বই পড়ার কথা যদি ওঠে, এবং কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, আপনি কবে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বই পড়া শুরু করেছেন ? নির্দ্বিধচিত্তে এখানে আমি বলতে পারি, ক্লাস ওয়ান থেকেই আমার আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠ্যবই পড়া শুরু হয়েছিল । প্রাক প্রাথমিকের ধারণা আমাদের সময়ে ছিল না । আমাদের সময়ে ছিল না, তাই বলে যে একেবারে ছিল না, তা কিন্তু নয় । সেকালে ইংরেজ জমানায় অসমের যে মানচিত্র ছিল, সেই মানচিত্রের সব জায়গায় সেই সময়ে যে নামেই হোক না কেন, প্রাক প্রাথমিকের শিক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর ছিল । আমাদের জ্ঞাতিকুটুম এবং মা–খালা–নানিরা তৎকালীন অসম প্রদেশে প্রাক প্রাথমিকে অধ্যয়ন করেছেন । সেই সময়ে অসমে যাঁরা মাধ্যমিক বা উচ্চশিক্ষা নিতেন, তাঁদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রাক প্রাথমিকের ক মান, খ মান, ওয়ান, টু থ্রি অধ্যয়ন করতে হত । এবং এইসব ক্লাসে কোনো ইংরেজি ছিল না । অর্থাৎ ক্লাস ফোর থেকে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল । এবং এটি সে সময় এমভি স্কুল অর্থাৎ মিডিয়াম ভার্নাকুলার স্কুল নামে ইংরেজ সরকার কর্তৃক পরিচালিত হত । বেঙ্গলে এমভি স্কুল থাকলেও জানামতে এখানে কোনো প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা চালু ছিল না । তৎকালীন অসমে প্রাথমিক, নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ম্যাট্রিকুলেশনের আগে সকলেই ১২ ক্লাস অধ্যয়ন করত । এবং এটি নিয়ে তখনকার কেউ কেউ বেঙ্গলের বন্ধুবান্ধব কাউকে পেলে খোঁচা মেরে নিজেদের বড়োত্ব জাহির করতে চেষ্টা করত ।
যাইহোক, এখন আমি আমার নিজের কাছে ফিরে আসি । আউট বই বা পাঠ্যসূচির বাইরে যে সব বইপত্র আছে, সেসব বইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে ক্লাস ওয়ান থেকে প্রমোশন নিয়ে ক্লাস টুতে ওঠার প্রাক্কালে । স্পষ্ট মনে আছে, সেই প্রমোশনে প্রথম স্থান অধিকার করায় স্কুল অথরিটির কাছ থেকে বই একটি উপহার হিসেবে আমার অধিকারে এসেছিল । শুধু নিজের কথা বলছি কেন, আমার সঙ্গে যারা ২য়, ৩য় স্থান অধিকার করেছিল, এবং ক্লাসে যাদের উপস্থিতি সর্বাধিক ছিল, এবং হাতের লেখা যাদের সুন্দর ছিল, তারা সকলেই এই আউট বই পেত । অর্থাৎ স্কুল থেকেই একটা চেষ্টা–চরিত্র করা হত, যাতে বড়ো হয়ে বই পড়ার একটা অভ্যেস গড়ে ওঠে । এবং বিভিন্ন দিবসে যেমন মহান স্বাধীনতা দিবস, মহান বিজয় দিবস এবং স্কুলের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে অধিকাংশ সময়েই বই–ই উপহার দেয়া হত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে । আনুষ্টানিকভাবে এই বই দেয়ার প্রবণতা কি এখন সবক্ষেত্রে চালু আছে ?
স্কুল থেকে প্রথম যে বই আনুষ্ঠানিকভাবে আমার হস্তগত হয়েছিল, স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে আমার সঙ্গে, তাহলে সেই কাঙ্খিত বইয়ের নাম যদ্দুর আমার মনে পড়ে, ছিল ‘গহন বনে রত্নাগার’ । এভাবে হাইস্কুলের শেষ ক্লাস পর্যন্ত আমার কাছে বেশ শিক্ষণিয় বই জমা হয়েছিল । দুএকটি বাদে প্রায় এই সবগুলো বই–ই আমি মনোযোগ দিয়ে পড়ে শেষ করেছিলাম ।
তখন কলেজে পড়ি । মন তো উচাটন । কী করি না করি, তার কোনো ঠিক–ঠিকানা নেই । বন্ধুবান্ধবদের প্রভাবে ছাত্র রাজনীতিতেও একটু–আধটু ঢু মারতে শুরু করেছি । যাইহোক, এগুলো অন্য বিষয় । সময় ও সুযোগ মতো হয়ত উপস্থাপন করা যাবে । তো একদিন অতি দূরের লতায় পাতায় মোড়ানো এক আত্মীয় ছোকরার ঘরে গিয়ে আমার চক্ষু তো চড়কগাছ হয়ে গেল ! গহন বনে রত্নাগার সহ আমার সকল বই তার জিম্মায় ! ব্যাটা বই চোর । বলে কী, আমার মাকে বলে এই বইগুলো সে পড়তে এনেছে । পড়া শেষ হলেই সে ফেরত দেবে । অবশ্য ফেরত আজ পরযন্ত তার আর দেয়া হয়নি ।
বইচোর বলে এক ধরণের চোরের স্বীকৃতি আছে কিন্তু আমাদের সমাজে । আমি আমার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে দূর্লভ এবং মূল্যবান বই লোপাট করতে দেখেছি । অবশ্য আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনই বা কদিন ছিল । তখন আমি রুটিরুজির সংগ্রামে ভীষণ ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছি । বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রাইভেট পড়াচ্ছি, আর কায়ক্লেশে জীবন ধারণ করছি । যাইহোক, বন্ধুটি আমার এই বই চুরির ধান্ধা করত শীত সিজনে । একদম ব্লেজার–টেজার পরে ফুলবাবু সেজে লাইব্রেরিতে ঢুকে তার পছন্দের বই নিজের মনে করে চুপচাপ নিয়ে আসত । তখন তো আর সিসি ক্যামেরা নেই । কে কার দেখে । এই বইচোর সন্দেহ থেকে আমিও নিজে মুক্তি পাইনি । বছর দশেক আগে সিলেটের এক বইয়ের দোকানে বই কিনতে গেছি, ফেরার সময় দেখি বইঘরটির মালিক কায়দা করে অপাঙ্গে তাকিয়ে আমার সবকিছু পরখ করে নিচ্ছেন ! বাইরে এসে যখন জুতোর ফিতা বাঁধছি, ভদ্রলোকটি কাছে এসে পায়ের গোড়ালি তুলে কিছুটা নুইয়ে আমার উন্মুক্ত ব্যাগটির ভেতর– বাহির সব দেখে নিচ্ছেন ! মেজাজ খানিকটা খিচড়ে গিয়েছিল । তিনি তো আর জানেন না, আমি কীভাবে বই পড়া শিখেছি ।
চেয়ে– মেগে আমার প্রথম পড়া উপন্যাসটির নাম ছিল নন্দিত নরকে । তখন আমি কিশোর । সুন্দরী এক কিশোরীর সঙ্গে ভাব– ভালোবাসার কারণে তখন দূর্দান্ত মুডে আছি । খাচ্ছি–ঘুরছি– ফিরছি । চরম দীনতা সঙ্গে নিয়ে বসবাস করলেও প্রতিদিন তার সঙ্গে দেখা হচ্ছে । আহা কী ভাব ! জাফর ইকবাল আমার নাম । তো একদিন দেখি, আমার ইমিডিয়েট বড়োবোন লুকিয়ে আড়াল করে হুমায়ূন আহমেদের নন্দিত নরকে পড়ছে । জিজ্ঞেস করতেই মুহূর্তে–ই লুকিয়ে ফেলল । আকলমন্দকে লিয়ে ইশারাই কাফি । আমিও ব্যাপারটা বুঝে গেলাম । দিন সাতেক বাদে অপালার ( ছদ্মনাম ) কাছ থেকে নন্দিত নরকে নিয়ে এলাম । সেই সময়ে নন্দিত নরকের আকর্ষণীয় ন্যুড প্রচ্ছদের কারণে কিশোর–কিশোরীদের কাছে এই বইটির আকর্ষণ বেড়ে গিয়েছিল । সন্দেহ নেই, হুমায়ূন আহমেদের এটি একটি সফল এবং জনপ্রিয় উপন্যাস ছিল । পাঠককূলও সাড়া দিয়েছিল ।
আরেকবার, এই সেরেছে । সব বলে দিচ্ছি ! তখন আমি সেবা প্রকাশনীর রহস্য উপন্যাসে বুঁধ হয়ে আছি । প্রতি সপ্তাহে এক পাঠিকাকে রহস্য উপন্যাস সরবরাহ করছি বন্দর বাজার হকার্স পয়েন্টের হকার ভাইদের কাছ থেকে ভাড়ায় নিয়ে । তখন আবার ভাড়ায় গল্প– উপন্যাস এসব পাওয়া যেত । তো আমিও পড়ি, তিনিও পড়েন । মনে হয় বছর দুয়েক গাঁটের পয়সা খরচ করে এই কর্মটি সম্পাদন করেছিলাম । তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটি কী ছিল তা না হয় উহ্যই থাকল ।
বই পড়ে আমার যে লাভটি হয়েছে, গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, আমার দেখার চোখটি কমবেশি খুলে গেছে । এই দেখা সেই দেখা নয় । এই দেখা জগৎ ও জীবন সম্পর্কে নিজস্ব একটা উপলব্ধি । একদম সাধারণ একজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে, উপলব্ধিতে ।

জন্মঃ ১লা জানুয়ারি, সিলেট শহর। ছোটোগল্পে হাতেখড়ি ২০০৯ সালে একটি জাতীয় দৈনিকে লেখার মাধ্যমে। তারপর আর থেমে থাকেননি। অবিরাম লিখেই চলেছেন। তাঁর গল্পে বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চল সিলেটের জনমানুষ, প্রকৃতি ধরা দেয় নির্মোহ ভঙ্গিতে।