তুই জগতের স্বপ্ন হতে এসেছিস আনন্দ-স্রোতে

 

 

বাঙ্গালি মাত্রই একজন মানুষের কাছে কোনো না কোনোভাবে ঋণী। যে কথা আমি/আমরা বলবো ভাবি, সে কথা অনেকদিন আগে আলখেল্লা পরা ঋষির মত এক বুড়ো ফটফটিয়ে বলে গেছেন। কী গান, কী কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, ছোটোগল্প, আঁকাআঁকি হেন মাধ্যম নেই যেখানে এই মানুষ মানবিক যাবতীয় অনুভূতির সবটা বলতে বাকী রেখেছেন। নতুন করে যা-ই বলতে বা লিখতে চেষ্টা করা হোক, দেখা যায় আগেভাগেই সেসব বলা হয়ে গেছে। কিছুই অবশিষ্ট নেই যেন। অনুমান করি, বিপদটা অতিমাত্রায় টের পান কবি- গীতিকারের দল।

সাহিত্যিক সন্তোষকুমার ঘোষের মতে, “পৃথিবীর সব গল্প বলা হয়ে গেছে, এখন কীভাবে বলতে হবে সেটাই জানা প্রয়োজন।” প্রয়োজনের এই হ্যাপা গল্প বা উপন্যাসের ক্ষেত্রে বেশ কৃতিত্বের সাথেই সামাল দেবার নজির রেখেছেন সাহিত্যিকেরা। কিন্তু কবিতা- গানের বেলায়, বিশেষ করে গানের ক্ষেত্রে বেশ একটু নাজেহাল অবস্হা যেন। ওঁর গানের বাণীর সামনে বুকটান করে দাঁড়াবার ক্ষমতা খুব কম গানে পাই। এমন অবস্হায় হতাশ হবার প্রবল আশঙ্কা, মানুষ মাত্রই রাগে ক্ষোভে আক্রান্ত হবার কথা। তবে আশ্চর্য, এহেন মানুষের উপর রাগ বা ক্ষোভের ধৃষ্টতা আসে না আসলে। যা আসে সেটা অবাক মুগ্ধতা, অপার বিস্ময়। একজন মানুষের এতটা লেখার, এতটা সইবার ক্ষমতা সত্যি বিরল।

অবশ্য বাঙ্গালি মাত্রই রবীন্দ্রনাথ কে মাথায় তুলে নাচেন, এমন নয়। একদল ভক্তির আতিশয্যে আকাশে উঠিয়ে মাটির মানুষটির ‘দেহখানি তুলে’ ধরতে চান, তাতে করে যে ঠাকুরটির মাটির সাথে সম্পর্ক ঘুচে যাবার যোগাড় হয় সেটি মাথায় থাকে না তাঁদের। এমন না করে তারা যদি রবীন্দ্রনাথের চাওয়া সমাজ, শিক্ষা, সংস্কারের অচলায়তন ভাঙবার যে ইচ্ছেটি ছিল তা পূরণে মনোযোগ দিতেন তবে রবি ভক্তি সঠিক পথের দিশা পেতো। অন্যপক্ষ আকাশ থেকে পাতালে টেনে নামাতে পারলে বেশ হতো’র এক ধরনের কাল্পনিক সুখে বিভোর হয়ে যৌক্তিক- আযৌক্তিক কেচ্ছা কাহিনি রচনায় মত্ত থাকেন। সেটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামের এই অবাক মানুষটির জীবিতকালেও যেমন ছিল, আজও আছে। হয়ত আক্রমণের লক্ষ্য ঘুরেছে। এই দলটিও বুদ্ধি বিবেচনার মাথাটি ভক্ষণপূর্বকই এহেন কার্য সাধনে মত্ত থাকেন। নইলে এটুকু বোধে আসতো বৈকি, যাঁকে কেন্দ্র করে কলমবাজি, সেটা কতটা সত্যের প্রতি আন্তরিকতায়, আর কতটা ব্যবসায়িক কাটতির কাছে বন্ধক থাকবার আকাঙ্ক্ষায়।

অবশ্য বিখ্যাত মানুষদের সাহিত্য বিচারের পাশাপাশি তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনকে আলোচনায় টেনে আনবার দায় শুধুমাত্র বাঙ্গালীর একচেটিয়া তা কিন্তু না। রোমান্টিক আন্দোলনের কবি লর্ড বায়রন থেকে শুরু করে অনেকেই স্বদেশিদের দ্বারা সংশ্লিষ্টদের সাহিত্য বিচারের চেয়ে তাঁদের অমিতব্যয়িতা, বহুগামিতা ইত্যাদি বিষয়ে সমালোচনার লক্ষ্যে পরিণত হতে দেখা গেছে। শেক্সপিয়রের সাহিত্য সমালোচনার পাশাপাশি একই কারণে আলোচনার বস্তু হয় তাঁর সহধর্মীণীটি কতখানি দজ্জাল ছিলেন সেটি। তাঁর কৃত অশান্তির কারণে শেক্সপিয়র কতখানি দগ্ধ হয়েছেন ইত্যাদি বিষয় জানবার আগ্রহে অনেকেরই পেটের ভাতটি চালে রূপান্তরিত হয়ে কোষ্টকাঠিন্যের কারণ হয়েছে। জীবনানন্দ দাশ তেমন নিস্তার পান না লাবন্য দাশের সাথে তাঁর সুখহীন দাম্পত্য জীবনের আলোচনা থেকে। নজরুলের বাঁধনহারা প্রেমিক জীবনের রসালো কাহিনি, নার্গিস আসার খানম ও প্রমীলা দেবীর সাথে তাঁর বৈবাহিক সম্পর্ক তাই আম পাঠক থেকে শুরু করে বিজ্ঞ গবেষকের কাছে আদরের বস্তু হয়ে দেখা দেয়। হয়ত আসলের চাইতে সুদে মিষ্টি খানিক বেশি, যে কারণে মাছির মত হামলে পড়ার একটা প্রতিযোগিতা চলে আমাদের মধ্যে। প্রতিযোগিতা চলে, কে কতখানি মুখরোচকভাবে বিখ্যাতদের হাঁড়িটি হাটে ভাঙতে পারি। সফল মানুষকে হেনস্তা করবার মধ্যে যে এক ধরনের পাষবিক আনন্দ আছে, তা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করলে চলে নাকি!

সামান্য বুদ্ধিতে যেটুকু বুঝি, কেউ সমালোচনার উর্দ্ধে নন। শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথও একজন মানুষই ছিলেন। দোষ ত্রুটি তাঁরও ছিল বৈকি। সেসব নিয়ে সমালোচনা হোক ক্ষতি নেই, কিন্তু তাতে যুক্তি খণ্ডনের চেয়ে ভেতরের বিষ উগলে দেবার প্রবণতা ভয়াবহ। রবীন্দ্রনাথের সমবয়সী কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদের বিষমাখা কটাক্ষের সামান্য নমুনা,

“উড়িসনে রে পায়রা কবি

খোপের ভিতর থাক ঢাকা।

তোর বক্বকম আর ফোঁস ফোঁসানি

তাও কবিত্বের ভাব মাখা!

তাও ছাপালি, গ্রন্থ হলো

নগদ মূল্য এক টাকা”

একটা সময় পেরিয়ে যে রবির কিরণে বাঙলা সাহিত্য জগত ঋদ্ধ, তাঁর উদ্দেশ্যে এহেন কটুক্তিতে রবীন্দ্রনাথের কিচ্ছুটি যায় আসেনি বলাই বাহুল্য। কালের পানে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রবীন্দ্রনাথের বহু সৃষ্টি শত বর্ষ পর আজও সমকালীন, আজও অপার আনন্দের আধার। কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদের কেউ সেভাবে মনে রাখেননি। আসলে এসব কথার জন্য এ লেখা না, এসব নতুন কথাও না। মূল প্রসঙ্গে যাই বরং। এ বছর, রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকীর ঠিক চারদিন পর মাদার্স ডে পালিত হবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশে। সেই সূত্রে মা কে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা বিষয়ে একটা কৌতূহল উঁকি দিয়ে যাচ্ছে মনে। পাঠক হয়ত প্রশ্নের তীর ছুঁড়তে পারেন, রে বাঙ্গালি এখন যে তুমি স্বয়ং ঠাকুর বাড়ির পাঁচিল টপকাতে চাইছো, তার বেলা? ‘মা’ শব্দের মধ্যে এমন এক জাদু আছে যাঁর কাছে অকপটে পৌঁছে যাবার আকুতি মানুষ মাত্রই। সন্তানের সাথে মায়ের সম্পর্ক পৃথিবীর সবচে’ সুন্দর আর পবিত্রতম। এ নিয়ে কেচ্ছা ফাঁদবার কিছু নেই।

একজন পৃথিবী বিখ্যাত সন্তান হিসেবে বহু (সম্ভবত পনেরো) সন্তানের জননী সারদাসুন্দরী দেবীর সাথে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কটি নিয়ে কৌতুহল দোষের কিছু নয় বলেই মনে করি। এ যাবৎকালে যে অতি সামান্য রবীন্দ্র রচনা পাঠ করেছি, তাতে যতদূর মনে পড়ে মা’কে নিয়ে তিনি খুব একটা উচ্চ কন্ঠ ছিলেন না। হয়ত মাত্র তেরো বছর দশমাস বয়সে মাকে হারিয়েছিলেন বলে ‘মা’ নিয়ে ততটা লিখেননি। এ ধারণার খানিক সত্যতা মেলে “জীবনস্মৃতি’র এই উদ্ধতিতে , “যে ক্ষতি পূরণ হইবে না, যে বিচ্ছেদের প্রতিকার নাই, তাহাকে ভুলিবার শক্তি প্রাণশক্তির একটা প্রধান অঙ্গ। শিশুকালে সেই প্রাণশক্তি নবীন ও প্রবল থাকে, তখন সে কোনো আঘাতকে গভীর ভাবে গ্রহণ করে না, স্হায়ী রেখায় আঁকিয়া রাখে না। এই জন্য প্রথম যে মৃত্যু কালো ছায়া ফেলিয়া প্রবেশ করিল, তাহা আপনার কালিমাকে চিরন্তন না করিয়া ছায়ার মতোই একদিন নিঃশব্দ পদে চলিয়া গেল।”

ছায়ার মত নিঃশব্দেই তাই বুঝি মা থেকেছেন রবীন্দ্র রচনায়। তাঁর সেই বিখ্যাত কবিতাটি স্মরণে আনি, যেখানে খোকা বীরের মত যুদ্ধ শেষে মা কে জানাচ্ছে আর ভয় নেই ‘লড়াই গেছে থেমে’, স্বস্তিতে মা বলছেন ‘ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল!’ কবিতার শেষটায় জানা যায় এ এক বালকের কল্পনার যুদ্ধ, যেখানে সে মায়ের খুব কাছাকাছি। একমাত্র সহায়, বীর পুরুষ খোকা। শুধু ‘বীরপুরষ’ কেন ওঁর আরো অনেক রচনায় মা এভাবেই ছায়ার আড়ালে থেকে গেছেন। ‘জন্মকথা’ কবিতায় কবি তাই মায়ের সাথে আলাপচারিতায় মেতে কল্পনায় মনের আঁশ মেটাতে চান যেন। কেননা, মাস্টার মশাই সাতকড়ি দত্ত কৃর্তক ‘রবি করে জ্বালাতন’ এর মত অকপট বক্তব্য পাঠক পর্যন্ত পৌঁছালেও সারদাসুন্দরী কতৃর্ক এমন ছদ্মআহ্লাদ ধ্বনি পাঠক সরাসরি পাননা তেমন। ‘শিশু পাঠ’, ‘অসম্ভব কথা’, ‘ঘরোয়া’, ‘জীবনস্মৃতি’সহ আরো নানান রচনায় রবির মা থেকে গেছেন দূর দ্বীপের বাসিন্দা হয়ে। যাঁকে চিনতে পারার আনন্দে পাঠকের বলা হয়ে ওঠেনি, ‘চিনি, তোমারে চিনি’।

অভিজাত ঠাকুর পরিবারের রীতি-রেওয়াজ অনুযায়ী সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্রই মায়ের কোলে না এসে চলে যেতে হতো দুধমা আর পরিচারিকাদের তত্বাবধানে। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বড় বোন স্বর্ণ কুমারী দেবীও যে ব্যতিক্রম ছিলেন না তার সাক্ষ্য পাওয়া যায় মেয়ে সরলা দেবী চৌধুরানীর বয়ানে। তাঁর বক্তব্যে মায়ের বাৎসল্য বঞ্চিত সন্তানের হাহাকারই শুধু ওঠে আসেনি, কেন তাঁদের মায়েরা সেরকম আচরণ করেছেন তার যৌক্তিক হদিশও দিয়েছেন পাঠককে। “সে কালের ধনীগৃহের আর একটি বাঁধা দস্তুর জোড়াসাঁকোয় চলিত ছিল। শিশুরা মাতৃস্তন্যের পরিবর্তে ধাত্রীস্তন্যে পালিত ও পুষ্ট হতো। ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্র মায়ের কোল ছাড়া হয়ে তারা এক একটি দুগ্ধদাত্রী দাই ও এক একটি পর্যবেক্ষণকারী পরিচারিকার হস্তে ন্যস্ত হতো, মায়ের সঙ্গে তাদের আর সম্পর্ক থাকত না। জন্মের পরেই ঠাকুরবাড়ির এই রীতি অনুযায়ী শিশু রবীন্দ্রনাথকে মায়ের কোল থেকে স্থানান্তরিত হতে হয় ধাত্রীমাতার কোলে।” বলাই বাহুল্য, সন্তানের প্রতি বাৎসল্য উপেক্ষা করা ছিল অলিখিত পয়লা প্রথা। প্রথার কাছে নতজানু সারদাদেবীর পক্ষেও হয়ত সেভাবে সন্তান বাৎসল্য প্রদর্শন করা সম্ভব হয়নি।

রবীন্দ্রনাথ নামের চরম সৃষ্টিশীল এবং সংবেদনশীল মানুষটি গড়ে উঠবার আগে তাঁর পরিচয় তিনি সারদাসুন্দরী দেবীর সন্তান। একজন সন্তান হিসেবে মায়ের সহচার্যের জন্য, বাৎসল্যের জন্য সে সন্তান আকুল হবেন এটিই তো স্বাভাবিক। সেটি সেভাবে না পাওয়ায় তাঁর মধ্যে কোথাও একটা না পাওয়ার বেদনা তো ছিলই, সে বেদনার প্রকাশটা তিনি তাঁর রচনায় আড়ালের মাধ্যমেই করে গেছেন। নিজের যন্ত্রণা কী করে আড়াল করা যায় তার সুনিপুণ কলাকৌশল তাঁর চেয়ে বেশি কে জানতো আর!

তবে একেবারেই যে অনুভূতির প্রকাশ ঘটাননি তাও না। যেহেতু ধনী পরিবারের রীতির কারণে তিনি তার মায়ের স্নেহ বঞ্চিত ছিলেন সে কারণে তিনি মা কে খুঁজে ফিরেছেন সামান্য পরিবারিক আবর্তে বড় হওয়া কাদম্বরী দেবীর মাঝে। বড় বোন রবীন্দ্রনাথ কে মানুষ করলেও এবং যথেষ্ট ভালোবাসা সত্ত্বে যেহেতু সেই বোনও ছিলেন পারিবারিক ঐতিহ্যের কাছে বাঁধা, তাই বোনের সাথেও রবীন্দ্রনাথের সেভাবে সখ্যতা বা বাৎসল্য ঘটে বলে মনে হয়নি। মায়ের কাছ থেকে যে বাৎসল্য তিনি পাননি সেটির খোঁজ যেন তিনি বৌদি কাদম্বরী দেবীর মধ্যে পেয়েছিলেন খানিকটা। মা-ই তো সন্তানের প্রথম প্রিয় সহচরের ভূমিকায় থাকেন। রবীন্দ্রনাথের সাথে সে সম্পর্কটি কেবলমাত্র কাদম্বরী দেবীর সাথেই গড়ে উঠেছিল।

কাদম্বরী দেবী সেরকম ধনী পরিবারের মেয়ে ছিলেন না। তাঁর মধ্যে পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার খুব একটা তোড়জোড় ছিল না তাই। বৌদির জীবন যাপনের আটপৌড়ে অভ্যস্ততায় রবি তাই বিমল আনন্দ খুঁজে পান। অকপট, নিপাট এক বন্ধুত্বের, মমত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল বুঝি তাই এ দু’জনের মাঝে। ‘শিশু ভোলা নাথ’ এর ‘রবিবার’ কবিতার আড়ালে কবি কী সে কথাটিই বলতে চেয়েছিলেন তবে!

“সে বুঝি মা তোমার মতো

গরিব – ঘরের মেয়ে ?”

মাতৃবন্দনায় রবীন্দ্রনাথ সেভাবে মুখর না হলেও দেশমাতৃকার বন্দনায় তিনি ছিলেন অকপট। হয়ত দেশ নামের এই মায়ের মাঝে সারদী দেবীর অভিমানী কালো ছেলেটি মাকেই খুঁজে ফিরেছেন। কে জানে!

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত