের ঘাট শান বাধাইয়া সিঁড়ি কইরা দিছে!’ তারপর মালেককে ফোন করল আনিস, ফোনের কাছে মুখ নিয়ে দুইজন এক সাথে চিৎকার করল, ‘মা… লে… ক… ক…’

ছোটবেলার মত গল্প করল তারা, আর পাপিয়া বলল, সে স্বপ্ন দেখেছিল ম্যাট্রিক পরীক্ষার আঠাশ দিন আগে কী স্বপ্ন? মালেক আর আনিস দুইজনকে একসাথে চুমা খাচ্ছে সে! স্বপ্ন দেখে সে এত ভয় পেয়েছিল যে, ঘরে ঢুকে গেছিল আনিস বলল,  তারা দুইজনও একসাথে পাপিয়াকে চুমা খাবে বলে ঠিক করেছিল চুমার কথা বলতে বলতে পাপিয়া জড়িয়ে ধরল আনিসকে, আদর করতে করতে বলল, ‘এইযে কত কত ঘুরলাম আমি, মালেক আর তুই ছাড়া আর কোনো ছেলেকে মনে ধরল না!’ পাপিয়ায় ডুবে যেতে যেতে আনিস জড়ানো গলায় বলল, ‘আমি আর মালেকও তোকে ছাড়া কোনো মেয়েকে কোনোদিন ভালো করে দেখি নাই!’ রাতে তারা একসঙ্গে খেলো, কথা হল বাড়ি যাওয়া নিয়ে তাদের বাড়ি ফেরার টিকিট সাতদিন আগে পরে পাপিয়া দুই সপ্তাহ বাড়িতে থেকে ফিরে যাবে ইংল্যান্ড একমাস পরে মালেশিয়া ফিরবে আনিস

বাড়ি গিয়ে ঈদের দিন তারা তিনজন হেঁটে হেঁটে অনেকদূর গেল, ব্রিজের নীচে গল্প করতে বসল মালেক একাই কথা বলছিল, পাপিয়া আর আনিস চুপ হঠাত পাপিয়া মালেকের হাত চেপে ধরল, ‘মালেক! মাফ কইরা দে!’ পাপিয়ার গলা শুনে চমকে উঠল মালেক, আনিসও মালেক অবাক হয়ে বলল, ‘মাফ ক্যান?’ বিষন্ন গলায় পাপিয়া বলল, ‘আমি আর আনিস তোকে ছাড়া এক বিছানায় রাত কাটাইছি!’ মালেক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হাহাকার করে উঠল, ‘পারলি তোরা…!’

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত