সবুজ গরিলা

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comরোজ যেমন কাকভোরে ঘুম ভাঙে অরুণিমার, তেমনি আজও ঘুম ভেঙে গেল ওর। ঘুম চোখে এসির রিমোট অফ করে খাটে কিছুক্ষণ পা ঝুলিয়ে বসে থাকা স্বভাব ওর। মাথার ভেতরে একটা অস্বস্তি পাক খাচ্ছে। রাজীবের নড়াচড়া টের পেল ও। ঘর ক্রমশ গরম হয়ে উঠছে, ফ্যানের সুইচ অন করার আগে মোবাইলে চোখ গেল অরুণিমার। এ কী! মাত্র দুটো চল্লিশ! আর তাই জানলার কাচ দিয়ে আলো এসে পড়েনি এখনও। তড়িঘড়ি এসির রিমোট অন করে শুয়ে পড়ল আবার ও। মাথার ভেতর অস্বস্তিটা আবার বাড়ছে। উঠে জল খেল। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা হিম স্রোত বেয়ে নামছে। আতঙ্কে ও শুয়ে শুয়ে মোবাইল খুলল চাদরের নিচে। চোখে আলো পড়লে যাতে রাজীবের ঘুম ভেঙে না যায়। এবং মোবাইল খুলেই ও বুঝল, অস্বস্তিটা কীসের। যতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল অরুণিমা, একটা সবুজ রঙের গরিলা ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। সেই চোখদুটো ও ভুলতে পারছে না কিছুতেই। একজোড়া সাদা ধবধবে পাথরের চোখের শীতল চাউনির সামনে দাঁড়িয়ে ও কেমন ঘামতে শুরু করেছিল। অথচ চলে যাবে, এমন শক্তিও ছিল না ওর। কাঁপুনি উঠছিল একটা। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। এমন সময়েই ঘুম ভেঙে গেছিল ওর। আর স্বাভাবিক ভাবেই ভেবেছিল ভোর হয়ে গেছে। এখন মোবাইল খুলে খুটখাট করতে করতে মেসেঞ্জারে চোখ গেল। সেই সবুজ রঙের গরিলাটা এখানেও সেই একই ভাবে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কেঁপে উঠল অরুণিমা। তাড়াতাড়ি মোবাইল বন্ধ করে চোখ বুজে শুয়ে রইল ও। ভোরের দিকে চোখ লেগে এসেছিল। ফলে মর্নিং ওয়াকে যাওয়া হল না সেদিন।

সেদিন মনে মনে অরুণিমা স্থির করেছিল, আজ আর কোনভাবেই রাত করবে না। দুপুরে ঘুমে চোখ বুজে আসছিল। ছাড়া ছাড়া ঘুম হল কিছুটা। কিন্তু অস্বস্তিটা গেল না কিছুতেই। রাতেও তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল ও। এবং ঘুমিয়েও পড়ল নিমেষে। কিন্তু আবার সেই একই সময়ে আকাশে তীব্র মেঘের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভেঙে মনে পড়ল, আজ পয়লা আষাঢ়। বৃষ্টি তো হওয়াই উচিত। তবে ডাকাডাকিই সার, একটু আধটু বৃষ্টির পরেই সব থেমে গেল। আর যথারীতি সেই সবুজ গরিলার একজোড়া পাথুরে, ভাবলেশহীন চোখের সামনে গিয়ে পড়ল ও। ওর আধঘুমন্ত মুখের ওপর ওর সবুজ গরিলার মুখটা ঝুঁকে রয়েছে। তন্দ্রাচ্ছন্ন অরুণিমা বুঝতে পারছে, ওর প্রতিটি নড়াচড়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে ওই বোবা প্রাণীটা। ও কি কিছু বলতে চায়? বোঝাতে চায় ওকে কিছু? সাহস সঞ্চয় করে একবার কি জিজ্ঞেস করবে অরুণিমা ওকে? চোখ খুলতেই দেখল গরিলাটা আর নেই। যাক্‌! নিশ্চিন্ত মনে পাশ ফিরল অরুণিমা। কিন্তু আজও আর দু চোখের পাতা এক করতে পারল না। এভাবে রাতের পর রাত কেটে যেতে থাকল। অরুণিমার মর্নিং ওয়াক বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ওর গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বেড়েছে। পেটের ভেতরে প্রবল অশান্তি ফিরে এসেছে। রাতের পর রাত ঘুমোয় না ও। একদিন রাজীব খেয়াল করল ওকে। ‘কী ব্যাপার, তোমার কি শরীর খারাপ? আজই ডাক্তারের কাছে যাবে, আমি ফোন করে দিয়ে যাচ্ছি।‘ অরুণিমা জানে, রাজীবের কথা না মানলে ওর চলবে না। ও নিজেও ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। বিকেলে ডাক্তারের চেম্বারে পৌঁছল অরুণিমা।

চেনাজানা পাড়ার ডাক্তার। দেখেই বলল, ‘কী হল আবার? গ্যাস্ট্রিক বাড়ালে নাকি?’ অরুণিমা মাথা নিচু করে বলল, ‘হুঁ, তা বেড়েছে কিছুটা। তবে আসল সমস্যা সেটা নয়’। ‘তবে? তবে কি এই বয়সে আবার কনসিভ করলে নাকি?’ এই বলে নিজের ঠাট্টায় নিজেই হেসে উঠল ডাক্তার পাল। উনি অবশ্য এমন ঠাট্টা করতেই পারেন অরুণিমার সঙ্গে। বয়সে রাজীবের বয়সীই প্রায় উনি আর দেখতে শুনতেও মন্দ না, স্মার্ট, কথা বলতে ভালোবাসেন খুব। ফলে চেম্বার ছাড়াও রাজীব, অরুণিমার সঙ্গে প্রায়শই এটা ওটা নিয়ে গল্পগাছা হয়, আর অরুণিমার যৌবন এখনও যাই যাই করেও যায়নি। একটু ভারী হয়েছে বটে আজকাল ও, তবে জৌলুস বেঁচে আছে। আর তাই ডাক্তার পালের যে ওর ওপর একটু দুর্বলতা নেই, এমন কথাও হলফ করে বলা যায় না। উপরন্তু ডাক্তারের স্ত্রী দীর্ঘবছর আর্থারাইটিসে শয্যাশায়ী। ফলে স্ত্রী সঙ্গ ব্যতীত ডাক্তার এমন একটি আদিরসাত্মক ঠাট্টা করে যদি কিঞ্চিৎ তৃপ্তি পান, তাতে অরুণিমার কিছু যায় আসে না। ও আবার মৃদু হেসে শুরু করল। ‘না মানে, আসল ব্যাপারটা একটু অন্য রকম।‘ এইবার প্রফেশনাল অ্যাটিটিউড দেখিয়ে ডাক্তার পাল অরুণিমার কথা শুনলেন মন দিয়ে। ‘একটা সবুজ গরিলা।‘ ‘মানে?’ একবার রুমাল দিয়ে অকারণ মুখ মুছল অরুণিমা। তারপর ধীরে ধীরে ডাক্তারকে রাতের স্বপ্নের কথা খুলে বলল। ডাক্তার পালের হাসিখুশি মুখটায় কেমন যেন চিন্তার ছাপ এখন। অরুণিমা প্রেশক্রিপশন নিয়ে বেরিয়ে আসছে চেম্বার থেকে। ও দেখেছে ওকে একজন সাইকিয়াটিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। আর গ্যাস্ট্রিকের ওষুধগুলো উলটে-পালটে দিয়েছে কিছুটা, যার সমস্ত নামগুলো এমনকি কম্পাউন্ডও অরুণিমার এই দীর্ঘ কুড়ি বছরে জানা হয়ে গেছে। ও জানে, ওর মানসিক দ্বন্দ্ব বাড়লে এই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাও তীব্র হয়। এই সব ওষুধে তার আর বিশেষ উপকার হয় না।

রাজীবের মুখও থমথম করছে এখন। খাওয়াদাওয়ার পরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খায় ও। ফিল্টারটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে এসে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। অরুণিমা বিছানা করছে। একটু বাদে ওকে ডাকল রাজীব। পাশে বসতে বলল। তারপর কেমন যেন মমতা ভরা গলায় ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, আমি বুঝি। বাবাই এত দূরে থাকে, মাসে একবারের বেশি আসতে পারে না। আর আমিও ব্যস্ত থাকি। এই বয়সে মেয়েদের হরমোনাল সমস্যা হওয়া তো স্বাভাবিক। তুমি একা একা থাকতে থাকতে হাঁফিয়ে উঠেছ। এই সব কারণেই এই সমস্যা। তুমি এক কাজ কর। কাল থেকে অ্যারোবিক্সে ভর্তি হও। মন চাঙ্গা থাকবে। শপিং-এ যাও, পার্লারে যাও নিয়মিত। নিজেকে আয়নায় দেখ রোজ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। নিজের সঙ্গে প্রেম কর একটু না হয়। চুপচাপ সারাদিন এইটুকু বাড়িতে থাকতে থাকতে তুমি এই রকম মন গড়া সমস্যা ডেকে আনছ। মায়ের কাছেও তো থেকে আসতে পার দু একটা দিন। তা নয়, কোত্থাও যাবে না! আমিও না হয় দু চারটে দিন হোম সার্ভিসে খেয়ে নেব। প্লিজ, শোনো, মন দিয়ে আমার কথা শোন! অরুণিমা উঠে পড়ল সোফা থেকে। ধীরে ধীরে বিছানার ধারে গিয়ে বসল। রাজীবও উঠে এলো ওর কাছে। কাছে টেনে আদরের চেষ্টা করল খানিক। অরুণিমা জাগল না। ধ্বস্ত রাজীব হাল ছেড়ে শুয়ে পড়ল। মৃদু এসির শব্দের সঙ্গে রাজীবের ঘুমন্ত নিঃশ্বাসের শব্দ মিশে গিয়ে রাতকে যেন আরও গম্ভীর করে তুলেছে এখন। অরুণিমা চোখ বুজল আয়েশ করে। মুখে একটা তৃপ্তির হাসি খেলে গেল ওর। ও জানে, সবুজ গরিলাটা একটু বাদে আসবে। ওর শরীর জেগে উঠছে এখন থেকেই। নিজেই হাত বুলোতে থাকল সারা শরীরে। লোমকূপে কাঁটা দিচ্ছে, থরথর করছে বুকের ভেতর। সে আসবে একটু বাদে। ওই পাথুরে চোখ তাকে গিলে খাবে একটু একটু করে…আহ! কী তৃপ্তি! মৃদু শীৎকারে কেঁপে কেঁপে উঠছে অরুণিমার শরীর এখন। আর এই দৃশ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে একজনই! ওই সবুজ গরিলা।

রাজীব অরুণিমাকে সাজগোজে মন দিতে বলল, সহানুভূতি দেখালো, এই পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। কিন্তু সাইকিয়াটিস্টের কাছে অরুণিমাকে নিয়ে যেতে ওর ঘোরতর আপত্তি ছিল। যতই আধুনিক মনস্ক হোক না কেন, ও কখনই চায়নি যে ওর স্ত্রীকে মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। ফলে এই যাওয়া নিয়ে ক্রমাগত গড়িমসি করছিল দিনের পর দিন। কিন্তু সেদিন রাতে অরুণিমার নড়াচড়ায় বা চিৎকারে কোনোভাবে ওর ঘুম ভেঙে যায়। অরুণিমাকে দেখে রাজীব বিস্ফারিত চোখে চেয়ে থাকে। ওকে ধাক্কা দেয় আস্তে করে। অরুণিমা যেন সেই অরুণিমা নেই, ঘোরগ্রস্ত উদ্যাম এক শঙ্খিনী নারী! ওকে প্রায় জোর করে এই ঘোর থেকে জাগায় রাজীব। চোখেমুখে জল দিয়ে দেয় নিজেই। তারপর অরুণিমার ঘোলাটে আর আচ্ছন্ন চোখ দেখে হেরে যাওয়া পুরুষের মতো হাউহাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কান্নার পরিণতিতে জন্মায় ক্রোধ। তীব্র চিৎকারে অরুণিমাকে গালাগালি দিতে থাকে রাজীব। ‘তুমি একটা ম্যানিয়াক! বেশ্যা কোথাকার! লজ্জা করে না তোমার, এই বয়সে এসে এভাবে নিজেকে একটা পেটি সেক্স ম্যানিয়াক করে তুলতে?’ অরুণিমা কি শুনেছিল এসব তখন? আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল বিছানায়। পরের দিন সকালে যথারীতি অরুণিমা ঘুম থেকে উঠে কাজকর্ম করছিল টুকটাক। রাজীব আজ অফিস যাবে না, ও বুঝে গেছিল। বেলা করে উঠে রাজীব গম্ভীর, থমথমে গলায় বলল, ‘একঘন্টার মধ্যে আমরা বেরুবো। রেডি হয়ে নাও’। সারা রাস্তা রাজীব একটাও কথা বলেনি। গাড়ি থামলে অরুণিমা বুঝেছিল ওকে সাইকিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে আসা হয়েছে। চেম্বারে গিয়ে এই ডাক্তারকে একই কথা রিপিট করেছিল ও, যা ডাক্তার পালকে শুনিয়েছিল। পালের প্রেশক্রিপশনও নিয়ে এসেছিল সঙ্গে করে। অরুণিমা বোধহয় এখন আর গরিলার সমস্যা থেকে বেরতে চায় না আগের মতো। ওই সবুজ গরিলাকে নিয়ে তার আর কোন অস্বস্তি নেই। সহজ আর স্বাভাবিক হয়ে গেছে গরিলাটা ওর জীবনে। ভীষণ চেনা। ভীষণ কাছের। যেহেতু রাজীবকে বাইরে যেতে বলেছিল এই ডাক্তার, তাই নির্ভয়ে অরুণিমা ডাক্তারকে বলল, ‘শুনুন, আমি কিন্তু এখন আর ওই গরিলাটাকে বাদ দিয়ে কোনভাবেই থাকতে চাই না, রাজীবের কথা আপনি শুনবেন না যেন! আমিও শুনছি না অবশ্য, তাতে ও আমাকে যতই গালাগালি দিক না কেন!’ এই বলে একটা অদ্ভুত ভঙ্গী করে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে ও চটুল হাসল। ডাক্তার এবার রাজীবকে ডেকে প্রেশক্রিপশন লিখে দিয়ে দিলেন। প্রতি সপ্তাহে কাউন্সিলিং করাতে হবে অরুণিমাকে। আপাতত একমাস। সঙ্গে কিছু ওষুধ।

বাবাই এসেছে। রাজীব, বাবাই ওরা যেন এখন একটু বেশিমাত্রায় অরুণিমার ওপর যত্নশীল। অরুণিমার মনে হচ্ছে ও যেন নিজের বাড়িতে নেই, কোন আত্মীয়ের বাড়িতে এসেছে অতিথি হয়ে। প্রথম কয়েকদিন ওষুধের অতর্কিত আক্রমণে সারাদিন ঝিমুনি আসত, রাতেও ছাড়া ছাড়া ঘুম হত। কয়েকদিন বাদে অবশ্য মাঝরাতে আবার ঘুম ভেঙে গেল অরুণিমার। দেখল, সেই একই ভাবে সবুজ গরিলাটা স্থির হয়ে বসে আছে। শুধু পাথরের চোখ দুটোর জায়গায় কিছু নেই। নেই মানে, কিছুই নেই, দুচোখের দুটো শূন্য কোটর ধূধূ করছে। চমকে উঠল অরুণিমা। তবুও কেন যেন ওর মনে হল, সে এখনও দেখছে ওকে। ওই শূন্য কোটর থেকে না জানি কোন সে অজানা তরঙ্গ উঠে আসছে আর তার চেনাজানা অস্তিত্ব ছড়িয়ে দিচ্ছে অরুণিমার মস্তিষ্কে। নাকি সবটাই বিভ্রম ওর? অরুণিমা প্রাণপণে চেষ্টা করছে ওই ফাঁকা কোটরে সেঁধিয়ে যাওয়ার, ও তো মা! ও কি পারে না ওই শূন্য গর্ভগৃহে দুটি চোখের জন্ম দিতে? দুটো ভাবলেশহীন পাথুরে চোখের ওর বড় প্রয়োজন আজ। ওকে পারতেই হবে, যেমন করে হোক! কিন্তু পারছে না। চোখ বুজে আসছে ঘুমে। জলে বিম্বিত প্রতিচ্ছবির মতো কেঁপে উঠছে গরিলার মুখ। আর পাতলা হয়ে যাচ্ছে তার সবুজ রঙ। ঘুমের গভীরে তলিয়ে যেতে যেতে অরুণিমার মনে হল, সেও যেন হারিয়ে যাচ্ছে কোনো অতলে। যে অতল থেকে কোনো ডাক্তারই আর ওকে বের করতে পারবে না।

               

             

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত