উৎসব

 

 

আমি আর সুকান্ত মিলে একটা প্ল্যান করলাম।এই যে জয়ন্তদা, আমাদের পাড়ার হোয়াটস্অ্যাপ গ্রুপে সারাদিন দেশপ্রেম ফলাচ্ছে,ও ব্যাটাকে টাইট দেব”, বলে সৌগত।
অরুণিমা জিজ্ঞেস করল, ‘কীভাবে?’
“গ্রুপে এখন দেব, ” কাল মোমবাতি মিছিল করব। দেখব কজন আসে।দেখি বিপ্লব কোথায় যায়?”
অরুণিমা বলল,” উদ্দেশ্য যদি এটা হয়,তবে বলি, কোন লাভ নেই। রবিবার সন্ধেবেলা হাঁটতে কারো অসুবিধা থাকবে না।”
“দেখা যাক না।”বলে সৌগত।
তারপর গ্রুপে পোস্ট করে পুলওয়ামার নিহত জওয়ানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আমরা একটি মৌন মিছিল আয়োজন করতে চাইছি, মোমবাতি নিয়ে। ইচ্ছুক ব্যক্তিরা গ্রুপে জানান।রাত তখন বারোটা।পোস্ট হওয়ার পর দুটো হাত ওঠে।একটা দেবরূপা, আরেকটা সমীরদার।
সৌগত রেস্টলেস।
” রাত্রি হয়ে গেছে বলে কেউ দেখছে না, বলো?”
অরুণিমা মন দিয়ে একটা গল্প লিখছে।
” কী গো..”
” হ্যাঁ বোধহয়।” খাতা থেকে মুখ না তুলে বলে অরুণিমা।
সৌগত ফোন করে রাজীবকে।” এই রাজু, গ্রুপে পোস্ট করলাম, তোরা কিছু লেখ। তোরা চুপ থাকলে কী করে হবে?”
রাজু লিখল: ” গুড ইনিসিয়েটিভ।”
সৌম্য লিখল ” দারুণ সৌগতদা।”
তারপর সৌগত একটু নিশ্চিন্ত হয়ে গেম খেলতে খেলতে ঘুমিয়ে পড়ল।রোজ ওভাবেই ঘুমোয়।অরুণিমাও ঘুমিয়ে পড়ে।পরের দিন সকাল থেকে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে সারদা পার্ক।সবাই একে একে হাত তোলে হোয়াটস্অ্যাপে।রেসিডেন্সিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি ব্রজেন বাবু ডেকে বলেন সৌগত আর সুকান্তকে, ” একটা ফ্লেক্স বানিয়ে নাও। গোটা ষাট-সত্তর মোমবাতি আনিয়ে নাও।কিছু পোস্টার বানিয়ে নাও। রঙ- তুলি যা যা লাগবে কিনে আনো। সব খরচা অ্যাসোসিয়েশন দেবে।জয়ন্তদা ক্যান্ডল হোল্ডারের দাবী তুলেছিলেন। সবাই মিলে ওনার ঘাড়েই দায়িত্বটা চাপিয়ে দিয়েছে। তিনি পুরোন জামা কাপড়ের বাক্সের দুটো করে কার্ডবোর্ড কেটে তার মধ্যে গোল ফুটো করে ক্যান্ডল হোল্ডার বানাচ্ছেন।এত তাড়াতাড়ি কেউ দেবে না ফ্লেক্স বানিয়ে।তাই অ্যাসোসিয়েশনের একটা ফ্লেক্সের পিছনে রঙ তুলি দিয়ে লিখছে ওরা।অপটু হাত। সময় লাগছে। মিনিটে মিনিটঃ হোয়াটস্অ্যাপে আপডেট আসছে, কদ্দূর এগোল।কী প্রবল উৎসাহ! সন্ধ্যা সাড়ে ছটা । সবাই এসে গেছে। সৌগত বাড়ি এলো কালো টী-শার্ট পরতে।
“এ কী ,তুমি ঘুমাচ্ছ? ওঠো, চলো। এই তো কালো ড্রেস ই পরা আছে।”
অরুণিমা মুখ ধুয়ে বাইকে উঠে বসে।পরনে কালো একটা নী লেংথ ড্রেস।গিয়েই শোনে শচীন বাবু চেঁচাচ্ছেন, “মেয়েরা একটা লাইন কর, ছেলেরা একটা লাইন।”
” বাহ্ , বিভাজনের শুরু।দেখি আর কী হয়?” মনে মনে বলে অরুণিমা।দাঁড়িয়ে পড়ে সুরমা কাকীমার পিছনে।
” দেখ, কী পরে এসেছে? কেন, এরকম একটা কিছুতে শাড়ি পরে আসতে পারত না?” বলে রূপাঞ্জনা ঈশিতার কানে কানে।
অরুণিমা ভাবলেশহীন দাঁড়িয়ে থাকে।
প্রতিমা কাকীমা বলেন, “উফ্, আর কতক্ষণ দাঁড়াতে হবে? সিরিয়াল ছেড়ে এসেছি।”
সবাই হেসে উঠলে বলেন, ” হাসার কী আছে? আমার বাপু স্পষ্ট কথা।”
সচীনবাবু আবার চেঁচান, ” মনে রাখবেন , এটা কিন্তু মৌন মিছিল, আপনারা কিন্তু কথা বলবেন না।নিন হাঁটতে শুরু করুন। মিছিল প্রথমে ডানদিক দিয়ে গিয়ে বাঁ দিক ঘুরে সামনের গলি নেবে।”
পিছন থেকে ব্রজেন বাবু বলেন,” প্রথমে বাঁদিক দিয়ে সোজা গিয়ে ডানদিক ঘুরুন।” অর্ধেক মিছিল ডানদিকে, অর্ধেক মিছিল বাঁ দিকে ঘুরতে শুরু করে। শোরগোল বেঁধে যায়। ব্রজেন বাবু বলেন ,” আমি সেক্রেটারি, আমি বলছি ডানদিকেই যাবে।”
সচীনবাবু বলেন, ” আমি প্রেসিডেন্ট, আমি বলছি বাঁদিকেই যাবে।সুকান্ত আর সৌগত দুজনকেই নিরস্ত করে ।আর ওরা লিড করে চলতে থাকে।সবাই পিছু নেয়।ছবি তোলা চলছে, কেউ কেউ এগিয়ে গিয়ে মিছিলের ভিডিও করছেন । কে একজন বলে “আজকের দেশ চ্যানেলের হোয়াটস্অ্যাপ গ্রুপে দিয়ে দে।”
মৌনমিছিল চলছে। বেশিরভাগ মহিলা সাদা শাড়ি পরেছেন, সঙ্গে মানানসই গয়না।দুজন সাদা কুর্তা পরেছে।ওড়নাগুলো ডিজাইনার।বেশ বাহারি লাগছে।কালো বা সাদা ছিল ড্রেসকোড।
” ছবি তোলা হচ্ছে, মোমবাতিগুলো উঁচু করে ধরো”, বলেন সুনীতি দা। সবাই তাকালে হেঁ হেঁ করে হাসার চেষ্টা করেন।জয়তীদি দাঁড়িয়ে আছেন নিজের বাড়ির গেটে। মঞ্জু ডাকে, ” এসো জয়েন করো।”
জয়তীদি ফিসফিস করে বলে,” আমার শরীর খারাপ হয়েছে রে, যাওয়াটা ঠিক হবেনা।”
” পিরিয়ড হয়েছে,তো কী?”
“আফটার অল, মৃত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, থাক্, আমাকে ছেড়ে দে।”
সুকান্ত এসে অরুণিমাকে চুপিচুপি বলে, “এটা নিয়ে, তুই কী সব লিখিস না, ধীর পায়ে, শিহরণ জাগিয়ে…ওরকম একটা কিছু লিখে দিস।”
মোমবাতি মিছিল এগোয়। তিন গলি চক্কর দিয়ে ক্লাবের মাঠে এসে সবাই দাঁড়ায়।পুজোর হোমকুন্ডতে বালি ভরাই ছিল।ওটা মাঝখানে রেখে সবাইকে বলা হয়, মোমবাতিগুলো রাখতে।
” গোলটা একটু বড় করুন, বড় করুন” চেঁচাতে থাকেন ব্রজেনবাবু।
” আমরা আজ সারদাপার্কবাসী, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের উদ্যোগে যে অনুষ্ঠানটি করলাম, তা এক কথায় ঐতিহাসিক। সারদাপার্কে এমন অনুষ্ঠান এই প্রথম। আপনাদেরকে অনেক ধন্যবাদ।সুকান্ত, সৌগত আমরা এবার যেতে পারি?” বলেন ব্রজেন।
সুকান্ত এগিয়ে এসে ফ্লেক্স আর পোস্টার ধরে সবাইকে মোমবাতি রাখা হোমকুন্ডর পাশে দাঁড় করায়।তারপরে টপাটপ অনেক ছবি ওঠে।
এবার সুকান্ত বলে, ” আমরা একমিনিট নীরবতা পালন করব।” টাইম কিপার হতে চায় তিনজন।তারপর সৌগতই স্টপ ওয়াচ অন করবে ঠিক হয়।পাশ থেকে হেঁটে যায় সরল কুন্ডু আর সমীর দাস। ওরা মিছিলে হাঁটেনি। ওরা আজ সকালে একটা সাফাই অভিযানের ডাক দিয়েছিল হোয়াটস্অ্যাপে, কেউ হাত তোলেনি।তাই ওরাও এটার থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখেছে।চালু হল স্টপ ওয়াচ। পনের সেকেন্ডের মাথায় জয়ন্তদার মোবাইলে বেজে উঠল ” হাই হিল পে নাচে।”
” এটা নাকি রিংটোন! কী কাণ্ডজ্ঞানহীন!নীরবতা পালনের মধ্যে মোবাইল বাজে কী করে?” চেঁচিয়ে ওঠেন অঞ্জনা কাকীমা।
দুজন তার সমর্থনে চেঁচান,” ঠিক বলেছেন কাকীমা, জয়ন্তদা র কোন সেন্স নেই।”
আরো দশজন চেঁচাতে থাকেন, ” আস্তে।আস্তে। নীরবতা পালন হচ্ছে।”
অগত্যা নতুন করে স্টপ ওয়াচ চালু। এবার কোন বিপত্তি ঘটেনি।
সবার থেকে ক্যান্ডল হোল্ডার কালেক্ট করে নেন জয়ন্তদা। “আমি কষ্ট করে বানিয়েছি, আর তোমরা বাড়ি নিয়ে যাবে, তা হবেনা।”
সবাই ক্যান্ডল হোল্ডার ফেরত দেয় জয়ন্তদাকে।
” এই সুকান্ত, বাকী মোমবাতিগুলো রেখে দাও, আবার যদি কোন হামলা হয়, উৎসবের জন্য বাঁচিয়ে রাখা উচিত।”
কে বলল অরুণিমা আর তাকায়না। বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত