Categories
ইরাবতী উৎসব সংখ্যা: একগুচ্ছ কবিতা । উপল বড়ুয়া
আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট 
অবসরে
এমনই সে চায়—
আরাম কেদারায়
বসে চুপচাপ
নাড়াতে দু’পা।
হাতে বই, ফ্লাক্সে চা
পিরিচে বিসকুট
সকালের রোদ
চুমু খাবে ঘাসে।
বসে থাকবে সে
দুপুর অবধি—
কোনো একদিন
নিষ্কাম অবসরে।
কেউ ডাকবে না
ডাকার নেই কেউ
থাকবে না যেহেতু
দুয়েকটা পাখি
থাকতে পারে।
এমনই সে চায়—
আরাম কেদারায়
না শোনা গানে
নাড়াতে মাথা।
উড়বে বলে এক হাঁস
উড়বে বলে এক হাঁস
ডানায় তার রোদের তেজ
গলা উঁচিয়ে দাঁড়াল পায়ে।
পালকের নীচে রসালো শরীর
ভারী মাংসল দুই পা
উড়বে বলে এক হাঁস
এখন তার বাতাসের অপেক্ষা।
প্যাক-প্যাক স্বরে সে এসে
পজিশন নিল পাহাড় কিনারে
তার নীচে স্বচ্ছ জলের ধারা
উড়বে বলে এক হাঁস
বাতাস বইতেই মেলল ডানা।
মেঘের মতো শাদা পালক
মেঘের কাছে এসে হলো আরো শাদা
উড়বে বলে এক হাঁস
অবশেষে উড়াল তার পাখা।
বৃষ্টি তখন কোমর বেঁধে
হঠাৎ ভর হলো হাঁসের পিঠে
উড়বে বলে এক হাঁস
বৃষ্টি নামাল খরার পৃথিবীতে।
হাঁসের ডানায় বৃষ্টি নামে
পাতায় পাতায় ইশারা
নদীতে টুপ; যেন মাছেরা পেলো আহার
উড়বে বলে এক হাঁস
তালের ভারে পড়ল জলের ‘পরে।
হাঁস তখন হাঁসফাঁস হাঁস ভুলে
সাঁতার দিল স্বচ্ছ নদীর জলে
উড়বে বলে এক হাঁস
জলেতে ভাসাল ডানা।
নাপিত
মাঝে মাঝে ক্ষুধাতুর কোনো পথশিশুর
ব্যথা নিয়ে ঘুরঘুর করি সেলুনের সামনে
নাপিতের কাঁচিতে ধার দেওয়া দেখি—
চুলের গন্ধে তার কেমন নেচে উঠে আঙুল
যেন হরিণ পেয়েছে সবচেয়ে সুমিষ্ট মহুয়া
আর যুবতী পেয়েছে সেলাইয়ের সুতো-সুঁচ।
আমিও কি খুঁজিনি একদিন মৃগনাভীর ঘ্রাণ?
শস্যময় বিকেলের ধারে বিগত হিরন্ময় ধান?
ক্ষুর চালানোর ফাঁকে সকৌতুকে হাসে নাপিত
রেডিওতে বাজে ‘বাজপান কি মহব্বত…’
সুরের তালে নাচে জঙ ধরা রোলিং চেয়ার
আঙুলের ফাঁকে কাঁচি।
তার ডাকের অপেক্ষা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি
যদি সে ইশারায় ডেকে বলে—
‘এসো ভাই, তোমার সোনালী দুঃখগুলো কাঁচি
ও ক্ষুরের আঘাতে বাগানের মতো সাজিয়ে দিই।’
মুমূর্ষু সৈনিকের গান
এই সিগারেটটা শেষ হলেই উঠে চলে যাব
হাঁটুকে ড্রামস বানিয়ে আর বাজাব না তুমুল।
পাখিরা ফিরবে বৃক্ষের কাছে, মাছেরা জলে
মানুষ কবে ফিরেছিল মানুষের কাছে
নিজের মুখোমুখি একা?
তারপরও কিছু কথা রয়ে যায়— কিছুধ্বনি
হাততালি দিলেও বাজে না আর— তবুও
হৃদয় এক অমীমাংসিত রণক্ষেত্র।
ঘোড়া যার পালিয়ে গেছে দূর বনে
ভাঙা ঢাল; তলোয়ারে ধরেছে মরচে
আহা! সে ছিল এক রাজার সৈনিক
আজ বড় অসুস্থ।
রোগীর পোশাক, যেন উন্মাদ এক ভূত
মনের অসূখে সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
যেখানে হৃদয় সেখানে দুধশাদা নার্স
এই গান শেষে চলে যাবে সে একা।
বোকা নৌকা
তোমার যাবতীয় বসন্তদিন পেরিয়ে—
এক হাঁটু জলের নদী; মৃদু কুয়াশার সুবাস
কেমন নীচুস্বরে গরুগুলো ভাঙছে পথ
তাড়াহীন সময়ে কোথাও বাজছে করুণ বাঁশি
ফেলে যাচ্ছো তোমার ব্যক্তিগত ইচ্ছের ফড়িঙ।
এক ভ্রমরকে দেখেছি গতদিনে—
ফুলের স্তনে মুখ বুজে পড়ে আছে মাতাল
তার শিশুদের ছেঁড়া প্যান্ট, ধুলোমাখা পা
কেমন মায়াবী শৈশবের ফুরিয়ে যাওয়া সন্ধ্যা
সবই আজ ব্যক্তিগত বসন্তদিন!
এসব আত্মকথার গোঙানি ঝরাপাতাদের কথা
পাখি শিকারীদের নিশানায় দেয় প্রবঞ্চনা।
দূরে, ঐ মাঠের ধারে, কাছে হাঁটু জলের নদী
কুয়াশায় জমে যাওয়া এক বোকা নৌকা
তাতে বসে কয়েকটি শালিক নিভৃতে ডাকছে।
আমি কি মারা যাব তবে—
এমন অত্যাশ্চর্য সুন্দরের আঘাতে?
দ্য শাইনিং
কলম হাতে উন্মাদনা নিয়ে বসে আছে সে
প্রথমে ছুরি হাতে তেড়ে এলো এক রাগী শব্দ
যেন তাকে টুকরো টুকরো কেটে রক্তাক্ত করবে এখনই।
এরপর দস্যু বনহুরের বেগে দলবল বেধে হৈ-হৈ রবে
এলো এক কাটা মুখ-হলদে দাঁতের বিদ্ঘুটে পঙকতি
যেন কবর থেকে কাফন দোলাতে দোলাতে গত শতকের
কোনো এক শব চেঁচাচ্ছে— ‘মাদারচোত, ডাকলি ক্যান?’
আলো-আঁধারে তবু সে বসে আছে ঠাইঁ
ভাঙা চেয়ার; টেবিলে বইয়ের স্তুপ; নিঃসঙ্গ চোখ
আরেকটু জোরে হাওয়া দিলে ভেঙে পড়বে কপাট
তবু সে ভাবে—
কলম কী তার অস্ত্র?
খাতা কী তার জীবন?
অন্তত একটা কবিতা লিখতেই হবে আজ
এমন টানটান উত্তেজনা নিয়ে সে জ্বালাল সিগারেট
চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকালো নিজেকে কিছুক্ষণ
একটা কবিতা লিখতে না পারলে সে
একটু পর মরে যাবে তীব্র যন্ত্রণায়।

উপল বড়ুয়ার জন্ম ১৯৮৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর, কক্সবাজারের রামুতে। মূলত কবি। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি কথাসাহিত্যেও মনোনিবেশ করেছেন। তার প্রকাশিত কবিতার বইগুলো হলো- কানা রাজার সুড়ঙ্গ, তুমুল সাইকেডেলিক দুপুরে। গল্পের বই- ডিনারের জন্য কয়েকটি কাটা আঙুল।