| 27 ফেব্রুয়ারি 2025
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অসমিয়া অনুবাদ উপন্যাস: অর্থ (পর্ব-২১) । ধ্রুবজ্যোতি বরা

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

ডক্টর ধ্রুবজ্যোতি বরা পেশায় চিকিৎসক,অসমিয়া সাহিত্যের একজন স্বনামধন্য লেখক ২৭ নভেম্বর ১৯৫৫ সনে শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন ।শ্রীবরা ছাত্র জীবনে অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিলেন ।’কালান্তরর গদ্য’ ,’তেজর এন্ধার‘আরু’অর্থ’এই ত্রয়ী উপন্যাসের লেখক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। ২০০৯ সনে ‘ কথা রত্নাকর’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বাকি উপন্যাসগুলি ‘ভোক’,’লোহা’,’যাত্রিক আরু অন্যান্য’ ইত্যাদি।ইতিহাস বিষয়ক মূল‍্যবান বই ‘রুশমহাবিপ্লব’দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’,’ফরাসি বিপ্লব’,’মোয়ামরীয়া বিদ্রোহ’।শ্রীবরার গল্প উপন্যাস হিন্দি, ইংরেজি, বাংলা, মালয়ালাম এবং বড়ো ভাষায় অনূদিত হয়েছে।আকাডেমিক রিসার্চ জার্নাল’যাত্রা’র সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ।’ কালান্তরর গদ্য’ উপন্যাসের জন্য ২০০১ সনে অসম সাহিত্য সভার ‘ আম্বিকাগিরি রায়চৌধুরি’ পুরস্কার লাভ করেন।শ্রীবরা অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি।


অনুবাদকের কথা

কালান্তর ট্রিলজির তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হল’অর্থ’। সশস্ত্র হিংসার পটভূমি এবং ফলশ্রুতিতে সমাজ জীবনের দ্রুত অবক্ষয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার তাড়না এবং বেঁচে থাকার পথ অন্বেষণেই আলোচ্য উপন্যাসের কাহিনী ভাগ গড়ে তুলেছে। সম্পূর্ণ পৃথক একটি দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে অসমের মানুষ কাটিয়ে আসা এক অস্থির সময়ের ছবি আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষের অন্বেষণ চিরন্তন এবং সেই জন্যই লেখক মানুষ– কেবল মানুষের উপর আস্থা স্থাপন করতে পারে।

এবার উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ নিয়ে এলাম।আশা করি ইরাবতীর পাঠকেরা এই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত অসাধারণ উপন্যাসটিকে সাদরে বরণ করে নেবে ।নমস্কার।

বাসুদেব দাস,কলকাতা।


ঘরের পেছন দিকের বারান্দায়ওরা বসেছিল।

সামনে ব্রহ্মপুত্র।

দুটিকে বিস্তৃত বালুচর- দূরান্তে কুরুয়ারচাপরি। মাঝখানের বালুচরের পাশে ছোট্ট জেলে নৌকা। পশ্চিমে দূরে একটা মেশিন  চালানো ভটভটি পার হচ্ছে। উত্তর গুয়াহাটির পাহাড় গুলির সীমারেখা ঝকঝকে রোদে ধূসর বলে মনে হচ্ছে।

‘ এবার মরিনি যখন সহজে আর মরব না বুঝেছ।’

শ্রীমান অঞ্জুদার দিকে তাকাল। ব্যান্ডেজ করা বাঁ হাতটা ডান হাত দিয়ে টিপে টিপে তিনি তার দিকে তাকিয়ে হাসছেন।

সে আর কি উত্তর দেবে? বোকার মতো হাসল শুধু।

‘ কিন্তু ওদেরজায়গায় আমি যদি বন্দুক চালাতাম কেউ রেহাই পেত না । অটোমেটিক রাইফেল দিয়ে বা একে ৪৭ দিয়ে গুলি করা একটা আর্ট বুঝেছিস । প্রায় অবাধ্য হয়ে ওঠা একটা বস্তুকে কন্ট্রোল করে তোমাকে টার্গেটেহিট  করতে হবে।।’

কী অবাধ্য?’

‘ গুলি চলতে আরম্ভ করার সঙ্গে সঙ্গে বন্দুকটা অবাধ্য হয়ে উঠতে চায়।

সেদিন রাত থেকে শ্রীমান অঞ্জুদা-র সঙ্গে রয়েছে। অঞ্জুদাই তাকে থাকতে বলেছে। রাত বারোটার সময়ওরা হাসপাতাল থেকে অঞ্জুদা কেনিয়েবাড়ি ফিরেছিল। অঞ্জুদার বাঁ হাতে গুলি লেগেছিল। কাপড়ভেদ করে সামান্য আঘাত লেগেছিল, রক্ত প্রচুর  বেরিয়েছিল,মাংসের ভেতরে গুলি ঢোকেনি। গাড়িতে থাকা বাকি দুজন গুরুতর ভাবে আহত হয়েছিল। ওরা এখনও হাসপাতালে– একজন ইনটেনসিভ কেয়ারে আছে। রমেন চব্বিশ ঘন্টা ওদের চার্জে। শ্রীমানকেঅঞ্জুদা সঙ্গে নিয়ে এসেছে।

নিচতলার ঘরে অনেক ছেলে ।প্রত্যেকের হাতে বন্দুক। পেছনের  বাগানে বসে ওই যে ছেলে দুটি বন্দুক সাফা করছে। বাড়ির চারপাশে সাধারণ কাপড় পরা ইউনিফর্ম পরা পুলিশের পাহারা। চারপাশের দেওয়ালটা মিস্ত্রিরা ইটের গাঁথুনি দিয়ে আরও উঁচু করছে ।তার উপরে কাঁটাতারেরবেড়া থাকবে। কাঁটাতারের তিনটি বড় মুঠো একটি গাছের নিচে ফেলে রাখা আছে। সমস্ত ঘরে, পুরো চৌহদে যেন একটা চাপা যুদ্ধকালীন উত্তেজনা বিরাজ করছে।

কিন্তু উপরের মহলটা শান্ত। পেছনের দীর্ঘ বারান্দার দুই প্রান্তে হাতে বন্দুক নিয়েচেয়ার পেতে দুটি ছেলে নীরবে বসে আছে। পুলিশের মানুষ নাকি অঞ্জুদার ছেলে বোঝার উপায় নেই। মাঝখানে অঞ্জুদা  এবং সে বেতের চেয়ারে বসে আছে। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ওরা রয়েছে। মাঝেমধ্যেপুলিশেরমিলিটারি অফিসাররা খবর করতে আসে। এইটুকুসময়ের মধ্যে শ্রীমান তাকে দেওয়াশোবার ঘরে  চলে যায়। পুনরায় অঞ্জুদা তাকে ডেকে পাঠায়। শ্রীমান লক্ষ করল অঞ্জুদাঅসম্ভবভাবে শান্ত এবং নিরুদ্বিগ্ন  হয়ে আছে। মোবাইল ফোন অফ করে রেখেছে। খুব জরুরী ফোন থাকলে কোনো  একটি  কর্ডলেস ফোন বা একটা মোবাইল নিয়ে আসেন। যেন কোনো উদ্বেগ নেই ,উত্তেজনা নেই মানুষটার শরীরে।

শ্রীমানকে তিনি কেন নিজের সঙ্গে রেখেছেন সে নিজেই বুঝতে পারছে না। এর আগেতো কখন ও তার সঙ্গে এতটা ঘনিষ্ঠতা ছিল না। বোধ করি সে অন্যরকম বলে, তার সঙ্গের দলটির মানুষ নয় বলেই তাকে কাছে রেখেছে। পরিচিত চক্রটির সান্নিধ্য হয়তো তার এই মুহূর্তে ভালো লাগছে না। তার মনে হল বাকি ছেলেগুলি কতটা সম্ভ্রমের সঙ্গে তার সঙ্গে কথা বলে।

যৌবনে টগবগ করা ব্যায়ামপুষ্ট শরীর ছেলেগুলির। দুই একজনের সামান্য ভুঁড়িবেরিয়েছে। এইসব ছেলেগুলি কোথাকার, কোথায় ওদেরবাড়ি– ছেলেগুলিকে দেখলেই শ্রীমানেরওদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে প্রাণ খুলে কথা বলতে ইচ্ছা করে।

‘ এখন কী হবে?’ জিজ্ঞেস করব কি করব না ভেবেও কথাটা একবার সে জিজ্ঞেস করল।

‘ কীভাবে বলবে। প্রতিটি ক্রিয়ার একটি প্রতিক্রিয়া থাকেই, নয় কি। কিন্তু একটি কথা, সায়েন্সের  বাইরেসমাজটিতে এই প্রতিক্রিয়া সব সময় সমান এবং বিপরীত না হতেও পারে। একটি ছোটো ঘটনার প্রতিক্রিয়া কখনও হয় সাংঘাতিক এবং বড়ো ঘটনারও কোনো প্রতিক্রিয়া না হতে পারে। কথাগুলি আসলে আপেক্ষিক নয় কি?’

হ্যাঁ, সবকিছুই আপেক্ষিক। কিন্তু এই আপেক্ষিকতা সব সময় মাপা যায় না। শ্রীমান কথাটা ভাবল। কিন্তু সে কোনো জবাব দিল না।

‘ এখন কী হয় দেখা যাক,’ অঞ্জুদা বলল।’ আগে থেকে তো কিছু  বলাযায় না। আচ্ছা ঘরের কাজ আর কতটা বাকি আছে?’

‘ আরও তিন মাসের মতো লাগবে।’

‘ এক মাসের মধ্যে কাজ শেষ করে ফেলতে হবে। সমস্ত সাপ্লায়ার, ঠিকাদারকে আগামীকাল ডেকে পাঠাবে। আমি কথা বলব। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করতে হবে।’

উপরের মহলটা এখনও খালি হয়ে আছে,’ শ্রীমান বলল।

‘বিক্রি করে দাও ওটা। রাখতে হবে না । পরিচিত দুটো পার্টি আছে । আমি বলেদেব, টাকা দিয়ে যাবে।’

‘ আপনি, আপনি কিছুই রাখবেন না?’

‘ না, না, দরকার নেই। কত আর রাখবে! বিক্রি করে দাও।’

বাবা খুব খুশি হবে শ্রীমান ভাবল। আর সত্যিই যদি তিনি বলার মতো পার্টি ঠিক করা থাকে তাহলে কমিশনও পাবেন।

অঞ্জুদা নিজের মনেই কথা বলে যেতে লাগলেন।তাঁরমুড এসেছে। হয়তো কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে। সঙ্গে থাকা ছেলেগুলিকে হয়তো এসব কথা বলতে পারে না। স্কুলের জীবনের কথা, ছাত্র আন্দোলনের কথা ,আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনের বিক্ষিপ্ত ঘটনা, নিজের ভাবনা- চিন্তা। শ্রীমান মাঝেমধ্যে সায় দিয়ে যেতে  লাগল, ছোটোখাটো প্রশ্ন করল। অঞ্জুদা জেলে থাকার সময়েরকাহিনি বলছিল।

‘ একজন মানুষের কথা আমি একেবারেই ভুলতে পারিনি বুঝেছ– তার কথা মনে পড়ে। জামিন দেবার মতো কেউ না থাকার জন্য জেলের মধ্যে পচতে থাকা একজন মানুষ। আজও সেই বুড়ো মানুষটিরকাহিনি আমাকে ভূতের মতো তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়– তার কথা মনে পড়লেই আমার খুব দুঃখ হয় আর দুঃখ হলেই তার কথা মনে পড়ে। মানুষটার সঙ্গে ঠিক কখন আমার দেখা হয়েছিল আমার মনে নেই, আমি জেলে যাওয়ার আগে থেকেই, হ্যাঁ হ্যাঁ। আগে থেকেই তিনি সেখানে ছিলেন…  …’ অঞ্জুদা একান্ত মনে কাহিনি একটা বলতে শুরু করল।

 

মানুষটা জেলের ঠান্ডামেঝেতেজড়োসড়ো হয়ে শুয়েছিল।

তিনি ঘুমাচ্ছিলেন না জেগে ছিলেন দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না। এত নিঃসার  হয়ে তিনি পড়েছিলেন যে শ্বাস প্রশ্বাস বইছে কিনা সে কথাটাও বোঝা যাচ্ছিল না। কেবল তার কপাল এবং গলা থেকে ঘামের ফোটা মাঝেমধ্যেখসেপড়ছিল।

আসলে কয়েকদিন তিনি কোনোসাড়াশব্দ না করে পড়েছিলেন। জ্বর আরম্ভ হওয়ার দিন থেকেই।

তিন ভাঁজ করে পেতে নেওয়া একটি জরাজীর্ণ কম্বলের ওপরে শতচ্ছিন্ন ফাটা  চাদর এবং নোংরা কাপাশের কম্বল গায়েদিয়েদিনরাত তিনি পড়েছিলেন। সকালে উঠে পা টিপে টিপে একবার বাইরে গিয়ে আসার পরে তিনি আবার সাড়াশব্দ না করে বুকে হাঁটু দুটো জড়িয়ে কাত হয়ে শুয়েপড়েতেন। দিনটা প্রায় এভাবেই তার পার হয়ে যেত। জ্বর হওয়ার আগে একটু উঠে ঘোরাফেরা করতেন কিন্তু জ্বর হওয়ার পর থেকে তিনি বিছানাতেই পড়ে থাকতে লাগলেন। সঙ্গের লোকেরাও তাকে খুব বেশি ডাকাডাকি করে না ,বিরক্ত করে না। তারা তাকে ডেকে না নিলে কখনও কখনও তার খাওয়াও হত না।

আসলে তার অস্তিত্বকে কেউ খুব একটা গুরুত্ব দিত না।

ঘরটাতেপ্রত্যেকেই যুবক; একদল যুবকের উপস্থিতি ঘরটিতে অহরহ এক উত্তেজনার তরঙ্গ সৃষ্টি করে রাখে। আর এই যুবকদের মধ্যে বুড়োমানুষটি সব সময় এত নিঃশব্দে চলাফেরা করে যে তার অস্তিত্ব বুঝতে পারাই মুশকিল হয়ে পড়ে। কারও চোখে চোখ পড়লে নিঃশব্দে একবার হাসি ছাড়া তিনি কিছুই বলতেন না। তার মুখের কথা যেন কবে হারিয়েগিয়েছিল, স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল বাকশক্তি…    


আরো পড়ুন: অর্থ (পর্ব-২০) । ধ্রুবজ্যোতি বরা


ঘরে থাকা বাকিরাদুপুরবেলা বা বিকেলে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে তাস বা লুডু খেলে, কখন ও দাবা খেলে। পুরোনো হয়ে যাওয়া দাবার অনেকগুলি গুটি ইতিমধ্যে হারিয়েগিয়েছিল । বিভিন্ন রং এবং আকারের পাথরের টুকরো দাবার গুটির পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছিল । খেলা আরম্ভ হলে ছেলেদের হাসি ফুর্তিতে ঘরটা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে । মানুষটার কিন্তু এসবে কোনো আকর্ষণ ছিল না । বরঞ্চ খেলার সময় বিশেষ করে তাস খেলায় হুলুস্থুল করা ছেলেদের দিকে অবাক হয়ে তাকাত।

সেই ঘরের তিনি ছিলেন সবচেয়েপুরোনো বাসিন্দা।

ইতিমধ্যে সেই ঘরেঅনেক ছেলে এসেছিল চলে গিয়েছিল । তিনি আসার সময় যে সমস্ত ছেলে সেখানে ছিল, ওদের একজনও এখন সেখানে নেই । কবেই তারা চলে গেছে। এখনকার ছেলেগুলি অনেক পরে আসা। তিনি আসার অনেক পরে …   …

বুড়োমানুষটাকে সেখানে দেখে ওরা প্রথম অবাক হয়েছিল। তারপরে ঘরে থাকা বিছানা, খাওয়ার জলের মাটির কলস, বিছানার কাপড়েরনুরা এবং মেঝেতেবিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে থাকা হাওয়াই স্যান্ডেলেরমতো তাঁর নিঃশব্দ উপস্থিতি মেনে নিয়েছিল। ঘরের অন্য জিনিস গুলোরমতো তিনি একটা বস্তু হয়ে পড়েছিলেন।

অবস্থিতিহীন অবস্থিতির মতো একটা অবস্থা তাঁর।

জ্বর হয়ে নিঃসার হয়ে পড়ে থাকা মানুষটামাঝেমধ্যে ছেলেদের কথাগুলি শুনছিল। ওদের কথাবার্তা যেন বহুদূর থেকে, পাহাড়ের পাশের ঘন কুয়াশার মধ্য দিয়ে ভেসে আসা অস্পষ্ট অসংলগ্ন কথার মতো মনে হচ্ছিল তাঁর। কুয়াশার মধ্য দিয়ে ভেসে আসা কথার মতো। 

মাঝেমধ্যে তিনি গভীর ঘুমে ঢলে পড়েছিলেন, মাঝেমধ্যেজেগে উঠছিলেন। জেগে ওঠার সময়টুকু ছিল তাঁর কাছে এক ধরনের ধোঁয়াময়অর্ধচেতন অবস্থার মতো। মাঝেমধ্যেহয়তোঘুমিয়ে পড়ার সময়টুকুতে তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন– অদ্ভুত ধরনের রঙচঙে স্বপ্ন এবং জেগে উঠলে তিনি সেই স্বপ্নগুলোর কথাই বা ছেলেদের কথাই ভাবতেন।

মাঝেমধ্যে তার ঠান্ডা লাগছিল।  মেরুদন্ডের নিচ থেকে পিঠ হয়ে একটা শিরশিরানির ভাব যেন উপর দিকে বেয়ে উঠছিল। জ্বর হওয়ার পরেই বেশি করে শীত শীত ভাবটা মনে হচ্ছিল। হাড়ের মজ্জা থেকে যেন ঠান্ডাটা ধীরে ধীরে সমস্ত শরীরে ছড়িয়েপড়ছিল। চটের একটা বস্তা ভাঁজ করে নিয়ে মাথার বালিশ করে নিয়েছিল।বেশিঠান্ডালাগায় তিনি দুর্বল হাতে মাথার নিচ থেকে বস্তাটা বের করে আনতে চেষ্টা করেছিলেন। বস্তাটা গায়েদিয়েনিলে কি জানি ঠান্ডাটা একটু কমবে। কিন্তু কাজটা করার মতো তার শক্তি ছিল না। একবার দুবার চেষ্টা করার পরে তার ইচ্ছা নাই হয়ে গিয়েছিল। বেরিয়েআসার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সব সময় করার মতো হাঁটু দুটো বুকের কাছে চাপিয়ে এনে আরও বেশি জড়োসড়ো হয়ে শুয়েপড়েছিলেন। 

বেশিরভাগসময় তিনি এভাবেই শুয়ে ছিলেন।

ঘরটিতেমানুষটার সামান্যতম অবস্থিতিও নাই হয়ে পড়েছিল।

তন্দ্রাচ্ছন্নমানুষটার মনে একের পর এক ছবির মতো কিছু  ঘটনা ভেসে  আসছিল– অসংলগ্ন ছবির মতো…  …

তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন নাকি? সিনেমার মতো ছবি দেখা স্বপ্ন! হ্যাঁ, সিনেমার ছবির মতো স্বপ্ন। এত সতেজ সজীব ছিল স্বপ্ন গুলি, ছবিগুলি! এরকম মনে হচ্ছিল যেন তিনি সেই ভেসে বেড়ানো ছবিগুলির মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন।

কোথা থেকে যেন একটা গন্ধ ভেসে  আসছিল।

দুগ্ধবতী গরুর গায়ের গন্ধ? ওই যে কুয়াশার মধ্য দিয়ে গাভীর হাম্বা রবের শব্দ ভেসে আসছিল নাকি? হাম্বা রবের শব্দ। গন্ধ ,শব্দ ,গন্ধ!

সকালে দুধ দোয়ানোর কাঁচা দুধের এবং গরু -বাছরেরগায়ের গন্ধ মিশ্রিত হয়ে যে গন্ধটা বের হয় সেটা। হ্যাঁ ,সেই গন্ধটা। মানুষটার শরীরটা যেন এবার শিউরে উঠল।

সবুজ পাহাড়ের হেলানোগায়ে বানানো দীর্ঘ গোয়ালঘরটা– স্বর্ণতরু  গাছের গায়ে হেলান দিয়ে থাকা গোয়ালঘরটা- সকালের রোদ এসে যেখানে ভেতরে পড়ে, বাদামি রংয়ের গরুগুলির তাই সকালের রোদ পড়ে সোনালি হয়ে ঝলমল করে।

আর যখন স্বর্ণতরুফোটে? আঙ্গুরের থোকার মতোস্বর্ণতরু  ফুলগুলি যখন ফোটে তখন গোয়ালঘরের চালটা, সামনের দিকের উঠোনটা সোনালি রঙের ফুলে পড়ে। সোনার মোহরের মতো ফুল।

সেরকম একটি সকালে মানুষটাচিৎকার করে ডেকেছিল– ধনমায়া- ধনমায়া, বড়ো জগ এবং বালতিটা তাড়াতাড়ি…  …

জ্বরের ঘোরে থাকা মানুষটা যেন চিৎকার করেধনমায়াকে ডেকেছিল।

ধনমায়া কোনো উত্তর দেয়নি।

ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা টুংটাং শব্দ থেকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ধনমায়া বাসন ঠিক করছে।বড়ো কাজের মেয়েটি-তিনি ভেবেছিলেন।নিঃশব্দেধনমায়া দুধের বাসনগুলি নিয়ে এসেছিল-ঘষেঘষেরূপোরমতো চকচকে করে ফেলা অ্যালুমিনিয়ামের জগ দুটো এনে বালতির সঙ্গে সে গোয়ালঘরের সামনে চাংঘরেরেখেছিল।খালিবালতিটা এনে এবার সে তার হাতের দুধ ভর্তি বালতিটা খালি করে দিয়েছিল।বালতিরদুধটুকু খুব সাবধানে সে অ্যালুমিনিয়ামেরজগটাতে ঢেলে দিয়েছিল।কাঁচা দুধের ফেনা উঠছিল,দুধের ফেনা আর গন্ধ।

দুধ দুইয়ে দিতে আসা যুবক ছেলেটিও নিজের বালতিরদুধটুকু এনে জগে ঢেলেছিল।একটা ভর্তি হলে অন্য একটিতে।ধনমায়া জগে দুধ ঢালার সময় খেয়াল রাখছিল -যেন দুটো জগে দুধ সমান হয়।সাইকেলেরক্যারিয়ারেপাথালি করে বেঁধে  নেওয়া বাঁশটা থেকে তখন দুদিকে দুটো জগ বেঁধে ঝুলিয়ে নিতে সুবিধা হয়।

      স্বর্ণলতা ফুলের নিচ দিয়ে গোয়ালঘরেরপথ;স্বর্ণখন্ডগুলি গরু এবং মোষের পা মাড়ানোয় কাদার মধ্যে ঢুকে পড়েছিল।

      কাদায় ঢুকে পড়া সোনাগুলির কথা মানুষটার মনে পড়ছিল।

      আগের মতো সে গালিগালাজকরছিল,’তুই আগের মতো গরুগুলির যত্ন করছিস না?এই দেখ গলার কাছে আঁঠালি লেগে আছে।’

      ‘কাল ছিল না,’ধনমায়ার কন্ঠস্বর যেন কুয়াশার মধ্য দিয়ে ভেসে আসছিল।‘রাতের মধ্যে লেগেছে।’

      দুধ যাতে ফেটে না যায় তার জন্য ধুয়ে নেওয়া কিছু কাঁচা পাতা দুধের জগে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল।দুধদোয়ানোরছেলেটি এবার এক থালা নুন ভাত খেয়ে জগদুটো সাইকেলের টিউবের রবার দিয়ে ক্যারিয়ারের দুই পাশে বেঁধেছিল  এবং দুই মাইল দূরে থাকা বড়ো রাস্তার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গিয়েছিল…  …

     আগে সে নিজে দুধ দিতে যেত। তখন দুধ দোয়ানোর জন্য ছেলেটি ছিল না।সে আসার পর থেকে সেই যায়,মনবাহাদুর যায় না।

          খিটিং-টিং-খিটিং-টিং -ফিরে আসার সময় খালি জগদুটো শব্দ করছিল। সেই শব্দটা সে শুনতে পেয়েছিল,অনেক দূর থেকে ভেসে আসা শব্দ-খিটিং-টিং-খিটিং-টিং ।

স্বপ্ন দেখে সোজা হয়ে পড়া মানুষটাপুনরায় জড়োসড়ো হয়ে পা দুটো বুকের মধ্যে ঢুকিয়েনিয়েছিল।ঠান্ডাটা বেড়ে চলছিল।মেরুদন্ডের ওপরের চামড়ার লোমগুলি দাঁড়িয়ে পড়ছিল-একটা ছোটো পোকার মতোঠান্ডাটা যেন নিচ থেকে বেয়ে বেয়ে ওপরের দিকে উঠছিল। হি হিহি করে বুড়োর মুখ থেকে শব্দ বের হচ্ছিল।দাঁতের পাটি দুটি সজোরে কামড়ে ধরে তিনি আরও বেশি জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে পড়েছিলেন।পারলে যেন হাত-পা গুলি নিজের শরীরের ভেতরে ঢুকিয়ে নেবেন। 

একটা সময়ঠান্ডাটা কমে এসেছিল– জ্বর উঠে এক জায়গায়থেমেগিয়েছিল। ধীরে ধীরেমানুষটাঘামতে শুরু করেছিল। গরম ,এবার গরম লাগছিল। গরমে তিনি জেগে উঠেছিলেন। তন্দ্রার ভাবটা সরে গেলেও তার মনে গোয়ালঘরে জ্বালানো ধোঁয়ারমতো কিছু একটা পাক মারতে লাগল।

ঘরের অন্য প্রান্তে ছেলেগুলি কথা বলছিল– ওদেরকণ্ঠস্বরও অনেক দূর থেকে ভেসে আসার  মতো মনে হচ্ছিল তাঁর। কী কথা বলছে ওরা? কোর্ট কাছাড়ির কথা? উকিলের কথা? জামিনের কথা? হ্যাঁ হ্যাঁ,ওরা জামিনের কথা বলছিল।

চোখ দুটো না খুলেই তিনি ওদের কথা শোনার চেষ্টা করেছিলেন।

‘ আগামীকাল তোর জামিন হবেই,’ কোনো একজন অপর একজনকে বলছিল।’ এত বড় উকিল লেগেছে, তুই দুই-তিন দিনের মধ্যেই বেরিয়ে যেতে পারবি।’

মনবাহাদুরেরস্নায়ুগুলি টনটন করে উঠেছিল। তিনি ছেলে দুটির কথাগুলি ভালোভাবে শোনার চেষ্টা করেছিলেন।

‘ বেরিয়েগিয়ে তোকে বলা কথাগুলি মনে রাখবি কিন্তু, ভুলে যাস না।’

‘ছয়মাস পরে জামিন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। না দিতেও তো পারে।’

‘ পেয়ে যাবি। আমি বললাম তুই কালকে জামিন পাবিই, দেখতে থাক।’ একটি ছেলে জোর দিয়ে বলেছিল।

ছেলেগুলি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।

‘ ৬ মাস?’ শব্দটা যেন বুড়োর মগজে এসে ধাক্কা মেরেছিল। মাত্র ছয় মাস? তোর নিজের কতদিন হল? বুড়ো মনের  ঘন কুয়াশার মধ্যে উত্তরটা খুঁজতে লাগলেন। ছয় বছর নয় কি? হ্যাঁ ,ছয় বছরই হয়েছে। ছয় বছর পার হয়ে গেল এবং এই ছয় বছর তিনি কেবল অপেক্ষা করলেন আমিনের জন্য।

ছয় বছর! ছয় বছর। জেলের নিজের ঘরটা গিয়েদেখেনি।

এই ছয় বছরে পাকা ঘরটার প্রতিটি ফাটল, প্রতিটি দাগ, জানালা দিয়ে দেখতে পাওয়া গাছের প্রতিটি পাতা, তার পরিচিত হয়ে পড়েছিল।ছয়টি  বছর তার জন্য হয়ে পড়েছিলঅন্তহীন অপেক্ষার সময় ।তার মামলার তারিখটা একদিন পড়বে,একদিন তিনি নিজেও এই ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া ছেলেগুলির মতো হাসতে হাসতেবেরিয়ে যাবেন; কতদিন এই ধরনের কল্পনায় তিনি বিভোর হয়ে পড়েছিলেন, কতদিন, কতবার ?তার লেখা- জোখা নেই।

বুড়ো এবার সজাগ হয়ে উঠেছিলেন, সেই প্রথম কয়েক দিনের কথা মনে করার চেষ্টা করেছিলেন…   …

প্রথমেই তাকে একজন বিচারকের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বিচারক ও  একজন আশ্চর্য জন্তুকে দেখার মতো তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি নিজেও অবাক হয়েছিলেন। বুড়োর মনে পড়ল– ভালোভাবে মনে পড়ল সেই কথাটা। তারপরে বিচারক প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে পুলিশ এবং সরকারি উকিলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

‘ ইনি জঙ্গলের মধ্যে থাকা আত্মগোপনকারীদের খাবার জিনিস যোগান দেওয়ার মূল মানুষ,’উকিল না পুলিশ কেউ একজন বিচারককে জানিয়েছিল। সেনারা এঁকে হাতেনাতে জঙ্গলের মধ্যে ধরেছে। জিনিসপত্র জোগাড় দিতে যাবার সময় ধরেছে।’ তাকে আরও পনেরো দিন পুলিশেরজিম্মায় রাখার জন্য ওরা বিচারকের কাছে আবেদন জানিয়েছিল। ইতিমধ্যে আট দিন সেনা এবং পুলিশেরজেলায় কাহিল হয়ে পড়া মানুষটার দিকে তাকিয়ে বিচারক ওদের প্রার্থনা নামঞ্জুর করেছিল।কাঁদতেকাঁদতেদাঁড়িয়ে থাকা বিচারকের আদেশ শোনা বুড়ো কিছুই বুঝতে পারছিল না ।তারপরেওরা তাকে জেলে নিয়ে এসেছিল।

উঁচু দেয়ালে ঘেরা জেলের মধ্যে থাকা দীর্ঘ একটা ঘরে এনে তাকে ঢোকানোহয়েছিল। ঘরটাতে আগে থেকেই থাকা ছেলেগুলিও তাকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। ওরাতাকে ঘিরে ধরেছিল। ছেলেগুলি তাকে ঘিরে ধরেছিল।

‘ তোমাকে টাডায় দিল নাকি দাদু? কোনো একজন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল।

টাডা! টাডা? সেরকম কোনো আইনের কথা তিনি আগে কখন ও শোনেন নি।

কিন্তু টাডায়  থাকা বাকি ছেলেগুলি একজন দুজন করে জামিনে বেরিয়েগিয়েছিল। ওদের আবার বিচারকের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিন চারবার যাবার পরে ওরা  জামিন পেয়েছিল। কেউ গিয়েছিল হাসপাতালে।

কতদিন তিনি আশা করেছিলেন তারও একটা দিন আসবে। তাকেও পুলিশনিয়ে  বিচারপতির সামনে দাঁড় করাবে। একদিন তিনি মুক্তি পাবেন।

গত ছয় বছর ধরে  এরকম একটি দিনের জন্যই তিনি অপেক্ষা করে রয়েছেন।

হ্যাঁ মুক্তির দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। একদিন তিনি বেরিয়ে যাবেন। ঘর থেকে, এই উঁচু দেওয়ালের মাঝখান থেকে, বাসে উঠে চলে যাবেন তার পাহাড়ে ঘেরা জায়গায়।পাহাড়েরহেলানোগায়েস্বর্ণতরু গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বানানো নিজের ঘর– নিজের গোয়াল ঘরে- সংসারে।

কিন্তু এই ছয় বছরে তাকে সবাই ভুলে গেল নাকি?

তাঁর সংসার! তার সংসারে কী হয়েছে? কথাগুলি ভাবতে ভাবতে তিনি এক সময় ভাবা ছেড়েদিয়েছিলেন। ভাবব না বলে ভেবেও চিন্তাগুলি কিন্তু মনের মধ্যে ঘুরেফিরে এসেছিল।

ঘুরেফিরে মনে পড়ছিলগোয়ালের গরুগুলির কথা!

পুনরায় তন্দ্রার ভাব তাকে চেপে ধরতে আরম্ভ করেছিল- পাহাড়ের কাছে গাঢ়কুয়াশা গুলি যেন ধীরে ধীরে তার মনের ভেতরে প্রবেশ করেছিল। একটা খোলা জানালা দিয়েধোঁয়া গুলি প্রবেশ করার মতোকুয়াশা গুলি মনের মধ্যে প্রবেশ করেছিল…   …

ঠিকই আছে কি তার গরুগুলি? ওদের মালিক এখনওগরুগুলোকে পালন করতে দিয়েছে কি? নাকি নিয়ে গেছে? তারমানে তার গোয়াল ঘরটা এখন খালি নাকি?ধনমায়া? ধনমায়া  কী করছে?সে কি গরুগুলিকে সামলাতে পারছে?

কুয়াশার মধ্য দিয়ে এবার তিনি যেন ধনমায়াকে দেখতে পেলেন – অস্পষ্টভাবে মুহূর্তের জন্য ।

সে জেলে এসেছিল। একবার,একবারই এসেছিল সে। প্রথম দিকেই প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই , তারপরে আজ এতদিন – পাঁচ বছর – ছয় বছরই হল সে আর আসেনি । সে আবার আসবে বলে তিনি এতদিন ধরে অপেক্ষা করছেন। অপেক্ষা করছেন …   …

পুনরায় একবার তন্দ্রার কোলে তিনি ঢলে পড়েছিলেন।

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত