| 14 এপ্রিল 2024
Categories
নারী প্রবন্ধ

ইকোফেমিনিজম: প্রাচীন প্রজ্ঞার নতুন অভিরূপ: অদিতি ফাল্গুনী

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


“…তত্ব ও বাস্তবাতার অন্যন্যোসংযুক্তি ও সামগ্রিকতাই ইকোফেমিনিজমের উদ্দিষ্ট। ধরিত্রীর প্রতিটি জীবন্ত বস্তু থেকেই এই আন্দোলন তার শৌর্য ও একাত্মতা সংগ্রহ করে। আমাদের জন্য একটি গুগলি-শামুকের আস্তিত্বের প্রশ্ন কোন জনগোষ্ঠীর তীব্র পানীয় জলের সঙ্কটের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা একটি নারী-স্বজ্ঞায়িত সংগ্রাম। এই নষ্ট, বৃহন্নলা সময়ে যখন কর্পোরেট যোদ্ধাদের দানব অর্থনীতি এবং সামরিক যোদ্ধাদের পারমানিবিক বিনাশন কর্মসূচী মা পৃথিবীকে ধ্বংস করছে, তখন এই বিনাশকে নারীবাদী প্রসঙ্গ হিসেবে পর্যবেক্ষণ না করে আমরা পারি না। এই নাশ, এই ধ্বংস সেই একই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা হতে উদ্ভুত, আধিপত্যের নানা প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্র-ক্ষমতাকে পর্যন্ত ব্যবহার করে যা আমাদের শরীর ও আমাদের যৌনতার প্রতি আমাদেরই অধিকারকে অস্বীকার করে।”
জনেস্ত্রা কিং, ÒWomen and life on Earth: A Conference on Eco-Feminism in the Eighties.” gvP©, 1980|

ইকোফেমিনিজম। আমাদের কানে সামান্য অচেনা ও নতুন এই শব্দের কি সংজ্ঞা দেয়া যেতে পারে? জনেস্ত্রা কিংয়ের ভাষা থেকেই যদি ধার করে বলি ÒThe Ecology of Feminism and the Feminism of Ecology?” ফরাসী নারীবাদী দ্য’ ইয়াবোন্নে দ্বারা সর্বপ্রথম ব্যবহৃত এই শব্দকে ডায়ামন্ড এবং ওরেইনস্টেইন তাঁদের “Reweaving the World The Emergence of Eco Feminism” গ্রন্থে সংজ্ঞায়িত করেছেন a new term for an ancient wisdom বলে। মূলতঃ ১৯৭০-এর শেষ ও ৮০-র দশকের শুরুতে শান্তি, পরিবেশ ও নারী আন্দোলন, — এ ত্রিবিধ আন্দোলনের বহুমুখী নানা অভিজ্ঞতা ও তত্বের মন্থন থেকে উদ্ভেত এই “ইকোফেমিনিজম” (নির্দিষ্ট কোন বাংলা পরিভাষা নাই বা দিলাম, কারণ ইংরেজী এই শব্দটি অসম্ভব শ্রুতিমধুর) ডিস্কোর্সটি হোল “পুজিবাদী পিতৃতান্ত্রিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা’র বিরুদ্ধে এক অগ্নিগর্ভ যুদ্ধঘোষণা।

পুঁজিবাদী পিতৃতান্ত্রিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা, যা রেনেঁসা প্রকল্পের উপনিবেশবাদী দ্বি- কেন্দ্রিকতা
[dichotomics] ও আধুনিক হ্রাসবাদী বিজ্ঞানের সাহায্যে [Reductionst Science] গত পাঁচশ বছরেরও অধিক সময় ধরে প্রকৃতি/নারী/শিশু ও অশ্বেতকায় নারী-পুরুষকে ‘উপনিবেশ’ হিসেবে ব্যবহার করে গড়ে তুলেছে প্রবল পুঁজির সঞ্চয়, যার আধুনিকতম রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি উপসাগরীয় যুদ্ধ বিজয়ী প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশের অহঙ্কার ÒNew World Order” ঘোষণায় ও ÒIntellectual Property Rights Convention”- এর ২৭নং অনুচ্ছেদে, ইকোফেমিনেজম সেই পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই ভাঙ্গতে চায় সর্বশক্তি দিয়ে। রেনেঁসা প্রকল্পের তথাকথিত উন্নয়ন ভোগবাদ, সুপারমার্কেট অর্থনীতি ও পারমানবিক অস্ত্রের “শিশ্ন কল্পনা”(Phallic Phantasy) – র পরিবর্তে ইকোফেমিনিজম আবাহন করে “জীবনযাপনযোগী” ও সরল মাতৃ-অধিকারভিত্তিক অর্থনীতি, আবাহন করে প্রকৃতি-প্রাণী বৃক্ষ ও নারীর পারস্পরিক ‘মিথোপযোগীতা’ [Symbioses]| ইকোফেমিনিজম তাই নিন্দা করে তৃতীয় বিশ্বের ওপর উন্নত বিশ্ব কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া উন্নয়নের স্বপ্ন-পুরান প্রকল্প’ [The Myth of Catching up Development], তথাকথিত গ্লোবাল ভিলেজে লক্ষ লক্ষ মানুষের উদ্বাস্তকরণ প্রক্রিয়া, ধর্মীয় ও জাতিগত বিচ্ছিন্নতাবাদ, জৈব-প্রকৌশলের নামে নারীদেহের গিনিপিগসুলভ ব্যবহার, ‘বিকল্প জননী কারখানা’ [Surrogate mother industry] তথা বৈশ্বিক পুঁজিবাদের যত নয়া চাতুর্য্যকে। বদলে ‘সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতা” জীববৈচিত্র্য ও ইকোসিস্টেমের সঙ্গতি তথা ধরিত্রীর হারিয়ে যাওয়া আনন্দিত ছন্দকে করতে চায় পুনরুদ্ধার।

আশার কথা, ‘ইকোফেমিনিজম’ আজ শুধু শিক্ষিত নারীর পাঠচক্রেই সীমিত নয়, বরং পৃথিবীর বহু প্রত্যক্ষ অঞ্চলে নিরক্ষর ও নিরন্ন নারীদের মাঝেও এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে, ¯্রফে তাদের নিজস্ব অস্তিত্বের স্বার্থেই। দক্ষিণ-পশ্চিম জার্মানীর হুইল এলাকায় পারমানবিক প্ল্যান্ট স্থাপনের বিরুদ্ধে সেখানের কৃষক নারীরা আজ আন্দোলন করছেন, হিমালয়ে যে নেপালী চিপকো আদিবাসী রমনীগন চুনাপাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন কারণ পাহাড় তাদের জীবনদায়িনী মাতা, কেনিয়ায় “সবুজ বন্ধনী আন্দোলন” মিনামাতা উপসাগরীয় দূর্ঘটনার পর জাপানের সিইকাৎসু ক্লাবের নারীগণ যারা এন্টি-কনসিউমারিস্ট আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, বিপন্ন ম্যাঙগ্রোভ অরণ্য বাঁচাতে ইকুয়েডরের দরিদ্র নারীদের প্রাণান্ত সংগ্রাম, ভারতে নর্মদা বাঁধের বিরুদ্ধে মেধা পাটেকরের লড়াই কিম্বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাভ ক্যানালে পারমানবিক বর্জ্য নিক্ষেপের প্রতিবাদে লুইস গিবস নামী এক সাহসী নারী শ্রমিকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন, — এই তত্বের অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রজ্ঞাকেই প্রকাশ করে।

সুসান ব্রাউনমিলার সম্ভবতঃ প্রথম নারীবাদী যিনি আধুনিক হ্রাসবাদী বিজ্ঞান কর্তৃক প্রকৃতির ব্যবচ্ছেদ ও প্রকৃতির উপর বিজ্ঞানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে পুরুষ কর্তৃক নারীকে ধর্ষণ-প্রক্রিয়ার সাথে তুলনা করেছেন। সিসিলির পারমানবিক কর্মসূচী বিরোধী মেয়েরাও অনেকটা সুসানের ভাবনার সাথে সঙ্গতি রেখেই বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলt ÒOur ‘no’ to war coincides with our struggle for liberation. Never we seen so clearly the connection between nuclear escalation and the violence of rape. … … … It is no coincidence that the gruesome game of war – in which the greater part of the male sex seems to delight- passes through the same stages as the traditional sexual relationship aggression, conquest, possession, control. Of a woman or a land, it makes little difference.”

চেরনোবিল দূর্ঘটনার পর এক রুশ মা’র আক্ষেপঃ “পুরুষেরা জীবন কি তা বোঝে না। ওরা বোঝে শুধু যুদ্ধ আর শত্রুকে জয় করা।”
ভারতে ভোপাল গ্যাস ট্রাজেডির পরে হামিদাবাই নামে এক দরিদ্র বস্তিবাসী মহিলা জানান, “বুকের আগুন ঠা-া না হওয়া পর্যন্ত আমরা লড়াই থামাবো না —- ৩০০০ জানাজা পড়ার পর এই আগুন জ্বলা শুরু হয়েছে।”

এমনি অসংখ্য কণ্ঠস্বরকে একত্রিত করেই ক্যারোলাইন মার্চেন্ট মারিয়া মাইজ, বন্দনা শিবা, ম্যুরে লেভিন, আইরিন স্টোয়েহর, এঞ্জেলা বার্ক, ইসাবেলা দ্য কর্তিভ্যুঁ, সান্দ্রা হাডিং প্রমুখ ইকোফেমিনিস্ট তাঁদের তত্বকে করে তুলেছেন পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ ও সমন্বিত। পিতৃতান্ত্রিক মুনাফাবাদী অর্থনীতির হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত “প্রকৃতি ও নারীর অভেদ ইন্দ্রিয়বৃত্তি, রতিশক্তি ও জননশক্তি যা ইন্দ্রিয়জাল, রহস্যবাদ ও নানাবিধ উৎসবের মাধ্যমে সমগ্র পরিবেশের প্রতিটি জীবনের অভ্যন্তরীণ গুঢ় রহস্যকে প্রকাশ করে, যা মূলতঃ একধরণের আধ্যাত্মিকতা” পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁর রচনা করেছেন বিপুলসংখ্যক ও বৃহদায়তন অজ¯্র টেক্সট, আলোকপাত করেছেন, বর্তমান বিশ্বের প্রধান-অপ্রধান দার্শনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবধারণ ও প্রতিক্রিয়ায়, তাদের এই আলোকসম্প্রাতের প্রধান কিছু ক্ষেত্রই আমরা নিচের শিরোনামাত্রয়ের সাহায্যে সংক্ষেপে আলোচনা করছিঃ
ক. রেনেঁসা, হ্রাসবাদী বিজ্ঞান ও শ্বেতাঙ্গ পৌনঃপুনিক উপনিবেশঃ উন্নয়নের স্বপ্ন-পুরান প্রকল্প,
খ. মাতৃভূমির পুরুষায়ন [Masculinization] ও নারীর পিতৃভূমিহীনতা.
গ. নয়া পুনর্জনন প্রযুক্তি ও তৎসংশ্লিষ্ট তর্ক-বিতর্ক।

ক. রেনেঁসা, হ্রাসবাদী বিজ্ঞান ও শ্বেতাঙ্গ পুরুষের উপনিবেশঃ
জাঁ পল সার্ত্র তাঁর Huis Clos MÖ‡š’ e‡j‡Qb, Hell is other people!
এটি সার্ত্রের একার বচনই নয়, মূলতঃ এই Ôother peopleÕ শব্দটির উপর ভিত্তি করেই গোটা রেনেঁসা প্রকল্প দাঁড়িয়ে আছে। রেনেঁসা তার ‘ঐতিহাসিক পরমতা’র খাতিরে শুরুতেই তৈরী করে নিয়েছিল একটি আধিপত্যবাদী দ্বিকোটিকরণ, যেমন প্রকৃতি/সংস্কৃতি, বৈশ্বিক/আঞ্চলিক, উন্নয়ন/জীবনধারণ, ব্যবচ্ছেদ/মিথোপযোগীতা, সভ্য/বর্বর, নর/নারী ইত্যাদি। এই প্রতিটি দ্বান্ধিক শব্দদ্বয়ের মধ্যে একটিকে অন্যটির তুলনায় শ্রেয়তর ও শ্রেয়তর বলেই বিজয়ী ধরে নেয়া হবে। যেমন, সংস্কৃতি বা বিজ্ঞান জয় করবে প্রকৃতিকে, সভ্য বর্বরকে, নর নারীকে। হেগেলীয় দ্বন্ধশাস্ত্র, মার্কসবাদ বা সার্ত্রের রচনা হতে শুরু করে দ্য বোভোয়ার, শুলামিথ ফায়ারস্টোন বা লোরি এন্ড্রজদের মতো সাম্প্রতিকতম নারীবাদীদের রচনা ও এই দ্বান্ধিকতা তথা ঐতিহাসিক পরমতা তত্ব দ্বারা তাড়িত।
কিন্তু ইকোফেমিনিস্টিরা, এই শতকের অপরাপর উত্তরাধুনিক দার্শনিকদের মতোই, প্রশ্ন করেছেন এই দ্বান্ধিক প্রক্রিয়াকেই। এই দ্বান্ধিকতার সূত্র ধরেই, ক্যারোলিন মার্চেন্ট তাঁর The Death of Nature: Women, Ecology and the Scientific Revolution (১৯৮৩) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ফ্রান্সিস বেকন, যাকে আধুনিক বিজ্ঞানের জনক বলা হয়, তৎকালীন ইংল্যান্ডে নব্য বিকাশমান পুঁজির স্বার্থে, “বিজ্ঞানের নামে দুষ্ট ও অবাধ্য রমনীর” ন্যায় প্রকৃতিকে জয় করার জন্য যাবতীয় সহিংস ও কঠোর পদক্ষেপ (যেমন, বাঁধ নির্মাণ, মাইন বিস্ফোরণ) গ্রহণের জন্য আহ্বান জানান। ত্রয়োদশ কি চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রকৃতিকে পবিত্র কিন্তু ক্ষমতাময়ী, তীব্র জননশক্তিসম্পন্ন মা হিসেবে অবলোকন করা হোত। রেঁনেসা প্রকল্পের নতুন ও ‘নিরপেক্ষ’ বিজ্ঞান রসায়ন ও পদার্থবিদ্যার কঠোর সহিংসতায় ক্ষমতাময়ী মা প্রকৃতিকে ‘দুর্বল, নিস্ক্রিয়, বশ্য বস্তুতে পরিণত করা হোল। প্রকৃতি অবশ্য এর প্রতিশোধ নিচ্ছে। চেরনোবিল দূর্ঘটনায় বিস্ফোরিত বিবিধ তেজস্ক্রিয় পদার্থের মধ্যে শুধুমাত্র প্লুটোনিয়ামের রেডিও এ্যাকটিভিট অর্ধেক হ্রাসপ্রাপ্ত হতেই সময় নেবে ২৪,০০০ বৎসর।
শুধু প্রকৃতিই নয়, আধুনিক হ্রাস বাদী বিজ্ঞানের কঠোর প্রকৃতি-বিধ্বংসী নীতির প্রতিবাদ করতে যেয়ে রেনেসাঁর সূচনা- সময়ে প্রাণ হারান লক্ষ লক্ষ ‘ডাইন’। ‘ডাইনীভাষণে নিন্দিত এই নারীরা প্রকৃতির সাথে OIKOS অর্থাৎ ঘরকন্না করতে জানতেন। তাঁদের ছিল শস্য একতা (Crop Integrity), জীববৈচিত্র্য, ভেষজ ওষুধ এমনকি জন্ম নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে চমৎকার জ্ঞান। কিন্তু ইউরোপের সর্বত্র তখন ম্যাক্স ওয়েবার কথিত ‘Social Darwinism’ অর্থাৎ তীব্র মুনাফা বিস্তারের প্রতিযোগীতা ডাইনীদের এবং তাদের সরল, পরিবেশবাদী ও মাতৃ-অধিকারভিত্তিক অর্থনীতিকে বাঁচতে দেয় নি। নতুন পিতৃতান্ত্রিক পুঁজিবাদ বরং সৃষ্টি করেছে ‘domestic idyll’ নারীদের, রুশো ও দিদেরোর ভাষ্যে “নৈতিক লিঙ্গ” (moral gender), যাদের নিঃশর্ত গৃহশ্রম প্রতিযোগিতাকামী পুরুষকে স্থিতি দেবে কিন্তু ঐ গৃহশ্রম নব্য জাতিরাষ্ট্রের এঘচ পণনায় অন্তর্ভুক্ত হবে না। এভাবেই নারী হয়ে ওঠে পুঁজিবাদী শ্বেতকায় পুরুষের বৃহত্তম ‘অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ (Internal Colony)|

প্রকৃতি ও নারীকে জয় করে, রোজা লুক্সেমবার্গের ভাষ্যে, শ্বেতকায় পুরুষ শ্বেতকায় পুরুষ অশ্বেতাঙ্গ ভূখ-গুলো জয় করতে প্রয়াসী হয়্ ১৮৩০ সলের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আফ্রিকা ও আমেরিকার আদিবাসীদের উপ-মানব (Sub-humane) মনে করা হোত। অষ্ট্রোলিয়ায় শ্বেত অভিবাসীরা ময়দায় এর্সনিক মিশিয়ে আদিবাসীদের খেতে দিত। ব্রাজিল এবং কলম্বিয়ায় শ্বেত অধিবাসীরা শুধু গরু চরানোর উদ্দেশ্যে লক্ষাধিক রেড ইন্ডিযানকে গুলি, বিষ ও ডিনামাইট ব্যবহারের মাধ্যমে হত্যা করেছিল। এমনকি স্বয়ং কার্ল মার্ক্স ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশের উপনিবেশ স্থাপনাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন এবং এভাবেই মারিয়া মাইস তাঁর White Man’s Dilemma প্রবন্ধে জানান, গত পাঁচশ বছরেরও বেশি সময় ধরে, উপনেবিশির পর উপনিবেশ প্রতষ্ঠা করে শ্বেতকায় পুরুষ তার বর্তমান সভ্যতা গড়ে তুলেছে, গড়ে তুলেছে প্রবল পুঁজির সঞ্চয়।
এই অর্থ লুণ্ঠন এই ঔপনিবেশিক শোষণ আজো অব্যাহত। দক্ষিণের দরিদ্র রাষ্ট্রসমূহ হতে সমৃদ্ধ উত্তরে বাৎসরিক নীট US $ 50 বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের সম্পদ প্রতি বংসর প্রবাহিত হচ্ছে। ২০০ বৎসর আগে পশ্চিমা বিশ্ব বর্তমান উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় পাঁচ গুণ ধনী ছিল, ১৯৬০ সালে এ বৈষম্য বেড়ে দাঁড়ায় ২০ঃ১ এবং ১৯৮৩ সালে ৪৬ঃ১- এ। ক্রমবর্ধমান এ অর্থনৈতিক মেরুকরণের কারণ আবিষ্কার করতে যেয়ে সত্তরের দশকের কিছু খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ যেমন, আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাঙ্ক, সামির আমিন, জোহান গুলতাং প্রমুখ দেখতে পান যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সদ্য-স্বাধীন, প্রাক্তন ‘উপনিবেশ’রাষ্ট্রগুলোর উপর উন্নত বিশ্ব উন্নয়নের যে স্বপ্ন- পুরান প্রকল্প চাপিয়ে দিয়েছে, তাই হয়েছে ঐ দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য কাল। যেমন, বন্দনা শিবা প্রদত্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে ভারতে বর্তমানে বিশ্বব্যাঙ্কের অনুদানে যে বিভিন্ন বাঁধ তৈরী হচ্ছে, তার মধ্যে এক সুবর্ণরেখা বাঁধ নির্মাণেই ৮০,০০০ আদিবাসী তাদের জমি হারাবে। অপর এক পরিসংখ্যানে বন্দনা প্রকাশ করেন যে, যেখানে ভারতের কেরালা প্রদেশের সাধারণ কৃষক নারীরা তাদের সনাতনী জ্ঞানের মাধ্যমে, মিশ্র ফসল চাষ পদ্ধতিতে এক হেক্টর জমিতে নারকেল গাছ, সুপারী ও গোলমরিচ, কলা, পেঁপে, কাঁঠাল, আম এবং নানা ধরণের সব্জী উৎপাদনের পাশাপাশি ৯৬০ জন ব্যক্তির দৈনিক কর্মসংস্থান যোগায়, সেখানে বিশ্বব্যাঙ্ক নির্দেশিত চাষ প্রণালীতে ১ হেক্টর জমিতে শুধুমাত্র নারকেল উৎপন্ন হয় এবং মাত্র ১৫৭ জন ব্যক্তির দৈনিক কর্মসংস্থান হয়। ফলাফলঃ দারিদ্র্য, বেকারত্ব, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শহরে অভিবাসন, বস্তির সংখ্যা বৃদ্ধি ও পরিবেশ দূষণ, তথাকথিত গ্লোবাল ভিলেজে লক্ষ লক্ষ মানুষের উদ্বাস্তু হওয়া। সন্দেহ নেই, এই দারিদ্র্য কিম্বা অনিকেত দশা সবচেয়ে তীব্র মাত্রায় ক্ষতি করে মেয়েদেরই। এমনকি, এত যে ঢাকঢোল পেটানো জাতিসংঘের ‘নারী উন্নয়ন দশক’ পালিত হোল, দশক শেষে পর্যালোচনায় দেখা গেল “…Women’s relative access to economic resources, incomes and employment has worsened, … … … and their relative and even absolute health, nutritional and educational status has declined”
রুথ সিদেল, ইস্তার বোসরুপ কিম্বা মেরিলেন ওয়েরিংয়ের মতো অর্থনীতিবিদরা আজ সেকারণেই পশ্চিমা বিশ্বের তীব্র ভোগবাদী ও পরিবেশ ধ্বংসকারী অর্থনীতির পরিবর্তে সরল জীবনযাপনভিত্তিক ও ইকোসিস্টেম রক্ষাকারী, মাতৃ-অধিকার ভিত্তিক অর্থনীতির পুনবির্ন্যাস চাইলেন।

খ. মাতৃভূমির পুরুষায়ন ও নারীর পিতৃভূমিহীনতাঃ
না, শুধু ‘পুঁজিবাদী পিতৃতান্ত্রিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা’কে আক্রমণ করেই ইকোফেমিনিজম ক্ষান্ত হয় নি। রেনেসাঁ প্রকল্পের অন্যতম রাজনৈতিক অবধারণ ‘জাতিরাষ্ট্র’ এবং আজকের পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান ধর্মীয়/জাতিসত্বাভিত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদের উৎসহেতুও তারা খুঁজতে চেয়েছেন।
রোমান ‘Natio’ শব্দ হতে আধুনিক ‘Nation’ কথাটির জন্ম¥| ‘Natio’ শব্দটির মূলগত অর্থ ‘Natus’ অর্থাৎ নবজাতক। ‘Natio’ অর্থ কোন ব্যক্তির জন্মস্থান, তার কৌমগোষ্ঠী, অঞ্চল, নামে ডাকত। নিজেদের তারা বলত “Populus Romanus” বা রোম সা¤্রাজ্যের নাগরিক। অনেকটা এই প্রাচীন রোমকদের কায়দায় বিসমার্ক, আব্রাহাম লিঙ্কন, স্ট্যালিন বা মার্শাল টিটোদের হাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্বার সমাহারে গঠিত হয়েছে বৃহৎ জাতিরাষ্ট্র, সৈনিক পুরুষদের ‘নয়া পিতৃভূমি’। কেননা, রেনেসাঁর সম্প্রসারণবাদী অর্থনীতের জন্য বিশাল এলাকা, বিশাল জনসংখ্যা, প্রচুর খনিজসম্পদ প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ওয়ালেরস্টেইনের ভাষায়, “These new nation- states, these fatherlands, swallowed up smaller countries and tribes and homogenized them within a new ‘national culture’, উপর হতে চাপিয়ে দেয়া এই রাষ্ট্রকাঠামো, মাতৃভূমির এই ‘পুরুষায়নই যুগোশ্লোভিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ পৃথিবীর বহু বৃহৎ রাষ্ট্রের ভাঙনের বা বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ। বন্দনা শিবা তার “Masculinisation of the Motherland” প্রবন্ধে দেখিয়েছেন কিভাবে বঙ্কিম চন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম গানটি ভারতীয় জাতির ‘পুরুষায়ণ’ ও ‘সৈনিকীকরণ’ প্রক্রিয়া শুরু করেছল। মর্মন্তুদ এই ‘পুরুষায়ন’ প্রক্রিয়া দাঙ্গা ও ১৯৪৭ এর দেশভাঙনের পরেও শান্ত হয়নি; RSS বা সঙ্ঘ পরিবারের নতুন ‘হিন্দুত্বে’র শ্লোগানে তা’ ক্রমাগত আগ্রাসী রূপ ধারন করছে। অথচ, নুতন পিতৃ ভূমিগুলের সমস্যা-সঙ্কটে-সফলতায় নারীর কিছুই করণীয় নেই। কারণ পিতৃভূমি বা জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টিই হয়েছিল পুরুষের প্রয়োজনে, নারীর কোন দাবীদাওয়াই ছিল না সেখানে কোনদিন।
গ. নয়া পুনর্জনন প্রযুক্তি ও তৎসংশ্লিষ্ট বাকবিতন্ডা:
নয়া পুর্নজনন প্রযুক্তি সম্পর্কে ইকোফেমিনিস্টদের বক্তব্য অবশ্য অনেকাংশেই মানা যায় না। তাঁদের মতে, পুঁজিবাদের প্রথম মুনাা আহরণ ক্ষেত্র ছিল কয়লা খনি, তামাক শিল্প বা লৌহ শিল্পের মতো ভারী ইন্ডাষ্ট্রি। আজ যখন সেসব ক্ষেত্রৈর সম্ভাবনা প্রায় নিঃশেষিত, তখন তারা তাদের মুনাফা আহরণের বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে বেছে নিয়েছে নারীদেহকে। তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র নারীদেহে ঔষধ কোম্পানীগুলো খুঁজে পেয়েছে তাদের নতুন বাজার। কিন্তু এখানেই একটি বিনীত প্রশ্ন থেকে যায়ঃ তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র নারীদের ঔষধ কোম্পানীগুলো গিনিপিগের মতো ব্যবহার করছে, ঠিক আছে। কিন্তু নারীর ভবিতব্য তবে কি হবে? বারম্বার গর্ভধারণ? অসংখ্য দরিদ্র সন্তানের জন্মদান? না, এমন ভবিতব্য কিছুতেই মেনে নেয়া যা না। পশ্চিমা বিশ্বকে বা তাদের সভ্যতার প্যাটার্ণকে গালি দেয়ার জন্য নিজেদের পায়ে এভাবে কুড়াল মারা যায় না। যা প্রয়োজন তা হবে কেমিক্যাল ঔষধের অনুপাত ক্রমশঃ কমিয়ে এনে ভেষজ ঔষধ তৈরী করা, যা নারী দেহে কোন ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করবে না। পরিশেষে আরো একটি কথা বলা প্রয়োজন। ইকোফেমিনিজম, যা উত্তরাধুনিক দর্শনেরই একটি সম্প্রসারিত শাখা, কিছু কিছু বিষয়ে প্রতিক্রয়াশীর ধ্যান-ধারণারও জন্ম দিচ্ছে না কি? নারীর স্বার্থকতা শেষ পর্যন্ত যদি প্রকৃতি থাকাতেই সীমায়ত থাকে, তবে বেগম রোকেয়া, মেরী ওলস্ট্যানক্রাফটরা এত রক্ত আর অশ্রু ঝরালেন কেন? আমার এ নিবন্ধের নামকরণে ইকোফেমিনিজমকে আমি “প্রাচীন প্রজ্ঞার নতুন অীভরূপ” হিসেবে সম্বোধন করেছি ঠিকই, তবে এই প্রজ্ঞা ও অভিরূপ উভয়কেই শ্রদ্ধার সাথে আরো বেশি কিছুকাল খতিয়ে দেখতে হবে।

পরিশিষ্ট
১। King, Ynestra: The Ecology of Feminism and the Feminism of Ecology, 1989.
২। প্রাগুক্ত।
৩। GATT, Agriculture and Third World women: Vandana Shiva.
৪। Ueno, Chizuko, Women’s Networking is changing the World.
৫। প্রাগুক্ত।
৬। Seveso is Everywherer: Caldecatt & Heland.
৭। Starhawk, 1992.
৮। Reflections on Gender and Science: Fax Keller, Evelyn.
৯। প্রাগুক্ত।
১০। White Man’s Dilemma: Mies Maria.
১১। Luxemburg, Rosa: The Accumulation of Capital.
১২। DAWN. 1985: Development Crisis and Alternative Visions.
১৩। প্রাগুক্ত।
অক্টোবর-ডিসেম্বর, ১৯৯৬।

 

 

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত