| 19 জুলাই 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

তেইশে জানুয়ারি । বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

সমুদ্রের উত্তাল হাওয়ায় জাহাজটা  কেঁপে উঠছিল মাঝে মাঝেই। জাহাজের ডেক জনশূন্য। কেবল  সদ্য কুড়ি পেরনো এক  যুবক আর এক প্রৌঢ় দাঁড়িয়ে আছেন। নিজেদের মধ্যে তাঁরা কথা বলছেন নাকি  চুপ করে দাঁড়িয়ে উদ্দাম সমুদ্রের অস্থির ঢেউয়ের রূপ দেখছেন, তা  দূর থেকে দেখে  বোঝার উপায় নেই। ক্যাপ্টেনের কেবিন থেকে সতর্কবার্তা ছড়িয়ে পড়েছে জাহাজের সমস্ত যাত্রীদের মধ্যেই। কেউ যেন তাঁদের কেবিন থেকে বাইরে না আসেন।  তবুও  সমস্ত সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই এই দু’জন ভারতীয় জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়িয়েছেন। ঝড়ের সঙ্গে এলোপাথাড়ি বৃষ্টির ফোঁটায় তাঁরা ভিজে যাচ্ছেন। ঝোড়ো হাওয়ায় তাঁদের  মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার সাক্ষী,  উত্তাল সমুদ্র, অস্থির বাতাস আর জাহাজের ওই নির্জন ডেক।
যুবকটি বলছিলেন, আপনি দেশে থাকতেই আমার  কথা  শুনেছেন? নাম জানেন আমার! আমি বিশ্বাস করতে পারছি না গুরুদেব। কেবল মনে হচ্ছে, বিলেতে থাকাকালীন একবারও যদি আপনার সঙ্গে দেখা হতো!
‘বিলেতের দরকার কী? দেশে থাকতেই তো তুমি আমার কাছে আসতে পারতে! জোড়াসাঁকো কিংবা শান্তিনিকেতনেও,’ প্রৌঢ় স্মিত হাস্যে  বলে উঠলেন।
—দেখা করতে  যাইনি, সেই কথাটা ঠিক নয়, চেষ্টা করেও দেখা করতে পারিনি।  আপনি ডালহৌসিতে আছেন শুনে কেমব্রিজে আসার আগে আমি সেখানে  গিয়েছিলাম। কিন্তু শুনলাম, আপনি তার আগের দিনই কলকাতার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। কী আশ্চর্য! আপনাকে এই খবরটা কেউ দেয়নি? কী আশ্চর্য!
‘কী আশ্চর্য!’ কথাটা যুবকটি দু’বার বললেন। যুবকটিকে সেই সময়ে সমুদ্রের ঝড়ের মতোই অস্থির উত্তাল মনে হলেও প্রৌঢ় লক্ষ করলেন এই যুবকটি প্রকৃতপক্ষে মাঝসমুদ্রের ঢেউয়ের মতো স্থির ও অবিচল।
যুবকটি সদ্য কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেন্টাল ও মর‌্যাল সায়েন্সে ট্রাইপস লাভ করেছেন। যেকোনও ভারতীয়ের পক্ষে লোভনীয় চাকরি আইসিএস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেও সেই সর্বোচ্চ সম্মানের চাকরি প্রত্যাখ্যান করেছেন কেবলমাত্র দেশসেবা করবেন বলে।
যুবকটির নাম  সুভাষচন্দ্র বসু। এবং  তাঁর উল্টোদিকে দাঁড়ানো  প্রৌঢ় মানুষটি  আর কেউ নন, স্বয়ং   রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। দু’জনেই ইউরোপে তাঁদের কাজ সেরে একই জাহাজে দেশে ফিরে আসছেন। জাহাজেই দেখা তাঁদের।
সুভাষের কথার তখনই কোনও উত্তর দিলেন না রবীন্দ্রনাথ। একটুখানি চুপ করে থেকে বললেন, ‘তোমার কি আমার সঙ্গে বিশেষ কোনও দরকার ছিল?’
—হ্যাঁ। আমি আসলে ঠিক  করে উঠতে পারছি না   আপনার পল্লি গঠনের আদর্শে নিজেকে সঁপে দেব,   নাকি ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের আধ্যাত্মিক চেতনার আলোয় নিজের আগামী পথ ঠিক করব। কার কাছে যাব? কে দেখাবে দিশা? বলতে পারেন একটা ঘূর্ণাবর্তে পাক খাচ্ছি। বিলেতেও আসার তেমন কোনও ইচ্ছে ছিল না। কিছুটা পরিবারের চাপে আর কিছুটা নিজের কাছে নিজেকে প্রমাণের তাগিদে এসেছিলাম।
—নিজেকে প্রমাণ করার জন্য বিলেতে আসতে হবে?
—তা ঠিক নয়। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রেই দেখুন। বিলেতে না এলে আপনার কবিতা এরকম অনুবাদ হয়ে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ত না। আর নোবেল পুরস্কারও হয়তো…
—পেতেম না আমি। ঠিকই বলেছ।
—আমি ঠিক এইটে বলতে চাইনি। আমি আসলে বলতে চেয়েছিলাম…
রবীন্দ্রনাথ হাত তুলে থামিয়ে দিলেন সুভাষকে, ‘মানুষের ধারণা যখন নিজেকে না সাজিয়ে-গুছিয়ে আত্মপ্রকাশ করে তখন তার অন্যরকম একটা সৌন্দর্য আছে। শুধু তুমি একা নও, আরও অনেকেরই নিশ্চয়ই এইটেই মনে হয় যে, বিলেতে বহুবার এসেছি বলেই নোবেল পুরস্কার আমার ভাগ্যে জুটেছে। নিশ্চয়ই এই মনে হবার মধ্যে কিছুটা জোরও আছে, নইলে এতজন তা বিশ্বাস করবেন কেন?’
—মানুষ কি গুজবেও বিশ্বাস করে না?
সুভাষের গলায় খানিকটা লজ্জা।
সুভাষচন্দ্র থামলে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘অবশ্যই করে। সেটাই তো সমস্যা। তবে সেই সমস্যা কেবল আমার দেশের নয়। ইংল্যান্ড-আমেরিকাতেও গুজবের চল খুব কিছু কম নেই। বিশেষ করে আমেরিকাতে গুজবটাই একটা শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তার চাইতেও বড় একটা সমস্যা হল, যা নিজের থেকে অন্যরকম তাকে গ্রহণ করতে না পারা। সেই সমস্যা অবশ্য আমার দেশের নেই।’
—একটু যদি বুঝিয়ে বলেন…
—আমি বলতে চাইছিলাম এই যে, আমেরিকার সান্তা বারবারায় আমার আলখাল্লা ধরে টান দিয়েছিল দুই শ্বেতাঙ্গিনী তরুণী। যদিও এই পোশাক সৌন্দর্যে বা শালীনতায় কিছুমাত্র খাটো নয় তাদের পোশাকের চাইতে। কিন্তু তারা টান দিয়েছিল কেবলমাত্র এই পোশাক তাদের অচেনা বলে। কিন্তু আমাদের দেশে কত সাহেবসুবো কত বিচিত্র পোশাকে ঘুরে বেড়ায় কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা, কই কেউ তাদের বিরক্ত করে না তো! আসলে যা অন্যরকম তাই শত্রু— এরকমভাবে ভাবতে আমার দেশের লোক শেখেনি। তারা অচেনাকেও চোখভরে দেখে, প্রাণভরে স্বাগত জানাতে জানে।
—হয়তো সারাক্ষণ ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়য় না বলেই…।
সুভাষের কথায় ঘাড় নাড়লেন রবীন্দ্রনাথ, ‘হ্যাঁ, তাও ঠিক। আমি জাপানে দেখেছি একেবারে সাধারণ শ্রমিকও মুগ্ধ হয়ে প্রকৃতির শোভা দেখছে। অথচ ইউরোপ-আমেরিকার লোকদের মধ্যে সর্বক্ষণ এক উচাটন। যেন এক পল দেরি হলেই বিরাট কোনও লটারির টিকিট ফস্কে যাবে।’
—আমি আপনার মতো করে ভাবতে পারিনি কিন্তু ব্যাপারটা যে এরকম তা আমারও মনে হয়েছে। একটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও আছে এই ব্যাপারে। আর সেটার সঙ্গে আপনিও খানিকটা জড়িয়ে।
বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল প্রায়। কিন্তু এতক্ষণ ধরে ডেকে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে ওঁদের দু’জনেরই জামাকাপড় ভিজে একশা। রবীন্দ্রনাথের দিকে তাকিয়ে সুভাষচন্দ্র তাই সংবরণ করলেন নিজেকে, ‘আপনি আপাতত আপনার ঘরে যান গুরুদেব। কথা আমরা পরেও বলতে পারব।’
রবীন্দ্রনাথও এই প্রস্তাবে খুব অরাজি নন বলে মনে হল। স্মিত হেসে বললেন, ‘তাই হবে তবে। সন্ধ্যায় তুমি যদি ব্যস্ত না থাক তাহলে…।’
—পৃথিবীতে এমন কোনও ব্যস্ততা নেই, যা আপনার ডাকের চাইতে বড়।
রবীন্দ্রনাথ কিছু না বলে হাসলেন।
                                    …
সন্ধ্যায় দেখা হতেই সুভাষ যখন নিজের জন্মদিনে রবীন্দ্রনাথকে প্রণাম করতে আসার কথা তুললেন, কী রকম যেন চুপ করে গেলেন রবীন্দ্রনাথ। অল্প কিছুক্ষণ পরে থেমে থেমে বললেন, ‘তোমার জন্মদিনও তেইশে জানুয়ারি?’
—আজ্ঞে, হ্যাঁ। তেইশে জানুয়ারি ১৮৯৭ সালে। বাংলা সাল ১৩০৩।
—ওহ। ওই একই তারিখে আরও একজন জন্মেছিল। আমার মেজো মেয়ে রেণুকা। ১৮৯১ সালের তেইশে জানুয়ারি জন্মেছিল ও।
—উনি কি এই যাত্রায় আপনার সঙ্গী? মানে আমি দেখিনি বলে জিজ্ঞেস করছি।
—ও আমাদের সবারই দেখাশোনার বাইরে এখন। কিন্তু তাই বলে পিতার হৃদয় কি মানে? চোখ বন্ধ করলে এখনও যেন দেখতে পাই, মেয়েটাকে আমার। তুমি তোমার পরের জন্মদিনে শান্তিনিকেতনে এসো। তোমার আসার মধ্যে দিয়ে আমার ওই অকালে চলে যাওয়া মেয়েটারও স্মৃতিচারণ করা যাবে, আগামী তেইশে জানুয়ারি।
—আমি আগের একটা তেইশে জানুয়ারিও আসতে গিয়েছিলাম আপনার কাছে। প্রেসিডেন্সির ওইসব ঘটনা নিয়ে তোলপাড় তখন, মন খানিকটা বিক্ষিপ্ত হয়েছিল। মনে হচ্ছিল, আপনার কাছে গিয়ে আপনাকে প্রণাম করে আসলে পরে একটু শান্তি পাব হয়তো।
—তা এলে না কেন?
—আসব বলে বেরিয়েছিলাম। ট্রেনে গেলেই হয়তো ভালো হতো কিন্তু একটা মোটরগাড়ির ব্যবস্থা হয়ে গেল বলে তাতেই চেপে বসলাম। এবার বর্ধমান পার হয়ে সেই মোটর গেল বিগড়ে। সে একেবারে একটা জঙ্গলের মধ্যে। আমার সঙ্গী ভদ্রলোক তো ভয় পেয়েই গিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরই একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে।
—কীরকম আশ্চর্য ঘটনা?
রবীন্দ্রনাথের গলায় খানিকটা কৌতূহল।
ওই ঘোর নির্জন জঙ্গলে হঠাৎ করে  পালকি বেহারাদের গলার আওয়াজ শোনা যেতে লাগল।
‘সামনে যে সর্দার বেহারা  থাকে সে পথের বিবরণ দেয়, অন্যেরা চলতে চলতে উচ্চারণ করতে থাকে, ‘সামনে মাঠ, হই আরে, মাঠ রে ভাই হই আরে, ওই যে গ্রাম,  হই আরে, পুকুর ঘাট হই   আরে, খাল পেরুবি,  হই আরে…।’ রবীন্দ্রনাথ খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে বলে উঠলেন। 
—আমি অবশ্য অতটা মনোযোগ দিয়ে শুনিনি কিন্তু ওই জঙ্গলের মধ্যে ওই পালকি বেহারাদের ডাক আর তাদের  কাঁধের ওই পালকি যেন পরিত্রাণের একমাত্র পথ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।
—তারপর?
—তারপর দু’টি পালকিতে চড়ে আমরা  দু’জন  মানে আমি আর আমার সঙ্গী  রওনা দিলাম কোন এক নিরুদ্দেশের দিকে। আমাদের গাড়ির চালক ওই বেহারাদের সঙ্গেই হেঁটে আসছিল। বেশিক্ষণ যে পথ চলতে হল তা নয়। অল্প সময়ের মধ্যেই একটি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল বেহারারা। আমি আর আমার সঙ্গী ভদ্রলোক পালকি থেকে নেমে দাঁড়াতেই, বয়স্ক কেউ নয়, এক কিশোরী আমাদের আপ্যায়নের জন্য দাঁড়িয়ে আছে দেখলাম। তার হাতে আবার একটি অর্ধসমাপ্ত সোয়েটার। ‘আসুন, আসুন, পথে কোনও কষ্ট হয়নি তো?’ জিজ্ঞাসা করে মেয়েটি আমাদের সেই ছিমছাম দোতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলে নিয়ে গেল আর তখনই একটা দমকা বাতাসের ঝাপটে বাড়ির সব হ্যাজাক লণ্ঠনগুলি নিভে গেল আচমকা। ঘনঘোর অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে চেয়ারে এসে বসার পর একটি রেড়ির তেলের প্রদীপ আমাদের সামনে এনে রাখা হল। একঝলকের জন্য মনে হল, মেয়েটির হাতে একটি মোমবাতি আর সেটা তার হাতের ওই সোয়েটার ফুঁড়ে বেরিয়েছে। সেক্ষেত্রে তো সোয়েটারটা পুড়ে যেত… কিন্তু না, আমারই দৃষ্টিভ্রম, সোয়েটার ছিল না মেয়েটির হাতে।
—থাকুক আর নাই থাকুক, পুরো বাড়িটায় একটা সুপার-ন্যাচারাল পরিবেশ ছিল তা তো তোমার কথা শুনেই মনে হচ্ছে।
সুভাষচন্দ্র হেসে উঠলেন, ‘তা খানিকটা বলতে পারেন। আমার ভয়ডর চিরকালই কম কিন্তু সেই রাতে ওখানে ওই বাড়িতে একটা গা-ছমছমে আবহ ছিল তা অস্বীকার করতে পারব না। তার মধ্যেই ভৃত্য এসে চা আর কুচো নিমকি দিয়ে গেল। আমরা সেগুলোর সদ্ব্যবহার করার সময়ই দেখলাম, বাড়ির সেই কিশোরী মালকিন আবার আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন তবে এবার আর অর্ধসমাপ্ত সোয়েটার নয়,  প্যারীচরণ সরকারের ‘ফার্স্ট বুক অফ রিডিং’ হাতে। আমাদের খাওয়াদাওয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, একটু পরেই রাতের খাবারের ডাক আসবে বলে এখন আর আপনাদের জন্য বেশি আয়োজন করা হল না। আমার সঙ্গী ভদ্রলোক ঘাড় নেড়ে ‘তার আর প্রয়োজন নেই’ বললেন। কিন্তু সেই কিশোরী সেই কথা শুনল বলে বোধ হল না। সে তখন অন্য জগতে।’
—কোন জগতে?
—তা ঠিক বলতে পারব না কিন্তু কিছুক্ষণ পরপরই বলছিল যে, বাবা কষ্ট পাবেন, গ্রামার যদি ভালো করে না শিখি তবে। আমার সঙ্গী ভদ্রলোকটি ওই কিশোরী আবার অন্তর্হিত হবার পরে আমায় জিজ্ঞেস করলেন, গ্রামবাংলায় এমন কোনও পিতা আছেন সুভাষ, যিনি মেয়ে ইংরেজি গ্রামারে দড় না হলে কষ্ট পান? এই পোড়া দেশে বাবাদের চিন্তা তো মেয়েদের বিয়ে নিয়ে। কথাটা না মেনে আমারও উপায় ছিল না, তবুও খানিকটা খচখচ করছিল মনটা। তারপর একটু বোধহয় চোখ লেগে গিয়েছিল। ঘুম ভেঙে গেল রাতের আহার গ্রহণের ডাকে। সেই আহারে পদ 
ছিল বেশ কয়েকরকম। কিন্তু ওই কিশোরী বারবার করে দই-কাতলার প্রতি নজর দিতে বলছিল আমাদের। অতবড় কাতলা নাকি বাংলাদেশে আর দু’টি নেই। আরও বলছিল যে, জন্মদিনে কাতলা খেতে হয়।
সুভাষের কথার ভিতরেই রবীন্দ্রনাথ সামনের কাগজে খসখস করে পেন্সিল চালাতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পর এক কিশোরীর মুখ সুভাষচন্দ্রর দিকে তুলে ধরে বললেন, ‘তোমার কি এরকম কারও সঙ্গে দেখা হয়েছিল?’
—এই রকম কারও সঙ্গে মানে? এর সঙ্গেই দেখা হয়েছিল। কিন্তু পরদিন সকালে আমরা আমাদের মোটরের কাছে এসে আবার যখন ফিরে গেলাম, আমার সঙ্গী কলম ফেলে আসায়,  তখন আর বাড়িটার অস্তিত্ব দেখলাম না কোথাও।
—দেখার কথাও নয়। কারণ এই আমার মেয়ে রেণুকা। যে অকালে চলে গেছে আমাদের ছেড়ে।
—তার মানে! 
—তোমরা পথে বিপদে পড়েছ দেখে ও নিজের পক্ষপুটে আশ্রয় দিয়েছিল তোমাদের। ওর স্বভাবটাই এমন ছিল। আর একটা বায়না ছিল। জন্মদিনের দিন সবচেয়ে বড় কাতলা মাছ ওর জন্য নিয়ে আসতে হবে। জোড়াসাঁকোর বাড়িতে তেমনটা হতোও বটে, কখনও সখনও। তেইশে জানুয়ারি রেণুর সৌজন্যে বড় কাতলার টুকরো জুটে যেত আমাদেরও। আর ওই মায়ের হাতের দই-কাতলাটাই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করত ও।
হতভম্ব সুভাষচন্দ্রের চোখের সামনে নিজের চোখ দিয়ে গড়িয়ে নামা জল আলখাল্লার হাতায় মুছে নিলেন রবীন্দ্রনাথ। 

(দুই মহাপুরুষের কাল্পনিক কথোপকথন)

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত