| 23 ফেব্রুয়ারি 2025
Categories
ঈদ সংখ্যা ২০২১

ইরাবতী ঈদ সংখ্যার গল্প: বাজি  ।  কৃষ্ণা দাস

আনুমানিক পঠনকাল: 14 মিনিট

 

[এক]

 

মেহুল ‘বি কে জি’ স্যরের কোচিন থেকে বেরিয়ে সাইকেলের লক খুলছিল। হঠাৎ শুনল, “কে পি সি’র নোটটা নিবি? আমার কাছে আছে”।

মেহুল তাকিয়ে দেখল, সৌজন্য। সেও সাইকেলের লক খুলছে। বুঝল একটু আগে যখন আর্যের কাছে ‘কে পি সি’র নোটটা চাইছিল, হয়তো তখন সৌজন্য শুনেছে। ‘ডুয়েল নেচার ওফ রেডিয়েশন এন্ড ম্যাটার’ এর নোটটা পেলে ভালোই হত। বইটা পড়ে ঠিক ধারণাটা পরিষ্কার হচ্ছে না।

সামনে চলে আসা লম্বা হর্সটেল বাঁধা চুলের গোছা এক ঝটকায় পিঠে পাঠিয়ে মেহুল সাইকেলে উঠে বসল। “এখন আছে? দিতে পারবি?”

“না বাড়িতে। তোকে জেরক্স করে দেব”। সৌজন্য ওর সাইকেল নিয়ে এগিয়ে এল।

“ঠিক আছে, কাল মানডে তাহলে স্কুলেই আনিস”। বলেই মেহুল সাইকেলে প্যাডেলে চাপ দিল।

সৌজন্যও সাইকেলে উঠে পাশাপাশি চলতে চলতে বলল, “সরি স্কুলে না”।

“তবে?”

“আমি সবার সামনে তোকে দেব না”।

“কেন?”

“বিকজ শুধু তোকেই দেব। এই নোটটা অনেক কষ্টে তৈরী করেছি। বিনা লেবারে কেউ ভোগ করবে তা চাই না”।

“আর আমি যদি কাউকে দিই”?

“কাকে দিবি রোমিতকে”?

মেহুল বুঝল সৌজন্য ঠিকই ধরেছে। আজ নিয়ে টানা তিনদিন রোমিত কোচিনে এল না। সামনেই ইলেভেন এর ফাইনাল টেস্ট। একদম ফাঁকিবাজ হয়ে গেছে।  স্কুলেও মন দিয়ে পড়াশোনা করছে না। স্যরদের কাছেও বকুনি খায়। কী যে হয়েছে ওর কে জানে। আগে এমন ছিল না। সেকেন্ডারিতে ঝাক্কাস রেজাল্ট করল। সেন্ট জর্জ স্কুলের সেরা স্টুডেন্ট সবাইকে তাক লাগিয়ে মেরিট লিস্টের একদম ওপরে ছিল। ইলেভেন এ সৌজন্য এল বাইরের স্কুল থেকে। ভীষণ ইন্টেলিজেন্ট, সব সাবজেক্টেই এক নাম্বার হলেও রোমিত এর থেকে বেশি। ইলেভেন এ এসেই ফার্স্ট সেমেস্টারেই ফার্স্ট পজিশন কেড়ে নিল রোমিতের থেকে। ব্যাস সেই থেকেই রোমিত একটু একটু করে চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে।

চিন্তা থামিয়ে মেহুল বলল, “হ্যাঁ যদি দিই?”

সৌজন্য মুচকি হাসল, কিছু বলল না।

মেহুল একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল, “হাসছিস যে”?

“এমনি, দিতেই পারিস”। সৌজন্য জানে দিলেও রোমিত আর কিচ্ছু করতে পারবে না।

ওরা কথা বলতে বলতে সারঙ্গের মোড়ে চলে এসেছে। একটু দূর দিয়ে দামোদর বইছে। এখন বসন্ত।গাছে গাছে অমলতাস ফুল ফুটে হলুদ হয়ে আছে। কিছু পলাশ গাছ লালে লাল। এই জায়গাটা এলেই মেহুলের বুকের ভেতর যেন কেমন হয়। এই ফিলিংগ্সটা একদম অন্যরকম। এটা আনন্দের না মন খারাপের ও ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।

আগে আগে শীত আসার সময় থেকে বর্ষার আগে পর্যন্ত প্রায়ই ও আর রোমিত স্কুল থেকে সাইকেলে ফেরার পথে ওপরে সাইকেল রেখে শুকনো নদীখাতে নেমে যেত। চওড়া শুকনো  নদী খাতের মাঝে মাঝে সরু হয়ে জল বয়ে যাচ্ছে। বাকি বালুকাময় নদীখাতে বড়বড় ঘাস জন্মেছে। মেহুল ঘাসের বনে বসে ড্রয়িং খাতা খুলে ড্রয়িং করত আকাশ জল ঘাস জমি আর তার উপরের উড়ন্ত পাখি। রোমিত প্যান্ট গুটিয়ে স্কুল শু আর পিঠের ব্যাগ মেহুলের কাছে রেখে জলে জলে ঘুরে বেড়াত পড়ন্ত বিকেলে। এতেই ওর আনন্দ। একটা সময় রোমিত জল ঘেঁটে জামা প্যান্ট ভিজিয়ে উঠে এসে বসত মেহুলের পাশে। বলত “দেখি কী আঁকলি?” মেহুল হাসি হাসি মুখে ড্রয়িং খাতা মেলে ধরতো। রোমিত মুগ্ধ হয়ে বলত “দারুণ”। তার পর সন্ধে নামার আগে আবার তারা উঠে আসতো ওপরে। কিন্তু বিগত শীত থেকে রোমিত আর আসে না। স্কুল ছুটি হলে ও অনুপম আয়ুধদের দলের সঙ্গে মুন্ডা পাড়ায় ফুটবল খেলতে যায়। ক্লাসেও তেমন কথা বলে না। মেহুল সেকেন্ড তো আগাগোড়াই হয় তবু ওর কাছে গেলেই বলে, “এখান থেকে ফোট্, ভালো মেয়েদের কাছাকাছি এলে আমার অ্যালার্জি হয়”।

মেহুল অন্যমনস্ক হয়ে সাইকেল চালিয়ে কখন দামোদরের পাড়ে চলে এসেছিল। খেয়াল হতেই সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখল সৌজন্যও ওর সাথেই আছে।

মেহুলের সুন্দর দুটো চোখ বেদনার্ত। অস্ফুটে বলল, “কত দিন নামিনি নীচে।”

সৌজন্য বলল, “চল নামি”।

“যাবি”? মেহুল অন্যমনস্ক ভাবে বলল।

“চল যাই”। সৌজন্য সাইকেল লক করে ভাঙা পাড়ের দিকে এগিয়ে গেল। মেহুলও সাইকেল লক করে নেমে এল। এখন পড়ন্ত বিকেল। কিছু পাখি জলের ধারে পাড়ে বসেছিল। ওরা নামতেই হুইই করে উড়ে গেল। নীচে নেমে মেহুল আজ  ঘাসে বসল না। শুকনো জায়গায় পায়ের জুতো খুলে রেখে ক্যাপ্রিটা আরও একটু গুটিয়ে হাঁটু অবধি করল। পিঠে স্কুল ব্যাগ নিয়েই জলে নেমে গেল। সৌজন্যও ওর দেখাদেখি ফুল প্যান্ট যতটা পারল উঠিয়ে জুতো খুলে জলে নামল। ঠান্ডা জল পায়ে লাগতেই মেহুলের সারামন অদ্ভূত ঠান্ডা হয়ে গেল। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল জলের গভীরে। পায়ের নীচে বালি, ভীষণ ভালো লাগছে বালির স্পর্শ। জলে জলে এ মাথা থেকে ওমাথা হাটাহাঁটি করল। কোথাও জল গোড়ালি তো কোথাও হাঁটু খানেক। ছোট ছোট কিছু মাছ স্বচ্ছ জলে ঘোরাঘুরি করছে। দূরে আরও একটু গভীরতায় অন্য খাত তৈরী করে জলস্রোত বয়ে যাচ্ছে। কোথ্থাও আর কোনও শব্দ নেই।

সৌজন্য কলকাতার ছেলে, ও তেমন অভ্যস্ত নয় এই জলে জলে ঘোরা। আসলে ওর তেমন ভালোও লাগছিল না। এসেছিল মেহুলের জন্য। কিন্তু মেহুল বেশ অনেকটা দূরে সৌজন্যকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গিয়েছিল। সৌজন্য নির্জনতা ভেদ করে ডাক দিল “মেহুউউল”?

দূর থেকে মেহুল বলল “বঅঅল”?

“তুই কাছে আআআয়, অনেক দূরে চলে গেছিইইস।”

“কেনঅঅ? তুই আয় নাআআআ?”

সৌজন্য এগিয়ে গেল। প্যান্ট ভিজে যাচ্ছে, সেদিকে একপলক তাকিয়ে সৌজন্য মেহুলের দিকে এগিয়ে গেল।

 

[দুই]

 

সকাল সাড়ে ন’টায় স্কুলের মেন গেটে খুব ভিড়। গাঢ় নীল স্কার্ট, বা প্যান্ট, আর আকাশি রঙের শার্টের স্কুল ড্রেসে জায়গাটা নীল আকাশ হয়ে যায়। ছেলে মেয়েরা বেশির ভাগ আশেপাশের টাউনশিপ থেকে সাইকেলে করে স্কুলে আসে। এছাড়াও স্কুল বাস বাইক স্কুটার প্রাইভেট কারে স্কুলের সামনেটা জ্যাম হয়ে যায়। এসব কাটিয়ে রোমিত মেন গেট দিয়ে ঢুকেই দেখল অনুপম সামনে।

অনুপম বলল, “বস্ এদিকে এসো, কথা আছে”। সাইকেলের ক্যারিয়ার থেকে স্কুল ব্যাগ নিয়ে পিঠে পরে রোমিত সাইকেলটা সাইকেল স্ট্যান্ডে জায়গা মত রাখল। অনুপমকে অনুসরণ করে রোমিত স্কুলের পেছনে ওদের ব্যক্তিগত আড্ডার জায়গায় এল। অনুপম জলের ট্যাঙ্কের পাশে চাতালটা ফু দিয়ে পরিষ্কার করে বসল, “বস্, মালটার সাহস কিন্তু দিনদিন বেড়েই চলেছে”।

রোমিত গম্ভীর মুখে বলল, “কী ব্যাপার?”

“বস্ কাল মালটা মেহুলের সাথে সারাক্ষণ চিপকে ছিল কোচিনে”।

“কোন কোচিনে”?

“বি কে জির ম্যাথ ক্লাসে”।

আয়ুধ ওদের দেখে এদিকে এল। “বস ফিরিঙ্গির কিন্তু ফড়ফড়ানি বেড়েছে বলে দিচ্ছি”। সৌজন্য ফরসা বলে ওকে আড়ালে সবাই ফিরিঙ্গি বলে।

রোমিত একহাতে ঈশারায় ওকে থামিয়ে অনুপমকে বলল, “আর কিছু”?

“হ্যাঁ, রাহুল স্যর ওকে ইয়ালো হাউসের লিডার করার পর থেকেই দেখছি ফুটবল টিমটাকে ঢেলে সাজাচ্ছে। মোটা সঞ্জুকে আউট করে আর্যকে গোলকিপার করেছে”।

“করুক গ্রীন হাউস খেলার মাঠে এক চুলও জায়গা ছাড়বে না ইয়ালোকে। ওটা নিয়ে ভাবিস না। ফাইনাল ম্যাচে আমরাই জিতবো”।

আয়ুধ বলল, “বস্ এদিকে যে আমিও দেখেছি ফিরিঙ্গি মেহুলকে নিয়ে দামোদরের চরায় ঘুরছিল”।

চট করে রোমিত আয়ুধের দিকে তাকাল। “কী বললি”?

“হ্যাঁ বস্। আমার দাদার বাইকে ফিরছিলাম, রাস্তার ওপর থেকে দেখি ওরা জলকেলি করছে”।

“মানে”?

“মানে ওই আর কী। দু’জনে জলে জলে ঘুরছিল”।

রোমিতের চোয়াল শক্ত হল। চোখ দিয়ে আগুন ছুটল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “শালা ফিরিঙ্গিটা আমার লাইফ তছনছ করে এখন মেহুলের দিকে থাবা বাড়িয়েছে”।

অনুপম রোমিতের মুখ লক্ষ্য করে বলল, “বস্ এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। ওই শালা ফিরিঙ্গির বাচ্চাকে উচিত শিক্ষা দিতে হবে”।

আয়ুধ বলল, “একদম ঠিক বলেছিস, একটু বাটাম পাল্লিশ দরকার”।

রোমিত তাও চুপ দেখে অনুপম বলল, “বস্ প্ল্যান করো, ক’দিন মনের সুখে হাতের সুখ করে নিই”।

আয়ুধ সমর্থন করল,“ঠিক ঠিক। আমি হকি স্টিক নিয়ে আসবো”।

রোমিত হঠাৎ বসে পড়ল চাতালে। হাত উল্টে ঘড়ি দেখে বলল, “ডাকতো একবার ফিরিঙ্গিকে”।

অমনি আয়ুধ দৌড়ল। হাতে বেশি সময় নেই। দশ বারো মিনিট তার পরই প্রেয়ারের ঘন্টা পড়বে। যা বলার এখনই বলা ভালো। একটু পরেই সৌজন্যকে আসতে দেখল আয়ুধের সঙ্গে। মুখে একটা প্রচ্ছন্ন হাসি। যেন মনে হয় সব জানে, কী ঘটছে, কী ঘটেছে, বা কী ঘটতে চলেছে। রোমিত ওর দিকে ভালো করে তাকাল । ওর থেকেও লম্বা ফিরিঙ্গি। প্রায় ছ’ফুট হবে। চেহারাও হ্যান্ডসাম। মাথায় ছোট করে চুলকাটা, আর চওড়া কপালে লম্বা নাক। মনে মনে নিজের সঙ্গে তুলনা করল রোমিত, গায়ের রঙটা তার চাপা, নাকটাও ওর মত টিকালো নয়। একটা চাপা রাগ ভেতরে গনগন করে উঠল।

সৌজন্য কাছে এসে রিল্যাক্স মুডে দাঁড়াল। মুখে সেই ডোন্ট কেয়ার হাসি।

রোমিত বিদ্রুপ হাসল চোখ ছোট করে, “কী খবর? শুনছি লাইন হচ্ছে।”

“লাইন?”

“ইয়েস দামোদরে জল কেলি?” পাশ থেকে আয়ুধ ফুট কাটল।

সৌজন্য দরাজ গলায় হেসে উঠল।“হাঃ হাঃ হাঃ। এতক্ষণে ক্লিয়ার হল”।

“ক্লিয়ার হয়েছে তো? এবার ক্লিয়ারলি আনসার দিয়ে দাও হিরো।” অনুপমের মুখে অবজ্ঞার ভাব।

“ওটা দিতেই হবে? না মানে ব্যক্তিগত ব্যাপার কিনা তাই বলছি”। সৌজন্যর চোখে মজা যেন উপছে পড়ছে।

রোমিতের সেটা লক্ষ্য করে গা পিত্তি জ্বলে গেল। কেটে কেটে উচ্চারণ করল, “মেহুল আমার। ওদিকে যে হাত বাড়াবে। তার হাত কেটে রেখে দেবো। মাইন্ড ইট!”

সৌজন্য হাসি হাসি মুখে বলল, “তাই নাকি? মেহুল তো কিছু বলেনি? আমি তো ওর ডাকেই নীচে নেমেছিলাম। এনি ওয়ে, মেহুল যদি ডাকে আবার যাব, বার বার যাব, কিন্তু না ডাকলে একবারেও যাব না। প্রমিস। ওকে? হ্যাভ এ গুড ডে”। বলেই হ্যান্ড সেকের জন্য হাত বাড়াল। রোমিত অন্য দিকে তাকিয়ে থাকল হাত বাড়াল না। সৌজন্য একটু হেসে মেন বিল্ডিং এর দিকে গটগট করে হাঁটা লাগাল।

সে দিকে তিন জনেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। আয়ুধ ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে বলল, “বস্ গোড়ায় গলদ। তুমি একবার মেহুলের সঙ্গে কথা বলো”।

অনুপম আয়ুধকে সমর্থন করে বলল, “ঠিক কথা। বস্ আগে ঘর সামলাও”।

রোমিত ভাবল কিসের ঘর? আজ পর্যন্ত মেহুল সম্পর্কে ওর বন্ধু ছাড়া আর  কিছু নয়। ভালো বন্ধু দ্যাটস্ ইট। এর বাইরে সে কিছুই ভাবেনি। তবু বন্ধুরা ধরেই নিয়েছে ওরা ক্যাপল। যদিও এ কথা ঠিক নার্সারি থেকেই ওরা পাশাপাশি বসে, টিফিন শেয়ার করে, বড় হয়ে নিজেদের পড়াশোনার নোটস্ শেয়ার করে, একে অন্যকে খুব কেয়ার করে, আর স্কুলে যাওয়া আসাও এক সাথে করে। তবে ইলেভেনের ওঠার কিছুদিন পর থেকেই সব বন্ধ। এখন মেহুলের পাশে ফার্স্ট বেঞ্চে ও বসে না, পেছনের বেঞ্চে অনুপম আয়ুধদের সঙ্গে বসে। যাওয়া আসাও এক সাথে করে না। বেসিক্যালি মেহুল সম্পর্কে ওর কোনও তাপ উত্তাপ নেই। তবুও মেহুলের সঙ্গে ফিরিঙ্গির মাখামাখিটা সহ্যের অতীত। ওটা কিছুতেই অ্যালাও করা যায় না। কিছু একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। কিন্তু কী?

প্রেয়ারের ফার্স্ট বেল পড়তেই ওরা প্রসঙ্গটা ছেড়ে মেন বিল্ডিংএ রওনা দিল।

 

[তিন]

 

রোমিত ছুটি হতেই সবার আগে স্কুল থেকে বেরিয়ে সারঙ্গের মোড়ে এসে দাঁড়াল। দু’পাশে বড় বড় গাছে জায়গাটা ছায়া ঘন। নির্জন এই পথে মেহুল ফেরে স্কুল থেকে। তার পর ডান দিকের রাস্তা ধরে মিনিট দশেক সাইকেলে গেলেই ওদের টাউনশিপ। ওদের মানে রোমিত ও মেহুল দু’জনদেরই, মেহুল এফ ব্লক, তার আগে সি ব্লকে রোমিত।

রোমিতের মনে পড়ল বসন্তের এই সময়টা যখন দামোদরের জল শুকিয়ে মধ্যে চরা জেগে ওঠে যখন চারদিকে পলাশ অমলতাসের ফুল ফোটে তখন ও আর মেহুল স্কুল ছুটির পর দামোদরের শুকনো নদীখাতে নেমে যেত।

দেখল কালো পীচ রাস্তা ধরে মেহুলের সাইকেল আসছে। মেহুল রোমিতকে দেখে নেমে এল সাইকেল থেকে।

“তুই এখানে একা একা দাঁড়িয়ে কী করছিস রোমিত?”

রোমিত গম্ভীর ভাবে বলল, “তোর জন্য অপেক্ষা।”

“আমার জন্য”? মেহুলের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল।

“ইয়েস তোর জন্য”।

“কেন রে কী হয়েছে?”

“কিচ্ছু না। ভাবলাম অনেক দিন দামোদরে নামিনি, তাই।”

মেহুলের যেন অবাক হওয়ার শেষ নেই। সে রোমিতকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত লক্ষ্য করল। গত প্রায় একবছর যে রোমিত মেহুলকে অ্যাভয়েড করে এসেছে তার হঠাৎ হলটা কী?

“কী হল ওভাবে তাকাচ্ছিস কেন?” রোমিত বিরক্ত।

“তুই ঠিক আছিস তো? আমি ঠিক ঠিক শুনছি তো?……..রোমিত”?
 “মানে?”

“শরীর টরীর ঠিক আছে তো?”

“হোয়াট রাবিস!”

“রাগ করছিস? এত দিন পর হঠাৎ তোর আমার সঙ্গে দামোদরে নামতে চাওয়ার কারণটা কী?”

“কারণ? হ্যাঁ, কারণ একটা আছে। শুনলাম তুই আজকাল ফিরিঙ্গির সঙ্গে দামোদরে জলকেলি করছিস”।

“কী? এসব কে বলল?”মেহুলের ভ্রু কুঁচকে গেল।

“বলেছে কেউ। সত্যি কিনা বল?”

“সত্যি। তবে জলকেলি মিনস্ যদি একে অন্যের সঙ্গে জল ছিটিয়ে স্নান হয়, তবে সেটা ভুল”।

“কে ডেকেছিল? তুই না ও?”

“আমি”।

“তুউউই? তুউউই ফিরিঙ্গিকে ডেকেছিস?”

“ব্যাপারটা কী বলতো? সৌজন্যকে তোরা ফিরিঙ্গি বলিস কেন?”

“লিসন, তুই ফিরিঙ্গির সঙ্গে মিশবি না।”

“কেন? একটা কারণ বল?”

“না মিশবি না, ব্যস।”

“রোমিত তুই পড়াশোনাটা ঠিক ঠাক কর এবার, কে কী করবে সেসব না ভেবে আগে লেখাপড়ায় মন দে।”

“জ্ঞান ঝাড়বি না। তোকে যা বললাম মাইন্ড ইট।”

“রোমিত তুই সেকেন্ডারিতে এত ভালো রেজাল্ট করলি, আঙ্কেল আন্টি কত খুশি হল, সেই তুই ক্রমশঃ পিছিয়ে যাচ্ছিস। একবার ভেবে দেখেছিস আঙ্কেল আন্টির কষ্টটা”?

“মেহুল আবার বলছি লেকচার দিবি না। বাই দা ওয়ে তোকে কি ফিরিঙ্গি কিস করেছে? সত্যি বল”?

মেহুল অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল রোমিতের মুখে। তার পর ফিসফিস করে বলল, “কী সব যা তা ভাবছিস তুই রোমিত? তোর কাউন্সিলিং দরকার।”

“স্যাট আপ!” হঠাৎ গলার শিরা খেঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল রোমিত।

মেহুল ঘাবড়ে গেল। এই রোমিতকে সে চেনে না, ভীষণ অচেনা এ রোমিত। দেখল রোমিতের গলার পেশি খেঁচে উঠেছে, দুটো চোখ রক্ত বর্ণ।  নির্জন বিকেল মুছে সন্ধ্যা নামছে। মেহুলের মনে হল এখান থেকে চলে যাওয়াই ভালো।

মেহুল সাইকেলে উঠে প্যাডেলে চাপ দিতেই রোমিত পেছন থেকে ক্যারিয়ার চেপে ধরল। টাল সামলাতে না পেরে সাইকেল নিয়ে রাস্তায় ধড়াস করে আছাড় খেল মেহুল। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল। ওর স্কার্ট উঠে গেছে কোমরে, হাতে পা ছড়ে গিয়ে রক্ত বেরচ্ছে। সে দিকে তাকিয়ে রোমিত বলল, “সরি মেহুল। আমি চাইনি তোকে কষ্ট দিতে, ঠিক যেমন তুইও চাসনি জ্ঞান ঝেড়ে আমাকে কষ্ট দিবি”।

রোমিত মেহুলকে রাস্তা থেকে তুলতে এল।

স্কার্ট ঠিক করে নিজেই কোনও রকমে উঠে দাঁড়াল মেহুল। “তুউউই- তুউউই বদলে গেছিস রোমিত!” চোখে জল মেহুলের।

“বদলে গেছি? কেন রে? আমি কি তোকে মলেস্ট করেছি? না রেপ? বল বল?”

এ পর কোন উত্তর হয় নাকি, না দেওয়া যায়? মেহুল সাইকেলটাকে দাঁড় করাল কোনও রকমে। সাইকেলটার হ্যান্ডেল সামান্য বেঁকে গেছে। জল ভরা চোখে বলল, “আমি যাচ্ছি।”

“দাঁড়া আমিও যাব”। ঘন অন্ধকার নামছে চারি দিকে। পাখিরা খুব ডাকাডাকি করে সেদিনের সমাপ্তি ঘোষণা করছে। রোমিত মেহুলের মুখোমুখি দাঁড়াল। মেহুলকে কিছু বুঝতে দেবার আগেই দু’হাতে ওর মুখ টেনে ধরে ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরল। মেহুল ছাড়ানোর জন্য ছটপট করে উঠল। কিন্তু রোমিতের শক্তির কাছে পেরে উঠল না। রোমিতের তল পেট লক্ষ্য করে হাঁটু দিয়ে এক গোঁতা মারল। রোমিত দু’হাতে জায়গাটা চেপে ধরে লাফাতে লাগল। সেই সুযোগে মেহুল কোন রকমে সাইকেলে উঠে জোরে প্যাডেল চালিয়ে দিল।

[চার]

আজ সন্ধ্যার আকাশটা কী দারুণ ঝকঝকে। চাঁদ তারা সব ঝকঝক করছে। বুট শিনগার্ড অ্যাঙ্কলেট জার্সি খুলে প্যাচপ্যাচে ঘামে ভেজা শরীরটা স্কুলের মাঠে ঘাসে শুইয়ে রোমিত তাকিয়ে ছিল আকাশে। অন্য ছেলেরা অনেকক্ষণ একে একে চলে গ্যাছে মাঠ ছেড়ে । রোমিতদের টিম গ্রীন হাউস আজ ফাইনালে উঠেছে রেড হাউসকে হারিয়ে। বিপক্ষে রেড হাউস জিরো গ্রীন হাউস টু। প্রথম থেকেই রেড হাউস ভালো খেললেও জিততে পারেনি। এর জন্য জান লড়িয়ে দিয়েছে রোমিত। ও একাই দুটো গোল দিয়েছে। সবাই ধন্য ধন্য করছিল। রোমিতের ভেতরের তাজা রক্ত আজ টগবগ করে ফুটছিল। এখন পরশু ফাইনালে গ্রীন হাউস আর ইয়ালো হাউস মুখোমুখি। যেভাবেই হোক ফাইনালে গ্রীন হাউসকে জেতাতেই হবে। এটা মরণ বাঁচন সমস্যা।

বাড়ি যাবার কোন তাড়া নেই আজ। বাবা মা কোলকাতায় দাদুর বাড়ি গিয়েছে, ফিরতে রাত ন’টা দশটা বাজবে। আজ অনেক দিন পর মনটা ভীষণ ভালো লাগছে রোমিতের। কতদিন পর প্রিন্সিপাল স্যর নিজে এসে পিঠ চাপড়ে গেল। মৃদু শীতল বাতাস বইছে। রোমিতের চোখটায় ঘুম চলে আসছে।

গতকাল মেহুলকে ওভাবে কিস না করলেই ভালো হত। আজ ও স্কুলে আসেনি। ও কি বাড়িতে কিছু জানিয়েছে? আন্টি আঙ্কেল কি এই নিয়ে বাড়িতে বা স্কুলে জানাবে? মনে হয় না। তা হলে আজ ঠিক ছুটে আসতো। খুব ভয় পেয়ে গেছিল মেহুল। এখন খারাপ লাগছে । মেয়েটা ভালো, সেই ছোট থেকে একসঙ্গে বড় হওয়া। ওকে ওভাবে কষ্ট দিতে চায়নি, কিন্তু কী করবে? ও কেন ফিরিঙ্গির পক্ষ নেবে? এত দিনের বন্ধুত্বে ফিরিঙ্গিকে কেন ঢোকাবে?

একটু দূরের স্কুল হোস্টেলের আলো আর লাইট পোস্টের আলো এসে পড়েছে মাঠে। সেই আলোয় রোমিত লক্ষ্য করল লম্বা লম্বা পা ফেলে ফিরিঙ্গি আসছে। দেখেই মাথাটা গরম হয়ে গেল। ফিরিঙ্গির ছায়াকেও অসহ্য লাগে। কী মতলবে আসছে কে জানে, তবে এবার বুদ্ধি নিয়ে চলতে হবে। সামনে ফাইনাল ম্যাচ। জিততেই হবে। সেই সঙ্গে বাজিও ধরবে। হ্যাঁ বাজি। এটাই শেষ চেষ্টা ঘুরে দাঁড়ানোর। বহুত হ্যাটা হতে হয়েছে ওকে। ক্লাস টেন পর্যন্ত ক্লাসের ফার্স্ট বয় স্যরদের চোখের মনি সর্বোপরি মেয়েদের কাছে হিরো ওই ছিল। ফিরিঙ্গি আসার পরই সব সম্মান চলে গেল। এটা কিছুতেই মানা যায় না ।

“আজ দারুণ খেলেছিস”। সৌজন্য রোমিতের পাশে এসে দাঁড়াল।

“এখানে কী মতলবে”?

“মতলব কী? হোস্টেলের ব্যালকনি থেকে দেখলাম তুই এখানে একা, তাই এলাম। ফাইনালেও আশা করি ভালোই খেলবি”।

“খেলবো মানে? ইয়ালো হাউসকে গুনে গুনে গোল খাওয়াবো”। রোমিত উঠে বসে একমুঠো ঘাস ছিঁড়ে ছুড়ে ফেলল দূরে।

“তাই নাকি? হাঃ হাঃ হাঃ! ইয়ালো হাউস তাহলে দাঁড়িয়ে থাকবে গোল খাওয়ার জন্য, তাই তো? হা হা হা”।

হাসিটা অসহ্য লাগল রোমিতের। আজকের আনন্দের পুরো সরটা কেটে গেল। ইচ্ছা করছে উঠে বেধকড় ক্যালায়। কিন্তু না, মাথা গরম করবে না। বুদ্ধি নিয়ে চলতে হবে। ঠান্ডা গলায় বলল, “বেট লড় কে জেতে?”

সৌজন্য হাসল, “বেট? হয়ে যাআআক।”

“লিশন আই হ্যাভ অ্যা সাজেশন।”

“হোয়াট?”

“দ্য লুজার উইল ফুলফিল অ্যা উইস ওফ দ্য উইনার।”

“আই এগ্রি”। সৌজন্যর ঠোঁটে এখনও হাসি।

রোমিত উঠে দাঁড়াল।পাশের ঝিলের জলে একটা ঢিল ছুড়ে বলল, “তা হলে শেষ পর্যন্ত কী ঠিক হল”?

“তুইই বল?”  সৌজন্য রোমিতের দিকে তাকিয়ে থাকল।

রোমিত ঘুরে দাঁড়াল। কোমরে দু’হাত রেখে মাথা নীচু করে দু’সেকেন্ড ভেবে বলল, “তুই যদি জিতিস তাহলে আমার গার্লফ্রেন্ড তোর”।

সৌজন্যর চোখটা লাফিয়ে কুঁচকে গেল। “আর তুই জিতলে?”

“আর আমি জিতলে তুই ফাইনাল টেস্টে আমার নীচে নাম্বার রাখবি, যাস্ট পাশ মার্ক”। কথাগুলো কেটে কেটে বলার সময় রোমিত সৌজন্যের চোখে চোখ রাখল।

সৌজন্য চোখ সরিয়ে নিল। ঘাসের দিকে তাকিয়ে সামান্য গম্ভীর হল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে রোমিতের পেতে রাখা হাতে সপাটে চাপড় মেরে বলল, “ডান। …বাট!”

“হোয়াট বাট”? রোমিত দু’কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে প্রশ্ন করল।

“একথা তুই আমি ছাড়া আর কেউ জানবে না”।

“উঁহু, তা আবার হয় নাকি”? রোমিতের চোখে বিদ্রুপ হাসি।

“মানে”? সৌজন্য ভ্রু কোঁচকালো।

রোমিত সৌজন্যের চোখে চোখ রেখে বলল, “রোমিত এত বোকা নয়। চারজন সাক্ষী চাই। দু’জন তোর, দু’জন আমার। নইলে কখন পালটি খাস কী বিশ্বাস আছে”?

সৌজন্য চট করে চারদিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, “তুই ব্যাপারটা ছড়াবি দেখছি”।

“ছড়ানোর কী আছে? আমার তরফে অনুপম আর আয়ুধ আছে। ওরা কাউকে লিক করবে না। এবার তুই দেখ তোর তরফ থেকে কে আছে”।

“সৌজন্য মাথা নাড়ল”। অর্থাৎ কেউ নেই।

“উইটনেস লাগবেই। তুই ঠিক কর। আমি চলি”।

রোমিত মাঠের থেকে বেরিয়ে গেল। সৌজন্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। কাজটা কী ঠিক হল? যদি রোমিত জিতে যায়? কিন্তু যা হবার তা হয়ে গেছে এখন আর পিছিয়ে আসা যায় না।

 

[পাঁচ]

 

এখনো ভেতর ভেতর উত্তেজনায় কাঁপছে রোমিত। যে ভাবে আজ খেলা হল এটাকে ঠিক খেলা না বলে যুদ্ধ বলা ভালো। যুদ্ধে আর প্রেমে ‘যো জিতা ওহি সিকান্দর’ কে যেন বলেছিল। যথারীতি গ্রীন হাউস জিতেছে। শেষ পর্যন্ত ফিরিঙ্গিকে হারানো গেল তা হলে। গত কাল ইয়ালো টিমের গোলকিপার আর্যকে মুন্ডা বস্তির ছেলেদের দিয়ে ভালোই পাল্লিশ করা গেছে। ব্যাটা খাঁড়া হতে পারছে না। ফলে লাস্ট মোমেন্টে মোটা সঞ্জুকেই গোলকিপার করতে হয়েছে। বেচারা প্রাকটিস করেনি কতকাল, ফলে গুনে গুনে পাঁচ গোল খাওয়ানো গেছে। তবে ফিরিঙ্গির টিম দারুণ খেলে চার গোল শোধ করেছে। হয়তো পাঁচ গোলও শোধই হয়ে যেত যদি না আগে থেকে প্ল্যান মাফিক আয়ুধ ইচ্ছাকৃত বিপক্ষ দলের স্ট্রাইকারকে ল্যাঙ মেরে নিজেই নিজের পা ধরে গড়াগড়ি না খেত। নিখুঁত অভিনয়ে পুরো পাঁচ মিনিট নষ্ট করেছে। সিসিটিভি থাকলে ঠিক ধরা পড়ত আসল কারসাজি। শেষ পর্যন্ত ওকেই ধরাধরি করে মাঠের বাইরে করে ইলেভেন্থ প্লেয়ার নামাতে নামাতে রেফারি বাঁশি বাজিয়ে দিল। খেলা শেষ হতেই ফিরিঙ্গি মাথা নীচু করে মাঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়াটা দেখার মত লাগছিল।

মাঠ এখনো পুরো ভর্তি। স্যরেরা আর স্টুডেন্ট্স মাঠের ধারে ভিড় করে। গ্রীন হাউসের সমর্থকরা এখনো গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে। এখনই প্রাইজ দেওয়া হবে। এটাই এ বছরের ফুটবল চাম্পিয়ানস্ ট্রফির ফাইনাল হল। আগামী এক বছরের জন্য ট্রফি গ্রীণ হাউসের দখলে। রানার্সরা সৌজন্য ছাড়া সবাই বসে মাঠের অন্য কর্ণারে।

“বস্ প্ল্যান তাহলে সাকসেসফুল!” অনুপম পাশ থেকে ফিসফিস করল।

রোমিত আজ খুব খুশি। বলল, “ফিরিঙ্গির ফড়ফড়ানির শেষ। এবার শুধু দেখ ওর ডানা কী ভাবে ছাঁটি”।

“বস্ আর্যকে ভালোই পাল্লিশ করেছে, দাঁড়াতে পারছে না। ওর বাবা পুলিশে কমপ্লেইন করবে নাতো”?

“করতেই পারে। কেউ মুখ খুলবি না।”

“বস্ ফিরিঙ্গি যদি পুলিশের কাছে মুখ খোলে”?

“তাও পারে। আমরা তো করিনি। কে করেছে জানি না বলে দিবি।”

“বস্ বেটিং এর ব্যাপারটা যদি বলে দেয়”?

“বলবে না। কারণ ও নিজেও জড়িত ছিল। আচ্ছা তোরা কেউ মেহুলকে দেখেছিস”?

“না বস্ তিনদিন হল ও স্কুলে আসছে না। খোঁজ নেব”?

“না থাক। নেক্স্ট উইক থেকে ফাইনাল এগজাম, হয়তো বাড়িতে বসে পড়ছে”।

“বস্ ফিরিঙ্গি শর্ত অনুসারে খারাপ এগজাম দেবে তো”?

“দেবে না মানে? দিতেই হবে”।

“যদি না দেয়?”

“মুন্ডা বস্তির ছেলেদের দু’বোতল বিদেশী দিলেই হবে”।

“কিন্তু বস, এবারে তোমাকে ফার্স্ট হতেই হবে।”

“না মেহুল হবে। আমি ফিরিঙ্গির ওপরে থাকলেই হল”।

 

[ছয়]

 

গনগনে রোদ চারিদিকে। মাথা নীচু করে রোমিত বসে আছে দামোদরের পাড়ে শাল গাছের ছায়ায়। আজ ইলেভেনের ফাইনাল রেজাল্ট বেরল। ফিরিঙ্গি পাস মার্কের কাছাকাছি পেয়ে পাস করেছে। কিন্তু ও নিজে ম্যাথস্ ফিজিক্স কেমিস্ট্রি তিনটেতেই ফেল। তবুও আগে কম নাম্বার হলেও ফেল ছিল না কখনও। কিন্তু এবারে ডাহা ফেল। খুব কান্না পাচ্ছে রোমিতের। প্রিন্সিপাল স্যর এত সব স্যর ম্যাম ছেলে মেয়ে সবার সামনে এ্যাসেম্ব্লিতে রেজাল্ট দেবার সময় ওকে গার্জিয়ান কল করতে বললেন। এর থেকে অপমান আর কী হয়? এও ছিল কপালে! এ মুখ দেখাবে কোথায়?

আসলে বহুদিন পড়াশোনাটাই হয়নি বাকি সব হয়েছে। কী যে হয় পড়তে বসলেই ফিরিঙ্গির মুখটা মনে পড়ে যায়। সব্বাই ওকে ভালোবাসে, সব ব্যাপারেই ও ফার্স্ট, স্যরদের নয়নের মনি। অথচ ও আসার আগে ওরই তো ছিল এসব।

কালকের মধ্যে স্কুলে গার্জন নিয়ে যেতে হবে। আজ বাড়ি ফিরবে কোন মুখে? বিগত এক বছর ধরে বাবা মা ওর ওপর বহুত খাপ্পা। উঠতে বসতে খ্যাচর ম্যাচর। মাঝে মাঝে মনে হয় কাউকে কিছু না বলে বাড়ি ছেড়ে স্কুল ছেড়ে যেদিকে দু’চোখ যায় চলে যায়।

মৃদু মন্দ বাতাস বইছে মাঝে মাঝে। নির্জন পাড়ে পলাশের পাপড়ি খসে পড়ছে একটা দুটো করে। অনেক দূরে নীচে নদীখাতের বালু চরার ঘাস জমিতে দু’তিনটে গরু ঘাস খাচ্ছে। একটা বাচ্চা ছেলে উদলা গায়ে গরুর পাশে ঘাস জমিতে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। হয়তো গরু পাহারা দিতে এসেছে। ঘুঁড়ি উড়ছে অনেক উঁচুতে। ছেলেটা এক মনে সুতো ছেড়ে যাচ্ছে। রোমিতের মনে হল ইস্ সে যদি ওই ছেলেটার মতো হত!

ওর কষ্টটা কেউ বোঝে না। মেহুলটা ছিল। কিন্তু ওর নিজের দোষে মেহুলও ওকে এখন এড়িয়ে যাচ্ছে। মেহুল আগের মতই ভালো রেজাল্ট করেছে তবে ফিরিঙ্গি  প্রতিযোগিতায় না থাকায় সেকেন্ড না হয়ে ফার্স্ট হয়েছে। পরীক্ষার সময় মেহুল এলেও ওর সঙ্গে কথা বলেনি। খুব ইচ্ছা হচ্ছিলো মেহুলকে ‘সরি’ বলে, কিন্তু বলা হয়নি। মেহুলের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবে। বলবে, “আবার আমরা দামোদরের চরায় নামি চ। তুই আবার ড্রয়িং কর, আকাশ মাটি জল, আর একটা ঘুড়ি আঁকিস নীল আকাশে। ওটা আমি। আমার আর মানুষ হতে ভালো লাগে না রে মেহুল। আমি ঘুড়ি হতে চাই”। বুক থেকে ভারী একটা নিশ্বাস বেরিয়ে এল।

রোমিত সাইকেলের আওয়াজে ঘুরে তাকাল। দেখল অনুপম সাইকেলে আসছে। কাছে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, “বস্ ওদিকের কেস জানো”?

রোমিত অর্থপূর্ণ চোখে তাকাল অনুপমের দিকে।

“বস্ মেহুল আর ফিরিঙ্গি টিসি নিচ্ছে।”

“মানে”?

“হ্যাঁ বস্, বিশ্বস্তসূত্রে জানলাম ওরা নাকি দু’জনেই কলকাতার আমাদের ব্রাঞ্চ স্কুলে চলে যাচ্ছে”।

রোমিতের মাথাটা ঘুরে গেল। “কী বলছিস কী তুই”?

“হ্যাঁ বস্ দু’জনের গার্জিয়ান স্কুলে এসে টিসি নিয়ে গেল। ওরা কালই কলকাতায় চলে যাবে”।

রোমিতের মাথাটা ফাঁকা লাগছে। ফিরিঙ্গি গেলে যাক। কিন্তু মেহল কেন? মেহুলের বাবা এখানের স্টিল প্লান্টসের জেনারেল ম্যানেজার। তবে কি উনি ট্রান্সফার নিচ্ছেন কলকাতা অফিসে?

“বস্ মেহুলের সাথে দেখা করবে না”?

“উঁ দেখা? উম্ না, মানে হ্যাঁ।”

“কী এত ভাবছো বস্? আমার মনে হয় একবার মেহুলের সঙ্গে দেখা করা দরকার। সেই ছোট থেকে এক সঙ্গে পড়েছি”।

রোমিত উঠে দাঁড়াল। “চল তো দেখি।”

“কোথায় যাবে বস্? ও তো স্কুল থেকে বাড়ি চলে গেছে”।

“বাড়ি চলে গেছে? তাহলে…।”রোমিতের কথা শেষ হল না, দেখল মেহুলের সাইকেল এদিকেই আসছে। রোমিত যেন হঠাৎ সসংকোচে কুঁচকে গেল। ঠিক কী বলবে কী করবে বুঝতে পারল না।

সাইকেলটা সামান্য দূরে থামিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে আসছে মেহুল। পরণে হলুদ টপ আর মেরুণ ক্যাপ্রি। মাথার চুল উঁচু করে ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা। টানা টানা চোখ, টিকালো নাক, পাতলা ঠোঁট। গায়ের রঙ যেন হলুদ টপের সঙ্গে ম্যাচিং। আজ এত বছর পর রোমিত যেন আবিষ্কার করল লম্বা রোগা মেয়েটা ভীষণ সুন্দরী। অবাক হল নিজের আবিষ্কারে। আশ্চর্য! এত দিন কেন সে দেখেনি মেহুলকে?

মেহুল সামনে এসে চুপ করে দাঁড়াল। রোমিতও চুপ। মেহুল মৃদু হেসে বলল, “আমি জানতাম তোকে এখানে পাব। এই জায়গাটা আমারো ফেবারিট”।

কেউ কোনও কথা বলল না। সর্ সর্ করে বাতাসের আওয়াজ হল শুধু। মেহুল আবার বলল, “রোমিত এবার অন্তত সচেতন হ। জীবনের এই দুটো ক্লাস খুব ভাইটাল। সিরিয়াসলি নে, তুই পারবি, পারবিই”।

অনুপম বলল, “শুনলাম টিসি নিয়েছিস”?

মেহুল মাথা নীচু করে নরম স্বরে বলল, “হ্যাঁ”।

রোমিত ভেজা গলায় বলল, “আবার জ্ঞান ঝাড়তে এলি”?

মেহুল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“যাবি তো যা। আবার জানাতে এসেছিস কেন”? রোমিতের গলায় প্রচ্ছন্ন অভিমান।

“এত দিনের বন্ধুত্ব! সেই নার্সারি থেকে। তাই যাবার আগে একবার তোর সঙ্গে দেখা করতে এলাম”।

“ওসব ফালতু কথা রাখ। আসল কথা বল”?

“আসল কথা”?

“হ্যাঁ। ফিরিঙ্গি চলে যাচ্ছে তাই তুইও যাচ্ছিস।”

“কী বলছিস এসব?”

“ঠিকই বলছি”।

“তা হলে শোন, দেখলাম এই স্কুলে সৌজন্য আর আমি না থাকলে তুই আবার আগের মত ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করবি। তাই আমরা কলকাতার স্কুলে চলে যাচ্ছি”।

রোমিত থরথর করে কাঁপছিল কেন ও জানে না। অপমান? না দয়া? না বন্ধুত্ব? না কী অন্য কিছু? অনুভূতিটা ঠিক বুঝতে পারছে না।

অনুপম ওদের কথার মধ্যে বলল, “ফিরিঙ্গির ব্যাপারটা ঠিক আছে, কিন্তু তুই যাচ্ছিস কেন”?

মেহুল জানতো প্রশ্নটা এক্ষুনি উঠবে। ও নিস্পৃহ গলায় বলল, “কারণটা রোমিত জানে। ওকেই জিজ্ঞেস করিস।”

“আমি? নাঃ, আমি কিচ্ছু জানি না।” রোমিতের গলা দিয়ে উষ্মা বেরল।

এবারে মেহুলের গলা কঠিন। “আমাকে নিয়ে বেট লড়িসনি কাপুরুষের মতো? সৌজন্যর সঙ্গে পেরে না উঠে ওকে শুধু পাশ মার্ক তুলতে বলিসনি? সৌজন্য কিন্তু কথা রেখেছে। ও ইচ্ছা করেই খারাপ রেজাল্ট করেছে। আর তুই? তুই তো পাশই করতে পারলি না। ভাগ্যের কী খেল দ্যাখ। জীবনে কোনও দিন ফেল করিসনি আর এবারেই ডাহা ফেল করলি”।

রোমিত মাথা নীচু করে রইল। অনুপম অমনি টিপ্পনি কেটে বলল, “আচ্ছা ফিরিঙ্গি তার মানে তোর কাছে কাঁদুনে গেয়েছে?”

“নাআআ। সৌজন্য আজ পর্যন্ত আমাকে কিচ্ছু জানায় নি”।

“তাহলে এসব তুই জানলি কী করে”?

“ট্রুথ কখনও চাপা থাকে না অনুপম। আয়ুধ ওর গার্লফ্রেন্ড শাওনীকে বলেছে। শাওনী আমায়”।

“শাআলা এই হল বন্ধু! কাকে বিশ্বাস করবি তুই রোমিত”?

“এগজ্যাক্টলি। কাউকেই বিশ্বাস করতে নেই। তা না হলে রোমিতকেই ধর না। নার্সারি থেকে আমরা বন্ধু অথচ আমাকেই গার্লফ্রেন্ড লেবেল লাগিয়ে বেটিং এ লাগাল। তার পর ধর রাস্তায় নৃশংস ভাবে সাইকেলে আছাড় খাইয়ে রক্ত ঝরালো। তার পর ধর আমাকে একা পেয়ে কামড়ে ঠোঁট ছিঁড়ে খেল। কেন বলত? কারণ আমি ওর ওয়েল উইশার ছিলাম তো, বন্ধু ছিলাম তো, তাই”।

রোমিত হীনমন্যতায় কুঁকড়ে আরো ছোট হয়ে গেল। মুখ তুলতে পারছে না। অনুপম এই প্রথম এসব শুনছে। ওর দু’চোখ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। বার বার একবার রোমিতকে একবার মেহুলকে দেখছে।

মেহুল কিছুক্ষণ চুপ থাকল, তার পর রোমিতের দিকে তাকিয়ে বলল, “আসি তবে? ভালো থাকিস। আর পারলে বাকি জীবনটা তোরা এক্সপেরিমেন্ট করিস বন্ধু জিনিসটা আসলে কী? খায়? না গায়ে মাখে”।

সাইকেলে উঠে প্যাডেলে চাপ দিল মেহুল। অনাবশ্যক দামাল হাওয়ায় গাছ থেকে ঝুরঝুর করে কিছু পলাশের পাপড়ি খসে পড়ল রাস্তায়। মেহুলের সাইকেলের চাকা তার ওপর দিয়ে এগিয়ে গেল। রোমিত আর অনুপম হাঁ করে তাকিয়ে থাকল ততক্ষণ -যতক্ষণ মেহুল বাঁকে না হারায়।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত