অর্ধশতকেরও বেশি সময় আগে আত্মহত্যা করেন ইংরেজিভাষার প্রখ্যাত কবি ভার্জিনিয়া উলফ। তার মৃত্যুও কাব্যিক ব্যঞ্জনার। নিজের ওভারকোটের পকেটে নুড়ি পাথর বোঝাই করে হেঁটে নেমে গিয়েছিলেন খরস্রোতা পাথুরে নদীতে। আর কোনদিন ফিরে আসেননি।
এ্যাডেলাইন ভার্জিনিয়া উলফের জন্ম ১৮৪২ সালে। ঊনিশ শতকে মডার্নিজম চর্চাকারী ব্রিটিশ লেখকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়কালে তিনি লন্ডর লিটারেসি সোসাইটি এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা হল, মিসেস ডাল্লাওয়ে (১৯২৫), টু দ্যা লাইটহাউজ (১৯২৭), ওরলান্ডো (১৯২৮)। ভার্জিনিয়ার বিখ্যাত উক্তি ‘নারী যখন ফিকশন লেখে তখন তার একটি কক্ষ আর কিছু অর্থ খুব প্রয়োজন।’ ৫৯ বছরের জীবনে উলফ বেশ কয়েকবার মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন উলফ। তার রোগের নাম ছিল ডিপোলার ডিজঅর্ডার। তিনি ১৯৪১ সালের ২৮ মার্চ আত্মহত্যা করেন।
শেষ বিদায়ের আগে প্রিয়তম স্বামীর উদ্দেশে এক চিঠি লিখে যান ভার্জিনিয়া। চিঠিটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পড়া সুইসাইড নোটগুলোর একটি। অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ওই চিঠিটি এখনও পড়েন বিশ্বের সাহিত্যপ্রেমীরা, উলফের পাঠকরা। চিঠিতে ভার্জিনিয়া লেখেন:
কিন্তু এই চিঠিটি প্রকাশিত হওয়ার পর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম একে নিজের মত করে ব্যখ্যা করতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সমালোচনাও প্রকাশিত হতে থাকে বিভিন্ন মাধ্যমে। সে বছর ২৭ এপ্রিল দ্য সানডে টাইমসে চিঠি লিখে উলফের মৃত্যুসংবাদের প্রতিবেদনের নিন্দা জানান লিঙ্কন নামের এক বিশপের স্ত্রী। মিসেস ক্যাথলিন হিকস নামের ওই নারী লেখেন, ‘প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, মিসেস উলফ ছিলেন পাশবিকতা সম্পর্কে স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল। এমন কথা লেখার মানে কী? যারা সাহসের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে অন্যদের জন্য বেঁচে থাকছে তারা কি সংবেদনশীল নয়? আমাদের ভালোবাসা ও বিশ্বাসের ভিত্তি তাহলে কোথায়? যে বলছে আমি আর পারছি না, তার প্রতি এত সহানুভূতির মানে কী?’
তবে স্ত্রীর চিঠি পড়ে অত্যন্ত প্রভাবিত হন ভার্জিনিয়ার স্বামী লিওনার্দো উলফ। তিনি পাল্টা একটি চিঠিতে লিখে জানান, ভার্জিনিয়া মোটেও দাবি করেননি তিনি আর পারছেন না। বরং তিনি এটাই বলতে চেয়েছেন, এবার হয়তো দুজনে মিলেও এই খারাপ সময় পাড় করা যাবে না।
.
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য লিওনার্দোর এই চিঠির শিরোনামও প্রকাশের সময় পাল্টে দেওয়া হয়। এমনকি ভার্জিনিয়ার অল্প বয়সে বিষণ্ণতা ও মানসিক ভারসাম্যহীনতার খারাপ সময়কে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খারাপ সময়কে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। ডিপ্রেশনের ভয়াবহতাকে চাপিয়ে ভার্জিনিয়ার আত্মহননকে দেখানো হয় ভীরুতা ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে। পরবর্তীতে ভার্জিনিয়ার বিখ্যাত বন্ধুরা যেমন টি এস এলিয়ট, এডিথ সিটওয়েল, এলিজাবেথ বোওয়েন প্রমুখ এই সকল ভুল ব্যখ্যা সম্বলিত সংবাদ পরিবেশনের বিরুদ্ধে কলম ধরেন।
সূত্র: ব্রেইনপিকিং