শারদ সংখ্যা গল্প: অসুখ । নন্দিনী সেনগুপ্ত
বৈশাখী গল্প খুঁজছে। একটা নিটোল গল্প। আসলে আগে সে এত গল্প খুঁজতো না। একটু আধটু কবিতা লিখবার অসুখ ছিল তার। ফাঁকে ফাঁকে একটু ছন্দ মিলিয়ে, অন্ত্যমিল দিয়ে যা মনে হত, লিখত। সংসার সামলে যা মনে হয়। ওটাকে সে অসুখ বলেই ভেবে এসেছে এতদিন। অসুখ ছাড়া আর কিছু নয় ওই লিখবার বাই। হঠাৎ আকাশে মেঘ করলে যেমন মন খারাপ লাগে, ব্যাপারটা ঠিক সেরকম। একটু ধৈর্য ধরে বসতে হবে ডায়েরির সাদা পাতার সামনে কলম হাতে। লেখ, যা মনে হয় লিখে ফেল। মনটা হাল্কা লাগছে কি না? ব্যস। ওইটুকুতেই খুশি ছিল সে। এই যে হঠাৎ মন খারাপ, তারপর কিছু লিখলে মন ভাল হয়ে যাওয়া, এটা অসুখ ছাড়া আর কিছু কেমন করে হবে? কাজেই সে নিজেও বিশ্বাস করত যে এই লেখালেখির ব্যাপারটা অসুখ ছাড়া আর কিছুই নয়। আর এরকম অদ্ভুত অসুখ নিয়ে সবাই হাসাহাসি করবে, তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে? মেয়েদের অনেক কিছু নিয়েই সংসারে হাসাহাসি হয়। উঁচু দাঁত, চুলের হাল্কা গোছ, গায়ের রং, হাত পায়ের লোম, বোঁচা নাক, খারাপ রান্না, অগোছালো স্বভাব, উঁচু গলার হাসি… সে তালিকার শেষ নেই। সেই অসীম তালিকায় এই লেখালেখির অসুখ না হয় যোগ হল। তাতে কার ক্ষতিবৃদ্ধি হল? তাই বৈশাখী লিখে যেত। ব্যাপারটা এই পর্যন্ত ঠিক ছিল।
গোল বাঁধল ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খুলবার পরে। সে দেখল তার মত এরকম অসুখে নারীপুরুষ নির্বিশেষে একটা বিশাল সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত। সবাই লিখছে কিছু না কিছু। কবিতাই বেশি। সেও লিখতে শুরু করল। অদ্ভুত ভাবে লাইক, কমেন্ট এসবও ভালই পড়তে লাগল। কিন্তু সে সেগুলির উপরে সেরকম আস্থা রাখতে পারেনা। কারণ, সে নিজে খুব ভাল করে জানে যে পুরো ব্যাপারটা একটা অসুখ ছাড়া কিছু নয়। তাছাড়া এই যে ফেসবুকে কবিতা পোস্ট করা, লাইক, কমেন্ট ইত্যাদি, এসবও একটা ‘খেলা’ ছাড়া কিছুই নয়। সেই যে ছোটবেলায় বিকেল হলেই পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে লুকোচুরি, কুমিরডাঙ্গা এসব খেলা হত, এটাও সেরকম। তবে কোনও খেলাতেই শখ করে কেউ চোর হয়না। তবে ফেসবুকের লেখালেখিতেও চোর থাকে, ধরাও পড়ে। কার কবিতা কে নিয়ে কোথায় টুকে দেয়। এরকম হতেই পারে। ইচ্ছাকৃত, অনিচ্ছাকৃত দুইই। প্রতিদিন ঘেসো ফুলের মত এত এত কবিতা গজানো কি সম্ভব? একটা ফুল আরেকটার মত দেখতে হলে ফুলেরা কি আর আদালতে যাবে? এও সেরকম। বৈশাখী ব্যাপারটা নিয়ে একেবারেই সিরিয়াস ছিল না। সবই ঠিকঠাক ছিল এই অবধি। খুব সমস্যার ব্যাপার কিছু ছিল না তার কাছে। কিন্তু সে সমস্যায় পড়ল বেশ কিছু পত্রিকার সম্পাদক তার কাছে লেখা চেয়ে পাঠানোয়। সত্যিই কি তার লেখা পত্রিকায় ছাপানোর মত? তাছাড়া তার লেখার সব বানান ঠিকঠাক আছে কি না, সেটা এই সব সম্পাদকেরা ঠিকঠাক করে দেবেন তো? বৈশাখী চিন্তায় পড়ল।
বৈশাখী লেখক হতে চায়নি কোনওদিন। লেখক মানেই খুব গম্ভীর সিরিয়াস ব্যাপার। দুনিয়ার সব কিছু জানতে হয়। খেলাধুলা, রাজনীতি থেকে শুরু করে অর্থনীতি, সমাজনীতি সব। এসব না জানলে লেখা যায় না। দুনিয়াতে কোথায় যুদ্ধ হচ্ছে, জানতে হবে। কেন হচ্ছে, সেই কারণটা জানাও জরুরি। এদিকে বৈশাখী এসব খবর চিরকাল এড়িয়ে এসেছে। যুদ্ধবিগ্রহ, মারামারি এসব খবরে তার কোনও আগ্রহ নেই। বরঞ্চ মন খারাপ হয়ে যায় লাশের ছবি দেখে বা অনাথ শিশুর মুখ দেখে। ঠিকমত খেতে পারেনা, ঘুমোতে পারেনা। স্বপ্নের মধ্যে ফিরে আসে নানা বীভৎস দৃশ্য। শুধু কি যুদ্ধ? কোথায় বন্যা, ভূমিকম্প, দাবানল এসব হল, এসব নিয়েও জানতে হবে, জানাতে হবে। সমাজসংসারে কোনও অন্যায্য ঘটনা ঘটলে, সেটা নিয়েও মতামত দিতে হবে, প্রতিবাদী লেখা লিখতে হবে। নাহলে তুমি কিসের লেখক? কেউ পুঁছবে না।
কিন্তু জগতসংসারে এত কিছু নিয়ে ভাবতে বসলে নিজের সংসারের ব্যাপারে ভাববে কী করে? নাহ, সংসার করে লেখক হওয়া সম্ভব নয়। বৈশাখী জানে। তবে কেউ লেখা চাইলে সে চট করে বারণ করতে পারেনা। এটা তার মস্ত দোষ। হুঃ, যদি ভাবে যে অহংকারী! না, বৈশাখী চায় না কেউ তাকে অহংকারী ভাবুক। সম্প্রতি একটা পত্রিকায় শারদ সংখ্যার জন্য একটা গল্প চেয়েছে। গল্প বৈশাখী লেখে না এমন নয়। তবে ওই চার পাঁচ শ’ শব্দের ভেতর। মাঝে মাঝে ফেসবুকে পোস্ট দেয়। তার চেয়ে বড় হলে ফেসবুকে কেউ পড়েনা। এদিকে এই পত্রিকায় বলেছে কম করে হলেও দেড় হাজার শব্দ। এখানেই সে প্যাঁচে পড়েছে। অত বড় গল্প তার মাথায় আসেনা। সব গল্প চট করে খতম করে ফেলে সে। কারণ, পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে অসুখের উপশমের মত। অসুখ নিয়ে বেশিক্ষণ বসে থাকতে কারো ভাল লাগে? তাই তাড়াতাড়ি লিখে ফেলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে চায় সে।
তাছাড়া দুঃখের গল্প লিখতেও ভাল লাগে না তার। তাহলে তার সেই অসুখ বয়ে জ্বর শরীরে বসে থাকবার মত একটা অনুভূতি হয়। সে মজার গল্প, আনন্দের গল্প লিখতে চায়। কিন্তু সংসারে কত আর মজার কাণ্ড ঘটে যে সে লিখবে? তাই সে সকাল থেকে খুঁজছে। ডায়রির পুরনো আঁকিবুঁকির মধ্যে, মকশ করা কবিতার মধ্যে, আকাশে, বাতাসে, বারান্দার ফুলের টবে, ফেসবুকে, নিউজ চ্যানেলে সে গল্প খুঁজছে। পাচ্ছে না এমন নয়, তবে পছন্দ হচ্ছে না। করাপশন, টাকাকড়ি লুকিয়ে রাখা এসব নিয়ে একটা প্লট মাথার মধ্যে প্রায় ঘনিয়ে এসেছিল দু’দিন আগেই। আজই সে দেখল যে ‘মনের মত গল্প’ গ্রুপে শ্রাবণী বিশ্বাস ঠিক ওই রকমের একটা গল্প পোস্ট করে দিয়েছে। নাহ, বাদ। এই থিমের গল্প চলবে না।
অতসী ঘর মুছছিল। বৈশাখীর আনমনা ভাব, ডায়রি আর কলম হাতে উশখুশ অবস্থা দেখে সে জিজ্ঞেস করেই ফেলল, ‘বউদি কী হয়েছে? শরীর ভাল আছে তো তোমার?’ অতসী পুরনো লোক। সে বউদির লেখার অসুখের খবর জানে। বৈশাখী বলতেও পারছে না যে সে ভাল আছে। কারণ সে সত্যিই ভাল নেই। যা খুশি একটা কিছু লিখে সে এখনই এই অসুখের হাত থেকে পরিত্রাণ পেয়ে যাবে, ব্যাপারটা এই মুহূর্তে আর এরকম সহজ জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। তাকে গল্প লিখতে হবে। একটা নিটোল গল্প। যেখানে হাসি, মজা এসব আছে। দুঃখের লেশমাত্র নেই। সে মরিয়া হয়ে অতসীকে জিজ্ঞেস করে বসল, ‘হ্যাঁ রে, তোর কাছে কোনও গল্প আছে? মানে, আমাকে একটা গল্প বলবি?’
আরেকটু হলে অতসী চোখ কপালে তুলে ঘর মুছবার বালতি উল্টে দিচ্ছিল। তবে সে পাঁচ বাড়ি খেটে খায়, অত সহজে অবাক হলে চলে না তার। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে কোমরে আঁচল গুঁজে বলে, ‘কেমন গল্প?’
-‘ভাল গল্প। মজার গল্প।’
-‘বউদি, তুমি ওই বোকা বউয়ের গল্প জানো?’
-‘নাহ, সে কী গল্প?’
-‘ওই যে শাশুড়ি খুব জ্বালাত। নাস্তানাবুদ করত।’
-‘নাহ, বল বল।’
-‘শাশুড়ি বলে গেছিল বেগুন ডুবিয়ে ডুবিয়ে ধুতে। যতক্ষণ না বেগুন ডুববে ততক্ষণ জল দিয়ে যেতে। তারপর…’
-‘হ্যাঁ, তারপর?’
-‘তারপর দুটো কড়ি গোবর দিয়ে দেওয়ালে বসিয়ে দিয়ে বলেছিল… ওই দ্যাখ… ওই হল আমার চোখ। আমি মরে স্বর্গে গেলেও সব দেখতে পাব। যদি তুই জল দিয়ে বেগুন না ডুবিয়ে ধুয়েছিস… তো দেখবি কী হয়…’
বৈশাখী হেসে গড়াগড়ি যায়… ‘তারপর?’
‘তারপর আর কী! বোকা বউয়ের বেগুন ধুতেই বেলা যেত। জল তুলে আনতে আনতে কোমর বেঁকে যেত। সময়ে রান্না শেষ করতে পারত না একদিনও। এর মধ্যে শাশুড়ি মো’লো। তো কী হয়? বোকা বউয়ের অবস্থার কী কোনও বদল হল? হল না। সেই খেটে মরে বোকার মত।’
‘সেকি রে… এখানেই গপ্পো শেষ?’
‘না, শেষ না। বোকা বউয়ের বর একদিন দূর থেকে দেখলে তার কাণ্ড। দেখে বলে… ওকি কর? বেগুন যত জল দাও, সে কি কোনো দিন ডুববে? তাই বলি, সারাদিন করটা কী? শুনে বউ দু হাত কপালে ঠেকিয়ে বলে… ওই যে শাশুড়ি মা সব দেখছেন দেওয়ালে বসে। উনি যেমন বলে গেছেন আমি তেমনটি করে যাচ্ছি। এর অন্যথা হবার জো নেই। শুনে তার বর তখুনি সেই কড়ি খুঁটে ফেলে দিল দেওয়াল থেকে। বোকা বউ চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল। কিন্তু বর এসে মুখ চেপে ধরল। ব্যস, তারপর থেকে বেগুন ডুবানো বন্ধ হল।’
অতসী চোখ গোলগোল করে বলে… ‘বউদি, গল্পটা মজার না, বলো?’
বৈশাখী মাথা নাড়ে। ঠিক, খুব মজার। সংসারে বোকা বউয়ের সংখ্যাই বেশি। নাহলে সমাজ টিকে আছে কী ভাবে? ভাল থাকবার ইচ্ছায়, বা ভয়ে বউয়েরা প্রশ্ন করেনা বেশির ভাগ সময়ে। আর তাদের বোকামো নিয়েই যুগ যুগ ধরে লেখা হয়েছে এরকম লোককথা। বৈশাখী লিখবে। এরকম কোনও বউয়ের কথা লিখবে কোনও এক দিন। গল্পটা কোনও না কোনও ভাবে থেকে যাবে তার গল্পে।
অতসী বেরোবার আগে এসে দাঁড়ায়।
‘বউদি, একটা কথা ছিল।’
‘বল…’
‘বলছি, হাজার সাতেক টাকা দেবে? বাড়ির একদিকের ঘরটা পাকা করব।’
বৈশাখী ভাবে। এত টাকা হুট করে সে দেবে কী ভাবে? একজন হোমমেকারের জন্য টাকাটা খুব অল্প নয়।
‘দাদাবাবুকে একটু জিজ্ঞেস করে দেখি। কাল জানাব।’
‘বউদি, মাসে মাসে পাঁচশ করে কেটে নিও আমার মাইনা থেকে।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে।’
অতসী হাসিমুখে দরজার দিকে এগোয়। বৈশাখীর গল্পটাও এগোয়। সম্পাদকের পছন্দ হোক বা না হোক, সে লিখে যাবে। কারণ সে জানে যে বোকা বউয়েরা চিরকাল বোকা থাকেনা, এবং তার চিন্তাটা ঠিক গল্প নিয়েও নয়। তার অসুখের উপশম নিয়ে সে ভাবিত। গল্পটা লেখা হলেই সাময়িকভাবে তার অসুখ বেশ কিছুটা কমে যাবে। তাছাড়া বোকা বা চালাক মানুষদের নিয়ে লেখা লোককথাগুলো নেহাতই গল্প। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বোকা এবং চালাক মানুষেরা খেলার কোর্ট বদলাবদলি করে থাকে।

ভূতাত্বিক নন্দিনী সেনগুপ্ত কবিতা কিম্বা গল্প কোনোটাই নিয়ম করে লেখেন না। মনের তাগিদ এলে তবে লেখেন। কবিতায় মানুষ আর প্রকৃতি মিলেমিশে থাকে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত প্রথম কবিতার বই ‘অরণ্যমেঘবন্ধুর দল’ বিশেষ সমাদৃত হয়েছে। কবিতা ছাড়াও গল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি প্রকাশিত হয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এবং ওয়েবম্যাগে। মৌলিক লেখা ছাড়াও ইংরেজি এবং জার্মান ভাষার লেখালেখি অনুবাদ করা বিশেষ পছন্দের কাজ। দ্বিতীয় বই ‘শান্তি অন্তরিন’ সিরিয়ার কবি মারাম- আল- মাসরির কবিতার অনুবাদ সদ্য প্রকাশিত হয়েছে। লেখালেখি ছাড়াও লিটল ম্যাগ সম্পাদনা এবং কবিতা ক্লাব ইত্যাদি নানা সাংগাঠনিক কাজে জড়িত।