ভাসান

 

খবরটা হঠাৎ করেই এলো। একটা খবর আসারই ছিলো। এলোও কিন্তু এলোমেলো হয়ে। হাওড়ার বাগনানের  মিত্তির পাড়ায়  এলো খবরটা।বাগনান স্টেশন থেকে মিত্তির পাড়া মোটে  মাইল দুয়েক হবে, কিন্তু জায়গাটায় পৌঁছলে মনে হবে যেন শহর থেকে অনেক অনেক দূরে। মাঠ  আর পুকুরের ছড়াছড়ি জায়গাটায়।

দুটো পুকুরের মধ্যে সাঁকো পথ ধরে অনেক বাড়ি।বর্ষায় রীতিমত ভয় ধরে পথিকের। ঝোপ ঝাড়  সর্বত্র। বাঁশবন, হোগলা বন পুকুরের ধারে  ধারে।  আর আছে বড়  শর বন। দেড় মানুষ উঁচু মাথা। মিত্তিরপাড়ায় আছে এক চন্ডী মণ্ডপ। ফি বছর সেখানে মা দুর্গার আরাধনা হয়। 

কিন্তু প্রতিবারই  পুজো আসার আগে  গোটা  মিত্তির পাড়ার  বুক ধক ধক  করে ওঠে। এই বোধহয় কেউ গেলো আর পুজোটাও সাথে সাথে গেলো। কেউ মারা গেলেই অশৌচ। না পরা  যাবে নতুন জামা আর না পাতে পড়বে  নবমীর দিন পাঁঠার মাংস। সারা বছর মানুষ গুলো বসে থাকে পুজোর দিন কটির  জন্যে। গ্রামের মিত্তিররা মোটামুটি নিম্ন বা মাঝারি মধ্যবিত্ত।   পুজো তাদের কাছে সত্যি উৎসব আর তাই ভয়ে ভয়ে থাকে আর মা দুগ্গার কাছে প্রার্থনা করে, মা গো, যদি তুলে নেবে কদিন আগে বা কদিন পরে নাও মা পুজোটা বাঁচাও মা।এত্ত বড় গুষ্টি। পাড়াতেই নয় নয় করে বিশ  ঘর মিত্তির, তার পর মিত্তির বটবৃক্ষ যে কত দূর পর্যন্ত ঝুরি নামিয়েছে, তা বোধহয় কারোরই জানা নেই।  কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে কেউ পরলোকে যাবার খবরটা  খবরের কাগজ আসার আগেই পৌঁছে যায়।

পাড়ার যে সবচেয়ে বুড়ি ঠাকুমা মোক্ষদা ঠাকরুণ, তিনি বলেন মরার খবর কাগে আনে। প্রতিবারই পুজোর আগে হঠাৎ করে মোক্ষদার খোঁজ খবর করার লোক বেড়ে যায়। তিনি বোঝেন কেন, অপরাধ বোধেও ভোগেন। সুস্থ  থাকার চেষ্টাও করেন।  কিন্তু টিপ্পুনি কাটতে ছাড়েন না!

কি লা! দেখতে এসেছিস বুড়ির শ্বাস  উঠছে কিনা তাই না? ওঠেনি রে এখনো।  এই বেলা বরকে পটিয়ে ভালো শাড়িটা কিনে নে  বুঝলি! নয়তো ফাঁকি যাবে!

কখন ও আবার কাব্যি করে উদাস ভঙ্গিতে বলেন, খাঁচার মধ্যে অচিন পাখি ঢুকে পড়েছে কবে তা  যেমন জানি না, তেমনি  আবার ফাঁকি দিয়ে প্রাণের পাখি কবে উড়ে যাবে তাও জানা নেই রে।

বলেন,  এতদিন বেঁচে থাকা মানে  তো পরিবারের লোকেদের হাড়  মাস কালি করা। ছিলুম বৌ, তারপর হলুম শাশুড়ি, তারপর দিদিশাশুড়ি। নাতিদের ছেলেদের  বৌ আনার সময় হলো। আর কত দেখবো? সামনে না বললেও আড়ালে সব্বাই বলে, বুড়ির এবার যাওয়াই  ভালো।  ঠাকুরকেও বলি তোলো ঠাকুর। আর  বলি তুলে নেবে যখন, একটু সময়  বুঝে তুলো ঠাকুর। মরে  যাবার পর ও যেন গাল না খাই।  লোকে যেন না বলে বুড়িটা আর মরার সময় পেলো না!তবে বয়েস নব্বুই পেরোলেও এখনো  চলা ফেরা সবই করতে পারেন।  চোখে বেশ কম দেখেন, কিন্তু কান এখনো ঠিকঠাক কাজ করছে। সন্ধ্যেবেলা টিভি দেখেন। দেখেন যত না শোনেন বেশি।

এখন  বেশ কয়েক বছর ধরে একই ধারা চলেছে।বর্ষাকালে বৃষ্টিৰ নাম নেই। বাদলধারা সারা হবার যে  সময় নিয়মমত, মানে ওই শরৎকাল, তখন  সব বৃষ্টি এসে জুটছে।

পুজোর আর মাত্র দুদিন বাকি। কাল রাত  পোহালে পঞ্চমী। বেল তলায় বোধন।  পাঁচদিন টানা বৃষ্টি হবার পর কাল থেকে বৃষ্টি একটু ধরেছে। আর আজ একটু রোদ্দুরের মুখ দেখা গেলো।

ক’দিনের কাচা  কাপড় চোপড় সব ঘরে শুকিয়েছে। শুকনো হলেও কেমন যেন স্যাঁতসেঁতে গন্ধ সবগুলোতে। মোক্ষদা ঠাকরুণ আজ সে সব  জামা কাপড় রোদে দিয়েছেন।  নাত  বৌদের আর বাড়ির কাজের লোকেদের দিয়ে। নিজেও  উল্টে পাল্টে দিয়েছেন কিছু।

সন্ধ্যে নেমে আসছে। বেলা ছোট হয়ে আসছে।ঝোপে ঝাড়ে  গাঢ় অন্ধকার।  জামাকাপড় সব তোলাও হয়ে গেছে। বৌ ঝিরা যে যার ঘরে এখন সন্ধ্যে দিচ্ছে, চুল টুল বাঁধছে।হঠাৎ মোক্ষদার  মনে হল তাঁর কাঁথা টা তোলা হয় নি।

বাড়ির পেছন দিকটা পশ্চিম দিক। একটা ছোট ফালি মাঠ। তারপরই জঙ্গল। পেছনদিকে দিয়ে একটা রাস্তা আছে বটে, তবে রাতের দিকে সচরাচর  সে দিকটা কেউ যায় না। অনেক সময় পেছনের পাড়ার কেউ কেউ দুধ, ডিম বিক্রি করার জন্যে ওই পথটা ব্যবহার করে। পেছনের মাঠের এক কোণে এক ফালি রোদ  ছিল অনেকক্ষণ। গায়ের কাঁথা খান একটু গরম করার লোভে রেখে দিয়েছিলেন, তারপর ভুলে গেছেন। পেছনে বলে  বাড়ির  বাকিদের চোখেও পড়ে  নি কাঁথাটা। আবছা আবছা অন্ধকার হয়ে আসছে। মোক্ষদা একবার ভাবলেন কাউকে ডেকে বলবেন কাঁথাটা তুলে আনার কথা।   কাছে পিঠে কেউ নেই। এরপর আনলে সেই ঠান্ডাই  হয়ে যাবে কাঁথা খান। শীতের আমেজ একটু একটু বাতাসে যেন কদিন বৃষ্টির পর। আবার ওদিকে ওনার রানী রাসমণি দেখার ও সময় হয়ে আসছে। তাই সাতপাঁচ ভেবে নিজেই তুলতে গেলেন কাঁথাটা। 

কাঁথাটা  তুলে আনার সময় হঠাৎ যেন মনে হলো ঝোপের আড়ালে  কে সরে গেলো। তারপর আরো একজন। চোখে ভালো দেখেন না এমনিতেই। তারপর সন্ধ্যের কালো ছায়া  ঘনিয়ে আসছে। ভাবলেন চোখের ভুল।  তারপরই কানে এলো একটা তীক্ষ্ণ স্বর। কে যেন কাতরাচ্ছে। চিৎকার করে উঠলেন মোক্ষদা!

কে? কে?

আরে ওই ঘাটের মড়া বুড়িটা এখন কোত্থেকে এলো? গলাটা চেনা চেনা না! হ্যাঁ, এতো তাঁরই নাতনির ছেলে বাপনের  গলা! কয়েকটা পাড়ার পর থাকে ওরা।  প্রায়ই আসে।

দিদা বাঁচাও! টুসির গলা। গোপালের বোন! তাঁদের বাড়ি ঘর মোছে মেয়েটা! সে ওখানে কেন? তবে কি?

বাপন  তোকে আমি চিনেছি! তারস্বরে চেঁচালেন মোক্ষদা।  কি করছিস তোরা? টুসি? ও টুসি? কে কোথায় আছো গো শিগগির এস। সব্বোনাশ হয়ে…।

কথাটা শেষ হবার আগেই পেটে  বসে গেলো ধারলো ছুরি। বেরিয়ে এলো একটা জোরালো আর্তনাদ।

গোলমাল শুনে   বাড়ির সবাই প্রায় ছুটে এসেছে পেছনের বাগানে। মোক্ষদা পড়ে  গেছেন  মাটিতে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারদিক।  জ্ঞান হারাননি কিন্তু।বলে চলেছেন শুধু  টুসিকে বাঁচা ! টুসিকে বাঁচা! বাপন, বাপন!

পঞ্চমীর ভোরেই খবরটা এলো। হাসপাতালে পৌঁছোনো অবধি বেঁচেই ছিলেন। তবে একে  এতো  বয়েস, তারপর এতো রক্তক্ষয়, তাই আর শেষ পর্যন্ত ঝুঝতে পারলেন না।পুজোর সময়েই  গেলেন। সারা মিত্তির পাড়া প্রায় ভেঙে পড়লো শ্মশানে।  আর টুসিদের পুরো পাড়া। চোখের জলে বিদায় দিলো সবাই মোক্ষদাকে। পঞ্চমীর রাতেই যেন দেবীর ভাসান হয়ে গেলো।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত