| 29 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
উপন্যাস ধারাবাহিক সাহিত্য

ধারাবাহিক উপন্যাস: ফুলো মুর্মুর সন্তান সন্ততি (পর্ব-৮) । বল্লরী সেন

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

|| দিকুর আদেশ, চুনি রঙের রামধনু ||

এঁটো বাসন, ঝামা কড়াই মাজতে গিয়ে চুনির ডান পায়ে বেথা ধরে যায়। তখন তোহফা কান্না আসে বুকে, কলিজা চুর্চুর হৈয়া যায়, এবং পায়ের গোড়ালিতে বিষম একটা জ্বালা হয়। হোক ক্যানে। তবু বাসন ঝকঝকে করবার লেগে পা দিয়ে ঝামা ডলতে তার একটা পরিতৃপ্ত ভাব আসে। ঘাটে মেয়েরা তার বাসনে চেয়ে থাকে, তার বেশ শ্লাঘা হয়। এমনই একবার বাসনে মগ্ন মেয়ে ভুলে গেল দিনটা ১৪, ২০ র পাঁচদিন আগে। তার এখনি হয়ত বাড়ি ফেরা দরকার। মনে হওয়া মাত্র সে বাড়ি হাঁটা দিলে, আর মায়ের মন তো! কাছে ডেকে তাকে বুঝান দিতে যায়।

আর হঠাৎ পেটে খিচ ধরন ব্যথা বাড়ছে, সহ্য করছে মেয়ে। দাওয়া নিকিয়ে উঠে দাঁড়ানো মাত্র একটা তলপেটের ভীষণ তোলপাড় বুঝে সে নীল প্যাকেটে গাঢ় রঙের দুপাট্টা গুঁজে নিল। ঘরে বাপজীর পরিচিত কালুকাকা, লখাইকাকা। কেউ ডাকার আগে চোরের মতো হাতে প্যাকেট জামার তলায় লুকিয়ে, পালিয়ে গেল চুনি।

এই তার তৃতীয় রজঃস্বলা মাস, এবার মা বলে দেয়নি আগে থেকে যে সময় প্রায় এসে গেছে। উল্টে রাখা ক্যালেণ্ডারে লাল কালির দাগ ছিল, সেটা কেউ সরিয়ে দিয়েছে। তাই কিছুই মনে নেই। মাথায় একটা টিসটিসানো ব্যাদনা, মনে হয় জ্বর। গায়ে তাপ বাড়ে, আর শরীরের ভেতরে স্রোত বয়। শৌচ সমাপ্ত করে মেঝে তদারক করে জল ঢেলে সাফাই শেষ করে টিনের আড়াল সরিয়ে আজ হঠাৎ চোখে পড়ে গেল চওড়া গাছের গুঁড়িতে কেউ আটকে রেখেছে।


আরো পড়ুন: ফুলো মুর্মুর সন্তান সন্ততি (পর্ব-৭)


“রঘুনাথের টোল”, সপ্তাহে দুবার, দুশো টাকা। পাশে নেতাজীর ছবি, ছিঁড়ে ফেলা। রঘুনাথ স্যারের কাছে যেতেই হবে তার, আর দুশো টাকা যোগাড় করতে হবে। কানের মাকড়ি রূপার, মা সদ্য পরিয়ে দিয়েছেন, এখনি বেচলে নজর এড়ানো যাবে না কোনোমতে। আর ছেঁড়া নেতাজির ছবির ভরসায় চুনি এবার তার রক্তাক্ত যোনির ওপর শক্ত পুরু কাঠের মতো কাপড়ের তাকিয়াকে অনুভব করেও বেরোলো। বৃষ্টি নেই, কিন্তু নেতাজির জীবন তাকে টানতে লাগল আরও জানার জন্য। পা পিছলে পড়লে মা বলেছেন স্রাব বেঢ়ে যাইও। তাই সযত্নে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়, কাদার বিকট তালে পায়ের হাঁটু অব্দি নোংরাজলে ডুবে যাচ্ছে। এঁটেল মাটির রং, কোথাও তা গাঢ়, কোথাও কালচে। হাঁসের দল ফিরছে আওয়াজ করে। পাঁকের পদ্মের মতো ধবধবে গোলাপি আঙুলের ছিলায় আমি ঠিক হরফ চিনবো, শিখবো।

নেতাজির মতো সারা জেবন গুম্ করে রাখলেও, হরফ শিখতে হবেক আমাকে। নৈলে কুনোদিন ঝালোর সামনে এসে দাঁড়াবো কি করে? শুধু মাস কে মাস শরীর নেকাবো, ওটোই ব্যস! সিহ তো সব মেয়া করে, লতুন কিচ্ছু লাই। শিরীষের রোঁয়ার মতো তরুণ এই জঙ্ঘা, মাজার পাশে দুদিকের সরু লাউডগার মতো কুন্ঠিত হাড় বন্দি হয়ে আছে নাভির তকামে। জিওলমাছের মতো ছটফটে উশকো খুশকো উরু ঢালে নেমেছে গোদাবরীতে। নিজের এই নতুন বরণ বসন্ত শরীরটুকুন ফুলোর এখন খুব নোনা লাগিছে, ঢং লাগিছে বড়। তবু লি, লিজেকে আঁচড়ে পিঁচড়ে ধামসে দেখিহ।

পরবের আগের রাতে, লালচি হাতে লিজ অঙ্গ ভেঙে ভেঙে রুইয়ে রুইয়ে তার শখ হয় দেহকে কাঁদাতে। লাই, করতে লাই গো। এতে স্রাব লিচ্চয় বাহিরাবে অধিক। শৌচের পর আবারও আবারও। গাড়ুর জল বারে বার শ্যাষ। কিন্তুক, আরও যে চাই। দু দুবারের পর আর পারি লাই গো বিদ্যাসিনি, এবার খুব খিদা লাগতেছে, কিন্তুক বাড়ি ফিরতে লারি।

ভাবামাত্র ক্রমে হাত পা ঝিম হল, মাথা ঘুরছে, তবু মা, মা গো বলে চিৎকার দিয়ে আলের পাশে পড়ে যায়। অভুক্ত রোগা মেয়েটির নিঃসাড় দেহে তখন আর নদী, কাপড়, বই কিছু নেই। সে নিজে বিদ্যাসিনির মণ্ডপ হয়ে গেছে। শালপাতায় দুটো ফুলের মতো তার বোজা চোখ কী শীতল। যেন বহু বছর সে জাগেনি। যেন তার আর বল নেই কাঁধে। আর ঠিক এ সময়েই দিকু সেনার কয়জন পার হচ্ছে সীমান্তের গ্রাম। তাদের চোখ তাদের পিস্তলের চেয়ে লম্বা। 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত