বাস্তব সময়ের একটি জীবন্ত দলিল । অ্যাঞ্জেলিকা ভট্টাচার্য
একজন মানুষের অস্তিত্ব হ্যাঁ থেকে না হয়ে যায়। সে অতীতে ছিল । কিন্তু বর্তমানে “নেই” হতে শুধু কিছু ঘণ্টা, মুহূর্ত লাগে। সেই ব্যক্তির নাম বৈরাগী মণ্ডল। ‘বৈরাগী মণ্ডল’ নামটা তারা করে বেড়ায় মফঃস্বলের অলিতে গলিতে, বস্তির নোংরা পাঁকে, রাজপথের অট্টালিকায়, বিলাস বহুল নরম বিছানায়। নিরুদ্দিষ্টের উপখ্যান তার গতি নিয়ে এগিয়ে যায়। সাহিত্যিক অমর মিত্র গল্পের বুননে পাঠকের চোখের সামনে তুলে ধরেন এক রক্তমাংসের বৈরাগীকে। যার অনুভবগুলো স্পর্শ করা যায়, যার দুঃখে চোখে জল আসে, কিন্তু তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না । কিন্তু কে এই বৈরাগী!
বৈরাগী মণ্ডল ছিল শ্রী রামচন্দ্র কাচকলের একজন সাধারন শ্রমিক। বাইশ নম্বর বস্তিতে বাবা মা স্ত্রী সন্তান নিয়ে ছিল তার বাস। কাচকলে মালিক তালা মেরেছে । শ্রমিকের পেটের ভাত মেরে সেখানে উঠবে বহুতল আবাসন। আলো ঝলমলে রাস্তা হবে। আকাশ চুম্বি বহুতলের ইমারত তৈরী করতে প্রয়োজন হবে প্রচুর মুটে মজুর। আবাসন হলে সেখানে আসবে স্বচ্চল , শিক্ষিত পরিবার। নোংরা জঞ্জাল বহুতলের নীচে চাপা পরে যাবে। সবুজ ঘাসে দামী জুতো পরে ঘুরে বেড়াবে বহুতলের বেবিরা। তাদের গায়ে সুগন্ধি ছড়ান থাকবে। বহুতলে দামী মানুষ এলে। তাদের দইনন্দিন কাজ করার জন্য লোক চাই । দামী মানুষ, অশিক্ষিত , নোংরা বস্তির মানুষের শ্রম থেকে গায়ের চামড়ার দাম ভালোই দেবে। শুধু তারা সেই চামড়ায় আঁচর কাটলে বস্তির মানুষ উফ টুকু করতে পারবে না। এটাই তো উন্নয়ন।
এই বস্তির মানুষ কারা? প্রভুদয়াল রোলিং মিল, শ্রীরামচন্দ্র কাচকলের শ্রমিক পরিবারের বড় অংশ নিয়ে বাইশ নম্বর বস্তি। মালিকপক্ষ কোন অন্যায় করেনি । যদি কারখানা লাভের মুখ না দেখবে , তার উপরে ইউনিয়নের চাপ, সে বেচারা কোথায় যাবে! শ্রীরামচন্দ্র কাচকলের মালিক তো তবু শ্রমিকদের ঠকায়নি।তাদের দুশো করে টাকা দেওয়ার কথা বলেছিল। শুধু বলেছিল নয় একদিন সেই টাকা বিলিও হচ্ছিল। কিন্তু বেয়াদপ বৈরাগী মণ্ডল সেই টাকা নিতে অস্বীকার করে। এবং অন্যদের সেই টাকা নিতে বারন করে। মালিকপক্ষের এটাই সাফাই ছিল। আসলে বৈরাগী বুঝেছিল শ্রমিক থেকে তারা দাসে পরিনত হতে চলেছে। এতদিন বাড়ির ছেলেরা রোজগার করত। কিন্তু এবার তাদের বাড়ির মা বউ বোন সবাই আবাসনের বহুতলে দাসিগিরি করবে। আর আবাসনের ঠাণ্ডা ঘরে কি হয় সেই ঘটনার ভয়াবহতা বস্তির প্রতিটা মানুষ জানত।
প্রভুদয়াল রোলিং মিলের তিরিশ বিঘের জমিতে বহুতল আকাশদীপ হাউজিং উঠেছে। সেখানেই কাজ করত মধু কারক। সেই আবাসনের রঙিন দেওয়ালে তার শরীর বেআব্রু হওয়ার কাহিনী লেখা আছে। কিন্তু সেই কাহিনী চাপা পরে যায় চোর বদনামে। কেউ প্রতিবাদ করে না। কারক দম্পতি সম্মান বাঁচাতে সুইসাইড করে। কিন্তু সুইসাইডের পিছনের কারন পুলিশের খাতায় লেখা নেই। লেখা থাকে না। অসাধু পুলিশের দলও হয়ত নাম লিখিয়েছে এইসব আবাসন মালিকদের খাতাতে। যেমন বৈরাগীর অন্তর্ধান রহস্য পুলিশের ডায়েরিতে নিছক একটা মিসিং ডায়রি। হবেই বা না কেন বৈরাগীর বংশে এমন হারিয়ে যাওয়ার গল্প তো আছেই ।
প্রভুদয়াল রোলিং মিলের কথা কেউ মনে রাখেনি। শ্রীরামচন্দ্র কাচকলের কথাও কেউ মনে রাখবে না। সেখানেও গড়ে উঠবে বিলাসবহুল আবাসন। রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে দামী গাড়ি। কিন্তু পুলিশকে খুঁজে বার করতে হয় বৈরাগীর ঠাকুরদার মিসিং ডায়েরি। ঠাকুরদা ননীগোপাল মণ্ডলও নিরুদ্দেশ হয়েছিল তার দেহ পাওয়া গিয়েছিল কোরাপুট জেলায়। সেই তথ্য পুলিশ সযত্নে রেখে দেয়। এটাই মনে হয় সব থেকে বড় প্রমান পত্র । বৈরাগী হারিয়ে গিয়েছে। পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে আসেনি।
বৈরাগীর বউ সহচরী, বাবা মদনমোহন মণ্ডল তাহলে কি মিথ্যে বলছে? সেই রাতে কাশীপুর থানার সাব ইন্সপেক্টর জগন্নাথ মিশ্র এবং কনস্টেবল অধীর কুণ্ডু বৈরাগীকে কলার ধরে মারতে মারতে নিয়ে এসেছিল। বস্তির সবাই দেখেছিল। কিন্তু বৈরাগীর অপরাধ! না সে কোন অপরাধ করেনি। আর অপরাধী না হলে কি পুলিশ কখনো কাউকে এভাবে নিয়ে যায়! প্রমোটার রমেশ শর্মা কে কারখানার শ্রমিকরা ঘিরে ধরে ছিল। তার গাড়ি ভাংচুর করে। এর জন্য রমেশ শর্মা এফ আই আর করে। কিন্তু সেই এফ আই আরেও বৈরাগীর নাম ছিল না। বস্তির লোক, মালিক , এমনকি পুলিশ পর্যন্ত জানে বৈরাগী মণ্ডল একজন নিরীহ শান্ত লোক। না সেই রাতে বৈরাগী নামে কাউকেই পুলিশ ধরেনি। আর যদি নাই ধরে তাহলে ফেরত দেবে কি করে? পুরটাই মিথ্যে সাজানো। বস্তির লোকের ঘাড়ে কটা মাথা যে তারা পুলিশের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে! একমাত্র বৈরাগীর বাড়ির লোক গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে থাকে “ওগো আমাদের লোকটাকে ফেরত দিয়ে যাও।
উপন্যাস যত এগোতে থাকে ততই মনে প্রশ্ন জাগে একটি নিরীহ শান্ত লোক বিপদজনক হতে পারে? বিপদজনক তো নিশ্চই । যে কাচকল বন্ধ, লোকটা তার সাইরেন শুনতে পেত। যে নিমগাছ কেটে দিয়েছে সেই নিমগাছের গন্ধ লেগে থাকত লোকটার নাকে । বন্ধ কাচকল খোলার স্বপ্ন দেখত লোকটা। এরকম স্বপ্ন যদি সত্যি দেখতে শুরু করে প্রতিটা শ্রমিক। পেটে গামছা বেঁধে দিনের পর দিন বন্ধ কারখানার গেটে বসে থাকা একরকম। কিন্তু সেই শ্রমিকের স্বপ্ন উস্কে দিলে , আগুন জ্বলে উঠবে তা মালিক, প্রমোটার সবাই জানত। সেই স্বপ্ন সত্যি হলে দেশের সমাজের উন্নয়ন আটকে যাবে। তবেই না বৈরাগী মণ্ডল বিপদজনক। তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছে পুলিশ। কিন্তু এটা প্রমান করবে কে?
লেখক ক্রমশ এগিয়ে গিয়েছে গভীরে। আমরা কোথায় যেন আমাদের বিবেকের মুখমখি হয়েছি। কোর্ট থেকে তদন্ত করতে আসেন অখিল শ্রীবাস্তব। তার তদন্তের বিষয় শুধু এটুকুই “ পুলিশ কি সেদিন বৈরাগী মণ্ডলকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল?” গল্প এগিয়ে চলে। বাইশ নম্বর বস্তি থেকে সে পৌঁছে যায় বিলাসবহুল আকাশদীপ আবাসনে। তার সঙ্গ নেয় একজন বস্তির মানুষ। তার কাছ থেকেই জানতে পারে কারক দম্পতির কথা । বৈরাগী মণ্ডল কে পুলিশ সত্যি তুলে নিয়ে গিয়েছে সেই কথা। সে সত্যের কাছে পৌঁছে দিতে থাকে অখিল শ্রীবাস্তবকে। ক্রমশ বুঝতে পারে যে উন্নয়নের নিচে চাপা পরে আছে একজন বৈরাগী নয় শত বৈরাগীর হারিয়ে যাওয়া। কিছু মানুষ রক্তমাংসে ঘুরে বেড়ালেও তাদের অস্তিত্ব আসলে হারিয়েই গিয়েছে বহুতলের সিমেন্টের নিচে। যে লোক তাকে পৌঁছে দিয়েছিল বহুতল আবাসনে তাকে আর খুঁজে পায় না।লোকটার নাম জানে না বর্ণনাটুকু দিয়ে খুঁজে বের করতে চায়। কিন্তু সেই বর্ণনা যেন মিলে যায় বৈরাগীর অবয়বের সঙ্গে। তাহলে সে কি বৈরাগী ছিল!
এখান থেকে শুরু হয় বাস্তব আর পরাবাস্তবের সঙ্গে যুদ্ধ। আসলে সব কিছু তো প্রমান করা যায় না। যে বৈরাগীকে পুলিশ নিয়ে গিয়েছে তাকে কি সত্যি নিয়ে গিয়েছিল? প্রমান নেই কোথাও। বস্তির লোক গলা উঁচু করে দেখা সত্য বলতে পারে না। ভয় হয় যদি সত্যি তাদেরকেও নিয়ে যায় এমন ভাবে আর তারাও হারিয়ে যায়। পুলিশ তো স্বীকার করবে না নিয়ে গিয়েছিল। তাহলে একটা মানুষ নাই হয়ে গেলে এর দায় কে নেবে?
অখিল শ্রীবাস্তব চোখের সামনে সত্যটা দেখতে পায় । কিন্তু সেই সত্যর কোন রিপোর্ট পেশ করতে পারে না। পুলিশই পুলিশের হয়ে সাফাই গায়। তাহলে সত্যকে কে রক্ষা করবে! রিকশাওয়ালা, অখিল শ্রীবাস্তবের সঙ্গে ছুটে চলে। সেও সত্যটা জানতে চায়। নাকি জানাতে চায়। তাই বারবার নিয়ে আসে গঙ্গার নির্জন ঘাটে। অখিল শ্রীবাস্তব তার হিসেব মেলাতে চায়। তাই সুধা মাস্টার , জগদীশ বাবুর সঙ্গে কথা বলে। কিন্তু একটা হেয়ালির মধ্যে ঢুকে পরে। দুটো প্রশ্ন , এক “ বৈরাগী মণ্ডলকে পুলিশ কেন নিয়ে যাবে? কোনো অপরাধের জন্য তার পুলিশের খাতায় নাম নেই।” দুই যদি পুলিশ না নিয়েই যাবে তাহলে সেই রাতে বৈরাগী মণ্ডলের বাবা এমন হন্যে হয়ে ছুটেছিল কেন সুধা মাস্টারের বাড়ি।”
গল্পের শেষে আমরা নির্মম এক ফ্যান্টাসির মধ্যে ঢুকে পরি। বৈরাগী নিজে আসে সত্যটা বলতে। সেই রাতে দেশলাই কাঠি দিয়ে তাকে অন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বুটের আঘাতে তার প্রান বায়ু বেরিয়ে গিয়েছিল। তার দেহটা একটা বাক্সে করে ফেলে দিয়েছিল এই গঙ্গায় ।বৈরাগীকে অখিল শ্রীবাস্তব এভাবে আবিষ্কার করবে ভাবে নি। এখানে সত্যি আর কল্পনার মধ্যে পাঠক খুঁজে বেড়ায় নির্মম বাস্তবকে। যা হয়ত ঘটেছে। বা হয়ত ঘটেনি। কিন্তু বৈরাগী মণ্ডল ফির আসেনা। তার বৃদ্ধ বাবা আর পোয়াতি বউ তকে খুঁজতে বেরয়।
বাস্তবের পথ ধরে যে ঘটনার সূত্রপাত হয় সেখানে মনে করিয়ে দেয় ১৯৯৩ সালের ৩১ অক্টোবর ভিখারি পাশোয়ানের নিরুদ্দেশ হওয়ার কথা। সে ছিল ভিক্টোরিয়া চটকলের শ্রমিক। তাকেও পুলিশ নিয়ে যায়। কিন্তু সেও নিরুদ্দেশের খাতায়। এমন অনেকেই আছে যারা নিরুদ্দেশ। তাদের আত্মীয়রা আজও হয়ত গলা ফাটিয়ে বলছে আমাদের মানুষটাকে ফেরত দাও। কিন্তু পুলিশ নিরুত্তর। যা হারিয়ে যায় তা কি আর খুঁজে পাওয়া যায়! মফস্বলের কারখানাগুলো সেই হারানোর খাতায় নাম লিখিয়েছে। সেই কারখানার শ্রমিকদের কি হল? “নিরুদ্দিষ্টের উপাখ্যান” যেন তাদের কথাই বলছে । উন্নয়নের আকাশ চুম্বি দেখতে হয়। নিচের দিকে তাকাতে নেই। লেখক এক করুন বাস্তবের মেঘ দিয়ে ঢেকে ফেলেছেন উপাখ্যানটি।
এরপর আরও চারটি গল্প ‘গাছ ও মানুষ’, ‘ঊনচল্লিশের পরের জন’, ‘প্রাণবায়ু’ , ‘রূপকথার প্রবেশ’ পড়তে গিয়ে আটকে পরতে হয় লেখকের গল্প বিস্তারের বিভিন্ন স্তরে। ‘গাছ ও মানুষ’ এবং ‘ঊনচল্লিশের পরের জন’ পড়ে মনে হয়েছে সুস্থ ভাবে মানুষের বেঁচে থাকা এই শব্দগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ‘প্রাণবায়ু’ সেই বাঁচাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। এত সহজ নয় মেরে ফেলা। জীবন আসে ঢেউয়ের মতো। ‘রূপকথার প্রবেশ’ গল্প যেন শুধু গল্প নয়, সব হারানর পর ফিরে পাওয়া। হারানো দেশের মানুষকে খুঁজে পাওয়া, ভার্চুয়াল জগতে অচেনা বন্ধুর ভাষাকে অনুভবে ছুঁয়ে ফেলা। লেখক অমর মিত্র বাস্তবের নির্মম জমিতেও রূপকথার বীজ বুনেছেন সুকৌশলে।
“নিরুদ্দিষ্টের উপাখ্যান ও অন্যান্য কাহিনি” বাস্তব সময়ের একটি জীবন্ত দলিল।
নিরুদ্দিষ্টের উপাখ্যান ও অন্যান্য কাহিনি
লেখক অমর মিত্র
গুরুচন্ডাঌ
মূল্য – ১৩০

জন্ম – ১৯৮৩ ,১৬ই মার্চ , আসানসোল । দর্শনশাস্ত্রে স্নাতক ।ইতিহাসে স্নাতকোত্তর । প্রথম প্রকাশিত গল্প প্রতিদিন সংবাদপত্রের রবিবারের ছুটির পাতায় ( ২০১৫)।
গল্প প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন জনপ্রিয় পত্রপত্রিয়ায় যেমন – আনান্দবাজার, বর্তমান ,এবেলা ,প্রতিদিন , এই সময় , আজকাল , যুগ শঙ্খ
এখনও পর্যন্ত প্রকাশিত গল্পের বই – ইচ্ছেমৃত্যু, রুপকথা নয় ,যে গল্পের শেষ নেই (কমলিনী, পরিবেশক – দে’জপাবলিশিং), অনির্বাণ ও মুখবই (অশোকগাথা)।
“ইচ্ছেমৃত্যু” বইটি আত্মজ সাহিত্য সম্মাননা এবং ডলি মিদ্যা স্মৃতি পুরস্কার পায় ২০১৭ সালে ।এই সঙ্কলনের “ব্রেকিং নিউজ” নামে গল্পটি নাটক রুপে একাধিকবার মঞ্চস্থ হয়েছে ।
ছোটদের জন্য প্রথম প্রকাশিত গল্প সন্দেশ পত্রিকায় (২০১৮) ।আনন্দমেলা , কিশোর ভারতী, শুকতারাতেও ছোটদের জন্য গল্প লিখেছেন ।