তুমি আছো আমি আছি

প্রিয়
কতদিন তোমাকে চিঠি লিখি না। শুধু চিঠি কেন কিছুই প্রায় লিখিনা, শুধু সাংসারিক জীবনের কয়েকটা মামুলি জিনিস আনার কথা লিখি মেসেজে বা হোয়াটসআপে।
আমরা কেমন যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছি, তাই নাগো! অথচ একটা সময় আমরাই কত চিঠি লিখতাম।তোমার সঙ্গে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস দেখা হত না।তখন তো টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ কম। বাবার ঘরের সেই কালো টেলিফোন বাজলেই ছুটে যেতাম ওই বুঝি তোমার ফোন এল।কিন্তু বাবা ঘরে থাকলে কোনো ভাবেই সে ফোন ধরা হত না।বাবার হ্যালো শুনলেই তুমি ফোন রেখে দিতে।
বাবা কী করে যেন বুঝে যেত তুমিই ফোন করছ।তিনবারের বার আমায় ডেকে বলত, দেখতো, বোধহয় তোর ফোন।আমি ভয়ে ভয়ে ফোন ধরলেই তুমি বলতে, কাল কলকাতা আসছি, কলেজে আসব।দয়া করে কলেজে এসো।
আমি উত্তর দেবার আগেই তুমি ফোন রেখে দিতে।বাবা জানতে চাইত, কে ফোন করেছিল? আমি বলতাম, বুঝতে পারলাম না বাবা।রেখে দিল হ্যালো বলতেই। কত বোকা ছিলাম, আজ ভাবি, বাবা সব বুঝতে পারত।তাই আমাকে ফোনে ডেকে দিত কিন্তু তুমি কলকাতা এলে আমার আর সেদিন কলেজ যাওয়া হত না।কেন যে হত না আজও ভেবে পাই না।ঠিক কিছু না কিছু ঘটত, যাতে কলেজ যাওয়া আটকে যেতই।
তুমি অপেক্ষা করে করে চলে যেতে একরাশ অভিমান নিয়ে।তারপর তোমার মান ভাঙাতে আমি চিঠি লিখতাম। কত রকম কাগজে যে তোমাকে লিখতাম, আজ ভাবলেই অবাক লাগে।লাল, হলুদ, সবুজ, গোলাপি কাগজে  নানা রঙের কালি দিয়ে সাজিয়ে দিতাম মনের আবেগ। পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো লেখক সেই মুহূর্তে  আমিই।আর তোমার মান ভঞ্জন করার জন্য রাধাও তখন আমিই। আসলে সে বয়সটাই তো রঙিন ছিল।চোখে সুরমা না পরলেও দুনিয়ার সব ভালো লাগাগুলো তখন চোখের পল্লবে, ভ্রুর মাঝের লাল টিপে গন গনে সূর্যের আলোর মত জ্বলত।
কত কিছুই না থাকত সে লেখায় ।ভালোবাসি বলারও কত রকম ভাব।পূর্বরাগ পড়ার ফলশ্রুতিতে তখন নানান ভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা তোমাকে কতটা ভালোবাসি আর কতটা একা নি:সঙ্গ বিরহী কাতর নায়িকা আমি। এতো গেল রং-বেরং এর কাগজের গল্প আর এর বাইরে ছিল নীল ইনল্যান্ড খাম, তিনটে ভাঁজে কত গোপন কথা।পরতে পরতে যেন লুকিয়ে রাখা কথারা একটু একটু করে গোলাপের পাপড়ির মতো উন্মোচিত হচ্ছে সেই নীল খামের ভিতর থেকে।যাতে সুগন্ধ বেরোয়,  তাই কতবার বাবার বিদেশি ওডিকোলন কিংবা আতর, পারফিউম ঢেলে ভিজিয়ে শুকিয়ে তার ভিতরে নীল কালি সবুজ কালি দিয়ে লিখেছি
“মনে কী দ্বিধা রেখে চলে গেলে…” কিংবা “বড় একা লাগে এই আঁধারে…”
কখনো বা চিঠিতেই তোমাকে উত্তম কুমার বানিয়ে সুচিত্রার মত দুহাতে তোমাকে জড়িয়ে বলেছি, এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হত কিন্তু পথ তো সেই কলেজ আর বাড়ি।তুমি কোথায়? তুমি তখন ২৮০ কিমি দূরে।অগত্যা, সেই নীল খাম, হলুদ পোস্ট কার্ডই ভরসা। হলুদ খামে আবার প্রিয়, প্রাণসখা, মাই লাভ, এসব তো বলা যাবে না।
বাড়ির গুরুজনরা দেখে ফেললে যে অনর্থ ঘটে যাবে।তাই তখন প্রিয় দাদা, কেমন আছো? পড়াশোনা কেমন চলছে? পরীক্ষা কবে? এর মধ্যে কলকাতা আসা হবে কী? এলে আমাদের বাড়ি এসো, ভালো থেকো, উত্তর দিও…ইত্যাদি প্রভৃতির মধ্যে দিয়ে সুবোধ বালিকা সাজবার নিদারুণ প্রয়াস তবু আমাদের মধ্যে সংযোগ ছিল।ওই লেটার প্যাডের আঙুল ছোঁওয়ানো ছবি দেওয়া গোলাপি পাতায় জুড়ে ছিল কত না বলা কথা, ভালোবাসা, মান, অভিমান, কাছে পাওয়ার ব্যকুলতা।
ক্রমশ ফুরিয়ে এল চিঠির যুগ। পোস্ট ম্যান এখন তোমার চিঠি আনে না আমার কাছে। সেই অধীর অপেক্ষা নেই, কলেজ থেকে ফিরেই লেটার বক্স ঘেঁটে শাড়ির ভাঁজে, ব্লাউজের ফাঁকে চারদিক চেয়ে কেউ দেখে ফেলার আগেই আমার নামে লেখা খামটা লুকিয়ে ফেলার আকুলতা নেই।গোপনীয়তাও নেই।সব পেয়েও তবু এখনো মাঝে মাঝে চিঠির জন্য অপেক্ষা করে থাকি।জানো এখনো আষাঢ় মাস এলেই মনে হয় বিরহী যক্ষের মতো তুমিও মেঘ পিওনকে চিঠি দিয়ে আমার কাছে পাঠাবে।
তুমি তো ভুলেই যাও আষাঢ়ের প্রথম দিন আমরা প্রথম একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম কলেজ থেকে পালিয়ে ।বহুর নজর এড়িয়ে, ট্রামে চেপে হেঁদোয়া থেকে কলেজস্কোয়ারে পৌঁছবার আগেই তুমুল বৃষ্টি। ট্রাম থেকে নামতেই ভিজে গেলাম দুজনেই। ছাতা ছিল না কারোর হাতেই। ভেজা শরীর, ভেজা চুল, ভেজা পিচের ট্রামলাইন, কলেজস্কোয়ারের পুকুরে বৃষ্টির বড় বড় ফোটা। কেমন আচ্ছন্ন হয়ে গেছিলাম দুজনেই।ভুলে গেছিলাম বাড়ি ফিরতে হবে।
সেদিনই প্রথম শেয়ালদা স্টেশনে এসে   ট্রেনে করে ফিরেছিলাম। তুমি আমায় প্ল্যাটফর্মে নামিয়ে দৌড়ে আবার সেই ট্রেনটাতেই উঠে পড়েছিলে। তোমাকে তো যেতে হবে বহুদূর। আমি স্টেসনে দাঁড়িয়ে একদিকে এত লোক দেখে ভয়ে কাঁপছি, অন্য দিকে তুমি চলে যাওয়ায় কাঁদছি অথচ এখন তুমি সারা পৃথিবী চলে যাও একা একা।আমার কষ্ট হয়, কান্নাও পায়।কিন্তু বলতে আর পারি না।বয়স হয়েছে তো।চুলে পাক ধরেছে। সন্তানও তো বড় হল কিন্তু এখনো তুমি আসছি বলে চলে গেলেই, আমি সেই ট্রেনটার হুইসেল বাজিয়ে স্টেশন ছেড়ে চলে যাবার শব্দটা পাই, দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।বুকের মধ্যে কেমন একটা দুরুদুর জেগে ওঠে। ভাবি, আবার কবে দেখা হবে।
কত কী লিখে ফেললাম। আচ্ছা, তোমার কিছু লিখতে ইচ্ছে করে আমাকে? নাকি খালি মেয়ের কলেজের ফিস ভরে দিয়েছি, গাড়িতে তেল ভরে দিলাম, কিংবা সংসারে এত টাকা দিলাম এই শব্দগুলো লিখে পাঠিয়ে দেওয়ার মধ্যেই আটকে গেছে তোমার যাবতীয় শব্দ।
অবশ্য চিঠি তুমি কোনোদিনই ভালো লিখতে না।অজস্র বানান ভুল, বাক্য গঠনে ভুল, অত্যন্ত খারাপ হাতের লেখা তবু তার অপেক্ষাতেই কাটিয়ে দিয়েছিলাম কতগুলো বছর।
আজ আর আমাদের কোনো গোপন কথা নেই, নেই কোনো পারস্পরিক চাহিদা, যা শুধু দেওয়া নেওয়ার নয়, নেই কোনো পাগলামি। তাই আজ আর আমরা প্রেমপত্র লিখি না। আচ্ছা, আমাদের সব প্রেম কী ফুরিয়ে গেছে নাকী আমরা উচ্ছ্বাস হীন যান্ত্রিক জীবনের দাস হয়ে গেছি। কে জানে! তবে আমি কিন্তু এখনো চিঠি লিখে চলেছি, দীর্ঘ চিঠি, দেখো একদিন পৃথিবীর সেরা চিঠি হয়ে উঠবে সে চিঠি ।তুমি অবশ্যই সেদিন পড়ো কেমন?
আজ আপাতত এইটুকুই থাক। উত্তর পাবো না জানি, তবু তো অপেক্ষা থাকবে। সেই যে একদিন বলেছিলাম না, স্বপ্ন মরে না, কামনা বাসনা অনুভূতি কিছুই হারিয়ে যায় না, কেবল সময়ের স্রোতে ফিকে হয়ে আসে।কে জানে কবে মেসেজ, হোয়াটস আপ, ইনবক্স, মেসেঞ্জার, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম ছেড় আবার পোস্ট ম্যান ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবে নীল হলুদ খাম! হতেও তো পারে, সেদিন হয়তো তুমি হঠাৎ আমাকে লিখবে, মনা , আমার ভীষণ মন খারাপ, একটু কাছে আসবে? 
আমি ছুট্টে যাব তোমার কাছে সেই প্রথম প্রেমের কথা বলার দিনটার মতো।তুমি হাতটা ধরবে আলতো করে।বলবে, কোনো চিন্তা নেই, আমি আছি। আমি বলব-
“উড়াব ঊর্ধ্বে প্রেমের নিশান দুর্গমপথমাঝে
দুর্দম বেগে দুঃসহতম কাজে।
রুক্ষ দিনের দুঃখ পাই তো পাব–
চাই না শান্তি, সান্ত্বনা নাহি চাব।”
পাড়ি দিতে নদী হাল ভাঙে যদি, ছিন্ন পালের কাছি,
মৃত্যুর মুখে দাঁড়ায়ে জানিব তুমি আছ আমি আছি।
দুজনের চোখে দেখেছি জগৎ, দোঁহারে দেখেছি দোঁহে…।
মরুপথতাপ দুজনে নিয়েছি সহে।
ছুটি নি মোহন মরীচিকা-পিছে -পিছে,
ভুলাই নি মন সত্যেরে করি মিছে–
এই গৌরবে চলিব এ ভবে যত দিন দোঁহে বাঁচি।
এ বাণী, প্রেয়সী, হোক মহীয়সী “তুমি আছ আমি আছি”॥
এভাবেই তো এতগুলো বছর রয়েছি , তাই না? 
ইতি তোমার
“ব”

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত