অসমিয়া অনুবাদ উপন্যাস: অর্থ (পর্ব-৪০) । ধ্রুবজ্যোতি বরা
ডক্টর ধ্রুবজ্যোতি বরা পেশায় চিকিৎসক,অসমিয়া সাহিত্যের একজন স্বনামধন্য লেখক ২৭ নভেম্বর ১৯৫৫ সনে শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন ।শ্রীবরা ছাত্র জীবনে অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিলেন ।’কালান্তরর গদ্য’ ,’তেজর এন্ধার‘আরু’অর্থ’এই ত্রয়ী উপন্যাসের লেখক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। ২০০৯ সনে ‘ কথা রত্নাকর’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বাকি উপন্যাসগুলি ‘ভোক’,’লোহা’,’যাত্রিক আরু অন্যান্য’ ইত্যাদি।ইতিহাস বিষয়ক মূল্যবান বই ‘রুশমহাবিপ্লব’দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’,’ফরাসি বিপ্লব’,’মোয়ামরীয়া বিদ্রোহ’।শ্রীবরার গল্প উপন্যাস হিন্দি, ইংরেজি, বাংলা, মালয়ালাম এবং বড়ো ভাষায় অনূদিত হয়েছে।আকাডেমিক রিসার্চ জার্নাল’যাত্রা’র সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ।’ কালান্তরর গদ্য’ উপন্যাসের জন্য ২০০১ সনে অসম সাহিত্য সভার ‘ আম্বিকাগিরি রায়চৌধুরি’ পুরস্কার লাভ করেন।শ্রীবরা অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি।
অনুবাদকের কথা
কালান্তর ট্রিলজির তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হল’অর্থ’। সশস্ত্র হিংসার পটভূমি এবং ফলশ্রুতিতে সমাজ জীবনের দ্রুত অবক্ষয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার তাড়না এবং বেঁচে থাকার পথ অন্বেষণেই আলোচ্য উপন্যাসের কাহিনী ভাগ গড়ে তুলেছে। সম্পূর্ণ পৃথক একটি দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে অসমের মানুষ কাটিয়ে আসা এক অস্থির সময়ের ছবি আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষের অন্বেষণ চিরন্তন এবং সেই জন্যই লেখক মানুষ– কেবল মানুষের উপর আস্থা স্থাপন করতে পারে।
এবার উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ নিয়ে এলাম।আশা করি ইরাবতীর পাঠকেরা এই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত অসাধারণ উপন্যাসটিকে সাদরে বরণ করে নেবে। নমস্কার।
বাসুদেব দাস,কলকাতা।
পরেরদিন আমি নেশাগ্রস্থ মানুষের মতো হয়ে পড়েছিলাম।
স্বপ্নে থাকা মানুষের মতো, নেশা করা মানুষের মতো।
আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না।
গত রাতটা ছিল একটি পাগলের রাত– পাগলা রাত – পাপের রাত । পাপ– পাপ কি? কিসের পাপ? ভালোবাসাটা পাপ নাকি? কেন পাপ হবে?
প্রায় রাত ভোরে আমি আমার ঘরে ফিরে এসেছিলাম। আসার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু সে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল। ঘরের বাইরে বেরিয়ে দেখেছিলাম ধৌলাধার পর্বতের গা সকালের প্রথম ম্লান আলোতে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
নিজের ঘরে ফিরে এসে কিছুক্ষণের মধ্যে তৃপ্তি অতৃপ্তির অবসাদে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। যখন জেগে উঠলাম তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার অফিসে যাবার সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি মুখ হাত ধুয়ে আমি নিচের ডাইনিং হলে নেমে গেলাম। নেমে যাবার সময় লক্ষ্য করেছিলাম তার দরজায় তালা ঝুলছিল। ভেবেছিলাম তার সঙ্গে ডাইনিং হলে দেখা হয়ে যাবে। কিছুটা সংকোচ হচ্ছিল– একটু লজ্জাও লাগছিল– পুনরায় তার সঙ্গে দেখা করার জন্য সাংঘাতিক ইচ্ছা করছিল। ইচ্ছা করছিল তার মুখের দিকে তাকাতে, তার গভীর চোখ জোড়া একবার দেখতে।
ডাইনিং হলে সে ছিল না। টেবিল দুটি খালি। এক কোণে শুকনো সুইস সাহেবটি। তার সামনে রাখা চায়ের কাপ বোধহয় সেই কবে ঠান্ডা হয়ে গেছে। তিনি আমাকে দেখতে পেয়ে হাত নেড়ে সুপ্রভাত জানিয়েছিলেন। আমি প্রতি সম্ভাষণ জানিয়ে গৃহকর্ত্রীর খোঁজ করেছিলাম। তিনি রান্নাঘরে ছিলেন না। কিছুক্ষণ পড়ে এলেন। এসে আমাকে আমার সকালের আহার বের করে দিলেন। আমার মনে হচ্ছিল যেন আমার গৃহকর্ত্রী কোনো কথায় অপ্রসন্ন। গত রাতের কথা তিনি কিছু জানতে…?না এইসব আমি মিছা মিছি ভেবে মরছি।
মেয়েটি কি এত সকালে বেরিয়ে গেছে? আমি ভাবছিলাম। আসলে তার প্রাইভেসিতে আমি সামান্যতম অসুবিধাও যাতে না করি তার জন্য আমি খুব সতর্ক হয়েছিলাম।
তার সঙ্গে সকালে দেখা না হওয়ায় মনটা খারাপ লাগছিল।
আমার নিজের ওপরে ধিক্কার জন্মেছিল। তার বৌদ্ধ দর্শনের ক্লাস সম্ভবত শুরু হয়ে গেছে।
একটা বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে অফিসে পৌঁছালাম। দৈনন্দিন কাজ করার সময় রমেনের ফোন এল।
স্বাভাবিকভাবেই সে হুলস্থুল আরম্ভ করে দিল।
‘তুই আজকেই চলে আয়। দেরাদুন চলে আয়। এখান থেকে মুসৌরি যেতে হবে। অঞ্জুদাও আসবে। স্কুলের কথাটা এবার ফাইনাল করতে হবে।
‘আমি গিয়ে কী করব?’ আমি বেশ দুর্বলভাবে বলেছিলাম।
‘কী শালা বুর্বকের মতো কথা বলছিস! আজই চলে আয়। বেশ জমবে এবার। আমরা আসলে মুসৌরি যাব। সেখান থেকে সিমলা। সব ফাইভ স্টার বুক করেছি। সেসব কাজ আমি করে ফেলেছি। আমাদের ট্রাভেল এজেন্সির নামে বুক করা হয়েছে। বুকিং কমিশনটা তুই পাবি। চিন্তা করিস না।’
‘কীভাবে যাব? প্রশ্নটা করেই ভাবলাম,কী বললাম আমি।
‘কীভাবে যাব মানে? খচ্চরের পিঠে উঠে আসতে চাইছিস নাকি। তিনটি খচ্চর নিবি। সামনেরটা এবং পেছনেরটাতে দুটো লামাকে উঠিয়ে নিবি তারপরে প্রসেশন করে আসতে থাকবি।’
রমেন ফোনের অন্য প্রান্তে হো হো করে হাসতে শুরু করেছিল।
‘তুই একটা ভালো গাড়ি নিয়ে নে। নতুন গাড়ি। ভাড়াতে নিবি– সেটাতে আসবি এবং সেটাতেই ফিরে যাবি। আজ সম্ভবত পারবি না। কাল সকাল সকাল স্টার্ট দিবি।’
‘কতদিনের জন্য যেতে হবে? বেশ দুর্বল স্বরে প্রশ্ন করেছিলাম।
‘এক সপ্তাহ‐দশ দিন আর কি? তোর তো এখন বিশেষ কোনো কাজ নেই, সিজন শেষ। তাড়াতাড়ি এসে যা। বেশ জমবে।’
উপায় নেই।
প্রচন্ড অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেতে হবে, উপায় নেই। অঞ্জুদা ও আসবে। সঙ্গে হয়তো অন্য কেউ আসতে পারে।
শরীর খারাপের অজুহাত দেব নাকি? একবার ভেবেছিলাম।জ্বর হয়েছে বলি? না, সেসব বললে রমেন গাড়ি নিয়ে এখানে এসে হাজির হবে।
‘ঠিক আছে,’ বললাম।’ তুই তো আগেও খবর দিতে পারতিস। আমি তাহলে একটু আরাম করে বেরোতে পারতাম। তোর সমস্ত কথাতেই হুলুস্থুল, সমস্ত কাজ শেষ মুহূর্তের জন্য রেখে দিবি।’
রমেন অপরপ্রান্তে হা হা করে হাসল।বলল,’ তোকে সারপ্রাইজ দেব বলে আগে থেকে বলিনি।’
উপায় নেই, উপায় নেই, যেতেই হবে এখন।
একদিন দুদিন নয়।সাত দশ দিনের জন্য!
আমার বিন্দুমাত্র যাবার ইচ্ছা ছিল না। গত রাতের পরে যাব কীভাবে?
ওকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। দেখার ঠিক দু‘একদিন পরেই— ঠিক যেদিন ট্রেকিংয়ে না গিয়ে থেকে গেল– তখন থেকেই। আমি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু আমি জোর করে নিজেকে বোঝাতে চাইছিলাম– এটা দুর্বলতা,এটা মরীচিকা বলে। অসম্ভব কথা বলে নিজেকে বিশ্বাস করাতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু আমার মনটি মানছিল না। ওকে দেখতে পেলেই এক বিচিত্র অনুভূতির ঢেউ আমার শরীরে প্রবাহিত হয়েছিল। এক ধরনের উত্তেজনা– ঠিক উত্তেজনা নয়– এক ধরনের উন্মাদনা আমি অনুভব করছিলাম। এত ঠুনকো বলে মনে হয়েছিল মেয়েটিকে– তাকে যেন জড়িয়ে ধরে রক্ষা করব। রক্ষা করব সমস্ত বিপদ থেকে– দুঃখ থেকে।
রক্ষা করব তাকে জরা থেকে–ব্যাধি থেকে।
ফিরিয়ে দেব তার আনন্দ।
আমার প্রতিও যে মেয়েটির একটি ভালো ভাব– একটা দুর্বলতা গড়ে উঠেছিল, সেটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম। দুর্বলতা কি? সে তো আমাকে একজন ভালো বন্ধু বলে বলেছিল। শুধুই বন্ধু মাত্র? বন্ধুর বেশি কিছু নয়? বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু?
গতকালের রাতটা কেন তাহলে এল?
আমি নিজেকে নিজে প্রশ্ন করেছিলাম। নানা বিক্ষিপ্ত কথার মধ্যে ভেবেছিলাম যে আমি তার যোগ্য তো নই। সে আমেরিকার নাগরিক। দুদিন এখানে আছে, পুনরায় আমেরিকা ফিরে যাবে। এখানে তো আর চিরদিনের জন্য থাকবে না।
গত রাতের ঘটনাটার অন্য কোনো অর্থ নেই। হঠাৎ হয়ে যাওয়া একটি ঘটনা মাত্র।
সত্যিই কি তাই?
এই সমস্ত চিন্তা আমার মনে এক প্রকার হীনমন্যতা এনে দিয়েছিল। এই চিন্তাগুলি মন থেকে দূর করে রাখার জন্য অফিসের কাজে যেমন বসাব তারও কোনো উপায় নেই। কাজই ছিল না। হিসেবপত্রগুলি পেমা হঠাৎ করে রেখেছিল। গ্যাটশ্ব শেষ ভ্রমণকারীর দলটা নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল।এই সমস্ত কাজ আমার চেয়ে ওরা দুজন ভালোভাবে করতে পারে। নিয়মমাফিক দৈনন্দিন কাজে আসলে আমার কোনো প্রয়োজন ছিল না।
গাড়িটা চেয়েই ফোন করেছিলাম।
আমাদের পরিচিত ড্রাইভার একজনের একটা নতুন ইন্ডিকা ট্যাক্সি আছে। কিছুদিন আগে কিনেছে। তাকে পাই নাকি ফোন করেছিলাম। তিব্বতী ছেলে। তার নাম লিমা। বড়ো ফুর্তিবাজ ছেলে। গাড়িও ভালো চালায়।
লিমাকে বাড়িতেই পেয়ে গেছিলাম। সকালবেলা কোথাও থেকে ট্রিপ নিয়ে এসেছে। আগামীকাল সে যেতে পারবে। পাঠানকোটেরই একটা ট্রিপ ছিল। সেটা অন্যকে দেবে। গাড়ি ঠিক হয়ে গেল। সকালবেলা সে আমাকে নিয়ে যাবার জন্য আসবে।
আরো পড়ুন: অর্থ (পর্ব-৩৯) । ধ্রুবজ্যোতি বরা
দ্রুত বাড়িতে ফিরে এসেছিলাম।সাধারণত দুপুরবেলা খেতে আসি না। অফিসে কিছু একটা আনিয়ে খেয়ে নিই। আজ আসতে দেখে গৃহকর্ত্রী কিছুটা অবাক হয়েছিল। বাড়ি পৌছেই প্রথমে ওপরে গিয়েছিল। তার ঘরের দরজায় তখনও তালা ঝুলছিল। ডাইনিং হলে নেমে এসেছিলাম। কিছু একটা খেতে দিতে পারবে কিনা গৃহকর্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন–ভাতই খেয়ে নাও,আছে। আমি ডাইনিং রুমে খুব আশা নিয়ে গিয়েছিলাম,কোনোভাবে তাকে দেখতে পাব বলে।কখনও সে দুপুরবেলা ভাত খেতে আসে।বৌদ্ধ দর্শনের ক্লাস করার পরে টংখা পেন্টিংয়ের ক্লাস হওয়া পর্যন্ত সে মাঝখানে কিছু সময় পায়,কিন্তু না,আজ তার দেখাই নেই।কীরকম একটা সঙ্কোচ হয়েছিল যদিও গৃহকর্ত্রীকে তার কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম।তিনি বলেছিলেন সে নাকি দুপুরবেলা আসবে না বলে গেছে।
ঘড়িটা দেখলাম।ঠিকই,এই সময়েই সে ফ্রি হয়।
গৃহকর্ত্রী এনে দেওয়া ভাতটুকু তাড়াহুড়ো করে খেতে শুরু করেছিলাম।ফেলে রেখে বেরিয়ে যাই বলে মনে হচ্ছিল।কিন্তু ভাত ফেলে রেখে যেতে সাহস হচ্ছিল না।
কয়েকজন বৌদ্ধ ভিক্ষুণী এসে ঢুকেছিল।লোকগুলি মাঝেমধ্যে আসে।রান্নাঘরের পাশের ডাইনিং টেবিলটাতেই তাঁরা বসেছিল।গৃহকর্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে চায়ের জল বসিয়েছিল।নিজেদের মধ্যে তিব্বতী ভাষায় কথা বলায় তাঁরা মশগুল হয়ে পড়েছিল।
কাসিটা সামলে খাওয়া বাসন রাখা টেবিলটাতে রেখে আমি তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এসেছিলাম।শুকনো সুইস সাহেব ঝপাং ঝপাং করে এসে তখন ঘরে ঢুকেছিল।আমাকে দেখে হাত তুলে অভিবাদন জানিয়েছিল।স্বচ্ছ প্লাস্টিকের একটা ঝোলায় সে কয়েকটি রুটি বহন করে এনেছিল।
তাড়াহুড়ো করে বৌদ্ধ ইনস্টিটিউটে গিয়েছিলাম।সিঁড়ি বেয়ে একেবারে ভেতরে চলে গিয়েছিলাম।ভেতরে ঢুকে আসার পরে কিছুটা সঙ্কোচ হচ্ছিল।বৌদ্ধ দর্শনের ক্লাস অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।সেখানে তখন কোনো ছাত্র ছাত্রী ছিল না।সংলগ্ন গ্রন্থাগারটিতে গেলাম।সেখানে কেউ নেই।
সে টংখা পেন্টিংয়ের ক্লাসে গিয়েছে নাকি?
কোথায় সে শিখেছে সে কথা আমার জিজ্ঞস করা হয় নি।এখানে এতগুলি টংখা পেন্টিং শেখানোর ক্লাস আছে ,কোথায় খুঁজে বেড়াব তাকে?আশেপাশে থাকা দুই একটাতে উঁকি দিয়ে দেখলাম।নেই,মেয়েটি সেখানেও নেই।
দালাই লামা মন্দিরে গেল নাকি?একবার ভেবেছিলাম।পরমুহূর্তে মনে পড়েছিল দুপুরবেলা তো বিশ্রামের সময়।এই সময় মন্দিরে বিশেষ কোনো কার্যসূচি থাকে না।দিনে দিনে এসে ফিরে যাওয়া ভ্রমণকারীরাই এই সময় এসে মন্দির দেখতে ভিড় করে।কখনও কমবয়সী এবং যুবক লামারা প্রার্থনার ঘুরতে থাকা চোঙায় ভরানোর জন্য রঙিণ কাপড়ে বৌদ্ধ প্রার্থনার কথা লিখে কাপড়ের মুঠিগুলি বানিয়ে থাকে।ভ্রমণকারীরা সেসবই দেখে।মূল প্রার্থনাগৃহের ভেতরে অতন্দ্র প্রহরীর মতো সেই সময় নীরবে বসে থাকে একজন অতি বৃদ্ধ লামা বয়সের বলিরেখা তাঁর মুখে এঁকে দিয়েছিল অজস্র নিশ্চল দাগ।
নিথর হয়ে বসে থাকা এইধরনের একজন বৃদ্ধ লামাকে দেখে রমেন আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলেছিল—‘একেবারে মামী দেখছি বে-শ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছে তো?
না,দালাইলামা মন্দিরে সে ছিল না।
থাকবে না বলে জেনেও আমি সেখানে গিয়াছিলাম।দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গিয়ে দালাই লামাইর ঘরের সামনের ঘোরানো পথটা দিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম।ফিরে যাবার সময় হাঁটার গতি স্তিমিত হয়ে এসেছিল।আমি বুঝতে পেরেছিলাম তাকে আমি আর এখন খুঁজে পাব না।ছোট্ট শহর মেকলডগঞ্জের কোনো অলি-গলির ঘরের ভেতর সে ঢুকে পড়েছে।
টংখায় তুলিকায় বল দিতে পেরেছে কি?
ইস-গত রাতটার সেই উদ্দাম উত্তেজনা-সেই ভালোবাসার কোমল ক্ষণগুলি! কানের কাছে ফিসফিস করে বলা সেই ছোটো ছোটো ভালোবাসার কথাগুলি-সেই উত্তাপ-ইস সেই উত্তাপ!
তাকে বিরক্ত করছে না কি?
সন্ধ্যা পর্যন্ত ছোট্ট শহরটার অলিতে-গলিতে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়িয়েছিলাম।কী করব,কোথায় যাব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।পথের পাশে ছোটো ছোটো রেস্তোরা গুলিতে একের পর এক ঢুকে দেখেছিলাম,কোথাও এক কাপ চা খেলাম,কোথাও একটা কোকা কোলা।
ক্রমশ সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল।
বেঁটে পাহাড়গুলির ওপর দিয়ে পেট ছেঁচড়ে ভেসে আসা মেঘগুলি ক্রমশ ধৌলাধার পাহাড়ের গায়ে জমতে শুরু করেছিল।মেঘের ফাঁক দিয়ে দীর্ঘ স্তম্ভের মতো ছিটকে এসেছিল দূরে সূর্যের আলো।দূরের পর্বতের কোনো অংশ এভাবে আসা আলো উজ্জ্বল করে তুলেছিল।
ছোট্ট শহরটিতে ক্রমশ আরম্ভ হয়েছিল দিনটাকে সমাপ্ত করার কর্মব্যস্ততা।
দ্রুত পদক্ষেপে লোকেরা বাড়ি ফিরেছিল। পথে বাজারের দোকানগুলি থেকে হয়তো কিনে নিয়েছিল আধডজন ডিম,কিছু শাকসব্জি,একটা তিব্বতী রুটি,পাওরুটি-পলিথিনের ব্যাগে ঝুলিয়ে এই বাজারটা মানুষগুলির সঙ্গে সঙ্গে ছন্দোবদ্ধ গতিতে যাচ্ছিল।ভিক্ষু এবং ভিক্ষুণীরা নিজের নিজের বিহারে ফিরেছিল দ্রুত পদক্ষেপে।ফিরেছিল বিদেশি পরিব্রাজকরাও।শহরের ছোটো ছোটো বাড়িগুলি থেকে বেরিয়ে এসে যুবকরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছিল।একটি দুটি করে বিদ্যুতের আলোগুলি জ্বলে উঠতে শুরু করেছিল।
জার্মান চা বিস্কুট পাওয়া দোকানটি থেকে আমি থাকা বাড়িতে প্রবেশ করা গলিটার মুখটা দেখতে পাওয়া যায়।এক গ্লাস গরম চা নিয়ে আমি দোকানের বাইরের বেঞ্চটাতে বসে গলির মুখটাতে চোখ রাখতাম।
সে ফিরে এলে আমি এখান থেকেই দেখতে পাব।ক্রমশ সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল।প্রথমে সরল এবং এবং দেবদারু গাছের পাতার নিচে জমা হতে আরম্ভ করা অন্ধকারগুলি ধীরে ধীরে আকাশের দিকে ছড়িয়ে পড়তে আরম্ভ করেছিল।
দেবদারু গাছটার দিকে তাকিয়েছিলাম।
দেবদারু গাছের ডাল এবং পাতাগুলি সৃষ্টি করা বিশাল বিছানাগুলিতে উঠে থাকা বাঁদরগুলি ক্রমশ দেখা যাচ্ছিল না।সারাদিন দৌড়ঝাঁপ করে থাকা বাঁদরগুলি সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে আশ্চর্য ধরনে নিশ্চুপ হয়ে পড়েছিল।
ক্রমশ গলিটার মুখটা অন্ধকার হয়ে এসেছিল।
এখন আর এখানে অপেক্ষা করে থেকে লাভ নেই,এখন সে ফিরে এলেও আমি বুঝতে পারব না।
ক্লান্ত পদক্ষেপে আমি বাড়ি ফিরেছিলাম।সত্যিই আমার ক্লান্ত লাগছিল।
কিন্তু ক্লান্তির চেয়েও এক পরাজয় এক অতৃপ্তির অবসাদ যেন আমাকে চেপে ধরেছিল। খুব ধীরে ধীরে হেঁটে আমি বাড়ি ফিরেছিলাম।।
বাড়িতে ঢোকার সময় লাইট ছিল না। লোডশেডিং। পথে থাকতেই বিদ্যুৎ বাতি নিভে গিয়েছিল। অন্ধকারের মধ্য দিয়ে এসে ঘরে ঢুকেছিলাম। আমার হঠাৎ এরকম মনে হচ্ছিল যেন মনের মধ্যে কোথাও সুইচ একটাও নিভে গিয়েছিল। আশার সুইচ। দপ করে বিজলী বাতি নেভার মতোই নিভে গিয়েছিল।
ওপরের তলায় কোথাও আলো ছিল না।কেউ মোম জ্বালায়নি। তারমানে সেখানে কেউ নেই। কেউ আসেনি।
শুকনো সুইস সাহেবটি নেই। পন্ডিত রামপ্রসাদজীও নেই। মেয়েটিও এসে পৌঁছাননি।
ধীরে ধীরে আমি রান্না ঘরের পাশের ডাইনিং হলে ঢুকেছিলাম। সেখানে মোম জ্বালানো হয়েছিল। খোলা রান্নাঘরটা থেকেও আলো আসছিল।
সবাই সেখানে বসেছিল। পন্ডিতজী , সুইস সাহেব, রিণপছে.
পেমাকে সেখানে দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ও এখানে কি করছে?
কিন্তু মেয়েটি কোথায়? কোথায় সে? সে এখনও আসেনি নাকি?
পেমাকে আমি জিজ্ঞেস করব বলে ভেবেছিলাম তার কথা।
একটা ট্রেতে কিছু কাপ সাজিয়ে নিয়ে সে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল।
হ্যাঁ হ্যাঁ মেয়েটি সেই হবে– হ্যাঁ সেই। আমার বুকের ভেতরে কলিজাটা যেন হঠাৎ ধপধপ করে উঠল। জিভাটা যেন তালুতে লেগে গেল, কিছু একটা তাকে বলতে চাইছিলাম, কিন্তু পারছিলাম না।
সে আমাকে দেখেছিল। মোমের অনুজ্জ্বল আলোতে সে হয়তো প্রথমে বুঝতে পারছিল না। যখন ধরতে পেরেছিল তখন তার মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল একটি সুন্দর হাসি— আর আমার অন্তরটা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাওয়া বলে মনে হচ্ছিল।
পরিষ্কার হয়ে যাওয়া বলে মনে হচ্ছিল।
বুকের ওপর থেকে একটা ওজন যেন নেমে গিয়েছিল।
‘আজ স্পেশাল তিব্বেতিয়ান স্যুপ বানিয়েছে মামি,’সে আমাকে বলেছিল।‘প্রত্যেককে কাপগুলি দিয়ে দাও তো।’
কাজটা করতে পেরে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে ট্রে থেকে স্যুপের কাপটা এনে এক এক এক করে দিয়ে যাচ্ছিলাম। শুকনো সুইস সাহেবকে, লামা রিনপছেককে ,পন্ডিত রামপ্রসাদজীকে,পেমাকে এবং দুজন অপরিচিত মানুষকে।
‘ভেজিটেবল স্যুপ এত ভালো হতে পারে বলে আমার ধারণা ছিল না,’ সে বলেছিল।
‘তুমি খেলে তাহলে।’
‘আমি তো মামীর টেস্টার।’
‘কিন্তু কি ছিল আজ? কিছু আছে নিশ্চয়।’
‘মামী তো কিছু নেই বলেছে, এমনিতেই খাইয়েছে বলছে। তাই আজ আমরা প্রত্যেকেই মামীর জন্মদিন বলে ধরে নিয়েছি।’
‘ না না জন্মদিন নয়,’ হাতের একটা ট্রেতে তিব্বতি রুটির টুকরো এবং ভাজা শাকসবজি প্লেট নিয়ে গৃহকর্ত্রী ভেতরে প্রবেশ করলেন। আমার জন্মদিন কবে তা আমি নিজেই জানিনা।
আমরা প্রত্যেকেই স্যুপ খেতে বসে ছিলাম।
মেয়েটির সঙ্গে একটু নিভৃতে কথা বলার এত ইচ্ছা ছিল, কিন্তু তখন কথা বলার মতো কোনো পরিবেশই ছিল না। প্রত্যেকেই উচ্চস্বরে কথা বলছিল। শুকনো সুইস সাহেব মূকাভিনয় করে সবাইকে আনন্দ দিচ্ছিল আর প্রত্যেকেই হাতে তালি দিয়ে তাকে উৎসাহ দিচ্ছিল।
তার মধ্যে একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন,’ তোমার আজ এত দেরি হল?’
‘ আমি তো কখনই এসেছি,’সে বলেছিল। দুই ঘণ্টার বেশি হয়েছে।
‘দুপুরবেলা আমি দেখে গিয়েছিলাম, দরজায় তালা ঝুলছে ।’
‘তোমারি আজ দেরি হয়েছে। তাড়াতাড়ি খাওয়া হয়ে গেল। পাবে না বলেই ভেবেছিলাম।’
‘দুপুর বেলা মামী আমাকে বলেনি।’
‘বিকেলে, বিকেলে হঠাৎ ঠিক করা হল। ‘
গৃহকর্ত্রীর ছেলেটি মাউথ অরগ্যানে এবার হিন্দি এবং ইংরেজি গানের সুর বাজাতে শুরু করল।তার এক বন্ধু সেটাই গিটারের সঙ্গে সঙ্গে তাল রেখে বাজিয়ে যাচ্ছিল। আমরা প্রত্যেকেই তন্ময় হয়ে গানের সুর শুনছিলাম।
পেমা এসে প্রত্যেকের কাপে পুনরায় স্যুপ ঢেলে দিয়ে যাচ্ছিল।
গান শুনে নীরবে বসে থাকার সময় মনটাতে নানান বিক্ষুব্ধ চিন্তা ভরে পড়ছিল। আসলে গানের সুর আমার মগজে ভালো করে প্রবেশ করছিল না। মেয়েটি খুব স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করছে–আমার মনটা ভালো লাগছিল। তাকে আমি আগামীকাল যাওয়ার কথা বলিনি— বলার মতো সুবিধা পাইনি। দশ দিনের জন্য বাইরে থাকব, দুই চার দিন বেশি হতে পারে— রমেনের পাল্লায় পড়লে কোনো কিছু বলা যায় না। আজ— আজকের রাতটুকুই আছে। আচ্ছা আজ রাতে ওকে কাল রাতের মতো পাব কি–। আমি চোখ দুটো বন্ধ করে নিয়েছিলাম— মনে করতে চেষ্টা করছিলাম সেই স্পর্শ, ঘ্রাণ ,স্বাদের স্মৃতি …আহা।একেকবার সেই কথাগুলি জোর করে ভাবব না বলে ভাবি— কিন্তু ঘুরে ফিরে পুনরায় সেখানেই ফিরে যাচ্ছিলাম—- ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে অপরাধীর মতো মনে হচ্ছিল।
স্যুপের পরে গানটান শুনে খাওয়া শেষ করতে করতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। লাইটও অনেকক্ষণ হয় এসে গিয়েছিল। আমরা তিব্বতী এবং চিনাখানার এক সুস্বাদু মিশ্রণে রাতের আহার শেষ করেছিলাম। একজন একজন করে বাইরের অতিথিরা বিদায় নিচ্ছিল। পেমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সে কীভাবে যাবে। সে বলেছিল অতিথি দুজন তাদের ওদিকটাতেই থাকে। তাই একসঙ্গে চলে যাবে। সবাইকে বিদায় দিয়ে এগিয়ে দিচ্ছিলাম। লামা রিনপছে যাবার আগে প্রার্থনা করে আশীর্বাদ জানিয়েছিল। সুইস সাহেব এবং পন্ডিত রামপ্রসাদজীও ধীরে ধীরে বিদায় নিয়ে উপরে উঠে গিয়েছিলেন। তাই গৃহকর্ত্রী এবং মেয়েটি দুজনের সঙ্গে সবকিছু গুছানোতে লেগে পড়েছিল।
ডাইনিং হলটা পরিষ্কার করে ছেলেটি ঝাড়পোচ করছিল। তারা সকালের জন্য কোনো কাজেই ফেলে রাখতে চাইছিল না। আমি শুধুমাত্র অসহজ ভাবে কিছু সময় টিভি দেখে,তারপরে বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
ডাইনিং হলে কাজ করে একটা সময়ে মেয়েটি বেরিয়ে এসেছিল। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে একটু অবাক হয়েছিল।
‘ তুমি অপেক্ষা করছ নাকি? সে জিজ্ঞেস করেছিল।
আমি তার কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম।
‘ আগামীকাল সকালেই আমাকে দেরাদুন মুসৌরি যেতে হবে। তারপরে সিমলা। দশ দিনের মতো লাগবে। হঠাৎ যেতে হচ্ছে।’
‘আগামীকাল? তার কণ্ঠস্বর ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এসেছিল।’দশ দিনের জন্য ।’
আমি যেতে উদ্যত হওয়ায় সে মনে মনে খারাপ পেয়েছে। আমি ভাবছিলাম।
‘দশ দিনের মতো? তাড়াতাড়ি চলে আসতে পার না কি ?’
‘চেষ্টা করব,’তাকে কথা দিয়েছিলাম।
আমরা দুজন ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গিয়েছিলাম।
উপর মহলের বারান্দার খালি জায়গাটা পেয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বারান্দাটার প্রান্তে আমার ঘর, অন্য প্রান্তে মেয়েটির। সে ওখানে দাঁড়িয়ে পড়ায় আমি অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলাম। তার মানে সে আজ আমার তার ঘরে যাওয়াটা পছন্দ করছে না নাকি?
হাতটা এগিয়ে দিয়ে তার দীর্ঘ আঙ্গুল গুলির সামনেটা ধরেছিলাম। তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।। গভীর কালো চোখ জোড়া অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে উঠছিল। আঙ্গুলগুলি ধরে ঠোঁটের কাছে এনেছিলাম। সে এবার আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। জোরে।মুখটা আমার বাহুতে গুঁজে দিয়েছিল। আমি তাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম- এক লহমার জন্য ঠোঁট দুটি খুঁজে পেয়েছিলাম। সে এবার আমাকে ছেড়ে দিয়েছিল। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলেছিল, ভালোভাবে ঘুরে এসো গিয়ে সকালে যাবার আগে আমাকে বলে যেও। আমি তাড়াতাড়ি উঠি। শুভরাত্রি।
দীর্ঘ বারান্দা দিয়ে একটা ছায়ার মতো সে সরে গিয়েছিল। নিজের ঘরের দরজাটা পেয়ে এক লহমার জন্য যেন সে দাঁড়িয়েছিল। তালা খুলে ছিল, হ্যাঁ তালা খুলে ছিল সে।
আমি বজ্রপাত হওয়া মানুষের মতো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলাম।

অনুবাদক