আকাশ ছোঁয়ার উড়াননামাঃ ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ ফ্লোরেন্স নাইটেংগেল

নারীর বিচরণ পৃথিবীর সর্বত্র, বহু বিস্ময় জাগানিয়া কৃতিত্বের সাথে স্বর্ণাক্ষরে জড়িয়ে আছে অসংখ্য গুণী নারীর নাম। এমনই কিছু অসমসাহসী, বীরাঙ্গনা নারীর গল্প নিয়ে আমাদের এই ধারাবাহিক আয়োজন ‘আকাশ ছোঁয়ার উড়াননামা‘।আজকের পর্বে থাকছেঃ- ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ ফ্লোরেন্স নাইটেংগেল

আগের পর্ব টি পড়তে চাইলেঃ-    https://irabotee.com/women/

ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল

ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল কে বলা হয় আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত। তিনি একই সঙ্গে একজন লেখিকা এবং একজন পরিসংখ্যানবিদ।

১৮২০ সালের ১২ মে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে উইলিয়াম এডওয়ার্ড নাইটিংগেল ও ফ্রান্সিস নাইটিংগেলের ঘর আলো করে পৃথিবীতে আসেন ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। মেয়ের জন্মস্থান ফ্লোরেন্স শহরের নামানুসারে বাবা মেয়ের নাম রাখেন ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। তাঁর পরিবার ১৮২১ সালে ইংল্যান্ডে চলে আসে।

ছোটবেলা কেটেছে ইংল্যান্ডের ডার্বিশায়ায়। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন অনেক মেয়েই শিক্ষা কী তা বুঝত না। সেক্ষেত্রে ফ্লোরেন্সের ভাগ্য ছিল খুবই ভালো- তার বাবা উইলিয়াম বিশ্বাস করতেন, মেয়েদেরও শিক্ষাগ্রহণ করা উচিত। তিনি ফ্লোরেন্স ও তার বোনকে নানা বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। মেয়েদের পড়িয়েছেন বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস ও দর্শন। তিনিই প্রথম পরিসংখ্যানগত তথ্য উপস্থাপনের জন্য ডায়াগ্রামের ব্যবহার করেন।

মাত্র ১৭ বছর বয়সেই নাইটিঙ্গেল বিশ্বাস করতেন স্রষ্টা তাকে সেবিকা হওয়ার জন্যই পাঠিয়েছেন। এ কাজে আগ্রহ প্রকাশ করলে মা-বাবা রাজি হননি এই ভেবে, একজন শিক্ষিত মেয়ে হিসেবে তার যে কোনো ভালো পেশায় যাওয়া উচিত। কিন্তু আশা ছাড়েননি ফ্লোরেন্স। অবশেষে বাবা-মায়ের অনুমতি মিললে তিনি ১৮৫১ সালে নার্সের প্রশিক্ষণ নিতে উড়াল দেন জার্মানিতে। ১৮৫৫ সালে তিনি নার্স প্রশিক্ষণের জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। নিরলস প্রচেষ্টায় ১৮৫৯ সালে তিনি নাইটিঙ্গেল ফান্ডের জন্য সংগ্রহ করেন প্রায় ৪৫ হাজার পাউন্ড। ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নেও তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৮৫৯ সালে রয়্যাল স্ট্যাটিসটিক্যাল সোসাইটির প্রথম সারির সদস্য নির্বাচিত হন। লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে নার্সিংকে সম্পূর্ণ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ১৮৬০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল’ যার বর্তমান নাম ‘ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল স্কুল অব নার্সিং। ডা. এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ১৮৬৭ সালে নিউইয়র্কে চালু করেন ‘উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ’।

ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময় নার্সিংয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন তিনি। রাতের আঁধারে আহত সৈন্যদের সেবা করার জন্য ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ নামে ডাকা হয় তাকে। ১৮৮৩ সালে রানী ভিক্টোরিয়া তাকে ‘রয়েল রেডক্রস’ পদকে ভূষিত করেন। প্রথম নারী হিসেবে ‘অর্ডার অব মেরিট’ খেতাব লাভ করেন ১৯০৭ সালে। ১৯০৮ সালে লাভ করেন লন্ডন নগরীর ‘অনারারি ফ্রিডম’ উপাধি। ক্রিমীয় যুদ্ধের সময় আহত সৈন্যদের সেবার মাধ্যমে নার্সিংকে তিনি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। আর এ কারণেই তাকে ডাকা হতো ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’। যুদ্ধের পর তিনি বহু দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। নারীমুক্তির জন্যও পূর্ণমাত্রায় সোচ্চার ছিলেন। নাইটিঙ্গেলের বিশ্বাস ছিল, মানবসেবার এমন কাজে নিজেকে উৎসর্গ করার জন্য ঈশ্বরের কাছ থেকে তার ডাক এসেছে। এক্ষেত্রে মা ও বোনের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও তিনি সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। বহু মনীষী তাকে ঈশ্বরের দূত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এখন যারা এ পেশায় নতুন আসেন তারা ‘নাইটিঙ্গেল প্লেজ’ নামে একটি শপথ গ্রহণ করে তার প্রতি সম্মান জানান। ১৯৭৪ সাল থেকে তার জন্মদিন ১২ মে পালিত হয়ে আসছে ‘ইন্টারন্যাশনাল নার্সেস ডে’।

ইস্তাম্বুলে তার নামে চারটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। লন্ডনের ওয়াটারলু ও ডার্বিতে রয়েছে তার প্রতিকৃতি। লন্ডনের সেন্ট থোমাস হসপিটালে রয়েছে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল মিউজিয়াম। ব্রিটিশ লাইব্রেরি সাউন্ড আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে তার কণ্ঠস্বর, যেখানে তিনি বলেছেন- যখন আমি থাকব না, সেই সময় আমার এই কণ্ঠস্বর আমার মহান কীর্তিগুলোকে মানুষের কাছে মনে করিয়ে দেবে এবং এসব কাজের জন্য উৎসাহ জোগাবে। দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প নামে একটি নাটক মঞ্চায়িত হয় ১৯২৯ সালে- যার নামভূমিকায় অভিনয় করেন এডিথ ইভানস। তার জীবনী নিয়ে চারটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ১৯১২, ১৯১৫, ১৯৩৬ ও ১৯৫১ সালে।

১৯১০ সালের ১৩ আগস্ট ৯০ বছর বয়সে এই মহীয়সী নারী চলে যান পৃথিবী ছেড়ে প্রশান্তি নিয়ে। মৃত্যুর সময় তিনি নিজ বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলেন। ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ারে সেন্ট মার্গারেট চার্চে তাকে সমাহিত করা হয়।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত