শিকাগো ডায়েরি (শেষ পর্ব)
শিকাগোর চেনা ফুটপাথের ধারে মাটির ওপরে তখন চেরি ব্লসমের ঝরে পড়া বীথি। মৃত প্রজাপতির মত দেহ রেখেছে গোলাপী পাপড়িমালা। মিলে গেল । অনেকদিন আগে পড়া অমলতাস ঝরে পড়ে শুকিয়ে যাওয়া দেখে অনিতা অগ্নিহোত্রী দি লিখেছিলেন এমনটি । মনে হল আমার চলে আসার জন্য ফুলেরও বুঝি মনখারাপ। টিউলিপের সে ভবন্ত যৌবন আর নেই। গরমে হেলে পড়েছে শুকনো ফুল। আমি গাই ঘরে ফেরার গান। তবু উতলা কেন যে প্রাণ!
পর্তুগীজ রেস্তোরাঁ পোর্তোর চিকেন পেরিপেরির পোড়া পোড়া সেই গন্ধে মাতাল হবে আবারও সেই ফুটপাথ।সন্ধের আলোয় ঢল নামবে কলেজ ফিরতিদের। ইতালিয়ান ডেসার্ট তিরামিসু খাবার লাইন লাগবে আবারও।
আমার নী কাজের তাড়াহুড়োয় দইয়ের মধ্যে মিউসলি ভিজিয়ে খেয়ে নিয়ে কোনোরকমে স্কুলে চলে যাবে। রোজ বলত পাতলা পাতলা পরোটা খাইয়ে খারাপ অভ্যেস করে দিলে। ফেরার পথে খিদে পেলে বড়জোর ঢুঁ মারবে একটিবার ফ্রোজেন ইয়গারটে। ছেলেটা হয়ত লাইব্রেরী ফেরতা মিট করবে সেখানে। তারপর দুজনে একসঙ্গে আবারো পেরুবে আমার চেনা সেই রাস্তা গুলো। সেদিন বাড়িতে মা অপেক্ষায় থাকবে না।
সেই ঘর পড়ে থাকবে একা। এককোণে ডেস্কটপে ছেলেটা কাজ করেই চলবে। ফিলি থেকে কন কল হলে উঠে গিয়ে বসবে খাবার টেবিলে, ল্যাপটপ নিয়ে। একাএকাই ঘরের মধ্যে “ইয়ে” বলে চেঁচিয়ে উঠবে কোনো প্রোগ্রাম ঠিকমতো রান করলে কিম্বা আরসেনাল গোল করলে। হোয়াটস্যাপে পিং করে আমার কাছে জানতে চাইবে হয়ত আলুর দমে সেদিন ঠিক কি মশলা দিয়েছিলাম অথবা হৈ হৈ করে তার বাবাকে জানাবে ভালো গ্রাফ প্লট করার কথা। তারপর মনে পড়বে আজ কি লন্ড্রি করতে হবে? গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট রিমাইন্ডার দেবে হয়ত রাতের চিকেন থ করার জন্য। বউ বাড়ি এসে রাঁধবে। অথবা বলবে আজ ফেরার সময় পিটস থেকে একটু কাঁচালংকা আনতে পারবে? বাই দ্যা ওয়ে একটু কোকোনাট মিল্কও যদি পারো। নেক্সট উইক এন্ডে আমি থাই কারি বানাব তবে।
লিভিংরুমের এক কোণে ম্যারেন্টা পাতাবাহারের গোড়ায় জল জমেনি তো? রান্নাঘরের কাঁচের শিশির মধ্যে পিঁয়াজের গাছ দুটো কেমন আছে কে জানে? সেদিন রসুন মুরগী বানাতে গিয়ে কত্তটা স্প্রিং আনিয়ন কেটেই নিলাম আমি। আসার আগে ওর রান্নাঘরের প্যান্ট্রির তাকগুলো মুছে দিয়েছি। আরেকটা পেঁয়াজ পচে যাচ্ছিল দেখে সেটাকেও জলের মুখে রেখে এসেছি। সেটার পাতা মেলা দেখলেই ওদের মনে পড়বে ওদের মায়ের কথা। শিকাগোতে পেঁয়াজ তাড়াতাড়ি পচে যায়। শিকাগো নামের অর্থ নাকি পচা পেঁয়াজ থেকেই এসেছে।
সেদিন একলা আমি রান্নাঘরে রান্না করতে গিয়ে বউয়ের রান্নাঘর হাঁটকেছি। তবে হাতড়াই নি মোটেও। সব কৌটোর গায় মার্কার দিয়ে নাম লেখা, জিরে, পাঁচফোড়ন, বেসন, সুজি, ডাল এমনকি ইসবগুলও।
রিসাইক্লিং বিন টাও আলাদা করে রাখা। সব শিশি বোতল, টিনের কৌটো ধুয়ে তার মধ্যে রাখে সে। বাড়িউলি তেমনি বলেছে যে।
ফ্রিজ টা এত বোঝাই কেন রে?
কি করব? হিটিং বেড়ে গেলে সব খারাপ হয়ে যায় তাই ফ্রিজে রাখি মাম্ মাম্। নী বলে ওঠে।
লিভিং রুমে তার ছবি আঁকার সরঞ্জাম আর ছেলের কিবোর্ড পড়েই থাকে। কখন যে একটু সময় পাবে ওরা!
আমি চলতে ফিরতে, উঠতে বসতে, ঘুমোতে, জাগতে গেয়ে উঠি ঘরে ফেরার গান।
সেদিন ভোরে উঠে দেখি স্কুল যাবার আগেই এগ-মেয়ো স্যান্ডুইচ গ্রিল করে রেখেছে সবার জন্য। বলে ওঠে সে,
তোমায় এই ক্র্যাব রাংগুন টা খাওয়াতেই হবে, আজ ফেরার পথে ডোনাটস নিয়ে আসব কিন্তু।
সেদিন সারপ্রাইজ দিয়েছিলাম ফুলকপির সিঙাড়া বানিয়ে। রান্নাঘরের কাবারড থেকে চীনেবাদাম আর ফ্রোজেন কড়াইশুঁটি ও দিব্যি খুঁজে পেয়েছিলাম। বাঙালি সিঙাড়া খেয়ে কি খুশি মেয়েটা! সেই হাসিটা ভুলিনি। আরেকদিন স্কুলের টিফিনে সব্জী-আলুর পরোটা বানিয়ে দিয়েছিলাম।
মাইক্রো ওয়েভে গরম করে নিয়েছিলি?
আবারও সেই হাসির ঝিলিক তার মুখে।
ওমা! আমাদের সকাল বিকেল গ্যাস্ট্রোনমিক ফূর্তিফার্তার চোটে সব সবুজ নধর কলাগুলো হলুদ হয়ে গেল রে! কি হবে? চল্। সিন্নি বানিয়ে ফেলি।
অতগুলো কলা দিয়ে সিন্নি? কি যে বল তুমি!
দৌড়ে গিয়ে চুপিচুপি ব্লেন্ডার ঘুরিয়ে কলাদের দফারফা করে ফেলে দুজনে। দুধ দিয়ে ঘুরিয়ে হাতে ধরিয়ে দেয় সুদৃশ্য কাঁচের গ্লাসে বেনানা স্মুদি । বানিয়ে তাক লাগায়।
সেদিন ডিনারে আমি বানালাম রসুন মুরগী। নী বানালো মিক্সড হাক্কা নুডলস। স্যুইট ডিশ কি হবে? তাদের বাড়ির গাছের গতবছরের পাকা আমের আম পাপড় দুধে ভিজিয়ে রেখে বানিয়ে ফেলে সুস্বাদু ম্যাঙ্গো শেক।
আজ রোদ ঝলমলে বিকেলে আর আমাদের বেড়াতে যাওয়া হল না। কলকাতায় জ্যৈষ্ঠ মাসের ভয়ানক দাবদাহ আর শিকাগোতে তখনো হাল্কা পুল্কা জ্যাকেট চাপাতে হয়। এই নাকি শখের গ্রীষ্ম, সুখের গরমকাল এসেছে ।
ওদের শিকাগোর গেস্ট রুমে পিয়ানো তে প্যাথোজ। ট্রান্সপোজ চেঞ্জ করে একই সুর দুহাতে বাজিয়ে চলেছে সে। যেন নদীর জল আপনি নিজের খেয়ালে ঢেউ তুলে চলেছে। চেনা কর্ড তবুও অচেনা। টাইটানিক না কি হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া? বোঝার আগেই পিয়ানো বন্ধ করে পেছন থেকে এসে দুহাত দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে সে। অনেক কাজ মা, কি করে সামলাই।
ছোলে বাটুরে বানিয়েছি, আগে খেয়ে নে গরম গরম। তারপর ভাবা যাবে।
আবার একটু ল্যাপটপে বসে কাজ করতে যায় । আদা দিয়ে চা রেখে দি টেবিলে।
মা, তুমি কি করে বুঝলে আমার চা খেতে ইচ্ছে করছিল?
কাল যে বললি, গলায় ব্যাথা।
শিকাগোয় বসন্তের আগমন আর ঝটিতি প্রস্থান। সব ফুল ফোটার শেষ মুহুর্তে হুড়মুড়িয়ে গরম পড়ে গেল মাত্র দুমাসের জন্য। আজকেও বাড়ির সামনে চড়ুই দেখেছি। কি সুন্দর তোদের এখানে শালিখ গুলো।
ফেরার উড়ানে চিঠি লিখছি তোদের। আকাশপথে অলস আঙুলের সংলাপ।
আবারও সেই বাড়ির পাড়ার স্যামস ক্যুইকে সাঁঝবাতি জ্বলে উঠবে। পিতজা ঠেকগুলো আবার ভরে উঠবে সান্ধ্য অধিবেশনে। খুব হিংসে করব আমি।
থাই রেস্তোরাঁয় সেই রেড থাইকারীর সঙ্গে গন্ধরাজ লেবুর সুবাস নিতে নিতে আমার কথা ভাববি তো?
আমিও তখন গরমে বসে মুসুরডালে গন্ধ রাজ লেবু ঘষে নেব হয়ত।
আমি যখন আলুভাতের সঙ্গে আমার ছাদের গাছের টুস টুসে পাকা লঙ্কা ডলে নেব তোরা হয়ত তখন ঝাল ঝাল মেক্সিকান কিছু বানাবি কষে হাবানেরো লংকা দিয়ে।
আমি যখন সবুজ দিশি ক্যাপসিকাম দিয়ে চাউমিন বানাব তোরা হয়ত তখন তোদের নানা রঙের বেল পেপার দিয়ে রঙীন ইতালিয়ান পাস্তা বানাবি। আমি বলব আরেকটু লঙ্কা দে। নী বলবে, না, না আর দেব না। তুমি বরং চিলিফ্লেক্স ছড়িয়ে খেও।
এভাবেই কেটে যাবে আমাদের সব দিন গুলো। আবার দেখতে দেখতে দুর্গা পুজো পার করে শীত আসবে। তোদের অপেক্ষায় দিন গুনবে তোদের মা।
ফিরে আসার সময় ব্যাগের মধ্যে পড়ে থাকা শিকাগো সিটি পাস, মিউজিয়ামের টিকিট, রোড ম্যাপ গুলো দেখতে দেখতে বড় কষ্ট হল। সেই স্ট্যান’স ডোনাটস, ডানকিন ডোনাটস, জিওডানোস পিত্জা, জিরাডেলি চকোলেটসের রঙচঙে কাগজের প্যাকেটগুলো আরো আরো মন ভারী করে দিল আমার।
আজ বাড়ি ফিরে ফ্রিজ খুলে মায়ের জন্য তোদের মনে কষ্ট হবে। তোদের রান্নাঘরের সেই পিঁয়াজ গাছটার সব ফ্রেশ গ্রিন আনিয়ন আমি আজ কুচিয়ে গার্নিশ করেছি একটা চাইনিজ ডিশে। রাগ করবি না তো? পাতাশূন্য গাছটা দেখে? চেখে দেখিস বাড়ি ফিরে। গার্লিক শ্রিম্প জাতীয় কিছু একটা দাঁড়িয়েছে মনে হল। ফ্রিজের ক্রিস্পারে নানান রঙের বেল পেপার ছিল। লোভ সামলাতে পারিনি। সবগুলো দিয়েছি আজ মিলিয়ে মিশিয়ে। গরম ভাত অথবা ম্যাগি বানিয়ে নিয়ে খাস দু’জনে। পরের বার আসার সময় গ্যারেটস পপ কর্ণ নিয়ে আসবি মনে করে।
শিকাগো থেকে আবুধাবি ফেরার পথে একে একে আটলান্টিক, বাল্টিক, ক্যাস্পিয়ান সাগর পেরুতে পেরুতে আমি এবার ঘরে ফেরার গান গাই ততক্ষণ। জানিস? আর্টিক সাগরও পেরুলাম বোধ হয়। সাত সমুদ্র তবুও দেখা হল না রে। তেরো টা নদী হয়ত বা পড়ল পথে। আবুধাবিতে মধ্যপ্রাচ্যের আরেক সমুদ্র পেরুব না? আরব্য উপসাগর নাকি পারস্য উপসাগর সেটা? কি জানি? আপাততঃ আমার ভূগোল, ইতিহাস সব জমা রেখে এসেছি শিকাগোর কাছে।
আমার মেঘলা এ মনের ভেতর কবে আবার বৃষ্টির প্রলেপ পড়বে সুপর্ণা? তুমিই জানো ঠিক কবে যেন বর্ষা টা আসে।

উত্তর কলকাতায় জন্ম। রসায়নে মাস্টার্স রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ থেকে। বিবাহ সূত্রে বর্তমানে দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা। আদ্যোপান্ত হোমমেকার। এক দশকের বেশী তাঁর লেখক জীবন। বিজ্ঞানের ছাত্রী হয়েও সাহিত্য চর্চায় নিমগ্ন। প্রথম গল্প দেশ পত্রিকায়। প্রথম উপন্যাস সানন্দা পুজোসংখ্যায়। এছাড়াও সব নামীদামী বাণিজ্যিক পত্রিকায় লিখে চলেছেন ভ্রমণকাহিনী, রম্যরচনা, ছোটোগল্প, প্রবন্ধ এবং ফিচার। প্রিন্ট এবং ডিজিটাল উভয়েই লেখেন। এ যাবত প্রকাশিত উপন্যাস ৫ টি। প্রকাশিত গদ্যের বই ৭ টি। উল্লেখযোগ্য হল উপন্যাস কলাবতী কথা ( আনন্দ পাবলিশার্স) উপন্যাস ত্রিধারা ( ধানসিড়ি) কিশোর গল্প সংকলন চিন্তামণির থটশপ ( ধানসিড়ি) রম্যরচনা – স্বর্গীয় রমণীয় ( একুশ শতক) ভ্রমণকাহিনী – চরৈবেতি ( সৃষ্টিসুখ) ২০২০ তে প্রকাশিত দুটি নভেলা- কসমিক পুরাণ – (রবিপ্রকাশ) এবং কিংবদন্তীর হেঁশেল- (ধানসিড়ি)।অবসর যাপনের আরও একটি ঠেক হল গান এবং রান্নাবাটি ।