| 3 মার্চ 2024
Categories
শিশুতোষ

শিশুতোষ গল্প: রান্না করলেন রাজপুত্র । যশোধরা রায়চৌধুরী

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

রাজা, রানি, রাজপুত্র, রাজকন্যা কে নিয়ে এক সুখের সংসার। কোন গোলমাল নেই,আবার গোলমাল আছেও বলা চলে।কারণ রাজা আর রানির মনে শান্তি নেই।একটাই কারণে। এই রাজ্যের রাজপুত্র যুদ্ধে যেতে চায়না,ফুটবল ক্রিকেট খেলেনা,এমনকি শিকারে যেতেও ভালোবাসেনা, একটাই জিনিষ ভালোবাসে,  সেটা হল রান্না করা। তার জীবনের সবচেয়ে বড় বাসনা সে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ রাঁধুনি হবে।রাজপুত্র সারাদিন রান্না ঘরে গিয়ে বসে থাকে, রাঁধুনিরা অতিষ্ঠ হয়ে যায়। এই লাও, ওই লাও। রাশি রাশি সবজি রাজপুত্র নিজের পরিকল্পনামাফিক কেটেকুটে ফেলে নতুন নতুন পদ রাঁধেন। পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। করলার পায়েস,লাউয়ের বিরিয়ানি, চিংড়িমাছের শুক্তো,অপরাজিতাফুলের চাটনি।

রাঁধুনিরা তো আর পেরে উঠছেনা বটেই, কিন্তু তার চেয়েও বেশী খারাপ অবস্থা রাজা রানি রাজকন্যার।রানিমা অবশ্য অন্যরকমের মানুষ। নিজে কোনদিন রান্নাঘরের ছায়াও মাড়াননি। শুধু পাড়ার লাইব্রেরী থেকে বই এনে এনে রাজ্যের ডিটেকটিভ গল্প পড়ে চলেন। কোন তাপ উত্তাপ নেই। আর রোজ সকালে রাজা আর রাজকন্যা গলায় বাইনোকুলার ঝুলিয়ে মৃগয়ায় যান। রাজার পুরোনো মোটরগাড়ি লোকলস্কর, ঘোড়া, কুকুর এসব তো সঙ্গে যায়ই। তো ফেরার পথে ওঁরা ওঁদের শিকার করা পশুগুলোকে সব জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসেন। কেননা বহুদিন হল ঘুমপাড়ানি গুলি ছাড়া আর কোন গুলি দেশে নিষিদ্ধ। যেখানে শিকার করার পর হাতে দু-চারখানা পাখি বা খরগোশ ঝুলিয়ে বা এক-আধখানা হরিণকে ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে আনা যায়না, সেখানে বুঝতেই পারা যাচ্ছে বাড়ি ফিরে রোষ্ট করে খাবার মতন কিছুই থাকছেনা। সুতরাং খিদে তে চনচন পেট নিয়ে ফিরেই রাজকন্যা দূত পাঠান পাশের রাজ্যের সীমার কাছে। সে রাজ্য থেকেই তো আসে যাবতীয় নন-ভেজ।পশুবধে ওখানে কোন নিয়ম-কানুন নেই।রাজকন্যার ফেভারিট হল তন্দুরি মুরগি আর মাছের চপ। কিন্তু সেসব খাবার আসার আগেই রাজপুত্র হাসিতে ঝলমল করতে করতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসেন, মাথার চুল খাড়া খাড়া আর চোখে কেমন একটা দুষ্টু ঝিলিক। তার মানেই কোন একটা নতুন রান্না আবিষ্কার হয়েছে। ভয়ে হাত-পা পেটে সেঁধিয়ে যায় রাজা আর রাজকন্যার।


আরো পড়ুন: শিশুতোষ গল্প: ক্যাবলাকান্ত । লীলা মজুমদার


অবশ্য তারপরেই একথালা ভাজাভুজি দেখে রাজকন্যা খুশিই হয় প্রথমে। কিন্তু এক কামড়েই তার দু-কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করে। শুকনো লঙ্কার সাথে দোপাটি ফুল মিশিয়ে পকোড়া বানানো হয়েছে, সে কী ঝাল!! অথবা কোনদিন সাদা ধবধবে ঝোলের ভেতরে কী সব যেন ভাসতে দেখা যায়। খেয়ে বোঝা যায় দুধ আর নারকেলের মিষ্টি ঝোলের ভেতরে সুপক্ক সুতিক্ত নিমপাতার বড়া। এমনি সব চমক অপেক্ষা করে থাকে রাজপুত্রের যেকোন রান্নায়।যতক্ষন না খাচ্ছ মজা বুঝতে পারবেনা।

কিন্তু হাজার হোক রাজপুত্র, তার একটা সন্মানের ব্যাপার আছে। খানসামা আর হুঁকোবরদারেরা যতই চোখ টিপে হাসাহাসি করুক, গম্ভীর মুখে রাজাকে সেসব খেতে হয়, রাজকন্যা বলে নীরবে নিজের জিন্সের পকেটে সেগুলো চালান করে দেয়। রানিমা নিজের ডিটেক্টিভ বইয়ের থেকে মুখ তুলে দেখেননা পর্যন্ত, আপনমনে কিছুই না বলে খেয়ে চলেন।

রাজাকে বাধ্য হয়ে মূল রান্নাঘরের দিক থেকে দূরে, গরুর গোয়ালের কাছে আর একটা বিকল্প রান্নাঘরের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। সেখানে রাজার খাস বাবুর্চি লুকিয়ে লুকিয়ে এমন সব খাবার বানায় যেগুলো দেখতে একেবারে রাজপুত্রের বানানো খাবারের মতই কিন্তু অনেক বেশী সুস্বাদু। সেজন্য একজন চর নিয়োগ করা হয়েছে, সে, রাজপুত্র যখন রান্না করেন তখন তার ঘাড়ের উপর দিয়ে উঁকি মেরে দেখে নেয় ঠিক কী রকম দেখতে হচ্ছে খাবারটা। ফিরে গিয়ে খবর দেয় বাবুর্চিকে। রাজপুত্র হয়ত বানাচ্ছেন টোমাটোর কেক আর গেঁড়িগুগলির ইডলি, বাবুর্চি অমনি বানাতে বসেন চেরি দেওয়া কেক আর ইডলিতে জমান পেঁয়াজ আর সর্ষের ফোড়ন। আর খাড়া চুল আর চকচকে চোখ নিয়ে রাজপুত্র যেই তার বানানো পদগুলো সগর্বে রাজার সামনে এনে হাজির করেন, বাবুর্চি তাঁর চরকে দিয়ে চোরাপথে রাজার টেবিলের তলায় সাপ্লাই দেন তাঁর তৈরী ঐরকম দেখতে খাবার দাবার। রাজা হাসতে হাসতে, রাজপুত্রের রান্না খাবার ভাণ করে দিব্যি সুস্বাদু খাবারগুলো সাঁটান। রাজকন্যাও বাদ পড়েননা। রাজপুত্র নিজে আর রানিমা অকাতরে ভয়াবহ রান্নাগুলো খেয়ে চলেন।

এইসব করতে করতে সবাই যখন ক্লান্ত, তখন একদিন ঘটল অঘটন। অবশ্য অঘটন ঠিক বলা যায়না রাজ্যের পক্ষে ব্যাপারটা ভালোই।পাশেই একটা জঙ্গলে ছিল একটা ডাইনি ছাউনি। একহাজার ডাইনির একটা কনফারেন্স ছিল সেদিন সেখানে। জানাই কথা ডাইনি রা ভীষণ ঝগড়ুটে হয়, আর কথায় কথায় উল্টোপাল্টা ম্যাজিক চালায়। তো ভেড়ার পিণ্ডি আর শূয়োরের হাড্ডি দিয়ে দুপুরের খানা যখন ঠিক জমে উঠেছে, কী যেন একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে হঠাত এক কমবয়েসি ডাইনির অন্যদের সাথে মারপিট লেগে গেল। গুচ্ছের অভিশাপ ছুঁড়তে ছুঁড়তে তখন ডাইনিরা ঐ উটকো ডাইনিটিকে তাড়িয়ে দিল, নিজেদের দুর্দান্ত লাঞ্চ বক্সের ভাগ দিলনা। পেটে ভয়ানক খিদে নিয়ে ঝাঁটায় চেপে এই ডাইনিটি আর কি করে হুশ করে উড়ে চলল যেদিকে দুচোখ যায়। আর পড়ল গিয়ে হাউইয়ের মতন আমাদের গপ্পের রাজার বাড়ির ছাতে।

একে মাথায় ঝগড়ার রাগ তার ওপর পেটে চুঁই চুঁই খিদে। ডাইনি থপ করে ছাদের ওপর বসে বসে ভাবছে কি করা। হঠাত সে পেল এক দারুণ গন্ধ। আসলে পাকশালায় রাজপুত্র তখন পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে ছিলেন। সবে পলতা শাকের মোড়কে ইলিশ মাছের টুকরোগুলোকে মুড়ে সেগুলোকে পিটুলিগোলার ঝোলে দিয়ে সেদ্ধ করতে যাবেন, ওদিকে আবার চামচিকের ঠ্যাং দিয়ে বানানো কাবাব গুলো বেশ হয়ে মত এসেছে। সেইসব গন্ধ গিয়ে পৌঁছল ডাইনির নাকে। আর অমনি তার খিদের ধার গেল বেড়ে, সে হড়বড় করে ঝাঁটায় চেপে ঝপাত করে এসে পড়ল একদম রান্নাঘরের মাঝে।ডাইনিকে হঠাত সেখানে দেখে তো রাজপুত্রের চুল খাড়া খাড়া, চোখ চকচকে হয়ে গেল। সবাই ভাবল আবার বুঝি নতুন কোন খাবার আবিষ্কার করেছেন তিনি। কিন্তু না, এবার আবিষ্কৃত হয়েছে, নতুন খাবার নয়,  নতুন খাইয়ে।

আধঘন্টা পরে দেখা গেল রাজপুত্র ডাইনি-কন্যার সামনে থালায় করে করে নানা আবিষ্কারের ফলাফল সাজিয়ে ধরেছেন, আর মহা তৃপ্তিতে ডাইনি সেগুলো চেটেপুটে খাচ্ছেন ।

তা দেখে সবাই হাঁ, রাজা ছুটে এলেন, রানি ছুটে এলেন। রাজপুত্রের খাবারের এতদিনে তবে একটু মর্ম বুঝল কেউ! কিন্তু আর যাই হোক, এ যে একজন ডাইনি, রীতিমতন ঝাঁটায় চড়া,মাথার চুলগুলো সব উলোঝুলো, তিরিক্ষি চেহারা। তবে একটা কথা বলতেই হবে, বয়সটা কম। আর পরনে ঝলঝলে গেঞ্জি আর টাইট্‌স। তবু ডাইনি তো! কথায় কথায় শাপ দিয়ে যে কাউকে সাপ, ব্যাং করে দিতে পারে। ভুল করে এক আধটা খাবার যদি আবার তার খারাপ লেগে যায়। খুব রিস্কের ব্যাপার।

তো রাজপুত্রের সাথে ডাইনির যেমন দু-মিনিটেই একেবারে আড্ডা জমে ক্ষীর হয়ে গেল, আর যেভাবে রাজপুত্র ওকে পদ্মপাতার পায়েস আর ব্যাঙ্গের ছাতার জিলিপি খাওয়াতে শুরু করল, তাতে খবরটাকে খারাপ বলবেন না ভাল, এটা রাজারানি ভেবেই পেলেননা। উলটে তাঁরা এমন ও ভাবলেন যে হয়তো ডাইনি এক-আধটা বরও দিতে পারে। যদিও ডাইনিরা কোন ভাল জিনিষ কখনো করতে পারে বলে কোন বইতে রাজামশাই কখনো পড়েননি।

শেষ অব্দি অবশ্য একটা ভাল জিনিষই হল, রাজপুত্র আর ডাইনি বিয়ে করল। আর ঝাঁটায় চেপে রাজপুত্র চলে গেল ডাইনিছাউনিতে, বেশীক্ষন লাগেনা সেখানে, একবেলার জার্নি। অবশ্য ঝাঁটার স্পীড ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার।

রাজারানিরা নিজেরা তো ঐসব রান্না খাবার দায় থেকে মুক্তি পেলেনই,তাছাড়া ডাইনিছাউনিতে রাজপুত্রের রান্নার কদর হল দারুণ। এখন রাজপুত্রের আবিষ্কার করা মাকড়শার জালের এক্সট্র্যাক্ট আর গাঁদাল পাতা-আরশোলার আচার প্যাকেটে করে শিশিতে করে বিক্রি হয়। ডাইনিদের সুপারমার্কেটে পাওয়া যায়।

 

 

 

 

 

 

One thought on “শিশুতোষ গল্প: রান্না করলেন রাজপুত্র । যশোধরা রায়চৌধুরী

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত