| 17 জুলাই 2024
Categories
ভ্রমণ

ভাবতে পারেন পৃথিবীতে এই ধরনের বিশ্বাসের লোকও আছে?

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

আমেরিকার পেনসিলভানিয়ার ল্যানকাস্টার কাউন্টিতে প্রধানত আমিশদের (Amish) বসবাস। এরা বিশেষ এক ধর্মীয় সম্প্রদায় যারা বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তি আর বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করে না। এদের জীবন সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতি নির্ভর, প্রযুক্তি বহির্ভূত জীবনযাপন করে। যতবারই আমিশদের নৈকট্য পেয়েছি, ততবারই অবাক হয়েছি তাদের সহজ-সরল জীবনযাত্রা দেখে। এরা গাড়িতে চড়ে না, বিদ্যুৎ ব্যবহার করে না, টিভি, কম্পিউটার এদের জীবনে খুব একটা প্রয়োজন নেই। এ যেন প্রকৃতির আইন দিয়ে ঘেরা আরেক জগৎ! এই প্রযুক্তির যুগে আমাদের জীবন যখন প্রযুক্তির কাছে জিম্মি, তখন আমিশদের প্রযুক্তিবিহীন এই সাদাসিধে জীবন আমাদের মত শহুরে লোকদের নিত্য ভাবায়, অবাক করে দেয়। আমিশদের জীবন, এদের বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের গোড়ার কিছু গল্প নিয়েই এই লেখাটির সূত্রপাত।

প্রকৃতিকে তাড়িয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের সবটুকু দখল করে বসে আছে অনেক আগে থেকে। গার্হস্থ্য জীবনের টুকিটাকি থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি বাঁকেই আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর করুণভাবে নির্ভরশীল। আমাদের বোধ, প্রজ্ঞা আর মননে এখন শুধুই বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির জয়জয়কার। আমরা বেড়ে উঠছি প্রযুক্তির আলোয়-হাওয়ায়, পরিণত হচ্ছি একেকটি মানুষ নামের রোবটে। বিংশ শতাব্দীতে যখন চারদিকে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির জয়জয়কার তখন এই আমিশরা বেছে নিয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে বেড়ে ওঠার এক অসাধারণ অনুকরণীয় দীক্ষা। এরা প্রকৃতির সহজ-সরল জীবন ব্যবস্থায় বিশ্বাসী, আর বিশ্বাসী বলেই আমিশরা যন্ত্রনির্ভর জীবনকে উপেক্ষা করে প্রকৃতিবাদী হয়ে বেঁচে থাকাটাকেই জীবনের অন্যতম ব্রত বলে ধরে নিয়েছে। তাদের ধারণা, এই বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি মানুষকে প্রকৃতি আর ঈশ্বরের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক করে তুলেছে।
পেনসিলভানিয়ার ল্যানকাস্টার কাউন্টিতে এলেই প্রকৃতি তার আপন শোভায় আপনাকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানাবে। এই ছোট শহরের কালো পিচের রাস্তার দুপাশেই দেখতে পাবেন দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা ছবির মত একটা ঝকঝকে ছোট্ট সুন্দর গ্রাম। গ্রামের ছোটা ছোট বাড়ি দূর থেকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা একগুচ্ছ দেশলাইয়ের বাক্সের মতোই দেখায়। রাস্তার আশপাশে যত দূর চোখ যায়, দেখা যায়, ফসলের মাঠে আমিশরা তাদের কাজকর্ম নিয়ে মহাব্যস্ত। কেউ ঘোড়া দিয়ে মাঠে হালচাষ করছে, কেউ ঘোড়ার গাড়িতে ফসল তুলতে ব্যস্ত, কেউ গরু আর ভেড়ার পালের দেখভাল করছে। না, লোক দেখানোর জন্য আমিশরা এ ধরনের জীবন বেছে নেয়নি। আর্থিকভাবে সব রকম সামর্থ্য থাকার পরও এরা প্রকৃতির কাছাকাছি বেঁচে থাকাকেই জীবনের অন্যতম ধর্ম বলে মেনে নিয়েছে। আমিশরা প্রযুক্তি ভালোবাসে না। প্রযুক্তিকে পাশ কাটিয়ে এরা জীবন-যাপনে বিশ্বাসী। গভীরভাবে ধর্মপ্রাণ আমিশরা আমাদের এই তথাকথিত সভ্য নাগরিক জীবনে এসে তাদের বিশ্বাসের গাঁট বাঁধতে চায় না। এরা প্রকৃতিকে ভালোবাসে আর ভালোবাসে নিজেদের ছোট্ট সাজানো-গোছানো ছোট গ্রামটাকে। অর্থ আর ক্ষমতায় এদের কোনো লোভ নেই। কৃষিকাজ করে জীবন-যাপনে এরা বেশি আগ্রহী।
পুরুষ আমিশরা মাঠে ভুট্টা, তামাক, সয়াবিন, বার্লি আলুসহ বিভিন্ন শাক-সবজির চাষ করে। আর আমিশ মেয়েরা কাপড় বোনে, মধু তৈরি করে, ফুল আর ফলের চাষ করে। আমাদের দেশের মেয়েদের মত আমিশ মেয়েরাও হাত দিয়ে কাপড় কাচে আর তা দঁড়িতে বেঁধে বাড়ির আঙিনায় শুকাতে দেয়। আমিশরা খুবই শান্তিপ্রিয় এক ধর্মীয় সম্প্রদায়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে আমিশদের তেমন আস্থা নেই। এদের বিশ্বাস, শারীরিক সুস্থতার পূর্ব শর্ত হল মানসিকভাবে সুস্থ থাকার পূর্ণ নিশ্চয়তা। আমিশদের ধারণা, পৃথিবীতে এত পাপ আর সমস্যার একমাত্র কারণ হল প্রকৃতিবিরুদ্ধ হওয়া, প্রকৃতিকে ধ্বংস করা। এদের বিশ্বাস, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা মানেই ঈশ্বরের কাছাকাছি থাকা। আমিশরা বিশ্বাস করে, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি মানুষকে প্রকৃতিবিরুদ্ধ করেছে, আত্মকেন্দ্রিক করে তুলেছে, আর দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছে ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিকে। পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী, আমিশরা কড়ায়-গন্ডায় সরকারকে প্রাপ্য খাজনা দিয়ে থাকলেও সরকারের কাছ থেকে বিনিময়ে কোনো সাহায্য আশা করে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমিশরা অবসর ভাতা, চিকিৎসা ভাতা কিংবা স্কুল ভাতা—কোনো কিছুই সরকারের কাছ থেকে নেয় না। মোট কথা, বৈষয়িক জীবনে আমিশদের কোনো আগ্রহ নেই

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

আমিশ কারা? সুইজারল্যান্ডের এনাব্যাপটিস্ট ক্যাথলিক চার্চ থেকে মূলত আমিশদের উৎপত্তি। আমিশ অর্থ ‘সত্যবাদী’ আর এনাব্যাপটিস্ট অর্থ ‘ব্যাপটিজম বিরোধী’। এদের প্রথম গোড়া পত্তন হয় ১৬৯০ সালের প্রথম দিকে সুইজারল্যান্ডে জ্যাকব আম্মানের (Jakob Ammann) হাত ধরে। এই এনাব্যাপটিস্টরা মূলত প্রটেস্ট্যান খ্রিষ্টান। তবে বাইবেলের অনেক বিষয়ের সঙ্গে এদের প্রবল দ্বিমত রয়েছে। যেমন খ্রিষ্টান ধর্মে নবজাতকের ব্যাপটিজম করে পাপমোচন করার কথা বাধ্যতামূলকভাবে বলা আছে। কিন্তু এনাব্যাপটিস্টরা অর্থাৎ আমিশরা এই প্রথার প্রবল বিরোধী। এনাব্যাপটিস্টরা মনে করে, একটা শিশু জন্মগতভাবেই নিষ্পাপ। নিষ্পাপ একটা শিশু পাপ-পুণ্যের কোনো পার্থক্য ধারণ করার কথা নয়। যেহেতু শিশুমাত্রই নিষ্পাপ তাই তাদের ব্যাপটাইজ করার চিন্তাটা রীতিমতো হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে যদি ব্যাপটিজম করতেই হয়, তাহলে শিশুর বয়স যখন ষোলোতে পড়বে, যখন সে পৃথিবীর পাপ-পুণ্যের অঙ্ক কষতে শিখবে তখনই তার ব্যাপটিজম হতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই সুইস খ্রিষ্টান সমাজ এনাব্যাপটিস্টদের বাইবেলবিরোধী এ ধরনের কথাবার্তা খুব ভালো চোখে দেখতে পারেনি। ধর্মের বিরুদ্ধে এ রকম দুঃসাহসিক কথা বলার জন্য সুইস সরকার এই এনাব্যাপটিস্টদের ওপর চড়াও হয়, প্রথমে এদের বাড়ি-ঘর-সম্পত্তি সরকারিভাবে বাজেয়াপ্ত করে এবং পরে ‘আমিশ নিধন’ নামে একটি বিশেষ পুলিশ বাহিনী তৈরি করে এদেরকে সুইজারল্যান্ড থেকে স্থায়ীভাবে বের করে দেওয়া হয়। সুইজারল্যান্ড থেকে বিতাড়িত হয়ে আমিশরা আশ্রয় নেয় জার্মানিতে। সেখানে শুরু হয় তাদের আরেক নতুন জীবন। কিন্তু জার্মানিতেও আমিশরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে খুব বেশি দিন টিকে থাকতে পারেনি। পরে এরা ধীরে ধীরে উত্তর আমেরিকার ওহাইও, কানাডা, পেনসিলভানিয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে পাড়ি দেয়।

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
আমিশ গবেষক জন হোস্টেটলার আমিশদের সম্পর্কে জানাচ্ছেন, The Amish are a church, a community, a spiritual union, a conservative branch of Christianity, a religion, a community whose members practice simple and austere living, a famiistic entrepreneuring system and an adaptive human community” (John a Hostetler: Understanding Amish Society)। সমাজতত্ত্ববিদদের ধারণা, আমিশরা এমন একটি সম্প্রদায় যারা মানুষকে ভালোবাসে, প্রকৃতিকে আঁকড়ে ধরে এরা সরলভাবে বাঁচতেই চায়। শহুরে জীবন এদের পছন্দ নয়। আর সে কারণেই পল্লি সমাজভুক্ত এই আমিশরা নগর সভ্যতায় খুব একটা আস্থা রাখতে পারে না। বংশ পরম্পরায় এরা নিজেদের বিশ্বাসের ভিত তাদের পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে শক্ত হাতে বুনে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সমাজতত্ত্ববিদ রবার্ট রেডফিল্ড মনে করেন, The Amish are the only honest Christians left in the modern world. Because of the qualities or sainthood ascribed to them, the Amish are regarded by some as a rare species, a people who raise their crops ‘naturally’ and who live by extra ordiniary standards of honesty and uprightness.’ (Robert Redfiield, American Journal of Society)।
১৭১০ সালের দিকে আমিশরা প্রথম আমেরিকার পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে আসে এবং উইলিয়াম পেন নামের এক জমিদারের কাছ থেকে ১০ হাজার একর জমি কিনে আমিশরা ল্যানকাস্টার কাউন্টিতে প্রথম বসবাস শুরু করে। ১৭২৭ সালের 2 অক্টোবর ‘অ্যাডভেঞ্চার’ নামের এক জাহজে চড়ে প্রথম ১৩ জন আমিশ আমেরিকায় আসেন। এর বছর দশেক পর ‘চারমিং ন্যান্সি’ জাহাজে চড়ে অসংখ্য আমিশ পেনসিলভানিয়ার ল্যানকাস্টার কাউন্টিতে আসতে শুরু করে। আমিশদের পরিধেয় সাদামাটা কাপড় দেখলেই এদের চেনা যায়। আমিশ মেয়েদের পোশাক হল সাদা রংয়ের লম্বা জামা আর তার ওপর কালো কুর্তা। পুরুষের পরনে থাকে ফুল হাতা সাদা শার্ট, তার ওপর কালো লম্বা কুর্তা আর মাথায় থাকে কাউবয়দের মত টুপি। আমিশ পুরুষেরা ষোলো বছর বয়সের পর থেকে দাঁড়ি কাটে না। এদের ভাষা ইংরেজি। তবে ইংরেজির পাশাপাশি আমিশরা ডাচ ভাষায়ও কথা বলে থাকে। আমিশদের জীবনে ধর্ম ও সম্প্রদায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাইবেলের প্রতিটি বাণীকে এরা তাদের জীবন দিয়ে আত্মস্থ করতে চায়।

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
গতানুগতিক ধারার শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আমিশদের কোনো আস্থা নেই। এরা নিজেদের বিশ্বাসের তৈরি স্কুলে সন্তানদের পড়াশোনার জন্য পাঠায়। কর্মঠ হিসেবে আমিশদের বেশ সুনাম আছে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে তারা ফসলের মাঠে যায়। ছেলেমেয়েরা যায় স্কুলে। বাড়ির পুরুষ আর নারীরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজেদের কাজ-কর্মে। বিনোদন আমিশদের জীবনে খুব একটা জোটে না। প্রতি রোববার কোনো বাড়িতে অথবা কমিউনিটি সেন্টারে গান গেয়ে আনন্দ করে এরা সময় কাটায়। তবে গানে কোনো রকম যন্ত্রসংগীত ব্যবহার করা আমিশদের জন্য ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ। নিজেদের গোত্রের বাইরে কোনো রকম আচার-অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা আমিশরা চিন্তাই করতে পারে না। এদের নিজেদের পরিধি তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায় আমিশরা পরস্পর পরস্পরকে ভালো করে বুঝতে চেষ্টা করে, সুখ-দুঃখের গল্পকে ভাগাভাগি করে নেয়। গতানুগতিক চাকরি-বাকরিতে এদের কোনো লোভ নেই। আমিশদের একমাত্র জীবিকা হল কৃষি খামার তৈরি করা। একটা খামারকে কীভাবে বাড়ানো যায় সম্ভবত এটাই তাদের একমাত্র বৈষয়িক লক্ষ্য।
আমিশদের বিয়ে নিয়ে দুটি কথা। অন্যান্য সমাজের মত আমিশদের জীবনেও বিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিয়ে ঘিরে আমিশরা নানা উৎসবে মেতে ওঠে। আমিশ ছেলেমেয়েরা যখন ষোলো বছরে পা রাখে, তখন থেকেই এরা নিজেদের সঙ্গী খোঁজায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সাধারণত ২০-২২ বছর বয়সেই এরা বিয়ের কাজটি সেরে ফেলে। তবে বিয়ে করা এত সহজ কথা নয়। আমিশদের প্রথা অনুযায়ী, বিয়ের প্রস্তাব দিতে হলে আমিশ ছেলে-মেয়েদের অন্তত জুলাই/ আগস্ট মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। নিজেদের পছন্দমতো বর চূড়ান্ত হওয়ার পরই শুধু কনে নিজের থেকে তার বাবা-মাকে হবু বর সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়।
১১ অক্টোবর থেকে সম্ভাব্য বর-কনেরা তাদের নামের তালিকা গির্জায় নিবন্ধন করে এবং পরবর্তী রোববার গণমান্য বিশেষ অতিথিদের উপস্থিতি আর আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে তালিকাভুক্ত সম্ভাব্য বর-কনেদের নাম ঘোষণা করা হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই দিনটি আমিশদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। চার্চ থেকে প্রকাশিত তালিকায় বর-কনের নাম নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই বর আর কনের বাবা-মায়েরা বিয়ের আয়োজনে মহাব্যস্ত হয়ে পড়েন। সাধারণত কনের মা নিজেরে হাতেই তাঁর মেয়ের বিয়ের পোশাক তৈরি করেন।

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

বর ও তার বাবা-মা বিয়ের অনুষ্ঠানে গির্জার নির্দিষ্ট অতিথিতো বটেই, আমিশ সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিমন্ত্রণ করেন। বিয়ের পোশাক হিসেবে আমিশ পুরুষেরা পরেন কালো লম্বা কোর্তা, মাথায় টুপি আর মেয়েরা পরেন নীল রঙের গাউন। পোশাক হিসেবে নীল রংয়ের গাউন আমিশ মেয়েদের কাছে খুবই প্রিয়। সে কারণেই আমিশ মেয়েরা বিয়ের দিন নীল রঙের গাউন পরে সজ্জিত হতেই বেশি ভালোবাসে।
পেনসিলভানিয়ার লেনক্যাস্টার কাউন্টি বর্তমানে উত্তর আমেরিকার অন্যতম এক জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। আমিশদের জীবনযাপনকে দেখতে আমেরিকার বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকেরা আসেন এই ল্যানকাস্টার কাউন্টির আমিশ পল্লিতে। শহুরে জীবনের বাঁধাধরা আর ছকে বাঁধা জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সপ্তাহান্তেই অনেক আমেরিকান ভিড় জমান এই ছোট্ট গ্রামে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ পর্যটক এই আমিশ পল্লিতে ঢুঁ মারেন। এদের কেউ কেউ যেমন আসেন প্রকৃতির নির্মল ছোঁয়ায় নিজেদের একটু চাঙা করে নিতে, আবার কেউ আসেন আমিশদের জীবনপ্রণালি দেখতে। পর্যটকদের বিনোদনের জন্য রয়েছে হোটেল, জাদুঘর, গিফট শপ আর খেলাধুলার সুব্যবস্থা। গিফট শপে আমিশদের হাতের তৈরি পোশাক, মোমবাতি, ঘর সাজানোর তৈজষপত্র, পেইন্টিং, মেয়েদের গয়না, টুপি, জুতা, পুতুল, গিফট কার্ড ইত্যাদি পাওয়া যায়।
জানা যায়, প্রতি বছর পর্যটকেরা এই আমিশ গ্রামে প্রায় চার শ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেন যা হিসাব করলে আমিশদের মোট জনসংখ্যা হিসাব অনুযায়ী, মাথাপিছু আমিশদের বার্ষিক আয় দাঁড়ায় ২৯ হাজার ডলার। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, এই আমিশদের সঙ্গে সাধারণ পর্যটকদের সম্পর্ক কী রকম? এ কথাতো সবারই জানা, শান্তিপ্রিয় আমিশরা সব সময় শান্তিতেই বসবাস করতে চায়। সে কারণেই পর্যটকদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনেক প্রাঞ্জল আর মধুর। কিন্তু তারপরও কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা যে ঘটে না, তা নয়। এই কিছুদিন আগেও গুলি করে দুজন আমিশকে হত্যা করা হয়েছিল এই ল্যানকাস্টার কাউন্টিতে। আরেকটা বিষয় হল, ক্যামেরা নামের বস্তুটি আমিশরা একদম পছন্দ করে না। সে কারণেই পর্যটকদের ক্যামেরা থেকে আমিশরা নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে রাখতে চেষ্টা করে। তবে পর্যটকেরাও আমিশদের জীবন ও তাদের জীবনযাত্রার ওপর শ্রদ্ধাশীল। আমিশ আর অ-আমিশদের শান্তিপূর্ণসহ অবস্থান ল্যানকাস্টার আমিশ পল্লিতে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে দিয়েছে।
শেষ কথা হল, আমিশরা প্রকৃতি থেকে উৎসারিত হয়ে যে মন্ত্র ও দীক্ষায় তাদের জীবন-ধর্ম তৈরি করেছে, সহজ-সরল জীবনের মাঝে বেঁচে থেকে সুন্দরকে অবলীলায় ধারণ করার ক্ষমতা অর্জন করেছে, সেখান থেকে আমাদের মত বিজ্ঞান-প্রযুক্তির পাতে মোড়া মানুষগুলোর অনেক কিছু শেখার আছে। এই প্রযুক্তির যুগে আমরা এই শহুরে মানুষেরা লোহা-লক্কড় আর ইট-কাঠের মত ধীরে ধীরে নিষ্প্রাণ হয়ে গেছি, ভালোবাসায় মাখা আমাদের চোখ দুটো এখন শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। আমরা স্বপ্নহীন মানুষেরা বেঁচে আছি প্রযুক্তির খাঁচায় বন্দী হয়ে। আর সে কারণেই আমিশদের সহজ সরল জীবন আমাদের যন্ত্রপাতি আর কলকব্জাতে আটকে থাকা ব্যস্ত জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবায়, প্রকৃতিকে নিত্য ভালোবাসতে উদ্বুদ্ধ করে। আমিশদের জয় হোক, প্রকৃতির জয় হোক আর জয় হোক মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত