ফেসবুকের আবির্ভাব ২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। তার একশো বছর আগে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সদস্যরা ফেসবুকের একটা আদল এনেছিলেন তাঁদের একটি খাতায়। সে খাতার নাম ‘পারিবারিক স্মৃতিলিপি পুস্তক‘ ( ১২৯৫—১৩০২ )। সাদা কাগজের উপর নীলচে রঙের রুলটানা সেই খাতাটিকে বলা যেতে পারে আধুনিক ফেসবুকের পূর্বপুরুষ। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পিতৃস্মৃতি‘ থেকে জানা যায় সত্যেন্দ্রনাথ বিলেত থেকে ফেরার পরে বালিগঞ্জের বাড়িতে থাকতেন। ঠাকুর পরিবারের অন্যান্য সদস্য বিকেলবেলা যেতেন সে বাড়িতে। গান–বাজনা আলাপ–আলোচনা হত। আড্ডা বসত যে ঘরে, তার সামনে একটা উঁচু ডেস্কের উপর শেকল দিয়ে বাঁধা থাকত এই খাতা। যখন যাঁর সময় ও খেয়াল হত, তিনি খাতায় নিজের মনের কথা লিখে রাখতেন। আত্মীয়– বন্ধু . কুটুম্ব ও স্বজন ‘আপন আপন মনের ভাব–চিন্তা–স্মর্তব্য বিষয়–ঘটনা প্রভৃতি লিপিবদ্ধ করিতে পারিতেন।
স্মৃতিলিপি পুস্তকের পরিচয় দিয়ে পুলিনবিহারী সেন লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ও তাঁহার ভ্রাতৃগণ তাঁহাদের যৌবনে এই পরিবেশকে কি ভাবে নানাদিকে সমৃদ্ধ করিয়া তুলিয়াছিলেন, খামখেয়ালি সভা—সমালোচনী সভা—সারস্বত সমাজ—সংগীত সমাজ–অভিনয়চর্চা—- পত্রিকা প্রকাশ প্রভৃতির যে সকল বিবরণ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হইয়া আছে তাহাতে তাহার কিঞ্চিৎ পরিচয় পাওয়া যায়। যে প্রাণোৎসাহ তাঁহাদিগকে নিত্য নতুন অনুষ্ঠানের আয়োজনের কল্পনায় প্রবৃত্ত করিত, তাহারই একটা আভাস তাঁহাদিগের পারিবারিক স্মৃতিলিপি পুস্তক।‘
মনে হয় প্রথম দিকে মূল অংশের পৃষ্ঠাঙ্ক হিসেবে বাংলা সংখ্যা ব্যবহার করা হত। পরবর্তীকালে ইংরেজি সংখ্যা ব্যবহৃত হয়। খাতার মূল অংশের প্রথম পৃষ্ঠাটি বাংলা ১, ইংরেজির 7; এর কারণ ইংরেজি সংখ্যার দ্বারা পরবর্তীকালে পৃষ্ঠা চিহ্নিত করার কালে পূর্ববর্তী ছয় পৃষ্ঠাকে ওই হিসেবের মধ্যে ধরা হয়। অতিরিক্ত প্রথম দিকের ছয়টি পৃষ্ঠার প্রথমটিতে লেখা আছে ,–‘শ্রীমান রবীন্দ্রের শুভ পঞ্চাশতম জন্মদিনে —বিবি দিদি‘। ২ ও ৩ পৃষ্ঠায় কোন লেখা ছিল না। ৪ পৃষ্ঠায় আছে কয়েকটি ‘নিষেধ‘। হস্তাক্ষর দেখে মনে হয় রবীন্দ্রনাথই এই নিষেধগুলি লিখেছিলেন। নিষেধ ১—পেন্সিলে লেখা চলবে না। নিষেধ ২—খাতা পরিবারের বাইরে নিয়ে যাওয়া চলবে না। নিষেধ ৩ — খাতার লেখা কাগজে ( পত্র–পত্রিকায়) বা বইতে ছাপানো চলবে না। স্মৃতিলিপি পুস্তকের ৫ পৃষ্ঠা নামপত্র। ৬ পৃষ্ঠায় কোন লেখা নেই। ৭ পৃষ্ঠা থেকে মূল অংশের সূত্রপাত।
ইংরেজি বা বাংলা ভাষায় অথবা ইংরেজি–বাংলা মিশ্রিত ভাষায় দর্শন, সমাজবিদ্যা, নন্দনতত্ত্ব, ব্যাকরণ প্রভৃতি গুরু–গম্ভীর বিষয়ের পাশাপাশি লঘু রচনাও স্থান পেয়েছে স্মৃতিলিপি পুস্তকে। লেখক তালিকায় ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ,সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ, সুরেন্দ্রনাথ, হিতেন্দ্রনাথ, ঋতেন্দ্রনাথ, আশুতোষ চৌধুরী, যোগেশচন্দ্র চৌধুরী, প্রমথনাথ চৌধুরী, লোকেন্দ্রনাথ পালিত, অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী, শরৎকুমারী চৌধুরানি, শীতলাকান্ত চট্টোপাধ্যায়, সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় প্রভৃতি। খাতায় স্থান পেয়েছে মোট ১১৯টি ‘প্রস্তাব‘ বা লেখা। ১৮৮৮ সালের ৫ নভেম্বর প্রথম লেখাটি লেখেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। লেখাটির নাম ‘ philogy’ . খাতার শেষ লেখা রবীন্দ্রনাথের। লেখার নাম ‘বৈষ্ণবধর্ম‘।
বলা বাহুল্য , খাতায় সবচেয়ে বেশি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ: ‘সৌন্দর্য ও বল‘, ‘সমাজে স্ত্রী ও পুরুষের প্রেমের প্রভাব‘, শিভালরি‘, ‘জীবনের বুদবুদ‘, ‘ইন্দুর রহস্য‘, ‘কবিতার উপাদান রহস্য‘, ‘শরৎকাল‘, ‘ঘানির বলদ‘। রবীন্দ্রনাথের ‘স্ত্রী ও পুরুষের প্রেমে বিশেষত্ব‘ সবচেয়ে বিতর্কিত রচনা। সে বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর , শরৎকুমারীদেবী , অক্ষয় চৌধুরী , শীতলাকান্ত চট্টোপাধ্যায়।
পারিবারিক স্মৃতিলিপি পুস্তকে বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশ কয়েকটি রচনা স্থান পেয়েছে। যেমন : ‘শিলাইদহের ভবঘুরে গায়ক‘, ‘সুনাউল্লার গান‘, ‘আর্কিটেকচার‘, ‘রবিকাকার কবিতা‘,’মশা ও ছারপোকা‘ প্রভৃতি। ‘ফ্রেনোলজি‘তে তিনি লিখেছেন,”নাকের জোরে অনেক কাজ করা যায় — এ theory যদি সম্পূর্ণ সত্য হবে তাহলে চিনেম্যানদের দশা কি হবে? নাকের prominence-এর উপর যে কাজগুলো নির্ভর করে, সেগুলো কি তারা করতে পারে না? জ্যোতিকাকামশায় ‘বালকে‘ বঙ্কিমবাবু ও রাজনারায়ণবাবুর নাক নিয়ে যেসব কথা বলেছেন, যেসব গুণ ব্যাখ্যা করেছেন, চিনেম্যানদের কী সেসব গুণ কোনকালে হবে না? শোনা যায়, আজকাল যন্ত্রে নাক বাড়াবার উপায় হয়েছে। চিনেম্যানরা যন্ত্রের সাহায্যে যদি নাক বাড়িয়ে নেয়, তাহলে কী তাদের ভবিষ্যৎ আশাপ্রদ?”
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে লিখেছেন, “ওদিকে আবার একটি ‘নবভানু‘ আমাদের পারিবারিক সাহিত্য–আকাশে উদয় হয়েছিল। সেই ভানু এখন পূর্ণ মহিমায় বিরাজ করছে এবং তার প্রদীপ্ত কিরণ এখন আমাদের পারিবারিক গগনকে অতিক্রম করে সমস্ত বঙ্গভূমিকে আলোকিত করছে। “
রথীন্দ্রনাথের জন্মের আগে নবজাতক সম্বন্ধে হিতেন্দ্রনাথের ভবিষ্যদ্বাণী, “রবিকাকার একটি মান্যবান ও সৌভাগ্যবান পুত্র হইবে। সে রবিকাকার মতো এমন হাস্যরসপ্রিয় হইবে না। রবিকাকা অপেক্ষা গম্ভীর হইবে। সে সমাজের কাজে ঘুরিবার অপেক্ষা দূর দূরে একাকী অবস্থান করিয়া ঈশ্বরের ধ্যানে নিযুক্ত থাকিবে।“
সরলাদেবী ‘ভারতী‘ পত্রিকায় ‘খেয়ালখাতা‘ শিরোনামে স্মৃতিলিপি পুস্তকের লেখাগুলি প্রকাশ করলে দ্বিজেন্দ্রনাথের মতো রবীন্দ্রনাথও বিরক্ত হন। তাঁকে সেসব প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথও পরবর্তীকালে সংস্কার করে সে লেখা প্রকাশ করেন ‘সাধনা‘ পত্রিকায় ।

গবেষক