”ভ্যাটিকানে গিয়ে আমি দেখেছি সোনায় মোড়া ছাদগুলো। এদিকে পোপ বলছেন দরিদ্রদের ব্যাপারে তাঁরা সত্যিই খুব উদ্বিগ্ন। তাহলে ওই ছাদগুলো বেচে দিচ্ছেন না কেন? দিন না ! অন্তত কিছু তো একটা হবে !”
-দিয়েগো মারাদোনা
এক পা দিয়ে পৃথিবীকে বিভক্ত করার ক্ষমতা যার , সেতো পাগলাটে হবেই । হাজার রকম রটনা, অপবাদ সব মিলিয়েই তো সে ম্যারাডোনা, প্রকৃতির খেয়ালী রাজপুত্র। এক পলকে বদলতে দিতে পারতেন পৃথিবীর মুখ।
আজকের যুগের সেরা খেলোয়াড় মেসি অথবা রোনালদোকে যদি মালাগায় (স্প্যানিশ লিগের একটা দল) খেলতে দিয়ে বলা হয়, দলকে লিগ চ্যাম্পিয়ন করাতে হবে, তাহলে কি সেটা তাদের জন্য সম্ভব হবে? রিয়াল মাদ্রিদ কিংবা বার্সেলোনাকে টপকিয়ে কাজটা করা মোটামুটি অসম্ভবই বলা যায়। পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে মোটামুটি এ ধরনের অসম্ভব কাজকেই সম্ভব করেছিলেন ম্যারাডোনা।
নাপোলিতে ৭ মৌসুম খেলে মাত্র ৫টি ট্রফি জয়কে আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ অর্জন মনে হতে পারে। কিন্তু আপনি জেনে বিস্মিত হবেন যে, ম্যারাডোনা থাকাকালীন যে দু’বার নাপোলি লিগ শিরোপা জিতেছে, সেটাই তাদের একমাত্র অর্জন হয়ে রয়েছে। নাপোলি তাদের ইতিহাসে সর্বমোট ১০টি মেজর শিরোপা জিতেছে ,যার ৫টিই ম্যারাডোনার আমলে। আর নাপোলির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাও ম্যারাডোনাই!
নাপোলির ইতিহাসে ম্যারাডোনার অবদান কী, সেটা বোঝার জন্য একটি তথ্যই যথেষ্ট। ম্যারাডোনার প্রতি সম্মান দেখিয়ে নাপোলি তাদের ১০ নম্বর জার্সিটিকে অবসরে পাঠিয়ে দিয়েছে, এই জার্সি পরেই সেখানে খেলতেন ইতিহাসের এই জাদুময় ফুটবলার।
ম্যারাডোনা মানে১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড রক্ষণভাগকে বিধ্বস্ত করা, অথবা ১৯৯০ সালে কিভাবে নেপোলি ফুটবল ক্লাবের সমর্থকরা নিজ দেশকে সমর্থন না করে ম্যারাডোনার পক্ষে জয়ধ্বনি দেয়া, কিংবা ১৯৯৪ সালে এই ফুটবল ঈশ্বর নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জেতার পর কি রকম প্রাণবন্ত উদযাপন !
ম্যারাডোনার সময়ে তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আরেক গ্রেট মিশেল প্লাতিনি। তিনি ম্যারাডোনা সম্পর্কে বলেছিলেন,
“আমি বল নিয়ে যা করতে পারি, দিয়েগো সেটা কমলা দিয়েই করতে পারবে!”
ম্যারাডোনার জাদুকরি কিছু রণকৌশলের মধ্যে অন্যতম হল ডান উইঙ্গে পূর্ণ গতিতে ড্রিবলিং, প্রতিপক্ষের গোল লাইনে পৌছানো এবং সতীর্থদের সঠিক পাস প্রদান। তার আরেকটি জাদুকরি নৈপূন্য ছিল পায়ের পিছনের অংশ ব্যবহার করে এক ধরণের রিভার্স-ক্রস পাস শট। এছাড়া ম্যারাডোনা ছিলেন একজন বিপজ্জনক ফ্রি কিক গ্রহনকারী।
ছোট্ট ম্যারাডোনার ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল ফুটবল খেলে তার মায়ের জন্য একটি বাড়ি কিনবেন। পাশাপাশি আর্জেন্টাইন জাতীয় দলের হয়ে খেলে বিশ্বকাপ জেতারও স্বপ্ন ছিল ম্যারাডোনার। এই অভিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই ফুটবলে ডিয়োগো ম্যারাডোনার পথ চলা শুরু। এক সময় ছোট্ট ম্যারাডোনার সব স্বপ্ন পূরণ হলে।মাকে ঘিরে যে ছেলের বেড়ে উঠা তাকে কেউ রুখতে পারে নি।
পৃথিবীতে এমন একটি ধর্ম আছে, যে ধর্মের ঈশ্বর ম্যারাডোনা? এই ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ২ লাখ! ধর্মের নাম হলো- Iglesia Maradoniana এই ধর্মের দশটি মূলনীতি আছে। সেগুলো তাদের অবশ্যই মেনে চলতে হবে। সেগুলো হলো-
১। ম্যারাডোনার বলে কখনও ময়লা লাগে নি। এটি ঐশ্বরিক।
২। ফুটবলকে সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসতে হবে।
৩। দিয়াগো ম্যারাডোনা এবং ফুটবলের সৌন্দর্যের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা (হোয়াট ইজ লাভ) থাকতে হবে।
৪। আর্জেন্টিনার জার্সিকে রক্ষার জন্যে সচেষ্ট থাকতে হবে।
৫। দিয়াগো ম্যারাডোনার অলৌকিক দক্ষতার কথা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে হবে।
৬। তার জার্সি এবং খেলার মাঠকে সম্মান করতে হবে উপাসনালয়ের মতো।
৭। দিয়াগো ম্যারাডোনাকে কোনো নির্দিষ্ট দলের সদস্য হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
৮। এই ধর্মের মূলনীতি সবখানে ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট থাকতে হবে।
৯। আপনার মিডল নেমে অবশ্যই ‘দিয়াগো’ থাকতে হবে।
১০। আপনার প্রথম পুত্র সন্তানের নাম দিয়াগো রাখতে হবে।
এই ধর্মের একটি প্রার্থনা সঙ্গীতও আছে “আওয়ার দিয়াগো” নামে। সেটির ভাবানুবাদ এখানে দেয়া হলো-
“হে আমাদের দিয়াগো, সকল মাঠের ত্রানকর্তা
আপনার পবিত্র বাঁ পায়ের জাদুতে আমাদের রক্ষা করুন
স্বর্গ এবং পৃথিবীতে আপনার গোলের নিদর্শন চির অম্লান
প্রতিদিন আপনার জাদু দিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রাখুন
ক্ষমা করুন পাপীষ্ঠ ইংলিশ ফুটবল দলকে যেমন করে আমরা ক্ষমা করেছিলাম নেপোলিয়ানের মাফিয়াকে
অফসাইডের ফাঁদ থেকে আপনি নির্বাণ লাভ করুন
হ্যাভেলাঞ্জ আর পেলের অপশক্তি থেকে রক্ষা করুন আমাদের”
ধর্মটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৮ সালের ত্রিশে অক্টোবর ম্যারাডোনার ৩৮তম জন্মদিনে।
‘মা বিশ্বাস করতেন আমি সেরা । সেই বিশ্বাস থেকে আমি সেরা হয়ে উঠেছি ।’
–ডিয়েগো ম্যারাডোনা
মানুষ হয়ে জন্মে পৃথিবীতে আসলে ম্যারাডোনাকে।অস্বীকার অসম্ভব।
শুভ জন্মদিন খেয়ালী রাজপুত্তুর l
