স্বাধীনতায় নারী

আমাদের দেশের স্বাধীনতার পিছনে যে ছিল বেশ কয়েকজন মহিলার অসামান্য কৃতিত্ব, সে কথা জান কি? সেইসব সাহসিনী নারীদের কথা আজকের দিনে একটু পড়ে দেখবে না?

 

 

 

 

 

 

 

 

রানি লক্ষ্মী বাঈ

ইতিহাসে তাঁর কথা সকলেই পড়েছ। তবে এই সাহসিনী রানির আসল নাম কিন্তু এটা নয়! ১৮৪২ সালে ঝাঁসির মহারাজ গঙ্গাধর রাওয়ের সঙ্গে বিয়ের পর ‘মণিকর্ণিকা’ নাম পালটে তিনি হলেন ঝাঁসির রানি লক্ষ্মী বাঈ। তাঁর ছিল এক শিশুপুত্র দামোদর রাও এবং এক দত্তক পুত্র। তবে রাজার মৃত্যুর পর সেই সময়ের ব্রিটিশ সরকারের প্রধান লর্ড ডালহৌসি রানির দত্তক পুত্রকে রাজা হিসেবে মানতে রাজি হলেন না। তখনই ব্রিটিশদের থেকে ঝাঁসিকে মুক্ত করার যুদ্ধ শুরু করেন রানি। শিশু দামোদরকে পিঠে বেঁধে ঘোড়ার পিঠে চড়ে যুদ্ধ করতে যেতেন তিনি। সঙ্গে সবসময় রাখতেন অস্ত্র। ১৮৫৮-এর কোটাহ-কী-সেরাই-এর যুদ্ধে স্যার হিউ রোজ়ের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সেনার হাতে মারা যান ইতিহাসের অন্যতম এই সাহসিনী রানি।

কস্তুরবা গাঁধী

‘গান্ধী’ শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজনেরই ছবি। কিন্তু, জানো কি, সেই মানুষটির পাশাপাশি দেশের জন্য একইরকম পরিশ্রম করে গিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী কস্তুরবা গাঁধীও? ভারতকে ব্রিটিশ রাজ থেকে মুক্ত করতে এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য রীতিমতো সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ১৯১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের যে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে কাজ করতে হত, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রধান মুখ ছিলেন কস্তুরবা। ফলে গ্রেফতার করা হয় তাঁকে এবং পাঠানো হয় তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ডে। পরে দেশে ফিরে এসে, গাঁধীজির কারাবাসের সময়টাতে দক্ষভাবে তাঁর জায়গা নেন কস্তুরবা গাঁধী।

সরোজিনী নাইডু

‘দ্য নাইটিঙ্গেল অফ ইন্ডিয়া’— তিনি জন্মেছিলেন কিন্তু হায়দরাবাদের এক্কেবারে বাঙালি এক পরিবারে, সরোজিনী চট্টোপাধ্যায় হয়ে। ইংল্যান্ডে পড়ার সময় ১৯ বছর বয়সে বিয়ে করেন মুথিয়ালা গোবিন্দারাজুলু নাইডুকে বিয়ে করেন। তিনি, সরোজিনী নাইডু, ভারতের প্রথম মহিলা রাজ্যপাল এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের দ্বিতীয় মহিলা প্রেসিডেন্ট। সাহসিনী এই কবি এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীকে জেলেও যেতে হয়েছিল দু’বার! আইন অমান্য আন্দোলনের সময় গাঁধী সহ অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে জেলে পাঠানো হয় তাঁকেও। দ্বিতীয়বার গ্রেফতার হলেন ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দেলনের সময়। তিনি অ্যানি বেসান্তের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন Women’s Indian Association (WIA)-তেও। ১৯৪৯-এ লখনউয়ে নিজের অফিসেই হার্ট অ্যাটাকে মারা যান সরোজিনী নাইডু।

কমলা নেহরু

ভারতের প্রথম প্রধান মন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর স্ত্রী এবং ইন্দিরা গাঁধীর মা, কমলা কৌর নেহরু, বিয়ে করেছিলেন মাত্র ১৭ বছর বয়সে। প্রথম থেকেই নেহরু পরিবারের সঙ্গে দেশের কাজে লেগে পড়েন তিনি। ১৯২১-এর অসহযোগিতা আন্দোলনের সময় তিনি তাঁর বিশাল মহিলা বাহিনী নিয়ে এলাহাবাদে ধ্বংস করে দেন প্রচুর বিদেশি সামগ্রীর দোকান। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহমূলক বক্তৃতা দেওয়ার জন্য যখন গ্রেফতার করা হয় তাঁর স্বামীকে, তখন নির্দ্বিধায় কমলা নেহরু এগিয়ে নিয়ে চলেন সেই বক্তৃতা। ক্রমেই ব্রিটিশরা বুঝতে পারে যে তাদের জন্য বেশ ভয়ের ব্যাপার হয়ে উঠছেন কমলা। ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় দু’বার তারা গ্রেফতারও করেন তাঁকে।

ম্যাডাম ভিকাজি কামা

দেশের মাটিতে না থেকেও, নিরলসভাবে ভারতের স্বাধীনতার জন্য কাজ করে গিয়েছিলেন ম্যাডাম কামা। প্লেগে আক্রান্ত হওয়ার ফলে চিকিৎসার জন্য তাঁকে ব্রিটেনে পাঠানোর পর বলা হয় যে দেশে ফিরে তিনি যেন আর স্বাধীনতার কাজে যোগ না দেন। তাই সারাজীবন বিদেশে থেকেই কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন এই পার্সি মহিলা। দাদাভাই নাওরোজির সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করার সময় তিনি এবং শ্যামজি কৃষ্ণ ভর্মা স্থাপন করেন Indian Home Rule Society-এর। বিদেশের মাটিতে প্রথমবার ভারতের জাতীয় পতাকাও তোলেন ম্যাডাম কামা। ১৯০৭ সালে জার্মানির স্টুটগার্টে  International Socialist Conference-এ তোলা সেই পতাকার নাম ছিল Flag of Indian Independence।

অরুণা আসফ আলি

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অন্যতম প্রধান চরিত্র অরুণা আসফ আলি। লবণ সত্যাগ্রহের সময় তিনি নিয়েছিলেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসেরও সক্রিয় সদস্য ছিলেন অরুণা। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলনের জন্য একসময় জেলবন্দিও করা হয় তাঁকে। তবে জেলের চার দেওয়াল কি আর আটকে রাখতে পারে তাঁর মতো ব্যক্তিত্বকে? জেলে থাকাকালীনও সব স্তরের বন্দিদের সমানাধিকারের জন্য টানা প্রতিবাদ চালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তার প্রতিবাদের ফলে তিহার জেলের বন্দিদের অবস্থার উন্নতির বন্দোবস্তও করা হয় শেষ পর্যন্ত।

অ্যানি বেসান্ত

নিজে ভারতীয় না হয়েও সারাজীবন ভারতের স্বশাসনের জন্য আন্দোলন করে যাওয়ার কৃতিত্ব সম্ভবত আর কারওই নেই। ১৯০২-এ ভারতে এসে সেন্ট্রাল হিন্দু কলেজ এবং সিন্ধ জাতীয় কলেজিয়েট বোর্ডের স্থাপন করেন তিনি। ১৯১৪, সারা বিশ্ব যখন প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে জর্জরিত, সেই সময় লোকমান্য তিলকের সঙ্গে মিলে তিনি শুরু করেন All India Home Rule League। এই সংস্থার চাপে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাধ্য হয় এই ঘোষণা করতে যে ভারতকে তারা স্বশাসিত হতে দিতে আগ্রহী। জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দিয়ে অ্যানি বেসান্ত এক বছর কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট পদও সামলেছিলেন।

সুচেতা কৃপালানি

ইনি এমন একজন যাঁর নাম না বললে এই তালিকা অসম্পূর্ণই থেকে যেত। অন্যতম এই স্বাধীনতা সংগ্রামী ভারতের পার্টিশন দাঙ্গার সময় মহাত্মা গাঁধীর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসেও সুচেতা কৃপালানি রেখে গিয়েছেন তাঁর অবদান। ভারতে সংবিধান তৈরির সময় তিনি সাংবিধানিক পরিষদের খসড়া কমিটির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এ ছাড়াও আরও একটি বিশাল কৃতিত্ব আছে কিন্তু তাঁর— কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতে তিনি গেয়েছিলেন ‘বন্দে মাতরম’। স্বাধীনতার পরেও তিনি উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

 

 

 

 

 

কৃতজ্ঞতা: ১৯ ২০

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত