পাঠপ্রতিক্রিয়া: দুটি পাতা একটি কুঁড়ি এবং আমি । সুজিত দাস
বীরপাড়া এবং জটেশ্বরের মাঝে একটি এরিয়া ফিফটিওয়ান। নাম তাসাটি চা-বাগান।এই অলৌকিক সবুজের গালিচা, নিজের শৈশব এবং কৈশোর নিয়ে ‘কোনও গল্প বা উপন্যাস নয়, এ এক মেয়েবেলার কাহিনি।‘ লেখিকা নন্দিতা বাগচী। ‘এখন ডুয়ার্স’ প্রকাশনা।
নন্দিতা তাঁর জীবনের প্রথম উনিশটি বছরের ছড়ানো ছেটানো নানান ঘটনাকে বেঁধে রেখেছেন এই বর্ণনে। তাই বলে এই লেখাসমূহ কখনোই আত্মজীবনী নয়। এ যেন ক্যারন রেলওয়ে স্টেশনের পাশের নদীতে ছোটবেলার সেই স্বপ্নের চড়ুইভাতি। ‘চারদিকে সবুজ পাহাড় আর বড় বড় বোল্ডারের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা ডায়না নদী’-র মতোই বড় স্বাদু গদ্যে লেখা এই আখ্যান। একদম বাউন্সি লেখা নয়, বরং বর্ষায় ফোটা গন্ধরাজ আর দোলনচাঁপা ফুলের মৃদু ঘ্রাণ ছুঁয়ে থাকে একশো আঠাশ পাতার এই বইটিতে।
নন্দিতা বাগচী মূলত উপন্যাস লেখেন। ছোটগল্পও। দেশে বিদেশে ভ্রমণ করেন। লেখেন ভ্রমণকাহিনিও। ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি এবং আমি’ সেই অর্থে তাঁর কমফর্ট জোনের বিষয় নয়। এখানে একটি গল্প নেই। কাহিনিতে বয়ে চলা ট্যুইস্ট অ্যান্ড টার্নস্ নেই। আখ্যানের লুজ এন্ডস নেই। বরং ছোট এবং সদ্য বড় হয়ে ওঠা একটি মেয়ের অজস্র গল্প আছে। সেই গল্পে কখনও ডুয়ার্সের রূপকথা, কখনও জলেশ্বর মাছওয়ালা কিংবা বীরপাড়ার পোস্টঅফিস বা ডিবিসি রোডের ‘আবরনী’।
তাসাটি চা-বাগানের ‘বড়া ডাগদারবাবুর মেয়ে’র ছোটবেলায় একটি ক্যানভাস ছিল। সেই আদিগন্ত সবুজ ক্যানভাসে অনেক নিপুণ তুলির স্ট্রোক। অ্যাবস্ট্রাক্ট বা সার-রিয়েল, কোনোটাই নয়। এ যেন আমাদের প্রত্যেকেরই ছোটবেলা। নন্দিতা লিখতে পেরেছেন, আমরা পারিনি। এই ছোটবেলা জুড়ে ছড়িয়ে আছে আমাদের সকলের নরেশদার দোকান। ‘ঝাল ঝাল চানাচুর, খাস্তা শিঙ্গাড়া, রেপসিড তেলে ভাজা জিলিপি আর রসগোল্লার বাসি রসে আঁশানো খুরমা।‘
‘ভুটান পাহাড়ের আবছা অবয়ব আর দিগন্ত বিস্তৃত মখমলি চা-বাগান’-এর কোলে ব্রিটিশ মালিকানাধীন এই তাসাটি বাগিচায় ছোটবেলা এবং ঘিরে থাকা প্রকৃতির কথা লিখবার সময় নিজের মা-বাবার কথা খুব স্বাভাবিকভাবেই এসেছে। সেই লেখা পড়ে কখনও মনে হয়নি ভালোবাসার আতচকাচ দিয়ে দেখে লেখা বরং বুধবার, সাহেব ডাক্তার হসপিটাল ভিজিটে এলে বড়া ডাগদারবাবু তটস্থ থাকতেন, আলমারি থেকে বের করে আনতেন কড়কড়ে ইস্তিরি করা ধুতি-সার্ট। মা-কে ইনস্টলমেন্টে শাড়ি বিক্রি করতে আসতেন যে গোপাল সাহা, গৃহকর্তার অনুপস্থিতিতেই তার আগমন ঘটত। ঢাকাই, টাঙাইল কিংবা ধনেখানি শাড়ি গছিয়ে দেওয়ার জন্য। ‘Her Majesty’s Secret Service.’ এ তো আমাদের ছোটবেলার সব মায়েদের কথা! এখানেই নন্দিতা বাগচী জিতে গেছেন। পড়তে পড়তে কখন যে নিজের শৈশবও জড়িয়ে মড়িয়ে একাকার হয়ে যায়!
সময়টা ডিসি কারেন্টের। সময়টা মাঠের সবুজে ত্রিপল বিছিয়ে প্রোজেক্টরে সিনেমা দেখার। এই কালখণ্ডে আইনক্স নেই, ফোর জি নেই তবে ‘সবুজ বন্ধুদের কথা’ আছে। আছে ‘ফুলমণি-এতোয়াদের কথা।‘ দাওয়াইওয়ালাজোসেফ আর মিক্সচারওয়ালা হোগরু-র কথা। এই কথনে বীরপাড়া নন্দিতার লন্ডন, বীরপাড়াই লেখিকার প্যারিস। আর মিনার্ভা টকিজ সেই অমোঘ আয়ুরেখা।
তুমুল বর্ষায় ফালাকাটা-পুন্ডিবাড়ির রাস্তা ভেসে যেতো তখন। বরযাত্রীরা আসত চিলাপাতা হয়ে। হাতির পাল দাঁড়িয়ে থাকত সেই অরণ্য-পথে। আর একটু বেশিক্ষণ যদি চলত এই ‘রোড ব্লকেড’, হয়তবা উনিশের মেয়েটি লগ্নভ্রষ্টা হয়ে যেতো। সেসব কিছুই হয়নি। হয়নি বলেই সাতসমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে নন্দিতা আবার ফিরে আসেন পুরনো তাসাটি-র ঘ্রাণ নিতে। ক্ষণিকের জন্য হলেও আসেন। এভাবেই ছোটবেলা বারবার হারিয়ে দেয় আমাদের। ডুয়ার্সও।
আমরা এখন অনেক চালাক হয়ে গেছি নন্দিতাদি। ‘হোগরু আভি চালাক হই গেলাক।‘ তবু আপনার এই মায়াগদ্য আবিষ্ট করে রাখে। টাইমমেশিনে বসে পড়ি।
প্রিয় পাঠক, একবার পড়ে দেখতে পারেন এই ঝরঝরে পাহাড়ি ঝোরার মতো বইটি।

কবি