উপমাহীন কবিতার কবি

আজ ১০ এপ্রিল। কবি অমিয় চক্রবতীর জন্মদিন। ইরাবতীর পাঠকদের জন্য রইল হাসান মাহামুদের ভাবনায় অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা নিয়ে লেখা একটি প্রবন্ধ।। কবি অমিয় চক্রবর্তীর প্রতি রইল ইরাবতী পরিবারের পক্ষ থেকে জন্মদিনের শ্রদ্ধা।

 

।। হাসান মাহামুদ।।

সাম্প্রতিক সময়ে একটা বিতর্ক খুব বেশি শোনা যায়, তা হলো বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক কবি কে? মাইকেল মধুসূদন দত্ত, জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান কিংবা আল মাহমুদকে আলাদা আলাদা ভাবে বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক কবি হিসেবে অভিহিত করতে দেখা যায়। অনেকে আবার মনে করেন রবীন্দ্রনাথকে, কেউ কেউ আরও পরবর্তী ত্রিশের কবিদেরই মনে করেন প্রথম আধুনিক কবি।

তবে আমরা বলতে পারি, প্রথম আধুনিক বাংলা কবিতা পাওয়া যায় মাইকেলের কাছ থেকেই। তাকে বেশিরভাগ বোদ্ধাই ‘আধুনিক বাংলা কবিতার জনক’বলেছেন। তিনি ‘মেঘনাদবধ’ মহাকাব্য এবং চতুর্দশপদী কবিতা লিখে বিখ্যাত হন। তিনিই বাংলা সাহিত্যে প্রবর্তন করেন মহাকাব্য, সনেট ও মনোনাট্যের। চৌদ্দ মাত্রার পয়ারে আট-ছয়ের চাল ভেঙে দেন এবং আঠারো মাত্রার মহাপয়ার রচনা করেন। যদিও অনেক বিশ্লেষক, শামসুর রাহমানকে আধুনিক বাংলা কবিতার রাজপুত্তুর হিসেবে আখ্যা দেন। আবার, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তকে বলা হয় যুগসন্ধিকালের কবি। তিনি মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের সংযোগ ঘটিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি মধ্যযুগের শেষ কবি এবং আধুনিক যুগের প্রথম কবি।

একই ধরনের বিশ্লেষণ রয়েছে অমিয় চক্রবর্তীকে নিয়ে। ত্রিশের প্রধান পাঁচ কবির অন্যরা হলেন অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। তখনকার সময়ে তারা আধুনিক বাংলা কবিতায় ‘পঞ্চ পাণ্ডব’ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। ১৯৩০-এর দশকে আধুনিক বাংলা কবিতায় প্রভাবশালী ভূমিকা রাখেন তারা। এর মধ্যে অন্যতম ছিলেন অমিয় চক্রবর্তী। ত্রিশের কবিরাই মূলত আধুনিক কবিতার পুরোধা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আধুনিক কবি হিসেবে অমিয় চক্রবর্তী বেশি সাহিত্য-সমালোচক দ্বারা নন্দিত ও গৃহীত।

তবে আধুনিক কবি কিংবা কবিতা, এই রচনার মুখ্য বিষয় নয়। অধিকাংশ খ্যাতনামা কবির সঙ্গে একটি মৌলিক পার্থক্য নিয়েই মূলত আলোচনা। তা হলো, উপমার ব্যবহার ছাড়া কবিতা রচনা। এ ক্ষেত্রে অমিয় চক্রবর্তী অন্য সবার থেকে আলাদা। উপমার ব্যবহারের পরিবর্তে তার কবিতায় এসেছে বর্ণনামাত্রিক অভিনবত্ব। যা তাকে স্বাতন্ত্র্যতা দিয়েছে।

জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, উপমাই কবিতা। সেই প্রাচীন যুগের কালীদাস থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সকল বড় কবির রচনাতেই এ সত্য প্রমাণিত। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ছিল উপমার ছড়াছড়ি। উপমার ছড়াছড়ি ছিল রবীন্দ্রনাথ, জসীমউদ্দিনের কবিতাতেও। উপমা ছিল বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথের কবিতাতেও। কিন্তু অমিয় চক্রবর্তীর কবিতায় উপমার উপস্থিতি অভাবিত রকমের কম। কোনো কোনো কাব্যে নেই বললেই চলে।


১৯৩০ সালে জার্মানিতে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে অমিয় চক্রবর্তী

কবিতা কেবল বক্তব্য বা বর্ণনা নয়, চিত্র অঙ্কনও। সব কবিই এই চিত্র অঙ্কন করেন। চিত্র অঙ্কনের অভিনবত্বই একজন কবির পান্ডিত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে। আর এই চিত্র অঙ্কনে কবিতার যে নান্দনিক উপাচার সর্বাধিক কাজে লাগে তা হলো উপমা। উপমা মানে তুলনা। প্রত্যক্ষ বস্তু বা বিষয়ের সঙ্গে অপ্রত্যক্ষ বস্তু বা বিষয়ের অভিনব তুলনার মাধ্যমে একজন কবি তার উপভোগ্য চিত্রকল্পগুলো তুলে ধরেন পাঠকের সামনে। অন্য সবাই যেখানে ছবি আঁকার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই উপমার আশ্রয় নিয়েছেন অমিয় চক্রবর্তী সেখানে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে, বর্ণনার পর বর্ণনা শানিয়ে চিত্রের পর চিত্র অঙ্কন করেছেন। একটি বিষয় তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তা সর্বমহলে গৃহীত এবং নন্দিত হয়। কবির ছন্দ, উপমা, গাঁথুনির সার্থকতাও সেখানে। অমিয় চক্রবর্তীও সেখানে সফল। তার উপমাবিহীন কাব্য বাহবা পেয়েছে।যেমন-এক মুঠো কাব্যের বৃষ্টি কবিতার প্রথম স্তবক :

অন্ধকার মধ্যদিনে বৃষ্টি ঝরে মনের মাটিতে।
বৃষ্টি ঝরে রুক্ষ মাঠে, দিগন্তপিয়াসী মাঠে, স্তব্ধ মাঠে,
মরুময় দীর্ঘ তিয়াষার মাঠে, ঝরে বনতলে,
ঘনশ্যাম রোমাঞ্চিত মাটির গভীর গূঢ় প্রাণে
শিরায়-শিরায় স্নানে বৃষ্টি ঝরে মনের মাটিতে।

ধানের ক্ষেতের কাঁচা মাটি, গ্রামের বুকের কাঁচা বাটে,
বৃষ্টি পড়ে মধ্যদিনে অবিরল বর্ষাধারাজলে।।

ছন্দ, শব্দ চয়ন, শব্দ ব্যবহারের ধাঁচ, পংক্তি গঠনের কায়দা সবকিছু মিলিয়ে তিনি ছিলেন বাঙালী কবিদের মধ্যে অনন্যসাধারণ। কঠিন সংস্কৃত শব্দও তার কবিতায় প্রবেশ করেছে অনায়াস অধিকারে। তার কবিতায় জাগ্রত চৈতন্যের সঙ্গে সঙ্গে অবচেতনার প্রক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়।

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতাকে বলা হয় ‘দৃষ্টির দর্শন’। সব কবিই দেখেন। এবং দেখাকেই তুলে ধরেন কাব্যিক চিত্রময়তায়। অমিয় চক্রবর্তীও যা দেখেছেন তা-ই তুলে ধরেছেন। এবং তার দেখার মধ্যে এক ধরনের দার্শনিক অভিজ্ঞান নিশ্চয়ই আছে। না হলে তাকে দর্শন বলা হবে কেন? অমিয় চক্রবর্তীর পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশে ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। বিশ্বভ্রামণিক হিসেবে যা দেখেছেন, যা অনুভব করেছেন, অনেক ক্ষেত্রেই অবিকল তা তুলে ধরেছেন কবিতায়। যেমন- বড় বাবুর কাছে নিবেদন নামক কবিতায় : থার্ডক্লাসের ট্রেনে যেতে জানলায় চাওয়া,/ধানের মাড়াই, কলা গাছ, পুকুর, খিড়কি-পথ ঘাসে ছাওয়া।/মেঘ করেছে, দুপাশে ডোবা,/সুন্দরফুল কচুরিপানার শঙ্কিত শোভা;/গঙ্গার ভরা জল; ছোটো নদী; গাঁয়ের নিমছায়াতীর/-হায়, এ-ও তো ফেরা-ট্রেনের কথা।

কালজ্ঞান কবিকে সমকালের কাছে যেমন মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে তেমনি উত্তরকালে করে তোলে স্মরণীয়। অমিয় চক্রবর্তীর কালজ্ঞান স্পষ্ট এবং কবিতায় তার চিত্রায়ন করেছেন সহজে। তার কাব্যের অন্তর্নিহিত ভাব এবং তার প্রকাশের সহজ শৈলীর ভেতর ফুটে ওঠে তার মানবজাতির জন্য শুভবাদী চিন্তা।

অমিয় চক্রবর্তী কবিতা, বিচিত্রা, উত্তরসূরী, কবি ও কবিতা, পরিচয়, প্রবাসী প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে— কবিতা: খসড়া, এক মুঠো, মাটির দেয়াল, অভিজ্ঞান বসন্ত, দূরবাণী, পারাপার, পালাবদল, ঘরে ফেরার দিন, হারানো অর্কিড ও পুষ্পিত ইমেজ। গদ্য: চলো যাই, সাম্প্রতিক, পুরবাসী, পথ অন্তহীন ও অমিয় চক্রবর্তীর প্রবন্ধ সংগ্রহ।

অমিয় চক্রবর্তী ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের ১০ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের হুগলিতে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম অমিয়চন্দ্র চক্রবর্তী। তার পিতার নাম দ্বিজেমচন্দ্র চক্রবর্তী এবং মাতা অনিন্দিতা দেবী। পিতা দ্বিজেমচন্দ্র চক্রবর্তী আসামে গৌরীপুরএস্টেটের দেওয়ান হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং তার মা অনিন্দিতা দেবী ছিলেন সাহিত্যিক। যিনি ‘বঙ্গনারী’ ছদ্মনামে প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করতেন। অনিন্দিতা দেবী সংস্কৃতে পারদর্শী ছিলেন বলেই চার সন্তানকে সংস্কৃত শিখিয়েছিলেন নিজেই। গৌরীপুরের সংস্কৃত টোল থেকে প্রখ্যাত পণ্ডিতকে তিনি নিযুক্ত করেছিলেন কালিদাস, ভবভূতি, ভারবি প্রমুখের রচনা পাঠের সুবিধার্থে। এভাবেই অমিয় চক্রবর্তী শৈশবেই ব্যাকরণে পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।

পঁচিশ বছর বয়সে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে অমিয় চক্রবর্তী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য-সচিব হিসেবে যোগ দেন। এজন্য ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে স্থায়ীভাবে শান্তিনিকেতনে চলে আসেন তিনি। সাহিত্য সচিবের দায়িত্ব ছাড়াও পরে অবশ্য বিশ্বভারতীর সকল প্রকার কাজেই অমিয় চক্রবর্তীকে জড়িয়ে পড়তে হয়। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ও রথীন্দ্রনাথের অনুপস্থিতিতে। ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সচিব হিসেবে কাজ করেন।

বাংলা কবিতায় আধুনিকতার পথিকৃত ও পঞ্চপাণ্ডবদের অন্যতম কবি অমিয় চক্রবর্তী সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৬০ সালে ইউনেস্কো পুরস্কার, ১৯৭০ সালে পদ্মভূষণ পুরস্কার, দেশিকোত্তম ও ভারতীয় ন্যাশনাল একাডেমী পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৬ সালের ১২ জুন এই উপমাবিরল কবি মৃত্যুবরণ করেন।
কৃতজ্ঞতাঃ রাইজিংবিডি

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত