অরণ্যের স্পর্শ আজ আমাদের শিহরিত করেছে

আজ বসন্ত নেমেছে দূর সিংভূমে, মানভূমে। সারান্ডা, পালামৌ আর শিমলিপালের পাহাড়-জঙ্গলে। কত বছর আগে এমনই একদিন থলকোবাদে, জঙ্গলের গভীরে দাঁড়িয়েছিল আমাদের জীপ। সন্ধ্যায় আকাশ শিহরিত করে চাঁদ উঠলে, আমরা  জীপ নিয়ে জঙ্গলের গভীরে গিয়ে ঝরাপাতার ওপরে নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলাম। -তখন আমি কর্মজীবনে জামসেদপুরে। বয়স চৌত্রিশ। মাঝে মাঝে পাহাড়-জঙ্গলের ডাকে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়তাম। যেকোনও দিকে গাড়ি নিয়ে মিনিট পনেরো গেলেই শাল-সেগুন-পলাশ-মহুয়া, পাহাড়ি বাঁকে ছোট্ট ডুলুং, কলস্বিনী স্রোতা।

কিন্তু হায়, কলকাতায় বসন্ত চিরিদিনই কেন এত কুন্ঠিত ! ছেলেবেলায় যখন উত্তর কলকাতায় দমদমে থাকতাম, তখন বসন্ত আসতো কি ? কে জানে ! তবে মনে পড়ে, পাড়ার গলিতে গলিতে রঙ মেখে হুড়োহুড়ি। নিম আর অশ্বত্থ গাছের ডালে ডালে নতুন তামা রঙের পাতা। বট গাছের ভারী পাতা শুকিয়ে পড়ে আছে মাটিতে। শেঠ লেন আর সেভেন ট্যাংক্স লেনের আমগাছে কোকিলও ডাকতো কখনো। জুটমিল, কাগজের কল, রেল কলোনী আর পুলিশ ব্যারাকের নোংরা বাড়িগুলোয়, টিন আর টালির চালের ভেতরে হাঁপ ধরা অন্ধকারেও আলতার শিশি আর সিঁদুর কৌটোয় নির্বাক বসন্ত আসতো বাঁকা বিভঙ্গে, রিকেটি শরীরে জ্বর হয়ে ; বসন্ত জ্বর। আজ কলকাতায় দোলের দিনে যখন বন্ধ কাচের জানালা ভেদ করেও কানে আসছে দেড় হাজার ওয়াটের ডিজের সেই গান- ‘রঙ বরষে, ভিগে…’ তখন মনে হচ্ছে এর চেয়ে পাহাড় জঙ্গল অনেক ভালো। এবং মাঝে মাঝে জঙ্গলে ক্যাম্প পাতা নয়, বরাবরের জন্যই। এখন মনে হয় পাহাড়ি ঝর্নার পাশেই আমাকে ভালো মানায়। আমি কি তবে ক্রমশঃ তরুণ হয়ে উঠছি, থলকোবাদের শালজঙ্গলে দেখা সেই ‘হো’ বালকের মতো ?      
        

সিংভূমের পাহাড় নদী শাল-মহুলের জঙ্গল, -এই ছিল আমাদের কবিতার রম্যভূমি জামশেদপুরের অদূরেই অপেক্ষায় সজ্জিত হ’য়ে আছে তারা ; পালামৌ, সারান্ডা, চাইবাসা, রাজখরসোয়ান, কিরিবুরু, বাদামপাহাড় সেটা ১৯৮৮ সাল, কৌরবের আমরা সেবার থলকোবাদে কয়েকটা দিন একসাথে কাটাবো বলে বেরিয়েছি। সঙ্গে দীপক চ্যাটার্জী এবং বারীন ঘোষাল। কমলদা (চক্রবর্তী) বললো- সুশ্বেতাও যেতে চাইছে, চলুক। কিন্তু কম্যুনিকেশানের গন্ডগোলে সেবার স্বদেশদাই (সেন) ট্রেন ধরতে পারলেন না। আমার খুব মন খারাপ হয়ে গেছিল, সারাক্ষণ সারাদিনতবে জঙ্গলের মতো, বিশেষতঃ সারান্ডার গভীরের ওইসব স্বর্গীয় অরণ্যাঞ্চল, ওখানে কি মন খারাপ করে থাকা যায় ? -‘অরণ্যের স্পর্শ আজ আমাদের শিহরিত করেছে’ ! আমার ডায়েরীর পাতায় আছে আমারই হাতে-আঁকা সেসময়ে সারান্ডা ভ্রমণের রুটম্যাপ।     

তো, ট্রেনে বড়জামদা স্টেশানে নেমে, রাত কাটিয়ে, পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট ক’রে আমরা জীপের খোঁজে। ক্রমে চালডাল, তেলনুন, চিনিকফি, জিরেহলুদ, লেবুলঙ্কা, আলুপেঁয়াজ, সিগারেটহুইস্কি। ফোর-হুইল জীপে সেই সব লোড করার পরে আমরা পাঁচজন। কমল-সুশ্বেতা-বারীন-দীপক আর আমি। ডানদিকে গুয়া যাওয়ার রাস্তা ছেড়ে কারো-নদীর ব্রিজ পার হয়ে আমরা এগিয়ে গিয়েছিলাম। বাঁদিকে পড়ে রইলো বরাইবুরু নামক সেই দেবভূমি যেখানে আমাদের শেষ কবিতার ক্যাম্প হয়েছিলএইসব জঙ্গল পাহাড় লোহার খনি-অঞ্চল। জীপের চাকায় লাল মাটির ধূলো উড়িয়ে চেকনাকা থেকে ডানদিকে আমরা শিকারী রোড ধরেছিলাম। তীব্র খাদের পাশ দিয়ে পাহাড়ি রাস্তা, -কাছে দূরে অজস্র পলাশ ফুটেছে। টন্টো-নালা পেরিয়ে এই ভয়ংকর সুন্দর ডার্ট রোডে যারা কখনো যাননি তাঁরা দুর্ভাগা ; ওই সতত চঞ্চল আরণ্যক সুন্দরের গহনকে দেখা তাঁদের বাকী রয়ে গেছে।  

আমরা প্রথম রাত কাটিয়েছিলাম করমপদা-য় ফরেস্ট বাংলোয়। কবিতা নিয়ে কোনও কথা হয়নি। মদ ছিল, ঝিঁঝিঁর ডাক ছিল, আর চৌকিদারের হাতে বানানো গরম তাওয়া-রুটি, আলুর দম, মুরগীর মির্চি-ঝোল, পেঁয়াজ আর শসার স্যালাড। পরের দিন কুমডি-নদী পেরিয়ে আমরা থলকোবাদে। ছিলাম ফরেস্ট রেস্ট-হাউসে। প্রাচীন বাংলো।  ড্রয়িং রুমের মাথায় এক দেওয়াল থেকে আরেক দেওয়াল অব্দি মোটা ক্যাম্বিশের বিশালকায় হাতে-টানা পাখা। তখন বসন্তকাল, সারা রাত কোকিল ডাকছে, শুকনো পাতা ঝরে পড়ছে অবিরাম। বিকেলে দূরের পাহাড়ে হঠাৎ বৃংহণ শুনে আমরা ড্রাইভারকে ডেকে নিয়ে লাফিয়ে জীপে চড়েছি। ওখান থেকে কাছেই, বাঁদিকের পথ ধরে গেলে টেবো ওয়াটার ফল্‌স। আর ডান দিকের পথে পড়বে লিগিরদা ওয়াচ-টাওয়ার। আমার প্রস্তাবমতো, সন্ধ্যায় আকাশ শিহরিত করে চাঁদ উঠলে, আমরা  জীপ নিয়ে জঙ্গলের গভীরে একটা ক্লিয়ারিঙয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে গাড়ির হেড লাইট নিভিয়ে ঝরা পাতার ওপরে সমবেত নির্বাক দাঁড়িয়ে রইলাম পাঁচ-সাত মিনিট। কথা বলতে সবাইকে নিষেধ করা ছিল।

ঐ জঙ্গলেই পরদিন সকালে তির-ধনুক হাতে হো-জনজাতির সেই রাখাল বালকটির সাথে আলাপ হয়, যার কথা আমি অন্যত্র লিখেছি। তার নাম বলেছিল, গুমহিদেও হোনহাগা। আজও মনে আছে। আমি জিগ্যেস করায় সে বলেছিল, ‘কি অপরূপ পাহাড় জঙ্গল !’- এটা ওদের হো-ভাষায় অনুবাদ করলে বলতে হবে ‘ইশুভুকিন বুরু !’  

সেদিন বাংলোয় ফিরে, রাতে, বারীনদার অনুরোধে আমাকে পড়ে শোনাতে হয়েছিল আমার ‘মুখার্জী কুসুম’ সিরিজ থেকে আঠারোটা কবিতা। বারীনদা উচ্ছ্বসিত, বললো, আমি ‘মুখার্জী কুসুম’ নিয়ে প্রবন্ধ লিখবো। কিন্তু তখন আমার মাথায় একটা আরণ্যক কবিতা-সিরিজ লেখার কুয়াশা-জলবাস্প-মেঘ ঘনিয়ে উঠছে। ফিরে এসেই লিখেছিলাম থলকোবাদ-সিরিজের কবিতাগুলো।    

“অরণ্যের স্পর্শ আজ আমাদের শিহরিত করেছে।
জ্যোৎস্নায় দ্বিতীয় গিয়ারে
                       ওঠে চাঁদ, চাঁদ ভেঙ্গে পড়ে ;
কে যেন ডেকেছে আজ আমাদের,  
শিকারী রোডের গেট আহ্বানে খুলেছে সহসা,
যেন কে ডেকেছে আজ আমাদের ;
                    -দৈব দাবানল নিয়ে এইমাত্র খেলা শুরু হোল”।…         

 



ছবিতে জঙ্গলের রুটম্যাপ :   ১ বড়জামদা রেল স্টেশান / ২ বরাইবুরু বনবাংলো / ৩ শিকারী রোডের চেক-নাকা / ৪ টন্টো নালা / ৫ কুমডি বনবাংলো / ৬ কুমডি নদী / ৭ থলকোবাদ বনবাংলো / ৮ সদ্যমৃত হাতির গোর / ৯ লিগিরদা ওয়াচ-টাওয়ার / ১০ টোয়েবো ওয়াটার-ফল্‌স / ১১ আকরিক লোহার ওভারহেড কনভেয়র / ১২ করমপদা বনবাংলো।     

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত