অসমিয়া অনুবাদ গল্প: চিকাডা । অপু ভরদ্বাজ
লেখক পরিচিতি–
১৯৮০ সনে জন্ম। প্রকাশিত গ্রন্থঃ মস্তিষ্কের সিনেমা(গল্প সংকলন),সেই দিন সেই কথা(স্মৃতি লেখা)। চন্দ্রপ্রসাদশইকীয়া স্মৃতি পুরস্কার লাভ। মস্তিষ্কের সিনেমা গল্প-সংকলনের জন্য মুনীনবরকটকী পুরস্কার লাভ করেন। সুদীর্ঘ দিন সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত অপু ভরদ্বাজ ‘সাতসরী’ মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সহকারি সম্পাদক।
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস
সাংঘাতিক কিছুই ঘটেনি। প্রচন্ড শিলাবৃষ্টি অথবা শরীর পুড়ে যাওয়া রোদ। সেই বিশেষ দিনটিতে হেডলাইন গুলিও ছিল নিতান্তই আকর্ষণহীন। কোনো গ্রেট ম্যানের আবির্ভাব কিংবা তিরোভাব তিথিও ছিল না সেই দিনটায়। মোটকথা নিতান্তই একটা সাধারন দিনের মামুলি ঘটনা ছিল রঘু কোঁয়রের জন্ম। রঘুর জন্ম হওয়ার দিন অমুককে বোলতা কামড়েছিল, রঘু জন্ম হওয়ার দিন অমুকে চা খাওয়ার সময় কাপটা পড়ে ভেঙ্গে গিয়েছিল, রঘু জন্ম হওয়ার দিন অমুক কোষ্ঠকাঠিন্যের রোগে ভুগছিল– এই ধরনের ঘরোয়া ছোটখাটো ঘটনা ঘটেছে বলেও কেউ শুনেনি। জাস্ট ডেলিভারি পেইন… এন্ড আফটার অল নরমালিবর্ন এ বেবি।
রঘু কোঁয়রের শৈশবের কোনো শ্রুতিমধুর গল্প ছিল না। রঘু যদি অতিমাত্রায় দুষ্টু হত! অংক অথবা ঢোলবাদনে রঘু যদি দক্ষতা দেখাতে পারত! চিত্রাংকন অথবা ফুটবল খেলায় যদি রঘুর গভীর আকর্ষণ থাকত! কিন্তু না হল না। পাখি অথবা প্রজাপতিরা রঘুকে খুব বেশি মুগ্ধ করত না। মোজার্ট সাত বছর বয়সে কি করেছিল? পিয়ানোতে মধুর সুর তুলে রাজাকে স্তম্ভিত করে দেয়নি কি ? না না, সেইসব রঘু করতে পারত না।
রঘু কোঁয়র যদি নিরুদ্দেশ হয়ে যেত। হারিয়ে গেল আর দশ বছরের জন্য নাপাত্তা। কিছু না সেরকম কিছু হল না। সিগারেট টানতে গিয়ে রঘু যদি দুর্ভাগ্যবশত ধরা পড়ে যেত। নারীর প্রতি যদি রঘুর তীব্র আকর্ষন থাকত। রঘু যদি আত্মহত্যার চেষ্টা করত!… কিন্তু সেরকম কোনো ঝামেলার সৃষ্টি না করেই রঘুর যৌবনের অন্ত হল।
… রঘু সিনেমার হিরো হওয়ার জন্য মুম্বাই পালিয়ে যাবার পরিকল্পনা করতে পারত, সহপাঠী জোনালী গগৈর প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে পরীক্ষায় ফেল করতে পারত। হস্তমৈথুনের অভ্যাসের ফলে রঘু স্বাস্থ্যহীন হতে পারত। আর কিছু না হলেও রঘু যেখানে-সেখানে কবিতা লেখার চেষ্টা করতে পারত…! কিন্তু রঘুর বয়স পঁচিশ অতিক্রম করার পরেও কোনো বদনাম বের হল না। কোনো বিরল সুখ্যাতির দাবিদারও হয়ে উঠল না রঘু কোঁয়র।
রাশিফল এবং বিজ্ঞাপন পড়ার অভ্যাস হয়েছিল বেকার রঘু কোঁয়রের। ইন্টারভিউ দিয়ে বিরক্ত হত না এই যুবক। চাকরির খোঁজে ঘুষ চাওয়া দালালের নাকে রঘু যদি ঘুষি বসিয়ে দিতে পারত, তখন দশ জন তাকে সাবাসি জানাত, ব্যাপারটা নিয়ে চর্চা হত। কিন্তু সেরকম কোনো অঘটন ঘটল না। ব্রেনড্রেইনের কবলে পড়ার মতো রঘু কোঁয়রের মগজ এতটাসারবান ছিল না । তাঁর সার্টিফিকেটগুলি অসাধারণ সম্পদ ছিল না তাই কিছু টাকা পয়সা দিয়ে রঘু কোঁয়র একটা কেরানির চাকরি ক্রয় করেছিল। নীরবে জিন্দেগীসুকলমে চালিয়ে গিয়েছিল রঘু কোঁয়র। লাখ টাকার কেলেঙ্কারি করার মতো রঘু কোঁয়রের সাহস ছিল না। খবরের কাগজে খবর বের হয়নি।রঘুকোঁয়রের মামলার কোনো সমস্যা ছিল না।
রঘু কোঁয়র কখনও কোনো সভা- সমিতিতে যায়নি। আমন্ত্রণ পায়নি, উপযাচক হয়ে কোথাও যায়নি। কোন পূজা সমিতির সেক্রেটারি হওয়ার চান্স পায়নি রঘু কোঁয়র। এমনকি কোনো সমিতির সদস্য হওয়ার মতো যোগ্যতা তার আছে বলেও কেউ ভাবেনি। শহরটাতে রঘু কোঁয়রের পরিচিত মানুষ ছিল খুবই কম। সে কাউকে কিছু দান করত না। সামর্থ্য ছিল, আগ্রহ ছিল না। চাঁদা দেওয়ারসময় সে তুমুল বাক-বিতন্ডায় লিপ্ত হত।রঘু কোঁয়র অবসর সময়ে উপন্যাস লিখতে পারত। সেই সব ছাপিয়ে প্রকাশ করতে পারত। না, সেই সব উদ্ভট চিন্তা কখনও তার মাথায় উদয় হয়নি। হরধনুর মতো একটা প্রকাণ্ড মোচ রাখতে পারলে রঘু কোঁয়র দশের মধ্যে একজন হতে পারত । কিন্তু ফ্যাসনের প্রতি রঘুর দুর্বলতা ছিল না। জুয়া খেলতে পারত রঘু, মদখেয়ে মাতাল হয়ে ঘুরে বেড়াতে পারত, জাল-নোট ছাপাতে পারত– করেনি, রঘু কোঁয়র জীবনে সেরকম কোনো তামাশা করে নি।
রঘু কোঁয়রকে কখনও সাপে কামড়ায় নি। বাঘের মুখেও পড়েনি রঘু কোঁয়র। সত্যি মিথ্যে মজার ভূতের গল্প বলতেও জানত না রঘু। কোনো নেতার ঘনিষ্ঠ ছিল না রঘু কোঁয়র।হাইপ্রেসার বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে এখন তখন অবস্থা হয়নি রঘু কোঁয়রের।
এই বৈচিত্র্যহীন মানুষটি একদিন পাত্রীর বাড়ি খোঁজখবর করে জোড়াতালি দিয়ে বিয়ে করেছিল। রঘুর যদি সিফিলিস হত! তাঁর উরু দিয়ে যদি পুঁজ রক্ত বের হত!গণিকা,অতি লোভী বলে তার বদনাম ছড়াতো। বেচারী স্ত্রী পালিয়ে বাঁচত, শ্বশুরবাড়ি থেকে টেলিফোন করা হত–’ লম্পট, ডিভোর্স চাইছি…’। ফালতু, কামুক– খুশি মতে পরিচিত মানুষ গুলি যা-তা বলাবলি করত। কিন্তু রঘুর জীবনে এইসব কিছুই হল না । এক বছর গেল রঘুর সন্তান হল। সেই সন্তান যদি বাঁদরের বাচ্চার মতো হত! ছোট হলেও তার যদি একটা লেজ থাকত– তাহলে ঘটনা কোন দিকে মোড় নিত বলা যায় না । তবে সেরকম নাভুত না শ্রুত কিছুই হল না । সন্তান একদিন বড় হল, টাকা-পয়সা রোজগার করল,সংসার পাতল। রঘু বুড়ো হল এবং একদিন তার মৃত্যু হল।
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ চিকাডা আফ্রিকার এক আজব প্রাণী। জীবনের মোট সতেরো বছরসে ঘুমোয় এবং সঙ্গমের জন্য কেবল দুই সপ্তাহ জেগে থাকে। তারপরে চিকাডা ইহলীলা সম্বরণ করে।

অনুবাদক