জিললুর রহমানের গুচ্ছ কবিতা

 
যেদিন প্রাণের জন্ম
 
 
 
যেদিন প্রাণের জন্ম পৃথিবীতে হবে
নিশ্চয় সে শুক্রবার দিনে দেখে শুনে
অথচ এখানে নেই জ্যোতির্বিদ, তবে
কিভাবে পবিত্র দিন প্রথম জীবনে
স্রষ্টার কৃপার কথা বলবে দু’কানে
এখানে কেবল স্রোতে ভাসছে ভূবন
আর্কিয়ান যুগে সপ্তা থাকে অন্যখানে
লড়াই নিজের জন্যে বাঁচাতে জীবন
 
আর্কিয়ান যুগে অতো অক্সিজেন নেই
কার্বনডাই অক্সাইডে বাতাসে গরল
জীবন অনন্ত বলে লাভা থেমে যায়
শীতল লাভার স্রোত শীলীভূত তাই
ফাঁদে ভরা পৃথিবীতে লাভাও অচল
জীবন যে কোনো ভাবে টিকে থাকতে চায়
 
 
 
 
 
 
জুজু
 
 
 
আমাদের আজ জুজুতে পেয়েছে খুব
রাহুতে খেয়েছে বহু বহু মহাকাল
গ্রহণ লেগেছে অমাবস্যার বেঘোর অন্ধকারে
 
 
 
পশ্চিম থেকে প্রতিদিবসের সূর্যকান্ত ওঠে
অস্তরাগীনী বিভা ডুবে যায়
পূবের ডোবায় মজে
 
 
 
ঘোর কলি কালে
রাতের কপালে ঢিপ করে টিপ দেয়
বিষম শনির দশা
 
 
 
তবু বলবোই
কিছুই ঘটেনি দেখো
কেবল আকাশ শিশুর রক্তে রাঙা
 
 
 
 
 
 
 
 
হেঁয়ালীর ধূমকেতু
 
 
 
হেঁয়ালীর ধূমকেতু উড়ে যাচ্ছে আকাশের প্রান্ত ধরে সে কোন্ দূরের দিকে। অগ্নিগোলক ছোটে জ্বলজ্বলে রকেটের বেশে যুগান্তরের সংবাদ বয়ে নিয়ে যায়। ওলাবিবিদের দিন চলে গেছে, জ্বীনপরীদের ছমছমে রাত আমাদের রোমকূপে শিহরণ আর আনবে কি আনবে না — হেঁয়ালীর ধূমকেতু দিক থেকে দিকে সময়ের ঘূণপোকা হয়ে ঘোরে, দাগ রেখে যায়।
 
হিমালয় থেকে বরফেরা নেমে আসে ব্রহ্মপুত্র নদে, পদ্মার বিস্তীর্ণ চরে হাওয়া খায় হাঁসুলী বাঁকের ইতিকথা। দিন চলে গেলে নশ্বর শরীর যথা বিলীন হবার পথে প্রাণীকুল নদীপথ বিচিত্র ধরাতল সার বেঁধে এগিয়ে চলেছে। কেবল কালের ধারা মেনে চলে চাঁদের ঘূর্ণন আর হেঁয়ালীর রাঙা জ্বলজ্বলে ধূম্রশলা।
 
 
 
 
 
 
প্যারাপিথেকাস
 
 
 
প্যারাপিথেকাস প্রাইমেট প্রাণী হেঁটে চলে বন পথে
সাড়ে চার কোটি বছরের আগে ফায়ুম মরুতে
একদিন তার মিলবে ফসিল সেকথা জানে না
ছোটখাট এই আদি পিতা রূপ
মানুষের আর নরবানরের;
খুনশুটি করে একে অপরের লেজ টেনে ধরে।
তার জানা নেই বংশ যে তার উন্নত হবে
শিড়দাঁড়া আরো সোজা রিজু হবে—
হাতগুলো তার হাঁটা ছেড়ে দেবে
একদিন তারা হাতাহাতি ছেড়ে অস্ত্র বানাবে আর
একে অপরকে মেরে রেখে যাবে, কোন্ কলিযুগে।
প্যারাপিথেকাস এসব জানে না।
 
গাছে গাছে তার নেচে বেড়াবার দিন শেষ হয়ে আসে। সাড়ে চার কোটি বছর আগেই নিভে গেছে তার নাম। এসব নিয়ম কালের লিখনে আমিও তো মুছে যাব। মানুষের নাম মানুষই মুছবে মনে হেন সন্দেহ…
 
 
 
 
 
 
 
 
সিনোজোয়িক কাল পেরিয়ে
 
 
 
সিনোজোয়িক কাল পেরিয়ে
আমি কি আজ কানার হাটবাজারে ঘুরি
হেঁটে বেড়াই মন পেরিয়ে
চোরাগলির শাদা অন্ধকারে
বাতাসে বিষ কথাতে বিষ মাথা জুড়েই অবিশ্বাস
এডিস মশা মানবমনে করে বেড়ায় রাজ
 
সিনোজোয়িক কালের পরে আজ কানার হাটবাজার
নীতির কানা দলের কানা তেলেসমাতি যতো
আমি যে তার প্রেমের কানা খবর রাখে কেবা
 
 
 
 
 
বানভাসী
 
 
কুড়িগ্রাম আর রংপুর থেকে বানভাসী হয়ে তিস্তা গড়িয়ে ফিরছি। করতোয়া আর মহানন্দার ঢল এসে একাকার। আমি ভেসে যাই কালান্তরের পথে, নূহ নবীদের কিস্তিমাতেরও আগে। আমার বাঁপাশে বুঝি বাইসন ডানপাশে কোনো ডাইনোসরাস; কাল স্রোত যাকে টেনে নিয়ে যায় তাকে ধরে রাখে কেবা। দিন শেষে শুধু বন্যার জল, ঘটি বাটি আর ডায়রিয়া মহামারী, চারিদিক থেকে ধেয়ে আসে যেন পামিয়ান যুগে বরফ গলিত ধারা। রংপুর ভাসে কুড়িগ্রাম ভাসে — গ্রামবাসীদের ঘর ডোবে আর ডুবে মরে সম্ভ্রম। কাল থেকে কালে আমি ভেসে যাই — হাতে কিছু নাই খড়কুটো নাই ধরবার ছুতোখানি।
 
 
 
 
 
ফানকুর পৃথিবী
 
 
 
 
 
ফানকুর কথা যে জানে সে জানে
একদিন এই পৃথিবী কিংবা আকাশ ছিলো না।
 
যারা মানে, মানে ফানকুর গড়া সেই মহাডিম
ভেঙে গড়া হয় আকাশ পৃথিবী
বিজুলি বজ্র মেঘ;
আঠার হাজার বছরের ঘুম
ভাঙে নাই, ভেঙেছে অশ্বডিম।
ফানকুর চোখ জ্বলে লাল রবি
চোখ থেকে সাদা চাঁদ
চারদিকে কতো পাহাড় খন্দ
কতো বেদনার ফাঁদ ও ফন্দি।
 
আমি খুঁজে মরি ফানকুর সে কুঠার —
যার আঘাতেই পৃথিবী হয়েছে,
ডিম হলো ছারখার।
বরফ হাতড়ে যতোটুকু যাই
যতোখানি ঘুরি চীন,
ফানকুর কোনো ফসিলের দেখা
মেলে নাই মেলে নাই।
বরফ যুগের হিম শীতলতা
দু:খগুলোকে ঢাকে
লাল চোখ থেকে সূর্যের তেজ
সাদা চাঁদ দেয় প্রেম।
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত