আধুনিক যুগের জন্ম কাহিনি (পর্ব -৬)। হোমেন বরগোহাঞি
১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ‐– বাসুদেব দাস
এর আগে বলা হয়েছে যে কেবল ধর্ম শাস্ত্রের ওপরে একান্ত নির্ভরশীলতাইইউরোপীয় মানসকে বহু শতাব্দী ধরে অজ্ঞতা এবং অন্ধবিশ্বাসের কারাগারে বন্দি করে রেখেছিল। কিন্তু ১২ শতক থেকে ইউরোপের চিন্তার ইতিহাসে আরও একটি নতুন ঘটনা ঘটল। সেই সময় থেকেই ইউরোপে জ্ঞানের আকর গ্রন্থ হিসেবে বাইবেল ছাড়াও একজন গ্ৰিক দার্শনিকের রচনা নতুন করে যুক্ত হল। সেই দার্শনিকের নাম হল এরিস্টটল। কিন্তু আশ্চর্যের কথা এই যে,যেএরিস্টটলকে ইতিহাসের সর্বকালের একজন সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী বলে গণ্য করা হয়, সেই এরিস্টটলের প্রভাব ও কিন্তু কালক্রমে জ্ঞানের বিকাশের ক্ষেত্রে সহায়ক না হয়ে বহু পরিমাণে ক্ষতিকারক হল। বরং বলা হয় যে জ্ঞান সাম্রাজ্যের সম্রাট হিসেবে এরিস্টটলকেসিংহাসনচ্যুতকরার পরে আধুনিক জ্ঞান চর্চার পথ সুগম হয়েছে এবং সঙ্গে আধুনিক যুগের সূচনা হয়েছে। সে যাই হোক না কেনএরিস্টটলের বিষয়ে দুই চারটি কথা প্রতিটি শিক্ষিত মানুষেরই জানা উচিত, কারণ এরিস্টটলের নাম না শোনা কোনো মানুষকেই প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত বলা যায় না।
এরিস্টটল
উইল ডুরান্ট নামের একজন পন্ডিত পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দশ জন ভাবুক বা চিন্তাশীল লোকের যে তালিকা করেছেন সেই তালিকায়এরিস্টটল যে জায়গা পাবেন সেটা জানা কথা। উইল ডুরান্টলিখেছেনঃএরিস্টটল যে আমাদের তালিকায় থাকতেই হবে সে কথায় গোটা পৃথিবী একমত।মধ্যযুগে তার নাম দেওয়াহয়েছিলThe Philosopher অর্থাৎ দার্শনিক। অর্থাৎ মধ্যযুগের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন দার্শনিক-কুল-শিরোমণি, দার্শনিক শ্রেণীর শ্রেষ্ঠ প্রতিভূ। এরিস্টটলের পাণ্ডিত্য এত গভীর এবং বহুমুখী ছিল যে সভ্যতার ইতিহাসে তার কোনো তুলনা নেই।এইপাণ্ডিতের মধ্যে আমরা কি পাই?তাঁর প্রতিভা সমগ্র বিশ্ব এভাবে প্রদক্ষিণ করেছিল যে তখন থেকে আজ পর্যন্ত অন্য কোনো মানুষই সেটা করতে পারিনি ।তাঁর প্রতিভা বিজ্ঞান এবং দর্শনের প্রতিটি সমস্যাকে বিচার করে দেখেছিল, তার ওপরে নতুন আলোকপাত করেছিল, প্রতিটি সমস্যারই মোটামুটি সমাধানও বের করেছিল।তাঁর প্রতিভা যেন চারপাশে হাজার হাজার গুপ্তচর পাঠিয়ে জ্ঞান এবং তথ্য সংগ্রহ করেছিল এবং সেইসব এক জায়গায়স্তূপীকৃত করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহস্য ব্যাখ্যা করতে পারা সাধারন সূত্রে পরিণত করেছিল। দর্শনের পরিভাষা সৃষ্টি হয়েছিল তার হাতেই। হাতের একই পাকে বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখার সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। এক কথায় বলতে গেলে একমাত্র জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং চিকিৎসা শাস্ত্র ছাড়া বাকি সমস্ত বিজ্ঞানের ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল জ্ঞান তপস্বী এরিস্টটলের বিপুল পাণ্ডিত্য এবং সাধনার মধ্যে।’
যে মানুষ এরকম একটি মানুষের নামই শুনেনি তাকে কি প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত মানুষ বলা যেতে পারে?
খ্রিস্টপূর্ব ৩৮৪ সনে ইজিয়ান সাগরের তীরের স্টেগিরা নামের একটি ছোটো শহরে এরিস্টটলের জন্ম হয়েছিল।তাঁর পিতা ছিলেন মেসিডনের রাজা এমিন্টাসের বন্ধু এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসক। এই এমিন্টাসের নাতি হল বিশ্ববিজয়ী মহাবীর আলেকজান্ডার– পরবর্তীকালে যার গৃহ শিক্ষক হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলএরিস্টটলের। সৌভাগ্য বলে এইজন্য বলা হয়নি যে আলেকজান্ডারেরমতো একজন পৃথিবী বিখ্যাত মহাবীরকে ছাত্র হিসেবে পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। প্রাচীন গ্রিসেই হোক বা আধুনিক পৃথিবীতেই হোক, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং অধ্যয়নের জন্য প্রচুর ধনের প্রয়োজন। ধন না হলে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে খুব বেশি এগুনো যায় না। যেহেতু এরিস্টটল এক সময়েআলেকজান্ডারের শিক্ষাগুরু ছিলেন, সেই জন্য রাজা হয়েই আলেকজান্ডার এরিস্টটলকে তার বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য অকাতরে ধন দান করেছিলেন। সেটাই ছিল এরিস্টটলের আসল সৌভাগ্য।
আরো পড়ুন: আধুনিক যুগের জন্ম কাহিনি (পর্ব -৫)। হোমেন বরগোহাঞি
আঠারো বছর বয়সে এরিস্টটল উচ্চ শিক্ষার জন্য এথেন্সের একাডেমিতে ভর্তি হলেন। সেই সময়ে সেটাই ছিল গ্রিসেরসর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা কেন্দ্র। সেখানে এরিস্টটল শিক্ষাগুরু হিসেবে পেলেন প্লেটোকে। এরিস্টটলের মতোই প্লেটোও পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিকদের অন্যতম।তাঁর চিন্তা ধারাই গত দুহাজার বছর ধরে মানব-জাতির ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি এবং সাহিত্যকে গভীরভাবেপ্রভাবিত করে আসছে। এরকম দুটি বিরাট প্রতিভা গুরু শিষ্য হিসেবে মিলিত হওয়াটা এক অভাবনীয় বিরল ঘটনা। কিন্তু গুরু-শিষ্য পরম্পরার প্রতিভা এবং পান্ডিত্য স্বীকার করলেও তাদের মধ্যে অনেক কথায় মতানৈক্য ও ঘটেছিল। অবশ্য কোনো ব্যক্তিগত কারণে এই মতানৈক্যঘটেনি; মতানৈক্যের কারণ ছিল জ্ঞান চর্চার লক্ষ্য এবং পদ্ধতি সম্পর্কে দুজনের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পার্থক্য। প্লেটোর প্রধান আগ্রহ ছিল বিমূর্ত ধারণা এবং গণিতের প্রতি। সত্য, ন্যায়, মঙ্গল- এই শব্দগুলি প্রকাশ করা ধারণা হল বিমূর্ত ধারণা।
যে কোনো সংখ্যা– এক বা এক হাজার বা এক কোটি– এটাও হল বিমূর্ত ধারণা। প্লেটোর মত ছিল এই যে মানুষের মন দার্শনিক চিন্তার উপযোগী করে তুলতে হলে গণিতের অধ্যয়ন অত্যন্ত আবশ্যক, কেননা গণিতের অধ্যয়ন মানুষের মন চোখে দেখা এবং হাতে স্পর্শ করতে পারা বস্তুগুলি থেকে সরিয়ে এনে সংখ্যা,চিহ্ন, প্রতীক এবং নক্সা ইত্যাদি বিমূর্ত ধারণা গুলির প্রতি আকৃষ্ট করে। এরিস্টটল গণিতের মূল্য একেবারে অস্বীকার করেন নি। কিন্তু প্লেটো গণিতের ওপরে যতখানি গুরুত্ব দিয়েছিলেনততখানি গুরুত্ব দিতে এরিস্টটল প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে একমাত্র গাণিতিক পদ্ধতি প্রয়োগের দ্বারা সমস্ত ধরনের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং তথ্য আহরণ করা যায় না। তাছাড়া তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে কেবল বিমুর্ত ধারণা গুলির বিষয়ে চিন্তা করেই বিশ্বজগতের বিষয়ে সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায় না । জ্ঞান লাভের প্রধান উপায় হল চোখে দেখা বস্তুগুলি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে প্রত্যেকের শ্রেণীবিভাগ করা।
কিন্তু গুরুর সঙ্গে এই ধরনের গুরুতর মত-পার্থক্য থাকলেও প্লেটোরএকাডেমিতে কুড়ি বছর শিক্ষা লাভ করেই এরিস্টাটল সেই যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ পন্ডিত হয়ে উঠলেন। খ্রিস্টপূর্ব ৩৪২ সনে প্লেটোরমৃত্যু হয়। এর মধ্যে ম্যাসিডনের রাজা ফিলিপএরিস্টটলকে তাঁর ১৩ বছরের পুত্র আলেকজান্ডারেরগৃহশিক্ষক হওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। ফিলিপের নিমন্ত্রণ রক্ষা করে মেসিডনিয়ায়গিয়ে সেখানে সাত বছর থাকলেন। এরিস্টটলআলেকজান্ডারের ওপরে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পেরেছিল বলে বিশ্বাস করা যায় না। কিন্তু তাদের এই গুরু শিষ্যের সম্পর্কটা যে বিজ্ঞানের উন্নতির ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়কহয়েছিল সেই কথা একবার উল্লেখ করা হয়েছে। ফিলিপের মৃত্যুর পরে আলেকজান্ডার সিংহাসনে উঠেই এরিস্টটলকে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য যথেষ্ট ধন মঞ্জুর করলেন। তাছাড়া তিনি এরিস্টটলকে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করার কাজে সহায় করার জন্য একদলসহকারীয়নিয়োগ করলেন। এই সহকারীরাএরিস্টটলের জন্য দূর দুরান্তর থেকে বিভিন্ন বিচিত্র প্রাণীর নমুনা সংগ্রহ করে আনতেন আর সেগুলোকে শ্রেণীবদ্ধ করার কাজে এরিস্টটলকে সাহায্য করতেন। এভাবে এরিস্টটলের হাতেই বিজ্ঞানের প্রানীতত্ত্ব নামের শাখাটির জন্ম হল। এরিস্টটলেরপ্রাণীতত্ত্ব বা জীববিজ্ঞান সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণার ওপরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য তার মূল্য চিরস্থায়ী বলে বিবেচিত হয়েছে। বস্তুতএরিস্টটল প্রাণীগুলির যে শ্রেণীবিভাগ করেছিলেন তার কোনো পরিবর্তন আঠারো শতক পর্যন্ত হয়নি। কিন্তু উপযুক্ত যন্ত্রপাতির সাহায্য না নিয়ে কেবল অনুমান এবং কল্পনার সাহায্যে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে সমস্ত তত্ত্ব বা মতবাদ উদ্ভাবন করেছিলেন সেগুলি ছিল এমনিতেই ভুল। উদাহরণস্বরূপ তিনি এই তত্ত্বে বিশ্বাস করেছিলেন যে আমাদের এই পৃথিবীই হল বিশ্ব চরাচরের কেন্দ্র এবং এটা সব সময় এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে। সমস্ত গ্রহ নক্ষত্রই একটি সম্পূর্ণ গোলাকার কক্ষপথে পৃথিবীর চারপাশে প্রদক্ষিণ করে। চন্দ্রের নিজস্ব আলো আছে। উপর থেকে নিচে পড়ার জন্য একটা হালকা জিনিসের চেয়ে একটি ভারী জিনিসের বেশিসময় লাগে ইত্যাদি। আজকাল এই সমস্ত কথা শুনলে পাঠশালার নিচের শ্রেণীতে পড়া ছাত্র-ছাত্রী নিশ্চয়হেসে উঠবে। কিন্তু এরিস্টটলের মৃত্যুর পরে সুদীর্ঘ এক হাজার বছর বছর ধরে এই উদ্ভট কথাগুলিকে বিশ্বাস করে থাকার জন্য সমগ্র পশ্চিমী জগতকে বাধ্য করানোহয়েছিল। এর ফলে বিজ্ঞানের অগ্রগতি এক হাজার বছর ধরে রুদ্ধ হয়ে রইল।
তার জন্য অবশ্য এরিস্টটলকে দোষের ভাগী করা যায় না। তিনি নিজে কখন ও এই কথা বলে যাননি যে তার মতবাদগুলিই চিরকালের জন্য সত্য, সেই বিষয়ে কেউ নতুন করে কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না। বরং তিনি নিজে একটি গ্রন্থ লিখে রেখে গেছেন যে জানতে চাওয়াটাই হল মানুষের স্বভাব। কিন্তু জানতে চাওয়া একটা মানুষ প্রচলিত মতবাদেঅন্ধভাবে বিশ্বাস করতে পারে না। প্রকৃত সত্য জানার জন্য পূর্ব থেকে প্রচলিত হয়ে আসা তথ্য বা মতবাদ গুলিকে নতুনভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে এবং নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু মধ্যযুগের ইউরোপে এরিস্টটলেররচনাবলীকে বাইবেলের ঠিক পরেই এরকম ভাবে প্রায় ধর্ম শাস্ত্রের মর্যাদা দেওয়া হল যে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং পদার্থ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তিনি প্রচার করে যাওয়া ভুল তত্ত্বগুলিকেও ধ্রুব সত্য বলে বিশ্বাস করার জন্য মানুষকে বাধ্য করানো হল। এরিস্টটল নিজেই বলেছিলেন–’ প্লেটোকে আমি ভালোবাসি, কিন্তু প্লেটোরচেয়েবেশিভালোবাসি সত্যকে।’ কিন্তু মধ্যযুগের ইউরোপ সত্যের চেয়েএরিস্টটলকেই বেশিভালোবাসতে থাকল। সেই জন্যই উপরে বলা হয়েছে যে সর্বকালের একজন সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও মধ্যযুগেরইউরোপে তার প্রভাব জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য সহায়ক না হয়ে ক্ষতিকারক হয়েছিল।
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের প্রতিভা এবং চিন্তা শক্তি ছিল বিষ্ময়কর। কোনো যন্ত্রপাতির সাহায্য না নিয়ে কেবল যুক্তি এবং বিচারবুদ্ধির সাহায্যে সেই সুদূর অতীতে অনেক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের কল্পনা করেছিলেন– যেসবের মধ্যে নিহিত হয়েছিল আধুনিক বিজ্ঞানের বীজ। কিন্তু অসামান্য মৌলিক প্রতিভার অধিকারীহয়েও তারা বিজ্ঞানকে আরও বেশি দূর এগিয়ে নিতে না পারার কারণ ছিল প্রধানত দুটি। প্রথম কারণটি হল এই যে তারা বিজ্ঞানের সাহায্যে প্রকৃতিকে জয় করে তাকে মানুষের সেবায়লাগানোরধারণাটিকে অতি হীন চোখে দেখত। অর্থাৎ তাদের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার মূলে কোনো ব্যবহারিক উদ্দেশ্য ছিল না। দ্বিতীয় কারণটা ব্যাখ্যা করে জেমস হার্ভেরবিনসন নামের একজন পন্ডিত লিখেছেনঃ’ গ্রিক সভ্যতার প্রধান ভিত ছিল দাস- প্রথা। কারিগরি বিদ্যার উন্নতির জন্য তারা কখনও চিন্তা করেননি। তাদের দৈনন্দিন সমস্ত কাজ করত দাসরা; এই ধরনের কাজকর্মের সঙ্গে জড়িত সমস্ত সমস্যা থেকে গ্রিক পন্ডিত এবং দার্শনিকরা নিজেদের সযতনে দূরে সরিয়ে রাখত। ফলে তাদের মধ্যে জীবনের ব্যবহারিক প্রয়োজনে লাগা নানা রকম সরঞ্জাম আবিষ্কার করার কোনো মানুষ ছিল না। এইসব ছাড়া প্রকৃতির রহস্য ভেদ করা সম্ভব নয়। গ্রিকদের কারিগরি প্রতিভা ছিল এমনিতেই নগণ্য। ফলে লেন্স (Lens) তৈরি করা তাদের পক্ষে সম্ভব হল না। খালি চোখে দেখতে না পারা ক্ষুদ্রবস্তু দেখার জন্য তাদের অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছিল না। দূরের জিনিস দেখার জন্য ছিল না দূরবীক্ষণ যন্ত্র। ক্যামেরা এবং স্পেকট্রোস্কোপ দূরের কথা, তারা যান্ত্রিক ঘড়ি, থার্মোমিটার এবং ব্যারোমিটার আবিষ্কার করতে পারল না। ফলে বিজ্ঞানের অগ্রগতির ক্ষেত্রে পরের পদক্ষেপটা নিতে মানুষকে আরও অনেক শতাব্দী অপেক্ষা করতে হল। বিজ্ঞানের এই দ্বিতীয়যুগটির সূচনা হল মাত্র তিনশো বছর আগে।

অনুবাদক