| 20 এপ্রিল 2024
Categories
নারী

বিজ্ঞানের প্রথম বাঙালি নারী ডক্টরেট এই কিংবদন্তি বিজ্ঞানী

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

বাংলা তথা ভারতের গর্ব বেঙ্গল কেমিক্যাল। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের হাতে গড়া এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একবার মামলা করেছিল এক বিদেশি ওষুধ কোম্পানি। অভিযোগ, বেঙ্গল কেমিক্যাল নাকি পেটেন্ট আইন ভঙ্গ করেছে। আদালতে তখন সেই বিদেশি সংস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন প্রফুল্লচন্দ্রেরই এক স্নেহধন্যা ছাত্রী, কিংবদন্তি বিজ্ঞানী ও রসায়ন গবেষক অসীমা চট্টোপাধ্যায়। বিশেষজ্ঞ হিসেবে সংগ্রাম করে তিনি বেঙ্গল কেমিক্যালের জয় হাসিল করেছিলেন।

বিজ্ঞানী অসীমা চট্টোপাধ্যায় ভারতে জৈব-রসায়ন গবেষণার এক অগ্রদূত। আমাদের দেশে আয়ুর্বেদ চর্চার ধারা এক সময়ে অতীব সমৃদ্ধ ছিল, পরবর্তীকালে, আধুনিক যুগের শুরুতে তা যথেষ্ট অবজ্ঞার শিকার হয়। অসীমা চট্টোপাধ্যায় আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে আবার ভেষজ গাছগাছালি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন, এবং আয়ুর্বেদশাস্ত্রে নতুন গতির সঞ্চার করেন। প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহার মতো প্রবাদপ্রতীম বিজ্ঞানীরা ভারতের বিজ্ঞান সাধনার ইতিহাসে যে স্বর্ণযুগের সূচনা করেছিলেন, অসীমা চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সেই যুগেরই এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯১৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০০৬ সালের ২২ নভেম্বর ৯০ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন।

 

তখনকার দিনে আমাদের সমাজে মেয়েদের পড়াশোনার জগতে যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হত।সেযুগে উচ্চবিত্ত এলিট পরিবারগুলোতেও মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোকে খুব একটা প্রয়োজনীয় মনে করা হত না। তবে অসীমা এই দিক থেকে খানিকটা সৌভাগ্যবতী ছিলেন, কারণ তাঁর বাবা ডঃ ইন্দ্রনারায়ণ মুখোপাধ্যায় শুধু মেয়ের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেই থেকে থাকেননি, নিজের ছিল উদ্ভিদবিদ্যার প্রতি আগ্রহ, তা সংক্রামিত করেছিলেন মেয়ের মধ্যেও। বেথুন স্কুল, বেথুন কলেজের পর অসীমা যখন স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন, তখন পরিবারের অনেকেই আপত্তি করেছিলেন, কারণ, কলেজটি ছিল কো-এড। মা কমলা দেবী তখন বড়ো মেয়ে অসীমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।রসায়ন অনার্সে স্বর্ণপদক-সহ উত্তীর্ণ হয়েছিলেন অসীমা। তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে জৈব-রসায়নে স্নাতকোত্তর, ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ। তিনিই প্রথম নারী, যাঁকে কোনো ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ডক্টরেট অফ সায়েন্স উপাধি প্রদান করেন।

কর্মজীবনে তিনি লেডি বেব্রোন কলেজে রসায়ন বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব সামলেছেন। রাজাবাজারের ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ সায়েন্সের রসায়ন বিভাগেও পড়িয়েছেন তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের খয়রা অধ্যাপকের পদে ছিলেন অনেক বছর। গবেষণা করেছেন বিশ্বের নানা বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে। ভিনকা অ্যালকালয়েডের ওপর তাঁর গবেষণা তাক লাগিয়ে দিয়েছিল সারা দুনিয়ার বিজ্ঞান মহলে। এই পদার্থটি এখন কেমোথেরাপিতে ব্যবহৃত হয়। মৃগী এবং ম্যালেরিয়ার ওষুধ আবিষ্কারের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

১৯৪৫ সালে তিনি বিয়ে করেছিলেন শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যাপক বরদাচরণ চট্টোপাধ্যায়কে। এভাবে তিনি অসীমা মুখোপাধ্যায় থেকে অসীমা চট্টোপাধ্যায় হলেন। তাঁদের মেয়ে জুলি বন্দ্যোপাধ্যায়ও একজন বিজ্ঞানী।

 

১৯৬০ সালে অসীমা চট্টোপাধ্যায় ভারতীয় জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমির ফেলো নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬১ সালে তিনি লাভ করেছিলেন শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার। এটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য ভারতে সর্বোচ্চ সম্মান। বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল তাঁকে। তিনিই প্রথম মহিলা, যিনি ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন রাজ্যসভার সদস্য। এত ব্যস্ততার মধ্যেও ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের চর্চা করতেন তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘চিরঞ্জীব বনৌষধী’ বইটির তিনি সম্পাদনা করেছেন। আম জনতার কাছে ভেষজ গাছপালার উপযোগিতা তুলে ধরতে এই বইটির জুড়ি নেই।

 

 

তথ্যসূত্র – গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়, তৃষ্ণা বসাক।

কৃতজ্ঞতা: বঙ্গদর্শন

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত