ভাষা রঙ্গ

Reading Time: 3 minutes

নিজের এবং আশপাশের মানুষের শরীরের উপরে ছোটোখাটো ডাক্তারি মাতবরি আমরা অনেকেই করি। যখন প্যারাসিটামল, ওমিপ্রাজলে আর কুলোয় না তখন ডাক্তারের কাছে যেতেই হয়। একটু আধটু বুক ব্যথা, কোমর ব্যথা পিঠ ব্যথা— এসব আমরা আমূলে নিই না।

কিন্তু ব্যথা যখন বেদনাতে উত্তীর্ণ হয় তখন মানতেই হয় শরীরও নিয়ম মেনে চলে। চন্দ্র সূর্য মেঘ বৃষ্টিরও বিধান আছে। সবই বিধানে বাঁধা। জল তার নিজের বেগেই চলে, ভাষাও তাই। জলেরও পথ থাকে। সে পথের বাইরে গেলেই ডোবা নালায় আটকে যায়। ভাষাও গতিময়; কিন্তু ওরও একটা ধারা আছে। মূল ধারা থেকে এক আধ খাবলা জল তুলে নিয়ে আমরা যেমন খুশি ব্যবহার করতে পারি; তাতে ভাত তরকারি রান্না করা যায়; কিন্তু সে জলে নতুন জলাশয় হয় না।

নদীরও শাখা সন্তান থাকে। কিন্তু মূলে ওই একই উৎস। বাংলাভাষাও তাই। যুগে যুগে ত্যাগী সাধক ভাষা প্রেমীদের সাধনায় বাংলাভাষা পরিণত হয়ে উঠেছে। এই ভাষার আত্মীয়স্বজনই আঞ্চলিক ভাষা। শরীরের উপরে গোয়ার্তুমি করলে অকালে ঝরে যেতে হয়; ভাষার উপরে গোঁয়ার্তুমি করলে সৃজনশীল রচনা প্রতিভার আলো অচিরেই নিভে যায়। নতুন শিং দিয়ে গুঁতোগুঁতি করতে বেশ মজাই লাগে; কিন্তু কচি শিং ভেঙে গেলে পরে আর সুস্থ শিং গজায় না। নতুন নতুন লিখতে এসে আমরা অনেকেই একটু লাফালাফি ফালাফালি করি; এর একটা ভালো দিক আছে; লম্ফঝম্ফ কারীরা ঘেমোঘ্যানা হয়ে মাঠ থেকে দ্রুত বেরিয়ে গিয়ে আর ফিরে আসে না।

আঞ্চলিক ভাষা বাংলাভাষার বড়ো সম্পদ। কিন্তু তা কখনোই সম্পূর্ণ নয়। মান ভাষার সঙ্গে অঞ্চলের চরিত্র মুখের সংলাপে ঠিক ঠিক বর্ণে গন্ধে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করতে পারলে বিশ্বাসযোগ্য বাস্তব নিষ্ঠ সৃজনশীল সাহিত্য সৃষ্টি হতে পারে। আমরা কেন ভুলে যাই মানিক বন্দোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আবু ইসহাক, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে।

নিরন্তর চেষ্টায় লেখকের নিজস্ব একটা ভাষাভঙ্গি তৈরি হয়ে যায়; কিন্তু লেখক নিজেই সম্পূর্ণ নতুন একটা ভাষা তৈরি করেন না। যাঁরা ভাষার ব্যাকরণকেই বাদ দিতে চাইছেন; কিংবা ভূতপূর্বদের ভাষারীতি মানতে পারছেন না তাঁরা আসলে অলস এবং জ্ঞান বিমুখ প্রতিভাবুদবুদ বিড়িসুখমুখ কবি লেখক। এঁরা খেতের আইলে বসে পরিশ্রমী সৃজনশীল চাষীদের সঙ্গে বিড়িসঙ্গসুখ পান করে কাজ না করে পালিয়ে গিয়ে ছায়াতলে শুয়ে আকাশ দেখে; কিন্তু কবে বৃষ্টি হতে পারে সেই সম্ভাবনাও গণনা করে না।

আজকাল বাংলাভাষার মধ্যে মোটা একটা নতুন দাগ কাটার চেষ্টাও চলছে। ওই বাংলা এই বাংলার ভাষা আলাদা। এখানে মূল ওখানে হুল, এখানে ফুল ওখানে ভুল, এখানে চুল ওখানে কূল— এমন একটা ভাব ভাবনা বেশ স্পষ্ট করার চেষ্টা চলছে।

ভূগোলই একই ভাষাকে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ গন্ধ দিয়ে দেয়। পশ্চিমবঙ্গের বাংলা আর বাংলাদেশের বাংলা তো এক নয় কখনো; কখনো ছিল না। শুধু ভাষায় কেন; চেহারাতেও অমিল বেমিল; স্বাদে গন্ধে আলাদাই ছিল বরাবর। কোলকাতার মানুষ চায়ে চিনি কম খান, কিন্তু রুই মাছের তরকারিতে চিনি না দিলে তাঁদের চলে না। বাংলাদেশে চায়ে গুড় চিনি লবঙ্গ এলাচ সবই চলে; আর মাছের ঝোল যদি ঝালই না-হল তো ওটা কিছু হল? বাংলার ভিন্নতাই সৌন্দর্য; এই সৌন্দর্য আজ নতুন দাগদুগ লাগানোর কিছু নেই। দুই বাংলার ভাষা মূলে একই; মানুষের চরিত্রদোষগুণও এক; কিন্তু শারীরিক এবং মৌখিক রঙে ঢঙে সব সময়ই ভিন্ন ভিন্ন।

শুধু বাংলা বাঙালিদের নিয়েই এই বিভিন্নতার বিত্তান্ত নয়। ফরাসি ইংরেজি স্প্যানিশ ভাষা নিয়েও একই সমাচার। ফ্রান্সের ফরাসি আর কানাডার ফরাসি হবহু এক নয় তো। বেলজিয়ামেও ফরাসি চলে, কিন্তু সেই ভাষার ধরন বরন তো একটু ভিন্ন। আমেরিকার ইংরেজি আর ব্রিটিশ ইংরেজি তো ব্যাপক আলাদা। দক্ষিণ আমেরিকার স্প্যানিশ আর স্পেনের স্প্যানিশ হুবহু এক নয়। স্পেনের কবিতা গান দারুণ ভালো, কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার গদ্য ভালো; যেখানে যার যেটুকু ভালো সেটুকু নিতে পারলেই নিজের আলো উদ্ভাসিত হয়। যিনি সৃজন করে কিছু দিতে চান; তাকে আগে উদারভাবে নিতে হয়, নেওয়াটাও শিখতে হয়। নিতে না জানলে দেওয়াটাও ভালো হয় না।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>