আমাদের কালের শ্রেষ্ঠ এক মানব, শিল্পী এবং বাঙালি—সত্যজিৎ রায়—তিনি অপসৃত হলেন পৃথিবী থেকে, কিন্তু আমাদের স্মৃতি থেকে নয়।
চণ্ড এবারের গ্রীষ্মকাল। ভোরের বাতাসটুকু পর্যন্ত শীতল নয়। দুপুরে তন্দুরের হাওয়া বয়ে যায়। পাখিরা ডাকে না আর গাছগুলোতে। পত্রিকার প্রথম পাতায় উত্তর বাংলা, যেখানে আমার জন্ম, তার ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়া মাটির ছবি তিন কলামজুড়ে। বিকেল ঝিমিয়ে থাকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও মনে আনে না এতটুকু স্বস্তি, ব্যক্তিগত জীবনে হঠাৎ আসে ঝড়, কিন্তু আকাশে আসে না। কেবল ওলট-পালট হয়ে যায় অস্তিত্বের অনুভব। পথ হাঁটি, হেঁটে যাই, মনে হয় আর কোনো গন্তব্য নাই। যা ভালোবাসি, এই জীবনের কাছে যা কিছু বীজ, যা কিছু স্বপ্ন, যা কিছু কাঙ্ক্ষিত, সব ভেঙে ভেসে যায়। আকাশ কারবালার খুনে লাল হয়ে ওঠে সন্ধ্যায়। সন্ধ্যার মুখে মুখে খবরটা পাই—সত্যজিৎ রায় চলে গেছেন কিছুক্ষণ আগে। কিছুদিন থেকেই মন বলছিল, তিনি এবার হয়তো আর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে আসবেন না। মানুষ অমর নয়, তবু মানুষের চলে যাওয়াটাই সবচেয়ে দুঃখের বলে আমাদের মনে হয়, এই এক আশ্চর্য। প্রতিটি মৃত্যু আমাদেরই একটি অংশের মৃত্যু বুঝিবা, তাই মৃত্যু আমাদেরই মৃত্যু হয়ে ওঠে, বিশেষ করে এমন কোনো মানুষের মৃত্যু, যিনি আমাদের বেড়ে ওঠার জল ও জমি হয়ে থাকেন; সত্যজিৎ রায় ছিলেন এমন একজন। সন্ধ্যায় গাছগুলোর মাথা ছুঁয়ে দ্বিগুণ লু হাওয়া বয়ে যায়। কিছুক্ষণের জন্যে। এ সকলই মরুভূমি বলে মনে হয়।
বাংলা সাহিত্যের প্রধান এক পুরুষ কমলকুমার মজুমদারের আদৌ ভালো লাগেনি সত্যজিতের প্রথম চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’ —এ কথা সত্যজিৎ নিজেই একাধিকবার তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন; আর কমলকুমারের এই মন্তব্য থেকেই আমরা আশ্চর্য স্পষ্ট করে বুঝতে পারি, সত্যজিতের চলচ্চিত্র আমাদের অভ্যেসের কতখানি বাইরে সৃষ্টি, সাহিত্যের চলচ্চিত্র যে সাহিত্য নয়, সর্ব অর্থে স্বাধীন একটি শিল্প মাধ্যমের শস্য, সে কথাটি কমলকুমারের মন্তব্য আমাদের তির্যক কোণ থেকে জানিয়ে দিয়ে যায়; সত্যজিৎ আর কমলকুমারের পথ ভিন্ন হয়ে গেছে ‘পথের পাঁচালী’ থেকে, আর এই ‘পথের পাঁচালী’ থেকেই সত্যজিৎ হয়ে উঠেছেন শুদ্ধ একজন চলচ্চিত্রকর।
‘পথের পাঁচালী’ বাংলাদেশের প্রথম দিককার চলচ্চিত্রকরদের ওপর গভীর একটি প্রভাব ফেলেছিল; সে পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকের কথা; না, সত্যজিতের মতো কেউ চলচ্চিত্র এখানে তৈরি করেননি, কিন্তু যা হয়েছিল, একটা আদর্শ এসে গিয়েছিল আমাদের সম্মুখে। অনেকেই আজকাল ঢাকার চলচ্চিত্রের কথা বলতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে সেই প্রেরণা ও চিত্রদৃষ্টি, বিষয় নির্বাচন ও চিত্রধারণ অনেকখানি শিল্পগুণময় ও সঠিক পথে স্থাপিত ছিল বলে থাকেন; এর পেছনে দূর থেকে সত্যজিতের হাত কাজ করেছিল। নাজির আহমদ শত সমালোচনা করতেন সত্যজিতের, কিন্তু সেই নাজির আহমদই যখন ‘আসিয়া’র মতো চলচ্চিত্রের জন্ম দেন, তখন সত্যজিৎ থাকেন তাঁর চোখের সম্মুখে। নাজির আহমদ যখন এফডিসির গোড়ার দিকে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য আগ্রহী ব্যক্তিদের বাছাই করেন তাঁদের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পটভূমি বিচার করে, তখনো সত্যজিতেরই মণ্ডলকে তিনি আদর্শ বিবেচনা করে সেই মানদণ্ডেই একদল শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান, বাংলার কোলে বর্ধিত ব্যক্তিদেরই আহ্বান করেন। এমনকি এ জে কারদারকে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগ দেওয়াটাও বুঝি হতো না, যদি না তার কিছু কাল আগেই বিশ্ব আপ্লুত করা সত্যজিতের চলচ্চিত্রের উদাহরণ রচিত হয়ে না থাকত।
মনে পড়ে সত্যজিতের ‘অপরাজিত’ চলচ্চিত্রটি যখন ঢাকায় এল, তখন নাজির আহমদ এডিটর মেশিনে সে চলচ্চিত্র দেখবার সুযোগ করে দেন বাছাই করা কিছু তখনকার চলচ্চিত্রকরদের; এডিটওয়ালা মেশিনে চলচ্চিত্র দেখা সম্ভব ধীরে, দ্রুতগতিতে, এগিয়ে, পিছিয়ে—যেন একটি বই পড়ার মতো; ফতেহ লোহানী, মহিউদ্দিন, জহির রায়হান, আমি, আরও অনেকে, একইভাবে ‘অপরাজিত’ দেখেছিলাম বহুবার, তালিকা তৈরি করেছিলাম আমরা কোথায় সত্যজিৎ কীভাবে শট নিয়েছেন, জোড়া দিয়েছেন, শব্দ প্রয়োগ করেছেন এবং ‘ব্যাকরণ’ভেঙেছেন। বিকেলে এফডিসির মাঠে নভেরা আহমেদের ভাস্কর্যের পাশে বসে চা খেতে খেতে নাজির আহমেদের সঙ্গে এই তালিকা নিয়ে আমরা কথা বলতাম। তর্ক জমে উঠলে সম্পাদনা কক্ষে গিয়ে ‘অপরাজিত’-র কোনো বিশেষ রিল আবার দেখা হতো। আমরা চলচ্চিত্র যা-ই বানিয়ে থাকি না কেন সে সময়ে, সত্যজিৎ হয়েছিলেন আমাদের দ্রোণাচার্য, আমরা একলব্য। এক সোনার মন্দিরের দুয়ার খুলে গিয়েছিল আমাদের চোখের সম্মুখে।
সত্যজিৎ যে ঢাকার চলচ্চিত্রকে এর অধিক প্রভাবান্বিত করতে পারেননি, এ তাঁর দোষ নয়, দোষ আমাদের; ভান্ডার ছিল সমুখে, দুয়ার ছিল খোলা, গ্রহীতা ফিরে গেছে।
রবীন্দ্রনাথ যখন চলে যান, তখন নিতান্ত বালক বলে তাঁর তিরোধানের শোক এসে স্পর্শ করেনি আমাকে, সত্যজিৎ আজ যখন গেলেন তখনো শোক স্পর্শ করল না, কারণ, বয়সে এত দূর এখন আমি অগ্রসর যে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে ব্যক্তির সৃষ্টিকে দেখতে পারছি; ব্যক্তির চেয়ে শিল্প হয় দীর্ঘজীবী; সত্যজিতের শিল্প আছে জীবন্ত হয়ে, তাঁর রচনায় এই প্রাণ তাঁর ব্যক্তিক বাঁচা-মরার অপরাধ নির্ভরশীল নয়; তিনি কী দিতে পারতেন আর, তা নিয়েও শোক করব না। বরং শোক করি, নতুন করে এই বাংলাদেশে যে আমাদের চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরুতে সত্যজিতের মতো এক চলচ্চিত্রকরের আবির্ভাব সত্ত্বেও, তাঁকে আমাদের আলোচনায় সর্বক্ষণ রেখেও এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার তেজ ও স্বপ্ন ধারণ করেও আমরা এখন আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছি স্বেচ্ছায়।
সত্যজিৎ রায়ের মহাপ্রয়াণে এই আমাদের শোক; এই হোক আজ আমাদের চলচ্চিত্র পরিবারের প্রধান শোক।
বিশ্বসাহিত্যের দরবারে বাংলা সাহিত্যকে স্থাপন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, বিশ্ব চলচ্চিত্রে বাংলা চলচ্চিত্রকে সত্যজিৎ রায়; শুধু স্থাপনাতেই সীমাবদ্ধ নয় তাঁদের উদ্যম; বাংলা ও বাঙালির সুর ও অস্তিত্ব অনুভবকে তাঁরা দুজনেই বিশ্বধারায় যোগ করে দিতে পেরেছিলেন। ফলে তাঁদের রচনা পরে বিশ্বসাহিত্য বা চলচ্চিত্রও আর আগের মতো থাকে না, হয়ে ওঠে অধিক ধনী। রবীন্দ্রনাথের মতো সত্যজিৎও ছিলেন সব্যসাচী; সত্যজিৎ চলচ্চিত্রের মতো সমবায়ী শিল্পের প্রধান প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের হাতে কাজ করেছেন, ফলে তাঁর চলচ্চিত্র সর্ব অর্থে তাঁরই করোটির সন্তান; আবার চলচ্চিত্র শুধু নয়, ব্যবহারিক শিল্পের ক্ষেত্রেও বঙ্গভূমে তিনি এনেছেন বিপ্লব-বইয়ের প্রচ্ছদ, অলংকরণ, বাংলা হরফের রূপ নির্মাণ ও বিন্যাস রচনায়। ইংরেজি নতুন হরফ-রূপ তিনি রচনা করেছেন রে-রোমান; লিখেছেন শিশু ও কিশোরদের জন্য কালজয়ী গল্প ও উপন্যাস এবং পরিমাণে খুব সামান্য হলেও বড়দের জন্যে অসাধারণ কিছু রচনা। আর চলচ্চিত্র সমালোচক ও তাত্ত্বিক হিসেবে তো তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠদের একজন।
এমন মানুষটিকে একবারই আমার দেখার সুযোগ হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। বার্লিনে চলচ্চিত্র উৎসবে ‘অশনি সংকেত’-এর পুরস্কার লাভ করবার পর তিনি সস্ত্রীক লন্ডনে এসেছিলেন কলকাতা ফেরবার পথে, উঠেছিলেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ায় ‘প্রেসিডেন্ট’ হোটেলে; বিবিসির হয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নেবার জন্যে গিয়েছিলাম আমি আর এখন প্রয়াত ও আমার সহকর্মী শ্যামল লোধ।
ফোনে কথা হয়েছিল আগেই, সময় দিয়েছিলেন সকাল ১০টায়; আমাদের অফিস থেকে এক কিলোমিটারের মতো পথ তাঁর হোটেল অবধি। শ্যামল আর আমি রেকর্ডিংয়ের যন্ত্র কাঁধে করে পায়ে হেঁটে যখন প্রেসিডেন্ট হোটেলে পৌঁছলাম, তখন বাজে ১০টা ১০।
লাউঞ্জে ঢুকে দেখি, দূরে, রিসেপশন কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আছেন সত্যজিৎ রায়, আমাদের কালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি; দীর্ঘ দেহ, গায়ে হালকা বাদামি রঙের জ্যাকেট, ছাই রঙের ট্রাউজার, কাউন্টারে কনুই ভর দিয়ে তিনি হোটেলের রিসিপশনিস্টের সঙ্গে কথা বলছেন; লাউঞ্জে ভিড়, নানা দেশের মানুষ বসে আছে, অধিকাংশই শ্বেতাঙ্গ, তারা আঙুল তুলে ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে বলছে, ‘ওই যে, রে, সট্যাজিট রে’; গর্বে বুক ভরে গেল। এমন দৃশ্য আগে দেখিনি, আর দেখব বলেও আমার জীবনে আশা নেই, যে, একজন বাঙালিকে শুধু চেহারা দেখেই চিনে ফেলছে এবং এত আগ্রহ নিয়ে তাঁর প্রতিটি ভঙ্গি অনুসরণ করছে।
সত্যজিৎ আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন, লাউঞ্জে ভিড় ছিল ঠাসাঠাসি, সত্যজিতের জন্য নীরবে জায়গা ছেড়ে দিল ইউরোপীয় একটি জটলা, সত্যজিৎ না না করে উঠলেন, তারা তাঁর সঙ্গে করমর্দন করে আমাদের জোর করে বসিয়ে দিল তাদের সোফায়। সত্যজিৎ হাসতে হাসতে ঘড়ি দেখে মৃদু তিরস্কার করে আমাদের বললেন, ‘বাঙালির এই বুঝি সময়? এখন বাজে ১০টা ১০।’ সেই তিরস্কার তারপর থেকে এখনো আমাকে সময় রাখতে সতর্ক করে রাখে। প্রথমে শ্যামল লোধ ইংরেজিতে, তারপর আমি বাংলায় তাঁর সাক্ষাৎকার নিলাম, প্রধানত ‘অশনি সংকেত’ বিষয়ে। উঠে আসতে যাব, সত্যজিৎ বললেন, ‘বিজয়া গেছেন মারি সিটনের সঙ্গে শপিং করতে। ওদের শপিংয়ে বেরোনো মানেই—’ বাক্যটি শেষ করলেন না তিনি, আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘আপনি তো বাংলাদেশের মানুষ, এখন তো আর পাকিস্তান নেই, তবু পাকিস্তানিদের ধ্যানধারণা এখনো আপনাদের দেশে রয়ে গেছে বলে আমি মনে করি। আপনাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
আশ্চর্য হয়ে আজ ভাবি, আমাদের স্বাধীনতার দুবছরের মাথায় এবং বঙ্গবন্ধু যখন জীবিত ও দেশের হাল ধরে রয়েছেন, তখনই ঋষির মতো সত্যজিতের চোখে ধরা পড়েছিল আমাদের জাতীয় জীবনের আসন্ন সংকটের সূত্রটি। প্রায় আধঘণ্টা ধরে এই একটি কথাই তিনি বারবার আমাকে বলেছিলেন, তাঁর উচ্চমানের ইংরেজি উচ্চারণে, ‘বাংলাদেশে না প্রতিক্রিয়াশীলেরাই আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আমি শঙ্কা করি। আমি শঙ্কা করি।’
সত্যজিৎ রায়ের সেই শঙ্কা আজ আমার কানে বাজছে। আমি ভীত কি? না, কারণ, তিনি সেদিন বলেছিলেন, ‘বাঙালির আছে প্রচুর প্রাণশক্তি, সেই শক্তি সম্পর্কে যত দিন আমরা সচেতন থাকব, তত দিন বাংলা ও বাঙালির কোনো ভয় নেই।’
সূত্র : প্রথম আলো

(২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫ – ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬) বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে সক্রিয় একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশী সাহিত্যিক। … সৈয়দ শামসুল হক মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেছিলেন। বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে কম বয়সে এ পুরস্কার লাভ করেছেন।