Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

ঋতুপর্ণর ছবিতে জানালার দৃশ্যকল্প

Reading Time: 5 minutes  ঋভু চৌধুরী

একটা বড় জানলার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কেয়া। নীচে উৎসবের উঠোন পার হয়ে চলে যাচ্ছে অরুণ। চতুর্থীর রাতে প্রথম বারের জন্য শ্বশুরবাড়ির দুর্গাপুজোয় আসা জামাই পঞ্চমীর সকাল হতে না হতেই চলে গেল— মুখে তখনো বাসি মদের গন্ধ। মনে, স্ত্রীয়ের সাথে সদ্য হওয়া ঝগড়ার তেতো স্বাদ। যাবার আগে দোরগোড়ায় খেলা করা বাড়ির কনিষ্ঠ সদস্যের চুলে হাত বুলিয়ে গেল কী এক মায়ায়।

আর বোধহয় টিকবে না কেয়ার বিয়েটা। যদিও প্রেমের বিয়ে। আর্ট কলেজের তরুণকে ভালোবেসেছিল বনেদী বাড়ির আদরের ছোট মেয়ে। তখনও বোঝেনি সংসার শুধু প্রেম দিয়ে হয় না। দায় লাগে, দায়িত্ব লাগে, কম্প্রোমাইজ দরকার। ইঁটের বদলে পাটকেল ছুঁড়তে ছুঁড়তে আজ দু পক্ষই বিক্ষত, ক্লান্ত, অবসন্ন। অরুণের গমনপথের দিকে অসহায় তাকিয়ে থাকা কেয়ার চোখ জলে ভরে যাচ্ছে। কখন যেন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে কেয়ার দিদি পারুল। পিঠে হাত রেখেছে নিঃশব্দে। কেয়া আর সামলাতে পারে না নিজেকে। বুক ভেঙে যায় কান্নায়। গরাদহীন, খড়খড়ি খোলা জানলার বাইরে তখন শরতের আকাশ। সফেদ রোদ।

অনেকক্ষণ হল সন্ধে নেমে গেছে৷ অন্ধকার বুঝি আরো গাঢ় হয়ে ওঠে বিসর্জনের বাদ্যি থেমে গেলে। সেই সাঁঝদালানে দুর্গাপিদিম রাখতে গিয়েছে পারুল। পুজো মিটে গিয়ে বাড়িটা আবার শান্ত, জনহীন। এমন সময় গেটে গাড়ি এসে দাঁড়ায়৷ সকালেও এসেছিল একবার। বহুকাল আগের একজন আশ্রিত, যাকে একদিন তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল অন্যায় ভাবে সে আজ নিজের প্রতিপত্তির জোড়ে এ বাড়ি কিনতে চায়। সেই প্রতিপত্তির প্রতি সম্মানবশতই বুঝি আজ আবার যত্ন আত্তি পাচ্ছে মানুষটি। পুরনো অন্যায় দু পক্ষই ভুলে যেতে চায়। তবু কোথাও কাঁটা বিঁধে আছে। পারুলকে সেদিন ঘরে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। আজ পারুল নিজেকে বন্দি করে রেখেছিল ওপরতলায়। মাঝে অনেকগুলো বছর পার হয়ে গেছে৷ এখন তার ছেলে বড় হয়েছে। সেদিনের কিশোরী আজ মধ্যবয়সের দোরগোড়ায়।

গাড়ির শব্দে এগিয়ে এসে পারুল মুখোমুখি হয়ে যায় তার— যার মুখ এতোগুলো বছর ধরে ভুলতে চেয়েছে সমানে। সেই কিশোরী বয়সের প্রেম। পূর্ণতা দূরে থাক আজীবন লজ্জা আর অপমান দিয়ে গেছে যে প্রেম। আজও এই নিয়ে ফিসফিস হয় আড়ালে, পারুল বোঝে। এ বাড়িতে আসার আগে প্রতি বার স্বামীর সঙ্গে অশান্তি প্রকাশ্যেই চরম লজ্জাজনক অবস্থায় গিয়ে দাঁড়ায়। তবু এই শরত-অন্ধকারে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে প্রাক্তন প্রণয়ীযুগল। শিশির বলছে, ‘সানগ্লাসটা ফেলে গেছি’। পারুল বলছে, ‘জুতোটা খুলে ওপরে যাও একবার? আমার সাথে দেখা হয়েছে বোলো না প্লিজ।’ ভয় পাচ্ছে মেয়ে। তার মধ্যে আবার সেই কিশোরীর অভিসার-মন দেখতে পাচ্ছে ছেলেটি। দীর্ঘশ্বাস আসছে তার। বলছে, ‘তবে থাক’। আর এক দীর্ঘশ্বাস চেপে মেয়েটি বলছে, ‘থাক’। আর কথা বাড়ানো যায় কি? শিশির চলে যেতে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। বলে, ‘তোমার চা, ফ্রেঞ্চটোস্ট ভালো হয়েছিল’। মায়া মাখা একটা হাসি ফুটে ওঠে পারুলের ভয়-পাওয়া মুখে। সে হাসি হেমন্তের আকাশপ্রদীপের মতো করুণ, নিঃসঙ্গ। পারুল বলে, ‘সেটা বলতে এতদূর এলে বুঝি তেল পুড়িয়ে?’ চলে যেতে যেতে সম্মতির ঘাড় নাড়ে প্রেমিক। নিজের মধ্যেকার প্রেমিকাকে পারুল প্রাণপণে লুকিয়ে ফেলতে চায়।

আর এই অভিসার দৃশ্য ধরা থাকে গরাদহীন, খড়খড়ি-খোলা সেই বড় জানলার মধ্যে মিশে থাকা এ বাড়ির বড় বউ বনানীর গোপনীয়তায়।

অরুণ ফিরে এসেছিল দশমীর রাতে, ধুম জ্বর গা’য়। কেয়াকে তখন বনানী জোর করে নিয়ে গেছে ঠাকুরদালানে। বলেছে, ‘পাকামো করিস না, কাপড় পর, সিঁদুর কৌটো নে। বল, মা সব ঠিক করে দাও। এটুকু তো করতে পারিস। … কীসে আটকায় কীসে ভাঙে আমরা কি কিছু জানি?’ অগত্যা ম্লান মুখে বিজয়ার জল টলমল করা জগৎ জননীর কপালে সিঁদুর ঠেকাচ্ছিল কেয়া। আর সে-সময় ভিখারি শিবের মতো ঘোর নিয়ে এসে পড়েছিল অরুণ উৎসব-ফুরনো বাড়িটায়। পরদিন সকালে একটা চিঠিও এল। অরুণেরই পাঠানো। ডিভোর্সের ড্রাফট। তারপর দীর্ঘ ঝগড়া, মান-অভিমান, মন খুলে কথা। ক্ষতর আরাম। বাইরে তখন সানাই বাজাচ্ছেন বিসমিল্লাহ্‌ খান— সেই ওদের বিয়ের দিন যে রেকর্ড বেজেছিল। কথা বলতে বলতে আলো ফুটছিল দুজনের মনে। এক জায়গায় গিয়ে সহমত হচ্ছিল দম্পতি, ঠিক-ঠিক সুর চিনে নেওয়ায়।

এখন রাত। কেয়া আর অরুণের মিলনের বিছানার পাশে একটা গরাদওয়ালা বড় খড়খড়ি খোলা জানলা। তার বাইরে তুবড়ির আগুন। অন্ধকারে উৎসবের রেশ। ভাসান যাওয়া প্রতিমাদের মৃদু কলতান। আর সেই শাশ্বত উৎসব-শব্দ ও রোশনাই জন্ম-জন্ম ধরে লেপ্টে যাচ্ছে আদিম দুই নারী-পুরুষের রমণ শরীরে। সেখান থেকে জন্ম নিচ্ছে অনন্ত সহাবস্থান।

স্বপ্নে প্রায়ই একটা জানলায় গিয়ে দাঁড়ায় বনলতা। তার যে ছেলেবেলার খেলার সাথী, এই মাঝবয়স অবধি একলা বাড়িতে তার একমাত্র সঙ্গী, তাদের বাড়ির চাকর প্রসন্ন, উঠোনের কলাতলা ঘিরে গান-গাওয়া এয়োদের সাথে বিয়ের বরণডালা সামলে ঘোমটা তুলে তাকে বলে, ‘কলাগাছগুলো ভেলা করে ভাসিয়ে দিতে হবে। সাপে কাটা মরা তো।’

ঘুম ভেঙে যায় সাবেক বাড়ির লগ্নভ্রষ্টা একা মেয়েটার। তার যৌবন ফুরিয়ে গেছে। তবু তৃষ্ণা কী এত সহজে ফুরোয়! কেউ তাকে ভালোবেসে স্পর্শ করল না কখনো। কারো জন্য সে অর্ঘ্য সাজাল না ভালবাসার। কেবল প্রাসাদসম পোড়োবাড়িতে বন্দিনী রাজকন্যার মতো কেটে গেল সারাটা জীবন।

একাকীত্বের জানলায় একদিন পুরুষ এসে দাঁড়ায়। সে ফিল্মমেকার। বনলতার বাড়িটায় সে শুটিং করতে চায়। বয়সে কাছাকাছি হলেও পুরুষের যৌবন বুঝি আরো দীর্ঘস্থায়ী হয়। সে প্রাণপ্রাচুর্যে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে নিজের কাজে লেগে পড়ে। প্রসন্ন তাকে ডাকে বীর হনুমান। আর বনলতা, এই প্রথম বন্ধ গরাদের ফাঁক দিয়ে অন্যরকম এক আলোর স্পর্শ পায়। আশার স্পর্শ। কে জানে, এ হয়তো অন্য রকম এক জ্যোৎস্না, যা মনকে পুড়িয়ে দিয়ে যায়।

শুটিং শেষ হয়ে আসে একদিন। এর মাঝে পরিচালক বন্ধুতার দোহাই দিয়ে বনলতার থেকে তাদের সাবেকী বাসন, প্রদীপ, সেলাইয়ের ফুলতোলা কাজ, বাবার ছবি চেয়ে নিতে থাকে ছবির কাজে ব্যবহারের জন্য। এমনকি সঙ্কটকালে বনলতাকে দিয়ে ছবির একটা অংশে অভিনয় পর্যন্ত করায়। ছোট অংশ। তবু বন্দিনীর কাছে সে স্বল্প মুক্তি আকাশ সমান। এতদিনে বনলতা জানে পরিচালকের স্ত্রী বর্তমান, বেনারসে থাকে। ওদের মধ্যে প্রেম নেই আর। এই ছবির যে নায়িকা সেও প্রণয়ী ছিল একদা। ইন্ডাস্ট্রি-ভর্তি কানাকানি সে নিয়ে। সে-সবও ‘কাটাকাটি’ হয়ে গেছে— বনলতা তার যুবতী পরিচারিকা মালতীকে আশাব্যঞ্জক সুরে জানায়। এই যে কাজ করছে সবাই, সে শুধু কাজের প্রতি সম্মান। কে জানে হয়তো কাজটাই একমাত্র ভালোবাসা লোকটার। চলে যাওয়া ইউনিটের দিকে আবার সেই স্বপ্নের জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকে বনলতা। বাড়ি ভাড়ার টাকাটা সে নেবে না ঠিক করেছে। ওটুকু সে করবে বন্ধুতার দায়ে।

দিন কাটে, মাস কেটে যায়। সিনেমা রিলিজের খবরটুকুও কাগজে পেতে হয়। বিরহ ধাক্কা দেয় জানলায়। মফস্বলের হলে সিনেমা আসে একদিন। বিকেলের টিকিট কাটা হয়। দুপুরবেলা চিঠি আসে একটা। পরিচালক নয়, তার যে সহকারী দিদি পাতিয়েছিল সে লিখেছে। বনলতার অভিনয় করা অংশটা বাদ দিতে হয়েছে ছবির দৈর্ঘ্য বেড়ে যাওয়ায়। আর সঙ্গে পাঠিয়েছে ভাড়ার টাকা। দুটো টিকিট।

জানলার রোদ মরা মাছের চোখের মতো ঘোলাটে দেখায়। বনলতার কান্না ছাপিয়ে পুরনো আমলের পাখা ঘটঘট শব্দ করে থেমে যায়। চেকটা ছিঁড়ে ফেলে প্রেমিকা। তার জানলার গরাদগুলো কবে থেকে হিম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঠায়।

ঋতুপর্ণের সিনেমায় জানলা ফিরে এসেছে বারবার। ফিরে এসেছে কী এক বন্দিজীবনের রূপক মায়ায়। জীবনের শেষ যে দুটো ছবিতে অন্য এক উচ্চতায় পৌঁছেছিল ঋতুর চিত্রভাষ তার একটা ‘চিত্রাঙ্গদা’ অন্যটা ‘জীবন-স্মৃতি’।

রবীন্দ্রনাথের জীবন দেখাতে গিয়ে লিটারালি একটা একটা করে দরজা জানলা খুলে যায়। আর তার মধ্যে দিয়ে আমরা আবিষ্কার করি কবি-জীবন। কবি আবিষ্কার করেন সার্ধশতবর্ষ পরের জগৎ। গোটা ছবিটা কবিতা হয়ে যায়। সে মধুরের শেষ পাওয়া ভার।

আর ‘চিত্রাঙ্গদা’ ছবিটা শুরুই হয় বহুতলের এক জানলা দিয়ে। দূরে ঘন মেঘের চাদর ঢাকা শহর। বোঝা যায় মাটির থেকে অনেক দূরের এক মনলোকে। সেখানে অজ্ঞাতবাস করছে রুদ্র। সেক্স চেঞ্জ অপারেশন হবে তার। এক বন্ধন থেকে মুক্তির চৌকাঠে সে আটকে আছে এখন। তার বিছানার অন্য পাশে একটা ঘোরানো সিঁড়ির ছবি। ছবি, না সেটাও একটা জানলা বোঝা যায় না ভালো। বোঝা যায় না সেটা ওপরে ওঠার নাকি নীচে নামার। সেই দোলাচলের ঘরে মঞ্চ, জীবন, রবীন্দ্রনাথ, ঋতুপর্ণ, মহাভারত সব একাকার হয়ে যায়।

ছবির শেষ দিকে আবার একটা স্বপ্নদৃশ্য বোনেন পরিচালক। সমুদ্রপারের বাড়িতে ঢুকে প্রাক্তন প্রেমিকের দেখা পায় রুদ্র। প্রেম তাকে থেকে যাবার অনুরোধ জানায়। রুদ্র বলে, ‘না গো। বাবা মা নতুন পর্দা কিনেছে আমার ঘরটা নতুন করে সাজানোর জন্য। আমি বাড়ি যাই?’

সব জানলার পর্দা সরিয়ে, গরাদ টপকে একদিন চলে গেলেন ঋতুপর্ণ, যেমন করে সব মানুষই যায়। ঘুমের মধ্যে কোন স্বপ্নে তলিয়ে গেলেন শেষবারের মতো আমরা তার কিচ্ছুটি জানলাম না। শুধু ওর রেখে যাওয়া এক গুচ্ছ সিনেমায়, লেখায়, মননে, চিত্রভাষে আমাদের একটা একটা করে মন-জানলা খুলে যেতে থাকল স্বপ্নের মতো।

সেই গরাদ ভাসানো আলোয় কত বন্ধ মুক্তি খুঁজে পাবে।

 

     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>