ইরাবতী উৎসব সংখ্যা গল্প: লালাবাই । সায়ন্তনী বসু চৌধুরী
“ছেলেটার বাঁ হাতে পোর্সেলিনের তৈরি ধবধবে সাদা একটা বাটি। বাটির ভেতরে কিলবিল করছে কৃমির জাতীয় কিছু প্রাণী। লম্বাটে, কালচে লাল রঙের। দেখতে অনেকটা কেঁচোর মত। ডান হাত দিয়ে সেই কীটগুলোকে খাবলা করে তুলে একবার শুঁকে আবারও বাটিতে রেখে দিল ছেলেটা। বিচ্ছিরি মাটি মাটি গন্ধ! গা গুলিয়ে উঠেছে তার। ওসব জিনিস কি হাতে ধরে থাকা যায়? দেখলেই কেমন যেন গা ঘিনঘিন করে ওঠে। কিন্তু ছেলেটার তো আর কোনও উপায় নেই। তার এক আদিবাসি বন্ধু আছে। লালচুলওয়ালা কালো একটা মেয়ে। রঞ্জি। সে বলেছে, এই কীটগুলো না পেলে গুহার রাক্ষসের খিদে মিটবে না। আর খিদে না মেটালে রাক্ষসটা নাকি কারও ইচ্ছে পূরণ করে না। বেশ কিছুটা দূর থেকে ছেলেটাকে ডাকছেন তার মা। সামনের দিকে এগোতে বারণ করছেন। জায়গাটা খুব উঁচু। কিন্তু বাচ্চা ছেলেটার তো সে কথা জানা নেই। তার বন্ধু রঞ্জি স…ব জানে। সামনে অদূরেই নিকষ অন্ধকারে ঢেকে রয়েছে এবড়ো খেবড়ো পাথুরে দেওয়াল। আর দেওয়ালের মধ্যিখানে সেই দরজাটা, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে ইচ্ছে পূরণের চাবিকাঠি! মায়ের ডাক কানে আসছে বলে বারবার সতর্ক হয়ে পিছন ফিরে দেখছে ছেলেটা। সঙ্গে সঙ্গে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে তার। কতখানি জমি আছে পায়ের নিচে? সত্যি সত্যিই পড়ে যাবে না তো? ওদিকে কে যেন সুর টেনে টেনে জানতে চাইছে,
“খানা লায়া হ্যায়? খা…না…আ? ভুউউখ ভুউউউখ…বহুত ভুউউখা হুঁ ম্যায়…। খা…না খিলা দে। বদলে মে মাঙ্গ লে জো চাহিয়ে…”
অন্ধকারের ভিতর থেকে যার কর্কশ গলা শোনা যাচ্ছে, তাকে কিন্তু কেউ কোনওদিন চোখে দেখিনি। ওটাই বুঝি রাক্ষস। কিন্তু রাক্ষস কি অবিকল মানুষের ভাষায় কথা বলে? এই কথার উত্তর কেউ জানে না। রঞ্জিও না। কেবল রঞ্জির দাদাজী মনুয়া কিছু কিছু জানতে পারে। রঞ্জিদের পরিবারের ওপর যখন বিপদ নেমে এসেছিল, ওর মা বাবার প্রায় ছাড়াছাড়ি হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন এই জায়গাটা খুঁজে বার করেছিল ওর বুঢ়া দাদা। সপ্তাহে একদিন করে গভীর রাতে পাথরের সিঁড়ি বেয়ে অনেক উপরে উঠে রাক্ষসকে খাইয়ে যেত মনুয়া। একদিন কী হল, মনুয়ার হাতের বাটি কাত হয়ে বেশ কিছু কীট পড়ে গেল নিচে। অন্ধকারে টের পেল না বুড়ো। তবে সে টের না পেলে কী? রাক্ষসের তো হিসেব ছিল। খোরাক কম পড়তে সে চেঁচিয়ে গর্জন করে দরজা ভেঙে বেরিয়ে এল। বিকট হাঁয়ের ভেতর থরে থরে সাজানো কালো ধারালো দাঁত! মানুষের মত বত্রিশটা নয়, অসংখ্য দাঁত! মনুয়াকে দেখে তার জিভ থেকে লালা গড়াতে লাগল। এমন শাঁসাল শিকার থাকতে এতদিন ধরে শুধু কীট খেয়ে বোকা বনেছে সে? মনুয়াকে এক মুহূর্তও অবকাশ না দিয়ে রাক্ষসটা তীব্র কামড় বসিয়ে দিল তার ডান হাতে।
এই পর্যন্ত বলেই ঠাম্মা জিজ্ঞেস করত,
“শুনছিস তো দাদু?”
আমি সুর করে বলতাম,
“হ্যাঁআআআ!”
দু সেকেন্ড চুপ করে থেকে ঠাম্মা আবার বলতে শুরু করত। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে তখন কাঠ। যতটা সম্ভব শক্ত করে ঠাম্মাকে আঁকড়ে থাকতাম আমি। কিন্তু কেন জানি না আমি ভয় পাব জেনেও গল্পের বীভৎসতা বিন্দুমাত্র কম করত না ঠাম্মা। যেন বড় হতে গেলে ভয় পাওয়া ভীষণ জরুরি একটা ব্যাপার। আর আমিও ওই গল্প শুনতে শুনতে মনের মধ্যে একটা বীভৎস রাক্ষসের ছবি এঁকে ফেলতাম। গভীর রাতে স্বপ্নের মধ্যে সেই বিকটদর্শন রাক্ষসটাকে হাঁ করে আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে প্রায় দিনই বিছানা ভিজিয়ে ফেলতাম আমি। সকালে উঠে মা চীৎকার করে পাড়া মাথায় করত।
“এত বড় ছেলে এখনও বিছানায় পেচ্ছাপ করিস আর স্কুলের ব্যাগ থেকে প্রেমপত্র পাওয়া যায়? লজ্জা করে না তোর?”
যা কিছু সত্যিঃ
আজও ভোর ভোর ঘুমটা ভেঙে গেল! না, সকালের সূচনালগ্নে সাংঘাতিক কোনও দুঃস্বপ্ন দেখে নয়। একটা চাপা উত্তেজনায়। দুঃস্বপ্ন যে দেখি না, তেমন দাবি আমি করছি না। তবে আজকাল আমার ঘুম কেড়ে নেওয়ার পিছনে সাদা অথবা কালো কোনও স্বপ্নেরই হাত নেই। আসলে দুশ্চিন্তা মেশানো একটা ভয় ইদানিং আমায় পেয়ে বসেছে। কীসের ভয় জানেন? মৃত্যুর! মারা যাওয়ার ভয়! কথাটা বরং ভেঙেই বলি আপনাদের।আমার এই ভয়টা কিন্তু নিছকই মরে যাওয়ার ভয় নয়। মরব তো একদিন আমরা সবাই। হয় কদিন আগে, নয়ত কটাদিন পরে। তাতে অস্বাভাবিকত্ব কিছুই নেই। অনিবার্য মরণে আমার কোনও ভয়ও নেই! তবে আমার মৃত্যুটা ঠিক কেমন হবে, সেটা নিয়ে চিন্তা আছে বৈকি! বিস্তর চিন্তা আছে।
আমি অনির্বাণ মুখার্জী। মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ। তবে ছা–পোষা নই। নীরিহ কিংবা শান্তিপ্রিয় বলতে পারেন আমাকে। তাতে আমি কিছুই মনে করব না। ইয়ার দোস্তরা আমার নাম থেকে নিপুণ হাতে “অ–টাকে” কেটে দিয়েছে বহুকাল আগেই। অনির্বাণ বলে কেউ আমায় ডাকলে এখন নিজের কানেই কেমন যেন ফরেইন এলিমেন্টের মত ঠেকে। পেশায় আমি মাস্টার থুক্কি শিক্ষক। উত্তর কলকাতার একটা নামকরা মেয়েদের ইস্কুলে ইলেভেন টুয়েলভে ইংরিজি পড়াই। এই দেখুন, ভুরু কোঁচকালেন কেন? কী বলছেন? এমনি? আরে না না মশাই, কথা ঘোরাবেন না। সে চেষ্টা বৃথা। নজরে আমার বড্ড তেজ! বুঝলেন কী না!
মেয়েদের ইস্কুলে ইংরিজি পড়ালে চরিত্রে একটু আধটু দোষ হয়। এইটাই ভাবছিলেন তো? আরে বাবা, এ আর এমন কী কথা! এ কথা আমি আগেও বহুবার শুনেছি। আমার স্ত্রীই তো বলত।
যাক গে, যা বলছিলাম। বেশ কিছুদিন হল, ভয়টা আমার পিছু নিয়েছে বুঝলেন। সারাটাদিন দিব্য কাটে। কেবল রাত্রিবেলা কাজকর্ম সেরে যেই না শুতে আসি, অমনি সে আমার মাথার মধ্যে জেগে ওঠে। শোওয়ার ঘরের শীতল অন্ধকারে একলা একলা মরে পড়ে থাকার ভয় গোটা রাত একটা ফুটবলের মত আমায় লাথিয়ে বেড়ায় আমি ছুটি। এ কোণা থেকে ওই কোণায়। আমি কিন্তু ঘুমের মধ্যে মৃত্যুর স্বপ্ন দেখি না। কিংবা আকণ্ঠ পান করেও মৃত্যু নিয়ে গবেষণায় বসি না। গোটা রাত রীতিমত জেগে জেগে ভাবি নিজের মৃত্যুর কথা। অর্ধেক জাগরণে অর্ধেক শয়নে অনুভব করি মৃত্যুর সময় আমার একাকীত্বের কথা। আর সেই মারণ চিন্তাই কালো কচ্ছপ সেজে হামাগুড়ি দিতে দিতে অন্তিম পিপাসার মত আমার গলায়, বুকে, মাথায়, মনে ক্রমাগত চেপে বসে। কী বুঝছেন? বেশ থ্রিলিং না ব্যাপারটা?
আমার গল্পটা তবে গোড়া থেকেই বলি। শুনুন।
আমার স্ত্রী মধুরিমা এবাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে। ডিভোর্সটা এখনও ঝুলছে, তবে মন থেকে আমরা কিন্তু একেবারেই সেপারেটেড। টান দরদ মায়া মোহ কিচ্ছু নেই। ওর দাবি দাওয়া একবার মিটে গেলে ডিভোর্সী হিসেবে আমাদের দুজনের মাথাতেই স্ট্যাম্প লেগে যাবে। মধুর যাওয়ার পর গত সাড়ে পাঁচ বছরে যে কটা বদ অভ্যেস আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে, তাদের কল্যাণেই এখন গলা–বুক জ্বালা, মাথা ব্যথা আর গ্যাস্ট্রাইটিসের একজন বাধ্য পেশেন্ট আমি। আমার বাঁ পাশের জায়গাটা মধুরিমা খালি করে দিতেই দলে দলে ওরা এসে আমার শরীরে নিশ্চিন্তে বাসা বেঁধে ফেলল। বলা বাহুল্য, ওদের আমি তাড়ানোর চেষ্টা করিনি। বরং মাত্রাতিরিক্ত দুধ–চা, ঘন কফি, চিকেন রোল, ভাজা মোমো, আর হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি আরও নানারকম দ্রুততম খাবার গিলে গিলে পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দিয়ে গিয়েছি। ওই যে কথায় আছে না, নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল!
মধুরিমা আমার সমবয়সীই ছিল। ছ’সাত বছর চুটিয়ে প্রেম করার পর আমরা বিয়ে করেছিলাম। প্রথম দিকে বেশ ভালই তালমেল ছিল। আমাদের প্রেমপর্বে অসাবধানতার বশেও কখনও শরীর আসেনি। হাত ধরা, চুমু খাওয়া ওইই ছিল অনেক। অচেনা শরীর, অচেনা গল্প রোজ নতুন করে আবিষ্কার করতে মন্দ লাগত না। কিন্তু গদগদ আহ্লাদি ভাব মানে ওই সুগার কোটিংটা কেটে যেতেই রাশভারি আর শিক্ষিত ওই মেয়েটার ব্যক্তিত্বের সামনে আমি সারাক্ষণ কুঁকড়ে কেমন যেন ইঁদুর ছানা হয়ে থাকতে লাগলাম। সে কিছু বললে চুপচাপ মেনে নিতাম। মুখ ঝামটা খেলে ভুল করেও রাটি কাড়তাম না। রাতের অন্ধকারে রোল প্লের সময় যে মেয়ে পাকা আমের মত মিষ্টি আর রসাল হয়ে থাকত, দিনের আলোয় তার লেডি হিটলার রূপটা আমার ঠিক পছন্দ হত না। বারবার আঁতে ঘা লাগত; কিন্তু মধুর চোখে চোখ রেখে কিছু বলার সাহস পেতাম না আমি। তবে এখন আর আমার কোনও বন্ধন নেই। এখন আমি যাকে বলে এক্কেবারে দড়ি ছেঁড়া বলদ। চোখ রাঙানোর পাত্রী কজন রয়েছে, তবে তারা প্রত্যেকেই আমার হাঁটুর বয়সী। ধোঁওয়া আর রঙিন জল দুটোই আমি আগের চেয়ে আয়েশ করে খাই এবং স্বীকার করতে কোনও বাধা নেই যে যথেষ্ট বেশি পরিমাণেই খাই।
মাস তিনেক হল দিতি বলে একটা বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক হয়েছে। ভার্চুয়াল সম্পর্ক। ফোনেই বাঁধন ফোনেই যত আদর আদর আদর খেলা। দেখা হয়ত হবে, তবে তার আগে মেয়েটা একটু সময় চায়। রাতে ঘুমোনোর আগে দিতির সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতে আমার পেট আর বুকের মাঝ বরাবর সরলরেখা ধরে তীব্র একটা ব্যথা ওঠে। চোখের সামনে চাক চাক অন্ধকার দেখি। দমটা যেন আচমকাই বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে কচি প্রেমিকাটির গলা চিন্তায় ভারি ভারি শোনায়। মাত্র ক’ মাসের আলাপ হলে কী হবে, মেয়েটা সত্যি সত্যিই কান্নাকাটি করে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বারবার জিজ্ঞেস করে,
“তুমি ঠিক আছো তো নির্বাণ? সত্যি করে বল।”
“আরে দিতি, মাই স্যুইট কিটি! চিন্তা নেই বেবি। তোমার বুড়ো প্রেমিকটি এত সহজে মরবে না। এখনও যে তোমার সবুজ উপত্যকায়, পাহাড়ে, বন্দরে আমার ঘুরে বেড়ানো বাকি। তোমার নদীতে নৌকা ভাসানো বাকি! নোঙর পোঁতা বাকি! তোমায় জড়িয়ে বসে রাতের আকাশে মেঘের ঢেউ গোনা বাকি! ভুলে গেলে?”
দিতি ভাবুক হয়ে পড়ে, কিন্তু ওর চেয়ে একটু পুরোনো যারা রয়েছে, এরকম পরিস্থিতিতে তারা মা বোন তুলে কাঁচা খিস্তি মেরে ফোন কেটে দেয়। হাসতে হাসতে একখানা মাথার বালিশকে পুলটিসের মত বুকের নিচে চেপে উপুড় হয়ে শুই। মনে হয় আমি একখানা বুড়ো কচ্ছপ! বহুকাল হল খোলস থেকে মাথাটা বার করতে ভুলে গিয়েছি। ব্যথার প্রাবল্যে চোখের কোণ থেকে দু’ তিন ফোঁটা জল গড়িয়ে ময়লা হয়ে আসা বালিশের কভারে পড়ে। মনে মনেই প্রেমিকাদের বুকের খাঁজে ঢালা পারফিউমের সুবাস, আর নরম নরম মাংসপিণ্ডের ছোঁয়া অনুভব করার চেষ্টা করি। তারপর কোনও এক সময় পা টিপে টিপে ঘুম এসে আমার যাবতীয় ক্লান্তি আর কষ্ট মুছে দিয়ে যায়। আমি টের পাই না। এই আমার অভ্যেস। পাঁচ পাঁচটা বছরের অভ্যেস। কিন্তু ইদানিং এই অভ্যেসে বাধ সেধেছে একটা বিকট কালো ছায়া। মৃত্যু!
দেবব্রত মারা যাওয়ার দিন থেকেই সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে আমার। প্রতিদিনই রাত করে বাড়ি ফিরছি। খাওয়াদাওয়া সেরে নিয়ম মাফিক পেগ তৈরি করছি। কারও না কারও ফোনও চলে আসছে। কথা জমে ওঠার মুহূর্তে ছ্যাঁচড়া গ্যাসের ব্যথাটাও বেগ দিতে ভুলছে না। অভ্যেসবশত বালিশ জড়িয়ে উপুড় হয়ে শুচ্ছি, অথচ ঘুম আর আসছে না। গোটা রাত দু’চোখের পাতা কিছুতেই এক করতে পারছি না আমি। শান্তির ঘুমের বদলে মাথার পাশের খোলা জানলা গলে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ার মত ধেয়ে আসছে চিন্তা আর ভয়! একা একা মরে যাওয়ার ভয়। মরার আগে কাউকে একবারও ডাকতে না পারার ভয়। এক ঢোক জল না পাওয়ার ভয়। বদ্ধ ঘরে মরে পচে দুর্গন্ধের মত একটা অশুভ উপস্থিতি হয়ে সারা পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ার গা ঘিনঘিনে ভয়। একদিন সকালবেলা হঠাৎ করেই খবরের কাগজের পঞ্চম কী ষষ্ঠ পাতার কোণে ছবি হয়ে জায়গা পাওয়ার ভয়।
***
“কী হে, আছ কেমন?”
“আমি বিন্দাস! তোমার খবর কী বস? আজকাল তো অনলাইনে দেখাই যায় না! এ পাড়ায় এলে বউ বকে নাকি প্রেমিকা?”
“আরে না না। ওসব কিচ্ছু নয়। দিনগুলো কোনওমতে চলে যাচ্ছে গো নির্বাণ দা। আজকাল অনলাইনে আসাই হয় না! কাজের চাপে জীবনটাই শালা অফলাইন হয়ে গেল! এ হল আমাদের মত মধ্যবিত্তের স্ট্রাগল ফর এক্সিসটেন্স গুরুদেব! তুমি বুঝবে না।”
“যাহ কেলো! বুঝব না কেনও রে ভাই? আমায় কি স্ট্রাগল করতে হয় না নাকি আমার এক্সিসটেন্সই নেই?”
“হা হা হা হা!”
একগাদা হলুদ রঙের হাসিমুখ পাঠিয়ে দিয়ে সেদিন হঠাৎই অফলাইন হয়ে গেল দেবব্রত। যদিও পাগলাটার ইঙ্গিত আমি দিব্যি বুঝেছিলাম। বৌ বাচ্চাহীন একখানা ফুরফুরে জীবন আমার। ফুলের পাপড়ির মত হালকা এবং বয়স অপেক্ষা যথেষ্টই রঙিন। সংসারের জোয়াল কাঁধে নিয়ে কোনমতে ধুঁকতে ধুঁকতে হেঁটে চলা অল্প বয়সি ছেলেদের আমার মত ঝাড়া হাত পা লোকের ওপর একটু আধটু হিংসে হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। ওসব আমি গায়ে মাখি না। মধুর সঙ্গে বিয়েটা যখন টিকে ছিল তখন এমন পিছুটানহীন পুরুষ দেখলে আমারও কি ঈর্ষা হত না? খুব হত। বাজার ঘেঁটে ঘেঁটে চারাপোনা, কাটাপোনা, বিউলির ডালের বড়ি, মুরগীর লেগ পিস, নতুন আলু, পাঁঠার টেংরি, কুকমী কোম্পানির গুঁড়ো মশলা, হরিতকী, আমলকী, স্যানিটারি ন্যাপকিন, ঝুলন্ত সিংহাসনে বসে থাকা বাবা লোকনাথের জন্য মিছরি ইত্যাদি জোগাড় করে আনতে না আনতেই আমার চোখের সামনে থেকে রবিবারগুলো ভুস ভুস করে লাফিয়ে উঠে বাষ্প হয়ে শূন্যে মিলিয়ে যেত। ঘেমে নেয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতেই আবার মুখ ঝামটা খাও!
“তোমার কি আঠেরো মাসে বছর নাকি গো? জন্ম কুঁড়ে একখানা! বেছে বেছে এই অপদার্থটাকেই আমার ঘাড়ে চাপালে ভগবান!”
শেষের দিকে মধুরিমার সঙ্গে তর্ক করতে আর ভাল লাগত না। বাজারের ব্যাগটা আলগোছে রান্নাঘরের মেঝেতে ছুঁড়ে দিতে দিতে চাপা স্বরে বিড়বিড় করে বলতাম, শাল্লা…জ্বালাতনে বটিকা একখানা “ডিস্টার্বিং এলিমেন্ট”। মুখের ওপর মধুকে কোনওদিন স্লাট কিংবা হোর বলিনি ঠিকই, কিন্তু মনে মনে নিজের বউকে বেশ্যাপল্লীর মেয়েদের সঙ্গে তুলনা করতেও আমার খারাপ লাগত না। ছেলেবেলা থেকেই মেয়েদের ঘেন্না করি বলে নিজেকে অপরাধী বলেও মনে হয়নি কখনও। কৈশোরের মাঝামাঝি যখন আমি জানতে পারি মায়ের একটা অবৈধ সম্পর্ক আছে, নিজেকে কেমন যেন অবাঞ্ছিত বলে মনে হয়েছিল। হঠাৎ করেই বিমল কাকুর সঙ্গে নিজের অদ্ভুত কিছু মিল খুঁজে পেয়ে ভয়ে আর লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়েছিলাম। একদিন রাতে আমিই বাবাকে বলে দিয়েছিলাম,
“তুমি যখন বাড়ি থাক না বিমল কাকু আসে।”
তারপর থেকেই মাকে কষ্ট পেতে দেখে অসীম আনন্দ হত আমার। আকণ্ঠ মদ গিলে এসে বাবা যখন কিল চড় লাথিতে ভরিয়ে মাকে অন্ধকার আর ঠাণ্ডা বিছানাটার দিকে টেনে নিয়ে যেত, আমার যে কী শান্তি হত, সে আমি লিখে বোঝাতে পারব না। মনে হত ফুসফুসের ভেতরে জমাট বাঁধা বরফের পাথরটা একটু একটু করে গলে যাচ্ছে। মা স্নানঘরে ঢুকলে টিনের দরজার চিড় খাওয়া অংশে চোখ রাখতাম আমি। কে যেন আড়াল থেকে আমার মাথায় লিখে দিত মহিলা মানেই বিষকন্যা। ভালবাসবে, আদর করবে আর তারপর তীব্র দংশনে একদিন সব শেষ করে দেবে।
প্রবল রাগের মাথায় মধুরিমার দিকে তাকিয়ে মাঝে মধ্যেই আমি ভেবে নিতাম তাকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে লোহার পেরেক পোঁতা একটা চেয়ারে বসিয়ে দু’হাত আর দু’পা টানটান করে লোহার শিকলে বেঁধে রেখেছে একটা অতিমানব, যার কাছে শুধু মধুর নীতিবাক্যই নয় সে নিজেও ক্ষুদ্র এবং তুচ্ছ। মধুর গলা থেকে ঝুলছে কাঁটা ওয়ালা পেট কলার। তার নরম গায়ে প্যাঁট প্যাঁট করে পেরেক ফুটছে আর সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসছে তাজা গরম রক্ত। একচোখা রাক্ষসের মত বিকটাকার কিছু প্রাণী পালা করে পাতাল থেকে উঠে আসছে। চেয়ারটার সামনে দাঁড়িয়ে মধুরিমাকে একটা করে চড় কষিয়ে যাচ্ছে তারা। না, শুধু হাত দিয়ে নয়! আট দশ ফুটেরও বেশি লম্বা অতিমানবদের বিরাট পুরুষাঙ্গের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হচ্ছে আমার স্ত্রী। তার গাল, গলা রক্তে লাল। গলা ফাটিয়ে কাঁদছে সে। চিৎকার করে আমাকে ডাকছে।
“এ কী অনির্বাণ, তুমি হাসছ? আমাকে এইভাবে শাস্তি পেতে দেখে তোমার হাসি পাচ্ছে? এত নিষ্ঠুর হয়ো না। আমাকে বাঁচাও প্লিজ! হেল্প মি অনির্বাণ! হেল্প মি।”
আমি তো তখন ক্লাউড নাইনে। দর্শকের আসনে বসে লাগাতার মজা লুটছি। আমাকে নির্বোধ বলা, আমাকে অলস বলা, খুব তেজ না তোর? বোঝ এইবার। একেবারে শেষ ধাপে পাথরের দেওয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসত সেই রাক্ষসটা, যাকে আমি ছেলেবেলাতেই মনে মনে এঁকে রেখেছিলাম। সে এলেই আমার অসম্ভব আরাম লাগত। ভাবনাতে আমি আরও আরও চরমে চলে যেতাম। দেখতে চেষ্টা করতাম, মধুরিমার নরম স্তনের বাদামি বৃন্ত দুটোতে জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরে দানবগুলো দুপাশ থেকে তার পা দুটো টেনে ধরেছে আর ফ্যাকাশে লাল ফোলা যোনির ভিতরে আমার পোষা রাক্ষসটা নিজের মোটা হাত প্রবেশ করাচ্ছে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে মধুর যোনিপথ বেয়ে। কাতরাতে কাতরাতে মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। আমার না খুব হাসি পেত। সমস্ত রাগ, সমস্ত অপমানের ওপর ফোঁটা ফোঁটা ঠাণ্ডা বৃষ্টি ঝরে পড়ত। গোপন আঁধার থেকে ঝিঁঝিঁ লাগা হাতটা বার করে এনে শ্রান্তিতে চোখ বুজে ফেলতাম আমি।
ভাগ্যিস! অনেক চেষ্টার পরেও আমাদের মাঝে কোনও তৃতীয় প্রাণ এল না! সংসার নামক ম্যাজিক স্টলের দু’দিকে নড়বড়ে দুটি খুঁটি সেজে স্রেফ লোক দেখানোর জন্য দাঁড়িয়ে না থেকে আমরা দুজনও দুইপাশে সরে গেলাম। ঘরটা আমাদের চোখের সামনেই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। প্রপগুলো অবশ্য আমরা নিজেদের মতই কুড়িয়ে নিয়েছিলাম। ঘর ভেঙেছে বলে কি ম্যাজিক শো বন্ধ হয়ে যাবে নাকি? কোর্টে দাঁড়িয়ে মধুরিমা বেশ গুছিয়েই আমাকে দোষ দিয়েছিল। একটা ফুটফুটে বাচ্চার বড্ড শখ ছিল তার। সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত একটা বাচ্চা জন্মালে নাকি আমাদের মধ্যে টান আরও বাড়বে। ঘর ভরতি লোকের সামনে মধু কেঁদে ফেলে বলেছিল আমিই তার বাচ্চার শখ পূরণ করিনি। অথচ সে যে আমাকে দূরে সরাতে সরাতে কোণঠাসা করে দিয়েছিল, সে কথা সকলের অজানাই রয়ে গেল। সওয়াল জবাবের মাঝে হঠাৎই কান্না থেমে গিয়ে সাপের মত হিসহিসে হয়ে গিয়েছিল মধুরিমার গলা। মুহূর্তেই সেই কণ্ঠ আমাকে অক্ষম বানিয়ে দিল। বলে দিল আমার সঙ্গে সেক্স করে সে সুখী হয়নি। তাও মেনে নিলাম। আমি তো জানতাম, শুধু একটা বাচ্চা নয়, মাসতুতো বোনের বিয়ের হারের মত একটা সীতাহার, মুক্ত সেটিংয়ের একটা চোকার, বছরান্তে দিন সাতেকের জন্য উটিতে রোম্যান্টিক ট্যুওর এবং আরও কিছু অপূর্ণ ইচ্ছে নিয়েই মধুরিমা আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।আমাদের পথদুটো ক্রমে সমান্তরাল হয়ে যাচ্ছে। হেঁকে বলে যাচ্ছে আর কোনওদিন তোমাদের মিলন সম্ভব নয়!
প্রথম প্রথম কোর্ট থেকে ফিরে আমারও মনে হত বারোটা বছর আমার কাছে থেকে সত্যিই তো কোনও সুখ পায়নি মেয়েট! স্বাভাবিক নিয়মেই ওর মনে ক্ষোভ জমেছে। তবে আমার বিশেষ গ্লানি ছিল না। আজও নেই। বিয়ে নামক শিকলটি থেকে আমি যে অবশেষে মুক্তি পেয়েছি, সেই অনেক।
নিচু ক্লাসগুলোতে ইংরিজির সঙ্গে মাঝে মাঝে ভূগোল, ইতিহাস, বাংলা আবার বিজ্ঞানও পড়াতে হয় আমায়।কম বয়সী ছাত্রীদের নিষ্পাপ মুখ দেখে বুঝি, মাস্টারেরা যে আজকাল খুব একটা বিশ্বস্ত হয় না, সে কথা তারা জানে না অথবা শোনেইনি কোনওদিন। তাদের সামনে নিজেকে নির্দ্ধিধায় মেলে ধরা যায়। বর্ষার দিনে জমিয়ে একটা দুটো নিরামিষ ভূতের গল্পও ফেঁদে ফেলা যায়। স্যার স্যার করে বাচ্চাগুলো মাতিয়ে তোলে। শিক্ষকতার পেশায় প্রথম যেদিন এলাম, সেদিনের কথা মনে পড়ে যায়। এসব দিনে আমার ভিতরের দস্যুটা শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকে। ওর কথা জানে কেবল কলেজ পেরোন প্রস্ফুটিত ফুলেরা; পাপড়ি মেলার আগে পর্যন্ত আমার সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্নে যারা বিভোর ছিল, তারা। অন্তরমহলের আবহাওয়া আন্দাজ করে বড় মেয়েগুলোর সামনে ভীতু শামুকের মত আমাকে খোলে ঢুকে পড়তে হয় বৈকি! সাবধানতা অবলম্বন তো দোষের নয়। ঠিক কি না?
রাজ্য সরকারের নির্দেশ মেনে দশটা পাঁচটার কাজ করি। অথচ সপ্তাহের ছটা দিনই আমি দেরি করে বাড়ি ফিরি। কর্পোরেটে চাকুরিরতরা যেমন ফেরে আর কী! আমার অবচেতনে কি কোনওদিন কর্পোরেট সেক্টরে চাকরি করার স্বপ্ন ছিল? জানি না। গুরুত্ব দিয়ে ভাবিইনি কখনও। দেবব্রতই মাঝে মাঝে সেই ভাবনার ছাই উস্কে আগুন বের করে আনত।
“সরকারী স্কুলের মাস্টার না হয়ে ইঞ্জিনিয়র হলেও তো পারতে নির্বাণ দা! এই মাস্টারি ব্যাপারটা শালা তোমার সঙ্গে যায় না।”
হো হো করে হাসতাম। ওই ছেলেটার সঙ্গে আমার যে কোথায় কবে আলাপ হয়েছিল, কিছুতেই মনে করতে পারি না। তবে সাগ্নিক দেশে এলেই দেবব্রতর সঙ্গে দেখা হত আমার। প্রতি বর্ষায় সাগ্নিকের বাড়িতে বুড়ো সন্ন্যাসীকে ঘিরে আমাদের জমাটি আড্ডা বসত। সেইখানে দেবব্রতর আসা ছিল মাস্ট। নিপুণ হাতে কাচের সেন্টার টেবিলের ওপর পেগ সাজাতে সাজাতে গলাটা একটু চড়িয়ে বলত,
“নির্বাণ দা, ইলিশটা একটু কড়া করে হোক আজ।”
ওর গলাটা এখনও আমার কানে বাজে। ফেসবুকে আমি বরাবরই অ্যাক্টিভ। বেশ মনে আছে, দেবব্রত রিকোয়েস্ট পাঠানোর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আমি অ্যাকসেপ্ট করেছিলাম। ছেলেটা যে শুধুই ভাল চাকরি করত তাইই নয়, তার মগজটা ছিল অসীম জ্ঞানের একটা ভাণ্ডার। কমবেশি সমস্ত ব্যাপারেই কী করে যেন আগামাথা সওবটা জেনে যেত দেবব্রত। ক্যান্সারের ওষুধ আবিষ্কার, বাঙালির চাঁদে অভিযান, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ থেকে শুরু করে পিডোফিলিয়া, প্যারাফিলিয়া, নেক্রোফিলিয়া, অবজেক্টোফিলিয়া মায় মন্ত্র তন্ত্র, প্রেতযোনি, পুনর্জন্ম, বৌদ্ধ তন্ত্রের ভয়ংকরি কোনও দেবী যে কোনও একটা প্রসঙ্গ তুলে ধরলেই হত। দেবব্রত সান্যাল বিনা দ্বিধায় ডিবেটে পার্টিসিপেট করত এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটানা প্রাসঙ্গিক বক্তৃতা দিয়ে বাকি সকলের বোলতি বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত। ছেলেটার চৌকো মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম আমি। চোখের পলক ফেলতে গেলেও মনে হত, যদি কিছু মিস করে যাই! আমার সঙ্গে ব্যাটার একটু বেশিই জমত। কারণটা সম্ভবত উভয়ের সাহিত্যপ্রীতি। সারাদিনের নাওয়া খাওয়া ভুলে একটানা উৎপল দত্ত পড়তে পারতাম আমরা, নবারুণ কিংবা বাদল সরকারকে নিয়ে আলোচনা করে একটা গোটা দিন হাসিমুখে কাটিয়ে দিতে পারতাম। আসলে দেবুটাকে আমি বড্ড ভালবাসতাম। মাঝেমধ্যে ভেতরে উঁকি মারলে দেখতে পাই, ওকে আমি এখনও ভালবাসি। সমকাম ছাড়াও পুরুষে পুরুষে কি তুমুল ঝড়ের মত ভালবাসা হয়? যদি হয়, দেবব্রতকে আমি তেমন ভালবাসি। দুঃখের বিষয় মুখ ফুটে কোনওদিন বলতে পারিনি।
দুই
“দেবব্রতটা আচমকাই পাস্ট টেন্স হয়ে গেল রে নির্বাণ।”
সদ্য ঘুম ভেঙেই সাগ্নিকের মেসেজটা পেলাম। মাথাটা বোঁ করে ঘুরে গেল। দেবব্রত? ফোনটা হাত থেকে রাখতে ইচ্ছে করল না আর। ঝট করে দেবুর ফেসবুক প্রোফাইলটায় ঢুকে পড়লাম। কাঁপা কাঁপা হাতে ওর টাইমলাইন স্ক্রল করতে করতে ইনফো সেকশন পেরিয়েই থমকে গেলাম। এ….এ..এই তো! অঙ্গিরা সান্যালের একটা ছোট্ট পোস্ট রয়েছে দেবব্রতর টাইমলাইনে। ভোর সাড়ে চারটের পোস্ট।
“মাই হাজব্যান্ড দেবব্রত সান্যাল ইজ নো মোর! আই রিকোয়েস্ট ইউ টু প্রে ফর হিজ ..”
অঙ্গিরার লেখা শব্দগুলোর নিচে অনেক কমেন্ট পড়েছে। “ভাবতেই পারছি না।” “সে কী!” “দেবু কোথাও যায়নি অঙ্গিরা, সে তোমার কাছেই আছে।” ইত্যাদি প্রভৃতি। আমিও কিছু একটা লেখার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু হাত সরল না। আঙুলগুলো পোলিও রোগীর পায়ের মতো এক অন্যের সঙ্গে জড়াজড়ি করে ফোনের স্পর্শকাতর কিপ্যাডের ওপর হোঁচট খেয়ে থেমে গেল। আবোল তাবোল কটা শব্দ টাইপ করেও মুছে দিলাম।চোখের সামনে দেবুর মুখটা বারবার ভেসে আসছিল। অঙ্গিরার মুখটাও দু’একবার মনে পড়ছিল। মেয়েটার বয়স একেবারেই কম। একত্রিশ বত্রিশ হবে। এখনও ছেলেপুলে হয়নি। যতদূর জানি, ওদের দুজনের মধ্যে গভীর প্রেম ছিল। স্বামীর ফেসবুক প্রোফাইলে পোস্টটা লেখার সময় অঙ্গিরার কি একবারও হাত কাঁপেনি? দেবব্রতর শরীরের গন্ধটা কি একবারের জন্যও মনে পড়ে যায়নি ওর? মেয়েটা নিশ্চয়ই কাঁদতে কাঁদতে লিখেছে কথাগুলো। ঠিক সেই সময় মনে হল, আমি যদি হঠাৎ করে মারা যাই, মধু কি আমার জন্য কোনও পোস্ট লিখবে? কিন্তু আমি মারা গেলে মধুরিমা জানবে কী করে? এসব ভাবতে ভাবতেই সাগ্নিকের মেসেজের রিপ্লাইতে লিখেছিলাম,
“মালটার কীসের এত তাড়া ছিল বল তো?”
যাইহোক, সেই দিন থেকেই মৃত্যুভয় আমার মাথায় চেপে বসেছে। স্কুল যাওয়ার পথে, স্টাফরুমে বসে, ক্লাস সেভেনের মেয়েদের “এইম ইন লাইফ” প্যারাগ্রাফ লেখাতে লেখাতে, শাওয়ারের নীচে নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে বাইরের ও ভেতরের বৃষ্টিতে ভিজে যেতে যেতে, বাসের জানালা দিয়ে নীল রঙের আইশ্যাডো মাখা কোনও উদ্ভিন্নযৌবনার কাতিল নজর দেখতে দেখতে বারবার দেবব্রতর কথা মনে পড়ে যায় আমার। রাতে আমি আর ঘুমোই না। ঘুমোতে এখন আমার ভয় করে।
তার প্রোফাইলে লেখা ছিল, এইটটি ওয়ানের তেইশে জুলাই। একাশি সালে জন্মেছিল ছেলেটা! আমার চেয়ে পাক্কা আট বছরের ছোট ছিল দেবু! এই অল্প সময়েই স্ট্রেস এতটা ঝাঁঝরা করে দিল ওকে? মিনিট পাঁচেকের বুকে ব্যথায় একেবারে মরেই গেল শালা?
***
মাস খানেক আগে দেবুর সঙ্গে আমার শেষবার কথা হয়। অনেক দিন পর সেদিন হঠাৎই ফোন করেছিল দেবু। “আরে! ভুলেই তো গিয়েছিস ভাই! মাসে একবারও গলা শোনা যায় না! কী ব্যাপার বল তো?” জানতে চেয়েও কোনও স্পষ্ট উত্তর পাইনি। ছেলেটাকে কেমন যেন অন্যমনস্ক লাগছিল।
খানিকক্ষণ কথা বলার পর খেয়াল করেছিলাম, সাগ্নিকের বাড়িতে যে হাসিখুশি দিলখোলা ছেলেটা সারাক্ষণ সিনেমা, নাটক, সাহিত্য, সমাজ, বাংলা, ইংরিজি, শব্দের উৎপত্তি, অপিনিহিতি, অভিশ্রুতি ইত্যাদি নিয়ে বকে যায়, সেই ছেলেটাই কেমন যেন চুপ মেরে গিয়েছে। কথায় কথায় জিজ্ঞেস করেছিলাম,
“হ্যাঁ রে দেবু তোর উপন্যাসটা কদ্দূর এগোল?”
নীরবতা ভেঙে বিদ্রূপ করে হেসে উঠেছিল সে।
“নির্বাণ দা, কেনও লোভ দেখাও মাইরি! অনেক কষ্টে সরিয়ে এনেছি নিজেকে। আর মনে করিওনা গো।”
“সরিয়ে নিয়েছিস মানে? এই…দেবু তুই কি লেখা ছেড়ে দিলি নাকি!”
“ইয়েস বস। আমার দ্বারা আর ওসব হবে না। ওসব তোমার মত মানুষের কাজ। আমি চুনোপুঁটি…” একরাশ হতাশা ছিল দেবুর গলায়। প্রথম দিকে সঙ্গে আমার বেশ ভালই যোগাযোগ ছিল ওর। আমার প্রতিটা কবিতা, প্রতিটা গদ্য নিয়ে নিরপেক্ষ মতামত দিত। পছন্দ না হলে সোজা ফোন করে গালাগালির বন্যা বইয়ে দিত।
“শালা বোকা… কী খেয়ে লিখতে বসেছ? শুকনো না তরল?”
বুঝতাম ওর মেজাজটা তিরিক্ষে হয়ে রয়েছে।
“কেন রে? একেবারে খাজা লিখলাম না? রাগ করিস না ভাই।”
ভারি ভারি কটা দু’অক্ষর চার অক্ষর ঝেড়ে নিজে থেকেই আবার শান্ত হয়ে যেত দেবু,
“দেখ গুরু, তোমার থেকে অনেক বেশি আশা করি। নিজের ইমেজটা এইভাবে নষ্ট ক’র না।” এইরকম একটা ছেলে নিজে আর কোনওদিন লিখবে না? কিন্তু কেনও? কেনও?
তিন
একজন স্কুল মাস্টারের জীবন ঠিক কেমন হওয়া উচিত বলুন তো? মাঝারি গড়ন, নোয়াপাতি ভুঁড়ি, পরনে ইঞ্চিপাড়ের সাদা ধূতি আর হাফহাতা শার্ট, হাতে ছাতা, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা, মাথায় তেল চকচকে পাতা চুল আর কাঁধে শান্তিনিকেতনের ঝোলা ব্যাগ? নাহ! লোকগুলো দেখছি ডাহা ভুল করে ফেলেছে। ত্রিশ চল্লিশ বছর আগের ওই চেনা খোলসটা ছেড়ে বেরিয়ে এসেই বোধহয় তারা সমাজের চোখে অন্যরকম হয়ে গেল। নিজেকে দিয়ে তো খুব ভাল করেই বুঝি ব্যাপারটা। পাশ কাটাতে গিয়ে অনেকেই লাজুক হেসে কানে কানে বলে যায়,
“নির্বাণ দা, আপনি না ঠিক টিপিক্যাল টিচার টাইপের নন জানেন তো!” এমন কথা শুনলে আজকাল কানে হাত চাপা দিই। আবার একটা নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার ভয় পাই আমি। আমার লেখা পড়ে দেবু বলত, “বাইরেটা আধুনিক হলে কী হবে, ভেতরে তুমি এখনও সেকেলে নির্বাণ দা।”
হ্যাঁ, আমি লিখি। বিরাট কিছু না হলেও বিগত বছরগুলোতে প্রতিটা কাগজেই কিছু না কিছু লিখেছি। কেউ সেসব মনে রেখেছে কী না জানি না। লেখাটা অনেকটা আমার পাশবালিশের মত। পাশে না থাকলে ঘুমের ঘোরেও কেমন একলা লাগে! তবে রবি ঠাকুরের প্রেম, গান্ধীজীর মতিভ্রম, সেক্সুয়ালিটি এসব নিয়ে খিল্লি উড়িয়ে, আবোল তাবোল কটা লিখে গালগালিও কম কুড়োইনি আমি। আসলে লোককে চটিয়ে দিয়ে মজা দেখতে আমার হেব্বি লাগে। দেবু সে কথা হাড়ে হাড়ে জানত। তাই ফেসবুকের লম্বা চওড়া পোস্ট দেখে কোনওদিন ব্যাটা হামলে পড়েনি। সে মন্তব্য করত জাতের লেখায়। নিজের বুকের রক্ত মিশিয়ে যখন ভাবগুলো আমি ফোটাতে চেষ্টা করতাম, সেই ভাবে, সেইসব ভাবনায় দেবু তার মত দিত। সময় সময় ছেলেটার মেধা দেখে আমি চমকে উঠতাম। কথা বলার সময় দেবুর ছ’ ফুট দুই ইঞ্চির শরীরটা সামনের দিকে বেশ কিছুটা ঝুঁকে আসত। তাকে দেখে মনে হত ফলভারেই দীর্ঘদেহী বৃক্ষটা যেন নুয়ে পড়েছে। খুব ইচ্ছে ছিল ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে একটা প্রকাশনা সংস্থা খুলব। বাংলা, হিন্দি, ইংরিজির অন্য ধাঁচের লেখাগুলো পাঠকের দরবারে পেশ করব। কিন্তু ছ’ সাত মাস আগে থেকে দেবব্রত নামের আলোটা ক্রমাগত আবছা হয়ে আসছিল। মগজ নিংড়ে মারাত্মক সিরিয়াস লেখা লিখেও আমি তার কোনও মন্তব্য পাচ্ছিলাম না। কী যে অশান্তি তখন আমার মনে! যে ছেলে সপ্তাহে তিন চারদিন টেলিফোনে তুমুল আড্ডা দিত, মাসে একবারও তার গলা কানে আসে না। মেসেজ করে কোনও উত্তর পাই না। দেবুর প্রোফাইলটায় ঘুরঘুর করি। অথচ সেটা একটা তালাবন্ধ একতলা বাড়ির মত পড়ে থাকে। আর টুকরো টাকরা ব্যস্ততা, খুচরো পাপ, নতুন প্রেম এসবের মাঝেই আমার জীবনে নেমে আসে পুরু হতাশা।
***
আজকাল ঘুমোনোর আগে দেবুর চোখদুটো খুব মনে পড়ে। কী উজ্জ্বল, কী গভীর ওই চোখজোড়া! সরাসরি তাকালে মনে হত সমস্ত মেধা বুঝি তার দু’ চোখের মণিতেই লুকিয়ে রেখেছে কেউ। আমি স্যাপিওসেক্সুয়াল। দেবুর ওই সমুদ্রের মত অনন্ত মেধা আমাকে পাগল করে তুলত। আজকাল ব্যথার সময় বুকে বালিশ চেপে ভাবি ছেলেটার ভেতরেই কি আমার জীবনের সব টান লুকোন ছিল? সেটাই কি কাল হল আমার? দেবব্রত চেইন স্মোকার ছিল। আমি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি শুনে একবার অবাক হয়ে বলেছিল,
“বাপরে! ছেড়ে দিলে? জিন্দা আছ কী করে গুরু?” অথচ সেই ছেলেটাই লেখালিখি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে দিব্যি বেঁচে ছিল! চোখের সামনে না দেখলেও আমি আন্দাজ করতাম ও শেষ হচ্ছে। একটু একটু করে ছাই হচ্ছে দেবব্রত।
বহুদিন আগে শুনেছিলাম, মেধাবী মানুষদের মধ্যে নাকি কিছু কমন ফ্যাক্টর থাকে। আমি নিজেকে মেধাবী বলে দাবী করি না; তবে দেবুর আর আমার মাঝে দু’দুটো কমন ফ্যাক্টর ছিল। ব্যথা আর লেখা। যদিও সে ব্যাটা মরার আগে বেইমানি করে লেখা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল, তবুও প্রতি রাতে গ্যাস্ট্রাইটিসের ব্যথার সময় দেবুর কথা আমার মনে পড়ে, আর মনে পড়ে আমার অসমাপ্ত লেখাগুলোর কথা। ঠাণ্ডা, অন্ধকার শোওয়ার ঘরে সাত বাই ছয়ের বিছানায় একলা শুয়ে থাকতে থাকতে বাঁ পাশের খালি জায়গাটায় আমি মধুরিমাকে দেখতে পাই। মনে হয়, একটা কালো গাউনের মত পোশাক পরে পাশ ফিরে শুয়ে রয়েছে মধু। তার সুগঠিত উরু আর নিতম্বে আলো আর আঁধার একসঙ্গে হাত ধরাধরি করে খেলছে। মাইরি বলছি, নাইটল্যাম্পের লালচে আলোয় মধুকে একটা ডাইনির থেকে কম ভয়ংকর লাগে না। মেয়েটাকে আমি বদলে যেতে দেখি। তার জ্বলন্ত দুটো চোখ, শিরা ঠেলে ওঠা কুৎসিত হাত, উঁচু উঁচু গজ দাঁত আরও উঁচু আর ধারালো হয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসে। বিছানা ছেড়ে উঠে বসব বলে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করি। কিন্তু…একটা সময় অনিবার্য ব্যর্থতার মত আমাকে মোক্ষম ধাক্কাটা মেরে শুইয়ে ফেলে আমার তলপেটের ওপর উলঙ্গিনী রণচণ্ডীর মত চেপে বসে মধুরিমা। আমি বিস্ফারিত চোখে দেখি তার মাথার চুলগুলো কালো কালো সাপের মত শূন্যে উড়ছে। সাপগুলো তাদের চেরা জিভ বার করে একে অন্যের মুখ চেটে দিচ্ছে। থকথকে লালার মত বিষ গড়িয়ে পড়ছে মধুর কপালের ওপর। বিষাক্ত হিসহিস শব্দে আমার মাথার চারপাশটা ভরে যাচ্ছে। মধুরিমার মুখের আদল বদলে গিয়েছে। সে আর মানুষী নেই!
ব্যথার চোটে শ্বাস আটকে এলে আমার শিরদাঁড়া দিয়ে আগুনের মত গরম একটা হল্কা দ্রুত গতিতে ওঠানামা করতে থাকে। মনে হয় মমতাময়ী মৃত্যু এসে নিঃশব্দে আমার পিঠে হাত রেখে দাঁড়িয়েছে। আমি দেখতে পাই হাঁটুর কাছে শাড়ি গুটিয়ে মাটির দাওয়ায় বসে ঠাম্মা আবার সেই গল্পটা বলছে। সেই গল্প শুনতে শুনতেই আমি দেখছি অন্ধকার ঘরের ভেতরে আমার বাবা মায়ের চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে ময়লা চাদর পাতা বিছানার দিকে।
“খানকি মাগী, বারোভাতারি কী ভাবিস তুই আমি জানি না, আমি বাড়ি না থাকলে পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে তুই কোথায় যাস? কার সঙ্গে শুয়ে আসিস? জানি না আমি?” নিজের অজান্তেই চেঁচিয়ে উঠি,
“রঞ্জি রঞ্জি রঞ্জি… আমাকে ওই রাক্ষসের ঠিকানাটা বলে দাও। বাবা মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে যাক আমি চাই না। আমি চাই না। আমিই বাবাকে খেপিয়েছি। মায়ের নামে বলেছি। শাস্তিটা আসলে আমার প্রাপ্য রঞ্জি।” দেওয়ালের পাঁজরে বসানো খোলা জানালায় তখন মৃত্যুর তৃতীয় চোখ! সেই চোখের ভেতর এক অনন্ত পথ…। অন্ধকার। সেখান থেকেই ঘড়ঘড়ে শব্দের মত দেবব্রতর ডাক ভেসে আসে,
“ও নির্বাণ দা, হল তোমার? আর কত ভাববে? চল চল, লেট হয়ে যাচ্ছে তো!” দেবুর ডাকটা শোনা মাত্রই আমার বুকের ওপর থেকে কালো কালো ধুলোর কণার মত ছিটকে দূরে সরে যায় মধুরিমা।
“কী হল? কী হল বেবি? আজকের রাইডটা তোমার পছন্দ হয়নি না? মধুরিমা…মধুরিমা…যেও না প্লিজ…প্লিজ। আর একটা সুযোগ দাও আমায়। এবার আমি মন দিয়ে ঘর পাতব।”
দুহাত বাড়িয়ে আপাদমস্তক জং ধরা একটা অক্ষম ফান রাইডের মত চেঁচিয়ে উঠি আমি। আমার গায়ে দুধগন্ধ মাখিয়ে দিয়ে একে একে নেমে যায় নিষ্পাপ বাচ্চারা। টিনের বুকটা থেকে হয়ত কিছুটা রংচটা অংশ ভেঙে ঝোলে। হাওয়াতে উড়ে যায় আমার বুকে জমা ধুলোবালি। মালিক হয়ত ভাবেন সবকিছুই আমার বেয়াদবি। আমার পাছায় টেনে একটা ডানপেয়ে লাথি কষিয়ে দেয়।
“শালা ফান রাইডের বুড়ো ঘোড়া তলে তলে তোর এত? পিঠে শুধু মেয়েছেলে বসাতে চাও নাকি? কী ভাব নিজেকে পক্ষীরাজ! হা হা হা!”
মালিক! কে? কে? সময় নাকি ঈশ্বর তুমি নিজে? অন্ধকারের মধ্যে ফুটে ওঠা রঙবেরঙের আলোয় আমি দেখি হাঁটু অবধি লম্বা লাল সাদা ফ্রক পরা, দুইদিকে ঝুঁটি বাঁধা ছোট্ট মধুরিমা আমার মধু ফরসা ফরসা তুলতুলে হাতে নিজের ফেসবুকের টাইমলাইনে একটা স্ট্যাটাস লিখে দিচ্ছে,
“সে মানে অনির্বাণ আর নেই, তবুও কোথাও…কোথাও তো আছে। নিশ্চয়ই আছে…” টুং টাং সুরে আমার কানে ভেসে আসে একটা গান। আমার শেষ ঘুমের সঙ্গে মানানসই একটা লালাবাই।

কবি,কথাসাহিত্যিক