রবার্তো বোলানিওর উনা নুবেলিতা লুম্পেন । গাজী তানজিয়া
তথাপি তার জীবন আয়ুষ্কালের তুলনায় একটু বেশিই ঘটনাবহুল। বোলানিওর জন্ম সান্তিয়াগো দে চিলেতে ১৯৫৩ সালে। শিশু অবস্থাতেই বোলানিও বাবা-মার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ছুটে বেড়িয়েছেন। ১৯৬৮ সালে চিলি ছেড়ে তাদের পরিবার চলে যায় মেক্সিকোতে।
বোলানিওর ডাইলেক্সিয়া ছিল, ফলে পড়াশোনা বরাবরই তার জন্য ছিল নিরানন্দের। তবে তার সাহিত্যক্ষুধা এমন চরমে ছিল যে, তার সাহিত্যগুরু আর্জেন্টিনার হোর্হে লুই বোর্হেসকেও যেন ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
ষাটের শেষভাগে মেক্সিকো সিটির রাস্তায় মিছিল, পুলিশের সহিংস আচরণ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। বোলানিও এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ভালোমতোই আত্মস্থ করেছিলেন। ট্রটস্কির অনুসারী হয়ে তিনি মেক্সিকো ছেড়ে চলে গেলেন সালভাদরে।
সেখানকার বামপন্থি কবিদের সঙ্গে দারুণ সখ্য হলো তার। এই সময়ে একই সঙ্গে বন্দুক আর কবিতার খাতা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে শুরু করলেন। সেখানে এক রোমহর্ষক রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কবল থেকে রেহাই পেয়ে ১৯৭৪ সালে মেক্সিকো সিটিতে ফিরে এলেন বোলানিও। সেখানে তার পরিচয় ঘটে মারিয়ো সান্তিয়াগোর সঙ্গে। যিনি ছিলেন উদ্ধত আদিবাসী ও ইন্ডিয়ান বংশীয় এক কবি। এই দুজনে মিলে সঙ্গে আরও ডজনখানেক বন্ধুকে নিয়ে তারা গঠন করলেন, সাহিত্যিক গেরিলা দল, বোলানিও যার নাম দিলেন ইনফ্রারিয়ালিস্তাস। এ দলের নন্দনতত্ত্ব হলো, ‘ফ্রেঞ্চ পরাবাস্তববাদ’ আর সঙ্গে খানিকটা মেক্সিকান স্টাইলের ডাডায়িজম। তাদের কাজ ছিল প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে তীব্র আক্রমণাত্মক ভাষায় সাময়িক পত্রিকা প্রকাশ করা। আর তারা যাদের লাতিন আমেরিকার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ‘শত্রু’ বলে মনে করতেন তাদের যে কোনো অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে চিৎকার করে নিজেদের কবিতা পাঠ করা। এই আক্রমণের সবচেয়ে নিয়মিত শিকার ছিলেন ওক্তাবিও পাস, মেক্সিকোর প্রথম নোবেল বিজয়ী কবি। আরও ছিলেন মেক্সিকোর প্রখ্যাত লেখক কারমেন বউজোসাও। তিনি যে কোনো অনুষ্ঠানে গিয়ে আতঙ্কিত থাকতেন এই বুঝি ইনফ্রারিয়ালিস্তাস দল তাকে নাজেহাল করতে হাজির হয়ে গেল। তিনি এই দলকে সাহিত্যের ‘মূর্তিমান আতঙ্ক’ বলে উল্লেখ করতেন। এছাড়া বোলানিও গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজেরও সমালোচনা করতেন।
বোলানিও যাদুবাস্তবতার কট্টর সমালোচক হিসেবেই কুখ্যাত ছিলেন। জাদুবাস্তবতাকে তিনি এঁদো গন্ধের সঙ্গে তুলনা করতেন। তিনি গার্সিয়া মার্কেসের জাদুবাস্তবতার কলুষ ও অনুকৃতিকে (তার ভাষায়) লাতিন আমেরিকার লেখালেখি থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন। মূলধারার সাহিত্যের প্রতি বোলানিওর ক্রোধ ছিল গভীর। নিজের সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি মেলার পরও তার এই ক্রোধ অটুট ছিল। অথচ স্পেনের সেভিয়ায় লেখকদের এক সম্মেলনে তাকে স্প্যানিশভাষী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী লেখক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তাকে তার প্রজন্মের লাতিন আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় একজন লেখক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
১৯৯৯ সালে তার ‘দ্য স্যাভেন ডিটেকটিভ’ হিস্পানিক দুনিয়ার সেরা সাহিত্য পুরস্কার ‘রোমেলো গাইয়োগোস প্রাইম’ (যাকে স্প্যানিশ দুনিয়ার নোবেল পুরস্কার বলা হয়) লাভ করে। তার বই জার্মানি, ইতালি ও আমেরিকায় অনূদিত হয় এবং আমেরিকায় তার বই বেস্ট সেলারের মর্যাদা লাভ করে। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ পুস্তক সমালোচক জোনাথন লেথেম লিখেছেন, উপন্যাসের আঙ্গিকের মধ্যে থেকে কী কী করা সম্ভব তার সেরা দৃষ্টান্ত তার ২৬২৬ উপন্যাস। যদিও এই উপন্যাস তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। বোলানিও ২০০৩ সালের ১৫ জুলাই যকৃত রোগে মারা যান।
এবার আসি তার লেখায় উনা নুবেলিতা লুম্পেন তার লেখা ছোট উপন্যাস। ছোট পরিসরের এই উপন্যাসে তিনি অর্থনৈতিক মন্দার ভেতরে টিকে থাকা কৈশোর উত্তীর্ণ দুই এতিম ভাই-বোনের গভীর সংকট তুলে ধরেছেন। গাড়ি দুর্ঘটনায় বাবা-মাকে হারানোর পর পনেরো বছরের বিয়ঙ্কা ও তার ছোট ভাই দারুণ সংকটে পড়ে যায়। আর্থিক অনটনে তাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। বিয়ঙ্কা একটা স্যালোনে এবং তার ছোট ভাই একটা জিমে সামান্য অদক্ষ শ্রমিকের কাজ জুটিয়ে নিতে সক্ষম হলেও তাদের দারিদ্র্যের অবসান হয় না। এর মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে ধস নামে। বিয়ঙ্কা ভাবে তাদের এই চরম দারিদ্র্য তাদের হয়তো অপরাধপ্রবণ করে তুলবে। যা তারা এড়াতে পারবে না। বিয়ঙ্কা কখনোই নিজেকে এবং ভাইকে একজন অপরাধীর ভূমিকায় দেখতে চায়নি। সে হয়ে উঠতে চায়নি স্বৈরিণী বা গণিকা। বিয়ঙ্কার সুদিনের অপেক্ষায় এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং তার জন্য নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই কতটা দুর্বিষহ ও ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছিল পাঠক উপন্যাসটা পড়তে পড়তে যেন নিজের মধ্যে তা অনুভব করতে পারবেন। লেখকের লেখনীর এমনই ক্ষমতা যে পাঠক যেন নিজেই অস্থির হয়ে উঠবেন বিয়ঙ্কাকে এই পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে। বিয়ঙ্কা স্যালোনে কাজ শেষে রোমের রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ায়, আর রাতে বাসায় ফিরে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে টিভি দেখে যায়, এভাবে এক সময়ে সে ছোট ভাইয়ের আনা ভিডিও ক্যাসেটে নীলছবি দেখায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
বিয়ঙ্কার এই দারিদ্র্য আর একঘেয়ে টানাপড়েনের মধ্যে গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো তার ভাইয়ের সঙ্গে ফ্ল্যাটে এসে জুটল দুই যুবক। যেন দুই যমজ। অদ্ভুত রহস্যময় তাদের অতীত। ছোট ভাইকে নিয়ে রহস্যময়ভাবে মিলানের রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় তারা। আর বিয়ঙ্কাদের ফ্ল্যাটে বিনা পয়সায় থাকতে খেতে শুরু করে। বিনিময়ে তারা বাড়িঘর সাফসুতরো করে। আর সারা দিন তারাও পরিকল্পনা করে কোনো একটা কাজের বা কাক্সিক্ষত সুদিনের। এক রাতে ওই দুই যুবকের একজন বিয়ঙ্কার ঘরে এসে ঢোকে। বিয়ঙ্কা তাতে বাধা দেয় না। পরের দিন হয়তো আরেকজন। কে কবে ঢুকল বিয়ঙ্কা জানতে চায় না। তাদের প্রতি বিয়ঙ্কার কোনো প্রেম নেই। তাই তাদের পরিচয় জানতেও সে কোনো আগ্রহ দেখায় না। এ যেন প্রকৃতির নিয়মের মতো কোনো ব্যাপার। এরকম এক তালগোল পাকানো অবস্থায় এক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিয়ঙ্কাকে এনে হাজির করা হয় এক সাবেক চলচ্চিত্র নায়কের প্রাসাদোপম ভিলায়। এক অদৃশ্য সিন্দুকের খোঁজে। সিন্দুকটা যখন শুধুমাত্র অলীক কল্পনার অংশমাত্র হয়ে ওঠে বিয়ঙ্কা তখন আবিষ্কার করে যে সে এই অন্ধ পাহাড়ের মতো শরীরের সাবেক বডিবিল্ডার ও নায়কের প্রেমে পড়ে যাচ্ছে। তাদের সম্পর্কটা শুধু টাকার বিনিময়ে সময় কাটানোর বা সহজ কথায় রক্ষিতায় সীমাবদ্ধ নেই। পরিণতিহীন এই অসম প্রেম থেকে নিজেকে বের করে আনার এক তীব্র লড়াইও বিয়ঙ্কাকে করতে দেখা যায়। তবে বিয়ঙ্কা যে নিজেকে এই সবকিছু থেকে নিজেকে টেনে বের করে নিয়ে আসতে পেরেছিল সে ঈঙ্গিত কিন্তু ছিল গল্পের শুরুতেই। তারপরও কাহিনীর টানটান বিন্যাস, সংলাপ, বিস্তৃতি পাঠককে আকৃষ্ট ও একই সঙ্গে একাত্ম করে রেখেছে।
বই : উনা লুবেনিতা লুম্পেন (অ্যা লিটল লুমপেন নোভেলিতা)
লেখক : রবার্তো বোলানিও
ইংরেজি অনুবাদ : নাতাশা উইমার

জন্ম ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭। বাংলাদেশ। শিক্ষা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ। পেশা : উন্নত কৃষি গবেষণা।
উপন্যাস
১. জাতিস্বর
২. পৃথিবীলোক
গল্প
১. সবুজ ঘাসে মুক্ত বেশে
রাজনৈতিক নিবন্ধ
১. অরক্ষিত দেশে অবরুদ্ধ সময়ে
পুরস্কার
১. আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার ২০১০