Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,women fight for their rights 8

ধারাবাহিক উপন্যাস: ফুলো মুর্মুর সন্তান সন্ততি (পর্ব-৪) । বল্লরী সেন

Reading Time: 3 minutes

॥ বিদ্যাসিনির শালপোয়ালে একা ॥

কদমঝুঁটির খড়াই ডাকের সংকেতে এখন, এ মুহূর্তে হামা টানছে মটুক আর 

জোরহাঁটুর কর্কশ ঐরাবত শব্দে পাথুরে ঝর্ণার কাছে থাকা ভোরাতিয়া হরিণের খুর সে আগম ধ্বনি পায়, চেনা লাগে, নিডর এই বনানী, স্তব্ধ হয়ে সূর্যদেবকে জাগাতে লারে।

মটুকের কদমবুসি চলা এখন শিউরানো পিঁপড়ের মতো ডেঁও তুলে পাছা ঠোকাঠুকি দিয়ে পোকাদের ঢিপি ধামসে। বর্ষায় এদিকে পেঁচাফল, মাকড়িফুল মাঠের পোয়াল ছাপিয়ে বেঢ় দিলেক। মটুক এখন ডাহুকবিলের নয়ানজলি ধরে এগোচ্ছে বাদাড়ের শাল মহুয়ার জঙ্গলে, কদমঝুঁটির হুইসল শোনে আর হাসি ফেটে পড়ে তার। পাখি এখন তার মাথার ওপারে কখনো সাদা বাকলে ঠোঁট ডুবিয়ে পোকা খাচ্ছে, সে এক কণা আদরের কাঠপোকা ধরে আর সটান পেছন দিকে হটে আবার শিশু মটুকের রাস্তা বুঝিয়ে দেয়, এবার ডাইনে, ডাইনে, ডাইনে। দু’ একটো ভ্যান আর সাইকেল পাশ দিয়ে চলে যায়, অবাক হয়ে হামা টানা শিশুকে। তলায় ভুঁই, ভুঁইটুকু সম্বল করেই সে এবার আমনের জমির আল দিয়ে মায়ের থানে ঢুকবে, ঠিক এমনি সময়ে পচ্চিম আলে গান ধরেছে গাড়ু হাতে লিয়াকত আলি।শৌচ করতে করতে রোজ সে বিদ্যাসিনির বাদনা গাইবেই, তাতেই তার চোখে ভক্তির জল এসে যায়; শকরি হাতে সে দেবতাকে তার কারুভাষাময় অশ্রু নিবেদন করে আর শৌচ সমাপন হয়। বিদ্যাসিনি দেবী তার দোয়াতে মণি মুক্ত ধরে দেন কি ওমনি! সে তার পীরনামার দৌলতে রোজ কাজের খিজির পায়, যেতে হয় ফুলঝোড়, দুগ্ধডিহি, শবরপাড়ার দিকে। ওখানে হিঁদু, মুসলমান সবাই পাঠশালে ডাকে। হাতলিখা কারুলিপি ইস্কুল খুলেছে, সেতানেও দুপুর থেকে বাচ্চারা লিপি শিখবেক। এখানের রসজ্ঞ কোকিলও তার গলায় সুরবাহার শুষে নেয়, শাল গামার,অর্জুল বৃক্ষদেবতার চৌপহরে লিয়াকত কত সাঁঝে পাগলের মতো জোনাকিমেলায় একা বসে বসে তার পিতিপুরুষের জইন্ন মল্লার ধরে, তখন বৃষ্টি না সুর ঠাহর পায় না শ্যামলা ডানার পেজাপতিরা, ঘুমের রেশম ছিঁড়ে তারাও হেঁটে ফেলে গুবড়ে পোকার ঘর। তালিমহীন এ এক আশ্চর্য পশ্চাদ অপসরণ, সৃষ্টির নিয়মের বাইরে। অন্ধ আলোর হাতছানি ভুলে মা যোনির 

অন্য মহলে তখন গভীর নাদঘুমের ভোঁ, শাবকের বীজে প্রৈতির আ ফোটেনি, বিদ্যাসিনি কেবল একা তার হরির লুট নেন, কাঁদেন একাই। নীরবে সে পানি মিশে থাকে রক্তগর্ভা সীতার পাতালগৃহে, কেঁচো ও একদিন মাটির দোয়াতে দীঘল অমলতাস হয়ে যায়, এ তো মিথ্যে লয়। শিশু মটুকও খিলখিল করে হাসে আর গোবর্ধন পর্বতের দিকে পৌঁছায়, সে 

মায়ের গম্বুজ ধরে এবার পুরা সোজা হইয়া দাঁড়ায় আর হাসিতে তার দু হাত জোড় হয় কিভাবে কে জানে,তারপর এক আশ্চর্য শমন আসে। কোথা যেন পাখিদের আলয় থেকে অনেক সাদা পেখম পালক উড়ে আসতে লাগল বাতাসে। উড়ে উড়ে তারা সবাই জড়ো হতে গেল মটুকের কোলের মধ্যে।

কদমঝুঁটির চুড়োতে সব পালক গুঁজে দিচ্ছে মেয়া, আর সূর্যদেব তার ঢাউস

পটের ছবি ঝাঁ কইরা তুলে দেখালেন এইবার। কুনো বাতাস লাই, কুনো রব লাই, কুথাও নাহি সুর বাথানের ডাক। মটুক হেঁটে গড় করে আর আহ্লাদে হাসতে হাসতে যেদিকে চায়, দেখে আলো আর আলো। ফেরার পথ কেমন চমৎকার কোহিনূরের রঙে ঠিকরাচ্ছে। গুটি গুটি টলোমলো মটুক হাঁটে আর বনকাটারি পাখির চমকানো ডাকে সংকেত ওঠে আর যেন নীরদাসুন্দরী পেরিয়ে, ঘোষপাড়া, ওঁরাও হাট, দুলকি চালে গতি বাড়ে দম নেয় আবার রাস্তা শুরু।


আরো পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস: ফুলো মুর্মুর সন্তান সন্ততি (পর্ব-৩)


প্রাচীন খাতার মানপত্রে লেখা হল মনস্তাপ

লিপির অক্ষরবৃত্তে মটুক এবার চুনিরঙের আলো পায়

তার নাম হয় চুনি, পদবি নেই, জাত নেই। গোটা শবর বংশে এমন  মেয়ে জন্মেনি কখনো। “ওলো ফুলি দ্যাখ্, মেয়া কেমন হাঁটি হাঁটি আসতেছে, আর মাথায় কে লো উহাকে টোকা দেল, ভাগ্যি, বারিশে ভিজতুক লয়? ফুলকুমারী এসে তাজ্জব, সত্যিই মটুক এবার সর্দার বটে। মা অর কড়ি আঙুলের ডগা দাঁতে কেটে থুতকুড়ি দিলেন গায়ে, নজর কেটে তাকে ঘরে ডেকে পাকা কলা চটকে খই দিয়ে মেখে খাওয়াতে বসলে।আর বলা নেই কওয়া নেই বিটি তার জামা ভিজিয়ে দেখালো, হেই হেই মা এখ্যানে…

রাগে গজর গজর ফুলি মেয়ার পিঠে গুম্ করে কিল কষিয়ে বলিলে, ‘আর একটিবার যদি একম্ম করবেক, তুর একদিন না আম্মোর একদিন। বসি বসি খাবি আমার হাড় কালি হৈল, মেয়ামানুষ কৈতদিন এ কাম করিস, বুঝস নাই কিছু?’ চুনি তখন পালক কলম নিয়ে মাটির দাওয়ায় দপ্তর পেতে বইসলে। কানে যায় নি তার, সে যে আপন ধনে মশগুল। বিদ্যাসুনির থানের খাগের কলম নিয়ে এবার অলচিকি সে শিখবেই বাপজির কাছে বসে। কাল রাত থাকতে উঠে স্নান করেই শুরু হবে, খুশিতে ডগোমগো চুনি। মটুক নয় চুনি। চুনি চুনি। মায়ের কাছে বকুনি মার খেয়েও মায়ের কাছে না শুলে হয় না। কারণ হল মায়ের বলা তার গল্প, কত রকম যে সেই ঘুঘুডাঙার জল্পনার দিনগুলো। দিদামা মাঝে এসে পানের ডাবরের মতো পা গুটিয়ে বসবে আর মাকে তেলজল দিয়ে স্নানের কাহিনি বলবে। মা তখন লাজবাসায় কুঁকড়ে আর বলবে না কিছু। আখার শেষ তলানি আলোতে এখন সামান্য বাসি দুধের জাল পড়বে, ধিকি ধিকি আগুনে বর্ষার

রাতে ভেজা কাঁথা কিছু আঁশিয়ে যায়, গন্ধ কেটে যায়। আজ টানা পাঁচ দিন বৃষ্টি ছাড়ছে না। 

     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>