উতুঙ্গ উটাহ

উটাহতে বেড়াতে যাচ্ছি এটা সহকর্মী, প্রতিবেশী, বন্ধু থেকে ট্রাভেল এজেন্ট যাকেই বলতে হচ্ছিলো তারই কেমন একটা উত্পটাং ধরণের অভিব্যক্তি হচ্ছিলো। ট্রাভেল এজেন্ট টি আসলে আমাকে লাস ভেগাস, অরল্যান্ডো, মায়ামি, ম্যার্টেল বিচ, নায়াগ্রা ফলস অর্থাৎ কি না আমেরিকা র “দীপুদা ” (অবশ্য এই জায়গা গুলো কে “দীপুদা” বলা যায় কি না সে নিয়ে জনগণের মধ্যে মতবিরোধ থাকতেই পারে) জাতীয় জায়গার প্রমোশনাল অফার গছাতে চাইছিলো। বললাম আমেরিকার সাউথ ওয়েস্টে অবস্থিত উটাহ যাবার টিকেট করা হয়ে গেছে। শুনে রাগ রাগ গলায় কেটে কেটে থেমে থেমে উচ্চারণ করলো ” So what is there in Utah ?”

তা উটাহ তে সত্যি কি আছে? দেখা যাক।



প্রথম দিন : নিউ জার্সি থেকে সল্ট লেক সিটি উটাহ শেষ মুহূর্তের কতকগুলো ছোটোখাটো কতকগুলো বাধা বিপত্তি কাটিয়ে, ফ্লাইট ছেড়ে যাবার ভয় বুকে চেপে ৫০ মাইল দূরের এয়ারপোর্টে, মেমোরিয়াল ডে লং উইকএন্ডের ট্রাফিক এড়িয়ে ঠিক সময় পৌঁছে আলাস্কা এয়ারলাইন্স এর ফ্লাইট এ নিৰ্বিঘ্নে বসা গেলো। আক্ষরিক অর্থে ঘুরিয়ে নাক দেখানোর মতো পশ্চিমে লস এঞ্জেলেস টেনে নিয়ে দু ঘন্টা হল্ট করে আবার ঘুরে পূর্বে সল্ট লেক সিটি যখন এলাম সন্ধে আট টা বেজে গেছে। কিন্ত একে সময়টা মে মাস তায়ে পশ্চিম, তাই বাইরে যথেষ্ট আলো। দিগন্তে সেই সোনাঝরা সন্ধ্যার আলোমাখা বরফ মোড়া পাহাড় চূড়া। রকি মাউন্টেন এর উটাহ কাজিন (পরে পড়ে দেখেছিলাম এটা রকি মাউন্টেন রেঞ্জ এরই অন্তর্ভুক্ত) চোখ ভরিয়ে দিলো।

দ্বিতীয় দিন : সল্ট লেক সিটি থেকে মোয়াব উটাহ : সকালে হোটেলের কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট দেখে বুঝলাম জায়গাটা রুক্ষ শুস্ক হলেও , খাবার দাবার এর ব্যাপারটা সরেসই হবে। লেট রাইসার দের গড়িয়ে গড়িয়ে ওঠা, ততধিক স্লো মোশনে মালা জপতে জপতে (ফোনে টাইপ করতে করতে) রেডি হওয়া এবং তার ফলে ব্রেকফাস্ট রুম বন্ধ হবার ২০ মিনিট আগে কোনোমতে খাবার ম্যানেজ ইত্যাদি করে শেষ পর্যন্ত বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে সল্ট লেক সিটি থেকে Arches ন্যাশনাল পার্ক এর উদ্দেশে রওনা হলাম সকাল সাড়ে দশটা টা নাগাদ। হাইওয়ে তে উঠে শহরের সীমানা ছাড়াতেই দূরে একদিকে, স্নো পিক আর একদিকে দিগন্ত বিস্তারিত খাড়া, রক্তিম, সুউচ্চ পাহাড়। এক এক্সিটে গিয়ে গ্যাস নেওয়া আর দ্বিপ্রাহরিক ভোজ, মাঝে দু এক বার রেস্ট এরিয়ায় break এর পর বিকাল প্রায় ৫ টায় লাল পাহাড়ে ঘেরা ঝলমলে, সুন্দর, ছোটো, শহর মোয়াব এ পোঁছলাম, যেখানে Arches ন্যাশনাল পার্ক। হোটেলে চেক ইন করে লাগেজ রেখে, একটু চা পান করে চললাম আর্চেস ন্যাশনাল পার্ক। ওই পড়ন্ত বিকেলেও বেশ লাইন ঢোকার চেক পোস্টে। চেক পোস্ট এর লেভেল থেকে ঘাড় অনেক উঁচু করে দেখলাম লাল পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে সুতোর মতো রাস্তায় দেখা যাচ্ছে খেলনার গাড়ির মতো গাড়ি। আমার সাবধানী, ভীত হৃদয় গুড়গুড়িয়ে পশ্চাদপসারণ করতে চাইলো। কিন্তু চাইলেই কি করা যায় নিজেই তো প্রচুর উইকএন্ডের রাত জেগে প্ল্যান বানিয়ে সবাইকে সেই প্ল্যানের আওতায় এনেছি, অফিসে ছুটি না নিয়ে কৃপনের মতো একটু একটু করে বাঁচিয়েছি। মনের ভয় একটু ব্যক্ত করতেই “আমি তো জানতাম এ হবেই “সূচক যে হাসি বাকি সকলের মুখে দেখলাম। যাক যে যাক , গাড়ি তো আর এখন আমি চালাচ্ছি না, অতঃএব সম্পূর্ণ স্বইচ্ছায় নেভিগেটর র স্থান ত্যাগ করে পিছনের সিটে বসে, সিট বেল্ট ফেল্ট লাগিয়ে মা ভৈ বলে রওয়ানা। যতটা পারা যায় সামনের দিকে চোখ সেট করে রাখি যতক্ষণ না গাড়ি একদম উঁচুতে উঠে পাহাড়ের সম উচ্চতায় যায়।

লাল পাহাড়ি রাস্তায় কিছুটা ড্রাইভ করার পর পড়ন্ত সূর্যের প্ৰতিফলিত সোনালী আলোয় একে একে প্রকৃতির নিজের হাতে তৈরী নানা আকৃতি র লাল পাথরের আর্চ এবং আরো অভুত পূর্ব স্থাপত্য চোখে পড়তে লাগলো।

ত্রি গসিপস , কোর্ট হাউস পার্ক এভিনিউ , ব্যালান্সড রক ভিউ পয়েন্ট দেখলাম। ছোট পুত্র , আমার নিষেধ অগ্রাহ্য করে পাহাড়ের বিপজ্জনক জায়গায় পড়তে পড়তে চড়তে লাগলো এবং উপরে উঠে হাহা হাসতে হাসতে করে আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে একহাতে টাল সামলে আর এক হাতে সেলফি তুলতে লাগলো আর তার বাবা তার ভিডিও তুললেন।

তৃতীয় দিন: আর্চেস ন্যাশনাল পার্ক উটাহ।এদিন আমরা বিখ্যাত উটাহর স্টেট সিম্বল ডেলিকেট আর্চ যাবো ঠিক করলাম। ছেলেরা জিজ্ঞাসা করলো আমি কি গাড়ি চড়ে আর্চ দেখার কথা ভাবছি , কারণ ২ মাইল খাড়া পাহাড়ে না চড়লে (হাইক না করলে) আর্চ দেখা যায় না এবং আসার পথে আবার ওই ২ মাইল গ্রাভিটির টানে খাড়া পাহাড় থেকে নামতে হবে । মনে মনে ভাবলাম ধুস না হয় পার্কিং লট থেকে গাড়িতে বসে হাইকিং রত জনগণ দেখবো। তাতেই দুধের স্বাদ ঘোলে এ মেটাবো। অকুস্থলে পৌঁছে, পুত্রদ্বয়, লাফাতে লাফাতে চড়চড়ে রোদে জগিং করে অদৃশ্য হয়ে গেলো হাইকিং ট্রেলে। উনি বললেন দেখি কিছুটা যাই, তারপর না হয় ফিরে আসা যাবে, তা তুমি কি যাবে না এখানেই থাকবে। গাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখি আবাল বৃদ্ধ বনিতা চলেছেন ডেলিকেট আর্চের উদ্দেশে। হাঁটতে থাকলাম তাদের সঙ্গে সঙ্গে। প্রথম দিকে ট্রেল মোটামুটি কঠিন নয় শুধু এবড়ো খেবড়ো পাথর বিছানো পথ। কিন্তু সেই পথ চলছে তো চলছেই আর কিছুক্ষনের মধ্যে সম্পূর্ণ ছায়া বিহীন পাথুরে পথ ক্রমশ উপরে চড়তে শুরু করলো আর সেই সঙ্গে চড়তে শুরু করলো রোদ। নিশ্বাস প্রশ্বাস হাপরের শব্দ কেও হার মানাতে শুরু করেছে। প্রায় ২/৩ দূরত্ব গিয়ে হার মানছিলাম। দেখলাম এক বয়স্কা মহিলা সম্ভৱতঃ আমার মায়ের বয়েসের কাছাকাছি নেমে আসছেন। কাছে গিয়ে জিগেস করলাম উনি শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ আর্চ পর্যন্ত গেছেন কি না, বললেন গেছেন এবং আর বেশি দূরে নয়, কঠিন ও নয় এবং এতো দূরে এসে না যাওয়া টা বোকামি হবে। সেই ভরসায় নতুন উদ্যমে পাড়ি দিলাম। প্রায় তিনটে ন্যাড়া, গাছ পালা হীন পিচ্ছল পাহাড় , সরু পাহাড়ি রাস্তা, ক্রমশ চড়তে থাকা রোদ এবং তাপমাত্রা র মধ্যে ওই ১/৩ ভাগ অতিক্রমঃ করা আগের ২/৩ ভাগের চেয়েও শক্ত ছিল। পাহাড়ের শেষ বাঁকে পৌঁছে চোখের সামনে ধরা দিলো সেই বিখ্যাত খিলান, যা দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত তা কোনো মানব হস্ত জাত স্থাপত্য নয়।



চতুর্থ দিন : ব্রাইস ক্যানিয়ন উটাহ: এবার গন্ত্যব উটাহ এর আরো দক্ষিণ পশ্চিমে ব্রাইস ক্যানিয়ন. যথারীতি সকালে উঠে শুরু হলো যাত্রা। কিছুক্ষনের মধ্যেই হাইওয়ে প্রায় জনশূন্য (গাড়ি শূন্য) .সর্পিল রাস্তা ধূসর রুক্ষ অতিকায় পর্বতের বুক চিরে চলছে তো চলছেই। পাহাড় পর্বতের উচ্চতা এবং ব্যাপ্তি যেন রাস্তা শুদ্ধ গাড়ী কে গিলে খেতে চাইছে। অনেক্ষন পরে পরে একটু রাস্তার পাশে ছোট জনপদ কি একটা পাহাড়ি নদী দেখা যায় তো আবার সেই ভয়ঙ্কর ধূসর রুক্ষ পাহাড় আর মাথা ঘোরানো মাথার চুলের পিনের মতো বাঁকা পাহাড়ি হাইওয়ে। দু’ঘন্টা এরকম দুর্গম গিরি কান্তার মরু পার হবার পরেও যখন শুনলেন আরো দু ঘন্টার বেশি আছে, চালক মশাই আমি চালাবো কিনা জিগেস করলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার শরীরটা বড়োই খারাপ লাগতে লাগলো। এরপর আরো কয়েকবার স্টিয়ারিং ধরার প্রস্তাব এলেও আমি নেভিগেটর এর সিট এ অনড় হয়ে রিমোট ফ্রেন্ডস এন্ড ফ্যামিলি কে ফোনে মেসেজে পাহাড় পর্বতের ছবি পাঠাতে পাঠাতে বাকি টা পথ টেনে দিলুম। এবার গন্ত্যবের কাছাকাছি পৌঁছে একটু রিসর্ট, হোটেল টুরিস্ট এর আশা করছিলাম। দেখা গেলো সেই ধু ধু প্রান্তর , ধূসর পাহাড় আর তার কোলে গুটি কয় হোটেল। এবার দলের (বাড়ির ) সব একযোগে ভাংচি দেয় আর কি। একি জায়গা, কেন এখানে এতো পাহাড় পর্বত ঠেঙিয়ে এলাম ইত্যাদি। তাড়াতড়ি চালক মশাই কে কফি দিয়ে টিভির সামনে সেট করলাম আর ছেলেপুলে দের হোটেল এর জিম, সুইমিং পুল এর দিকে ভেড়ালাম। কফি পানান্তে তিনি ও আমি বাইরে এসে দেখি পড়ন্ত সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত, একদিকে পাহাড় আর একদিকে পাইন সজ্জিত মনোরম পটভূমি, চমৎকার ফুরফুরে বাতাস। হোটেল এর গেটে র সামনে এগোতেই দেখি US ন্যাশনাল পার্ক এর ছবি দেওয়া শাটল। জিগেস করতে বললো এই শাটল পার্ক এর টিকেট থাকলে ফ্রি আর পার্কের সব সব ভিউ পয়েন্ট এ চক্কর দিয়ে আবার এখানে ফিরে আসবে। দু জনে চড়ে বসলাম। বেশ আরামে বসে নিজে রা না চালিয়ে বাস থেকেই ক্যানিয়ন এর বিভিন্ন পয়েন্ট গুলো জেনে আর যেটুকু দেখা যায় দেখে নিলাম।

পঞ্চম দিন: ব্রাইস ক্যানিয়ন উটাহ। পরদিন সকালে আবার সবাই উঠলাম সেই বাসে। এবার বাস থেকে নেমে Bryce point, Sunrise, Sunset, Inspiration point এক এক করে। এখানে বলা দরকার যে এই ক্যানিয়ন চাইলে হাইক করা যায় এছাড়া হর্স ব্যাক রাইডও আছে। ছোট পুত্রের ঘোড়ায় চড়ার ইচ্ছা প্রকাশে আমি মনে মনে দূর্গা নাম জপছিলাম (কারণ ইউ টিউব এ দেখে এসেছি ঘোড়া কিভাবে সরু ক্যানিয়ন এর ধার দিয়ে চলেছে) কিন্ত Bryce Canyon এক ভিউ পয়েন্ট র কোনো অদৃশ্য স্থান থেকে তাদের বর্জ্য পদার্থের সুবাস আসায় তিনি ঘোষণা করলেন এ যাত্রা ঘোড়ায় চড়বেন না। আমি অদৃষ্ট কে অদৃশ্যে প্রণাম ঠুকে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম।

আমাদের এর আগে ক্যানিয়ন এর সঙ্গে পরিচিতি আরিজোনার গ্রান্ড ক্যানিয়ন এর মাধ্যমে। Bryce অত বড়ো না। আর দু জায়গার গঠনে ও তফাৎ আছে। Bryce এর গঠন দেখলে মনে কোনো প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। সরু সরু খোদাই করা পাথরের স্তম্ভ যেন মাটির তলা থেকে উঠেছে। এখানে যেগুলোকে hoodoos বলে. একদিকে এই রকম অদ্ভুত স্থাপত্যে এর মতো গঠন আর ন্যাশনাল পার্কের অন্য দিকে alpine অঞ্চলের মতো লম্বা লম্বা pine গাছ. অনেক পর্যটকের মতে Bryce ক্যানিয়ন আমেরিকার ন্যাশনাল পার্ক গুলির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ।

ষষ্ঠ দিন:  এবার শেষ গন্তব্য Zion National পার্ক। Bryce থেকে Zion এর দূরত্ব খুব বেশি না। যথারীতি সকালে শুরু হলো ড্রাইভিং। এবার ছোটোখাটো পাহাড় পর্বত, কোনোটা ধূসর কোনো টা লাল আর পথের পাশে উপল খন্ড লাফিয়ে বয়ে চলা চঞ্চলা নদী অতিক্রম করে মোটামুটি ঘন্টা আড়াই এর মধ্যে চলে এলাম Zion পার্ক এর সীমানা র মধ্যে। গাড়িতে যেতে যেতে পাওয়া গেলো Zion আর এক অন্য ভিউ। এখানে হাইওয়ে Zion পার্ক কে বেড় দিয়ে পাহাড়ের ভিতরের লম্বা এক টানেল অতিক্রম করে চলে গেছে ছোট শহর স্প্রিংডেল এর দিকে। লাল রঙের হাইওয়ে থেকে Zion এর সব অতিকায় সুউচ্চ লাল পাহাড় আর মধ্যে গজিয়ে ওঠা হরেক রকম উদ্ভিদ, ক্যাকটাস আর পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়া জলপ্রপাত যতটুকু পারি ক্যামেরা বন্দি করলাম।

ছোট্ট শহর স্প্রিংডেল ভারী সুন্দর। একটা লাল পাহাড়ের কোলে র মধ্যে আমাদের হোটেল টা, হোটেল এর পিছনে ক্যাম্পগ্রাউন্ডে একের পর এক আসছে RV আর ক্যাম্পার রা। হোটেল এর সামনে দাঁড়িয়ে দেখি সেখানেও লাল পাহাড়ের কোলে সবুজ গাছ আর তার নিচেই দোকান, রেস্তোরাঁ। যাই হোক হোটেলে গিয়ে জিনিসপত্র রেখে ছেলে রা রিটাযার করল যে যার ইলেক্ট্রনিক্স নিয়ে আর আমরা কফি পান করে বাইরে এলাম। লাল পাহাড়ে তখন আরো উজ্জ্বল দিনান্তের রবির অস্তরাগে। RV আর ক্যাম্প গ্রাউন্ড থেকে ভেসে আসছে গ্রিলের সুস্বাদু সুবাস। Springdale টাউন এর সুন্দর ফ্রি শাটল এ চড়ে Zion এর গেটে এ চলে এলাম। সেখান থেকে আবার ন্যাশনাল পার্ক এর শাটল এ করে বসন্তের পড়ন্ত বিকেলের উদ্ভাসিত আলোয় Zion পরিক্রমা করে দেখে নিলাম ভিউ পয়েন্ট গুলো।



পর দিন সকালে হোটেলের কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট রুমে সেই পরিচিত, টোস্ট, ব্যাগেল, সিরিয়াল, প্যাকেজ থেকে ঢালা স্ক্র্যাম্বলড এন্ড হার্ড বয়েল্ড এগ এর সমারোহ দেখলাম। কিন্তু যা অপরিচিত ঠেকলো তা হলো এক খাদ্য প্রহরী (যার আসল কাজ হচ্ছে ওই ব্রেকফাস্ট রুম এ খাবারের সরবরাহ রাখা ও পরিষ্কার করা)। তার চোমড়ানো গোঁফ থেকে, চাহনি, দৈর্ঘ্য, চলন একেবারে মনে হচ্ছে পঞ্চদশ শতকের রাজস্থানের কোনো দুর্গ থেকে তুলে আনা হয়েছে, হাতে শুধু একটি ঢাল আর তরোয়াল দিলেই অবিকল রাজপূত দুর্গের প্রহরারত সৈনিক। কিন্তু খেতে বসে তার ওই ঠায় দরজার গায়ে হেলান দিয়ে আমাদের লক্ষ্য করা আমার কিছুক্ষনের মধ্যেই অসহ্য লাগতে শুরু করলো। এ বার ইচ্ছা করে কটমট করে তাকাতে লাগলাম। কিছুক্ষন পরেই কাজ হলো। তিনি পিছনের দরজা দিয়ে সুড়ুৎ করে পিছনে কিচেন এ অন্তর্হিত হলেন। আমরা ব্রেকফাস্ট শেষ করে টাউন শাটল এ অন্য টুরিস্ট দের সঙ্গে চলে এলাম Zion এর গেটে। সেখান থেকে ন্যাশনাল পার্ক এর ইলেকট্রিক শাটল এ চড়ে বসলাম। এ বাসের শুধু জানলাই খোলা নয় বাসের মাথায় ও জানলা অর্থাৎ sun-roof আছে। চমৎকার ফুরফুরে হাওয়া আর বাসের চালিকার Zion পার্কের ট্রেলস, হাইকস ইত্যাদি দ্রষ্টব্য বিষয়ে ধারাবিবরণী শুনতে শুনতে চলে এলাম বাসের ফার্স্ট স্টপ রিভার ওয়াক এ। রাস্তা থেকে অনেক নিচে নেমে এলাম ভার্জিন রিভার এর বুকে। আমি আদৌ ডাকাবুকো নই তবু এরকম পাহাড়ী যদি দেখলে কেমন ছোটোবেলায় বর্ষায় মাঠে জল জমলে জল ঘাঁটার মতো প্রবল ইচ্ছা চাগাড় দেয়। নদী তে পা দিয়েই দেখলাম নদীবক্ষ পিচ্ছিল পাথরের। দু বার পা হড়কানো সামলে ও একটু জলকেলী করলাম। এই ভার্জিন রিভার Zion ক্যানিয়ন এর এর বিভিন্ন জায়গা দিয়ে বয়ে চলেছে। আপাতদৃষ্টিতে মনোরমা, শীর্ণকায়া এই নদী নাকি হঠাৎই ভীষণ রূপ ধারণ করে প্রবল বেগে কয়েক মিনিটের মধ্যে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সমস্ত চরাচর আর মানুষজন। তাই Zion এর Riverwalk আর Narrows এ নামার আগে পার্কের visitor center এ Flash Flood ওয়ার্নিং দেখে নেওয়া অতন্ত্য জরুরী। যাই হোক এর পর আর কয়েকটা ভিউ পয়েন্ট দেখা হলো। উইপিং রক যাবার পথে আবার দেখা মিললো ভার্জিন নদীর। ছবির মতো সুন্দর এক ব্রিজ এ ভার্জিন নদী পেরিয়ে হাইকিং ট্রেল শুরু হয়েছে উইপিং রক এর। আবার পা পিছলানোর, মচকানোর ঝুঁকি নিয়ে ফিরে আসার পথে উঁচু থেকে নামলাম নদীর বুকে। চারদিকে রুক্ষ লাল পাহাড় এর মাঝে ইতস্ততঃ পাইন, ফার আর তার কোলে ছুটে চলেছে ভার্জিন নদী। একটু নামতেই নদীর খর স্রোত বেশ টের পাওয়া গেলো। একটা বড়ো সড়ো পাথর বেছে বহুক্ষণ বসে রইলাম কুমারী নদীর বুকে। চারদিকে পাহাড় আর গাছ গাছালি র কোল দিয়ে কল কল শব্দে বয়ে যাওয়া নদী আর ছবির মতো প্রেক্ষাপট শরীর মনের ক্লান্তি দূর করে মন কে সজীব করে দেয়। এরপর আবার উঠে, হেঁটে বাস স্টপ। নেক্সট পয়েন্ট এমেরাল্ড পুল. আবার বাস থেকে নেমে হাইক। দুর্ভাগ্য বশত এমেরাল্ড পুল এর ছোট পুল দেখতেই এতো উপরে চড়তে হলো আর যেহেতু এরপর ন্যারোস হাইক বাকি আছে তার জন্যে এনার্জি সঞ্চয় করে রাখতে আর উপরে ওঠার সাহস করলাম না। ছেলে গেলো যথারীতি লাফিয়ে হাইক করে। পরে ওর কাছে আর ইউ টিউবে দেখে বুঝলাম ভীষণ মিস করেছি। এখানে বলে রাখা দরকার যে, Zion এর প্রায় প্রত্যেকটি ভিউ পয়েন্টই হাইক করে যেতে হয় এবং প্রায় প্রত্যেকটি হাইকই বেশ পরিশ্রমের কিন্তু যাত্রা পথের এবং শেষ প্রান্তে Zion এর প্রকৃতির অতুলনীয় সৌন্দর্য পরিশ্রমের কষ্ট লাঘব করতে বাধ্য।

Zionপার্কে আমাদের শেষ গন্তব্য Zion Narrows. আবার চড়লাম শাটল বাসে , বাস নামিয়ে দিলো যে স্টপ এ সেখান থেকে প্রায় দেড় মাইল হাঁটলে এই Narrows. এখানে প্রায় ১০০০ ফিট উঁচু Zion ক্যানিয়ন এর দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে ভার্জিন রিভার বয়ে গেছে মাত্র ২০ কি ৩০ ফিট চওড়া। উপরের রাস্তা থেকে দেখলাম পাথর ছড়ানো নদীর বুকে লোকজন নেমে পড়েছে । আমরাও এগোলাম সে দিকে । জুতো চেঞ্জ করে ওয়াটার শু পরে নদীর জলে পা ডোবাতেই বুঝলাম এখানে নদীর জল কত ঠান্ডা আর নদীবক্ষ অত্যন্ত অসমতল পাথরে ভর্তি । আমার দৌড় তো ওই পড়তে পড়তে টাল সামলাতে সামলাতে কিছক্ষন নদীবক্ষে জলকেলী আর ফটো তোলা। এদিকে আমার এডভেঞ্চার প্রিয় কনিষ্ঠ পুত্র অনেক আগেই ঘোষণা করেছেন তিনি Narrows hike এ যাবেন। সেই hike যা পড়ে এসেছি ওই দুই খাড়া পাহাড়ের মাঝের সুড়ঙ্গ দিয়ে নদীবক্ষে অনন্ত যাত্রা। কে জানে তার শেষ কোথায়। ভিডিও তে dare devil দের এই নদীপথে বিপজ্জনক হাইক দেখেছি এবং এটাই সেই কুখ্যাত ফ্ল্যাশ ফ্লাড কবলিত জায়গা। ক্ষীণ ভাবে বলার চেষ্টা করলাম যে wading বুট ফুট নেই আরো কিছু গিয়ার ও দরকার পড়ে হয়তো। সেসব কথা যথারীতি হেসে উড়িয়ে আমাকে আরো আর একবার ভীতুর ডিম প্রতিপন্ন করে টি-শার্ট, শর্ট আর একটা সামান্য ওয়াটার শু পরে দুটো গাছের ডাল কুড়িয়ে দুহাতে সম্বল করে ছেলে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে তার থেকে প্রায় কোয়ার্টার মাইল দূরে দুই ক্যানিয়ন মাঝে নদীর উপর হাটঁতে হাঁটতে অদৃশ্য হয়ে গেলো। আমি আর কি করি, কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষন কাটিয়ে দিলাম । ছেলের পিতৃদেব এতক্ষন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মিনিট পনেরো পরে তিনি হাওয়াই চটি সম্বল করে উপল খন্ড পূর্ণ নদীবক্ষে নামলেন। উদ্দেশ্য ছেলেকে ধরে আনবেন। তিনি ও রওয়ানা দিলেন ওই দুই পাহাড়ের মাঝের সংকীর্ণ নদীপথে। সৌভাগ্যবশতঃ সন্ধ্যের ঠিক মুখে আমার উদ্বেগ মাথাব্যথায় পরিণত হবার আগেই দু’পাহাড়ের মাঝে ছেলে অবতীর্ণ হলো। বাবা ও বেশিদূর অতিক্রম করেননি হাওয়াই চটি পরে। তারপর বাবা ছেলে যুগলের নদীবক্ষে কিছু ছবি তুলে আমরা আমাদের Zion ক্যানিয়ন এর ন্যারোস এডভেঞ্চার সমাপ্ত করলাম। মনে মনে অদৃশ্য কে আবার ধন্যবাদ দিলাম যে এ যাত্রা ছেলে একবার Zion এর “এঞ্জেলস ল্যান্ডিং” নামক ভয়ঙ্কর উঁচু খাড়া পাহাড়ে হাইক এর কথা মুখে বললেও কাজে করে দেখায় নি।

এরপর আবার বনপথে মাইল খানেক হেঁটে , পড়ন্ত সূর্যের আলোয় দীপ্ত লাল পাহাড়, সবুজ বন , তার মাঝ দিয়ে ছল ছল শব্দে বয়ে চলা কুমারী নদী , আরাম করে পাতা চিবানো হরিণ, কাঠবিড়ালী ও তার শাবক সবাইকে বিদায় জানিয়ে বাস স্টপ এ দাঁড়ালাম অন্য টুরিস্ট দের সঙ্গে। শাটল বাস এ হোটেল এর পথে ফিরে যেতে যেতে Zion ন্যাশনাল পার্ক এর অনন্য প্রকৃতি মন আর ডিজিটাল ক্যামেরায় সঞ্চয়ে করার চেষ্টা চালালাম।

উটাহ যাবার আগে আর এই লেখার প্রথমে যে প্রশ্ন দিয়ে শুরু করেছিলাম, যে কি আছে উটাহ তে? এই যাত্রায় এবং এর আগে আমেরিকার ওয়েস্ট, নর্থ আর সাউথ ওয়েস্ট অঞ্চলের বিচিত্র এবং বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড (আরিজোনা, কলোরাডো এবং ওয়াওমিং )আর এবার সাউথ ওয়েস্ট এর উটাহ র Arches, Bryce আর Zion ন্যাশনাল পার্ক অতিক্রম করে মনে হলো এখানে মায়ামি র বিচ এর নাইট লাইফ, লাস ভেগাস ক্যাসিনোর চোখ ধাঁধানো আলো আর ক্যারিবিয়ান রিসর্ট এর বিলাসবহুল উজ্জ্বলতা নেই কিন্তু তবু এই ঊষর প্রকৃতি র সৌন্দর্য তুলনাহীন এবং মারাত্বক তার আকর্ষণ। প্রকৃতি এখানে অপার, রুক্ষ, দরাজ, খেয়ালি এবং ভয়ঙ্কর সুন্দর। এক মুহূর্তে তার তার শান্ত সৌন্দর্যে মুগ্ধ করে মানুষকে তো পরের মুহূর্তে প্রলয় তান্ডবে করতে পারে প্রাণ হরণ। সাহসীহৃদয়, প্রকৃতিপ্রেমিক মানুষজন হয়তো অন্য কথা বলবেন কিন্তু আমার মতে এখানে প্রকৃতি কে সমীহ করে তার শর্তে তার সীমানায় বিচরণ করে তারিফ করা ই ভালো এবং আমি আমি আনন্দিত যে সাহসী না হয়েও এর দূরন্ত, দুর্নিবার প্রকৃতি কে একটু ছুঁয়ে দেখার আর চাক্ষুস করার আমার সুযোগ হয়েছে।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত