তুষার দাশের কবিতা

আজ ১৩ নভেম্বর কবি তুষার দাশের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার কবিকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


থার্টি ফার্স্টের কবিতা

অসুন্দরের গল্প অনেক শুনেছি আর কিছু কিছু পড়েছি ওখানে,
কখনোবা এইখানে বসে—
তত যে সুন্দর নয় আমাদের পাড়ার মেয়েটি,
পুরুষালি চোখ কিন্তু তাকেও ছাড়ে না,
দেখে তার নিতম্ব ও স্তন বড়ো মনোযোগে,
তারা যেন পাহাড় ও টিলা সব দেখে নিচ্ছে জবাবদিহির,
বেশ আয়োজন করে কিম্বা কোনো আয়োজন ছাড়া—
পুরুষেরা এসবে অভ্যস্ত আর মনে করে
এইসব তাহাদের বাপ ও দাদার কিম্বা তস্য দাদার কাছ থেকে পাওয়া
নিতান্ত সামান্য এক উত্তরাধিকার, প্রায়শ জমির মতো
প্রজন্মের ব্যবধান ছাড়া একে ক্রমাগত ভোগ আর উপভোগ
করে চলা একান্ত দস্তুর!

জানতে হবে এইসব, সবকিছু—জানাটা জরুরি আর
পুরুষেরই পক্ষে তো সব অভিযান স্বাস্থ্যকর, উপাদেয়,
অধিকারবোধে তৃপ্ত, চিরঅনুকূল হাওয়া, জ্ঞানাঞ্জন শলাকায়:
পদ্মেরই মতো ওঠে ফুটে। কিন্তু ডাইনি উপাধি দিয়ে উল্লাসে পুড়িয়ে মারা
তাকেই সহজ। চলো, আজ তাই করি—থার্টি ফার্স্ট এসে যাচ্ছে,
নারীরা পুড়ছে শুধু—চিয়ার্স চিয়ার্স আর উল্লাস উল্লাস !!

এইবার সুন্দরী মেয়েটির কথা হবে।
তাকে তো জিজ্ঞেস করে জানতে হবে প্রথমেই কে কে তাকে চুমু খেয়েছিল
কিম্বা কারা বেঁধেছিল আলিঙ্গনে আরও কিছুদূর অগ্রসর হবে বলে
কে প্রথম শিখিয়েছে তাকে অনুস্বার-বিসর্গের মোহন সংগীত, তীব্র অনিচ্ছায়—
জানতে হবে কারা কারা তার অনিচ্ছায় তাকে ধর্ষণ করেছে,
কারা কারা মাঠে নেমে বল্লমের সুতীক্ষ্ণ খোঁচায় তাকে রক্তাক্ত করেছে,
কারা তাকে, জমিকে অনেক বেশি উর্বর করার কথা বলে
রজঃস্বলা সময়েই টুকরো টুকরো করে কেটে, মাঠে ছড়িয়েছে—
তার রক্তে ধান-পাট ব্যাপক ফলেছে
নাকি নিম আর করলার তিক্ত স্রোতে ভেসে গেছে অজ্ঞান পৃথিবী ?

চুমু

এই মেয়ে এই ছেলে শোনো—
তোমরা বেশ দুঃখ পাবে বলে
তোমার মায়ের জন্য, তোমাদের
জন্মদাত্রী মহিয়সী নারীটির জন্যে
আমি আর কোনো চুমু জমিয়ে
রাখি নি!
তোমার বা তোমাদের পিতার
অবর্তমানে বহু চুমু খেয়েছি তো
তাঁকে—
আমাকে পাগল করা সেইসব চুমুদের
কথা মনে হলে ইতিহাস গাঢ় হতে
থাকে-
মনে হয় সামান্য চুম্বন—আসলে তা
ইতিহাস, ভূগোল ও অর্থনীতি,
এমনকি দর্শনেরও এখতিয়ারে এসে
যায়—
সমুদ্র বিশাল বলে এক লোক
ঝটিতি স্পীডবোট থেকে ঝাঁপ
দিয়ে পড়েছিল গভীর সমুদ্র-বুকে
নিজের জীবন সেও হাতের তালুতে
তুলে নিয়েছিল বিশালতা মেপে
নেবে বলে। এ তো ইতিহাস।

পকেট হালকা বলে এক কাপ চা
অনায়াসে দু’জনেই ভাগ করে খাওয়া
এর মধ্যে অর্থনীতি নেই ?

আসলে, এসব কিছু নয়—
এত চুমু এত চুমু জমিয়ে
রেখেছি
আর জমানো হয়েছে—
প্রচণ্ড ক্রোধের মুখে, অপমানে,
ঝম্ঝমানো বৃষ্টির ভেতর-প্রকাশ্যে
লোকের সামনে, রিকশায় ঘুরে ঘুরে
একটু আড়াল পেলে, ভয়ংকর রোদের
ভেতর, ঘামে-ভেজা সমস্ত শরীরে—
আচ্ছন্ন বোধের মধ্যে ঝিলপারে—
নদীর কিনারে এত চুমু খেয়েছি
যে তোমাদের মাকে—এই ধরো
নৌকার ছইয়ের ভেতরে—গান
শোনার ফাঁকে মেঝেতে নামিয়ে—
রাগ হচ্ছে—ভয় পাচ্ছো—খুন করবে
এখন আমাকে ?
আসলে তোমার মাকে দূর থেকে পুরোটাই
দেখে গেছি আমি।

বাঁদর-নাচ

গুরু-প্রশ্নে ভোরের মুঠিকে তুমি
আলগা করেছো।
তোমার দর্শন তত্ত্ব হাজার হাজার ফুট নিচে
পড়ে যাচ্ছে, তাই—
অন্য কোনো প্রশ্ন আর উত্তর ছাড়াই।

বানরের খেলা যারা দেখে
তারা শুধু বানরের নাচানেওয়ালাকে দেখে না
তারা কেউ কেউ ভাবে বানরের ইতিহাস—
মুগ্ধ চোখে নাচনের পাশাপাশি
বানরের ভেতরের বেদনাকে,
তার স্মৃতি-বিস্মৃতির সম্মোহনও দেখে।

মৎস্যসন্ধান

অজস্র নক্ষত্র জ্বালো।
সে আগুনে জ্বাল দাও অম্লান ব্রহ্মাণ্ড।
জাল নাও এরপর। তাকেও রঙিন করে তোলো।
শুকিয়ে এবার তাকে ছুঁড়ে মারো উৎসের দিকে।
বিস্তর মৎস্যের ভীড়ে তুলে আনো আলগোছে কয়েকটি রূপালি শস্য,
দেখতে যা মায়াময়, মোহ বিছায়েছে যারা তোমার দু’চোখে,
তোমার জহুরি চোখ, সঠিক শস্যের লোভে তোমার যে উড়ু উড়ু মন
সংসার বাসনা বিষে প্রায়শই নীল হয়ে থাকে,
মাকড়শার চিহ্ণ-জাল ছিন্ন করে তখন উড়বে পাখা তোমার অমেয় এষণায়
তুমি ঠিক জাপ্টে ধরবে, তোমার বিশাল থাবা কান্কোর পাশ
বড়শির ধরনে সব গেঁথে নেবে জানি।
এরপর ধৃতশিশু তোমার দুকূল জুড়ে লাফাবে অস্থির হয়ে—
অনন্তের দিকচক্রবাল জুড়ে খেলাতে থাকবে তার লেজ,
ঢালু সীমানার দিকে গড়াতে গড়াতে সেও স্থৈতিক শক্তির জোরে
মাঝেসাঝে উঠে যাবে নীল নীল পাহাড়চূড়োর দিকে
অবলীলাক্রমে।

 

আমার মনেস্ট্রি

আমি কোনো মনেস্ট্রি দেখিনি,
কোনোদিন।
শুধু তোমাকে দেখেছি।

কী ভীষণ রহস্যময়, চুপচাপ,
সুতীব্র ও গভীর-গোপন সুগম্ভীর স্তব্ধতার ভেতর
বাতাসের অবিরাম চলাচল, সিঁড়ির ফিসফাস,
পরিচ্ছন্ন পবিত্রতার ভেতর হঠাৎ কয়েকটা পাতার ঝরে পড়া।

এ নিয়ে দর্শন ফাঁদার কিছু নেই,
পাতারা সরাসরি সোজা মাটিতেই ঝরে।
কিন্তু তোমাকে মুগ্ধ করতে সামান্য রহস্য মাখিয়ে দিতে
পাতাগুলোকে একটু বাতাসে ভাসিয়ে একটু ঘুরিয়ে মাত্রা দিতে চেয়েছি।

তোমাকে দেখতে দেখতে একটা বাড়ির তিনতলা অব্দি উঠতে পেরেছিলাম,
মাটি থেকে একতলায় উঠতে এতো সিঁড়ি আমি কখনো ভাঙিনি। নিশ্চিত।
তোমাকে তখন অনেক বড়ো মনে হচ্ছিলো
এরপর দোতলা, আবারও অনেক নানা সিঁড়ি,
একটি উঠোনের মাঝখানে আমাকে আটকে দেয়া হলো।

আর ওপরে যাওয়া যাবে না,
এ কথা শোনার সংগে সংগে না-শোনা-যাওয়া এক তীব্র হুইসিল বেজে উঠলো
মহামান্য রহস্যময়তার, আমার তীব্র কৌতূহলের মুখ আর আগ্রহী চোখের
সবকিছু বন্ধ করে কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হলো,

কিন্তু তার আগেই আমি না দেখেও স্পষ্ট টের পাচ্ছিলাম
কয়েকটা চোখের ইশারা ইঁদুর শাবকের মতো নিঃশব্দে সরে যাচ্ছিলো
অনেকক্ষণ উঠোনে দাঁড়িয়ে ডান-বাম-পেছনটা দেখার চেষ্টা করলাম,
উপরে তাকাতেই তীব্র রোদঝলক অন্ধ করে দিলো আমাকে।
সেদিন রোদটাও জমেছিলো খুব। শীতেও আমি ঘামছিলাম।

আমার মনেস্ট্রি দেখার ইতিহাস ও ইতি কি ওখানেই ঘটেছিলো?
আমি আবার সেই দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে নামছিলাম নিচে, নিচে,
আমার নমন আর শেষই হচ্ছিলো না—
পাশ দিয়ে দ্রুতবেগে নেমে যাচ্ছিলো শিশু আর তরুণ সব শ্রমণেরা
আমার নামা হয়ে উঠেছিলো যেন এক অনন্তযাত্রার পথ,

স্বচ্ছতোয়া নদী প্রতিদিন তোমার রহস্যের নোনা আরকের ধার
ধুয়ে দিতে দিতে যেন তাকে আরো বেশি ক্ষুরধার করে তুলছে,
অবলোকনের মিহিন ক্ষমতাগুলো কেড়ে নিয়ে কেউ কি এভাবে নিঃস্ব করে দেয় কাউকে
এতো সব দীর্ঘ দেবদারুর ছায়া নিয়ে কেন তুমি তোমার চারপাশে আলো ঘন আবছায়া
লুকিয়ে রেখেছো?

মনেস্ট্রি দেখতে এসে এত কাণ্ড !
ত্রিপিটক শোনা গিয়েছিলো?
সেল্ফি কি যথেষ্ট হয়েছে?
পুনাখার এক কোণে, যমজ সে নদীপারে শাদাকালো বাড়ি ঘিরে এতখানি
চাপা আর ভীষণ নীরব উত্তেজনা !

 

ভি-চিহ্ন

সুন্দরের হাত থেকে ছলকে পড়লো আলো
সে আলো ছড়িয়ে গেলো চারদিকে— ধোঁয়া-গন্ধ-রক্তশ্রাব-হত্যার আগুনে
মানুষের মৃতদেহ স্তূপ হতে হতে রক্তের সে গাঢ় লাল
ঢেকে দিলো পুরো পৃথিবীকে এক অদ্ভুত কালোতে।

এ কালোয়ই এখন তো সুন্দরের সব আরাধনা, যাবতীয় যাগযজ্ঞ—
অপ্রমিত বাহারে ও অশিষ্টের উল্লম্ফনে খণ্জ মানবিকতার বোধ
ব্লোয়ারের অকুণ্ঠ দাপটে উড়ে যায়।

কোটি কোটি মানুষের অভিযোগহীন মৃত্যু অসাংগীতিক স্তব্ধ মেঘ যেন,
হাওয়ায় কেবল ভাসে, প্রহসনী এজলাসগুলো চোখ পিটপিট করে
ক্ষমতাধরের বাণী, ছবি আর বিবাদীর অস্পষ্ট মুখের দিকে গোলামের মতো
হাবা দৃষ্টি নিয়ে উন্মাদ তাকিয়ে থাকে।

রায়ের পৃষ্ঠা থেকে ছিন্ন খিন্ন হাল্কা আলো-রেখা আসে,
নতুন হত্যার আরো উৎসবে মাতবে বলে খুনিদল মানুষকে ভি-চিহ্ন দেখায়!

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত