উৎসব সংখ্যা: অচিন আলোকুমার ও নগণ্য মানবী | আকিমুন রহমান
উৎসর্গ
এই শব্দেরা কেউ কেউ বেলিফুল!
সাদা বেলিফুল!
কেউ কেউ সাদা সাদা সাদা সৌরভ!
প্রণয়ের মতো ভীরু ও গোপন সুগন্ধ- কেউ কেউ!
কেউ কেউ গোলানো সবুজ পাতা! বেলির সবুজ পাতা!
এই বাক্যেরা প্রখরা নদীর ঢেউ!
তুখোড়া তেজবতী ঢেউ! নিরন্তর ঢেউ!
এই কথাগুলো নিরাশার দেশে আশা
এই কথাগুলো পেকে ওঠা ধানছড়া
এই কথাগুলো উনোনের ফুটন্ত ভাত, দুপুরের পাত!
তপ্ত অন্নের দুপুর- এই কথাগুলি!
এই গল্পটা একটা রাতের আকাশ!
গাঢ় কালো ঘন সেই রাত
অপেক্ষার মতন সঘন নিবিড় তমিস্রা
এই গল্পটা সে আঁধার রাতের আকাশ!
এই গল্পটা ঝিকিমিকি তারা, আর তারাদের রাত!
পরম!
এই আমি -এইটুকু শুধু- গড়ে তুলতে পেরেছি!
এই সামান্যকেই কেবল- ফলাতে পেরেছি!
হে আমার প্রিয়,
এই গল্প-এইসব সাদা সুঘ্রাণ-আশা ও অপেক্ষা!
তোমার জন্য!
সেই নগরে-সংসারে তখন, সময়টা ছিলো বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ! আরো স্পষ্ট করে বললে- বলতে হবে- সেটা ছিলো ১৯৯৫ সাল!
আমাদের কারো কারো কাছে মনে হতে পারে- এ আর এমন কী দূরের সময়! এই তো অল্প কয়দিন মাত্র হয়, ১৯৯৫ সাল ফুরিয়েছে! আবার কারো কারো কাছে ওই বছরটাকেই হয়তো মনে হবে- বহু আগের এক কাল!
তো, সেই ১৯৯৫ সালে, ঢাকা শহরের এক সংসারে মেয়েটি বাস করতো!
উহু! সংসার কথাটা বোধহয় এখানে খাটবে না!
যাকে সংসার বলে, সেইখানে, ঘরের সকলজনেরই- একসাথে কেমন একরকম- জাবড়ে-জুবড়ে থাকার ব্যাপারটা থাকে! সেখানে এক চুলায়ই সকলের জন্য রান্না হয়! এক হাড়িতেই সকলের সেই খাদ্য থাকে! সেইখানে সুখ-দুঃখের ঝাপটাগুলো -একসাথে সওয়ার থাকে! একজনের আশার সাথে অন্য সকলের আশা-ভরসাও এসে জড়িয়ে যায় সেখানে! এমনই তো থাকে সংসার? নাকি?
কিন্তু সেই মেয়ে যেইখানে বাস করছে; সেইখানে, এমন নিকট হয়ে থাকাথাকির কোনো বৃত্তান্ত নেই! এক ছাদের নিচে, পাশাপাশি ঘরে, রক্তের একেবারে নিকট সম্বন্ধের মানুষের সাথেই বসত করছে সে!
তবে সেইখানে তাকে থাকতে হয়- বিচ্ছিন্ন, অনাত্মীয় এক পরস্য পরের মতো! আলাদা হাড়ি আলাদা রান্না আলাদা মৌনতা নিয়ে- অনেক কুণ্ঠা-মরোমরো অপরাধী মুখে- সেখানে থাকে সে! খুব সন্তর্পন আলগোছে সে- নিজের রক্তের সম্পর্কের লোকের সাথে- এক ফ্লোরে থেকেও, আদতে কোথাও বসত করে না! কোথাওই অবস্থান করে না!
তাহলে বরং সংসার শব্দটা এইখানে ব্যবহার না করি! বরং বলি- এক বাসা! বরং বলি যে, সেই কালের ঢাকা শহরের এক বাসায় মেয়েটি থাকে!
আবার, এমন নয় যে, মেয়েটি তস্য হতদরিদ্র কেউ একজন! এমন নয় যে, তার মাথার ওপরে কোনো ছাদ নেই! বা, এমনও নয় যে, তার মাথার ওপরে যে ছাদ আছেÑসেটা হচ্ছে ভাড়াবাড়ির ছাদ!
তার যেই বসতবাড়ি- সেটা একটা চারতলা বাড়ি! হোক সেটা বাঁকাচোরা, আর জোড়াতালিতে বোঝাই; কিন্তু আস্ত একটা চারতলা সেটা! সেই বাড়িরই খানিকটা, পৈত্রিকসূত্রে, পেয়েছে সেই মেয়ে! অন্য কয়েকজন শরিকের সাথেই, উত্তরাধিকারসূত্রে সে, সেই বাড়ির একটা ফ্লোরে, বসবাসের অধিকার পেয়েছিলো। যদিও কপালগুণে সে কেবল চৌকোমতো-চিপা একটি কামরারই স্বত্বদখল পেয়েছিলো; তারপরেও আমরা বলতে পারি, পৈতৃক দালানেই বসত ছিলো সেই মেয়ের!
তারপর, এমনও কিন্তু নয় যে, নিজের অন্নসংস্থানের জন্য মেয়েটাকে দোরে দোরে ধন্না দিয়ে যেতে হতো! বা এমনও নয় যে, তাকে অন্যের দানের ওপর ভরসা করে দিন পার করতে হতো! তেমন ছিলো না মোটেও! বরং একেবারে লক্কর-ঢোক্কর করে চলার মতোন -একটা চাকুরিও ছিলো মেয়েটার! তাতে তার চলে যেতো! কোনোরকমে ঠিকই দিন গুজরান- হয়ে যেতো তার!
আশ্চর্য! দেহ ধারণের জন্য এমন এমন সব অতি দরকারী বিষয়-আশয়, নিজের নাগালে থাকার পরেও, মেয়েটাকে দেখলে কিছুতেই মনে হতো না যে, অইসব দিকে খেয়াল করার কোনো হুঁশ আছে তার! তাকে দেখে মনেই হতো না যে, সে জ্যান্ত-জাগ্রত কেউ একজন!
তার দিকে চোখ পড়া মাত্র যে-কারোই মনে হতো, এই যে মেয়ে; এই যে সে মানুষের দেহ নিয়ে চলছে-ফিরছে সে কি আদপেই জীয়ন্ত কেউ? নাকি সে আদতে -ক্রমে ক্ষয়ে আসা- একটা সাবান-বাংলা সাবান?
তারপরেও মেয়েটার দিকে খুব মনোযোগ দিয়ে একটু তাকিয়ে থাকার পরে, কোনো কোনো মানুষের মনে এমন কথাও জাগতে পারে, এই মেয়ের মাথার ওপরে যদি বান্ধা-ছাদখানা না থাকতো, তাহলেই যেনো ভালো হতো! ওই লটর-পটর চাকুরীটাও যদি না থাকতো, তাহলেও যেনো মেয়েটার উপকারই হতো! মেয়েটার অই বছরকে বছর পার করে দিতে থাকার মধ্যে- তাহলে তখন হয়তো -একটুখানি ছুট থাকতো! একটুখানি অনিশ্চিতির ধাক্কা থাকতো! মেয়েটা তাহলে তখন হয়তো বা, আসল বেঁচে থাকাটাকে চিনে নিতে পারতো!
কিন্তু এখন মেয়েটা কী করে?
এখন মেয়েটাকে- রোজ রোজ তার রোজকার খাওয়া-পরা, ঘুম-জেগে ওঠা ইত্যাদি নিয়ে থাকতে দেখা যায়! কিন্তু নজর ধারালো করে দেখলে, ঠিকই বোঝা যায়, যেনো সেইসবের মধ্যে সে আসলে নেই! বহুদিন হয়ে গেছে, সে ওইসব কিছুতে থাকেও না!
দরকারের কাজে নিত্য বাইরে যায় সে। তারপর আবার বাসায় ফিরে আসে! বাসায় থাকে, আবার বাইরে যায়! কোনো কোনো সময় দিনে ঘুমায়! দিনে ঘুমায়। রাতেও ঘুমায়! আবার কোনো কোনো সময় পুরো রাতই চোখের পাতা তার একদম খোলা থাকে! একদম খোলা থাকে! ঘুম আসে না তার! ঘুম আসে না! দিনেও আসে না! রাতেও না!
তবে, নিজের এই অতি ঘুমের ব্যাপারটা নিয়ে তার মনে যেমন কোনো গ্লানি বা অশান্তি হয় না; তেমনই ঘুম একেবারেই না-আসাটা নিয়েও কোনো জ্বালা-পোড়া হয় না তার! সবই স্বাভাবিক লাগে তার কাছে! কোনো কিছু নিয়েই আর কোনো সাড়া-নাড়া নেই এখন!
কোনো বিশেষ কিছু পাবার ইচ্ছা হয় না তার। আবার, জীবনে যে কতো কিছু পাওয়া হয়নি, সেসবের দিকেও নজর যায় না সেই মেয়ের!
সে তার দিন পার করে দিন পার করে, দিন পার করে! কিন্তু কোনো একটা দিনের দিকেও চেয়ে দেখে না! সে তার রাত- ফেলে যেতে থাকে ফেলে যেতে থাকে ফেলে যেতে থাকে! কিন্তু একটা কোনো রাতের কথাও -কদাপি তার স্মরণে আসে না!
সে রাতে ও দুপুরে ভাত খায়! তার আশপাশের অন্য সকলে -সকালে – সচরাচর রুটি খায়! কিন্তু সে তেমন কিছু নিজের পাতে তুলতে পারে না! এখন অনেকদিন হয়- সেটা পারে না! নিজের জন্য সকালে রুটি গড়ার ফুরসত ও পরিস্থিতি তার নেই! তাই সকালেও তার থাকে ভাত! রাতের ভাত!
এই যে তার সকালগুলোতে -কখনো -রুটি সেঁকার গন্ধ ওঠে না, এই নিয়েও তার মনে কিন্তু কোনো খেদ বা কষ্ট আসে না! কোনো প্রশ্নও মনে আসাআসি করে না!
সে বাসি ভাত খেয়ে যায়! খেয়ে যায়! রোজ সেই ভাত সে- মুখে তুলে যায়! কিন্তু আবার যেনো ঠিক সে-মুখে তোলেও না!
এমন রকমে মেয়েটা যখন বেঁচে চলছিলো; তখন কিনা, একদিন, তার মনে একটা বাসনা দেখা দেয়! খুব আশ্চর্য রকমের একটা ইচ্ছা কিনা জন্ম নেয়- মেয়েটার ভেতরে!
কি সেই বাসনা?
না! নিজের মনের দুই চারটা কথা- লিখে ফেলতে ইচ্ছা করতে থাকে তার! সেইগুলা কিনা খাতার পৃষ্ঠায় লিখে ফেলার জন্য- খুব ইচ্ছা হতে থাকে। খুবই ইচ্ছা!
‘এমন হয় কেনো! এমন কেনো হচ্ছে? এ কী রে বাবা!’ প্রথম প্রথম-মেয়েটা- নিজের ওই অহেতুক ছটফটানিকে দমানোর চেষ্টা করে। চেষ্টা করতে থাকে! অনেক করে চেষ্টা করতে থাকে!
কিন্তু ক্রমে সে বোধ করতে পারে, অই ইচ্ছাটাকে সে মন থেকে তাড়িয়ে দিতে পারছে না! কিছুতেই পারছে না! সেটা তার মন থেকে মুছে যাচ্ছেই না! বরং একটু একটু করে, সেটা যেনো বেশ ঘাড়-তেরা ধরণের তেজী হয়ে উঠছে!
অমন ইচ্ছা-ধাক্কার অসুবিধা নিয়েই সে হয়তো বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতো! মনের ইচ্ছার অমন না-বুঝপনাকে সে হয়তো কোনোমতেই প্রশ্রয় দিতো না! হয়তো কিছুতেই সে, কখনোই, টেনেও নিতো না কোনো কাগজ!
কিন্তু তার হাতদুটা হঠাৎ কিনা বেপরোয়া হয়ে ওঠে! নিজেরাই তেরিয়া হয়ে ওঠে! তারা করে কী, নিজেরা নিজেরাই, একটা খাতা খোঁজা শুরু করে! খুঁজে খুঁজে, শেষে, পুরোনো একটা খাতাও পেয়ে যায় তারা। পেয়ে যায় একপাশে মার্জিন টানা একটা অঙ্ক খাতা! সেই খাতার প্রথম কয়টা পাতায়, কোন সেই আগে, মেয়েটা ব্যাকরণের কিছু নিয়ম প্রাকটিস করেছিলো! তারপর কেনো জানি, খাতাটা সে অন্য কোনো কাজেই লাগায়নি!
সেই খাতাটাকেই তার হাতেরা লাগায়, মনের অকারণ ইচ্ছা পূরণের কাজে! সেই খাতায় মনের কথা লিখে উঠতে থাকে তার হাত!
চলুন পাঠক, আমরা দেখি, কী কথা লিখে ওঠার- বেদম ইচ্ছা জাগতে পারে -অই তিরিশ পার হওয়া মেয়ের মনে! চলুন তো দেখি সেটা?
২৭ মার্চ ১৯৯৫
কয়দিন ধরে এইটা কী হচ্ছে আমার! মনের কথা কিনা লিখতে ইচ্ছা করছে! অনেক হাড়–ম-দুড়–ম ইচ্ছা করছে!
আমি আবার একটা কেউ! আমার আবার কিনা আছে মন! সেই মন নাকি আবার আমাকে থেকে থেকে গুঁতাচ্ছে; লেখ লেখ! ভিতরের কথা কয়টারে লিখে নে রে! লেখ!
আর আমি তখন সর্বক্ষণই নিজেকে চুপেচুপে চোখ-রাঙানী দিয়ে যাচ্ছি! “অই? আমার আবার ইচ্ছা কী! আমার আবার মন কী!”
“আমার ভিতরটার আবার কোনো কথা আছে নাকি? ভিতরের কোন কথা? সেইসবকিছু আবার লেখালেখি করার কী আছে!” এতোসব কথা আমি না আমাকে বলছি বারেবারে? ওদিকে দেখো আমার হাতেরা কিনা নিজেরা নিজেরাই কাগজ-কলম খোলাখুলি করে শেষ! আমি তবে আর কী করবো! লিখুক এখন হাতে! তার যা ইচ্ছা হয় লিখুক গা! আমার কী!
এই যে আমি – জীবনে- নামীদামী কেউ একজন হতে পারি নাই! এই বিষয়টা নিয়ে কি আমার কোনো আফসোস আছে? এই নিয়ে কি আমার কোনোরকম মন টনটনানী হয়েছে কখনো?
কোনোদিন হয় নাই!
কেনো হয় নাই? আমি কি একেবারে সাধুসন্ত, মহামানুষ কেউ একজন হয়ে গেছি? সেই কারণে আমার মনে কোনো শোকতাপ নাই? নামীদামী হই নাই বলেও তাই কোনো আফসোস আসে নাই আমার মনে? বিষয়টা সেইরকম কিছু?
আসলে বিষয়টা সেইরকম কিছু না! হয়েছে কী, লোকেরে যে নামজাদা কোনো একজন হতেই হয়, এমন করে ভাবনাচিন্তা করতেই তো শিখি নাই আমি!
আবার, কোনো রকমেই নামীদামী না হতে পারলে যে -জীবনটা একেবারে বৃথা হয়ে যায়-এই কথাটাও শেখা হয় নাই কোনোদিন!
কেমন করে শিখবো?
সন্তানদের শিশুকালে এইসব বিষয় শিক্ষা দেবার দায়িত্ব কাদের থাকে? থাকে বাবা মায়ের!
আমার আব্বা আম্মা ছিলো! কিন্তু থাকলে কী! তাদের কোনোজনকে এমন সব বিষয় নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে দেখি নাই কোনোদিন! তারাও করে নাই! আমাদেরও করতে শেখায় নাই! তাহলে কি শিখিয়েছে তারা?
সত্যি কথা যদি বলি, তো বলতে হবে- আম্মা শুধু জানতো নিজের বাপের বাড়ির ভালোমন্দের বড়াইটা করতে! আর জানতো, নিজের পোলাপান কয়টারে কেমন করে নিজের বাপের গোষ্ঠীর সাথে জুড়ে রাখা যাবে-সেই ভাবনাটা ভাবতে!
আব্বা কি জানতো? আব্বা যে কী জানতো, সেটা ভালো করে আমার জানা হয় নাই!
তবে এখন- এই যে এই তিরিশ পার হওয়া বয়স আমার- এই টাইমে এসে- ক্ষণে ক্ষণেই আমার মনে হয়, আব্বা আসলে তার ছেলেমেয়ে কয়টারে আল্লার হাতেই ছেড়ে দিয়েছিলো!
সংসারে পোলাপান জন্ম নেয়ার পরে- তাদের লেখাপড়া শেখানোর নিয়ম তো আছে একটা! মনে হয়, সেই নিয়ম মোতাবেকই আব্বা আমাদের স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে গেছে!
‘পড়–ক এখন, যেমনে যে যতোখানি পড়তে পারে!’ এইটুকুই হয়তো ভাবনায় ছিলো তাঁর! এর বাইরে অন্য কোনো কিছুই তাঁর চিন্তাতেও আসে নাই হয়তো কোনোদিন! নাকি আরো অন্য কোনো ভাবনাও ছিলো তাঁর অন্তরে? কী জানি!
কাজেই এই কথা খুব সত্য, লেখাপড়া করতে থাকার সময়ে, এইম ইন লাইফ বলতে কোনোকিছুই -আমাদের তিন ভাইবোনের -কোনোজনেরই ছিলো না! তারপরেও দাদাভাই এখন উকিল হয়ে, জজ কোর্টে ভালোই আসাযাওয়া চালাচ্ছে! আর, আমি কিনা-একটা কলেজে পড়ায়ে চলছি! হোক যেমন-তেমন! কিন্তু কলেজ তো! খোদা খোদা! কেমনে যে কী হয়ে উঠছে!
সেই সংসারের মেয়ে আমি! সেই আমার কিনা Ñএখন আজকাল- কি করতে ইচ্ছা হচ্ছে? না! ডায়েরি লেখার ইচ্ছা! আমার তিনকুলের কাউরে- যা কিনা কোনোদিনই – করতে দেখি নাই, সেইটাই আমার করার ইচ্ছা হচ্ছে! ওদিকে আবার সেই ইচ্ছাটারে পূর্ণ করার কাজটাও কিনা- নিজে থেকেই শুরু করে দিয়েছে-আমার হাতেরা! এই যে এখন- এই যে ডায়েরী লিখছে- আমার হাতেরা! আল্লা!
না না! টাকাপয়সার তেমন কোনো একটা জোর Ñআমার নাই! আবার, আমার মনেরও তেমন একটা শক্তি-সাহস-দাপট-হিম্মত নাই! একেবারেই কিচ্ছু নাই। সুন্দর দেখে একটা মোটাগাটা, বাঁধানো ডায়েরী কিনে আনার আহ্লাদ বা সাহস- কোনো মতেই আমি করতে পারি না!
তেমন ডায়েরীর অনেক দাম! কম পক্ষে একশো টাকা তো হবেই! অতোটা টাকা এমন কাজে খরচ করে ফেলবো! ভাবনা-চিন্তায়- আমার না খালি ডর করতেছিলো! এতোগুলা টাকা! শেষে, এই যে পুরান খাতাটাকে খুঁজে পাওয়া গেলো! কী বাঁচা যে বাঁচলাম! ডায়েরী বানিয়ে ফেলা!
হোক দেখতে এইটা যেমন-তেমন, তাতে কী! আমার কথাগুলা তো টোকা যাচ্ছে এইখানে! ওইটাই তো আসল, তাই না? অনেক অনেকগুলা খালি-পৃষ্ঠাই তো আছে খাতাটাতে! ওতেই হয়ে যাবে আমার!
আমার নিরালা কথাগুলা কিন্তু লেখা শুরু করেছে আমার হাত! এই যে লিখছি!
প্রতিদিন রাত সাড়ে নয়টার দিকে এই ডায়েরি লেখার ইচ্ছাটা হচ্ছে আমার! সারা দিন নানা রকমের কতো কথা ওঠা-পড়া করে আমার ভেতরে! কতো রকমের কথা বলি কতো জনের সাথে! আবার কিছু কিছু কথা মনের মধ্যেও তো রেখে দেই। বলিও না কাউকে।
সারা দিনে কিন্তু- ওইসবের কোনোকিছুকেই- লিখে ফেলার কোনো ইচ্ছা আসে না আমার!
কিন্তু রাত সাড়ে নয়টার দিকে আমার মনের অবস্থাটা অন্যরকম হয়ে যায়।
তখন কিনা মনের মধ্যে কেমন অদ্ভুত কয়টা কথা দেখা দেয়! অল্পস্বল্প কয়েকটা কথা মাত্র! আর, সেই কথা কয়টাকেই লিখে রাখতে খুব ইচ্ছা হতে থাকে। কেমন একটা ঘন ইচ্ছা আসতে থাকে আমার ভেতরে! ওই যে রাত নয়টা সাড়ে নয়টার দিকে!
প্রতিদিনই শেষ বিকাল থেকে রাত আটটা সাড়ে আটটা পর্যন্ত- হাতে আমার বেশ কাজ থাকে। প্রথমে কিনা পরের দিন কলেজে পরে যাবার শাড়ি-ব্লাউজ ইস্তিরি করতে হয় আমাকে। তারপর খাতা দেখার থাকলে, দেখতে বসা আছে। ছাত্রীদের নোট দেখে দেওয়ার থাকলে, সেগুলাও কারেকশন করতে হয় তখনই। কলম, খাতাটাতা ব্যাগে ঢোকাবার হলে- ঠিকমতো ঢোকানোর কাজও- সেই সময়েই সারতে হয়। তারপর বাংলা ব্যাকরণের এটা-ওটার দিকে নজর দেওয়ার কাজটাও করি, ওই তখনই।
এই রকমে রাতের ওই সকল কাজ একে একে শেষ হয়ে যায়! শেষ হয়ে যায় নয়টা সাড়ে নয়টার দিকে। তারপর আর কিছু করার থাকে না! থাকে কেবল ঘুমাতে যাওয়ার কাজটা।
যেই ঘুমাতে যাবার সময়টা হয়, তখনই, আচমকা এই লেখার ইচ্ছাটা আসে। কিছু লিখি- কিছু লিখি- এমন একটা ইচ্ছা আসতে থাকে মনের ভেতরে! বারেবারে!
না না! কোনোরকম গদ্য বা কবিতা লেখালেখির কোনো অভ্যাস আমার নাই। ওই রকম কিছু আসেই না আমার! কোনোদিনই আসে নাই।
অথচ আমি কিন্তু পড়ালেখাটা করেছি বাংলায়।
অনার্স, মাস্টার্স করতে করতে কতো রকমের কবিতা, গদ্য ও উপন্যাসই তো পড়া লেগেছে। কতোভাবে তো সেইসব রচনাকে ব্যাখ্যাও করতে হয়েছে।
তারপরেও কোনো সময়ে নিজের মনে কোনো তাগাদা আসে নাই। নিজে কিছু লেখার তাগাদা আসে নাই।
আমি একেবারেই সাধারণ একটা স্টুডেন্ট ছিলাম। আগাগোড়া।
“বাংলায় পড়লে কী, লেখালেখি আবার এমন সাধারণ স্টুডেন্টের কাজ নাকি!” এই কথা বারেবারে মনে এসেছে আমার!
সবসময় আমার মনে এই বিশ্বাসটাই আসছে যে, লেখালেখির বিষয়টা আমার মতন এইরকম ঠা-া-সিধা আর সাধারণ স্টুডেন্টের কাজ না। ওইসব যারা করে, তারা বিরাট সব মহাজন!
কলেজে আমার সঙ্গে পড়ছে, এমন দু-একজনকে আমি দেখেছি- তারা কিছুতেই আমার মতো সাধারণ কেউ না! তারা বেগম পত্রিকায় কবিতা পাঠায়। সেইসব কবিতা ছাপাও হয়। তারা আবার সেইগুলা ক্লাশে এনে আপাদের ও আমাদের সবাইকে দেখায়ও। আবার সেইসব নিয়ে কতো হই হইও হয়! দেখেছি!
দেখে দেখে আমি বড়ো তাজ্জব হয়েছি তখন! কীভাবে এইসব করতে পারছে ওরা! এই যে লেখালেখির বিষয়টা! কেমনে পারে? কেমনে আসে অমন সব অদ্ভুত অদ্ভুত কথা, ওদের মনে! আমার তো আসে না! একটুও তো আসে না!
তারপর মনে মনে নিজের কাছে নিজে স্বীকার করেছি, আমি কেমন করে পারবো! আমি একদমই সাধারণ এক স্টুডেন্ট না? এমন সাধারণেরা এইসব পারে না।
হাজারো রকমে চেষ্টা করেও, আমি ফুলকে ফুলই দেখি। মেঘকে মেঘ। অন্য কিছু বলে চিন্তাও করতে পারি না।
ফুলে ফুলে কোনোদিনও তো কারো হাসির আভাস দেখতে পাই নাই!
কোনোদিনই মেঘে মেঘে তো বাজতে শুনি নাই কারো ডাক!
অথচ আমাদের পাঠ্য বইয়ের কতো কতো কবিই তো এমন নানা কিছু দেখতে পেয়েছে! বেগম-এ বের হওয়া আমার ক্লাশমেটদের কবিতায়ও তো এমন এমন কথাই লেখা হতে দেখেছি আমি!
আমি তেমন তেমন দেখতে পেলে তো হয়েছিলোই! তাহলে আমারে আর খুঁজে পাওয়া লাগতো না লোকের!
বাংলায় পড়েছি, পড়ার জন্য। অন্য কোনো কারণে না!
আব্বা বললো, এইটাই পড়। যদি কোনোদিন চাকরি করা লাগে, তাইলে চাকরি পাওয়াটা সহজ হবে! আমিও সেই কারণেই বাংলায়ই ভর্তি হলাম ইডেন কলেজে। নাইলে অন্য কোনো সাবজেক্টে হয়তো ভর্তি হতাম। পড়তাম। পাশ করে চাকরির চেষ্টাটা চালাতাম! এইই তো!
সেই আমার আবার লেখালেখি কী! পাগলে পাইছে নাকি আমারে!
কলেজে পড়ার সময়ে লেখালেখি নিয়ে কতো রকমের সব কথা মনে এসেছে আমার, মাঝেসাঝে! তখন একা একা মনে মনে হাসতে হাসতে দম ফাটার অবস্থা হয়েছে একেক বার!
এখন আর তেমন তেমন কথা মনে আসে না একদমই!
মনে আসবে কী! ফুরসতই তো পাই না মনে আনার!
সপ্তাহের ছয়দিনই কলেজ থাকে। ছুটি বলতে আছে সেই এক শুক্রবারে!
তাও বড়ো আপা প্রায় প্রায়ই শুক্রবারে কলেজে আসতে হুকুম দেয়। নতুন কলেজ। এখনও গভমেন্ট এফিলিয়েশন আসে নাই। ছাত্রী আছে অল্প কয়জন মাত্র।
কলেজে ছাত্রী কম, এদিকে স্কুল সেকশনে ভালোই ছাত্রী আছে। তাও কলেজে ভর্তির জন্য ছাত্রী পাওয়া যায় নাই। একেবারে কলেজ খোলার সময় থেকেই এই অবস্থা! সেই একেবারে প্রথমেই, কলেজ সেকশন খোলার সময় থেকেই, স্কুল সেকশনের ছাত্রীরা এস এস সি পাশ করার পর, নিজেদের কলেজ সেকশনের দিকে তাকায়েও দেখতে চায় নাই। অন্য কলেজে ভর্তি হতে চলে গেছে। এখনও ছাত্রী পাওয়ার অবস্থাটা বিশেষ ভালো না!
এইসব নিয়ে বড়ো আপার চিন্তার শেষ নাই। কলেজ উন্নয়নের এইসব চিন্তার কারণেই, যখন তখন মিটিং কল করতে হয় তারে। শুক্রবারেও।
তখন আসতে তো হয়ই। মনে মনে বিষম বেজার হয়েও আসতে হয়। চাকুরিটার জন্য দরদ তো আছে ভেতরে। আবার ডর-ভয়ও তো কম নাই! চাকুরি হারালে আমার কী হবে!
চাকুরিরে নিয়ে কোনো ঝামেলায় পড়ার সাহস কি আমার আছে? সাহসও নাই উপায়ও নাই।
যাক, এইসব কথা।
এইসব কথা লেখার জন্য বসেছি আমি? এই যে লেখাটা ধরেছি; সেইটা তো ধরেছি একটা বিশেষ কথা লিখে রাখার জন্য!
তাইলে এইখানে এইসব পুরানা কথা -আসছে কোত্থেকে! এইসব লিখতে চেয়েছি নাকি আমি? না না! অইসব হাবিজাবি কথা লিখতে কে চায়! অন্য গুরুতর একটা কথা আছে তো আমার! সেই কথাটাই না লিখতে চেয়েছিলাম? লিখলাম সেইটা? না! কই!
বড়ো অদ্ভুত ব্যাপার তো! কী লেখার জন্য এই যে আজকে খাতা-কলম হাতে নেওয়া, আর কোন সব আউলা কথা লিখছি আমি!
আসল কথাটা তো লেখাই হলো না।
এদিকে, এইসব নাই-তাই কথা লিখতে লিখতে দেখো রাত হয়ে গেছে কতো!
পোনে বারোটা! এক্ষণ নাÑঘুমালে, সকাল সাড়ে পাঁচটায়, কোনোমতেই জাগনা পাওয়া যাবে না! সাড়ে সাতটা থেকে না কলেজে থাকা লাগে!
২৮ মার্চ ১৯৯৫
আজকে ঠিক করেছি, আজকে আসল কথাটাই শুধু লিখবো। শুধু ওইটাই লিখবো। লিখবোই লিখবো। আর কিছু না। অন্য কোনো কথা না।
আসল কথা কোনটা?
সেই যে সেই কথাটা!
কথাটা তেমন বড়ো কোনো কথা না! ছোটোমোটো একটা কথা। কিন্তু আমার সেটা লিখে রাখতে বড়োই ইচ্ছা করছে।
কথাটা হলো এই, মাগরেবের আজান পড়ার পরের সময়টা আমার বেশ লাগে! অনেক ভালো লাগে। অনেক অনেক ভালো লাগে! তখন মনটা বড়ো কেমন জানি লাগে আমার!
মাগরেবের আজানের পরের ওই টাইমটাকে দেখতে দেখতে, আমি তখন, কেমন জানি হয়ে যাই! এমনে তো ঠা-া-চুপচাপ-বোবা একজন আছিই আমি! কিন্তু তখন যেনো ফুল-ফুরফুরা বরই গাছ হয়ে যাই! কার্ত্তিক মাসের ফুল-ভরা বরই গাছ যেনো হয়ে যাই! কেমন জানি খুশী লাগতে থাকে! ঠিক বুঝতে পারি, যেনো বরই ফুলের মতন কচি-সবুজ রঙা খুশী ঢলকাতে থাকে আমার ভিতরে! মাগরেবের আজানের পরের সেই টাইমটাকে দেখতে দেখতে!
এরেই তো সন্ধ্যা বলে?
আহা! কতো অন্য রকম এই টাইমটা!
ওই যে মাগরেবের আজান পড়ার পরের টাইমটা, ওই যে পনের বা বিশ মিনিট সময়টুক, ওই সময়টাকে আমার বেশ লাগে!
তখন মাটিতে অন্ধকার। অথচ আকাশে আছে অন্য ব্যাপার! আকাশে তখন অনেকখানি ফিকে রকমের ফর্সা ভাব। অনেকখানি ফর্সা!
সেই ফর্সা ভাবটা আবার আকাশ থেকে ধুড়মুড় করে সরে যায় না। যেতে থাকে আস্তে আস্তে। অতি আস্তে আস্তে আকাশে অন্ধকারটা আসে। অনেক অনেকক্ষণ লাগে সেই অন্ধকারটা আসতে!
অথচ মাটিতে অন্ধকারটা নামে কেমন ঝুপ্পুত রকমে! যেনো ওইটার খুব তাড়াহুড়া আছে। অনেক তাড়াহুড়া। সেই জন্যই এরে হুড়মুড় করে আসতে হয়। তারপর ধুড়মুড় করে নিজের জায়গাটা দখল করে নিতে হয়।
তারপরে যেনো এর আর তাড়াহুড়া করার কোনো ঠেকা থাকে না। তখন শুধু থির হয়ে বসে থাকলেই চলে। সেইজন্যই একদম স্থির বসে থাকে।
মাটিতে নামা সেই সন্ধ্যার জন্য আমার কোনো ভাবনাচিন্তা নাই। তারে খেয়াল করারও কোনো তাগাদা আসে নাই কোনোকালে।
আবার আকাশের সন্ধ্যাটা, ওই যে ধীরে আবছা হতে থাকে যে; সেই আবছাটার জন্যও যে খুব একটা কোনো টান বা হুড়াহুড়ি আহ্লাদ- এমন কিছু ছিলো, তাও কিন্তু না।
আসলে, আকাশ বাতাসের দিকে নজর দেওয়ার যে কোনো দরকার আছে; এটাই আমি বোধ করতে পারি নাই কোনো দিন।
আজকাল, এই প্রায় দুই বছর হতে যাচ্ছে; ভোর সকালে এবং বেলা তিনটার দিকে, আকাশের দিকে আমাকে নজর দিতে হয়।
তবে সেটা শুধু একটা কারণে! কী! না, বৃষ্টির কোনো লক্ষণ দেখা যায় কিনা!
বৃষ্টির নামনিশানা দেখা যাওয়া মানে, আমার রিক্সা ভাড়াটা বেড়ে যাওয়া।
আগে আমাদের এই বাসাবো কদমতলা থেকে আজিমপুর ইডেন কলেজে যেতে ভাড়া লাগতো কতো কম! দশ বা বারো টাকায় আসা-যাওয়া কুলায়ে যেতো। সেই টাকায় এখন একবারের যাওয়াটা পর্যন্ত হয় না! ভাড়া এখন সীমাছাড়া বেশী!
এখন আর ইডেন কলেজে যাওয়া কী! পাশ করে ফেলেছি কোনকালে! কিন্তু তাও ওই আজিমপুরের মাটি আমারে বিদায় দেয় নাই! অনেক ঘোরা-ঘুরন্তি, অনেক গোত্তা খাওয়া-খাওয়ির পরে, শেষমেশ, আমি যেই কলেজে চাকরি পেয়েছি; সেইটা ওই আজিমপুরেরই কোন এক ভিতরের দিকে!
যাও এখন বাসাবোর কদমতলা থেকে আজিমপুরের সেই কোন গলিতে!
এমনই কপাল!
আমাদের কদমতলার আশেপাশে, বা গোপীবাগ স্বামীবাগ এলাকায়, বা মতিঝিল শাজাহানপুরের এইদিকে ওইদিকে; গার্লস ও বয়েজ স্কুল এন্ড কলেজের কোনো লেখাজোখা নাই।
আমি পাশ করে বের হতে হতে সরকার কী এক ঘোষণা দেয়, ব্যস! সব হাইস্কুলে কলেজ সেকশন খোলার ধুম পড়ে যায়।
আমিও চোখমুখ বন্ধ করে অনেকগুলাতে ইন্টারভিউ দিয়ে দেই। কোনোটাতে রিটেন পরীক্ষা দিতে হয়! সে যেই রকমের যাই হোক না কেনো, আমি কিন্তু কখনোই ভালোরকম করে পরীক্ষা দিতে ছাড়ি নাই। কোনোবারই না!
কিন্তু ভালো রিটেন দিলে কী, বা ঠিকঠাক ইন্টারভিউ দিলে কী, বাসার আশেপাশের কোনোটাতেই চাকরি হয় নাই আমার।
মনের মধ্যে অন্য আরেকটা ইচ্ছাও ছিলো! ইচ্ছা ছিলো, সরকারী কলেজে চাকরি করি।
কিন্তু আমার সময়েরই কিনা দেশে এই আশ্চর্য ঘটনাটা ঘটার দরকার পড়লো! কি সেই আশ্চর্য ঘটনা? না, দেশে এই দশ দশটা বছর ধরে সরকারী কলেজের সকল নিয়োগ বন্ধ! কেনো বন্ধ কে জানে! বন্ধ তো বন্ধই! তারপর সরকারী চাকরির বয়স যেতে কয়দিন!
আমার বয়সও গেছে। এই তো আজকে, এই অল্প কয় বছর হয়, সেই বয়স গেছে। আমার বয়স তিরিশ পেরিয়েছে!
এর মধ্যেই শেষে কী কারণে বা কেমনে জানি কলেজের এই চাকুরিটা পেয়ে গেছি আমি! আয়াতুন্নেছা গার্লস স্কুল এন্ড কলেজে। আজিমপুর গোরস্থান পার হয়ে, সেই কোন চিপার ভেতরে!
স্কুলটা চলছিলো টিটির-মিটির। বহুদিন ধরেই নাকি চলছে! তারপর এখন সরকারের নিয়ম মান্য করে কলেজ সেকশন খোলা! বড়ো আপার আশা ছিলো; খোলার সময়ে যেমনই হোক, এক বছরের মধ্যে ছাত্রী বাড়বেই বাড়বে! স্কুলটা আছে না? ক্রমে ক্রমে স্কুল থেকে কম করেও যদি একশোটা ছাত্রী পাওয়া যায়, তাহলে কলেজ চালাতে সমস্যা হবে না!
কিন্তু দেখা গেলো, স্কুল পাশ করা মেয়েগুলা কোনোমতেই নিজেদের কলেজে ভর্তি হতে আসছে না! বুঝ-বাঝ দিয়ে, সোনাধন করেও কোনোজনরে কলেজে ভর্তি করানো যায় নাই। তাইলে ছাত্রী আসছে কোত্থেকে? সেই কোন অজানা-না-জানা কারা জানি কোনোখানেই ভর্তি হওয়ার কোনো রাস্তা না পেয়ে, শেষে এসে ঢুকছে এই আয়াতুন্নেছা গার্লস স্কুল এন্ড কলেজে!
যে আসে আসুক, কোনো আটকানি দেওয়া-দেওয়ি নাই! বড়ো আপার এই মত!
কিন্তু কী আফসোস! স্কুল সেকশনের ওরা আসবে না! ওদের যদি ভালো রকমে বোঝানো যায়? তাইলেও কি কোনো সুফল আসবে না? আসবে! আসবে! বড়ো আপার খুব বিশ্বাস হয়, ঠিক মতো বোঝানো গেলে, স্কুলের ছাত্রীরা নিজেদের কলেজে ভর্তি হতে আসবেই আসবে!
শেষে এখন, স্কুলের ক্লাশ টেনের মেয়েদের নানারকমে তোয়াজ করার কাজটা, চাকরি পাবার পর থেকে আমারে করতে হয়। সেটা করতে হচ্ছে, আজকে প্রায় অনেকদিন হয়।
ওই বুঝ দেওয়ার কাজটা যাতে ইচ্ছামতো করা যায়, সেইজন্য দিনে দুইবার করে বাংলা ক্লাশ দেওয়া আছে ক্লাশ নাইন আর টেনের রুটিনে।
স্কুলের সিনিয়ার বাংলা আপা এই কাজ ঠিকমতো করবে কিনা-এইটা নিয়ে বড়ো আপার মনে কেনো জানি একটু সন্দেহ ঢুকেছে। একেবারে কলেজ খোলার প্রথম থেকেই নাকি সন্দেহটা ঘুরঘুর করছে বড়ো আপার মনে। সেই কারণে দায়িত্বটা পড়েছে আমার ওপরে।
স্কুল সেকশনের সিনিয়ার বাংলা টিচার এই নিয়ে কী রাগ! কী মেজাজ খারাপ করাকরি! চিপেচিপে আমারে নানা মন্দ কথা বলাবলি- চালায়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই সে!
যেনো আমি সাধ করে তার ক্লাশে দখল নিতে গেছি! আরে, তোর চেতের কথা তুই গিয়া বড়ো আপারে বল গা না! আমারে চিমটাস ক্যান! তুই আছিস আজকা দশ বছর! আমার চাকরি হইছে ৯৩-এর নভেম্বরে। এইটা যাচ্ছে ১৯৯৫-এর মার্চ মাস। আমি কিনা নতুন একজন! তুমি হইলা পুরান!
এখন, আমার দাবী বেশী; না তোরটা? তুই গিয়া বড়ো আপার সাথে ফায়সালা কর গা না? আমারে জাতস ক্যান? আমারে বড়ো আপা যেই হুকুম দিবে, সেইটাই তো পালন করতে হবে, নাকি?
ওমা! দেখো তো! আমার আহাম্মকিটা দেখো!
এদিকে আজকেও আবার সেই একই উল্টা ব্যাপার করে যাচ্ছি আমি! আসল কথা রেখে, পড়ে আছি অন্য কথায়! আসল কথার খবরই নাই!
ছিহ! আমি কি কলেজের এইসব ব্যাপার-স্যাপার লেখার জন্য লেখায় হাতে দিয়েছি? নাকি মনের ভেতরে অন্য তাগিদটা ছিলো? সেই তাগিদটাই তো আসল।
আমার না শুধু লেখার ইচ্ছা- ওই একটা কথা? ওই যে, সন্ধ্যার আকাশ দেখে আমার কেমন ভালো লাগে; সেই কথাটা না শুধু লেখার ইচ্ছা আমার?
সেই কথা কোনখানে সরায়ে দিয়ে, আমি এইগুলা কী করছি! ভাজুংভুজুং আউলা সব ফালতু কথা বলছি তো বলছিই!
আসল কথা ফালায়ে দিয়ে, কী সব নাই-কথা কলমে আসে আমার! রাত এদিকে বেড়ে বেড়ে কতো বেশী হয়ে গেছে! আরো জেগে থাকতে গেলে, ঝামেলার শেষ থাকবে?
২৯ মার্চ ১৯৯৫
কেনো আমার এমন লাগে- এমন ভালো লাগে- মাগরেবের আজানের পর-পরের ওই সময়টারে? কেনো এতো ভালো লাগে!
আমি উত্তরটা বলতে পারি না।
দুনিয়া না চিল্লাচিল্লি আর গোলমালে গুমুর-গামুর করতে থাকে, মাগরেবের আজানের আগ পযর্ন্ত টাইমে? আমাদের মহল্লায় তেমনই তো থাকে।
তারপর মাগরেবের আজানটা একদিকে শেষ হয়, অমনি মহল্লার সবখানের সকল আওয়াজ ঝুপ করে থেমে যায়। একদম থেমে যায়।
তখন, কেমন যেনো স্তব্ধ হয়ে যায় আমাদের পুরাটা পাড়া। একদম যেনো থোম ধরে যায়-অন্তত মিনিট দশ বা পনেরোর জন্য।
তারপর আবার আওয়াজ ওঠে; আবার নানা গলার কলবলো, হাঙ্কি-পাঙ্কি চিল্লানি ওঠে। হয়তো মিনিট দশেকের মধ্যেই ওঠে, কিন্তু আমার আর তখন সেইদিকে খেয়াল যায় না!
ওই যে আজানের পরের, একটুখানি সময়ের, থোমধরা নীরবতা-সেইটাই কানে লেগে থাকে আমার। নতুন করে জাগনা দেয়া কলকলো, হইমই আর কানে যায় না।
কানে আর যাবে কেমনে? আমি তখন থাকি ছাদে বসা। আর, আমার চোখ তখন চেয়ে থাকে সেই কোন ওপরের দিকে! ওই যে কোন উঁচুতে আসমান! কোন উঁচুতে! সেই আসমানের দিকে চেয়ে থাকে আমার চোখেরা! চোখের সাথে সাথে আমার কানেরাও যেনো সেই আসমানের দিকেই উঁচিয়ে রাখে নিজেদের! তাইলে তারা আর দুনিয়ায় ওঠা কোনো আওয়াজ শুনতে পাবে কেমনে? পায় না।
তখন আমি আসমানে আসমানে ছড়ায়ে যেতে থাকা আবছা ফর্সা সন্ধ্যাবেলাটাকে- দেখে যেতে থাকি!
দেখতে পেতে থাকি, যেনো কেমন একটা ছাই ছাই বরণের ঢেউ ছড়ায়ে পড়তে থাকে আসমানে! হয়তো কোনোদিন পশ্চিমের আকাশ থেকে উঠে আসে সেই ছাইছাই বরণের ঢেউটা! কোনোদিন আসে পুবদিক থেকে। কোনোদিন যেনো আসতে থাকে উত্তর থেকে! আসতে থাকে ঢেউ। খুব ধীর ঢেউ! ফেকাসে ছাই বরণ ঢেউ!
এমন ফেকাসে ছাই ছাই বর্ণটাকেই তো ধূসর বর্ণ বলে? তাই না?
সেই বর্ণটার আবার এমন একটা ঝিলিকও আছে নাকি? খুব মিহি, খুব অস্পষ্ট একটা ঝলক! দেখা যায় কী যায় না, শুধু অনুমান করা যায়।
না! ঝলক কথাটা মনে হয় এইখানে খাটে না। এরেই বোধ হয় দ্যুতি বলে! দ্যুতি! সেই দ্যুতির ঢেউয়ের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে আমি বুঝে উঠতে পারি, আকাশে আকাশে সন্ধ্যা আসতে কতো দেরী হয়!
এতোগুলি বছর বয়স হয়ে গেছে আমার! এতোদিনেও; আসমানে সেই সন্ধ্যা আসার এমন ঘটনাটাই কিনা জানা হয় নাই!
দেখো, হাসিটা আসে কিনা! যেনো আসমানের সন্ধ্যা আসার হিসাব-কিতাব না জানাটা বড়ো একটা লোকসানের বিষয়! এতোদিন যে জানি নাই, তাতে কোন লোকসানটা হয়েছে? কিছুই হয় নাই!
সন্ধ্যা আসে সন্ধ্যার নিয়মে। আমরা থাকি ঘরে সংসারে, আমাদের রকমে। এই হলো মোদ্দা কথাটা!
আজকাল কিছুদিন হয়, আমি ছাদে যাই। ছাদে যাই বিকেল হতে না হতেই। থাকি বেশ অনেক ক্ষণ। তারপর আকাশে অন্ধকার ঘোরঘুট্টি হয়ে এলে, আমি ছাদ থেকে নিচে নেমে আসি।
নেমে, তেতলায় আমার থাকার যে ঘর, সোজা সেইটাতে ঢুকি। তখন কিন্তু আর আকাশে ওই সন্ধ্যার আনাগোনার ব্যাপারে কোনো আহাউহু থাকে না, আমার মনে।
ঘরে ঢুকি একদিকে, আরেকদিকে আকাশের ওই সন্ধ্যার কথাটা মাথা থেকে একেবারে নাই হয়ে যায়!
তখন অন্য কতো কাজের চাপ! ওই যে সেই কাজগুলা! শাড়ি ইস্তিরি করা, খাতা ও নোট দেখা, পড়া করা-এইসব এইসব! সেইসব কাজ নিয়ে হুড়াহুড়ি করতে করতে, সন্ধ্যার বিষয়Ñটিশয় কই যে যায়!
প্রতিদিন বিকালে, এই পাঁচটা কী সাড়ে পাঁচটার দিকে, আমার এই ছাদে যাওয়ার ব্যাপারটা শুরু হয়েছে আজকাল। এটা আগে কোনোদিনও ছিলো না! আজকে এই তিনমাস হয়, বিকালটা হতে না হতেই, কিসে জানি আমাকে ছাদে যাওয়ার জন্য ঠেলতে থাকে। ব্যাপারটা শুরু হয়েছে এই বছরের জানুয়ারি থেকে।
কোনোরকম টটর-মটর করে তোলা চারতলা-আমাদের এই বাড়ি।
আব্বার সরকারী চাকরি ছিলো। বি.কম পাশ করে ছোটো কেরানী হয়ে ঢুকতে হয় ওনারে, রোডস এন্ড হাইওয়েজ ডিপার্টমেন্ট-এ। বাপ-মা ছাড়া এতিম মানুষ ছিলো আমার আব্বা। তার নাম আবদুল আলী। তার জীবনের প্রথম দিকে, জেঠার সংসারে গিয়ে মাঝেসাঝে থাকার ঘটনা ঘটতো। যেতো, কিন্তু সেটা ঈদেÑচান্দে। বছরকার বাকি সকল দিন লজিং বাড়িতে।
সেই মানুষ বি.কম পাশ করার তাকত যে রাখতে পেরেছে, সেটা সামান্য ব্যাপার নাকি? সেটা সামান্য কোনো বিষয় না! অনেক বড়ো একটা হিম্মতের ব্যাপার!
আব্বা জীবনে কতো বার যে এই কথা আমাদের তিন ভাইবোনকে শুনিয়েছে, তার হিসাব নাই। তারপর সেই বি.কম পাশ হয়েই তো থাকে নাই আব্বা!
দিনে দিনে, একটু একটু করে, পড়ে চলেছেই আব্বা। গ্যাপ দিয়ে দিয়ে, এক পার্ট এক পার্ট করে পরীক্ষা দিয়ে দিয়ে শেষে, এম.কম পাশও হয় আব্বা!
তারপর আস্তে ধীরে সেকশন অফিসার হয়ে রিটায়ারমেন্টে যাওয়ার আগেই অসুখটা তারে ধরে। প্রস্টেট ক্যানসার।
আহারে আমার আব্বা!
তখন আমাদের বাড়ির চারতলাটা মাত্র কোনোরকমে করা শেষ হয়েছে।
তখন আম্মা গত। আব্বার এই দুই মেয়ে – হেনা রিনার লেখাপড়া, বিয়েশাদী শেষ। আব্বার যে একমাত্র ছেলে- আমাদের দুই বোনের বড়ো-আমাদের দাদাভাই; তারও চাকরিবাকরি পাওয়া শেষ তখন! বিয়েশাদীর মতো বড়ো যে বিষয়, সেইটাও তখন হয়ে গেছে দাদাভাইয়ের। দাদাভাইয়ের বিয়েশাদীরও বেশ কয়বছর হয়ে গেছে তখন! সেই আব্বার মৃত্যুর সময়ে।
আত্মীয় স্বজনেরা বলে; আব্বার মতন সার্থক জীবন অনেক কম দেখা যায়। জীবনের কোনোদিক তার অপূর্ণ থাকে নাই!
এতিম একটা সহায়-সম্বলছাড়া লোক! এতোসব করা কি মুখের কথা?
আব্বা বেঁচে থাকতে, লোকের এইসব কথা আব্বার কানেও কতো গেছে। কিন্তু এই নিয়ে আব্বার চেহারায় কোনো সুখ-অসুখের ছাপ পড়তে দেখা যায় নাই। মুখেও আব্বা কোনো কথা তোলে নাই, একটা বার।
এই বাড়ি কী আর আব্বার নিজের কেনা! কদমতলার এই আড়াই কাঠা জায়গা আমার নানার। আম্মাকে এই জায়গা সমেত আব্বার হাতে তুলে দেয় নানা, ওই কতোকাল আগে।
সেই জায়গায় এখন এই যে চারতলা দালান। আব্বা বলতো, ঘসটে ঘসটে এক ইট এক ইট করে তোলা Ñএই বাড়ি। তিন ছেলেমেয়ের জন্য তিন তলা! খালি তেতলাটা থাকলো এজমালি। বাপ-মা যতোদিন আছে, ততোদিন থাকবে তাদের জিম্মায়। পরে তিন ভাইবোন নিজেরা বুঝ মতো ঠিক করে নেবে-ওই তলাটার ভাগ।
আম্মা নেই আজকে পাঁচ বছর। আব্বাও গেছে! তার যাওয়ারও প্রায় দুইবছর হয় হয়! আব্বা মারা গেলো ১৯৯৩ সালের অক্টোবর মাসে। তার পরের মাসেই কিনা আমার চাকরি হলো এই আয়াতুন্নেছা গার্লস স্কুল এন্ড কলেজে।
কিন্তু এজমালি তেতলা এখনও এজমালিই আছে। আব্বা আম্মা থাকতে আমরা যেমন ওই ফ্লোরে থাকতাম; এখনও সেইখানেই থাকি। কোনো ভাগ করাকরির কথা মাথায় আসে নাইÑ আমাদের তিন ভাইবোনের কারোরই।
কিন্তু সেটা নিয়ে অন্য একজনের মনে অশান্তির কোনো সীমা নাই! আমার ভাবী সে। দাদাভাইয়ের স্ত্রী।
তার ইচ্ছা এই ফ্লোরটার মালিকানা থাকবে শুধু ভাইটার। বোনদের আবার এই ফ্লোরে হক কী! তারা পাইছে না, অন্য ফ্লোর? আর কতো? কিন্তু আব্বার দানপত্রে তো এমন কথা লেখা নাই! দানপত্রে লেখা আছে, এই ফ্লোরে তিন ভাই-বোনেরই আছে সমান অধিকার। এখন সেইটা নিয়েই হয়েছে যতো গ্যাঞ্জাম!
এই এজমালিটার সুবন্দোবস্ত করতে না পারার কারণে, আমার দাদাভাইয়ের বউয়ের যেনো শরীরে আগুন জ্বলছে দিবারাত্রি। মনে মনে যেনো দিনরাতই দাঁত কড়মড় করছে সে। সেই দাঁত কিড়মিড়ানিরে চোখে দেখা যায় না ঠিক, কিন্তু তুমি একটু চুপ করে শোনার চেষ্টা করো; পরিষ্কার শুনতে পাবা! সে যেনো একটা রাক্ষস। মানুষের মতো দেখতে একটা ডাইন যেনো এই মাতারিটা- এই দাদাভাইয়ের বউটা!
তার নামও আমি মুখে আনতে চাই না। লেখা তো দূর!
আচ্ছা! আচ্ছা-এটা কী হচ্ছে! আবার আমি আসল কথা থেকে কোন দূরে চলে গেছি! তোবা তোবা! এগুলা কী হচ্ছে! আমি তো তাইলে তাল-বোধ ছাড়া একজন হয়ে উঠেছি, শেষ পর্যন্ত!
বলা শুরু করেছিলাম কী, আর বলছি দেখো কী!
এটা কেমন ব্যাপাররে বাবা! কী বলতে চাই, আর বলি কী!
৩০ মার্চ ১৯৯৫
এই যে আকাশের সন্ধ্যা নিয়ে এমন ভাবনাচিন্তা মাথার ভেতরে নড়াচড়া করছে আমার, এটা এই অল্প কয়দিনের ব্যাপার। জীবনের এতোগুলি বছরের কোনো সময়েই কিন্তু আসমান আর মাটির সন্ধ্যা নিয়ে কখনো ভাবনা করি নাই আমি! ওইসব নিয়ে এমন ভাবাভাবির কোনো কারণ কোনোদিন ঘটে নাই আমার জীবনে!
বেলা আসবে বেলা যাবে, এমনটাই দুনিয়ার নিয়ম। তার মধ্যে তোমার কাজগুলা তুমি করো! খাওদাও, বেড়ান্তি-খেলান্তির বিষয় সারো। সঙ্গের লোকজনের ভালাবুরা দেখতে পারলে দেখো তুমি! তবে, যদি তোমার মনে লয়- তাইলেই দেখবা; মনে না লইলে দেখবা না! জোর নাই কোনো। কিন্তু নিজের কর্ম -কীর্তি দিয়া অপররে অশান্তি করবা না। আর, নিজেরটা বুঝবা ঠিকঠাক রকমে! ব্যস! এইই তো জীবন!
এমনটাই জেনেছি। এমনটাই করার তাগাদা পেয়েছি,আম্মার কাছ থেকে। ঘরে, আম্মা ক্ষনে ক্ষনে এই কথা বলে গেছে আমাদের তিন ভাইবোনের সামনে! কারণে অকারণে! এখন এটাকে শিক্ষা বললে শিক্ষা বলতে পারি! নাইলে সুবুদ্ধি বললে সুবুদ্ধি! আম্মা বলেছে, আমরা শুনেছি। তারপর আবার কখন যেনো সেই সুবুদ্ধি মতো নিজেদের চলা-চলতিও শুরু করে দিয়েছি! কখন যে আম্মার সেইসব কথা ফলো করা শুরু করেছি, খেয়ালও করি নাই!
আম্মার দেওয়া এই যে শিক্ষা- এই যে সুবুদ্ধি পাওয়ার বিষয়টা- এইটা কিন্তু আব্বা বরাবরই খেয়াল করেছে! খেয়াল করে করে তার মুখ-চোখ যে একদম কালো ঘুরঘুট্টি হয়ে উঠেছে-সেইটাও কিন্তু আমার নজরে এসেছে! কিন্তু কালো শীতল মুখ নিয়ে আব্বার মতন আব্বা চুপ হয়ে থেকেছে! আম্মার দেওয়া সুবুদ্ধি বিষয়ে আব্বা কখনোই আম্মাকে বা আমাদের- কোনো কথা বলে নাই। বা, নিজেও কোনো সুবুদ্ধি শিক্ষা দিতে যায় নাই।
তবে আব্বার সেই কালো হয়ে-যাওয়া মুখচোখ দেখে কেনো জানি আমার মনে হতো; জীবনে শুধু এইসব করাকরিকেই সে – আমার আব্বা- জীবনের গুরুতর কর্ম বলে মানে না! বরং এমন করে জীবন কাটানোকে যেনো তাচ্ছিল্যের চোখেই দেখে আব্বা!
চুপেচুপে কেনো জানি আমার মনে হতো- অন্য কী জানি এক বিষয় বিশ্বাস করে আব্বা! অন্য কোন এক কথা জানি লুকানো আছে, তার মনে! আব্বা আমাদের বলে না, কিন্তু কী জানি একটা বিষয় আমি আব্বার ভেতরে নড়েচড়ে যেতে দেখি। বিষয়টারে নিজের ভিতরে একলা ক্যান নাড়েচাড়ে আব্বা? আমাদের বলে না ক্যান কিছু?
এমন কতোসব কথা মনে এসেছে আমার তখন! কিন্তু আব্বাকে কিছু বলতে সাহস হয় নাই!
সংসারে চলতে গিয়ে, আম্মার কোনো কথার উপরে, কোনো একটা কথাও বলে নাই আব্বা। কোনোদিন বলে নাই। আম্মারে ডিঙ্গায়ে কোনোদিনও আমাদের কোনো কিছু শিক্ষা দিতে যায় নাই। সংসারে আম্মার হুকুম মতো যেমনে যা চলছে, তেমনেই সেইটা চলতে দিয়েছে। কেমন একরকম আলগোছে থেকে গেছে আব্বা, এই বাড়িতে আর বাড়ির এই সকল কিছুর মধ্যে!
আম্মা গত হওয়ার পরেও তো অনেক কয়টা বছর দুনিয়াতে ছিলো আব্বা! তখনও কিন্তু সেই আম্মা থাকাকালীন টাইমের মতোই চুপচাপই থেকে গেছে! কেমন একলা একজন হয়েই এইখানে বসত করে গেছে আমার আব্বা। কোনো একটা কিছু নিয়ে, কোনো একটা তেজী আওয়াজও কিন্তু তারে দিতে দেখা যায় নাই।
কিন্তু তাঁর অসুখ যখন খুব বাড়াবাড়ির দিকে যায়, সেই ১৯৯৩ সালের মে-জুন মাসের দিকে; তখন, হঠাৎ এক সকালে আমাদের তিন ভাইবোনকে খুব ডাকাডাকি শুরু করে আব্বা।
আব্বার শরীর তখন একেবারে কাহিল অবস্থায় চলে গেছে।
পেশাব-পায়খানা সারার জন্য তখন, একবার যদি কোনোমতে তাকে ধরে মেঝেতে বসানো যায়, তো বসানো গেলো। কিন্তু তার পরের বারই আর তার শরীরটা আর নড়তে চায় না তখন! একটু কোনোরকম উঠে বসারও কোনো শক্তি পায় না! পুরা লম্বা, ঠান্ডা একটা কাঠ হয়ে যায় যেনো আব্বার শরীর। একটা আঙুল পর্যন্ত আর নড়াতে পারে না তখন আব্বা!
তখন বোঝা যাচ্ছিলো, এইবার পুরা বিছনায় পড়ার সময় এসে পড়েছে আব্বার। পোশাব-পায়খানা সব কিছু – বিছানায় সারার সেই কষ্টের দিন- আসতে আর দেরি নাই!
কপাল ভালো, সেই সময় আমার চাকরি-বাকরি কিচ্ছু হয় নাই। আসল কথা হলো, কোনো একটা কিছুই জোটাতে পারি নাই আমি ওই সময়। সেই কারণে একদম ঘরে বসা তখন আমি।
তাতে সুবিধাই বরং হয় অনেক। আমি সর্বক্ষণ থাকতে পারি বলেই, আব্বার দেখাশোনা নিয়ে বাড়িতে চিন্তা করার কোনো পরিস্থিতি আসে নাই।
রিনা শ্বশুরবাড়িতে। ওর জামাই ইটালীতে থাকে, কিন্তু ওরে সকল সময়ই শ্ব্শুরবাড়ি আগলানি দিয়ে রাখতে হয়। ওই বাড়ির মুরুব্বিদের পারমিশন নিয়েটিয়ে তবে, নিজের বাপের বাড়িতে, আসতে হয় ওরে। আসে, যেনো মেহমান। শেষে চলেও যেতে হয় ওরে জলদি জলদি! যেনো চোখটা না ফিরাতে ফিরাতেই ওর ফিরে যাওয়ার টাইমটা এসে হাজির! এমনে কেমনে আব্বারে দেখবে রিনা!
আব্বাকে সেবা করার উপায় ছিলোই না ওর।
দাদাভাইয়ের তো সকাল থেকেই কোর্টকাচারির কাজ শুরু হয়ে যায়। ফিরতে ফিরতে রাত দশটা এগারোটা। ও কেমনে আব্বারে সামলানিটা দেয়! ভাবী আছে বাড়িতে। কিন্তু তার জমজ দুই ছেলে। তার উপরে রান্না-বাড়ার কতো ঝামেলা! সে কোনোকিছু করারই ফাঁক পায় না।
তো, কথা তো এই নিয়ে না। কথা হলো, সেই ১৯৯৩ সালের মে না জুন মাসের শুরুর দিকে, বিছানায়-পড়া আব্বা আমাদের কেনো ডাকলো, সেটা! সেই কথাটা বলা রেখে, আমি কেনো এমন বেহুদা অন্য অন্য কথা বলছি!
কেনো মূল কথাতে সরাসরি যেতে পারি না আমি? ইস!
সকাল বেলা। বিছানায় একেবারে নেতায়ে-পড়া আব্বার মুখে তখন আমি বেদানার রস দিতে গেছি, আব্বা কোনোরকমে চোখ নেড়ে আমাকে রস দিতে নিষেধ করে।
কেনো কেনো! তিতা লাগে নাকি!
না, তিতা লাগে না। আমাকে আব্বা কিছু বলতে চায়।
কি আব্বা? কি?
না, আমাদের তিন ভাইবোনেরে নাকি তার একটা গোপন কথা বলার আছে।
গোপন কথা! আব্বা আমাদের গোপন কথা বলতে চায়! আব্বার গোপন কথা আছে?
আমি থতমত মুখ নিয়ে দাদাভাইরে ডাকি। জানি এইটা ওর হুড়াহুড়ির টাইম, তাও ডাকি।
দাদাভাই আব্বার ওই গোপন কথা বলার বিষয়টা শোনে। এবং কী আশ্চর্য বিষয়টা সে হালকাভাবে নেয় না।
তারপর সেই সকালেই নিজের মুহুরিকে সে পাঠায় রিনার শ্বশুরবাড়ি ধলপুরে। টেলিফোনে ওরে আসতে বলা যেতো, কিন্তু ঠেকাটা কতো গুরুতর- সেইটা তাহলে রিনা নিজের শাশুড়ীরে- বোঝাতে পারতো না কোনোমতেই।
“আমার সয়সম্পত্তি যেট্টুক যেইখানে আছিল, তোমাদের সমবণ্টন করছি আব্বায়! কোনো ফাঁকফোকড় রাখি নাই তগো লেইগা!” আব্বা বলে।
‘আব্বা, সম্পত্তি নিয়া ক্যান চিন্তা করতাছেন, আব্বা! আল্লা আপনেরে সারায়া দেউক! তাইলেই শোকর!’ দাদাভাইয়ে আব্বার ডান হাতের পাতাটা চেপে ধরে। ‘থাউক এখন এইসব কথা, আব্বা!’
“সব দিছি, কিন্তু আসল আমানতখানাই তোমাগো দিতে ভুলছি! এটা না দিয়া থুইয়া তো আমার যাওয়ার উপায় নাই!” আব্বা দাদাভাইয়ের কথা যেনো শুনতে পায় না! “এই আমানত আমারে দিয়া গেছেন আমার দাদা। নেয়ামত মোল্লা সাহেবে!”
কি হতে পারে সেই আমানত? আমাদের এতোখানি জীবনে, কই, কখনো তো এমন কোনো আমানতের কথা বাড়িতে বলাবলি হতে শুনি নাই!
এমন ভাবনায় আমরা তিন ভাইবোনই কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে যাই বলে, আব্বার কথার কোনো উত্তর দিতে পারি না।
আব্বা কী আর আমাদের উত্তরের বা কোনো প্রশ্নের অপেক্ষা করছে! কথা বলে চলছে নিজের খেয়ালে, আর কেমন জ্বলজ্বলে চোখে তাকাচ্ছে আমাদের তিনজনের দিকে।
“সেই বিষয়রে আমানতও বলতে পারো, আমলও বলতে পারো! মোরাকাবা করার আমল। আমার দাদা আমারে মোরাকাবা আমল করার হুকুম দিয়া গেছিলেন! সেই আমলের আমানত এখন তোমাদের তিনজনেরে দিয়া যাইতাছি, আব্বায়!”
মোরাকাবা! এটা কি?
এমন কথা আমি কোনোদিন শুনি নাই! এর কি মানে হতে পারে? আমল মানে তো জানি। কিন্তু মোরাকাবা কি? সেইটা আবার আমানত হয় কেমন করে?
আমার মাথা আরো আউলা করে দিয়ে দাদাভাই আব্বাকে বলে, ‘আব্বা! পরদাদার দেওয়া সেই আমানত আমরা মাথায় তুইল্লা নিব! আপনে দেন! কেমনে আমল করবো, তার নিয়ম দেন!’
সেই আমল আব্বা ধীরে ধীরে, কতো না সময় নিয়ে, আমাদের তিনজনকে বলতে থাকে। কতো না দম আটকে আটকে যেতে থাকে আব্বার! তাও আব্বা একটুও থামে না। একটুও জিরানোর চিন্তা করে না! খালি বলে যেতে থাকে।
সেইসব কথা লিখে নেওয়ার জন্য আমার ছটফট লাগতে থাকে। অনেক ছটফট করতে থাকে আমার অন্তরটা! লেখা তো দরকার! নাইলে- নাইলে- কেমন করে পরে আবার মনে করবো! কিছুই তো মনে থাকবে না!
‘এতো লাফাস ক্যান?’ দাদাভাই আমারে থামায় বারেবার। ‘সব রেকর্ড করা হইছে। সব ঠিকমতো নেওয়া হইছে। অসুবিধা নাই!’
তারপর সেই বছরের অক্টোবর মাসের ৩১ তারিখেই তো আব্বা মারা গেলো। ১৯৯৩ সালে।
৩১ মার্চ ১৯৯৫
অন্য অন্য মানুষদের বাবারা তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য কতো কিছু রেখে যায়! নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যেই তো কতো দেখলাম! বাপ-মা মারা গেছে; কিন্তু তাদের পোলাপানেরা দুঃখ করবে কী! বাপ মায়ের রেখে যাওয়া সয়সম্পত্তি, সোনাদানা, টাকা, হাড়িপাতিল -ভাগ করে করেই কূল পায় না! সয়-সম্পদের ভাগ পেতে পেতে একেবারে বেদিশা হয়ে যেতে থাকে একেক জন! এতো থাকে একেকজনের ভাগে।
আমাদের মায়ের কথা নাই বললাম। সে নিজের বাবার কাছ থেকে নিয়ে এসেছিলো এই ঢাকা শহরের কদমতলার আড়াই কাঠা জায়গা। সেইটা সে রেখে গেছে। তার সোনা-দানার খবর একেবারে যে পাই নাই, সেইটা না। সোনাদানার খবরও পরিষ্কার করেই জানা আছে!
বিবাহের সময় রিনারে সোনাগয়না বেশী দিতে হয়েছে। কারণ সেই মেয়েরে আম্মা বিয়ে দিয়েছে উঁচু বংশে। এতো বড়ো ঘরের সম্বন্ধ! সেইখানে তো হালকা-পাতলা সোনার জিনিস দিলে মুখ থাকে না!
দাদাভাই আম্মার একমাত্র ছেলে। আর, তার বউ করে যারে আনা হয়েছে; সে আম্মার আপন বড়ো বোনের একমাত্র মেয়ে। তারে উচিত সমাদর না করলে আম্মা বাঁচবে? বাঁচবে না!
উচিত সমাদর কেমনে করা যায়? নয়া বউয়ের সর্ব অঙ্গে সোনার জেওর পিন্ধাও! তবেই না বোঝা যাবে উচিত সমাদর করলা, নাকি করলা না! আম্মা তার পোলার বউ হয়ে আসা বোনঝিরেও, অতি সমাদর করেছে।
আমি নানামতে আম্মার কলজায় দাগ দিয়েছি! সেই কষ্ট ভুলতে পারে নাই আম্মা! তো, সেই আমার কথা মনে রাখতে আম্মা কোনো ঠেকা পড়ে নাই!
এই গেলো আম্মার বিষয়।
আব্বা কি রেখে গেছে? রেখে গেছে ধার-কর্জ করে তোলা এই বাড়িখানারে! রেখে গেছে, এই যে কোনোরকমে চারতলা হয়ে ওঠা বাড়িটারে! আর কিছু না!
প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা? সব গেছে তার চিকিৎসার জন্য। একটা টাকাও রেখে যেতে পারে নাই, আব্বা!
সেটা নিয়ে দাদাভাই প্রায় প্রায়ই বেজার হয়, জিদ্দাজিদ্দি করে। করে আমার সাথে। ওর হাতের কাছে এই এক বোনেই আছে কিনা! আরেক বোনেও যখন ফুরসত পায়, আমারেই ঝামটা দেয়।
“পরের বাড়িতে মুখ উঁচা কইরা কথা কওনের কোনো রাস্তা থুইয়া গেছে, বাপ মায়? লাখ টেকার আশা করি না! দশ-বিশ হাজার টেকাও তো দিয়া যায় মাইনষে, পোলাপাইনের হাতে! ইছ ইছ ইছ! দুই এক হাজার টেকা তরি হাতে ধরাইয়া দিয়া যায় নাই! এমুন কাঠুইরা এমুন কশাই বাপ মায়ের খুরে নমস্কার!”
রিনা যখন-তখন রাগে চকবকাতে থাকে। আর আমার দিকে ঘিন-ভরা চোখে তাকাতে থাকে! যেনো সমস্ত কিছুর জন্য আমি দায়ী!
আমি আর কী বলবো! কি বলে কোনটারে আবার আরো কষ্ট দেবো?
বাপ-মা ছাড়া এই তো আমরা তিন এতিম ভাইবোন! দাদাভাই বড়ো, তারপরে আমি, তারপরে আরেক বোন। আমি চুপ মুখে ওদের দুইজনের রাগ খোঁটা হজম করি। হজম করতে ভালো লাগে না। উল্টা আমারও মুখ খুলে যেতে চায়।
দুই চারটা উচিত কথা বলে দিতে মুখ খুলিখুলি করতে থাকে। গরগরায়ে কতো সব কঠিন কথা- আমার মুখ দিয়েও বেরিয়ে আসতে চাইতে থাকে! আল্লা! আমারও কী না-বুঝ হলে চলবে! এমন অবস্থায় আমি করি কী- ঝুপ করে নিজের চোখ দুইটা বন্ধ করে ফেলি। যাহ দুনিয়া! তরে আমি অখন কতোক্ষণ একদম দেখমু না!
এমনটা করলে মাথা ঠা-া হয়ে যায় আমার।
মাথা ঠা-া হওয়া মাত্রই অন্য একটা কথা ধুম করে মনে পড়ে। আরে, আব্বা তো শুধু এই দালানখানাই খাড়া করে রেখে যায় নাই! আরো একটা জিনিসও তো আমাদের তিন ভাইবোনের হাতে সোপর্দ করে গেছে!
মোরাকাবার আমানতখানা আব্বায় দিয়ে গেছে না? তিনজনরেই দিয়ে গেছে না? বলে গেছে না, নিত্য মোরাকাবা আমল করতে?
এমন আমার দুই ভাইবোন দেখি একবারও সেইটার কথা মনে আনে না!
১লা এপ্রিল ১৯৯৫
আমার কিন্তু আজকাল একটা কথা খুব বিশ্বাস হয়। বিশ্বাস হয় যে, এই যে আকাশের সন্ধ্যা দেখে আজকাল আমার এমন মন উতলা লাগে; এর সঙ্গে ওই মোরাকাবা করার একটা সম্পর্ক আছে! ভাইবোনদের কোনো জনকে এই বিষয়ে আমি কিছু বলি নাই, কিন্তু নিজের মনের একটা বুঝ আছে তো!
সেই বুঝ আমারে বলছে, এই দুইয়ের একটা কিছু সম্পর্ক থাকলে থাকতেও পারে!
কই, আগেও তো কতো সন্ধ্যার দিকে তাকায়েছি! কম-বেশি তাকাই নাই কি বিকাল বা সন্ধ্যার দিকে? তাকিয়েছি! কিন্তু সেইসব সন্ধ্যাকে তো কোনোদিন চোখে পড়ে নাই! এখন এমন গভীর রকমে কেমনে চোখে পড়ছে?
আমি এখন মোরাকাবা করছি, আজকে অল্প কয় মাস হয়।
আব্বা বলার পরপরই তো শুরু করি নাইই, আব্বা যাবার পরেও তো কতোগুলা বছর গেলো! সেই ১৯৯৩ থেকে এই ১৯৯৪-এর ডিসেম্বর পযর্ন্ত সময়! এতোখানি টাইমে মোটেও তো মোরাকাবার নাম মনে আনি নাই। করা তো দূর!
অথচ আব্বা এই মোরাকাবার বিষয়ে কতো না গুপ্তকথা আমারে বলে গিয়েছিলো! শুধু আমারেই বলে গিয়েছিলো! অথচ সব জেনেও আমি আব্বার আদেশটা পালনে গাফিলতি করেছি! আমি মোরাকাবা করার দিকে যাইই নাই প্রথমে।
আমি করি নাই। সেটা এজন্য না যে, আব্বার কথার কোনো গুরুত্ব আমার কাছে নাই! না না! আব্বার কথার অনেক অনেক গুরুত্ব আছে। অনেক গুরুত্ব!
তাও যে আমি আব্বার কথামতো মোরাকাবার কাজটা করা শুরু করি নাই, তার পেছনে কঠিন কারণ আছে!
আব্বা মারা যাওয়ার পর থেকেই আমি আর আমি নাই! আমি হয়ে গেছি তুফানে আছড়ানী খেতে থাকা একটা গাছ! কাহিলের কাহিল, মরমর এক গাছ! আহ! আমার ওপর দিয়ে ভয়ানক বজ্জাত -কী এক তুফান যে যাচ্ছে।
না না! ভুল বললাম! আব্বা মারা যাওয়ার পর থেকে ঝড় এসেছে- এই কথা বলি কেনো? সেই তুফান তো শুরু হয়েছে আব্বা থাকার কাল থেকেই। আম্মা জীবিত থাকতেই তো তুফানের দিন এসে হাজির হইছে আমার দুনিয়ায়! তারপর তুফান চলছে চলছে চলছে! থামাথামি নাই!
শেষে আব্বার যখন শেষ সময় উপস্থিত-তখন দেখা যায়- সেই তুফান কিনা আরো ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়া হাজির হয়েছে! খোদা! কেমনে সহ্য করেছিলাম সেই আন্ধা-তুফানের ঝাপট! কেমনে? আমি বলতে পারি না!
সেই ঝড় কি শেষ হয়ে গেছে? এখন যখন আমি দুনিয়াতে পিতৃ-মাতৃহীন, একার একা! তখনও কি ঝড়মুক্ত আমি? না না! তুফান আছে তুফানের মতোই! এখনও চলছে ঝড়। তবে তার ধরনটা অবিকল আগের মতো নাই! বদলে গেছে! কতো রকমের ঝড়-তুফান না পাওয়া হলো! এই এন্দি-সেন্দি, তুচ্ছর অধিক তুচ্ছ মহিলাটারে-কতো ঝড়-তুফানে না ভালোবাসা দিলো!
আমি কেমনে সেই সবেরে সামলানি দিচ্ছি? কেমন করে? আমি বুঝি না। বুঝতে পারি না।
সেই ঝড়কে সামাল দিতে দিতে একেকবার মনে হয়, আর পারবো না! এইবার আমি শেষ! এইবার হয় আমারে যেইদিকে দুইচোখ যায়, চলে যেতে হবে! নাইলে নিজেরে শেষ করে দিতে হবে!
সেই সময় দাদাভাই কেমন করে কী বোঝে, আমি আন্দাজ করতে পারি না। কিন্তু দেখি, ও চুপ করে আমার পাশে এসে দাঁড়ায়ে থাকে। হালকা একটু সময়ই তো থাকে; কিন্তু থাকে তো!
আলগোছে অল্প-স্বল্প বুঝটা দেয়। সাহসটা দেয়। আমার তখন ভয়টা কেটে যায়। মনের ভেতরে শক্তিটা পাই। সহ্য করার শক্তি।
তবে সত্য বলছি, সেইসব ঝড়তুফানের কথা মুখে আনতে আমার কঠিন ঘৃণা হয় আজকাল! সেইসব এখন আমি আর মুখে বলতে চাই না। এখন খালি ঢেকে রাখতে চাই। একদম ঢেকে রাখতে চাই।
ভালো লাগে না বলতে। ভালো লাগে না ওইদিকে তাকাতে! আছে তুফান, থাক। আমি অন্যদিকে তাকায়ে থাকবো। অন্যদিকে চেয়ে থেকে থেকে দিন পার করে দেবো।
ওই ঝড়ের থাবড়াগুলা ঢাকা থাক! ঢাকা থাকুক ওইসব থেতলানীর দাগ। ওইদিকে না তাকাই বরং আমি!
আমি বরং অন্য কথা মনে করি।
অন্য কোন কথা? ওই যে- সেই মোরাকাবার কথা!
আব্বা তো আমাদের তিন ভাইবোনকে-তার নিজের কাছে বসায়ে মোরাকাবার বিধি-নিয়ম জানানো-বোঝানো শেষ করলো সেইদিন। তারপর আমি ভাবলাম, আমরা তিনজনে বুঝি ওইটা নিয়ে কথা বলতে বসবো।
কিন্তু দেখি যে কিসের কী! কথা বলা শেষ করে আব্বা তার কাহিল চোখদুটা একটু বন্ধ করেও সারে না; দাদাভাই ছোটা শুরু করে তার কোর্ট কাচারির দিকে। আর রিনা যায় রিক্সা ধরতে।
ওমা! আমি তো ভেবেছিলাম দাদাভাইয়ে কিছু না করুক, আমরা দুই বোনে অন্তত এটা নিয়ে একটু কথা বলবো। নাইলে, অন্তত আব্বার ঘরের এক কোণে বসে প্রথম মোরাকাবাটা করার একটু চেষ্টাটা করবো!
আমি ছুট পায়ে গিয়ে রিনাকে ধরি।
‘কি রে? যাস গা যে? তুই আট্টু থাকলে মোরাকাবা করোনের ট্রাইটা করতাম!’ আমি বলি।
“কি আজাইরা কতা যে কস না তুই, আপা!” রিনা আমাকে কড়া একটা ঝাপটা দেয়; “কিয়ের মোরাকাবা? আগে, ভালা থাকতে, আব্বারে কোনোদিন দেখছস এইটা করতে? আমি তো দেখি নাই! শরীর তার ছাইড়া দিছে, বোজতাছস না? কানের লতি দুইটা নেতাইয়া শেষ! আধা মউতা মানুষের কথারে অখন গোণায় ধরোস তুই? এইটা না বিকারের কথা? বোঝস না?”
এইসব কথা বলতে বলতে রিনা তিনতলা থেকে নামতে থাকে। সিঁড়িতে ওর স্যান্ডেলের আওয়াজ উঠতে থাকে ঠাক্কুস ঠুক্কুস ঠাক্কুস ঠুক্কুস! আমি কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে ওর নেমে যাওয়া দেখতে থাকি।
আর কী করতে পারি আমি! ওরা যদি আব্বার ওই কথারে হালকা করে উড়ায়ে দেয়, যদি গোনায় না ধরতে চায়, আমি কেমনে কারে বোঝাবো? সকলেই তো বড়ো হয়ে-যাওয়া; সংসারী মানুষ।
আমার মনে কিন্তু মোরাকাবার কথাটা নানাভাবে নড়ে চড়ে, ওঠানামা করে।
এটা কি আসলেই হতে পারে, আব্বারে বিকারে পেয়ে গেছে? শেষ অবস্থার বিকার? শেষ অবস্থা এসে গেছে তার? সেই কারণে- কী বলতে কী বলে ফেলেছে আব্বা!
কিন্তু কই, দিনক্ষণের হিসাব পর্যন্ত তো দেখি আব্বার এখনও একদম পরিষ্কার! কথাও তো একদম স্পষ্ট! কোনোরকম উল্টা-পাল্টা কথা তো বলতে শুনি না আব্বারে! কথা যা বলে আব্বা, সেটা ফিসফাস শোনায়। কিন্তু সেটা তো শরীর একেবারে কাহিল বলেই এমন শোনায়। আর তো কিছু না!
না না, দাদাভাইয়ে যতোই কিনা উপেক্ষা করুক ওই বিষয়টা-রিনা যতোই কিনা উড়ায়ে দিক আব্বার কথাটা-আমি ওটা উড়ায়ে দেবো না। আব্বার কথাটারে আমি গোনায় ধরবো। ওটারে কেনো জানি বিশ্বাস করতে মন চাচ্ছে আমার! বিশ্বাস করতে মন চাচ্ছে!
মনে হতে থাকে, ওইসব কথা বেহুদা কারণে বলে নাই আব্বা!
আমি জানি, আব্বা বেহুদা কথা বলার লোক না! কোনোদিন কেউ তারে দেখেছে বেহুদা কথা বলতে? দেখে নাই! তাইলে আমি কেনো বিশ্বাস করবো না? আমি বিশ্বাস করলামই করলাম কথাটারে।
মনে মনে নিজের কাছে নিজের বুঝ স্পষ্ট করি আমি। আর, নিয়ম ধরে আব্বার যতন করতে থাকি।
যতন করতে করতে টের পেতে থাকি, আব্বার শরীর যতো নাজুক হয়ে যাচ্ছে; তার বুদ্ধি যেনো ততো তাজা ততো জ্যান্ত হয়ে উঠছে!
১৯৯৩ সালের অক্টোবরের ২৬ তারিখ পর্যন্ত, আব্বার চেতনা ছিলো একদম টনটনে। যদিও জুলাই-আগস্ট মাস থেকেই আব্বার কথাগুলা হয়ে উঠেছিলো একেবারে গোঙানীর মতো। কিন্তু বুঝ-জ্ঞান তো ছিলো পরিষ্কার। সব বুঝতো।
আবার ওদিকে গোঙায়ে গোঙায়ে সব কিছু বোঝাতেও পারতো আব্বা তখন! ১৯৯৩ সালের সেই জুলাই বা আগস্ট থেকে একেবারে অক্টোবরের ২৬ তারিখ পর্যন্ত- এমনই তো চলছিলো।
সব মনে আছে আমার! আব্বার এই শেষ সময়ের সকল দিনক্ষণরে আমার অতি স্পষ্ট রকমে মনে আছে! আমার হাতের ওপরেই তো ছিলো আমার বাপটায়, জীবনের শেষ বছরটা! এমন কাছের করে তো আব্বারে জীবনেও পাই নাই! সেই শেষসময়েই একটু শুধু পেয়েছিলাম!
সেই কথা মনে করে করে কতো যে কান্না আসে আমার! তবে সাথে সাথে এও মনে আসে, আমার ভাগ্যটা কতো ভালো! কেমন সু-কপাল আমার! আব্বাকে সেবা দেবার কিসমতটা পেয়েছিলাম আমি!
মনে আছে, অক্টোবরের ২৬-এর পরে আচমকাই আব্বার জবান বন্ধ হয়ে গেলো। অক্টোবরের ৩১ তারিখে, সেই ১৯৯৩ সালে, একেবারে চলে যাবার আগ পর্যন্ত টাইমেও; সেই জবান আর খোলে নাই।
সেই যে মে না জুন মাসে, তিনজনকে সেই গুপ্ত কথা শোনালো আব্বা; তারপর থেকে একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে চলতে দেখি আমি। তারপর থেকে হয় কী-আব্বা যেনো একা আমাকে মোরাকাবার বিধিরীতিগুলা শিখায়ে দেবার জন্য মরিয়া ওঠে! দাদাভাই আর রিনার কথা যেনো আর আব্বার মনেও থাকে না! খালি আমাকে মনে থাকে। আর, বিধি-বিধানগুলো নানামতে আমাকেই শিখাতে থাকে!
যতো কিনা আমি আব্বার যতন-যাতন করা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হতে থাকি, আব্বা ততো আমাকে দোহাই দিতে থাকে। একেবারে বিছানায়-পড়া, সেই অচল মানুষটা অস্থির-ব্যস্তির হয়ে পড়ে আমাকে নিয়ে!
খালি বলতে থাকে, “শোনো গো ঝি! মোরাকাবার নিয়মগুলা মোখে মোখে বলি তোমারে, আব্বায়! শোন তুই, মন দিয়া!”
আমি কোনো উত্তর করি না! বলুক, যা বলতে মন চাচ্ছে তার! অসুইক্ষা মানুষটা! বলে বলে ক্লান্তি আসলে,আপনা থেকেই থেমে যাবে নে! কিন্তু আব্বাকে আমি ক্লান্ত হতে দেখি না!
আবার আমাকে ডাকতে থাকে আব্বা! আবার। “আসো গো মা! মোখে মোখে তরে মোরকাবার বিধান-নিয়মগুলা শিখায়া রেখে যাই! নাইলে আব্বায় মইরাও কিন্তু শান্তি পাব না!”
‘রেকর্ড করা আছে আব্বা! আমি শিইক্ষা লমু নে! ফাঁক মোতন শিইক্ষা নিমু আব্বা! ক্যান চিন্তা করেন আপনে?’ আমি গলা নরম করে আব্বাকে বুঝ দিতে থাকি!
কিন্তু আব্বা সেই বুঝকে গ্রাহ্যই করে না।
উল্টো আমাকে ফ্যাসর-ফ্যাসর গলায় বিধির পরে বিধি শোনাতে থাকে শোনাতে থাকে শোনাতে থাকে। তখন সারাদিনে সেইসব বিধিরীতি কতো শত বারই না শোনা হয়ে যায়! রাতে আব্বার চোখে ঘুম আসে না যেনো! সেইসব বিধান শোনাতেই থাকে আব্বা! যতোক্ষণ গলায় কুলায়, বলেই চলে! কাহিল লাগলে থামে! গরম একটু পানি খায়। খানিকক্ষণ চুপ থাকে। আচমকাই ঘুমায়ে যায়! আমি ভাবি, যাক তবে এইবার আব্বার গলাটা একটু জিরানী পাবে! আমিও তবে এইবার একটু ক্যাঁৎ হতে যাই!
ওমা! যেই না রাত একটু ঘন হয়, আশপাশ সুমসাম হয়ে সারেও না; আব্বার তীব্র গোঙানী শোনা যেতে থাকে! চটক দিয়ে আমার কাচা ঘুমটা ভেঙে যায়!
ওরে মা! আব্বায় ডাকে ক্যান! আমি ছুটে আসি তার বিছানার পাশে! আব্বা আবার শোনানো শুরু করে মোরাকাবার বিধি-নিয়ম!
শুনতে শুনতে কখনো কখনো আমার খুব বেদিশা লাগতে থাকে! আহ! এই তো আব্বার এমন অসুখে-কাতর, ফ্যাসফ্যাসে গলা! সেই গলারে এমন জুলুম করছে ক্যান আব্বায়!
‘কেনো আপনে আগে থাকতে এই গুরুতর বিষয়টা আমারে শিক্ষা দেন নাই আব্বা?’ রাগে-দুঃখে আমার গলা একটু উঁচু যেনো হয়ে যায় একদিন! আমার কথাটা শুনে আব্বাকে একেবারে নিথর হয়ে যেতে দেখি আমি তখন! কী ব্যাপার! এমন তবদা হয়ে গেলো কেনো আব্বায়! চেয়ে দেখি আব্বার দুই চোখ থেকে দরদরিয়ে নেমে আসছে পানি! অনেক তেজী সেই চোখের জলের ধারা!
‘হায় হায়! কারে আমি কষ্ট দেই! কারে! এমন অসুখে-পড়া মানুষটারে কেমনে ব্যথা দেই আমি!’ আফসোসে তছনছ হয়ে যেতে থাকে আমার ভিতরটা! ‘না না! আর তো আমি আব্বার অইসব কথা শুনে বিরক্ত হবো না! তারে কষ্ট দেওয়ার মতোন পাপকর্ম -আর তো করবো না!’
তারপর থেকে আমি আব্বার বলা সকল কথা মন দিয়ে শুনে যেতে থাকি! শুনেই যেতে থাকি। শুনতে থাকি মোরাকাবার বিধিবিধান পালনের কথা!
১৯৯৩ সালের সেই জুলাই না আগস্ট মাস পর্যন্ত আব্বা ফ্যাসফ্যাসা গলায় আমারে মোরাকাবার বিধিরীতি বারেবারে শোনায়ে গেছে। তারপর তো তার কথা হয়ে যায় পুরা যেনো গোঙানীর মতো।
আশ্চর্যের বিষয়! সেই সময়েও কিন্তু, থেকে থেকে, মোরাকাবার বিধি নিয়মই বলতে বলতে গোঙাতে শুনেছি আমি আব্বারে!
সেই যে পুরা গোঙানীর মতো হয়ে যায় আব্বার কথা, যখন আর পরিষ্কার করে একটা শব্দও বলতে পারছিলো না আব্বা; সেই সময় একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটতে দেখি আমি! ভীষণ তাজ্জবের একটা ব্যাপার! ভাইবোনদের কোনোজনেরই ভাগ্য হয় নাই- সেই অবিশ্বাস্য ঘটনাটাকে দেখার!
আমি একা সেই ঘটনার সাক্ষী! একা আমি! সেইটা ঘটেছিলো আব্বার অসুখের সময়ের একেবারে শেষদিকে!
আচ্ছা! সেইটার কথা বরং পরে বলি!
এখন আগে অন্য কথা বলি। সেই যে প্রথমদিন আব্বা তার তিন সন্তানকে মোরাকাবা আমল করার আদেশটা দিলো, তারপরের ঘটনার কথা বলি!
২ এপ্রিল ১৯৯৫
তো, সেই তো প্রথম বার আমাদের তিন ভাইবোনকে মোরাকাবা আমল করার হুকুমটা দেয় আব্বা! দাদাভাই আর রিনা সেই হুকুম শুনে নিজের নিজের কর্মেও চলে যায়!
আব্বা কিন্তু আর ওদের ওই বিষয়ে কিচ্ছু বলে না! ওদের কাছে মোরাকাবা বিষয়ে একটা কোনো হালকা কথাও তারপর আর তোলে না! একবারও তোলে না!
কিন্তু এদিকে কিনা আমাকে আব্বা মোরাকাবার কথাটা এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে দেয় না! সেই কথা তো আগেই লিখে উঠলাম! এখন বরং লিখি, অইসব বিধিবিধান শুনতে শুনতে আমার কী হলো- সেই কথা!
আব্বা আমাকে মোরাকাবার বিধিবিধান শোনাতে থাকে।
আমি সেইসব কথা শুনতে শুনতে কখনো আব্বার মুখে জাউ তুলে দিতে থাকি। শুনতে শুনতে আব্বার পেশাবে জবজবা কাঁথা সরাতে থাকি। তার লুঙ্গি বদলাতে থাকি। শুনতে থাকি শুনতে থাকি!
তারপর কেমন করে যে কী হয়, আমি বুঝি না! আমি দেখি কী, শুনতে শুনতে শুনতে মোরাকাবার বিধিনিয়মবিধানগুলা আমার একেবারে মুখস্থ হয়ে গেছে!
কেমনে হলো এটা!
আব্বার কথা শুনে যেতে যেতেই একসময় বুঝে ফেলতে পারি আমি, মোরাকাবা বিষয়টা আদতে কী!
‘তুমি তোমার বাংলায় এরে ধ্যান কইতে পারো!’ আব্বা আমারে বলে।
দেখো! এমন অসুস্থ অবস্থায়ও আব্বা আমারে তুমি বলা ভোলে নাই!
একটা বিষয় আমি চিরদিনই খেয়াল করে এসেছি যে, আমার লেখাপড়া বিষয়ে যখনই আব্বা কথা বলতে গেছে, তখনই কেনো জানি আমারে আর তুই করে বলে নাই আব্বা। কোনো সময়ই তুই করে বলে নাই! যেনো ওই সময় তুই বলতে তার মুখে আটকেছে! তখন তুমি ছাড়া কোনো রাও নাই! অন্য সকল সময় তো কেবল তুই-শুধু তুই!
কেনো আমার লেখাপড়ার ব্যাপারে কথা বলার সময়ে সবর্নাম নিয়ে এই সমস্যাটা হতো আব্বার? চিরদিনই এমনটা কেনো হতো?
এইটা আব্বারে জিজ্ঞেস করতে শরম পেতাম আমি! তাই জিজ্ঞেস করা হয় নাই কোনোদিন!
কতো কথাই তো জিজ্ঞেস করা হয় নাই! কতো কথা জানার ইচ্ছা হতো! কতো কথা জিজ্ঞাসা করি করি অবস্থায় চলে আসতো, একেবারে জিব্বার আগায় চলে আসতো বারেবার, জীবন ভরেই! কিন্তু কী এক অজান্তি শরমে আর মুখ ফুটে বলা হয় নাই কোনোদিন, সেইসব কথা!
এই যেমন আমাদের দুই বোনের নাম নিয়ে কতো কিছু না মনে এসেছে আমার! প্রথম প্রথম এই আমাদের দুই বোনের নাম রাখার বিষয়টা নিয়ে কতো না আশ্চর্য লাগতো! আমাদের দুই বোনের নাম দুইটা-বড়ো কেমন জানি! অন্যদের থেকে বড়ো আলাদা রকমের যেনো আমাদের দুইজনের নাম!
আমাদের গুষ্ঠীতে কারো এমন নাই নাই। আমার নাম মরিয়ম হুসনা জাহান। সকলে ডাকে হেনা হেনা বলে। রিনার নাম রাবেয়া হুসনা জাহান।
নামের এমন বাহার, দাদার কুলে কী নানার কুলে- কোনো ঘরের কোনো মেয়ের নাই।
আবার দাদার গুষ্ঠীতে বা নানার গোষ্ঠীতে- ছেলে- সন্তানদের নামও কিন্তু যেন-তেন একটা কিছু রকমের নাম! সেইসব নামও তেমন বাহারী কিছু না! এই যে আমার দাদাভাইয়ের নামটা! সেটাও একদম সাদাসিধা! মোতাহার আলী। আবদুল আলীর পুত্র মোতাহার আলী!
তাইলে আমাদের দুইজনের এমন বাহারের নাম যে!
‘নিজেগো নাম লইয়া আবার এতো কুয়ার করোনের কি অইলো? বাপের পছন্দ হইছে, থুইছে! আমারে জিগাইয়া থুইছে? জিন্দিগীতে কিছু জিগাইয়া করছে?’ আম্মা সাফসাফা জানায়ে দিয়েছে।
সঠিক কোনো উত্তর পাওয়া যায় নাই, আম্মার কাছ থেকে।
তবে যেদিন ইডেন কলেজে বাংলা অনার্সের ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাই, আব্বা আমাকে একলা ছাড়ে নাই। অফিসে দেরী করে যাওয়ার ব্যবস্থা করে, তারপর, আমারে নিয়ে গেছে ইডেন কলেজে।
পরীক্ষা সকাল নয়টায়।
এক রিকসায় দুইজন মানুষ। হুড তুললে তো ঠিকমতো বসার উপায় থাকে না! সেই সকাল সাতটার সময়, কদমতলা থেকে বাপবেটী দুইজনে যেতে থাকি হুড ফেলা রিকসায়!
আমার তখন অনেক শরম করতে থাকে। এই আমাদের মহল্লা-কদমতলা! এর গলি-ঘুঞ্জি দিয়ে রিক্সার হুড না-তোলা অবস্থায় যাওয়ার চিন্তাও করি নাই কোনোদিন। আজকে যেতে হচ্ছে।
তারপর যেতে যেতে রিক্সা যখন পলাশীর ওইখানে, শহীদ মিনার পার হয়ে যখন সলিমুল্লাহ হলের সামনে, দুইপাশে যখন পুরানো সব বিরাট গাছ-তাদের ছায়ায় ছায়ায় চলছে যখন রিকসা, তখন হঠাৎ শুনি কী-কোকিল ডাকে।
অনেক জোরভরা ডাক! কুহু কুহু কুহু কুউ!
তখন কিছুর মধ্যে কিছু না, আব্বা যেনো নিজেই নিজেরে বলে ওঠে; ‘হুসনা জাহানও বাংলায় অনার্স পড়তে গেছিলো! আমারে যাইতে হইলো বি.কম পড়তে! অনার্সে যাইতে পারলাম না!’
আমি তখন অন্য দিকে চেয়ে থাকা। সলিমুল্লাহ হলের সাদা দালানের বিরাট বিরাট মিনারগুলা দেখতে দেখতে আমার তখন ভোম্বল দশা! সেই সময়ে কোকিলের তেজভরা ডাক আর আব্বার কথাগুলা ফাড়ফাড় করে আমার কানে ঢুকে যায়।
আব্বা এটা কী বললো! ঝটর-পটর করে আমি আব্বার দিকে মুখ ঘুরাই! কী শুনলাম এটা!
আমাকে মুখ ফেরাতে দেখে আব্বা বলে, ‘ভর্তি হওয়ার পরে, এই রাস্তা দিয়া আসা-যাওয়া করস যদি, আরাম পাবি। গাছের ছায়াটা খেয়াল করছস?’
৩রা এপ্রিল ১৯৯৫
তাহলে হুসনা জাহান নামটা যে আব্বা আমাদের দুই বোনের নামেরই অংশ করে রেখেছে; সেটা তো কারণ ছাড়া না!
আমি একা একাই সেদিন বুঝে নেই বিষয়টা। কিন্তু বাড়িতে ফিরে আর কারো সাথে আলাপে যাই না। দরকার নাই তো কোনো। আম্মা শুনলে অহেতুক হুজ্জোত করবে। আব্বারে হাজারো রকমে শরম দিতে থাকবে। আর, রিনার তো এমন সব কথা শোনার কোনো আগ্রহই নাই কোনোকালে!
তাহলে বিষয়টা তোলা দিয়ে দরকার কী! আমার জানাটা আমার মনেই থাকুক!
আব্বা কি সেইদিন বেহুদা কোনো কথা বলেছিলো নিজের সঙ্গে নিজে?
না না! বেহুদা কোনো কথা ছিলো না সেটা! আমি ঠিক বুঝতে পারি! নিজের মনের ভেতরে লুকিয়ে রাখা কথাটাই নিজেকে আবার মনে করিয়ে দিচ্ছিলো আব্বা, সেই সকালে!
আমার মনে হতে থাকে, এই মোরাকাবার বিষয়টাও তেমনই এক গুরুতর ব্যাপার। আব্বার মনের ভেতরে লুকিয়ে রাখা-অতি প্রিয় একটা বিষয় না হয়ে যায়ই না এটা! এই মোরাকাবার বিষয়টা!
এইটাকে রিনা যতো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করুক, বা দাদাভাই এই বিষয়টারে যতোই কেনো এড়ায়ে যাক – এটা কোনো আবোলতাবোল কথা না! আমার মন সেই ব্যাপারে একদম নিশ্চিত হয়ে যায়।
‘আচ্ছা তাইলে, ওইটা আমি যথানিয়মে পালন করমুই করমু!’ আমি নিজের কাছে নিজে প্রমিজ করি।
কিন্তু সেটা শুরু করলাম কবে?
করলাম এই যে এই বছরে! এই ১৯৯৫ সালে। জানুয়ারি মাসের দশ তারিখ থেকে। আব্বা চলে যাওয়ার প্রায় এক বছর দুই মাস পরে।
যদি আব্বার কথাকে সত্য বলেই মান্য করলাম, তাহলে এতোদিন লাগলো কেনো? মৃত্যুর বিছানায় শুয়ে যে-আদেশটা দিয়ে গেলো বাপটা, সেটা পালন করতে এতোগুলা দিন লাগে কোন কারণে?
এমন তো জটিল না, বিষয়টা! এমন কোনো কঠিনও তো না বিষয়টা! তাইলে শুরু করতে এতো দেরী কেমনে হয়?
দেরী যে হয়েছে, সেটা অকারণে না! কারণ আছে তার!
ওই যে আগে বললাম, ভয়ঙ্কর এক ঝড়ের ছোলার মধ্যে আছি আমি। কেমনে যে আছি!
থাক থাক! ওই ঝড়তুফানের কথা গোপনই থাক! বলতে চাই না। বলার ইচ্ছা নাই আমার!
৪ এপ্রিল ১৯৯৫
আমি তো জানি, ওটাকে বাংলায় ধ্যান বলে। আব্বা থাকতে থাকতেই একদিন, ডিকশনারীতে দেখেও নিয়েছি ওইটার ইংরেজি নাম! মেডিটেশন!
কিন্তু কেনো জানি ওই দুইটা নামের একটাও আমার জিহ্বায় ওঠে না!
ওটার বিষয়ে মনে মনেও যদি বলতে যাই; খালি বেরিয়ে আসে সেই মোরাকাবা শব্দটা।
আব্বা তো প্রথমে এই নামটাই বলেছিলো। তাই না?
এই নামটা দিয়েই তো এর সাথে চেনাশোনা! সেই কারণেই কি এই রকমটা হয়? বুঝি না!
এই তো এই বছরের জানুয়ারি মাসের দশ তারিখের ঘটনা। কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে বেলা তখন তিনটা! খুব শীত সবখানে। বাইরে যে রোদে ছিলাম, সেইখানেও শীত! ঘরে যে ছায়া ছায়া ভাব; সেইখানেও শীত!
এতো শীত, কিন্তু আমার যেনো কোনো সায়-শান্তি নাই।
ভেতরটা বড়ো জ্বলছিলো সেই দিন। ভেতরের জ্বালাপোড়াটা একটু পর পর যেনো শরীরের বাইরেও এসে ঝটকা দিচ্ছিলো। আহ! আমি কোনোমতেই সেই জ্বালা-যন্ত্রণা ঠান্ডা করতে পারছিলাম না!
ওই যে কলেজ শেষ করে এলাম, সেইখান থেকে শুরু করে-এই যে আমাদের বাসা- সবখানে আমার জন্যই যেনো খালি আগুন জ্বলছে! আগুন আগুন শুধু!
আর সেই আগুনে আমি খালি পুড়ছি পুড়ছি! কতোরকমে সেইদিন নিজেকে নেভাতে চেষ্টা-চরিত্র করলাম! কিন্তু ভেতরের ফাতফাতানি আর জ্বলুনির, সেদিন কোনো নেভা-কমা নাই!
না-পেরে তখন সেদিন কী মনে করে ছাদে গেলাম! এমনিতে আসি না কখনো ছাদে। কোনোদিন ছাদে যাওয়ার কোনো অভ্যাস হয় নাই, আমাদের দুই বোনের। একেবারে ছোটোকাল থেকেই দিনের বেলায় আমাদের দুই বোনের ছাদে যাওয়া নিষেধ! আম্মার কড়া নিষেধ! সেইটা অমান্য করার সাহস- আমাদের কবে ছিলো!
আশেপাশে সব চারতলা পাঁচতলা বাড়ি। এই কদমতলার এই গলিতে সকল বাড়িঅলারই পছন্দ হচ্ছে, বাড়িতে মেস ভাড়া দেওয়া। নিজেরা কোনো একটা ফ্লোরের কোনো একটা পাশে কোনোরকমে গুঁজে-মুজে থাকে। বাকি সবখানটায় মেস!
কোনো কোনো বাসার সব কয়টা তলায়ই মেস। সেই বাসার বাড়িওলা দেখো গে হয়তো নিজেরা থাকছে আরো ভেতরের দিকের কোনো ভাড়াবাড়িতে! থাকছে হয়তো অল্প ভাড়ার কোনো টিনের ঘরে! এদিকে, এইখানে নিজের দালানবাড়িতে মেসভাড়া দিয়ে টাকা পাওয়া যাচ্ছে অনেক বেশী! তাইলে মেসভাড়া দিবে না ক্যান তারা!
খালি আমাদেরটা বাসাটা ছাড়া, ভাড়া দেওয়ার এমনই অবস্থা চলছে-এই মহল্লার সব বাসাতে!
সেইসব মেসের ছেলে-ছোকরা বা মাঝারি বয়সের লোকেরা বিকালটা ভরে ছাদে ছাদে চড়ে থাকে।
ছাদে চড়ে থাকো তোমরা, ভালো কথা! কিন্তু এই বাড়ি ওই বাড়িতে তোমাদের উঁকি-লুকি না দিলে কি হয়? মেসের লোকেরা উঁচু ছাদে চড়ে থাকে বটে, কিন্তু তাদের চোখ থাকে অন্য বাড়ির জানালায় জানালায়! নাইলে বারান্দাগুলাতে!
কোনো লজ্জা-সংকোচ না রেখে, তারা বুক ফুলায়ে উঁকিফুচকি দিতে থাকে। হাসিঠাট্টা করতে থাকে। যখন মর্জি হয়, নিজের পরনের শার্ট-গেঞ্জি ফর ফর করে খুলে ফেলতে থাকে একেকজন।
তারপর উদাম শরীর নিয়ে একেকজনে গানও গাওয়ার কোনো শেষ রাখে না। তারা নিজেরা নিজেরাই, গান গেয়ে গেয়ে, একেবারে পাগল হয়ে যেতে থাকে।
সেইসব লোক, ছাদে একটা মহিলা দেখলে, কা–কীর্তির কোনো লেখাজোকা রাখবে!
ছাদে গিয়ে কোন লজ্জায় পড়তে হবে-কে বলতে পারে! সেই চিন্তায় আমি তো এখন কখনোই ছাদে যাই না।
কলেজে পড়ার টাইমে ছাদে গেছি কখনো কখনো! তবে তখন গেছি রাতবিরাতের কালে। হয়তো আম্মারই হুকুমমাফিক গেছি! সেইটা ছিলো -বিশেষ কোনো ঠেকার কাজ সারতে যাওয়া!
এখন এই যে আমি পুরা এক বয়স্ক মহিলা! এই টাইমে, একলা একটা মহিলা-দিনের আলোতে ছাদে যাবো কোন মুখে! আল্লা! আমাকে দেখে- বেটাগুলার- শয়তানীর কোনো সীমা থাকবে তখন?
এমন কথা বরাবর আমার মাথায় থাকে বলে, এখনও ছাদে যেতে কিছুতেই সাহস পাই না! অস্বস্তি লাগে! কুণ্ঠা তো হয়ই!
কিন্তু সেদিন কী হয় আমার- ঠিক বুঝতে পারি না! ভেতরের পোড়ানির যাতনায় বড়ো ছটফটাতে থাকি আমি! আর কেবল থেকে থেকে মনে হতে থাকে যে, ছাদে বরং যাই! সেইখানে গেলেই যেনো প্রাণটা শীতল হবে! সত্যি শীতল হবে! শেষে কী করবো দিশাবিশা না পেয়ে- ছাদে যাওয়ার জন্যই- কেমন করে যেনো পা বাড়ায়ে দেই! মেসের বেটাগুলোর কথা মনে আসে, কিন্তু কেনো জানি একটুও অস্বস্তি লাগে না!
মনে করি, শীতের বেলা! ঢলে পড়তে আর কতোক্ষণ! অন্ধকার হয়ে আসবে জলদি জলদিই তো! আর, আজকে তো ছুটির দিনও না! সকল মেসের সকল লোকই তো কোনো না কোনো কাজের জায়গায় থাকার কথা! নাকি আজকেও তারা সকলজনেই ছাদে ছাদেই আছে? ইস! আচ্ছা, থাকলে থাকুক গা শয়তানগুলা!
কুণ্ঠায় একটুখানি নড়নড়ে হয়ে যায় আমার পা, কিন্তু তাও আমার মন আমাকে থামতে দেয় না! থামাতে পারি না আমি নিজেকে! কাহিল পা টেনে টেনে ঠিক চলে যাইÑ আমাদের গরীরের গরীব ছাদটাতে!
আমাদের যে ছাদ, সেটার অবস্থা যা তা! বাড়ি তোলা শেষ করার পর থেকে এটা- এই যা তা অবস্থায়ই আছে!
কোনোরকম হাঁটু পর্যন্ত রেলিং তোলা আছে- এই ছাদের। তবে রেলিংয়ের কোনো দিকেই কিছুমাত্র আস্তর পড়ে নাই কোনোদিন! জায়গায় জায়গায় লম্বা লম্বা রড উঁচানো আছে। রেলিং আরো উঁচু করার প্ল্যান যে আছে বাড়িঅলার-এই রডগুলা তারই নিশানা।
সেই প্ল্যানকে আর বাস্তব করার ফাঁকটা আব্বা পায় নাই। দাদাভাইয়েও সেই ফুরসতটা পাবে বলে, লক্ষণে বোঝা যায় না!
কাজেই যেমনকার আধা সমাপ্ত ছাদ, তেমন আধামাধা হয়েই পড়ে আছে।
সেই ছাদে থাকার মধ্যে আছে তিনটা পেয়ারা গাছ। সিমেন্টে বানানো অনেক বড়ো তিন টবে, সেই তিন পেয়ারা গাছ।
দাদাভাইয়ের জান।
সে নিজে পারলে তো নিজেই ওইগুলাতে পানি দেয়। নাইলে প্রতিদিন ভোরসকালে এসে, এই পানি দেওয়ার কাজটা সারে বাচ্চু মিয়া। দাদাভাইয়ের ছোটো মুহুরী।
ছাদের পুবদিকের রেলিং-ঘেঁষা দুইটা পেয়ারা গাছের টব। অনেকটা ফারাকে ফারাকে রাখা দুই টব। তাও গাছের রোগা-টিংটিঙ্গা ডালেরা এ ওরে ধরে ফেলি ফেলি অবস্থা করে আছে!
ছাদের পশ্চিম দিকে একলা খাড়া আছে আরেকটা টব। একটু ঝাঁকড়া মতো একটা পেয়ারা গাছ আছে ওইটাতে।
এই গাছকয়টা ছাড়া ছাদে আছে অনেকগুলা বাঁশ। গাদাগাদি পড়ে আছে ওইগুলা, ছাদের উত্তর দিকের রেলিং ঘেঁষে।
আর আছে একটা লোহার চেয়ার। প্লাস্টিকের বেত দিয়ে একসময় বোনা ছিলো ওইটার বসার জায়গা, পিঠ, হাতল! আম্মা থাকতে এমন সব চেয়ার আমাদের তেতলার বারান্দায় রাখা থাকতো, নিজেদের বেশী-কাছের আত্মীয়-মেমান বসানোর জন্য!
এখন সেই চেয়ারদের একটার ঠাঁই হয়েছে ছাদের এক কোণায়!
সেই চেয়ারের প্লাস্টিকের বেত এখন ছিঁড়ে-উড়ে লতর-পতর। শুধু লোহার কাঠামোটা ঠিক আছে। তাতে চেষ্টা করলে কোনোমতে হয়তো বসা যায়! বা হয়তো বসা যায়ই না!
সেদিন, সেই প্রথম দিন, ছাদে উঠে আমি প্রথমে ভয়ে ভয়ে নানাদিকের ছাদের দিকে তাকাই। কয়জন কোনদিকে খাড়া আছে, আল্লায়ই জানে!
কিন্তু কী অবাক ব্যাপার! কোনো ছাদে একটা কোনো লোক নাই!
বিশ্বাস হয়?
আমার তো বিশ্বাস হতে চায় না! কিন্তু এটা সত্য! সত্য!
কতোক্ষণ গাছ কয়টার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করি আমি। একবার পশ্চিমের গাছটার কাছে যাই, একবার পুবের দিকে আসি। উত্তরে ডাই করে রাখা ছাতা-জমা, কালো বাঁশগুলার সামনে গিয়ে কতোক্ষণ দাঁড়ায়ে থাকি!
এমন করে করে হাঁটাহাটিতে থাকলে ভেতরের ছ্যাতছ্যাতানি কমবে? কমবে?
নিজেকে জিজ্ঞেস করি বারবার! কিন্তু কোনো উত্তর পাই না। শুধু একবার পুবে যাই, একবার পশ্চিমে, তারপর আবার উত্তরে।
এমন করতে করতে, দেখি কী, বাইরে আমি যেমন হাঁটছি; তেমন আমার মনের ভেতরেও একটা কথা ঘোরাঘুরি করছে। খুব আস্তে আস্তে নড়াচড়া করছে।
আমি সেই কথাটা বেশ বুঝে উঠতে পারি। কথাটা মোরাকাবা করা নিয়ে।
আমার মন যেনো বলছে, ওইটা তো করলে পারি আমি! ওই যে মোরাকাবাটা! সেইটা করা তো দরকার, তাই না? না করলে আব্বার আত্মায় কষ্ট পাচ্ছে কিনা? আর কতো কষ্ট দিবো আব্বার আত্মারে? হ্যাঁ? এমন ভাবনা নড়েচড়ে নড়েচড়ে, আমার মনের ভেতরে তখন।
তারপর কখন যে আমি মোরাকাবা করতে বসে যাই; মনে করতে পারি না!
আশ্চর্য! কেমন করে যেনো বসে যাই- সেই ছেঁড়াখোঁড়া চেয়ারটাতেই! একটুও কুণ্ঠা হয় না! কোনোরকম ভাবনাও মাথায় আসে না। আমি কেমনে যে -কখন- সেইখানে মোরাকাবা করতে বসে যাই, মনে করতে পারি না!
মোরাকাবার নিয়মরীতিগুলো যেনো আব্বাই পাশে বসে বসে আমাকে বলে যেতে থাকে।
হালকা ভাবে চোখ বন্ধ হোক! বুজে আসো চোখ! বুজে থাকো!
তারপর প্রথমে লম্বা দম! লম্বা দম!
চলুক চলুক চলুক!
তারপর ধীরে ধীরে ধীর দম! ধীর ধীর!
তারপর শুধু দম খেয়াল করা। শুধু দম খেয়াল করা।
তারপর যাত্রা শুরু! দূর গহীনের দিকে যাত্রা শুরু!
ঊনিশ, আঠারো, সতেরো
৫ এপ্রিল ১৯৯৫
কেনো যে সেদিন, সেই যে এই বছরের জানুয়ারী মাসে, এমন হঠাৎই মোরাকাবা করার খেয়ালটা আসলো আমার! এখনও পরিষ্কার না ব্যাপারটা আমার কাছে।
তবে আমি দেখলাম, আমি ওটা করে ফেলেছি! কেমন সুন্দর, একলা একলাই করে ফেলা গেছে ওটা!
ওটা করার জন্য ভাইবোন কোনোটারেই পাশে পাওয়া লাগে নাই। একা একা আমিই পেরেছি করতে! একদম ঠিকঠাক মতনই করতে পেরেছি!
যাক, মরার আগে বাপটা একটা কাজ করতে বলে গিয়েছিলো, সেটা তাহলে এতোদিনে ভাইবোনদের তিনজনের একজনে অন্তত করে ফেলতে পারলাম!
এই কথাটা জোরেসোরে মনে আসে। আর, তখন মনের ভিতরে জ্বলতে থাকা আগুনটা ধুপ করে নিভে যায়! আপনা-আপনিই নিভে গিয়ে সবকিছু একেবারে শান্ত হয়ে যায়!
এমন ঠান্ডা কেমনে হয় মন? আগে অন্যদিন তো এমনটা হতো না! আগুন জ্বলতে থাকতো তো থাকতোই! কোনো যেনো নেভানেভি নাই তার! কোনো নেভানেভি নাই!
আজকে তবে এমনটা যে হলো, সেটা কি মোরাকাবা করার কারণে? নাকি, আব্বার কথাটা রাখতে পারার কারণে? সঠিকভাবে বুঝতে পারি না আমি।
কিন্তু তারপর মোরাকাবা শেষে, কেনো জানি, ছাদের সেই ছ্যারাভ্যারা চেয়ারটাতে বসে থাকতে অনেক শান্তি লাগতে থাকে আমার। অনেক শান্তি!
আমি ছাদে বসে থাকি- অনেক রাত পর্যন্ত।
বসে থাকতে থাকতে সেই কথা কয়টা মনে আসে! কথাগুলি আব্বাকে নিয়ে।
না, ভুল বললাম! কথাগুলি আব্বাকে নিয়ে না!
কথাগুলা আব্বা বলেছিলো! নিজেই নিজেকে বলছিলো সেইদিন! নিজেই নিজেকে শোনাচ্ছিলো আব্বা ওই কথা কয়টা!
আর কী কপাল আমার! কী সু-কপাল! ভাগ্যগুণে আমি তখন আব্বার কাছাকাছি ছিলাম! ভাগ্যগুণে সেই কথা কয়টা শুনতে পেয়েছিলাম আমি!
সেই কথাগুলি ভাই-বোনদের কোনোজন শোনার কিসমত পায় নাই। আমারও কেনো জানি- কোনোদিন আর- সেই কথাগুলা ওদের সাথে একফোঁটা শেয়ার করার ইচ্ছা পর্যন্ত হয় নাই।
কথা কয়টা কেবল আমি জানি! আর জানে আমার অন্তর! যখনই সেই কথাগুলা আমার মনে আসে, পুরাটা শরীর যেনো ঝনৎকার দিয়ে ওঠে! শরীর কাঁটা দিয়ে উঠতে থাকে বারেবার।
আব্বা-আব্বা-সেইগুলা কি কথা বলেছিলো? এমন পরিষ্কার, স্পষ্ট গলায় আব্বা তখন কেমন করে কথা বলছিলো?
তার তো তখন গোঙানীর অবস্থা যাচ্ছিলো! তখন আব্বার কোনো একটা কথাকেই আর কথার মতো শোনা যাচ্ছিলো না! কেবল গোঙানী কেবলই গোঙ গোঙ!
আমিই শুধু অই গোঙানীর ভিতরে লেটকে পড়ে থাকা কথাগুলাকে তখন কোনোরকমে আধামাধা বুঝতে পারছিলাম!
পারবো না ক্যান? দিনরাতের সবটা টাইমই তো আমি থাকছিলাম আব্বারে নিয়ে! নাড়ছি-চাড়ছি, খাওয়া-লওয়া সামাল দিচ্ছি, পেশাব-পায়খানা সাফসাফা করছি! এমন করতে করতে অসুখের মানুষটার আধা-নষ্ট হয়ে যাওয়া জবানটার সাথেও তো একপ্রকার চেনাশোনা হয়ে যায়ই! তাই না? আমারও চেনাশোনা হয়ে গিয়েছিলো!
সেই দিনরাত শুধুই গোঙাতে থাকা মানুষটা – কেমন করে- অমন আঁতকার মধ্যে -অমন পরিষ্কার কণ্ঠে -কেমন করে অতোগুলা কথা বললো সেই সময়? সেও তো কোনোরকম হালকা-পাতলা, লঘু কোনো কথা না!
সেসব তো অনেক গুরুতর কথা! অনেক গুরুতর! অমন ভারী ভারী কথা-কেমন করে বলে গেলো আব্বা, অই টাইমে!
আমি সেইটা ভেবে ভেবে কোনো সুরাহা করতে পারি নাই-এই পর্যন্ত! তখনও পারি নাই, এখন তো পারি না-ই! এই জীবনে কি কোনোদিন সেটা সুরাহা করতে পারবো? মনে হয় না!
আজ মনে হচ্ছে, পরিষ্কার রকমে সেই বিষয়টারে আমি বরং লিখেই রাখি এইখানে! লিখে রাখতে ইচ্ছা হচ্ছে বড়ো!
সেইটা তখন অক্টোবর মাসের চৌদ্দ বা পনেরো তারিখ হবে!
হয়েছে কী, বিছানায় পড়ে পড়ে আব্বা তো তখন পারতে কথা বলতে চায় না! কথা তো বলা না, আসলে সেটা গোঙানী!
বেশীর ভাগ সময় চুপ করে পড়ে থাকে আব্বা তখন! তারপর হঠাৎই দেখা যায় অনেক গোঙাচ্ছে আব্বা! হয়তো তখন আমি তার শরীর মোছাচ্ছি বা মুখে জাউ দিচ্ছি-অমন সময়ে হঠাৎই দেখা যায় আব্বা গোঙাচ্ছে!
দাদাভাই সেই সময় আশেপাশে থাকলে চেঁচিয়ে উঠেছে, কেনো কেনো? শরীরটা কি আরো বেশী যন্ত্রণা পাচ্ছে আব্বার?
আমি বলেছি, না না! আব্বা আমার সাথে কথা বলছে!
আব্বার সাথে থাকতে থাকতে তো ওই সময়ে আব্বার গোঙানী-কথাগুলারেও আমি পরিষ্কার রকমে বুঝে ফেলতে পারছিলাম! একদম ঠিকঠাক বুঝতে পারছিলাম তার অইসব কথারে!
কেনো গোঙাতো আব্বা অইরকমে? আসলে অইভাবে, ওই সময়েও আব্বা আমারে মোরাকাবা করার কায়দা-কানুন-নিয়ম-বিধিগুলাই মনে করিয়ে দিতে থাকতো!
কেমন পাগলার পাগলা যে ছিলো আমার বাপটায়!
তেমন একদিনের কালে, একবার হয় কী, সেই ঘটনাটা ঘটে! একেবারেই বিশ্বাস করা যায় না এমন ঘটনা!
কিন্তু বিশ্বাস না করে উপায় নাই! আমার নিজের চোখের সামনে ঘটা ঘটনা তো! নিজ চক্ষে দেখা বিষয়! নিজের কানে শোনা বিষয়! তেমন সত্যরে উড়ায়ে দেওয়া যায় নাকি!
না না! যায় না!
তখন দুপুরের টাইম। ঠিক কিন্তু ভরা দুপুরটা নয়, পড় পড় দুপুর! বেলা আড়াইটা তিনটার দুপুর! ওইটা তখন আব্বার মুখে সাগুর জাউ দেবার টাইম!
গরম জাউ বাটিতে ঢেলে ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করতে করতে আমি আগাচ্ছিলাম আব্বার বিছানার দিকে!
আগাতে আগাতে হঠাৎ আমার খেয়ালে আসে যে, ও খোদা! বিছানায়-পড়া আব্বারে যেনো একেবারে ঠান্ডা-নিঃসাড় দেখায়!
এখন যে অবস্থা আব্বার – তাতে তার শরীরের নড়াচড়া নাই, সেটা ঠিক! কিন্তু দম নেয়া আর ছাড়ার সময়ে তো এক রকমের লম্বা গোঙানীর আওয়াজটা ওঠে।
কই! এখন দেখি সেই আওয়াজটা শোনা যায় না! ও আল্লা! কেনো!
আব্বায় এমন নিঃশব্দ কেনো? এমন চুপ কেনো! কী হইছে!
আমি আর তখন জাউয়ে ফুঁ দেবো কী, কোনোমতে জাউয়ের বাটি বিছানার পাশের ছোটো টেবিলটাতে নামায়ে রেখে, আমি আব্বার মুখের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ি!
আব্বা! আব্বা! আব্বা! হাউমাউ কান্না বের হতে থাকে আমার ভিতর থেকে!
“মাগো!” আব্বা তখন আচমকাই অতি ধীর ও স্বাভাবিক গলায় আমাকে ডেকে ওঠে! শুনে আমি আঁতকে উঠি!
একদম সুস্থ লোকের গলায় কথা বলছে আব্বা? সেটা বলতে পারছে কেমনে? এখন, এই অবস্থায়? কেমনে কি হচ্ছে এইটা? ভয়ে আমার শরীর কাঁপা শুরু করে!
কিন্তু নিজের কাঁপাকাঁপির দিকে নজর দেওয়ার ফুরসত পাই না তখন আমি! ওই তো আব্বা কথা বলছে। এই যে আব্বা ডাকছে আমারে! “মা গো! এই দেখো আব্বায় ঠিক আছি! তুমি কান্দ ক্যান?”
‘আমি যে আপনের কোনো আওয়াজ পাইতেছিলাম না আব্বা! ডরাইয়া গেছি আব্বা- আমি!’
“আহা! জিন্দিগীর এমন শেষ রাস্তায় আইসা কিনা তোমার বাপে তার আসল পথের খোঁজটা পাইলো! এমন শেষ টাইমে আইসা! এতো দেরীতে! আহা আহা! আগে পাইলে-এট্টু আগে পাইলে-জনম যে সার্থক হইতো গো মা!”
‘আব্বা! আব্বা! আপনে কি বলতাছেন আব্বা? আমি তো ধরতে পারতেছি না আব্বা!’
“কী সুন্দর পথখানা! ওই যে রাস্তা! সিধা গেছে গা রাস্তাখান- ওই কতো দূরে! আরে সব্বনাশ! কতো দূর যে গেছে! দেখো! দেখো গো মা!” আব্বা আমাকে পথ দেখতে বলে!
এই তেতলার ওপরে, এই ছোটোমোটো ঘরটাতে পাতা আছে একটা মাঝারি খাট! এক কিনারের দেয়াল ঘেঁসে সেই খাটটা পাতা আছে! তারপর ঘরের বাকিটা মেঝে তো খালি! ঘরের ভেতরে মলিন ঘরটুকু ছাড়া আর তো কিছু নাই! আব্বা সেইখানে মস্ত দীঘল রাস্তা দেখতে পায়-কেমন করে! ও মা গো! আব্বা কী তাইলে প্রলাপ বকতাছে!
আমার শরীর আবারও কিনা ভয় পাওয়া শুরু করে! ভয়ে ধকধকিয়ে উঠতে উঠতে আমি দেখতে পাই যে, আরো একটা তাজ্জবের ঘটনা ঘটছে! পুরো অচল, অবশ আব্বা কিনা শান্ত মুখে, ধীরে, অতি ধীরে বিছানার ওপর উঠে বসতে যাচ্ছে! নিজে নিজেই উঠে বসছে আব্বা! আমার চোখের সামনে আমি এই তেলেসমাতি ঘটনা ঘটতে দেখছি! ভুল দেখছি? নাকি সত্যি?
ইয়া আল্লা! আব্বা উঠে বসে কীভাবে! কী হচ্ছে এইটা! হায় হায়! এই না ধুপ্পাস করে মাটিতে পড়ে যায় আমার বাপটায়! আমি ত্রাসে ঠকঠকাতে ঠকঠকাতেও দৌড়ে গিয়ে আব্বাকে ধরি! ধরে তাকে শোয়াবো কী, আমি হতভম্ব হয়ে চেয়ে থাকি সামনের দিকে! অই তো! আব্বাও তো অই দিকেই চেয়ে আছে! অই তো সামনে একটা রাস্তা দেখা যায়! আব্বা যা দেখছে, আমিও তো তাইই পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি!
পায়ে হাঁটা পথ! অই তো!
পায়ে-হাঁটা এমনও পথ হয়! ছায়ায় ছায়ায় একেবারে এমন মোড়ানো -এমনও পথ হয়! সেই পথ ধরে অই যে আব্বা হেঁটে যাচ্ছে! অই তো যেতে যেতে পথটার বাঁ-পাশে কেমন একটা দীঘি দেখা যায়! এতো বিরাট দীঘি জন্মেও তো দেখি নাই আমি! আব্বাও দেখে নাই! দীঘি ভর্তি পদ্মফুলের ঝাড়! এতো পদ্ম ফুল! উফ আল্লা! এতো পদ্ম ফুল! বাতাসে কেমন সুবাস! এতো সুবাস! আমি সাদা আর গোলাপী মেশানো পদ্মফুলের সুগন্ধ পেতে থাকি!
কোন দূর থেকে জানি আব্বা কথা বলে ওঠে। “ও গো মা! আমার জনম য্যান সার্থক হইয়া গেলো গা গো মা-জননী!”
সেই পথটা ধরে আমি আব্বাকে এগিয়ে যেতেই দেখতে থাকি! কতোদূরে চলে গেছে আব্বা! পেছনে আমি, সেই কোন পেছনে পড়ে আছি! তাও আমি সেই সামনের সবকিছুই দেখতে পাচ্ছি! স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি!
অই তো সরু হাঁটা পথটার ডান দিকে কত্তোগুলা আমগাছ দেখা যায়! গাছে গাছে এত্তো এত্তো বোল! অই দেখা যায়! বোলে বোলে পুরা গাছ একেবারে ঢাকা পড়ে আছে! সব কয়টা গাছই এমন ঢাকা-পড়া! আহা! কোনো গাছেরই তো একটা পাতাও দেখা যায় না-খালি বোল খালি বোল!
এমন সুন্দরও হয় গাছ-বৃক্ষরা! এমনও সুন্দর! আব্বাকে এগোতে দেখতে দেখতে এই কথা মনে আসে আমার!
“ও আমার মা! আমার জনম নেওয়া – এই এতোদিনে ধন্য হইলো রে!” পথ ধরে যেতে থাকা আব্বার গলা শুনতে পাই আমি! কতো যে সন্তোষে ভরা সেই গলা! আহা! আব্বার এমন সন্তোষ মাখা গলা-আগে কোনোদিন শুনতে পেয়েছিলাম? কোনোদিন না!
এই পথ কই গেছে? কোথায় এর শেষ? কতো দূরে?
অই যে পথটা চলে গেছে কোন সেই দূরে! অই দেখো! পথের শেষে যেনো একটা ভিটি-বাড়ি দেখা যায়! রাস্তাটা গিয়ে যেনো অই ভিটিটাতেই শেষ হয়েছে! আমি কতো দূরে দাঁড়ানো! তাও যেনো ভিটি বাড়িটার সবকিছু পয়পরিষ্কার রকমে দেখতে পেতে থাকি আমি! অই যে আব্বা এগিয়ে যাচ্ছে সেই বাড়িখানার দিকে! দেখতে পাচ্ছি!
আহা! ভিটায় ঢোকার মুখেই কিনা একটা ফুলের গাছ খাড়া হয়ে আছে! ছোটো ছোটো সাদা সাদা ফুলে-ভরভরন্ত দেখি গাছটা!
কি গাছ এটা? কি গাছ?
“আহা! আস্তে কথা কও মা!” আব্বা আমাকে একটু বেদনামাখানো গলায় বলে! “এইটা হইলো কামিনীফুলের গাছ! এই গাছখানে তোমার আব্বার জন্য বার চাইয়া রইছে! অনেক অনেক আশা নিয়া পথ চাইয়া রইছে!”
ঝরা ফুলের সাদা পাপড়িতে পাপড়িতে নিচের সবুজ ঘাস একদম ঢাকা পড়ে গেছে!
“আহা! এই ভিটি কোন ভিটি! এই রাস্তা কোন রাস্তা! আমি কী চিনি নাই নাকি!” আব্বা হা হা করে কেঁদে ওঠে! আশ্চর্য! তার কান্নার শব্দ বাতাসে বেজে উঠতে শুনি আমি, আর দেখতে পেতে থাকি কামিনীফুলেরা ঝরে পড়ছে -ঝুর ঝুর ঝুর ঝুর! ঝরে ঝরে ওরা মাটিতে পড়ছে না কেনো? কোথায় পড়ছেÑ কোথায়?
পড়ছে আব্বার দুই হাতে আর কাঁধে!
“আমি চিনছি আমি চিনছি! আর কোনো ধোঁকা খামু না আমি! আর কোনো ভুল হবে না, দাদাজান! আপনে দেখেন এইবার! দাদাজান!” কাঁদতে কাঁদতে আব্বা বলতে থাকে!
তখন অকস্মাৎ কী থেকে কী হয় আমি বুঝতে পারি না, তবে দেখি যে আমার সামনে আর কিচ্ছু দেখা যায় না! পলকে আমার চোখের সামনে থেকে সেই হাঁটাপথ সেই ভিটি-বাড়ি সব সরে যায়! শুধু আব্বার কান্নার আওয়াজ শোনা যেতে থাকে!
গো গো গো গো গোঙানোর ধ্বনি শুধু পাওয়া যেতে থাকে!
তাহলে তাহলে-আমি এতোক্ষণ কী দেখলাম! আমি হরদিশা হয়ে মেঝেতে বসে পড়ি! অই যে আব্বা! যেমনকার অচল- তেমন হয়েই তো- বিছানায় পড়ে আছে! কোনোরকম নড়ানড়ি করেছে তার শরীর- সেটার তো কোনো নামনিশানা দেখা যায় না!
আহারে! দিনেদুপুরে আমি এমন ভুল দেখলাম! নাকি ভুল না? সত্য?
আমার চোখের থেকে দরদরায়ে পানি ঝরতে থাকে। সীমাছাড়া রকমে দরদরাতে থাকে! সেই দরদরানি নিয়ে আমি তবদা খেয়ে বসে থাকি আব্বার পাশে।
তারপর আমার সারাটা বিকাল যায়- কেবল ভাবনা-চিন্তা করতে করতে! এটা কি হলো? এটা কি দেখলাম আমি? আব্বা কোন রাস্তারে দেখতে পেলো? রাস্তাই দেখতে পেলো কেনো? এইসব দিয়ে কী বোঝায়! কিছু কি বোঝায়?
কে আমারে এর উত্তর দেবে? সেই উত্তর দেওয়ার কেউ নাই।
এমন ভয় ভাবনায় ভাবনায় সন্ধ্যা যায়, রাতও বাড়তে থাকে। প্রতিদিন রাত সাড়ে দশটার দিকে আব্বারে ভালোমতো মুছে-টুছে মশারিটা টানায়ে দেই আমি।
মশারি টানানো যেমন-তেমন, গুঁজতে হয় খুবই তরিজুত করে! একটা কোনো মশাও যেনো ঢোকার রাস্তা না থাকে!
আবার মশারিটাকে গুঁজতে গুঁজতে খুবই সাবধানী নজর দিয়ে দেখতে হয় মশারির ভিতরটা! কোনো এক ফাঁকে, কোনো একটা মশা গিয়ে ভিতরে বসে পড়ে নাই তো আবার!
থাকলে খবর আছে! সেই মশা করবে কী, একটা কোনো ফাঁকে গিয়ে আব্বারে কামড় দেবেই দেবে! আর আব্বা তখন একরকমের গোঙানী-কান্না শুরু করবে; উ উ উ উ উ!
তারপর কিছুতেই তারে তখন থামানো যাবে না! থামানো যায় না! কতো যে জ্বালা হয় তখন!
সেই কথা আমার মনে থাকে বলে, রোজ আমি অতি ধীরে-সুস্থে আব্বার মশারিটা গুঁজি। গুঁজতে গুঁজতে রোজই অতি চোখা-চোখে মশারির ভিতরের মশার খোঁজটাও নিতে থাকি!
আছে মশা? নাকি আসলেই সব মশা বের করে দেওয়া গেছে আগেই?
অইদিনও অমনই করে যাচ্ছিলাম, তবে করছিলাম খুব আউলা-বিশৃঙ্খল হাতে!
অই যে দুপুরের ওই সময়টাতে অতোসব কী জানি দেখলাম, সেইসব চোখের ভুল ছিলো? এমন চোখের ভুল-কেমনে হলো আমার!
এই চিন্তায়ই না আমার তখন অমন এলোটলো হাত-মন? এই তো এখন আব্বা একেবারে নিঃসাড়ে পড়ে আছে! একটু কঁকাচ্ছেও না পর্যন্ত! অন্যদিন না ভীষণ ছটফট ছটফট করতে থাকে এমন সময়ে? কতো কষ্টে না দাপাতে থাকে? আজকে ঘুমে আছে আব্বা? আজকে শরীর ভালো লাগছে তার?
“আজকা যা শুনছো, যা কিছু দেখছো, কিছু কিন্তু ভুল শোনো নাই মা! ও মা!” আমার তখন মশারি গোঁজা কাজটা প্রায় শেষ হওয়ার দিকে! সেই সময় আমি আব্বার পরিষ্কার গলা আবার শুনতে পাই!
‘আব্বা! থাকুক এইসব কথা! ঘুমান তো একটু!’ আমি আব্বাকে থামাতে যাই!
“মোরকাবার রাস্তা ধরে চলতে থাকলে এই পথের দিশাখান আসে! যার খোশনসিব, সে আগে পায়! আমি পাই নাইÑ আমার নিজেরই দোষে! সাধনে ঢিলামি দিছি। সাধনে বহুত বহুত ঢিলামি দিয়ে গেছি সারাটা জীবন! তাইলে সিদ্ধি কেমনে আসবে! আহ! সময়ে বুঝি নাই! সময়ে এই পথের সন্ধানখানা পাইলে, জিন্দিগী এতো বিষকাঁটার দংশন পাইতো না রে মা!”
আমি এই কথার উত্তরে কী বলবো! কী বলতে হয় এমন সময়ে! আমি বুঝতে পারি না! তাইলে তখন চুপ করে না থেকেÑ আমি কী আর করতে পারি! আমি বোবা হয়ে বসে থাকি আব্বার পাশে।
“তোমার মাথাখান আমার দিকে আনো মা-জননী!” আব্বা হুকুম করে। আমি মাথাটা নোয়ায়ে একবারে আব্বার মুখের কাছে নেই। “আব্বা তোমারে দোয়া দিয়া যাইতেছি মা! তোমার পথ য্যান তোমারে ধরা দিতে দেরী না করে! মোরাকাবা করায় গাফিলতি দিয়ো না মা! আব্বারে কও তো তুমি মা- মোরাকাবা করতে কোনো গাফিলতি করবা না তুমি! জিন্দিগীতে করবা না?”
আমি কিন্তু আব্বাকে একদম অন্তরের ভিতর থেকে বলেছিলাম যে, সত্যি আমি কোনো রকম গাফিলতি দেখাবো না। করবো আমি মোরাকাবা। আসলেই ঠিকঠাক মতো করবো!
কিন্তু সেই কথা আমি রাখি নাই। রাখার ফুরসত পাই নাই। আবার, মনের ভিতরে মোরাকাবা করার জন্যÑ কেনো জানিÑ জোর কোনো তাগাদাও পাই নাই।
যদিও মাঝেসাঝে মনের ভিতরটা একটু ছাৎ ছাৎ করে উঠেছে! আব্বারে না কথা দিয়েছিলাম মোরাকাবা করবো? কই করছি? এমন একটু খারাপ-লাগা নড়ে উঠেছে আমার মধ্যে, প্রায় প্রায়ই!
কিন্তু সেই কারণে মোরাকাবা করতে বসে যাই নাই কখনো তখন!
সত্যি বলছি, আব্বার বলা অই রাস্তা-মাস্তা বা পথের সন্ধান পাওয়া ইত্যাদি ব্যাপারে আমার ভিতরে কোনো প্রকারই নড়ানড়ি আসে নাই!
মনে হয়েছে, আব্বার আগের কথাগুলা-সেই মে বা জুন মাসে বলা কথাগুলা- ঠিক কথা হতেই পারে! সেটায় কোনো ভুল নাই! কিন্তু এই অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে আমি যেইসব কথা শুনেছি, সেই কয়টা কথা আসলে সত্য কথা নাও হতে পারে! সেগুলা খুব সম্ভব আব্বার এক রকমের প্রলাপ ছিলো! এটা হতেই পারে যে, রোগে-ভোগা মানুষটা-কী বলতে কী বলে গেছে! এমনটা হতেই পারে! খুবই সম্ভব!
আব্বা উল্টাপাল্টা বলতে পারেই, অসুখে ছিন্নভিন্ন মানুষটা এমনটা করতেই পারে! কিন্তু আমি যে তখন অতোসব দেখতে পেলাম? সেগুলা কি? চোখের ভুল? আমারও তখন মাথায় দোষ পড়ে গেছিলো? সেই কারণে আমি আবোল তাবোল কীসব দেখেছি?
এই কথার উত্তর খুঁজে পাই নাই আমি! উত্তর পাই নাই, আর একা একা নিজে নিজে ভয়ে-ভাবনায় উতলা-পেরেশান হয়েছি! কিন্তু মোরাকাবা করার দিকে যাই নাই! শুধু ভয় পেয়েছি!
কেমনে তাইলে কী হলো! কেমনে?
আমি জানি না। একদম জানি না!
শুধু এই এখন জানি, আমি অবশেষে আমার বাপটার দিয়ে যাওয়া হুকুমটা পালন করা শুরু করেছি! আমি তাঁর হুকুমটা পালন করতে পেরেছি!
আমি-আমি-আমি-মোরাকাবা করতে পেরেছি! এই তো আজকে সন্ধ্যায়! করেছি আমি ওইটা! আব্বা!
আমি মোরাকাবা করা শুরু করেছি আব্বা!
৬ এপ্রিল ১৯৯৫
সেই যে শুরু হলো, এই বছরের দশই জানুয়ারি থেকে, সেই যে শুরু হলো মোরাকাবা করা; স্টো এখনও চলছে।
প্রথম দিন তো বিশেষ কোনো ভালোমন্দ কিছুই বুঝি নাই, তবে তার পরের দিন যখন মোরাকাবা প্রায় শেষ করে ফেলছি; তখন টের পাই, কান্নায় আমার চোখমুখ ভিজে যাচ্ছে!
সেইদিন ফোঁপায়ে ফোঁপায়ে কাঁদতে কাঁদতে আমি মোরাকাবা শেষ করি। তারপর আশ্চর্য! ডুকরে ডুকরে কাঁদতেই থাকি আমি!
এমন কান্নার বিষয়টা- গত অনেকগুলা বছরে- আমার জীবনে আসে নাই!
আম্মা থাকতে যা কান্না করার, সেটা করে নিয়েছি। তারপর আর একটা দিনের জন্য- চোখে কোনোদিন এক বিন্দু পানি আসে নাই! এতো যে দরদের আব্বা! তার ইন্তেকালেও তো এই চোখেরা খরখরা শুকনাই থেকেছে।
এখন, এই যে এখন, ঘরে-বাইরে এতো যে জুতার বাড়ি পিছার বাড়ি খাচ্ছি-এই যে রোজ খাচ্ছি! কই, সেই কষ্টে তো এক ফোঁটা পানিও আসে না চোখে! কোনো সময় আসে না!
আজকে বছরখানেকের বেশী হয়ে গেলো – এই যে কলেজে যাই; সেখানেও তো আমাকে কম লাঞ্ছনা পোহাতে হয় না! লাঞ্ছনা পোহাই, আর নিজের ভেতরে ফাতফাত জ্বলুনি পেতে থাকি।
কিন্তু কোনোখানেই তো কাঁদে না আমার চোখ। খালি শরীরটা পুড়ে যেতে থাকে! ব্যস, এইই!
তাহলে এই দ্বিতীয় দিনে, মোরাকাবার শেষ ভাগে এসে; আমার চোখে এমন ঢল আসলো কেমন করে? কেনো আসলো?
আব্বা কি বুঝতে পেরেছিলো, তার মেয়ের মনের ভেতরটা পুড়ে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে? মেয়েটার কান্নাকাটি করাটা সেই কারণে বড়ো দরকার? সেই জন্যই কি আব্বা এই মোরাকাবার বিধান বাতলে দিয়ে গেছে?
আর, বারেবার কি সেইজন্যই আমাকে মোরাকাবা করার জন্য এমন তাগাদাটা দিয়ে গেছে?
সেইটাই হবে! নাইলে, কই রিনারে বা দাদাভাইরে তো আর একবারও মোরাকাবা করা বিষয়ে একটা টু-আওয়াজও দেয় নাই আব্বা! কিচ্ছু বলে নাই! যা বলার, বলেছিলো সেই প্রথমবারেই। তারপর ওদের সাথে আর কোনো কথা ছিলো না তার! অই বিষয়ে ওদের সাথে আর কোনো কথাই বলে নাই তো!
এদিকে; যতোদিন আব্বার বিছানায়-পড়া দেহটার মধ্যে কিছুমাত্র একটু শক্তি ছিলো, দ-ে দ-ে কেবল আমারে মোরাকাবামুখী করার জন্য কী চেষ্টাটা না করেছে আব্বা! কোনো কারণ ছাড়াই অমনটা করেছিলো আমার বাপটায়? শুধু শুধুই করেছিলো?
না! এখন তো মনে হয় না, আব্বা খামোখা খামোখা অমনটা করেছিলো! না না!
এইসব কথা ভেবে ভেবে সেদিনও আমার, একদম এশার আজান দেওয়ার টাইম পর্যন্ত ছাদে থাকা হয়ে যায়।
৭ এপ্রিল ১৯৯৫
১৯৯৫ সালের এই এপ্রিল মাসে বসে, এই বছরেরই জানুয়ারি মাসের দিনগুলার নানা কথা মনে করতে গিয়ে বিষম মুশকিলে পড়ে গেছি! মনে আসছে না! কতো দরকারী কথাই কিনা মনে আসছে না!
যাক গা!
জানুয়ারি মাসটা মাসের নিয়মেই চলে যেতে থাকে। আর বিশেষ কিছুই ঘটে না, কিন্তু আমি ছাদে বসে মোরাকাবা করেই যেতে থাকি।
তবে প্রতিদিন কী আর নির্বিঘেœ সেইটা করার ভাগ্য হয় আমার! হয় না! রোজ তো আর আশেপাশের ছাদগুলা লোকশূন্য থাকে না! বরং প্রায় রোজই লোক গজগজাই থাকে।
আমার এই যে এতোটা বয়স, বত্রিশ পার হয় হয় বয়স; আমার দিকেও লুকিঝুঁকি দিয়ে চলতে ছাড়ে না তারা কেউ! কেমন বদমাইশ!
তাহলে বিকাল চারটা, সোয়া চারটার দিকে ছাদে উঠি কেমন করে! কী জ্বালা!
এইখানে কথা কিন্তু উঠতে পারে, আমি কেনো নিজের ঘরে বসে মোরাকাবার মতন পাকপবিত্র কাজটা করি না?
হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বুঝি; এই কথা উঠতেই পারে!
কিন্তু এই কথার কোনো উত্তর আমিÑ আমার নিজেরেও খোলাসা করে দেবো না! কারণ কথা বলতে গেলে বহুত কথা বলতে হবে। সব পঁচা, গন্ধ থকথকা কথা! দরকার নাই দরকার নাইÑ সেইসব কথা মুখে আনার!
শুধু বলতে চাই, এই যে তিন তলা-এটার দুই ইউনিট এক করা।
এই বাড়ির অন্য অন্য তলাগুলা, দুই ইউনিট করে করে ভাগ করা। সেইসব ফ্লোর-ভাড়া দেওয়ার জন্য। তিনতলা আমাদের থাকার জন্য। তাই এইখানে এমন দুই ইউনিট এক করা অবস্থাটা!
অনেকগুলা রুম এইখানে। ছোটো ছোটো রুম, কিন্তু অনেক গুলা।
তার একটা মাত্র ছোটোর ছোটো, চিপা এক রুমে কোনোমতে আমার চিলতা সিঙ্গেল খাটটা পাতা। একটা একফালি টেবিলও আছে। নাইলে চলবো কেমন করে! আমার চাকরিতে তো বইখাতা আর চেয়ার টেবিলই সম্বল।
তিনতলার বাকি সবটা ভাবীর দখলে। দুই জমজ ছেলে আর নিজের সংসার নিয়ে সেই জায়গাটুকে তার কুলায় না!
সেই কারণে তার খালি মনে হয়, আমার থাকার এই যে ছোটো রুমটা- এই রুমটা যদিÑ তার থাকতো! যদি এই রুমটা সে নিজেই ব্যবহার করতে পারতো! তাইলেই সুহালে সংসারটা করতে পারতো সে! কিন্তু কী কপালের ফের! সেইটা সে করতে পারছে না! সংসারের শনি সংসার থেকে দূর হচ্ছে না!
এই কথাটা সর্বক্ষণ তার মনের ভিতরে গর্জায়, আর তার ক্রোধ হতে থাকে! টগবগায়ে ফুটতে থাকা ক্রোধ!
সেই ক্রোধ নিয়ে তখন ভাবী আর কী করে! আমার দিকে শাপশাপান্তি ছুঁঁড়ে দিতে থাকে! আমারে গালিগালাজ করতে থাকে!
দাদাভাই যতোক্ষণ বাসায় থাকে, ততোক্ষণ ভাবী গালিগালাজ করে না! তখন সে থাকে একটু থমথমা মুখে, আর কেবল কারণে-অকারণে কারে জানি খোঁটা দিতে থাকে! খাওয়ার খোঁটা। উপকার নেওয়ার খোঁটা এইসব!
তারপর যেই দাদাভাই বাইরে পা দেয়, ভাবী শুরু করে তার গালিগালাজ! আমাকে গালি দেওয়া আরম্ভ হয় তার তখন! আমার হেন বিষয় নাই, যা নিয়ে সে ভেংচানী-খোঁচানী দেয় না; বা কুকথা বলে না!
প্রথমে সে চালায় একটানা অনেকক্ষণ! তারপর থেমে থেমে, দফায় দফায়! চালাতে থাকে সে! একেবারে রাত্রি দশটা পর্যন্ত এমনই চলে! রাত দশটার দিকে দাদাভাইয়ে তার চেম্বার শেষ করে বাসায় আসে! গালিগালাজও সেই দিনের মতো মুলতবি হয়!
তবে রক্ষা! আমার একটা যাওয়ার জায়গা আছে! আমাকে চাকুরি করতে যেতে হয়! সপ্তাহের ছয় দিনই ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে আমাকে বেরিয়ে যেতে হয়! কলেজে যাই আমি! সেই কারণে দিনের বেশিটা সময় সে আমারে তার নাগালে পায় না!
কিন্তু বাসায় তো ফিরি একটা সময়! ফিরি বিকাল তিনটার দিকে! তখন ভাবীর ঘুমানোর টাইম! সেই ঘুম শেষ হয় চারটা সাড়ে চারটার দিকে! তখন?
তখন তার শরীরভরা শক্তি! গলাভরা জোর! তারে তখন কে থামাতে পারে? কেউ না! সে তখন সারাদিনের উশুল তুলতে থাকে! বিকালে যতোক্ষণ ঘরে থাকি, আমাকে গালিগালাজের সীমা রাখে না আমার ভাবী। আবার করে কী- তার জমজ বাচ্চা দুইটার খেলার যতো বল আছে- সেইসব সে নিজেই আন্ধাধোন্ধা ছুঁড়ে মারতে থাকে- আমার ঘরের দিকে!
দরোজার পাল্লা ভিঁড়ানো থাকলেও সর্বনাশ, খোলা থাকলেও সর্বনাশ!
বন্ধ দরোজার পাল্লা দুইটাতে ভাবীর ছুঁড়ে-মারা বলেরা এসে বাড়ি মারতে থাকে! ধড়াক ধড়াক! বাড়ির চোটে দরোজার পাল্লা দুটা যেনো থেতলে যেতে থাকে! আল্লা! আশপাশের সকল বাড়িতে না সেই আওয়াজ গিয়ে পৌঁছাচ্ছে!
আল্লা! মানুষেরা কী জানি মনে করতাছে! শরমে আর ভয়ে আমার পরান আর পরানের ভিতরে থাকার সাহস পায় না! কিন্তু কেমনে কী করবো আমি! কেমনে থামাবো-এই দজ্জালের দজ্জালরে! আমার তো সেইটা জানা নাই! কোনো দিশা না-পেয়ে আমি চিপেচিপে কেঁদে যেতে থাকি!
ওদিকে দরোজা খোলা থাকলেও তো রেহাই নাই! খোলা দরোজা দিয়ে বলেরা উড়ে আসতে থাকে। এসে বাড়ি খেতে থাকে দেয়ালের সাথে! ধাম ধাম! তারপর সেই বলÑ উল্টা উড়াল দিয়ে এসেÑ হামলে পড়তে থাকে আমার ওপরেই! আল্লা! বলেরা কেমনে আমার দিকে আসে! ভয়ে তখন আমার কলজার পানি শুকায়ে যেতে থাকে!
এমন করে করেই যাচ্ছিলো এতোকাল! এতোকাল আমি নিজের ঘরটার ভিতরে, কোনোমতে নিজেরে গুঁজে রেখে রেখে, তার মুখের সেই কুকথাগুলারে সহ্য করে আসছিলাম! দুই হাতে নিজের কান জাবড়ে ধরে, সহ্য করে যাচ্ছিলামÑ বলের সেই কঠিন ধাক্কাগুলা! নড়বড়ে দরোজার পাল্লা দুটার উপরে আন্ধা গোন্ধা উড়ে! আসা বলের বাড়ি! কী কঠিন তার আওয়াজ! কী ভয়ঙ্কর!
এইসবেরে সহ্য করে করে- নিজের ঘরের ভিতরেই- আধমরা হয়ে পড়ে থাকতাম এতোদিন! এই যে আব্বা মারা যাওয়ার পর থেকে- এই ১৯৯৫ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত! সহ্য না করে কী করবো! কোথায় যাবো! আমার কী যাওয়ার কোনো জায়গা আছে! চিপার চিপা এই ঘরখানা ছাড়া, দুনিয়ায় আমার আর কোনো দাঁড়াবার জায়গা আছে? নাই তো!
শেষে না আমি, অইদিন কেমন করে জানি, ছাদে যাওয়ার বুদ্ধিটা পাই! কেমনে জানি নিজেকে এক প্রকার জোর করেইÑ নিয়ে যাই ছাদে! বিকালে নিজেকে রক্ষা করি এইভাবে! তাহলে, কেমন করে আমি নিজের অই চিপা ঘরটাতে বসে মোরাকাবা করি! কোনো উপায় কী আছে করার!
বন্ধের দিনে কি ভাবী আমাকে চোপা করা বন্ধ রাখে? রাখে না! তখন তার গালিগালাজের ধরণ থাকে ভিন্ন! কাজ করতে করতে আচমকাই শোনা যায়, সে খুব ঝাঁঝিয়ে উঠেছে! নিজের জমজ ছেলে দুইটারে শাপ-শাপান্তি করা শুরু করেছে! তারপর গালিমন্দ আসতে থাকে দাদাভাইয়ের জন্য! তারপর আমাদের আব্বাকে মন্দ-ছন্দ কথা বলে সে কিছুক্ষণ! তারপর আমাকে নিয়ে পড়ে!
বন্ধের দিনে সেইসব গালিগালাজ দাদাভাইয়ে শোনে। সে-সময় কখনো কখনো দাদাভাই নিজের স্ত্রীকে একটু ধামকি দেওয়ার চেষ্টাও চালায়! কিন্তু ওর সেই ধামকি কোনো কাজে দেয় না! ওর বৌয়ের বকাবাজি তখন আরো যেনো বেশীরকম বলক দিয়ে উঠতে থাকে! সেই ধামকি শোনার পরে, তার গলা তখন এতোটাই চড়ে যায় যে, পড়শীদের আর কোনো কথা শোনার বাকি থাকে না!
সেই কারণে দাদাভাইয়ে করে কী, মোটের ওপর সেইসব গালি-বকা, শাপ-শাপান্তিরে কানেই নেয় না। আমারেও বলে কানে না নিতে।
আমিও আমাকে দিতে থাকা ভাবীর গালিগুলারেÑকোনোরকম পাত্তা দেই না! তখন কিনা-ওই যে শুক্রবারে- শুক্রবারে- তখন- কোনো না কোনোভাবে আমার ভাইটায় বাসাতেই থাকে। কোনো না কোনোভাবে সে কিনা তখন আমার পাশেই থাকে। সেই কারণে আমার মনটা ততো বেজারও লাগে না!
কিন্তু নিত্যি অন্য সকল দিন, আমার দরোজার দিকে বল ছুঁড়ে মারার ঘটনাটা যখন ঘটে, তখন তো আমি থাকি একা। দাদাভাইয়ে তো তখন কোর্টে। আমার তখন কলজে না কেঁপে পারে! খুব কাঁপে!
জোরে ছুঁড়ে মারতে থাকা বলগুলা এসেÑ ধাক্কুর ধুক বাড়ি খেতে থাকে- আমার ভেঁড়ানো দরজায়। হায় হায়! কী আওয়াজের আওয়াজরে তখন! আল্লা!
ধুর! দেখো তো আমার কারবার! কী বলতে গিয়ে আমি – কী কী সব বলতে থাকি এইগুলা! খালি অকাজের কথা বলি! আর আসল কথা বলারই কিনা ফুরসত করতে পারি না!
মাস্টারি করি বলে কি এমন করি? দরকারী কথা বলতে গিয়ে কি এই কারণেই- বলতে থাকি সব অপ্রাসঙ্গিক কথা? বলছিলাম গত জানুয়ারি মাসে ছাদে গিয়ে মোরাকাবা করার পথে- হঠাৎ যে গ্যাঞ্জাম দেখা দিয়েছিলো, সেই কথা।
একদিন, প্রথম দিন; আশপাশ ফাঁকা পাওয়া গিয়েছিলো ঠিক! কিন্তু বাকি সব দিন তো আর তেমন ছিলো না! কতো কতো লোক ছাদে ছাদে!
আমি তাহলে করি কী! চারপাশের সব ছাদের কটকি-মটকি হাসি-চাউনির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কী! আর, ছাদে গিয়ে মান-ইজ্জত নিয়ে বসতে পারার উপায়টাই বা কী!
চিন্তা করে করে আর কূলকিনারা পাই না। এদিকে চারটা বাজতে না বাজতেই, আমি কিছুতেই আর, ঘরে, আমার শরীরকে তিষ্টাতে পারি না। খালি ছাদে যাওয়ার জন্য অস্থির লাগতে থাকে।
খালি মনে হতে থাকে; যাই! পুবের যে কোনো একটা পেয়ারা গাছের তলে, ছিঁড়া ভ্যারভ্যারা চেয়ারটা টেনে বসি গা! মোরাকাবা করি না করি, চোখ দুটা বন্ধ করে তো বসে থাকি কতোক্ষণ!
শেষে করি কী, ঠিকই ছাদের দিকে উঠি। তবে ছাদে আর পা রাখি না। বসে থাকি সিঁড়িঘরে।
সিঁড়িঘরের দরোজা বলতে একটা হালকা লোহার পাত, কবজা দিয়ে আটকানো। ছাদে যাওয়ার দরোজা। দরোজা পশ্চিমমুখী।
সেই দরোজা হাট করে খুলে, বসে থাকি কিছুক্ষণ। পশ্চিম দিকে আস্তে আস্তে সূর্য নেমে যেতে দেখি। মাগরেবের আজান পড়তে শুনি।
তখন খুশী লাগতে থাকে।
এই আজানটা পড়ে, তো, অন্য সকল ছাদের লোকসকলের কেনো জানি নিচে নেমে যাওয়ার ধুম পড়ে যায়। আজানের সাথে সাথেই একজন কাউকেও আর কোনোদিকে দেখা যায় না!
তাহলে আর কী করা! বিকালে না পারি না-ই পারবো! অসুবিধা নাই! মাগরেবের আজান পড়ার পরেই নাইলে মোরাকাবায় বসবো আমি! বসবো শান্তিহালে, এইখানে! মোরাকাবায়। এই অন্ধকার হয়ে আসতে থাকা ছাদে বসেই করবো!
এই যে সন্ধ্যাকালে মোরাকাবায় বসতে হয় প্রতিটা দিন, সেই কারণেই না ছাদ থেকে নামতে আমার অনেক দেরী হয়ে যায়!
সেদিনও এমন দেরী হয়ে গিয়েছিলো। দিনটার তারিখটা সঠিক মনে নাই।
তবে মনে আছে ঘটনাটা!
সেই রাতে দাদাভাইয়েরও চেম্বার থেকে ফিরতে অনেকটাই দেরী হয়। রাত সাড়ে দশটার বেশী।
অন্য দিন খেয়ে আর কোনোদিকে তাকায় না সে। সোজা ঘুম। সেইদিন দেখি, সে স্যান্ডেলে ছট্টস ছট্টস আওয়াজ তুলে আমার ঘরে ঢুকছে।
“কি রে? আইজ-কাইল তর এতোÑ ছাদে যাওনের ধুম পড়ছে ক্যান? তুই জানস না, সবগিলি বাসায় খালি মেস? কোন বেটায় তরে দেইক্ষা সিটি বাজাইয়া দিবো, নাইলে পিছে লাগবো; তহন নাকটা কার কাটা যাইবো? ভাইয়ের মান-ইজ্জতের পরোয়া নাই তর? ছাদে কি তর? কি রে?” দাদাভাই খ্যানখ্যানা, বিরক্তিভরা গলায় বলে!
আমি আচমকা অপমানের একটা ধাক্কা পেতে পেতে দাদাভাইয়ের মুখের দিকে তাকাই! ওর গলায় রাগ আর বিরক্তি, কিন্তু রাগের স্বাভাবিক ভঙ্গীর চেয়েও একটু বেশী চড়ানো শোনায় কেনো ওর গলা!
“তগো ভাবী তো ভালামাইনষের ঝি! উয়ে ক্যান মুখ ফুইট্টা তরে নিষেধ দিবো? দিলেই বা কী, তুই হোননের মাইয়া? আঁতকা তর ছাদে কি? কতা কস না ক্যান, কি রে ছেড়ী?”
দাদাভাই আরো জোরে চিল্লানি দেয়, তবে সাথে সাথেই ওর তর্জনীটা নিজের মুখের সামনে তুলে ধরে।
ওহ দাদাভাই! তুই একটা কী যে শয়তান!
এইটার মানে হচ্ছে ও এখন অভিনয় করছে। আমাকে এখন অবস্থা মতো কথা বলতে হবে!
আজকে বছর দুই হয়, অবস্থা বুঝে এমন করে চলা-চলতির বিষয়টা আমরা দুই ভাইবোনে ঠিক করে রেখেছি।
“কি? অহন কতা নাই ক্যান মোখে?” দাদাভাই জোর ধমক দেয়। তারপর টেবিলের দিকে দ্রুত এগিয়ে এসে ফিসফিসায়, “মন অনেক বেজার যাইতাছে তর, বইন? ছাদে গিয়া বইয়া থাকোন লাগতাছে, এই কারণে?”
আমার চোখে পানি চলে আসে। গলার ভেতরেও পানি ছল্লাৎ করে ওঠে। কোনোমতে গলাটা সামলে নিয়ে আমিও ফিসফিসাই, ‘মোরাকাবা করি আমি অইনে বইয়া! আঁতকাই শুরু করছি। অন্য ছাদের মাইনষের সামনে করি না। আন্ধার অইলে করি!’
“মোরাকাবার টাইমে কি কেউরে দোয়া দেওনের সিস্টেম আছে? থাকলে, দাদাভাইরে বেশী কইরা দিস! জুন-জুলাইর দিগে হাইকোর্টে এনরোল হওনের পরীক্ষা, বুঝলি? এইবার তো পার হওনের কাম!”
ঠিক। এই নিয়ে তিনবার হবে ওর হাইকোর্টের উকিল হবার পরীক্ষা দেওয়া। এইবার যেনো পাশটা করে। নাইলে আর কতো!
“দেখো! যতোই কিনা মোখে তালা দিয়া রাখো এহন, কোনো লাভ নাই! পষ্ট কইরা কইতাছি কথাটা! ক্লিয়ার কইরা মাথায় নেও! তুমি এই বাড়িতে থাকতে চাইলে, সোজা কলেজ যাইবা আর বাড়িত আইবা। আর কোনোদিগে য্যান পাও না যায়! ছাদের দিকে আর এক পাও দিছো – তো খবর আছে! তারের মতন সিধা হইয়া চলবা, কইয়া দিতাছি!” দাদাভাই গরজাতে গরজাতে বের হয়ে যায়।
৮ এপ্রিল ১৯৯৫
এইভাবে এইভাবে জানুয়ারি গেছে, ফেব্রুয়ারি গেছে। মোরাকাবা করে গেছি নিয়ম ধরে ধরে, একাই।
কেনো যে করেই যাচ্ছি, বুঝি না! কেনো যে বন্ধ করছি না, সেইটাও বুঝি না!
কি লাভ হবে এইটা করলে? একটা অদ্ভুত রাস্তার সন্ধান পাওয়া যাবে? জীবনের একেবারে শেষ টাইমে আব্বা যেমনটা পেয়েছিলো? তেমনটা? তেমনটা পেতে হয় মানুষেরে? পাওয়া দরকার? না পেলেই বা কী এমন লোকসান হবে? হবে কিছু?
কী জানি! আব্বা তো বিশেষ ভেঙে-চুরে কিছুই বলে যেতে পারে নাই!
আব্বা কি এমন কথাও বলে গেছে যে, এইটা করে হেন-তেন নানা লাভ পাওয়া যাবে? না! তেমন কিছুও বলে যায় নাই।
আব্বা শুধু আমাদের তিন ভাইবোনেরে বলেছে, তার দাদার দিয়ে যাওয়া এই যে গুপ্ত বিদ্যা, এটা অনেক দামী এক জিনিস! এইটা অতি সাধনার এক বিষয়। যে এই বিদ্যার সন্ধান পায়, তার মতন ভাগ্যবান দুনিয়ায় বিরল! আবার তার মতন ডরে-কাঁপতে থাকা মানুষও দুনিয়ায় আর কেউ না!
সেই লোক ভাগ্যবান, কারণ সে সাধন করার কপাল পেয়েছে! দুনিয়ার বহু বহুজনই এমন সাধনের ভাগ্য পায় না! অমন ভাগ্যবান সেই জনেরে আবার তবে অহর্নিশি ডরে কাঁপতে হবে ক্যানো?
কাঁপতে হবে না? সে যদি সৎ-অন্তরে সাধনভজন না করে, খাঁটি দীলে যদি নিজেরে মোরাকাবায় সপে না দেয়; তাইলে ইহ-জীবনেও পথের সন্ধান পাওয়া হবে না তার!
লোকে তো কেবল ভাত-কাপড়ের জন্য এই জীবনরে পায় না! আরো গূঢ় এক সাধনারও জন্য তো এই মানব-জনম!
কার কাছ থেকে আব্বা এই গুহ্য কথা জানতে পেরেছে? আব্বা বলে, তার দাদাজানই তারে এই কথা জানায়ে গেছে!
আব্বার দাদাজান আরো বলে গেছে, এই গুপ্তবিদ্যার হেফাজতের ভার যে পায়, তার দায়-দায়িত্বের কোনো সীমা থাকে না! নিজে তো সারাজীবন এই বিদ্যারে আগলায়ে রাখতে হয়ই হয়; আবার দুনিয়া থেকে যাওয়ার আগে, এই বিদ্যা, উপযুক্ত একজনের হাতে গচ্ছিতও রেখে যেতে পারতে হয়। এমন করাই নিয়ম! নাইলে আমানতের খেয়ানত করা হয়। মস্ত অন্যায়ের কর্ম হয় তাইলে সেটা!
সেই অপরাধের শাস্তি সে কতোটুকু পায় কেউ জানে না, কিন্তু তার বংশধরের জীবনÑ দুর্ভাগ্যের দংশনে দংশনে চিরÑছারেখারে যায়!
নিজের শরীরের অসুখের কামড়ে আব্বা যতো না যাতনা পেয়েছে, তার চেয়ে কোটি গুণ বেশী যন্ত্রণা পেয়েছে এই চিন্তায়! কার হাতে দিয়ে যাবেÑ তার দাদাজানের রেখে যাওয়া এই আমানত? নিজের পোলাপানদের কোনজনের হাতে দিয়ে যাবে এই গুপ্ত বিদ্যারে রক্ষার ভারখানা? কে পারবে এই ভার নিতে? কোনজন?
আব্বা মীমাংসা করতে পারে না! কোনো একজনকেই একলা ভরসা করতে মন সরে না তার!
এদিকে দিনে দিনে দিন তো তার ঘনায়ে আসছে! তাইলে এখন কার কাছে সপে যাবে সে? আর তো দেরী করা যায় না! আর তো টাইম নাই!
চিন্তায় চিন্তায় দিশাহারা আব্বা, শেষে না পেরে করে কী, তার বাচ্চাদের তিনজনের হাতেই আমানত রক্ষার ভারখানা দিয়ে দেয়!
এই তো ঘটনাটা! এই কারণেই তো আমাদের তিন ভাইবোনকে একত্র করে সেইদিন, তার দাদাজানের দেয়া আমানতখানারে, আমাদের হাতে তুলে দেয়া আব্বার? আমার কাছে এখন একেবারেই পরিষ্কার কিন্তু বিষয়টা!
সেই বিদ্যারে সেই আমানতেরে তো শুধু মনের ভেতরে রেখে দিলেই হয় না। সেইটারে পালন করতে হয়। পালন করতে হবে। এমনই নিয়ম।
আব্বার কথা মান্য করতে গিয়েই না এই মোরাকাবা করে চলছি আমি! শুরু করতে দেরী হয়ে গেছে আমার! সেই জন্য আমি অনেক শরমিন্দা আছি আব্বা!
কিন্তু শুরু আমি করতে পেরেছি! আপনার কথা অমান্য করি নাই আমি! আব্বা! শুধু আপনাকে মনে করে করে এই কর্ম করে যাওয়া আমার! এই মোরাকাবা! কোনো কিছু পাওয়ার আবার কি আশা থাকবে আব্বা আমার, এইখানে? আমার জীবন তো আপনি থাকতেই ধ্বংস হয়ে গেছে আব্বা! আমার আবার জীবন কি?
তাইলে করি না মোরাকাবা? শুধু আব্বার কথা মনে করে করেই, করি না? মরা বাপটার শেষ ইচ্ছাটা পূরণ হোক না এইভাবে? এইখানে আবার আমার লাভ-লোকসানের হিসাব করাকরি কী! আমার আবার জীবন! সেই জীবনের আবার আশা-করাকরি! সব তো কবেই শেষ হয়ে গেছে!
সেই কথাই বা এইখানে, এমনে এমনে, মনে করতে হবে কেনো আমারে? ছিহ! থাকুক ওইসব! থাকুক লুকানো!
তবে একটা বিষয় বুঝেছি, মোরাকাবার একটা খুব উপকারিতা আছে! আমি তো পাচ্ছি উপকার!
কি সেই উপকার? না! এই যে কাঁদতে পারছি আমি! এই যে, অন্তর আর শরীর ঝাঁকায়ে-কাঁপায়ে, চোখের পানি নেমে আসছে আজকাল আমার! আমি কাঁদতে পারছি। কোনো কারণ ছাড়াই হু হু করে কান্নায় ভেঙে পড়ছে আমার চোখেরা। প্রত্যেকটা দিন।
এইটা কী সোজা-মোজা বিষয়! না না! এটা কোনো সহজ বিষয় নয়! আগে শুধু আমার শরীরটা আর মনটা ফাতফাত পুড়তে থাকতো, জ্বলতে থাকতো। ধিকিধিকি দাউদাউ! চোখে, পানির কোনো চিহ্ন্মাত্র নাই তখন। শুধু আগুন! খালি দগদগা আগুন!
এখন সেই পোড়াপুড়ির বিষয়টাকে কোথাও যেনো দেখতে পাই না। একদমই দেখতে পাই না।
এটা কি মোরাকাবা করার ফজিলত? এটা কি সেটা করারই সুফল?
নাকি এই যে আজকে – অনেক কয়টা মাস ধরে- একা একা, নিরালা ছাদে এসে বসে থাকতে পারছি; আকাশ দেখছি, কালো রাতকে দেখছি, তারাদের দেখছি! এইসব দেখার কারণে মনটা এমন শান্তিতে আছে?
কতো আশ্চর্যের বিষয়ই না দেখতে পেয়েছি এই কয়দিনে! এই ছাদে এসে!
পেয়ারা গাছকয়টায় নতুন পাতা আর ছোটো ছোটো, টোবলা-টোবলা, সাদা ঝুরঝুরি ফুল ধরতে দেখেছি! ফুলের পরে কড়া কড়া পেয়ারাগুঁটিও আসতে দেখেছি!
এইসব তো একেবারে নতুন কাহিনী আমার জীবনে!
এইসব কিছু তো আগে কোনোদিন দেখি নাই! গাছে গাছে এমন নতুন পাতা আসা, এমন ফুল ধরা, এমন কচি কচি গুঁটি আসা Ñএমনটা তো জীবনেও দেখি নাই! এমন করে জীবনেও তো কোনোদিন নিরালা ছাদে গিয়ে, একা, বসে থাকি নাই!
চারতলা বাড়ি উঠেছে তো কী, আমার আবার ছাদে যাওয়ার কোন দরকার? ছাদে যায় খালি দাদাভাইয়ে! হয় পানির ট্যাংকির ঝামেলা দূর করতে, নয় ওই কয়টা পেয়ারাগাছের ভালোমন্দ চেক করতে।
সেটাও তো নিয়মিত না! ছাদে সে ওঠে মাঝে মধ্যে।
বরং আজকে দুই তিন মাস হয়, আমিই নিত্য লাগাতার আসছি ছাদে।
হতেও পারে, এমন একটা নতুন জায়গায় একা একা আসা ও অনেকক্ষণ থাকার কারণে, আমার মনটা একটু আলাদা কিছুর স্বাদ পাচ্ছে! হতে পারে সেই কারণেই, এমন শান্তি শান্তি লাগছে আমার এখন! সেই জন্যই দিনে দিনে কেবল শান্তি পাচ্ছি ।
হতেও পারে যে, মোরাকাবা আসলে কোনো ইস্যু না!
৯ এপ্রিল ১৯৯৫
এই ডায়েরি লেখালেখিটা আমার কাল হয়েছে!
অন্য সকল দরকারী কাজ বাদ পড়ে থাকছে, এদিকে কিনা বসে যাচ্ছি এই ডায়েরি লিখতে!
সমস্তটা বিকাল তো যাচ্ছে এখন ছাদে বসে থেকে থেকে! মোরাকাবা করে করে। সন্ধ্যার পরেও আজকাল আর দুদ্দাড় করে নিচে নেমে আসি না। রাত একটু বাড়িয়ে, তারপর নামি আজকাল! তাও আবার কেমন করে যে রাত এমন বেড়ে যাচ্ছে, সেই হুঁশটা থাকছে না আমার ইদানীং!
বিষয় কী!
অতোখানি সময় ওইভাবে কাটায়ে এসে যদি আবারÑ ডায়েরি খুলে ঝুপ করে বসে যাই, তাহলে কলেজের কাজগুলা কখন করি!
এই যে আজকে এপ্রিলের ৯! ১৫ তারিখ থেকেই শুরু হবে প্রথম সাময়িকী পরীক্ষা! আমার তো এখন কলেজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা! প্রশ্ন করা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, তাই না?
কিন্তু কিসের কী! প্রশ্ন করার কথা মাথায়ও থাকছে না আমার।
খালি ডায়েরি খুলে এই কথা সেই কথা লিখছি তো লিখছিই। এমনটা কেনো হচ্ছে! মাথায় কোনো দোষ পড়ে গেছে নাকি আমার?
পড়লে পড়–ক। এখন তো মনের একটা বিশেষ কথা লিখে নেই আগে।
সেটা হলো এই, জানুয়ারি মাসে বা ফেব্রুয়ারি মাসে যা হয় নাই, হঠাৎই মার্চ মাসে সেটা হয়ে যায়।
কি সেটা?
সেটা এক আশ্চর্য বিষয়। মার্চ মাসেই প্রথম, একটা বিষয় হঠাৎ আমার খেয়ালে আসে! এই সময়ই প্রথম আমার নজরে আসে যে, মাগরেবের আজানের পরের সন্ধ্যাবেলাটা মাটিতে ও আকাশে একইরকম থাকে না! দুই জায়গায় সন্ধ্যা হয়ে যায় দুই রকম।
এবং আমি আরো একটা বিস্ময়কর ব্যাপারও টের পাই- এই মার্চ মাসেই! সেটা হলো মাগরেবের আজানের পরে আকাশে আকাশে যে সন্ধ্যা ছড়িয়ে থাকে; সেই সন্ধ্যার জন্য কেমন একটা ভালো লাগা টের পেতে থাকি আমি- আমার মনের ভেতরে।
সেই ভালোলাগাটা এমন-তেমন হালকা কোনো বিষয় নয়! আমি ক্রমে বুঝতে পারি, সেটা খুব তীব্র একটা ভালোলাগা! অই তো- এই মার্চ মাস থেকেই এমনটা বোধ করতে থাকি আমি। ওই সময় থেকে -আকাশের সন্ধ্যাটাকে Ñঅনেক অনেক ভালো লাগতে থাকে।
এই মার্চ মাসেই আমি আমার ভেতরে আরো একটা সর্বনাশা বিষয় জন্ম নিতে দেখি! দেখে আমি তাজ্জব হয়ে যাই। আমি পুরা হতবাক হয়ে যাই।
কি সেই বিষয়?
ওই যে সন্ধ্যাটাকে আকাশে ছড়ানো দেখি, তার কথা খাতায় লিখে রাখার ইচ্ছার বিষয়টা। ইচ্ছা হতে থাকে, এই সন্ধ্যা বিষয়ক কথাবার্তাগুলা লিখে ফেলি। অনেক অনেক কথা লিখি! অনেক কথা লেখার Ñইচ্ছা হতে থাকে আমার! অনেক ইচ্ছা!
এমন ইচ্ছার জন্ম নেওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু, এই যে এই বছরের মার্চ মাসের শুরুর ঘটনা!
তারই জের কিন্তু এই যে ডায়েরি লিখে যাওয়াটা! এই যে লিখছি!
তবে, আর এমন অহেতুক কথাবার্তা লিখতে লিখতে রাত পার করা যাবে না। যাবেই না। অন্তত আজকে তো আর নয়ই।
আমাকে পরীক্ষার প্রশ্ন বানাতে হবেই আজকে! তারপর কালকে সকালে কলেজে গিয়ে, প্রথমে, বড়ো আপার কাছে সেই প্রশ্ন জমা দিতে হবে। তারপর আছে বড়ো আপার অনুমোদন নেওয়া। যদি সে বলে, প্রশ্নের ধরন-ধারন ঠিক আছে; তখন সেইটা অফিসের ক্লার্ককে দেওয়ার কাজটা করার আছে। টাইপ করে দেয়ার জন্য তাকে দিলেই শুধু হবে না! বরং তার পাশে বসেও থাকা লাগবে! নয়তো সময়ের কাজ সময়ে করে দেবে না সে!
ওরে মা! কতো দুনিয়ার কাজ! চাকরিরে মায়া না করার সাহস- কই পাই আমি!
১১ এপ্রিল ১৯৯৫
আজকে কয়েকদিন হয়, আমি কিছুই লেখার সময় পাই নাই! একদম সময় পাই নাই!
সেইদিন, সেই যে নয় তারিখের সকালবেলা, আমি তো প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করে নিয়ে গেছি বড়ো আপার কাছে! প্রশ্ন হাতে পেয়ে বড়ো আপা ভারী অদ্ভুত একটা কাজ করে! সে করে কী- আমার মুখ বরাবর প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয়!
ক্যান!
প্রশ্ন নাকি কেমন মেন্দা মেন্দা লাগতাছে, তার কাছে! তেমন একটা স্মার্ট কিছু হয় নাই এইটা! মোটেও চোস্ত প্রশ্ন বানাতে পারি নাই আমি।
“এই গুণ নিয়া তুমি আমার কলেজরে নামজাদা করবা-সেই আশা করো নাকি? কিচ্ছু হয় নাই এইটা!” বড়ো আপা আমাকে উড়ায়ে দেয়; “যাও, সাদেকার কাছ থেইক্কা জেনে আসো-কেমনে কী করতে হয়!”
ওই তো সাদেকা আপা! স্কুল সেকশনের সিনিয়র বাংলা আপা। বি.এ, বি.এড। বিশ বছরের অভিজ্ঞতা আছে তার! আর, আমি জয়েন করেছি ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে, কলেজ সেকশন খোলার সময়ে। এম.এ পাশ হলে কী, অভিজ্ঞতা আছে কোনো?
নাই। কিছুমাত্র অভিজ্ঞতা নাই। সকল রকমের অভিজ্ঞতা আছে শুধু সাদেকা আপারই!
আমার আরো একটা ডিগ্রি কিন্তু আছে।
কিন্তু থাকুক বরং। ওটার কথা আর না-ই বা বলি! ওইটার জন্য যা অপদস্থ আমারে হতে হচ্ছে! তার কোনো সীমা নাই! বড়োই অপদস্থ হচ্ছি আমি পদে পদে, ওই ডিগ্রিটার জন্য!
কে অপদস্থ করে?
কলেজের কলিগরা আছে না? সঙ্গে ওই সাদেকা আপা আছে না? কলেজ সেকশন খোলার পরে, সেই সাদেকা আপাই, কলেজে জয়েন করতে চেয়েছিলো। বাংলা পড়ানোর জন্য। কিন্তু বড়ো আপা তারে নেয় নাই! নেয় নাই, কারণ তার এমএ ডিগ্রি করা নাই! এই হলো সমস্যাটা!
আচ্ছা, কোনো কিছু দিয়ে কি আমার ওই বাড়তি ডিগ্রিটাকে নাই করে দেওয়া যায়? দেওয়া যেতো যদি!
যাক, যাক!
আমি না নিজের কাছেই কিরা-কসম কেটেছি? কিরা-কসম কেটেছি যে, এইসব কোনো কথা নিয়ে কোনো আওয়াজ করবো না? তাহলে এখন এইটা আমি কি করছি?
ঠিক না ঠিক না! ঠিক না।
তারপর বড়ো আপা আমার প্রশ্নটা ফিক্কা ফেলে দেয়ার পরে, আমি কতোক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায়ে থাকি! তারপর চোখের পানিকে চোখের ভিতরে ঠেলে পাঠায়ে, বড়ো আপার হুকুম মতো কাজ করা শুরু করি। সাদেকা আপাকে প্রশ্ন দেখাতে যাই!
ওমা! সে আমার প্রশ্ন দেখে দেবে কী, কেমন সব আগড়ম-বাগড়ম করা শুরু করে! আসল কাজটা বাদ দিয়ে- সে কিনা আমাকে- বড়ো বড়ো উচিত কথা শোনাতে থাকে।
আল্লা! তার সেইসব বড়ো বড়ো কথার নড়াচড়া দেখতে দেখতে, বড়ো বড়ো হম্বিতম্বি শুনতে শুনতে, আমার প্রায় ফিট হওয়ার অবস্থা হয়!
শেষে নাকটারে কুঁচকানি দিয়ে সাদেকা আপা আমারে বলে, আমি যেই প্রশ্নটা করেছি, সেইটা দিয়েই কোনোরকমে কাজ চালানো যাবে! নতুন কিছু করার দরকার নাই!
বড়ো আপা তখন কী করে, আমার প্রশ্নটারে টাইপ করতে দেয়।
তো, গত কয়দিন কিছুই লেখি নাই, সেটা ঠিক।
কিন্তু তাই বলে মোরাকাবা করা কিন্তু আমার বন্ধ নাই! ও মা রে! কেমনে বাদ দেবো! আব্বার মন যদি কষ্ট পায়! আর, আমিই বা না-করে থাকবো কেমনে!
১২ এপ্রিল ১৯৯৫
আজকে, আজকে একটা কেমন ঘটনা ঘটেছে! কেমন একটা অস্বস্তিকর ঘটনা! আমার অনেক অস্থির লাগছে। আমার -আমার- ভালো লাগছে না কিছু।
কেমনে যে কী হলো, বুঝলাম না কিছু। কিন্তু হয়েছে!
এখন যন্ত্রণায় ছটফট করতে হচ্ছে আমাকে। অনেক ছটফট করছি আমি। অথচ কেনো যে কেমন করে এমন কঠিন যন্ত্রণাটা আমাকেই পেতে হলো-তার সঠিক কারণটা ধরতে পারছি না আমি! আহ!
এতোদিন ধরে রোজ রোজই তো, প্রায় বিকাল থেকে রাত আটটা সাড়ে আটটা পর্যন্ত, ছাদে থাকছি! কোনোদিন তো কিছু হয় নাই! কোনোদিনই তো কোনো ঝামেলার কিছু ঘটে নাই!
আজকে আচমকা এটা কেমন অশান্তির বিষয় ঘটলো! খুব অশান্তি হচ্ছে আমার! শরীরটা কেমন জানি করছে। কেমন জানি একটা অস্বস্তি!
না, ব্যথা-বেদনা জাতীয় কিছু না। জ্বালা-পোড়া জাতীয়ও কিছু না! সারাটা শরীর ভরে কেমন জানি একটা কী পিলপিল করে নড়ছে! সমস্তটা শরীরে, মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত Ñকী যেনো- কী জানি একটা কিছু খালি পিলপিলাচ্ছে!
মনে হচ্ছে কিছু একটা জিনিস যেনোÑআচমকা আচমকা ছিটকে ছিটকে উঠছে, আমার শরীরের ভেতরে! তারপর জোর দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিচ্ছে কী জানি কিসে! পিলপিল পিল। পিলপিল পিল। ছিলবিল ছিলবিল!
অনেক খারাপ লাগছে। দম ছটফট দম ছটফট লাগছে।
হঠাৎ করে আজকে এটা কী হলো! এটা কী হলো রে আল্লা!
একবার মনে হচ্ছে পিলপিল পিলপিল কাঁপাকাঁপিটা হচ্ছে কেবল শরীরের চামড়ায় চামড়ায়। একবার মনে হচ্ছে, না ওইখানে না! হচ্ছে একদম আমার হাড্ডি-গুড্ডির ভেতরে! ওইখানে, ওই হাড্ডির ভেতরে ভেতরেই যেনো পিলপিলানি কিলবিলানি ছটকে ছটকে উঠছে!
শরীর তো শরীর; পায়ের পাতা, হাতের তালু, মুখ চোখ কিচ্ছু বাদ থাকছে না!
আল্লা! কী হলো এইটা! কিছুর মধ্যে কিছু না, এইটা কী আজাবের মধ্যে পড়লাম! আহ! এইটা কেমন জ্বালার মধ্যে পড়লাম রে! আজকে বিকাল থেকেই সবকিছু উল্টাপাল্টা। সব কিছু বড্ডই উল্টা-পাল্টা যাচ্ছিলো।
হয়েছে কী, আজকে ছাদে গেছি অন্যদিনের চেয়েও আগে।
অন্য অন্য দিন তো যাই সাড়ে পাঁচটায়। আজকে গেছি ঠিক সাড়ে চারটার সময়।
কী মনে হলো, চলে গেলাম! এপ্রিল মাসের সাড়ে চারটার রোদ! সেটা কী সহজ, সরল, ঠা-া রোদ?
ইস! কে বলে!
ছাদে পাড়া দিতে গিয়ে দেখি, ও রে মা! আকাশ বাতাস আর এই খোলা খা খা ছাদটাÑ গরমে খনখন করছে! এমন বেধোন্ধা গরমের মধ্যে, কোনো টবের পাশে গিয়ে বসেই তো, আমি শান্তি পাবো না! এই তো ছুটকা-ফুটকা লিকলিকা তিনটা গাছ। তারা দেবে আমারে ছায়া! এমন আশা কোন প্রাণে করি আমি!
তাইলে কী করা! ফিরে যাবো নাকি ঘরে তবে? পরে আসবো নে?
এমন কথাও মনে নড়ে ওঠে একবার। তার পরের মুহূর্তেই আবার মনে হয়, নাহ! রোদেরে কিসের ডর! পশ্চিমের টবটার কাছে গিয়ে যদি বসি, কিছুটা ছায়া কী না পাওয়া যাবে নাকি!
রোদকে অগ্রাহ্য করেই আমি তখন, গিয়ে বসি, পশ্চিমের পেয়ারা গাছটার সামনে। সেই বসাটা মনটাকে এমন খারাপ করে দেয় যে, কী বলবো!
পশ্চিমের টবের পেয়ারা গাছটা একটু ঝাঁকড়া! এইটা একটু বেশী ডালপালাঅলা। চেয়ারটা টেনে নিয়ে ওটার সামনে গিয়ে বসি। বসে, গাছের দিকে তাকাই! কিছু দেখার জন্য তাকাই না! এমনি এমনিই তাকাই।
প্রতিদিনই তো এমন কতো কতোবার, সব কয়টা গাছের দিকেই, একটু পর পর নজর চলে যায়! আজকেও তেমন অকারণে, এমনি এমনিই গাছের দিকে চোখ চলে গেছে।
অন্য দিন, গাছে ডাল-পাতা ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। আজকে দেখি, পশ্চিমের গাছটার একেবারে উঁচুর ডালটাতে একা একটা পাখি বসা! খুব ছোটো, গোলগাল পাখি। একদম ছাই ছাই ঘিয়া তার গায়ের বর্ণ!
পাখিটা যেনোÑ তার ঘাড়টা অল্প বাঁকা করেÑ আমারে খেয়াল করলো একটু! কিন্তু ভয়-ডর যে কিছুই পেলো না; তা স্পষ্টই বোঝা গেলো। আমার বসার আওয়াজ পেয়েও সে, একচুল নড়ন পর্যন্ত দিলো না। আকাশের কোন দূরের দিকে যেমন চেয়ে ছিলো, তেমন চেয়েই থাকলো!
অদ্ভুত পাখি তো! ডরায় না।
তারপর গাছের ডালে পাখি বসে থাকলো পাখির মতো! আমি, গাছের ঝিরিঝিরি ছায়ায়, ছেঁড়াখোরা চেয়ারটাতে বসে থাকলাম আমার মতো।
কোথাও কোনো শব্দ নেই। কোথাও কোনো অশান্তিও নেই। এমন রোদ দগদগা সময়ে; কোনো ছাদে মানুষ তো দূর, একটা পাতি কাক পর্যন্ত নেই। শুধু আমি আছি ভাঙা-চোরা চেয়ারটার মতোই একা! ছাদে পড়ে আছি!
বসে আছি বসে আছি, হঠাৎ কিছুর মধ্যে কিছু না; মনে পড়লো, দুনিয়ায় আমার বাপ-মা বলতে কেউ নাই! মা যখন ছিলো, তখন সে আসলে থেকেও না-থাকার মতো একজনই ছিলো।
আমাদের তিন ভাইবোনকে নিয়ে আসলে ছিলো আব্বা! কেঁপেকুপে, ব্যাঁকাতেরা হয়ে হয়ে, আমাদের জন্য ছিলো আসলে আমাদের আব্বাই।
সে-ই আব্বাও আজ কতোদিন হয়Ñ এই দুনিয়ায় নাই। অন্য ভাইবোনেরা যেমনে পারে ভালো আছে। আমিও ভালো।
কিন্তু আমার মন জানে, এইটা কেমন ভালো! এখন, যে পারে সে তো আমাকে জুতা মারেই! যে পারে না সেও মারে! আমি এমন ভালো আছি।
এই কথা মনে ওঠানামা করতে থাকে একদিকে, আরেকদিকে আমার চোখে কান্নার ঢল ছুটতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে, ফোঁপাতে ফোঁপাতে কতোক্ষণ যায়। তারপরের কতোক্ষণ যায়- নিজের মনকে গুছিয়ে নিতে নিতে! এমনে এমনে কখন যে মাগরেবের আজানের টাইম হয়ে যায়!
আজান পড়ে। তখন আমার মনেও, আসমানে আসমানে সন্ধ্যার শোভা দেখার সেই ছটফটানিটা দেখা দেয়।
কতো সুন্দর এই সন্ধ্যাটা আজকে! আসমানের ওই পশ্চিম কিনারের কাছে, এই তো এক চিলতা চাঁদ দেখা গেলো!
আকাশের দক্ষিণ কিনারে একটা তারা। অনেক দূরের এই তারা? কে জানে, কী তার নাম! কতো ঝিকমিক করে তারাটা!
তখন পর্যন্ত শরীর ঠিক। কান্নাকাটির পরে মনটাও ঠিক।
আমার সেই মনের কিন্তু- আজকে ওই সন্ধ্যা পার হয়ে যাবার পরেও -মনে আসে না, একবারও মনে আসে না, আজকের মোরাকাবা করা হয় নাই! একটুও মনে পড়ে না যে, এতো সময় চলে গেছে; আজকে এখনো মোরাকাবা করার নামও নেই নাই আমি!
এইটাই না এখন দিনের সকল কাজের চেয়ে বড়ো কাজ, আমার জন্য? এমনই তো মনে করি আমি! তাই না?
অন্য দিন এই মোরাকাবা করার তাগাদাটাই তো আমাকে ঠেলতে থাকে। আগাগোড়া ঠেলতে থাকে। আর আজকে কী ব্যাপার! এটার কথা যেনো একটুও মনে নাই আমার! ওই আসল কাজের কথাটাই যেনো মন থেকে একদম নাই হয়ে যায় আমার! একেবারে মন থেকে মুছে যায়- আজকের সেই সন্ধ্যার টাইমে!
তারবাদে মোরাকাবার কথাটা কখন আসে আমার মনে? যখন কিনা আবার আরেকটা আজানের আওয়াজ আমার কানে এসে ঝাপটা দেয়, তখন!
তখন ছাদে ছাদে অন্ধকারটা একটু কালো, ঘুরঘুট্টি হয়ে এসেছে। আকাশের যেদিকে তাকাচ্ছি, চোখে পড়ছে হালকা-পাতলা তারার শোভা।
ছটফটা, গরম বাতাস এসে এসে যে আমার শরীরে আর পেয়ারা গাছ তিনটায় হঠাৎ হঠাৎ ঝাপটা দিচ্ছে-সেটাও টের পাচ্ছি তখন খুব করে।
মনে কেমন একটা ঢিলাঢালা শান্তি তখন! যেনো কিচ্ছু আর করার নাই আমার! কোনো কাজ করাও আর বাকি নাই আমার! এখন শুধু অন্ধকারে পা ছড়ায়ে বসে থাকলেই চলে! আর কিছু করতে হবে না!
এমন বেদিশা, উদাস থাকার সময়ে হঠাৎ আবার আজান শুনি ক্যান? এই সময়ে আবার আজানের আওয়াজ শোনা যায় যে! কি বিষয়?
এই মাত্র না মাগরেবের আজান পড়লো! এখনই আবার এটা কোন আজান? খেয়াল করে দেখি; আমি হুঁশহারা হলে কী, দুনিয়া চলছে দুনিয়ার মতোই।
এটা এশার আজান! কেমনে কেমনে রাত অনেক হয়ে গেছে!
এখন কী করি!
মোরাকাবা করা বাদ দিয়ে দেই তবে আজকে? ঘরে গিয়ে ঘুমানোর আগে কোনোমতে করে নেবো নে?
এমন চিন্তাটা মাথায় আসে বটে, কিন্তু আমার মন সেটা কিছুতেই মানতে চায় না! কিছুতেই সে আমাকে উঠতে দেয় না।
হাজার বিজারবার আমার মন আমাকে গুঁতাতে থাকে, ঠেলতে থাকে; বলতে থাকে, ‘মোরাকাবা এইখানেই কর। করে, তবে যা! কতোক্ষণ আর টাইম লাগবে? বেশী তো না! তাইলে শুরু করলেই তো হয়? কর রে! কর কর! কর কর কর!’
সেই ঠেলার চোটে আমিও দিশা-বিশা না পেয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলি। লম্বা দম আপনা-আপনিই নিতে থাকি, বের করতে থাকি। তারপর অন্য সবকিছুও আপনা আপনিই হয়ে যায়।
কতোক্ষণ যে ধ্যানে থাকি আমি, আন্দাজ করতে পারি না।
কিন্তু মোরাকাবার মূল কাজ শেষ করে, নিজেকে স্বাভাবিক দশায় ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটা চালাতে চালাতে টের পাই, বড়ো শান্তি শান্তি লাগছে যেনো ভেতরটা! চোখ আমার বন্ধ; কিন্তু বড়ো ভারমুক্ত ভারমুক্ত লাগছে যেনো আমার শরীরটা! আমার মনটাকেও তেমনই লাগছে!
অন্য দিনের চাইতে অনেক আলাদা রকমের হালকা লাগছে নিজেকে আমার! বড়ো আনন্দ হচ্ছে যেনো! এই বোধটা মনে নিয়ে শেষ দমটা টানি।
এটা অনেক অনেক লম্বা একটা দম টানা ও ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া। পুরাটা শরীর আর মনকে একদম ছেড়ে দিতে হয়, এই সময়ে। মোরাকাবার এই একদম শেষ অবস্থাটায়।
চোখ বন্ধ আমি দীর্ঘ দীর্ঘ দম টেনে নেই, অন্য দিনের মতোই। সবই স্বাভাবিক তখনও। তারপর ধীরে খুব ধীরে দম ছাড়া শুরু করি যেই; কী জানি একটা কিছু এসে ঝাপটে পড়ে আমার মুখে, গলায়, হাতে, পায়ের পাতায়।
কিছু একটা আচমকা এসে যেনো- আমার সাথে বাড়ি খেয়ে যায়। সূক্ষ্ম, মিহি ধরণের, আঁশ আঁশ কিছু যেনো ওটা! অজান্তে মাকড়সার জালের সাথে বাড়ি খেলে যেমন লাগে, তেমন লাগতে থাকে আমার শরীরের খোলা জায়গাগুলো।
চুলবুল অস্বস্তি লাগা শুরু হয়ে যায় পলকেই। আমি সঠিক রীতিতে শেষ দমটা নিতে পারি আজকে ঠিকই, কিন্তু নিয়ম মেনে ছাড়তে পারি না। ধুড়–স করে দম ছেড়ে দিয়ে চোখ খুলে ফেলি।
শরীরে এটা কিসের ঝাপটা লাগলো! মাকড়সার জালের মতো কী যেনো একটার ঝাপটা যেনো খেলাম? কি?
মুখে হাতে বারবার হাত বুলায়ে বুলায়ে মাকড়সার জালকে সরায়ে দিতে চেষ্টা করি! অনেকবার করে হাত বুলাই। যতোক্ষণ হাত বুলাই, কোনো অস্বস্তি থাকে না। মনে হতে থাকে, সরে গেছে জিনিসটা। কিন্তু যেই হাত বুলানো বন্ধ করি, ওমা! জাল তো সরাতে পারি নাই! মাকড়সার জালটা যেনো আমার শরীরে জেবড়ে আছে জালের মতোই! একটুও সরে নাই তো!
এটা কেমন বিষয়!
মাকড়সার জাল সরাতে আবার এতো কায়দা করতে হয় নাকি? সরে না ক্যান শরীর থেকে জিনিসটা?
কিচ্ছু বুঝতে পারি না।
বিষয়টা কী! বিষয়টা বোঝার জন্য্ তো তবে আলোর সামনে যাওয়া দরকার!
এই বাড়িতে ড্রেসিং টেবিল একটাই। সেইটা ভাবীর ঘরে। সেইখানে গেলে অন্যরকম তুফান উঠবে। ওইখানে যাওয়ার চিন্তা বাদ!
আমার ঘরে আছে একটা মাঝারি রকমের আয়না। হতভম্ব চোখে সেই আয়নায় দেখা শুরু করি নিজের মুখ। না, মুখে তো কোনো আঁশ-ফাশের চিহ্নও দেখা যায় না!
ঘরের বড়ো বাতিটা জ্বালায়ে নিজের হাত দুইটারেও তন্ন তন্ন করে তল্লাশ করি। কোনো আঁশ বা জালের টুকরা-টাকরাও তো নেই কোনোখানে! তাহলে নিজেকে এমন জালে আটকানো জালে আটকানো লাগছে কেনো?
আর, জবর পিলপিলাচ্ছে তো! জোর পিলপিলাচ্ছে!
কী হলো এইটা!
ভয় আর ভাবনা নিয়ে আমি কতোক্ষণ থোম ধরে বসে থাকি। মনটা কেমন যে কু গাইতে শুরু করে! না জানি কোন ঝামেলা বান্ধাইছি এই আমার শইল্লে! না জানি কোন ফ্যাসাদে পড়া আছে কপালে!
থাকলে আর কী করা! তুমি যাও বঙ্গে, কপাল যায় সঙ্গে! সহ্য করোন লাগবো, কপালের ঝঞ্ঝাট!
মনকে কোনোরকমে এই বুঝ দিয়েÑ নিজেরে ঠেলে নিয়ে যাই বারান্দার বেসিনে! মুখহাত তো ধুতে হবে! এতোক্ষণ ছাদে ছিলাম! নিজেরে একটু পানির ঝাপটে ঝাপটে ঠান্ডা তো করি!
বারান্দার ওই শেষ মাথায় চল্লিশ ওয়াটের লাইটটা! তার আলোতেই রাতে বারান্দা ও নিকট সিঁড়ির সব কাজ সামাল দেয়া হয়! বেসিনের আলোর দরকারটাও অইটাতেই মেটে!
আমি বেসিনে গিয়ে মুখে পানির ঝাপটা দেই। কোনো অসুবিধা লাগে না। তারপর কনুই পর্যন্ত হাত দুইটারে ধোয়া শুরু করি! ধুতে ধুতে আমি দেখিÑ কেমন অদ্ভুত এক দৃশ্য যেনো দেখা যায়! বারান্দার ক্ষীণ হলুদ আলো আমারে দেখি এক সর্বনাশা বিষয় দেখাচ্ছে! ওমা! আমার ভিজা হাত দুইটারে এটা কেমন ন দেখায়!
কী দেখি আমি এটা!
দেখি কী, কনুই থেকে হাতের পাতা পর্যন্ত অংশে পানি লাগা মাত্র, কেমন একটা লাল রঙ ঝটকা দিয়ে দিয়ে ভেসে উঠছে আমার মাংসের ভেতর থেকে!
যেনো চামড়ার নিচে, হাড্ডির কোন ভেতরে, লুকানো ছিলো এই রঙ এতোদিন! এখন ধুড়মুড় করে উঠে আসছে চামড়ার উপরে! গবগবা লাল রঙ।
আমার চোখের সামনে আমার দুই হাত! সেই হাতের কনুই থেকে পাতা পর্যন্ত অংশ গমগমা লাল হয়ে আছে, আমি দেখতে পাই! তারপর দেখা যায়, কিছুক্ষণ থির হয়ে থাকা সেই লালরঙটা ছলবলাতে ছলবলাতে হয়ে যাচ্ছে সবুজ। এমন তেমন সবুজ না! একেবারে কচি কলাপাতার সবুজ।
হায় হায়! এইটা কী! আতঙ্কে আমার গলা দিয়ে চিল্লানি বের হয়ে আসতে চায়! কিন্তু সেই বিপদের কালেও, আমার মন আমারে সামলানি দিতে ছাড়ে না।
না না! অবস্থা যতো বেগতিকই হোক, কোনোরকম চিৎকার গোঙানি কিচ্ছু করা যাবে না কিন্তু! ভাবীর কানে য্যান না যায় কিছু! ওই কানে কিছু যাওয়া মানে কিন্তু চৌদ্দ গুষ্ঠীর জাত-মান সব খোয়ানো!
নিজেরে সামলাতে গিয়েও কি আমি আওয়াজ ফেলেছিলাম নাকি? আমি সেটা ধরতে পারি নাই! কিন্তু কোনোমতে হাতমুখ মুছতে মুছতে নিজের ঘরে ঢুকেও সারি না, দাদাভাইয়ে হুমধাম কদমে এসে দাঁড়ায়, আমার পিছনে!
“কি হইছে রে হেনা? কেমুন য্যান গোঙানি দিয়া উঠলি, মনে হইলো? ডরাইছস নি কোনো কারোণে?”
ওহ! আমার ভাইটায় তাইলে একটা কান দিয়াই থোয় আমার দিগে! চোখে পানি না এসে পারে এরপর? চোখ ভরা কান্না নিয়ে আমি দাদাভাইরে আমার হাত দুইটার কারবার দেখাতে যাই।
ওরে বাবা! হাতে তো একটু আগে দেখা দেওয়া সেইসব রঙের কোনো চিহ্নই নাই! যেমনকার স্বাভাবিক হাত তেমনই তো আছে। এই তো! লাল বা কচি সবুজ-কোনো রঙেরই তো কোনো নমুনা-নিশানা দেখা যায় না এখন, আমার হাতে!
আরে বাবা! এটা কী ঘটনা!
হাতে সেই আচমকা হাজির হওয়া রঙদের দেখা যায় না! তবে সেই সিরসির পিলপিলানিটা যেমন ছিলো, তেমনই যে আছে-সেটা বুঝতে পারি!
চুলবুল চিলচিল পিলপিল-কেমন জানি চুলকানির মতো একটা ব্যাপার! শুধু হাতেই না, সারাটা শরীরেই যেনো! চলছে।
“কি কামটা আছিল গয়া গাছের কাছে গিয়া বহোনের? শইল্লে তর মাকড়সার জালই যে লাগছে, কে কয়? গাছে গাছে দুনিয়ার কালা পিঁপড়ার বাসা! হইতে পারে, দুই চাইরটা কালা পিঁপড়ায় অগো ডিম-ডাম লইয়া তর শইল্লে পইড়া গেছিলো! হেইর তেনে যে এলার্জি হইয়া যায় নাই, কওন যায়?” দাদাভাইয়ে দাঁত কিড়মিড়ানি দিতে দিতে কথা শেষ করে; “খালি গ্যাঞ্জাম বান্ধান ছাড়া আর কিছু পারোস না, না? অক্ষণে গরম সেঁক দে শইল্লে। সেঁক দিয়া ঘোম দে। যাইবো নে গা এলার্জি!”
আমি ইস্তিরিটার সুইচ অন করি। সর্বোচ্চ হিটের ঘরে দেই নবটা। তারপর রুমালটাকে ইস্তিরির শরীরে ঠেসে ধরে, কোনোরকমে একটু গরম করে, বাম হাতের এক জায়গায় গরম রুমালটা ঠেসে ধরি। এমন গরম সেঁক তো এলার্জিতে বড্ড উপকার দেয়!
মা! ও মা! হাতে সেঁকটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখো কেমন ভয়ানক ঘটনা ঘটতে শুরু করে!
বাম হাতে যেই রুমালের গরমটা খালি একটু লাগে, অমনি হাতের মাংসের ভেতরে সেই গবগবা লাল রঙের বলক উঠতে থাকে! মাংসের কোন ভেতর থেকে আসতে থাকে রঙের বলক। এই লালের বলক ওঠে, তারপরেই আসে সবুজ! এই লাল এই সবুজ!
আল্লা গো! এইটা কী!
বেসিনে যখন মুখেহাতে পানি দিচ্ছিলাম, তখন তো শুধু হাত দুইটাতে এই রঙের দপদপানি দেখা গেছে। এখন গরম সেঁকটা হাতে পড়ার সাথে সাথে দেখতে পাই যে, পুরাটা শরীরে রঙের বলকানি শুরু হয়ে গেছে!
খোদা! কী দেখি আমি এইটা!
আমার পরনের শাড়ি ব্লাউজ সহ পুরাটা শরীর লালে লাল, কচি সবুজে সবুজ হয়ে যাচ্ছে পলকে পলকে! ইয়া আল্লা!
ওই তো দেয়ালে আয়নাটা ঝোলানো! সেই আয়নায় কী দেখা যায়! আল্লা! দেখা যায়, আমার চুল আর চুল নাই! লম্বা, কুচকুচে কালো চুলগুলা হয়ে গেছে পাকা কাঁঠালের বাইরের আস্তরের মতো! হলদা সবজা খয়েরা মেশানো কিছু একটা!
ইয়া মাবুদ! আমার কী হইছে এইটা!
হাতে থেকে সেঁকা দেওয়ার কাপড়টা কখন খসে যায়- আমি টের পাই না। ইস্তিরির সুইচ কখন বন্ধ করি, নাকি করি না, সেইটা মনে করতে পারি না।
হায় হায়! এইটা আমি কী দেখতাছি!
আমার শরীর এমন করতাছে ক্যান! এমন করতাছে ক্যান! এইটা কী সর্বনাশ হইছে আমার!
তারপর কেমনে জানি সুইচ টিপে লাইট নেভাই আমি! ঘর আন্ধার করে; ভয়ে ঠকঠক শরীরটারে নিয়ে, আমি চুপ বসে থাকি। ঘুমের কথা মনেও আসে না!
কতোটা সময় যায় কে জানে। তারপর একসময় কেনো জানি লাইট জ্বালাতে মন চায়। দেখতে মন চায় নিজেরে! কাঁপতে কাঁপতে আয়নাটার সামনে গিয়ে মুখটারে দেখার জন্য তাকাই। ওমা! কিসের কী! মুখ চুল তো যেমনকার ছিলো, তেমন ঠিকঠাকই আছে!
তাইলে কী দেখলাম আমি একটু আগে! কী দেখলাম! কেমনে কী দেখছি এইসব! একটু পর পর কী দেখতাছি!
শরীর আবার ঠকঠক করে কাঁপা শুরু করে। দাঁতে দাঁতে বাড়ি খাওয়া চলতেই থাকে। আমি কিছুই থামাতে পারি না।
কাঁপতে কাঁপতে বাঁকা হয়ে যাওয়া আঙুলগুলা দিয়ে – এই যে – তাও লিখছি আমি। আমার সঙ্গে যা ঘটছে, সেটা দুনিয়ার কেউ না জানুক; আমার খাতা যেনো পরিষ্কার জানে!
এইই খাতাটাই তো এখন আমার একমাত্র আপন- একমাত্র নিজের জন!
এই কথাটা লিখে তো বড়ো জ্বালা হলো!
একটা মানুষ নাই আমার আপন? এই খাতাটা ছাড়া আর কেউ না? এই কথা মনে করে করে, আমার চোখ থেকে দেখো, কেমন পানির ঢল নামা শুরু হইছে! কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না!
১৩ এপ্রিল ১৯৯৫
কী হয়েছে আমার, আমি জানি না। কিছুই ধরতে পারছি না।
শরীরে যখনই পানি লাগছে, তখনই সেই তেমন গটগটা লাল আর ছনছনা কচি সবুজ রঙ- বলকে বলকে উঠে আসছে! কোন ভিতর ঠেকে জানি উঠে আসছে। তারপর শরীরটা যেই একটু শুকায়ে যাচ্ছে, অমনি সেই রঙও নাই হয়ে যাচ্ছে!
আবারও আজকে- দিনের টাইমে- গরম সেঁক দেওয়ার চেষ্টাটা নিয়েছিলাম। রেজাল্ট সেই একই। সেঁকের তাপটা শরীরে লাগে কী লাগে নাÑ অমনি পুরাটা শরীর শুধু না, চুলগুলা পর্যন্ত দগদগা রঙঅলা হয়ে উঠছে! কালকে রাতের বেলা যেমন হয়েছিলো, ঠিক সেই রকম।
পানি লাগালে শুধু রঙের বলকানিই আসতে থাকে। একটু পরে চলেও যায়। তারপর কেবল সেই পিলপিল অস্বস্তিটা নড়তে চড়তে থাকে শরীরে।
কিন্তু গরম সেঁক দেওয়ার ফল তো দেখলাম ভয়াবহ! সেঁকটা লাগলো শরীরে, তারপর রঙের বলকানি ওঠা তো শুরু হলোই, চোখের পাপড়ি আর চুলের বর্ণ তো বদলায়ে গেলোই; সেই সবের সাথে সাথে আরো একটা ভয়ঙ্কর বিষয়ও ঘটা শুরু হলো!
কেমন জানি একটা আওয়াজও উঠতে থাকলো- ওই রঙগুলার ভেতর থেকে। এই আওয়াজ কিন্তু কালকে রাতে, সেঁক দেওয়ার পরে আমি শুনি নাই! আজকে দিনের টাইমে গরম রুমালটা- হাতে কেবল একটু চেপে ধরেছি, তখনই এই আওয়াজ! আর, রঙের বলকানি! আল্লা!
কী রকম আওয়াজরে এইটা! থাক্ থাক্ থাক্Ñ ঝিপ ঝিপ ঝিপ ঝিপ ঝিপ! থাক থাক!
অনেক মৃদু, খুবই ঝাপসা রকমের আওয়াজটা। কিন্তু খেয়াল করে ঠিক বুঝেছি, আওয়াজটা সত্যি সত্যি আসছে রঙগুলা থেকে!
তারপর আস্তে আস্তে রঙ মিলায়ে যায় একদিক দিয়ে, তার সাথে সাথে আওয়াজও বন্ধ হয়ে আসে! এসব কিসের আলামত? আল্লা! কিসের?
কোন কঠিন রোগে না জানি আমারে ধরছে! খোদা গো! কিছুই আমার আর বুঝতে বাকি নাই রে! নির্ঘাত আমার কোনো একটা কঠিন রোগ হইছে! এইটা তারই আলামত। কঠিন কোনো অসুখের লক্ষণই তো বোঝায়-এইসব দিয়ে? তাই না? তাই তাই! অসুখেরই! আহ! এইটা অসুখেরই আলামত! আহা!
আচ্ছা থাক! থাক হাহাকার করা! কোনো হায়-আফসোস আর আমি না-ই বা করলাম! আফসোসে ফল কী! এই আমার অতি তুচ্ছ জীবন! সেইটা গেলেই কী, আর থাকলেই কী!
আমার যা বোঝার, তা আমি স্পষ্টই বুঝে ফেলছি! আমার যে দুনিয়া থেকে চলে যাবার সময় হয়ে গেছে, আমি তা পরিষ্কার বুঝতে পারছি!
আমার কী হইছে, কোন অসুখে ধরেছে আমারে, আমি সেইটা একদম স্পষ্ট বুঝছি।
আমার ব্লাড ক্যানসার হয়েছে। এটা ব্লাড ক্যানসারেরই লক্ষণ! আর কিছু না!
যেই ধরণ-ধারনটা দেখছি, তাতে বোঝাই যায়, ক্যানসারের একদম লাস্ট স্টেজেই চলে গেছি আমি! অর্ধেক রক্ত নিজের রঙে আছে, সেই কারণে তারে লাল দেখায়! বাকি অর্ধেক রক্ত নষ্ট হয়ে গেছে। একেবারে পঁচে গেছে! একদম! সেই কারণেই সেইটারে অমন দপদপা সবুজ দেখায়!
বোঝাই তো যাচ্ছে বিষয়টা। পরিষ্কার রকমেই তো বোঝা যাচ্ছে! সেই কারণেই আমার রক্ত এমন লাল-সবুজের লটকাÑলটকি অবস্থায় চলে গেছে! তাইলে আমি আর বেশীদিন নাই! বেশীদিন আর নাই আমি!
বাপটার হইছিলো প্রস্টেট গ্লান্ডের ক্যানসার। ভুগতে ভুগতে কাহিল ন্যাতা ন্যাতা হয়ে- তবে যেতে পারছে, দুনিয়া ছেড়ে! আর, আমার হলো কিনা ব্লাড ক্যানসার!
আইচ্ছা! দুনিয়া ছাইড়া যাইতে আমার কোনো দুঃখ নাই! কোনো দুঃখ নাই। কেনো দুঃখ হবে? সর্বপ্রকারে নিষ্ফল – এই জীবনটা যদিÑ এমন অকালেই শেষ হয়ে যায়, তাইলে কার কী! কারো কিচ্ছু না!
এতো পরিষ্কার রকমে বাস্তবটারে বুঝতে পারি; তাও চোখ দিয়ে দরদরায়ে পানি পড়তে থাকে আমার। আজকে সমস্তটা দিন ধরে এইই চলছে। পানি পড়া থামাতে পারছি না।
কেনো রে তোমার কান্না আসে, চোখ?
কি রে চোখ; জানো না তুমি, এই জীবন পুরা নিষ্ফল? সেই নিষ্ফলায় থাকলে কী, গেলেই বা কী! কেই বা আছে তোমার বান্ধব-আপনার জন, যার জন্য বাঁচার বাঞ্ছা করবা তুমি! কেউ নাই। কেউ না।
এইভাবে সারাটি দিনই নিজেকে কতোভাবে বুঝ দিয়ে চলছি। কিন্তু আগুন-বেতালা মনটাকে ঠা-া করতে পারছি কোথায়! সারাটা দিনে এই মনেরে একফোঁটাও শান্ত করতে পারলাম না তো!
এমন কী আজকে ছাদে যাওয়ার জন্য- আমি আমার পায়ে- এক ছটাক শক্তি পর্যন্ত পাই নাই!
যাই নাই আজকে আমি মোরাকাবা করতে।
কী এসে যায় এখন মোরাকাবা করা, না করায়? আজ বাদে কাল নাইলে পরশু যে দুনিয়া থেকে চলে যাবে চির জনমের মতো, তার আর মোরাকাবা না করলে সমস্যা কী? কোনো সমস্যা নাই!
বাপের কথা মান্য করে- তার মেয়ে তো- যেই কয়দিন পেরেছে, করেছে মোরাকাবা। আর পারলো না সে। সব শেষ তার! সব শেষ!
লিখতে লিখতে কথাবার্তাগুলা কেমন তালগোল পাকায়ে, কেমন জানি হয়ে গেলো আজকে! কিন্তু কী করবো! মউতের মুখে দাঁড়ায়ে কি মানুষ সব কিছু ঠিকঠাক রেখে চলতে পারে?
শরীরের যন্ত্রণা Ñপিলপিলানির যন্ত্রণা Ñআর সহ্য করতে পারছি না। আর পারা যাচ্ছে না।
১৪ এপ্রিল ১৯৯৫
এখন দুপুর। সাড়ে তিনটা বাজে। বিছনায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছি। দেখি একটু আরাম পাই কিনা, এমন করে পড়ে থেকে! দেখি এমনে থাকলে, পিলপিলানির দমকটা একটু কম হয় কিনা!
বসে বসে আর এই জ্বালা সওয়া যাচ্ছে না। চিৎ হয়ে শুয়েও কিছুমাত্র আরাম আসে না। বরং শরীরটা যেনো তখন ঝিলিক দিয়ে দিয়ে পিলপিলাতে থাকে! খিবলি-ঝিবলি পিলপিলানি! আহ! সওয়া যায় না! সওয়া যায় না! অথচ দেখো রে, আমারে সয়ে যেতে হচ্ছে!
জানি তো, এমন জ্বালাই সহ্য করে যেতে হবে! চুপেচুপে এমন যন্ত্রণাই সহ্য করে যেতে হবে। যতোক্ষণ মরণ না আসে, ততোক্ষণ পর্যন্ত!
আহা রে! এখন প্রত্যেকটা মিনিটে আব্বার কষ্টটা বুঝতে পারছি। একেবারে তন্নতন্ন রকমে বুঝতে পারছি, কেমন যাতনা সওয়া লেগেছে আমার বাপটারে! নিজে যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে না গেলে কী সেটা এমন করে বুঝতে পারতাম!
কোনো দিন পারতাম বুঝতে এমন করে? পারতাম না। আহা রে আমার আব্বা! কতো কষ্ট পেয়ে গেছে তার শরীরটায়!
তবে, আব্বার বড়ো খোশ নসিব! তার মরণকালে দেখাশোনাটা করার জন্য নিজের মেয়েসন্তানটা ছিলো! যেমনই হোক, ডাক-খোঁজটা করার জন্য তার পুত্রসন্তানটাও ছিলো!
আমার যে কেউ নাই! আমার তো কেউ নাই! আমার কেউ নাই! আমার কী হবে! কে দেখবে আমারে? বিছনায় পড়া থাকলে, কে আমার তত্ত্ব-তালাশিটা করবে? করার কেউ তো নাই! আহা! কেউ না!
আজকা পুরাটা দুপুর, কলেজে বসে বসে, এই চিন্তাটা করেছি। আজকে পয়লা বৈশাখের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিলো কলেজে। সকাল এগারোটা থেকে।
কী আর করা! যেতে তো হবেই। চাকরি না থাকলে, আমি চলবো কোন পয়সায়! যেই কয়দিনই আর বাঁচি, সেই কয়দিনই তো পেটে-মুখে কিছু তো দিতে হবে! সেইটা দেবার পয়সা কয়টা আসবে কোত্থেকে? এই চাকুরিটা যদি না থাকে!
আমি ঠিক করেছি; যতোদিন শরীর চলবে, চাকরিটা করে যাবো। তারপর শরীরের দশাটা তো নিজেই বুঝবো! তখন আর যাবো না চাকরিতে। তখন আর এই শরীরটারেই তো বাঁচায়ে রাখবো না আমি! যেমনে পারি নিজেরে শেষ করে নেবো তখন!
তার আগে পর্যন্ত হাতরথ যতোক্ষণ চলতে চাবে, চলবো আমি।
থাকুক শরীরের যাতনা শরীরে। আমি সহ্য করে যাই। কাজকাম চালায়ে যাই কোনোমতে। এই কথা কালকে রাতেই সাব্যস্ত করেছি আমি। আরো সাব্যস্ত করেছি, মরা-বাঁচা যা আসে আসুক, কথা শুদ্ধ করে বলতে বলতেই জীবন শেষ করবো!
কালকে ভয়-তরাসে কেমন আউলারকম কথাবার্তা লিখে ফেলেছি না? এই তো আজকাও তেমন আউলা ধরনের কথাই তো লিখে যাইতেছি খাতাটাতে!
ঘরের কথা আর শুদ্ধ কথা মিলায়ে মিশায়ে করে ফেলেছি যেনো ডালে-চালে ফোটানো খিচুড়ি! নাহ! ছিহ! এইটা আর করবো না!
একজনের শুদ্ধ কথা একটু শুনতে পেয়েছিলাম, সেই কতো কাল আগে! আমার মনটা ভরে আছে কিনা এখনও? আছে! ভরে আছে তার কথার সুন্দরতা দিয়ে!
এই যে তাকে মনে এলো এখন; এই এখনও মনটা কেমন সুখ পেলো! কেমন যে ভালো লাগলো!
শরীরের যন্ত্রণাটা যেনো একটু কমেও গেলো এখন, পলকে! এই যে তাকে মনে করার সময়ে! এমনটাই কিন্তু মনে হলো আমার। সত্যি কিন্তু মনে হলো।
যাক, কলেজের কথা বলি! কলেজ সেকশন খোলার পরে, এই হচ্ছে দ্বিতীয় পয়লা বৈশাখ। কিন্তু সেই নববর্ষ বরণের অনুষ্ঠান করার দায়িত্ব কিন্তু কলেজ সেকশনের বাংলা আপা পায় নাই।
বড়ো আপারে কেমনে করে পটায়ে-মটায়ে, না, কী সব বুঝ দিয়ে-থুয়ে; স্কুলের বাংলা আপাই সেইটার দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। নিজের খাতিরের কলিগেরা আছে তো তার, এই কলেজ সেকশনেই বহু জন আছে Ñতার পেয়ারের লোক! তাদের নিয়ে অনুষ্ঠানের প্ল্যান-মø্যান করে ফেলেছে সাদেকা আপা, সেই কবে! তারপর সে ছাত্রীদের নিয়ে দরোজা-বন্ধ রুমে রিহার্সেলও করায়ে-টরায়ে একেবারে হুলস্থূল দশা করে ফেলেছে!
কিন্তু আমারে কোনো কিছুতে রাখেও নাই, কোনো কাজেও ডাকেও নাই! এমনটা চলছিলো অনেকদিন ধরে! আমি আর তখন কী করি!
আমি ক্লাশের নিয়মে ক্লাশ করি। অন্যসব কাজও করি। তারপরে বাড়িতে চলে আসি। করো গা তোমাগো অনুষ্ঠান তোমাগো জুইত মতোন! আমার কী!
শেষে কী মনে করে গত সপ্তাহে সাদেকা আপা আমাকে ডেকে একটা কাজের ফরমাশ দেয়! বলে যে, অনুষ্ঠানের জন্য ফুল আনতে হবে আমারেই। না, ফুলের তোড়া না। আনতে হবে একশো দেড়শো গোলাপ। লাল রঙের গোলাপ। ওই খোলা ফুল দিয়ে স্টেজ সাজানো হবে।
আমার তো রাজি না হওয়ার কোনো কারণ নাই। কলেজে যাওয়ার পথেই পড়ে হাইকোর্টের দিকটা। এই যে কার্জন হলের দিকের এলাকাটা!
সেইখানে পাতিতে পাতিতে গোলাপ নিয়ে- কতো জনেরেই তো- ফুল বেচতে বসা দেখি! প্রত্যেকদিনের ভোর সকালে ওই এলাকাটা তো ফুলের গন্ধে ঝমঝমাতে থাকে একবারে। সেইখান থেকে গোলাপ ফুল কিনে, কলেজে নিয়ে যেতে আর প্রবলেম কী!
আহ! তখন কী জানতাম, এই পাঁচ-সাতদিনের মধ্যে আমার দুনিয়া আর দুনিয়া থাকবে না! জানতাম নাকি, এই কয়টা দিনের মধ্যেই আমার শরীরের লুকানো এই কঠিন রোগটা- হুড়মুড়ায়ে বের হয়ে পড়বে? জানতাম না!
যাক। সহ্য করবো বলে মনস্থির করেছি যখন, তখন দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য্ করে যাবো। দুনিয়ার একটা কাউরে জানতে দেবো না আমার অসুখের কথা! একটা কাউকে বুঝতে দেবো না, কোন অসুখে আমি- কোন ভোগা ভুগছি! কী যাতনাটা পাচ্ছি! কাউরে জানতে দেবো না!
ঠিক আছে পিলপিলানি, কর তুই কতো পিলপিল করতে পারস! কইরা যা! দে আমারে কতো তুই খিজিরবিজির চুলকানি দিতে পারস! দিয়া যা! দিয়া যা! আমি কিচ্ছু বলমু না তোরে! দে দে তুই!
আঙুল দিয়ে চুলকায়ে আর সামাল দিতে পারছি না। চুলকাতে চুলকাতে আঙুলের ডগা আর নখেরা- বেবশ বেবশ হয়ে গিয়ে- ফুলে ফুলে উঠেছে! আঙুলের আগাগুলা একেবারে স্থায়ী ডগডগা লাল হয়ে পড়েছে!
শরীরের মধ্যে দেখা দেওয়া লাল-কইচ্চা রঙেরা তো আসছে হঠাৎ হঠাৎ; আবার তারা মিলিয়ে যাচ্ছে একটু পরেই! কিন্তু আঙুলের ডগার এই লাল-কিছুতেই মিলায়ে যেতে চাচ্ছে না।
না না! এমন থাকলে তো বিপদ! লোকে না তাহলে ধরে ফেলবে আমার অসুখ? লোকেরে জানান দেওয়া তো চলবে না! চুলকানির জন্য আঙুল আর তাইলে ইউজ করা ঠিক হবে না!
ঠিক আছে, করবো না।
এই তো বুদ্ধি পেলাম। পেন্সিল আর চা চামচের ডাটাটা যদি ইউজ করি, শরীর চুলকানির জন্য ইউজ করি, তাইলে মনে হয় একটা উপায় হয়! বা, যদি হাত দিয়ে আলগোছে থাবড়াই – চুলকানির জায়গাটা, তাইলেও মনে হয়-একটা উপায় হয়!
এখনও দেখো, কোন কথা রেখে কোন কথা বলা শুরু করেছি! এই স্বভাবটা মনে হয় আর বদলাবে না আমার। এখন তো ব্লাড ক্যানসারেরই রোগী হয়ে গেছি! আর বদলানোর সুযোগ নাই রে। নাই!
তো, রাত ভরে চোখে কী আর ঘুম থাকতে চায়? চায় না। যার জীবনে মরণ ঘনিয়ে আসতে থাকে, তার কি ঘুম আসে? আসে না! আমিই তার প্রমাণ!
এই কথা ভাবতে ভাবতে, চোখের কান্দন মুছতে মুছতে, চুলকানিটাকে কোনোরকমে সামাল দিতে দিতে-কেমন করে গতকালের রাতটারে পার করে দিচ্ছিলাম-বলতে পারি না!
তারপর হঠাৎই যেনো চোখের পাতা দুটা লেগে আসে আমার। যেনো ঠিক ঘুমায়ে যাই না! আবার যেনো জেগেও থাকি না! এমন অবস্থা তখন আমার!
তখন আমার সেই বন্ধ চোখেরাই যেনো পরিষ্কার দেখতে পায়, কোন দূর থেকে- আমাদের এই বাড়িটার দিকে- একটা মেঘ ছুটে আসছে। কালো মেঘ। খুব জোর গতিতে যেনো ছুটে আসছে!
তারপর জোরে ছুটতে থাকা সেই মেঘটা- আমাদের বাসাটার মাথার ওপরে এসে- একদম থির হয়ে দাঁড়ায়ে পড়ে। একেবারে স্থির হয়ে যায় মেঘটা, বাড়িটার মাথার কাছে! তারপর আমি শুনতে পাই, মেঘটা আমাকে ডাকছে। আমাকেই ডাকছে। সেই থির মেঘ বারবার করে আমাকে ডেকেই যেতে থাকে!
অন্য সবাই ডাকে-মরিয়ম মরিয়ম! মেঘটা ডাকতে থাকে-হুসনা জাহান হুসনা জাহান!
ডাক শুনতে শুনতেই কিসের একটা ধাক্কা যেনো আমার গায়ে এসে লাগে। পলকেই যেনো ঘুমের চটকটা সরে যায় আমার চোখ থেকে!
কি রে বাবা?
দেখো কী অবস্থা! বাইরে কেমন ঝড় শুরু হয়েছে! আমার ঘরের দক্ষিণমুখী জানালা দিয়ে- ঝড়তুফান আর বৃষ্টির জোর দমক- ঘরের ভেতরে ঢুকছে। ঘরের মেঝে ভিজে সুপসুপা! বিছানাটা তো ভিজিয়েছেই; আর আমাকেও ভিজিয়ে জ্যাবজ্যাবা করে দিয়েছে!
এইটা কেমন তুফান রে বাবা! ঘরের এতো ভেতরে কেমনে ঢোকে ঝড়ের ঝাপটা! এমন তো জিন্দিগীতেও হতে দেখা যায় নাই!
‘হায় হায়! এই ভোর রাতে, এখন না আবার এই ভেজা শরীরটায় সেই রঙের দমক-ধমক শুরু হয়ে যায়! আবার না জানি কতোক্ষণ সহ্য করতে হবে সেই রঙের তা-ব! আল্লা!’ ভয়ে আমার ভেতরটা আর বাহিরটা কেমন কাঁপা যে কাঁপতে থাকে! ‘আল্লা! আমি আর সহ্য করতে পারবো না অই রঙের কাঁপাকাঁপি! আল্লা! বরং নাইলে তুমি আমারে একবারে, এই এক্ষণ, তুইল্লা নিয়া যাও গা, মাবুদ!’ আমি আল্লাকে ডাকতে ডাকতে কাঁদতে থাকি! চোখ বন্ধ করে কাঁদতে থাকি!
তারপর কেমনে কী হয় বলতে পারি না! বৃষ্টির ঝাপটায় আমার শরীর ভিজে যেতে থাকে, কিন্তু সেই ভেজা শরীরে কোনো রকমের রঙেরই আনাগোনা দেখা যায় না।
কিন্তু চুলকানির যন্ত্রণাটা কিছুমাত্র কমে না! আমাকে বড়ো অস্থির করে দিতে থাকে সেটা।
ভোররাতের সেই ঝড়বাদলা থামতে থামতে বেলা বেজে যায় আটটা। তুফান থামে; কিন্ত বৃষ্টি যেমন জোর-তেজী হয়ে পড়ছিলো, তেমনই পড়তে থাকে! সাড়ে আটটা বেজে যায়। থামার নাম নাই।
এদিকে, সেই কোন ভোর-সকালেই, কঁকায়ে কঁকায়েই, আমি রেডি হয়ে-টয়ে একদম শেষ। যাই ঘটুক, কলেজে যাওয়া কি বন্ধ করা যাবে? যাবে না তো!
এখন, এই না-থামা বৃষ্টিরে নিয়ে আমি কি করি? শেষে ভিজতে ভিজতেই সাড়ে আটটার দিকে বাসা থেকে বের হই।
কিন্তু বের হলে কী, গলির কোনোদিকে একটা রিক্সারও নামগন্ধ নাই যে! এই যে বৃষ্টির ফোঁটা ধাপুর ধুপুর করে আমার ওপর এসে পড়ছে, আমার কী উপায় হবে! আমার কলজায় আর পানি থাকে না!
আরে সর্বনাশরে! পানির ঝাপটাটা পেলেই না আমার ভেতরের ক্যানসারে-খাওয়া বদরক্তরা ঝিলিক দিয়ে দিয়ে উঠে আসতে থাকে, চামড়ার ওপরে? হায় হায়! এখন, এই রাস্তার উপরে, সেই ঘটনাটা শুরু হলে – আমি কেমনে কী করবো! রাস্তার লোকের চোখের উপরে কেমনে সামাল দেবো-সেই সর্বনাশা ঘটনাটারে!
মাথার ওপরে ফ্যান্সি ছাতাটা কতো শক্ত করেই না ধরে থাকি আমি! কিন্তু কোনো উপকার তো হয় না! বৃষ্টি আমারে ভিজাতেই থাকে!
যখন বাসা থেকে বের হই; তখন দেখি যে, আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ছে সিধা বরাবর মাটির দিকে। বড়ো বড়ো তাগড়া সব ফোঁটা। মনে খুশি হই! ছাতা দিয়ে এমন বৃষ্টিরে সামাল দেওয়া যায়। কিন্তু তেছরা বৃষ্টিতেই যতো সমস্যা। সেই বৃষ্টি ভিজায়ে তেনা তেনা করে ছাড়ে!
ওমা! ছাতা মাথায় রাস্তা দিয়ে একটু আগায়েও সারি না; আমার সাথে যেনো মজা করার ইচ্ছা দেখা দেয় এই অকালের বৃষ্টির! সিধা ঝরতে থাকা বৃষ্টি আচমকাই তেরছা হয়ে যায়! তেরছা হয়ে গিয়ে বৃষ্টি কিনা আমাকে সাপটে ভিজাতে থাকে!
সেই বৃষ্টি কি এক রকমের তেরছা হচ্ছে? কী আচানক ধরনের বৃষ্টিরে বাবা এইটা! কতো রকমের তেরছা হয়ে যাচ্ছে, মুহূর্তে মুহূর্তে!
এই একবার বাঁকা হয়ে উত্তর দিক থেকে তেছরা হয়ে ঝরতে থাকে। কতোক্ষণ এইভাবে ঝরে ঝরে; তারপর হঠাৎই আসতে থাকে পুবের বৃষ্টি।
তারপর কিছুক্ষণ এই দক্ষিণ, এই পশ্চিম। এমন পাগলা হয়ে যাওয়া বৃষ্টিরে কি আমার ওই ফ্যান্সি ছাতাটা সামলাতে পারে নাকি? একটুও পারে না!
ইইস! সেই ভোরসকালে-কলেজে যাওয়ার পথে-আমার শাড়িটা – আমার শরীর চুল হাত মুখ চোখ- কিচ্ছু ভেজার আর বাকি থাকে না! ভয়াবহ রকমের জবজবা ভেজা হয়ে যেতে হয় আমারে! আহারে!
তো, শাড়ি ভিজলে সমস্যা নাই।
রোদবৃষ্টি সকলটা সময়Ñ আমার পরা থাকে ইন্ডিয়ান পরাগ শাড়ি। ওই যে সিল্কের মতো দেখতে সিনথেটিক শাড়িগুলা! আজকেও তাই পরা! একটু ঘিয়া একটু হলুদ একটু লাল মেশানো শাড়িটা! পরতে হয়েছে পয়লা বৈশাখকে মনে রেখেই! এই শাড়ি ভিজলে চিন্তা নাই কোনো। শুকাতে বেশীক্ষণ লাগবে না।
কিন্তু আজকে যে একটু বেশী ভিজে গেলাম! অনেক বেশী! এমন জবজবা ভেজাটা পরনে নিয়ে- কলেজে গিয়ে শান্তি পাবো? শরীরের গোলমালকে ঢেকে রাখার জন্য শাড়িটা শুকনা না থাকলে চলবে?
ভেজা শাড়িতে আমার দুই পা জেবড়ে জেবড়ে যেতে থাকে। তাও আমি সামনের দিকেই চলতে থাকি। ভয় ভয় লাগতে থাকে অন্তরটা। রঙের বলকানি না এই আবার শুরু হয়ে যায়! আল্লা!
ডরেভয়ে পেরেশান হয়ে শেষে, আমি মনে মনে আমার অসুখটাকে রিকোয়েস্ট করতে থাকি; “ক্যানসারের রক্ত, এই রাস্তার ওপরে দেখা দিয়ো না তোমরা! আমি সামলাতে পারবো না! আমি কোনো রকম শরমের তলে পড়তে চাই না! আমাকে এই দয়াটা করো তোমরা! আইসো না চামড়ার উপরে! আইসো না!” চোখের পানিতে নিজেকে নতুন করে ভেজাতে ভেজাতে আমি আগাতে থাকি; আর অসুখকে রিকোয়েস্ট করতে থাকি।
আশ্চর্য ব্যাপার ঘটে কিন্তু তারপর! ক্যানসারে যেনো আমার রিকোয়েস্ট শুনতে পায়, এবং যেনো সে আমার সেই রিকোয়েস্টটা রাখেও। আমার ভেজা শরীরে কোনো রঙের বলক দেখা দেয় না। একটুও না!
আমি তাজ্জব হয়ে যাই! আমার দিশাহারা দিশাহারা লাগতে থাকে। অসুখেও কথা শোনে নাকি?
যদিও শরীরের চুলবুলানি ঠিকমতোই আমাকে খাবিজাবি খাওয়াচ্ছে, কিন্তু সেটা নিয়ে আমার- তেমন আর ভাবনা হয় না। চুলকানি তো? আমি যেভাবে পারি, সামালে নিতে পারবো!
তারপর এক মিনিটের জন্য মনে হয়, এমন ভেজা শাড়ি পরে কলেজে যাবো? এতোটা ভেজা! কিন্তু উপায় কি? শাড়ি বদলাতে যে বাসায় যাবো, তাইলে তো আরো দেরী হয়ে যাবে!
আমার ওপর না হুকুম আছে- ফুল কিনে নিয়ে যাওয়ার? এই ফুল দিয়ে না স্টেজ সাজাবে? আমার দেরী হলে তো, স্টেজেরও দেরী! হায় হায়!
কোনোমতে রিক্সা নিয়ে হাইকোর্টের ওইদিকে যেতে যেতে দেখি বৃষ্টি শেষ। এমনকী বাতাসে যেনো গরম গরম একটা ভাঁপও পাওয়া যায়! তাইলে তো সূর্যও উঠে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যে! যাক! মেয়েরা তাইলে শান্তিহালে আসতে পারবে কলেজের প্রোগ্রামটাতে!
হাইকোর্টের বটতলায় রিক্সা থামায়ে আমি নামি। নেমে দেখি, আল্লা! কেউ একজনও ফুল নিয়ে বসে নাই আজকে! কেউই না! থাকার মধ্যে আছে কয়েকটা আউলা মেয়ে। একটু শুকনা দেখে একটা জায়গায় তিনজনে বসা।
একজন আড়মোড়া দেয়, একজন ইতিবিতি হাতে- নিজের চুলে নিজেই বিলি দেয়; একজন খক খক করে কফ বের করা নিয়ে আছে!
কোনো ফুলের পাতি কোনোদিকে নাই!
আল্লা আল্লা! ইজ্জত রাখো আল্লা! ফুল নিয়ে না গেলে- স্কুলের বাংলা আপা আমারে আস্ত রাখবে না! আল্লা! দুনিয়া থেকে যারে তুমি নিবাই গা ঠিক করছো, তারে আর শেষটাইমে অন্য ভোগান্তি দিয়ো না মাবুদ! অসম্মানি দিয়ো না তুমি তারে আর!
কী জানি কোন সময়ে আমার চোখে পানি জমে যায়! কোন সময়ে সেইটা আবার আমি হাতের পাতা দিয়ে মুছতেও থাকি! আমার খেয়ালে পড়ে না! এদিকে, সেই বিষয়টা কোন সময়ে যে সেই আউলা মেয়েগুলা দেখেও ফেলে, তাও আমার খেয়ালে আসে না!
তারপর অনেক আশ্চর্যের ঘটনাটা ঘটে! সেই মেয়েগুলাই ঘটায়। তারা কারে কারে যেনো- ডাক পেড়ে পেড়ে -কোনখান থেকে বের করে আনে। ছোটোমোটো দুই পাতি হাতে দুইজন লোক আসে। দুইখান পাতিতে সব মিলিয়ে আছে একশো পঁচিশটা গোলাপ।
নিতে হলে সেই একশো পঁচিশটা গোলাপই নিতে হবে! নিলাম নাইলে সব কয়টাই! দামও তো যেনো ঠিকঠাকই লাগে আমার কাছে! আমি নিয়ে নেই।
রিক্সায় ওঠার আগে মেয়েগুলাকে একটা দুটা কৃতজ্ঞতার কথা বলতে ইচ্ছা করেছিলো আমার, কিন্তু ওদের কোনো চিহ্ন দেখলাম না আর ওইখানে!
আমি যখন ফুল বুঝে নিচ্ছিলাম, তখন তারা যে কোনদিক দিয়ে, কখন চলে গেছে! বুঝলাম না ঠিক।
তার মধ্যে সেই রিক্সায় বসেই হঠাৎ খেয়াল আসে, কোন ফাঁকে জানি আমার শাড়িটাও শুকায়ে একদম নরমাল হয়ে গেছে! আরে! কখন হলো?
এটাও তো বুঝলাম না ঠিক!
এতো হুজ্জোত করে ফুল জোগাড় করলাম! তাও কলেজে গিয়ে কতো খারাপ কথা না শুনতে হলো আমাকে!
ফুল কেনার হ্যাঙ্গামা শেষ করে, সেই আজিমপুরের কোন ভেতরে গিয়ে যখন পৌঁছাই আমি, তখন দশটা! গিয়ে দেখি কলিগদের মুখ থমথমা! আমার দিকে একেকজন একটা করে চাউনি দেয়; আর কেমন জানি একটা ভাব করে করে চোখ সরায়ে নেয়।
কি বিষয়? কি বিষয়?
বিষয় শোনা যায় বড়ো আপার মুখ থেকে।
বড়ো আপা নিজের রুমে আমাকে ডাকায়ে নিয়ে কঠিন মুখে জিজ্ঞেস করে, “প্রোগ্রামটা নষ্ট হউক, এই প্ল্যান করছিলা নাকি মরিয়ম? নাইলে সকাল নয়টার ফুল দশটায় আনো কি কইরা? সাদেকা আমারে বুঝাইতে বাকি রাখে নাই!”
আমি বৃষ্টি ও ফুল না পাওয়ার ঝামেলাটার কথা ওনাকে বলতে যাই, বড়ো আপা জোরে ধমক দিয়ে ওঠে; “এক্সকিউজ দিবা না! আমি শুনব না। কলেজের প্রেস্টিজ নিয়া ঝামেলা করতে চাও কোন সাহসে? কালকা তোমারে শোকজ দেওয়া হবে। রেডি থাকো।”
মনটা শক্ত একটা বাড়ি খেয়ে একদম নীল হয়ে যায়। কিন্তু তারপরেও মুখটা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করতে করতে আমি, আমার জন্য বরাদ্দ করা অন্য কাজগুলা সারি। তারপর সকলের অগোচরে, শেষের সারির এক কোণের চেয়ারটাতে ঠাঁই নেই!
সবকিছু থেকে দূরে গিয়ে, একদম একা একলা হয়ে বসার জন্য, বড়ো তাগাদা আসছিলো তখন আমার ভেতরে! কতোক্ষণ লাগবে এই প্রোগ্রাম শেষ হতে কে জানে! থাকি তবে চুপ করে বসে।
থির হয়ে যেই বসতে পারি, তখনই কিন্তু কথাটা মনে আসে। আগে বা পরে মনে আসে নাই। ওই চুপ করে বসার পরেই মনে পড়ে, অনেকক্ষণ না বেধুম, জোর বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম সকালে?
বৃষ্টিতে ভেজার পরে কিন্তু আমার রক্তরা ঝিলিক দিয়ে দিয়ে ওঠে নাই!
না লাল রক্ত না পঁচে নষ্ট হওয়া সবুজ রক্ত- কোনোটাই কিন্তু ঝিলিক দিয়ে ওঠে নাই! গত কয়দিনে না পানি লাগার সঙ্গে সঙ্গে- ঝিলিক দিয়ে দিয়ে- শরীর থেকে বের হয়ে যাওয়ার মতন লাফালাফি করছিলো রক্তরা? আজকে সকালে তবে তেমনটা করলো না যে! তাইলে কি ক্যানসার সব সময় একই রকম আচরণ করে না? নাকি সত্য সত্যই অসুখটা আমার রিকোয়েস্টটা শুনেছে?
কিন্তু এমন কি হয়? এই রিকোয়েস্ট শোনার বিষয়টা? হয় এমন? কোনোদিন তো এমন কিছু শুনি নাই! কারো মুখে শুনি নাই! কী জানি!
তবে যাই হোক গা, আমার ডিসিশন আমার নেওয়া হয়ে গেছে।
আজকে সকালে, কলেজের সেই শেষ কোণের চেয়ারটাতে বসে বসে, আমি মনকে তৈরি করে ফেলেছি।
আমি – আমি সুইসাইড করবো!
অসুখটারে আর একটু দেখবো। এই যে- যেই কয়দিন- চলতে ফিরতে পারবো, সেই কয়দিনই দেখবো আর কী! তারপর সুইসাইড! মরতে যখন হবেই, তখন এমনে আর সেমনে কী! আগেই চলে যাবো। মানীর মান আল্লায় রাখে- এইরকম একটা কথা আছে না?
নাইলে আমারে টানবে কে? পড়ে থাকলে, টানার তো কেউ নাই। আর, আমার চিকিৎসার খরচটাই বা কে দেবে? দেয়ার কেউ নাই। আমার নিজেরও তো কোনো সম্বল নাই!
ঠিক আছে তবে! ক্যানসারে আমারে নেওয়ার আগে- আমিই চলে যাবো!
এই কথাটা পরিষ্কার করে লিখে রাখার জন্যই- আজকে এই দুপুরে- ডায়েরি লিখতে যাওয়া! দুনিয়াতে আমারে মায়া করে-এমন তো কেউ নাই। দুনিয়াতে আমার জন্য মন খারাপ করে -এমনও কেউ নাই!
এই দুনিয়ায় কেউ একজনও নাই, যে কিনা আমার জন্য অপেক্ষা করে। সেই আমি দুনিয়া থেকে চলে গেলেই কী, থাকলেই কী!
দেখো তারপরেও চোখে পানি চলে আসে। এতো পানি চলে আসলে আমি কেমন করে লেখা কনটিনিউ করবো!
পিলপিলানি সামলাবো, না চোখের পানি মুছবো?
১৪ এপ্রিল ১৯৯৫ রাত ১টা
এখন রাত কতো? রাত ১টা।
যেই আমি দুপুরে ডায়েরি লিখেছিলাম; সেই আমি, আর এই যে এখন রাত একটার সময় যেই আমি লিখছি-এই দুইজন কি একই মানুষ? একই মানুষ?
না না! একই মানুষ বলে বিশ্বাস করতে পারছি না। মনে হচ্ছে এটা অন্য কেউ। আমার মতোই দেখতে-আমার মতো মুখচোখেরই অন্য একজন এটা। মনে হচ্ছে, আমি আর আমি নাই! অন্য একজন হয়ে গেছি আমি!
যদি সত্যিই এটা আমি হই, তাইলে সন্ধ্যার মুখে যে ভয়ঙ্কর ভয়ের ঘটনাটা ঘটে গেছে, সেটারে এমন সহজ ভাবে নিতে পারলাম কেমনে? কিভাবে পেরেছি?
আমি এক ডরুক মানুষ। চরম ভীতুর ভীতু আমি! আমি ভয় পাই না কোন জিনিসটাকে? চিরকাল ধরে – বলতে গেলে – সব কিছুরেই ভয় পাই আমি। ভয় পেতে পেতে, থরথর কাঁপন খেতে খেতে, আধামরা হয়ে থাকা একজন হলাম আমি!
সেই আমি এমন এক আশ্চর্য ঘটনা নিজের চক্ষে দেখেছি- তারপরে ফিট হওয়ার নামও নেই নাই- একদমই ফিট হই নাই-এটা কেমনে হতে পারে?
বিষম সেই তাজ্জবের ঘটনারে দেখার পরে, আমি আমার শরীরে বা মনে কোনো রকম ঠকঠকানি থরথরানি পাই নাই! আমি কিছুমাত্র ভয় পাই নাই! এটা কি বিশ্বাসযোগ্য কথা? এইটা কেমনে হয়?
নাকি আমি যা দেখেছি, সেইটা ছিলো ভুল দেখা? ভুল দেখে এসেছি? মনের ভুল ছিলো ওইটা?
ভেবে ভেবে আমি -আমি মাথা স্থির করতে পারছি না। মাথা ঠা-া করতে পারছি না! মাথা ফাঁপড় ফাঁপড় লাগছে! গরম ভাঁপ বের হচ্ছে তো হচ্ছেই! থামছে না একটুও! কী হলো এইটা আমার!
আমি কী বলবো! কেমন করে বলবো! আমি- আমি- অবিশ্বাস্য একটা ঘটনার সাক্ষী হয়ে গেছি। আল্লা! বিশ্বাস হয় না। বিশ্বাস হয় না। শুনে কেউ বিশ্বাস করবে না- তবুও বলি-
আমার একটা-একটা Ñঅদ্ভুত কিছুর সাথে দেখা হয়েছে! মানুষ না মানুষ না! কিন্তু এখন মানুষের রূপ ধরে আছে সে! ওহ আল্লা!
সেই তখন, সেই যে দুপুরে, কাঁদতে কাঁদতে লেখা বন্ধ করলাম। তারপর কাঁদতে কাঁদতেই কখন জানি ঘুমায়েও গেছি-বলতে পারি না। সেই ঘুমের মধ্যে শুনি কী, কে একজন আমাকে ডাকে! সেই যেমন ভোররাতের মেঘটাকে ডাকতে শুনেছিলাম, তেমন ডাক।
কে ডাকে?
ঘুমের মধ্যেই ভালো করে খেয়াল করে দেখি, মানুষের ছায়ার মতো দেখতে কিছু একটা- আমাকে ডাকছে!
“হুসনা জাহান, একটু আসবেন? আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছি। ছাদে কি একটু আসতে পারেন? খুব দরকার! আসবেন?”
ডাকটা শোনার সাথে সাথেই, চটাং করে আমার ঘুম কিন্তু ছুটে যায়।
স্বপ্নে এটা কি দেখলাম আমি? কেমন স্বপ্ন দেখলাম এটা? আর, স্বপ্নের ডাক এমন স্পষ্ট, এমন বাস্তবের মতো শোনায়? এমন শোনায়?
মা মা! কী হচ্ছে এইসব!
আমি হতভম্ব হয়ে শুয়েই থাকি। অনেকক্ষণ শুয়েই থাকি। উঠে কী করবো! ছাদে আর যাওয়া-যাওয়ি নাই! আর যাবো না কখনো। যে কিনা আর কয়দিন পরে মারা যাবে, তার আবার মোরাকাবা করার কোন দরকার! তার আর ছাদেই বা যাওয়া-যাওয়ি কী! কোনো কিছুরই আর কোনো প্রয়োজন নাই তার! নাই!
এই কথা মনে আসে, পলকে চোখ পানিতে টুবুটুবু হয়ে যায়। যথানিয়মে সেই আমি হাতের পাতা দিয়ে চোখ মোছা শুরু করি।
সেই সময় আবার আমি পরিষ্কার শুনতে পাই ডাক!
“হুসনা জাহান, আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছি। খুব দরকার! ছাদে আসবেন কি? আসুন!”
ও আচ্ছা! তাহলে ক্যানসারে শুধু আমার শরীরটারেই দখল করে নাই, ওইটায় তবে এখন আমার মাথায়ও চলে গেছে? তাইলে আমার মগজেও ক্যানসারে এ্যাটাক করে শেষ করেছে? আহা আল্লা! মাথাটাও গেছে! তাই না? নাইলে এমন নাই-কথা শুনতে পাবো কেনো? আহা রে! আমি শেষ! বেশীদিন আর তবে নাই আমি! আহা!
ঠিক আছে তবে। যাবো আমি ছাদে। যেই ছাদে বসে অসুখটারে দেখতে পেরেছি, হাত-পাও-রথ থাকতে থাকতে সেই ছাদেরে শেষ বিদায়টা দিয়া আসি আজকে!
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে দেখি, এটা সেই সন্ধ্যার টাইমটা! আজকে মাগরেবের আজান পড়ে গেছে কখন, আমি শুনি নাই। এটা মাগরেবের আজানের পরের সেই টাইমটা!
আহা রে! কয়দিন আগেও না সুস্থ ছিলাম আমি! কী ভালো না বাসতাম এই সময়টারে!
এখন সব শেষ! আমার দিন ফুরাতে আর তো দেরী নাই! হাত দিয়ে চোখের পাতা মুছতে মুছতে আমি সিঁড়িঘরের দরোজা খুলে, ছাদে যাই। তারপর সোজা গিয়ে দাঁড়াই পশ্চিমের পেয়ারা গাছটার সামনে।
এই তো চেয়ারটা তেমনই পড়ে আছে গাছটার সামনে। সেদিন তো এটাতে বসেই মোরাকাবা করেছিলাম, তাই না? আর হবে না সেইসব! আর হবে না! আমার কান্না আর কান্না থাকে না। হাউমাউ বিলাপ হয়ে যায়।
“আমি পেছনে আছি। একটু কি আমার এখানে আসবেন?” পেছন থেকে কে যেনো আমাকে ডাক দেয়!
এই নিরালা ছাদে, যেখানে জনমনিষ্যির কোনো চিহ্ন নাই, সেখানে ডাকটা ডাকে কে? কেমন করে? কেমন করে ডাক শোনা যায়?
হঠাৎ আমার কেমন ডরে ধরে যায়! এটা কী কথা! ছাদে তো আমি ছাড়া কেউ নাই! সেইখানে আমাকে ডাকবে কে! আমি পেছন ফিরে তাকানোর সাহস পাই না! বরং হুড়–ম-ধড়–ম ছুটতে চাই সিঁড়িঘরের দিকে।
কিন্তু ছুটবো কেমনে! আমি দেখি যে, আমার দুই পা-ই অচল হয়ে গেছে। আমি খাড়া হয়ে আছি ঠিক, কিন্তু পা দুটা যেনো পা আর নাই। তারা হয়ে আছে সিমেন্টের খাম্বার মতন মরা! বিবশ! সেইখানে নড়ার কোনো শক্তি নাই! আমি একচুল নড়ার শক্তি পাচ্ছি না তো! এটা কি ব্যাপার?
“আপনি ঘুরে যদি আমার দিকে আসতে চান, তাহলে ঠিক আসতে পারবেন! কিন্তু অন্য দিকে ছুটতে চাইলে, কিছুতেই যেতে পারবেন না। আমি গতি-রুদ্ধকারী তরঙ্গ-বন্ধনে আটকে রেখেছি আপনার পা! তবে, আমাকে ভয় পাবেন না! আমাকে ভয় পাবার কিছু নেই। আমি আপনার জন্যই এসেছি, হুসনা জাহান!”
কী! কী বলে এইটা! কে বলে? কে? শরীরের কাঁপন সামলাতে সামলাতে আমি পুবের দিকে ঘুরে দাঁড়াই। কই? ওইদিকে তো কেউ নাই! কিচ্ছু নাই! তাইলে আমি কথা শুনতে পাই কেমনে? কী! কী এইসব!
দাঁতে দাঁতে বাড়ি খেতে থাকে আমার। আবার পা দুটারে সিঁড়িঘরের দিকে নেওয়াতে চাই। পা কিছুমাত্র নড়ে না! একটুও নড়ার শক্তি পাই না। কিন্তু যেই পা দুইটাকে পুবদিকে বাড়াতে চাই, দিব্যি সুন্দর পা চলতে থাকে।
কই, এই তো পুবদিকের শেষ দুই কিনারে দুই দুইটা পেয়ারা গাছের টব দাঁড়ানো। মাঝখানের রেলিং এই তো ফাঁকা! কেউ তো নাই কোনোখানে!
তাহলে কে ডাকলো? কার ডাক শোনা গেলো? কে আসতে বললো এইদিকে? কই সে!
“এই যে আমি! একটু সতর্কচোখে যদি তাকান, দেখতে পাবেন!” আমি কথা শুনতে পাই।
সতর্কচোখে তাকাবো মানে কী! ভয়ের কিছু আছে নাকি? আল্লা! এইবার তুমি আমারে রক্ষা করো আল্লা! মনে মনে এই চিৎকার দিতে দিতেও, ফাঁকা রেলিংটার দিকে, খর-চোখে, কেমনে যেনো তাকায়ে ফেলি আমি।
দুই পেয়ারা-টবের মাঝখানের জায়গাটাতে, রেলিং ঘেঁষে, কেমন জানি একটা ছায়ার মতো কী একটা দেখা যায়! ওই যে!
মানুষের শরীরের আবছা ছায়ার মতো-কিছু একটা দেখা যায়! ওই তো দেখা যায়! খুব নজর দিয়ে তাকালে ঠিকই তো দেখা যায়! আবছা একটা ছায়া!
অদ্ভুত ছায়া! একদম ঠিক মানুষের মতোই রেলিংয়ে ভর দিয়ে আধা বসা হয়ে আছে মিহি ছায়াটা। দুই পা ছাদে। শিথিল করে রাখা পা। এক হাত যেনো পকেটে রাখা, এক হাত রেলিংয়ে। পেট ঘাড় মাথা উঁচোনো। শূন্যে উঁচানো। আমি রেলিংয়ে ভর দিয়ে বসলে যেইভাবে বসবো, ছায়াটা ঠিক সেইভাবে বসা!
এ কেমন ছায়া! এটা কী!
“আপনি আপনার প্রিয় কোনো পুরুষের কথা কি মনে আনতে পারেন এখন, হুসনা জাহান? প্লিজ! আপনি তাকে একটু কেবল মনে করুন! আমি এখনই তাহলে সেই কাঠামোটা নিয়ে নিতে পারি! আপনার সুবিধার জন্য বলছি। নয়তো, এরকম আমাকে দেখে আপনার ভয় কাটবে না!” আমি ছায়াটার কথা শুনতে পাই।
কী অদ্ভুত কথা বলে এই ভূতটা! নাকি এটা জ্বীন! আল্লা, তুমি জানো! এইটা কী!
কিন্তু কী অদ্ভুত কথা বলছে এই জ্বীন!
বলে, প্রিয় পুরুষ! আমার প্রিয়পুরুষ! আমার কি ছিলো কোনোদিন? সেটা কী কোনোদিন হয়েছে? আমার কোনো প্রিয়পুরুষ নাই! কোনোদিন হয় নাই কেউ!
কিন্তু তারপরেও কিছুর মধ্যে কিছু না; ওই আবছা ছায়াটার আধো বাঁকা হয়ে রেলিংয়ে ভর-দেওয়া ভঙ্গীটা দেখতে দেখতে- অনেক, অনেকদিন আগের একজনের কথা মনে আসতে থাকে কিন্তু আমার! দুদ্দাড় করে মনে আসতে থাকে তার কথা!
ঠিক এমন শিথিলরকম ভঙ্গী করে সেও তো দাঁড়ায়ে ছিলো একদিন – বাংলা বিভাগের করিডোরে! সেই সকালে! সেই কোন আগেকার দিনের সেই সকালে! তার নাম মাহবুব শরীফ!
আমি তাকে দেখে কী থমকানো যে থমকে ছিলাম! এই ছায়াটার ভঙ্গীটা ঠিক ওই ভঙ্গীটার মতো লাগে না? লাগছে কিন্তু!
মাহবুব শরীফ! তার কথা মনে এলো এই এখন? কেমন করে তাকেই মনে এলো? এই ভাবনাটা আমার মনের ভেতরে নড়ে যেতে যেট্টুক সময় লাগে, সেই সময়টুকুর মধ্যে আমি দেখি, রেলিংয়ের ছায়াটা আর ছায়া নাই।
ওখানে মাহবুব শরীফ।
মাথা ভরা সেই তেমন তুমুল চুল। কালো, এলানো চুল। পরনে সাদা শার্ট! সেই সাদা শার্ট!
শার্টের হাতা একটুখানি গোটানো। সেই যেমন ছিলো সেই সকালে! সেই ইন করে পরা শার্ট! ওই কালো বেল্ট দেখা যায়, ছাই-ছাই কালো জিনসের ট্রাইজার!
“আপনাকে ধন্যবাদ জানাই! আপনি আমাকে মাহবুব শরীফ বলেই ডাকতে পারেন! অন্তত যতোটুকু সময় আপনার সাথে থাকতে হবে আমাকে, ততোটুকু সময়ের জন্য! আপনাদের এখানে তো দেখলাম, নাম ছাড়া চলেই না!” অচেনা লোকটা বলে।
আমি এই কথার উত্তর দেবো কী! আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, এই অদ্ভুত জ্বীনটা কিছুমাত্র মুখ নাড়াচ্ছে না। একদম বন্ধ এর মুখ। অথচ আমি এর সবকথা শুনতে পাচ্ছি! পরিষ্কার রকমে সব কথা শুনতে পাচ্ছি!
এমন জ্বীনের সঙ্গে মানুষ কী কোনোদিন কথা বলেছে! এমন রকমে কথা বলেছে? আমি জানি না! জানি না!
আরো কী ভয়াবহ ব্যাপার! আমাদের ছাদে বা আশেপাশের কোনো ছাদে কোনো লাইট জ্বলছে না! রাতের এই সময়ে- অন্য অন্য দিন- আমাদের ছাদে থাকে ঘুঁসঘুঁসা অন্ধকার!
কিন্তু আজকে অন্ধকারটা নাই। বরং কেমন একটা চাপা সাদা আলোর আভা ছড়ায়ে আছে আমাদের ছাদের পুব দিকটায়! আলো, কিন্তু যেনো আলো না!
এটাও তো তাইলে এই জ্বীনটারই কোনো একরকম কীর্তি, তাই না? অন্ধকারকে আলোর মতো কিছু একটা বানায়ে নিয়েছে সে। আবার দেখো সে মুখ নাড়ছে না, কিন্তু আমি তার কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি!
আল্লা!
“তাহলে আপনি চাচ্ছেন আমিও আপনাদের মতো করেই কথা বলার কাজটা সারি?” আমি জ্বীনটার কথা শুনতে পাই! তারপর দেখি -সে আমার উত্তর শোনার জন্য কিছুমাত্র অপেক্ষা না করেÑ আবার আমাকে তার কথা শোনানো শুরু করে।
“আমাদের ওখানে এই রীতিতে কথা বলার রেওয়াজটা এখন আর নেই। এমন ভঙ্গীতে কথা বলার রীতি আমরা বাতিল করে দিয়েছি কয়েক হাজার বছর আগেই। এখন আমি যেভাবে বলছি, এই যে কথা-তরঙ্গ ভাসিয়ে দেয়া- এটাই এখন আমাদের ভাব বিনিময়ের রীতি! আপনাদের রীতিতে কথা বলার ধরণটা আয়ত্ত করার জন্য- আমার অন্তত- আপনাদের চব্বিশ ঘণ্টা সময় দরকার পড়বে। কিন্তু অতোক্ষণ আমি এখানে থাকবো কিনা-আমি নিশ্চিত নই! মুশকিলে ফেলে দিলেন কিন্তু হুসনা জাহান! অবশ্য আপনাকে নিয়ে আমার মুশকিলের শেষ নেই!”
‘আমাকে নিয়ে মুশকিলের শেষ নাই? বলে কী জ্বীনটা! এরে আমি দেখলাম কবে যে, মুশকিলে ফেলবো! খুব কিন্তু অদ্ভুত কথা বলছে এই জ্বীন! এর তো দেখি অদ্ভুত কথা বলারও কোনো সীমা পরিসীমা নাই! কোন দেশের কথা বলছে সে? কোন দেশ?’ আমার মনের ভেতরে এই কথা নড়ে ওঠে।
“জ্বীন বলাটা ঠিক হচ্ছে না। আমি ওরকম কিছু কিন্তু নই!”
আল্লা গো! এই জ্বীন-ভূতে তো মনের ভেতরের কথাও বুঝে নিতে পারে দেখি! এটা কেমন একজন! মনে মনে এই কথা বলে, সঙ্গে সঙ্গে মনের ভেতরে কথার ওঠানামাটাকে আটকে ফেলি আমি। মনে মনে বলে ফায়দা কী! এর কাছে তো সেটা গোপন থাকবে না দেখা যাচ্ছে!
লোকটা এইবার যেনো আমার মনের ভেতরের কথা শোনার জন্য কোনো তাগাদা পায় না। সে নিজের কথাই বলে যেতে থাকে; “আমি অনেক দূর থেকে এসেছি! অনেক অনেক দূর। এবং সেটা আপনার জন্য! মুশকিল হচ্ছে আমার সেই দেশটার কথা এখুনই আপনাকে বলা যাচ্ছে না! আপনি সেটা নিতে পারবেন না! একটু সময় দিন আমাকে! জানাবো আমি! জানাতে তো হবেই!”
‘আমি কি করেছি? আমার কাছে কি চাই আপনার? কেনো এসেছেন? কেনো ভয় দেখাচ্ছেন?’ হঠাৎই কেমনে জানি আমার গলা চিৎকার করে ওঠে। কিন্তু কেনো জানি ওটাকে ফোঁপানির মতো শোনায়!
“আমার ভুলে আপনি এতো কষ্ট পেয়ে যাচ্ছেন! এমন ভয়ানক কষ্ট! সেটা দূর করার জন্য আমি ছাড়া আর কে আসবে? আমাকেই তো আসতে হবে!”
‘না! আমার কোনো কষ্ট নাই। আমার আবার কী কষ্ট!’ বলতে বলতে আমার মনে পড়ে যায়, এই শরীরে না ক্যানসার বাসা বেঁধে ফেলেছে? আমি তো আর বেশী দিন নাই এই দুনিয়ায়!
চোখে আবার পানি চলে আসে। অনেক পানি। আচ্ছা, এমন অচেনা কারো সামনে কাঁদে নাকি কোনো ভালো ঘরের মেয়ে? ছিহ! কী করছি এইসব!
আমি আমার হাতের পাতা ঝটপট তুলতে যাই চোখের পানি মোছার জন্য।
তখন সেই জল টুপটুপা চোখেই দেখি কী, রেলিংয়ে হেলান দেওয়া সেই অদ্ভুত মানুষটাও তার ডান হাতটা বাড়ায়ে দিচ্ছে আমার দিকে।
ওমা! জ্বীনটা তার হাত এমনে বাড়ায় ক্যান! ও মা গো!
আমি চোখের পানি মুছতে ভুলে যাই। বরং আমার নতুন করে ভয় লাগতে থাকে।
আমি তো তার থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়ানো। ওই লোক আমার দিকে হাত বাড়ায় কেনো? কিছু চায় নাকি? নাকি আমাকে আক্রমণ করবে? এইবার মেরে ফেলবে আমাকে! ও মা!
কিন্তু তখুনই কেমন যে ধন্ধে পড়ে যাই আমি! একবার যেনো লাগে হাতটা এগিয়ে এসেছেÑ একদম আমার চোখের পাতা বরাবর! একবার যেনো মনে হয়, কিসের কী! ওই লোকের যেমনকার হাত- ওই তো তার কোলের ওপরই পড়া আছে!
আশ্চর্য তো!
“এতো সব অদ্ভুত ভয় নিয়ে কেমন করে বাঁচেন?” এই কথাগুলোর সঙ্গে কেমন একরকমের আওয়াজও শুনতে পাই আমি।
কেউ বলে দেয় না, কিন্তু কেমন করে যেনো আমার মন বুঝে নেয় যে, ওটা হাসির আওয়াজ! হাসছে জ্বীনটা! আমাদের মতো হা হা হা হাসি না! আমাদের মতো নয়!
কেমন যেনো গাছের পাতাদের ভেতর দিয়ে বাতাস বয়ে যাওয়ার মতো শন শন শন ঝিমি ঝিমি আওয়াজ! শন শন শন ঝিমি ঝিম!
আহা! সেই আওয়াজটা শুনে মনের ভেতরে কেমন খুশী খুশী যেনো লাগতে থাকে! মনে হতে থাকে, আর কোনো ভয় নাই! একটুও ভয় নাই! এটা আবার কেমন ব্যাপার! এমন কেনো লাগে!
তারপর কিনা আরো আশ্চর্য ব্যাপারটা ঘটে!
চোখের পলকটা ফেলতে না ফেলতে আমি দেখি, এতোক্ষণ ধরে রেলিংয়ে ভর দিয়ে বসে থাকা জ্বীনটা আর রেলিংয়ে হেলান দিয়ে নাই! ওই তো দেখি লোকটা খুব ধীরে এগিয়ে আসছে আমার দিকে! ও মা! আমাকে না এখনই আছাড় মারতে যায় জ্বীনটা! জ্বীনেরা তাই তো করে বলে শোনা যায়! ও মা!
লোকটা আমার মনের কথাগুলা শুনে ফেলে কিনা বোঝা যায় না। তবে সে আমার দিকে একটুখানি এগিয়ে এসে, তার মুঠোকরা ডান হাতের পাতাটা, বাড়ায়ে দেয় আমার দিকে।
কি নিতে বলে এই লোক?
দম আটকে যেতে থাকে আমার! আহ! কী দিতে চায়! কেনো আবার নতুন করে ভয় দেখানো শুরু করছে জ্বীনে!
কি দিতে চায় সে? কি? এই তো হাতটা আমার সামনে বাড়ানো! কিছু নিতে সাধছে এই মুঠো-করা হাত! কি?
সেটা নেবার জন্য আমার একটুও সাহস হয় না, কিন্তু তারপরেও কেমনে জানি আমি হাত বাড়ায়ে দেই।
খুব আলগোছে সে তার মুঠিটা আনে আমার হাতের ওপর। আমার হাতের পাতায় যেনো কিছুমাত্র ছোঁয়া লাগে না- সেই দিকে- খুব খেয়াল করতে দেখি যেনো আমি জ্বীনটাকে!
তারপর দেখি, কী যেনো সে রেখে দিলো আমার হাতে।
অনেক ওপর থেকে, অতি সাবধানে, জিনিসটা আমার হাতের পাতায় রেখে দিতে দেখি আমি তাকে! ও রে বাবা!
আমার হাতে কি দিলো সে? এমন সাবধানে সাবধানে কি দিতে হলো তাকে?
ওমা! টলমলো কয়েক ফোঁটা পানি!
আমার চোখের পানি?
আমার চোখের পানি!
পলকে সেই পানিকে সবুজ মুক্তা হয়ে যেতে দেখা যায়। একটুখানি পরে সেই মুক্তারা আর মুক্তা থাকে না! আস্তে আস্তে দুলতে দুলতে তারা হয়ে যায় নীল জোনাক। তারপর সেই নীল জোনাকেরা ওড়া শুরু করে! ধীর উড়াল! কোন উঁচুতে ওই যে কালো আকাশ! সেইদিকে উড়ে যেতে থাকে তারা!
এসব কী! যাদু? এমন অপরূপ যাদু! এমন যাদুও হয়!
আরো কী ব্যাপার দেখো! আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি, ওই জোনাকগুলা এমনি এমনি উড়ে যাচ্ছে না! ওরা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে আমার মনের ভয়গুলাকেও! ওই যে, আমার ভয়গুলাকে সাথে নিয়ে নিয়ে ওরা উড়ে উড়ে চলে যাচ্ছে।
ভয়েরা যদি মনের ভেতর থেকে-এমন করে উড়ে চলে যায়, তারপর কি থাকে তবে মনের ভেতরে?
আমি দেখতে পাই, মনের ভেতরে জমে উঠছে সুখ! একটু একটু সুখ! আমি বুঝতে পারি, আমার আর ভয় লাগছে না! এই জ্বীনটাকে আর যেনো ভয় লাগছে না! বরং কেমন করে যেনো এই অচিন ছায়া-মানুষটাকে ভালো লেগে যাচ্ছে আমার! ভালো লাগছে! একটু একটু ভালো!
সেই ভালোলাগাটা, ওই জোনাকগুলার মতো, তারপর উড়তে থাকে আমার মনের ভেতরে। উড়তে থাকে উড়তে থাকে! আর খুশী লাগতে থাকে আমার! খুশী লাগতে থাকে! ঝুপঝাপ খুশী!
এমন করছে কেনো আমার মন?
এসব তো ঠিক না। আগন্তুকে বিশ্বাস করতে হয় না! আব্বা বলতো না?
তাইলে আমি এখন আমার মনকে এতোখানি এলাও করছি কেনো? এই অচেনা একজনকে এতোখানি ভালো লাগতে দিচ্ছি কেনো মনকে?
মনের ভেতরে ওইরকম সব উল্টাসিধা কথারা উঠতে পড়তে থাকে আমার। আবার অস্থির অস্থির লাগতে থাকে! খুশীতে অস্থির লাগা! আমার যে ব্লাড ক্যানসার হয়ে গেছে-আমার শরীরভরা যে পিলপিলানির যন্ত্রণা আছে-সে সবের কিচ্ছু আর তখন মনে পড়ে না!
কেবল ওই অদ্ভুত মানুষটাকে যে একটুখানি ভালো লাগছে-সেই কথাটুকু শুধু মনে আসতে থাকে।
তারপর অল্পক্ষণের মধ্যেই আবার একটা সন্দেহ, একটা ধন্দ এসে মনের ভেতরে ঝাপটা দিতে থাকে। কে এটা? এইখানে, এই ছাদে, কেমন করে এলো? কোন দিক দিয়ে উঠে আসছে? এরে দেখে কেনো- খুশী হতে চায় কেনো- আমার অন্তর? ঘটনা কি?
এমন উল্টা-অদ্ভুত সবকথা- মনের ভেতরে নিয়ে- হতভম্ব হয়ে দাঁড়ায়ে থাকি আমি। সেই ছায়া-মানুষটারও দিক থেকেও কোনো কথা ভেসে আসতে থাকে না। সেও আমার মতোই নির্বাক হয়ে থাকে।
দুজনে চুপচাপ দাঁড়ানো। অনেকটা ফারাকে দাঁড়ানো, কিন্তু সেটাকে মুখোমুখিই বলা যায়! দুজনের মুখেই কোনো কথা নাই, কিন্তু যেনো দুজনের সামনে থেকে দুজনার সরে যাওয়ার শক্তিটাও নাই!
‘আর কোনো কথা নেই?’ শেষে আমি মনে মনেই সেই লোককে জিজ্ঞেস করি!
“আমি কিন্তু এখন বিদায় নেবো, হুসনা জাহান! আপনাকে খুঁজতে কেউ আসছে! যাই তবে! ভয় পাওয়ার কিছু নেই।” সে আচমকাই বলে; “আপনার শরীরের কষ্টটা যাতে কমে আসে, তার জন্য আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি এতোক্ষণ! কিন্তু পুরো সারিয়ে তোলা যায়নি আপনাকে। আমি দুঃখিত! তবে ভয় নেই! আমি আপনার কাছে কাছেই থাকবো। একদম কাছে কাছেই আছি! বিদায় তবে!”
বিদায়? বিদায় কেমনে হবে? যেতে হলে তো যাওয়া লাগবে সিঁড়ি দিয়ে। তো, সেটার জন্য আমার সাথে নামলেই তো হবে! কোনো কথাই তো ঠিকঠাক শোনা হয় নি। এখনই বিদায় কেনো? না! এখনই নয়। এই যে অচিন মানুষ!
আমি তাকে ডাকতে যাই, কিন্তু আমার কথা আমিই শুনতে পাই না। দাদাভাইয়ের চাপা গলার চিল্লানির নিচে ঢাকা পড়ে যায় আমার গলা!
‘তুই কোন সাহসে- এই রাইত বারোটা পর্যন্ত- ছাদে খাড়াইয়া রইছস? কইলজার তেনে ডরভয়, লাজলজ্জা সব চইল্লা গেছে নাকি? এদিগে তর ভাবী যে নানা কুকথা কইতাছে, সেইটার হুঁশ আছে? আমারে শান্তি দিবি না নিয়ত করছস?’
আমি অপরাধী পায়ে নিচে নেমে আসি। রাত তবে সত্যিই বারোটা বেজে গেছে? এতো রাত পর্যন্ত ছাদে ছিলাম নাকি তাইলে? কী সর্বনাশা কথা! কেনো ছিলাম?
কি থেকে কি ঘটেছে তাইলে? আসলেই সত্য কিছু ঘটেছে? নাকি আমারে জ্বীনে পাইছিলো? নিশিরাতে একলা ছাদে থাকলে যে জ্বীনে আছর করে, সেই কথা কে না জানে? আমিও তো জানি!
নাকি আমার দৃষ্টিভ্রম হইছিলো? আন্ধারে আমি কী দেখতে কী জানি ভুল সব দেখছি? ওইসব কিছুই সত্য না? ভুল! ভুল ছিলো? নাকি ওইসব পুরাটাই সত্য? সত্য ছিলো? নাকি ভুল?
কই, ছাদে গিয়ে দাদাভাইয়ে যখন আশপাশে টর্চের আলো ফেললো, অচিন মানুষটারে তো কোনোখানেই দেখা গেলো না! দেখা গেলো ছাদ ফাঁকা, সুমসাম!
তাইলে কার সাথে এতো কথা বলা? এতোক্ষণ ধরে এতোসব কথা? নাকি আমার মাথাখারাপ হয়ে গেছে!
এই যে এখন-একবার মনে হচ্ছে আমার মাথায় গ-গোল হয়েছে। তাই অমন আবোলতাবোল দেখতে পেয়েছি। একবার মনে হচ্ছে, না না! ওটা সত্য ঘটনা! আমি আসলেই ভয়ঙ্কর একটা ঘটনা ঘটতে দেখেছি। অবিশ্বাস্য বিষয়! পৃথিবীর কেউ যা কোনোদিন দেখে নাই, আমি অতি সামান্য একজন হয়েও সেটা দেখতে পেয়েছি!
বিশ্বাস করা যায় না! যায় না! কিন্তু সত্য!
আরো কী অদ্ভুত আরেকটা ব্যাপার যে ঘটছে!
অনেকক্ষণ হয় আমি বোধ করছি, সেই বিষম পিলপিলানির কষ্টটা যেনো আমার শরীরে তেমন একটা নাই! একদম যে সেরে গেছে, সেটা বলবো না! কারণ হঠাৎ হঠাৎই শরীরে কেমন ঝিলিকবিলিক লাগছে একটু একটু; কিন্তু পরিষ্কার বুঝতে পারছি, যন্ত্রণাটা আর আগের মতো তীব্র হয়ে নাই!
অচিন মানুষ! জানি না আপনি সত্য কিনা! নাকি আমার মাথায় গোলমাল ঘটে গেছে, তাই ভুল দেখেছি আমি! আমি জানি না! তবুও আপনাকে সত্য বলে বিশ্বাস করতে সাধ হচ্ছে! মাহবুব শরীফ বলে ডাকতে ইচ্ছা হচ্ছে! সত্যি সত্যিই ডাকতে ইচ্ছা করছে!
মাহবুব শরীফ! মাহবুব শরীফ! অচিন মানুষ! আমি কি সত্যিই আপনাকে দেখেছি? নাকি ওইসব কিছু শুধু আমার কল্পনা? আমি জানি না! আমি কিছুই বুঝছি না।
কোথায় আপনি? কেমন করে কোথায় চলে গেলেন? আমাকে কি শুনতে পাচ্ছেন?
১৫ এপ্রিল ১৯৯৫
রাতটা আমার কেমনে যে গেছে, তার খবর খালি আমিই জানি! এই একটু ঘুম আসে, এই চটক দিয়ে দিয়ে ঘুম ছুটে যায়! রাতভরে কেবল এই!
আমার মনের মধ্যে যেমন বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের আসা-যাওয়া চলছে মিনিটে মিনিটে, চোখেও তেমন ঘুমের আসা-যাওয়া চলেছে মিনিটে মিনিটে!
কী কষ্ট যে গেছে রাতটা ভরে! চুলবুল পিলপিল চুলকানো আছে, সেটা এখন অতি হালকা রকমের হয়ে আছে ঠিক, কিন্তু আছে তো! সেটার এক কষ্ট! তারপর মনের মধ্যে কেমন একটা ভোঁতা রকমের কান্না-গুঙিয়ে গুঙিয়ে যাচ্ছেই যাচ্ছেই!
আমার-আমার- বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে! মাহবুব শরীফ নাম নিয়ে যে দেখা দিয়েছে, সেই তাজ্জবের বিষয়টাকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে! খুব খুব ইচ্ছা করছে!
আর আমার শুধু কান্না পাচ্ছে। থেমে থেমে কেবল কান্না পাচ্ছে! দুয়েকটা কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, আর দমক দিয়ে দিয়ে কান্না আসছে।
আমার প্রিয় পুরুষ? আছে নাকি কেউ এই জগতে? নাই তো! কোনোদিন নাই!
লোকটা এমন কথাটা কেনো বললো? সে কি জানে না, মানুষকে এমন করে লাঞ্ছনা দিতে নাই? কষ্টের কথা মনে করিয়ে দিতে নাই? তাহলে কোন বুদ্ধিতে লোকটা এমন কথা বললো?
আচ্ছা, লোকটার বুদ্ধি যাই হোক; আমিই বা কেমন? চেনা না শোনা না-এমন একজন জানতে চাইলো, আমিও বলে দিলাম? বলে দিলাম প্রিয় পুরুষের নাম! তাইলে তো দেখা যাচ্ছে আমিই ভালো না!
আমারও কেমন এই মন? সেই কবেকার কথা মনে আসে! সেই কোনকালে দেখা একজনের কথাই কিনা আচম্বিতে মনে আসে? কেমন করে মনে আসে?
এইসব কথাই আজকে সকালে দুপুরে বিকালে সন্ধ্যায়- খালি আমার মাথার মধ্যে ঘুরছে ঘুরছে ঘুরছে! আর কিছু মনে আসে নাই।
ক্লাশে ক্লাশে আজকে কী পড়ালাম, কী বললাম-কিচ্ছুর কোনো হুঁশ ছিলো না আমার! শুধু মনে হচ্ছিলো- আমি যেনো আর এই দুনিয়ার মাটির ওপরে নাই! যেনো আমিও ওই জোনাকগুলার মতো উড়ে উড়ে কই জানি চলে যাচ্ছি! কই জানি চলে যাচ্ছি!
কলেজে একটু পর পর শুধু মনে হয়েছে; এই সকাল এই দুপুর- কেনো ফুরায় না-কেনো ফুরায় না! কেনো ফুরায় না! কেনো সন্ধ্যা হয় না! কেনো রাত আসে না! কেনো আসে না!
বাসায় ফেরার পরেও সেই একই রকম ছটফটানি! বিকাল কখন হবে! কতো দেরী? ছাদে যাওয়া লাগবে যে! কখন যাবো!
এমনকী দুই একবার আমাদের ফোনটায় রিং হতে শুনেও, আমার ভেতরটাতে অনেক ছটফট লাগতে থাকে! কেনো জানি মনে হতে থাকে, ওটা আমার জন্য আসা ফোন! মাহবুব শরীফের ফোন! আমার জন্য!
নিজেকে সামলাতে না পেরে, শেষে কিনা, আমি বারান্দায় এসেও দাঁড়ায়েছিলাম অনেকক্ষণ! যদি আমার ফোন হয়! ভাবী যেনো তাইলে একটু উঁকি দিয়েই দেখতে পায়-আমি বারান্দায় দাঁড়ানো! তাইলে হয়তো ফোনটা কেটে দেবে না। তাইলে ফোনটা আমারে ধরতে দিতেও পারে সে!
ফোনটা দাদাভাইয়ের বেডরুমে এখন।
দিনের বেলায় কোনোদিন যদি ভুলেও আমার কলেজ থেকে কেউ আমাকে ফোন করে ফেলে, ভাবী আমাকে ডেকে দেয় না। সিধা বলে দেয়-আমি বাসায় নাই। সে আবার আমারে কষ্ট করে ডাকতে যাবে নাকি! তবে রাতের টাইমে হলে তো কথা নাই। দাদাভাই-ই ঘরে তখন। আমাকে ডেকে দেওয়ার লোক তো তখন বাসায়!
এই যে এখন বিকাল হয় হয় দুপুরটা! আজকে-আজকে-এই তো আমি ভাবীর বেডরুমেরই সামনের বারান্দায় দাঁড়ানো। আমাকে শুধু একটু ডাকলেই হবে! আমি যেনো ফোনটা ধরতে পাই আজকে। মাহবুব শরীফের ফোনটা।
কিন্তু আসলে কোনোবারেই ফোনগুলা আমার জন্য আসে নাই। সবগুলা ফোনই ভাবীর। তাদের ঘরের সামনের বারান্দায় দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে আমি, ফোনের মানুষদের সাথে ভাবীকে নানা পদের হাসি-আলাপও করতে শুনি!
আমার জন্য কেউ ফোন করে নাই। সেই লোকটা ফোন করে নাই। কেমনে করবে? সে কি আমার ফোন নাম্বার জানে? এই কথাটা তো আমার পরিষ্কার জানা! তারপরেও কেমন করে আশা করি-সেই লোক ফোন দেবে আমাকে?
আর, ফোন করতে হলে তো তারে সত্যিকারের মানুষ হতে হবে! সে যে সত্যিকারেরই একজন, কল্পনার কেউ না; সেইটা কেমনে বলা যায়? হতেও তো পারে যে, আমি একটা আজগুবি চিন্তা করেছি? একা একা ছাদে হাঁটতে হাঁটতে আজগুবি চিন্তাটা এসেছে মাথায়?
ক্যানসার পেশেন্ট না আমি? ক্যানসার যে মাথায়ও ছড়ায়ে যায় নাই এর মধ্যে, কে বলতে পারে?
তাইলে খুবই সম্ভব যে, লোকটা সত্য কেউ না! ওইটা শুধু আমার আজগুবি ভাবনা। কল্পনার মানুষেরা তো অবাস্তব মানুষ! তারা তো আসল মানুষ না!
এমন কথা যেই মনে আসে, তখনই চোখে কেনো যে পানি আসতে থাকে শুধু! আজকে সারাদিন কেবল এইই চলেছে!
কালকে রাতে-ওই যে অতোখানি গভীর রাতে-একা একা ছাদে দাঁড়িয়ে – কী দেখতে কী দেখেছি কে বলতে পারে? সেইটাকে সত্য বলে বিশ্বাস আসছে কেনো আমার? সত্যিকারের মানুষ হলে, এমন আচমকা নাই হয়ে যেতে পারতো? কেউ পারে? পারে না।
এমন সন্দেহ-সংশয় আর বিশ্বাস -অবিশ্বাসে ধুকপুক ধুকপুক করতে থাকা বুক নিয়ে ছাদে গেছি আমি। আজকে আর বিকাল হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে পারি নাই। দুপুর সাড়ে তিনটার দিকেই চলে গেছি।
দেখো পুবের রেলিং ওই যে খালি-ধু ধু! দুই পাশে অই যে দুই পেয়ারা গাছের টব। রোজকার মতনই চুপচাপ তারা। ওইদিকে আর কিছু নেই। সিড়িঘরে বসে থেকে থেকে সারাবেলা চেয়ে থেকেছি ছাদের খরখরা রোদের দিকে! কেউ কি আচমকা এসে হাজির হবে? আসবে কেউ?
কেউ আসে নাই!
সন্ধ্যার নিয়মে সন্ধ্যাও এসেছে আজকে। আমি একা বসে থেকে থেকে বারেবারে চমকে উঠেছি। কেউ কি এলো? এসেছে?
কেউ আসে নাই!
মোরাকাবা করার জন্য মনটাকে শান্ত করতে পারি নাই কোনোমতেই। শুধু চেয়ে থেকেছি পুবের রেলিংয়ের দিকে। ওইখানে কোনো ছায়া দেখা যায় নাকি? কেউ কি এসেছে?
না! কেউ আসে নাই!
তবে আজকেও হঠাৎ করেই দাদাভাই গিয়ে উপস্থিত হয় ছাদে! কোনোদিন না কোনোকালে! এই সন্ধ্যার সময়ে দাদাভাই কিনা ছাদে?
এমন সন্ধ্যাসন্ধির টাইমে, সে তো বাসায়ও থাকে না কোনোদিন। থাকে চেম্বারে, ক্লায়েন্টদের নিয়ে! প্রতিদিনের সেই ভীষণ ব্যতিব্যস্ত থাকার টাইমে, ও কিনা ছাদে আজকে!
‘কি হইছে দাদাভাই?’
“চল, নিচে যাই গা! তুই আর এমনে ছাদে আসিস না! তর ভাবী বহুত কুকথা কইতাছে! ফোনের উপরে ফোন দিয়া দিয়া পাগল কইরা ছাড়ছে আমারে! সব কাজ ফালাইয়া- না আইসা পারলামই তো না! দেখ কারবার!”
আমার ভেতরটা হায় হায় করে ওঠে! নিচে চলে যাবো! কেমনে পারবো যেতে!
যদি- যদি- সেই আজগুবি লোকটা আসে? তাইলে তো আমার দেখা সে পাবেই না আজকা! আমিও তো তাকে দেখতে পাবো না! দেখতে পাবো না!
‘মোরাকাবাটা কইরা নিচে যাই?’ আমি ছাদে থাকার শেষ চেষ্টাটা করি!
“অখন কয়দিন মোরাকাবা বাদ। ঘরে গিয়া টেলিভিশন দেখ গা তো! চল, আমার লগে!”
ঘরে এসে মনে হলো, কেনো তবে আর জেগে থাকতে হবে আমারে? কোনো প্রয়োজন নাই তো জেগে থাকার!
এই যে এখন আমি আমার বিছানায়। আমার আর একটুও জেগে থাকার শক্তি নাই! কিন্তু তাও কেনো জানি মনে হলো, কয়টা কথা একটু লিখে রাখি! ঘুমাবার আগে লিখিই না মনের ছটফটানির কথাটা?
শরীরটা যে ভালো নাই আমার, সেই কথাটাও এই এখন মনে আসলো! খুব ঝাঁকি দিচ্ছে শরীরটা আজকে। একটু পর পর জোরে ঝাঁকি দিচ্ছে! বোঝাই তো যাচ্ছে, আর বেশীদিন নাই আমার! আর বেশীদিন বাঁচার কিসমত নাই!
১৬ এপ্রিল ১৯৯৫
এখন সকাল, আমি কলেজে।
নিজের কথাগুলা তো এই খাতার কাছে বলা ছাড়া- আমার বলার আর কোনো জায়গা নাই! তাই খাতাটাকেই জানায়ে রাখছি আমার মনের অবস্থাটা!
বড়ো অস্থির আছি আমি। বলে বোঝানো যায় না-এমন কঠিন অস্থির!
আজকে কলেজে রওয়ানা দেবার সময় কী মনে হলো, নিজের কথা লেখার এই গোপন খাতাটাকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছি। মনে হয়েছিলো, ক্লাশের ফাঁকে ফাঁকে কয়টা কথা লিখে রাখবো। লিখে রাখবো অসম্ভব জটিল কয়টা স্বপ্নের কথা। কালকে রাতে দেখা স্বপ্ন! একটা দুটা না! অনেক কয়টা স্বপ্ন!
সেই কথাগুলি বিকালে বাসায় ফিরেও লেখা যেতো! কিন্তু সকালে মনে হলো, সারাদিনে যদি ভুলে যাই স্বপ্ন কয়টারে? এমন স্বপ্ন জীবনেও দেখি নাই! সেগুলারে ভুলে যেতে চাই না আমি! এই জীবনে ভুলে যেতে চাই না!
সেইসব স্বপ্নের কথা লিখে রাখার জন্য তাই এই খাতা কলেজে নিয়ে আসা!
কলেজে টিচারদের রুমটা অনেক লম্বা একটা ঘর। উত্তর দক্ষিণে লম্বা। তিনটা টেবিলও জোড়া দিয়ে দিয়ে উত্তর মাথা থেকে দক্ষিণ মাথা পযন্ত পাতা আছে এইখানে। টিচারেরা প্রথমদিন থেকেই যার যার বসার জায়গা ঠিক করে নিয়েছে।
আমি জায়গা পেয়েছি একেবারে দক্ষিণের শেষ মাথায়। দক্ষিণের শেষ চেয়ারটাই আমার বলে, একদিক থেকে রক্ষা। আমার বামপাশে কেউ একজন বসা থাকলে কী, অন্যপাশটা তো ফাঁকা থাকে।
এইভাবে আমি তো একটু হলেও রেহাই পাই! এইভাবে আমি সবদিক দিয়ে লোক ঘেরাও হয়ে নাই তো এইখানে।
কাজেই ক্লাশের ফাঁকে ফাঁকে এইখানে বসে- নিজের খাতায়- নিজের কথা আরামেই লেখা যাবে! এই মনে করেই না নিয়ে এসেছিলাম খাতাটা? কিন্তুকিসের কী! আমাকে খাতায় লিখতে দেখে এর মধ্যে দুইবার উঁকিঝুঁকি দিয়ে গেছে কামরুন আপা। একাউনটিং পড়ায় সে।
সে কিন্তু বসে সেই উত্তর মাথার শেষ চেয়ারে। সেইখান থেকে উঠে এসে এসে তারে খোঁজ নেওয়া লাগছে-আমি কী লিখি! সে শুধু উঁকিলকিই দিচ্ছে না। কয়েকবার জিজ্ঞেসও করে ফেলেছে-আমি কী করি! আমি বলতে বাধ্য হয়েছি, আমি স্টুডেন্টদের পড়ানোর জন্য নোট করছি।
এইসব লোক যে কেমন লোক, বুঝি না আমি!
এখন সকাল প্রায় এগারোটা বাজে। এর মধ্যে দুটা ক্লাশ নেয়া শেষ আমার। একাদশ শ্রেণীর মানবিক বিভাগেরটা আর দ্বাদশের বাণিজ্য বিভাগেরটা। দ্বাদশ বিজ্ঞানের আজকে আছে ১২.৩০ মিনিটে। এই ফাঁকা সময়টাতে, অন্যদিন, আমি মেয়েদের নোট দেখে দেই।
আজকে কিচ্ছু করার ইচ্ছা নাই। কয়েকটা মেয়ে নোট নিয়ে আসছে ঠিকই, আমি বলেছি; কালকা দেখাও!
আমি এখন নোট দেখবো কেমনে? আমি বলে আমার স্বপ্নে দেখা নিয়ে ধড়ফড়াচ্ছি! মাথার ঠিক আছে নাকি আমার? এদিকে শরীরের অসুখ তো শরীরে আছেই!
কালকে রাতে ঘুমাতে গিয়ে কেনো যে অতো কান্না আসছিলো আমার! বুঝলাম না। কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমায়ে গেছি, টেরও পাই নাই!
সেই ঘুমের মধ্যে কতো যে স্বপ্ন! কতো যে স্বপ্ন-আসা যাওয়া করতেই থাকলো করতেই থাকলো-তার ইয়ত্তা নাই! আশ্চর্য! স্বপ্নে স্বপ্নেই কালকের রাত কাবার আমার!
অবিশ্বাস্য অদ্ভুত সব স্বপ্ন! সেই স্বপ্নের কোনোটাতেই আমি নাই। আছে অন্য একজন! আছে, সেই যে সেই রাতে হাজির হওয়া আজগুবি মানুষটা!
ছাদে তারে কালকে বিকালে বা সন্ধ্যায় দেখতে পাই নাই, কিন্তু কা- দেখো! সে কিনা স্বপ্নে এসে উপস্থিত!
প্রথমে দেখিÑ কোথায় জানি কেমন একটা দেশ! মানে ঠিক একটা গ্রামদেশ! গ্রামটার সবদিকে খালি ফসলী মাঠ আর মাঠ। মাঠ আর মাঠ। কোনোটাই কিন্তু শূন্য মাঠ না। সবখানে ফসলের চারা আর চারা।
কোনো কোনো ক্ষেতে ঝোপড়া ঝোপড়া ছোটো ছোটো গাছ। সরু সরু পাতার বোটার আশেপাশে ছোটো ছোটো কতো যে ফুল! সাদা সাদা ফুল। ফুলে ফুলে শয়ে শয়ে মৌমাছি! উড়ছে বসছে উড়ছে।
এমন ফসলী গাছ তো কখনো দেখি নাই। নাম তো জানা নাইই! স্বপ্নে আমি অবাক হয়ে এমন কথা যখন ভাবছি, তখন কে জানি আমার পেছন থেকে, ফসলী গাছটার নাম বলে দেয় আমাকে।
এই হচ্ছে তিসি ফুল! এটা তিসি গাছ!
কে? কে বলে? আমি বিস্মিত হয়ে তাকাই। দেখি, ও মা রে! এইটা দেখি সেই আজগুবি লোকটা!
লোকটা তারপর করে কী, তার দুই হাতের পাতাকে একটা তিসি গাছের গোড়ার কাছে নেয়। আমি স্পষ্ট দেখতে পাই, নিচের মাটিসহ তিসি গাছটা ছোটো একটা লাফ দিয়ে তার হাতের পাতায় উঠে বসে গেলো!
তারপর লোকটা তার অঞ্জলি করা হাত আমার সামনে নিয়ে আসে। আমি বুঝতে পারি, গাছটা আমাকে ঠিকমতো করে চেনাবার জন্যই এটা করছে সে!
আমি পরিষ্কার দেখতে পাই তিসি গাছের পাতাদের। দেখতে পাই ছোটো ছোটো সাদা ফুলদের। পাতা ও ফুলদের শরীর থেকে বেরুতে থাকা একরকমের গন্ধও এসে আমার নাকে-মুখে লাগে! তেজী রোদ রোদ গন্ধ!
আমাকে দেখানো শেষ করে, সেই মানুষ তার হাত আবার মাটির কাছে নামায়।
আমি এইবারও একদম স্পষ্ট দেখতে পাই, আবার হালকা একটা লাফ দিলো তিসি গাছটা। মাটিসহ নেমে গেলো ক্ষেতে।
লোকটা তার আঙুলগুলো একটু বিছিয়ে রাখলো গাছটার মাথার ওপরে। গাছটা নড়েচড়ে নিজেকে আবার ঠিকঠাক বসিয়ে নিলো জমিনে।
তারপর তিসি ক্ষেতদের আল ধরে হাঁটা শুরু করে লোকটা। যেতে যেতে সে দেখে নিতে থাকে কাউনের শিষ, ধানের কাঁচাপাকা ছড়া; নানারকম আগাছা আর তাদের ফুল ও বীজকে।
তারপরও সে চলতে থাকে চলতে থাকে- চলা তার থামেই না!
সমস্তটা দিন ধরেই চলতে থাকে সে। সঙ্গে নিয়ে যেতে থাকে আমাকে। স্বপ্নের মধ্যে আমিও চলতে থাকি তার সাথে সাথে! যেতে যেতে শেষে সে অন্য কোন এক দূর এলাকায় এসে পৌঁছায়।
সেইখানে হঠাৎই একটা নদীকে পেয়ে যায় সে। গহীন বিশাল নদী। খুব পানি আর স্রোতভরা নদী।
তখন তার মুখ যেনো কেমন কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকে! তার চলার গতি ধীর হতে হতে একদম থেমে যায়।
সে যেনো তখন আর চোখের পলকটা ফেলারও শক্তি পায় না। অপলক চোখে সে চেয়ে থাকে পানির দিকে। জোরে ছুটে যেতে থাকা স্রোতের দিকে চেয়ে চেয়ে কেমন যেনো চঞ্চল হয়ে ওঠে তার শরীর।
তারপর আস্তে পায়ে নদীর পানিতে নামা শুরু করে লোকটা।
আরে এই লোক! দেখেই তো বোঝা যাচ্ছে, এই নদীটা কোনো ছোটোজাতের নদী না! বোঝাই তো যাচ্ছে-এটা বড়ো নদী। খরস্রোতা নদী। এটাতে এইভাবে নামা যায় না! অমন গহন নদীতে মানুষেরা কেউ নামে না এইভাবে! এইটাতে এমন করে নামতে যায় নাকি কেউ! ডুবে যাবেন ডুবে যাবেন তো!
‘আরে এই অদ্ভুত লোক! এমনে নামে না এইটাতে। ডুবে যাবেন ডুবে যাবেন!’ আমি পেছন থেকে চেঁচাতে থাকি! লোকটা আমার কথায় একটুও কান দেয় না। ধীর কদমে সে ঠিকই নদীতে নেমে যায়।
প্রথমে তাকে একটু সতর্ক দেখায়, তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মুখে-চোখে কেমন একটা খুশী- কেমন একটা বিস্ময়- ঝিলিক দিয়ে দিয়ে উঠতে থাকে।
ও রে মা! দেখো দেখো-এই লোক কী করেছে! হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছে একদম মাঝ নদীতে!
এমন গহীন যে নদী-তার মাঝখানের থই- কেউ কোনোকালে পায়? হেঁটে হেঁটে যেতে চায় কেউ অইখানে? অই মাঝ নদীতে? গেলে যেতে হবে নৌকায় চেপে! নাইলে সাঁতার দিয়ে!
এই লোক তো হাঁটছে! আল্লা! হায় হায়! এইবার এই মানুষটা ডুবে মরবে। ডুবেই মরবে! আমি আঁতকে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেলি!
তারপর ভয়ে ভয়ে চোখ খুলে দেখি; লোকটা সেই গহন, গম্ভীর, বিশাল নদীটার একেবারে মধ্যিখানে দাঁড়ানো! কিন্তু সে ডুববে কী! অতল সেই মাঝনদীর পানি তারে ডোবাবে কেমন করে! সেই পানি তো তার কোমর-সমান মাত্র!
মা মা! এটা কী দেখছি! এমন গহীন-গভীর নদীর মাঝখানটাও তার কোমর সমান! কই, সামনে থেকে দেখলে তো এই লোককে এমন লম্বা লাগে না!
সে তো আমাদের ঘর-সংসারের আর সব ছেলেদের সমানই লম্বা দেখতে! আমি তো তেমনই দেখেছিলাম তাকে, সেই রাতে। তাই না? নাকি ভুল ছিলো?
“বাহ! আপনার তো দেখি অনুমান করার শক্তি মোটেই নেই! আমি যে দরকারে নিজেকে লম্বা করে নিতে পারি, দরকারে হয়ে যেতে পারি ছোটো- সেটা ধরতেও তো পারছেন না দেখি! কা- বটে!”
স্বপ্নের মধ্যে নানান সব ভাবনা নিয়ে আকুপাকু করছি যখন; তখন আমি তাকে বলতে শুনি অই কথা! ওরে মা! এটা তবে কে? কেমন মানুষ?
তারপর কোমর সমান পানিতে দাঁড়ানো আজগুবি লোকটা করে কী, হঠাৎই এক আঁজল পানি তুলে কী যেনো দেখা শুরু করে! দেখতে থাকে তো থাকেই!
এতো সময় ধরে কি দেখে সে? পানিকে এমন নিবিষ্ট চোখে, সমস্ত অন্তর দিয়ে দেখে যাওয়ার কিছু আছে নাকি? জানি না তো! কিন্তু অই তো অই আজগুবি লোকটা-অমন করে- দেখেই যাচ্ছে নদীর পানিকে! দেখেই চলেছে!
কী দেখে কে জানে! দেখে অনেক ক্ষণ! তারপর খুব খুব সাবধানে আঁজলার পানিকে আবার নামিয়ে দেয় নদীতে।
আঁজলায় দু চার ফোঁটা পানি কি লেগে থাকে? নাকি কিছুই থাকে না? আমি বুঝতে পারি না! কিন্তু তারপর দেখতে পাই লোকটার অন্য কা-টা!
লোকটা তার হাতের পাতায় লেগে থাকা- সেই পানির ফোঁটা কয়টাকেই যেনো- আবার আঁজলা করে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে।
ওরে বাবা! এই লোকের হাত না খালি? পানি না সবটাই নদীতে ঢেলে দিয়েছে সে? তাহলে সে তার খালি আঁজলা থেকে কি নিতে সাধে আমাকে?
দেখছি তো-কিছু নেই তার হাতে! তাও কী দিতে চায়! পাগল কোথাকার!
সেই লোক মাঝনদীতেই তখনও দাঁড়ানো। সেই কোমর সমান পানিতে দাঁড়ানো। তাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে, একটু অল্প ধাক্কা দিয়ে দিয়েই, বয়ে যাচ্ছে স্রোতেরা। সেইখানে দাঁড়িয়ে সে আঁজলা বাড়ায়ে দিয়েছে আমার দিকে!
আমার মনে পড়ে; আমি না অনেক দূরে? আমি না আমার ঘরে? তাহলে আমি হাত বাড়ালেই বা কী! সে কি আমার হাতের নাগাল পাবে? পাবে না তো! না আমি পাবো তার হাতের নাগাল!
ওই লোক এই কথাটা মাথায় নিচ্ছে না কেনো? আন্দাজ জ্ঞানটা কম নাকি তার? সত্যিই মনে হয় এর আক্কেল কম!
কিন্তু দেখো তো, লোকটা আমার দিকে আঁজলা বাড়ায়েই আছে! আছে তো আছেই। আমি তাহলে আর কতোক্ষণ লোকটাকে অপেক্ষায় রাখতে পারি!
শেষে দ্বিধা আর অস্বস্তি নিয়ে আমিও কোনোরকমে আমার আঁজলা বাড়ায়ে দেই, তার দিকে।
মুহূর্তে, আমার হাতে কীসব যেনো এসে ঠাঁই নেয়। সবজে সাদা, ছোটো ছোটো কীসব জানি! অনেকগুলা জিনিস!
সেগুলো পেয়ে আমার দুহাতের পাতা-খুশীতে যেনো বিবশ হয়ে যেতে থাকে! এমন খুশী লাগে কেনো? কি এইগুলা?
ভালোরকমে দেখার জন্য ঝুঁকতে যাই আমি, ও মা! তখনই কিনা ঘুমটা ভেঙে যায়!
এটা হলো কিছু? এমন সময়েই ঘুম ভেঙে যেতে হবে? এমন সময়েই?
মনটা টনটন করতে থাকে! টনটন করতে থাকে। কী দিয়েছিলো সেই লোক-সেটা কোনোদিন জানা হবে না! আহা রে!
গুমরাতে থাকা মনটা নিয়ে আবার চোখ বন্ধ করতে যাই।
তখনই মনে হয়, ঘুমানোর চেষ্টাটা করে লাভ নাই কোনো। ওই তো জানালার বাইরে দেখা যায় ফর্সা আকাশ! কলেজে যাওয়া আছে না? যাই, রেডি হই গা!
তখন শোওয়া থেকে উঠে বসি আমি। বসে যা দেখি, সেটাকে বিশ্বাস করার কোনো শক্তি আমার নাই! সেই শক্তি কোনোদিন হবে না!
দেখি, আমার মাথার কাছের বিছানাটা ফুলে ফুলে ভরে আছে! বালিশে ফুল, চাদরে ফুল! একটা দুটা করে ফুল এদিকে আমার মাথা থেকে, গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে আসছে আমার কোলে! ওদিকে, আমার চুলেও আটকে-লটকে আছে ফুল।
ফুল। বেলী ফুল।
সেই ফুলের গন্ধে আমার এতোটুকু ছোটো ঘরটা থইথই করছে! থইথই করছে!
আমার অঞ্জলিতে কী তবে এতো এতো ফুলই দিয়েছিলো সেই লোক! ফুল?
কোথায় এখন সে?
ও আজগুবি লোক! আপনি কোথায়?
১৬ এপ্রিল ১৯৯৫
রাত এখন কতো! আমার জানা নেই!
আজ দুপুর থেকে যা যা ঘটেছে, তাকে ব্যাখ্যা করার সাধ্য আমার নাই! সেই সবকে বিশ্বাস করি, সেই শক্তিও নাই। আবার তারে অবিশ্বাস করি-সেই সাহসও আমার নাই!
থাক তবে! বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা এখন তবে বাদ দেই। সম্পূর্ণ বাদ দেই। যা ঘটেছে সেই কথা বলি। জানি না, সবটা ঠিকঠাক মতো বলে উঠতে পারবো কিনা!
না-ই যদি পারি, তাতেও ক্ষতি নাই! আমার মনের ভেতরে রয়ে যাবে সব কিছু! চিরদিন ধরে রয়ে যাবে। কোনোদিন মুছে যাবে না। মুছে যাবে না! তারে আমি কোনোদিন মুছে যেতে দেবো না! না!
দুপুরে কলেজ শেষ করে বের হয়েছি যখন, তখন বেলা ঠিক দুটা।
এমন সময়ে এই আজিমপুর থেকে বাসাবো কদমতলার রিক্সা পাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। এইটা রিক্সার বদলির টাইম। সকল রিক্সাঅলা এইসময় রিক্সা নিয়ে গ্যারেজের দিকে ছুটতে থাকে, জমা দেওয়ার জন্য। এমন টাইমে এই এলাকার রিক্সা কোন দুঃখে বাসাবো কদমতলা যাবে!
শান্তিমতো রিক্সা পেতে হলে তিনটা বাজতে হবে।
সেইজন্য অন্য দিন আমি কলেজের কাজ বুঝে, হয় দুইটার আগে বের হই; নাইলে তিনটার দিকে বের হই।
এই যে কয়দিন ধরে- না আমার শরীরটা ঠিক আছে, না আমার মনটা ঠিক আছে! সেইজন্য আজকে আর কোনো নিয়ম মানামানির ধার ধারতে ইচ্ছা করে নাই আমার! আজকে মনে হলো, কী আসে যায় রিক্সা না পেলে? হাঁটতে হলে হাঁটবো! কিন্তু এখনই বের হয়ে যাবো!
কলেজের বড়ো গেটটা সর্বক্ষণই বন্ধ থাকে। দারোয়ান পকেট গেট দিয়ে একজন একজন করে ছাত্রী বের করে। ঢোকায়ও সেইভাবেই। তাতে ছাত্রী ঢোকাতে আর বের করতে এখন যতোক্ষণ লাগে, লাগবে! বড়ো আপার হুকুমই এমন।
পকেট গেটটা এই একটুখানি। ঘাড় মাথা এক করে, শরীর কোনোমতে গুঁজামুজা করে, অন্যদিনের মতোই আমি বেরিয়ে আসি, সেই গেট দিয়ে।
বেরিয়ে নিজেকে সোজা করা, শাড়ির আঁচলটা ঠিক করা-এইসব নিয়ে ব্যস্ত থাকি বলে আশপাশের কিছুর দিকেই নজর দেওয়ার সুযোগ হয় না কোনোদিনই। আজকেও সেই একই ব্যাপার।
আমি জানি, আশপাশকে নজরে আনার দরকারও নাই তেমন একটা। আশেপাশে বন্ধ গেটঅলা উঁচা উঁচা বাড়ি ছাড়া আর কী আছে!
আর আজকে তো খুবই জানি, আজিমপুরের এই চিপা গলির ভেতরে, যতোই কিনা খালি রিক্সা আসতে দেখা যাক; তাতে আমার কোনো লাভ নাই! এই বদলির টাইমে এইখানে রিক্সা পাওয়ার আশা করা গাধামি।
হাঁটতেই যখন হবে, তাইলে হাঁটি। আশেপাশে আর তাকানোর দরকার কী! ব্যাগটাকে ঠিকমতো কাঁধে সেটে নিয়ে আমি হাঁটাও শুরু করি।
শরীর পিলপিলাচ্ছে? সেটা তো এখন আর তেমন গুরুতর যন্ত্রণা দেওয়ার অবস্থায় নাই! এখন তো বিষয়টা অনেকটাই সহ্য হয়ে গেছে। তাইলে সেটার কথা মনে করার কী দরকার?
এখন তো জানি, যখন মরণ আসবে; মরে যেতে হবে! নিজের জন্য কান্দ্ন-ফান্দন আসে যদি, আসবে! সেইটা নিয়ে আজাইরা আর ভাবনা করা কেনো!
নিজেকে এই বুঝটা দিয়ে, দপদপা রোদরে মাথায় নিয়ে, আমি হাঁটা শুরু করি। লম্বা গলির শেষে বড়ো রাস্তা। আজিমপুরের বড়ো রাস্তা।
তবে দশ কদম এগিয়েও সারি না, একটা ঘটনা ঘটে। অনুমানে বুঝতে পারি, কে যেনো পেছন থেকে এসে আমার সাথে হাঁটা শুরু করেছে!
এটা আবার কী! কে হাঁটে? এমন তো হয় না কোনোদিন!
আমি তো বরাবর মাটির দিকে তাকিয়ে রাস্তা-চলা মেয়ে। রাস্তা ধরে চলতে থাকি ঠিকই আমি, কিন্তু ডাইনে-বায়ে তাকাবার হিম্মত পাই না! কোনোদিনই পাই নাই! তাকাতে শরম লাগে! কী জানি কোন লোকের সঙ্গে না আবার চোখাচোখি হয়ে যায়! কী বিশ্রী একটা ব্যাপার হবে তাইলে সেটা!
একেবারে স্কুলে পড়ার টাইম থেকেই এমন জড়োমড়ো হয়ে রাস্তায় চলার অভ্যাস আমার! এখনও এই যে এতো বয়স্ক হয়ে গেছি, সেই অভ্যাস ঘোচে নাই! রাস্তায় বের হই কতো দরকারে। কিন্তু চোখ তুলে চাইতে পারি না ডাইনে-বাঁয়ে কোনোদিকে চাইতে পারি না। চাইতে গেলে মাথা যেনো কাটা যেতে থাকে আমার! শরম!
এখনো হাঁটার সময়ে মাটির দিকে তাকায়ে, আন্দাজে অনুমানে, বুঝে বুঝে, রিক্সা বা গাড়িরে সামাল দেই আমি। নিজেরে বাঁচায়ে চলি! এবং আগাতে থাকি!
তবে রিক্সায় চড়ে বসলে কিন্তু এই কুণ্ঠাটা থাকে না! তখন দিন-দুনিয়ার সকল দিকে তাকাতে থাকি! ফুরফুরা চোখে খালি তাকাতে থাকি!
কেমন অদ্ভুত স্বভাব না আমার? একেবারে অদ্ভুত!
তো, এই তো কলেজ থেকে বের হয়েছি! এই তো ফাঁকা গলিটা ধরে হাঁটছি! এমন হেঁটে যাই তো প্রায় প্রায়ই! আমার পেছনে কেউ হাঁটা ধরেছে- এমন তো কোনোদিন হয় নাই!
এই গলির সকলেই তো জানে এইখানে এই স্কুল ও কলেজটা আছে। সেই স্কুল ও কলেজের আপাদেরও তারা না চেনে নাকি? চেনে তো! সেইসব বয়স্ক আপাদের পেছনে আবার জীবনেও গুন্ডা লেগেছে নাকি? কখনোই লাগতে শোনা যায় নাই!
তাহলে আজকে কার এমন ঠেকা পড়লো আমার পিছু নেওয়ার?
এখন, আমি আবার ঘাড় ঘুরায়ে দেখতে যাবো নাকি, কে আসছে সাথে সাথে? জীবনেও সেটা করবো না। ধুর!
চোর-ছিনতাইকারী হতে পারে! তো, সেটা সামাল দেয়ার জন্য আমি বরং জোর কদমে হেঁটে বড়ো রাস্তায় চলে যাই! সেইটাই হবে ঠিক কাজ! সেইখানে মানুষের ওপরে মানুষ! অতো লোকের চোখের সামনে কোনো গুন্ডা-বদমাশই বান্দরামি করার সাহস পাবে না!
জোর কদমে হাঁটতে হাঁটতে এই কথা মনে আসে আমার!
আবার মনে অন্য এক সংশয়ও ঝাপটা দেওয়া ধরে। চোর-ছিনতাইকারীই আমার পিছু নিয়েছে-এমন কথাই মনে আসছে কেনো আমার?
হতেও তো পারে, আমার বোঝার ভুল! যে আসছে সে হয়তো একেবারেই পথ-চলতি কোনো লোক! ঘটনাচক্রে আমার পেছনে পেছনে হাঁটতে হচ্ছে তারে! হয়তো একটু ক্ষণের মধ্যেই আমাকে পেরিয়ে যাবে সে!
হয়তো এমনটাই বিষয়! আমি বুঝ খুঁজে পাই! অস্বস্তিও যেনো একটু সরে যায় আমার মন থেকে। তাও আমি জোর কদমেই হাঁটতে থাকি।
কিন্তু ও মা! আমি যতো এগোতে থাকি, পেছনের জনও ততোই যেতে থাকে আমার পেছনে পেছনে। একদম মেপে মেপে যেনো সেইজন আমার সাথে সাথেই কদম ফেলে চলছে! যাচ্ছে আমার পিছু পিছু! কই! আমাকে পেরিয়ে তো যাচ্ছে না!
সর্বনাশ! এই ফাঁকা দুপুরে তো তাইলে গু-া বদমাশই পিছু নিয়েছে আমার! ব্যাগটা টান দিয়ে দৌড় দেওয়ার মতলব নাকি এইটার? সর্বনাশ!
তখন কী আর মাটির দিকে চেয়ে থাকার নিয়মটাকে মনে থাকে? থাকে না। ভয়ের চোটে আমি ঝটপট মুখ তুলি। ঝটাস করে ঘাড় বাঁকায়ে তাকাই সেই পিছু নেওয়া লোকটার দিকে।
তারপর আমি আপাদমস্তক কেঁপে উঠি! তখন আপনা থেকেই কেমনে জানি আমার চলা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়!
কে? কে!
“আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম! গত এক ঘণ্টা ধরে খামোখাই তো কলেজে বসেছিলেন! কোনো কাজ তো ছিলো না আপনার! চলে আসতেই পারতেন!” সেই আজগুবি লোকটার গলা শুনতে পাই আমি।
কী! কী বলে লোকটা!
সত্যিই সত্যিই কি সেই লোকটাই কথা বলছে? সে কি সত্যিই আমার পিছু পিছু আসছে? আমি তাকে সত্যিই দেখতে পাচ্ছি? সত্যি?
নাকি আমার কানে কোনো সমস্যা হচ্ছে? আমি তাই ভুল শুনছি! চোখেও সমস্যা শুরু হয়েছে নাকি আমার? সেই কারণে আবারো কী দেখতে কী দেখে ফেলছি আমি?
আহ! ক্যানসার গাঢ় হয়ে গেলে, এমন সব আজগুবী দেখা ও শোনার প্রবলেম হয়? কই! আব্বার তো এমন কিছু হতে দেখি নাই! আমার তবে কেনো হলো! কেনো হচ্ছে!
না না! ভুল-ভুল শুনছি আমি! ভুল দেখছি! আমার পাশে কেউ হাঁটছে না!
“আর কতো আমাকে আজগুবি লোকটা বলে ডাকবেন? যার কাঠামোটা ধার করেছি আমি, তার নাম ধরেই ডাকুন না? বেশীদিনের জন্য তো নয়!” আমি আবার সেই আজগুবি লোকটার কথা শুনতে পাই! সত্যিই শুনতে পাই!
‘মাহবুব শরীফ! কোথায় ছিলেন?’ কিছুর মধ্যে কিছু না, আমার মুখ ফসকে কিনা ডাকটাই বেরিয়ে আসে! আর, এমন জিজ্ঞাসাটাই কিনা বের হয়? এভাবে কথা বলে নাকি অপরিচিত কারো সঙ্গে! ছি ছি!
কী জানি কেমন করে ডেকে ফেললাম! কেমন করে বলে ফেললাম!
সেই লোক কি বিস্মিত চোখে ঘাড়-ঘোরানো আমার দিকে চেয়ে থাকলো একটুক্ষণ? হাসলো তো মনে মনে? ছিঃ! কী যে করলাম এটা! কী লজ্জার বিষয়!
“আপনার সাথে অনেকগুলা ঘণ্টা ধরে গল্প করা হয়নি! খারাপ লাগছে। বড্ড খারাপ!” মাহবুব শরীফ বলে।
‘আপনি কে?’ আমি আমাকে সামলে নিয়ে বলি।
“কারো সাথে ইচ্ছেমতো গল্প করা না গেলে, মন খারাপও যে লাগতে পারে; এমন তথ্য এই প্রথম পেলাম! আমার জীবনে-এই প্রথম! বিস্ময়কর কিন্তু বিষয়টা!” যেনো নিজেকেই জানাতে থাকে সে, এই কথাগুলা!
‘আপনি চাইবেন, আর আমি গল্প করতে বসে যাবো-এতো সোজা নাকি জগতটা?’ আমি কথা বলি, না, রাগটা ঝাড়ি-বুঝতে পারি না! কেনো রাগ?
“এমন যে লাগছে, এই যে আকুলব্যাকুল মন খারাপ লাগাটা- এটা হয়তো কেবল আপনার জন্যই নয়! আপনিই এর একমাত্র কারণ হয়তো নন। আমি দেখেছি, এই মায়া ভেসে বেড়াচ্ছে এই গ্রহেরই বাতাসে! হয়তো আমি সংক্রমিত! তাই এমন লাগছে!”
এইসব কি বলে লোকটা? আসলেই মনে হয় এটা কোনো পাগল! এর জন্যই কিনা – কালকের বিকাল ও রাত- আমি তড়পিয়ে মরেছি? কষ্ট পেয়েছি? আমি একটা কী! উজবুক ছাগল না?
মনের এই কথা মনে রেখে আমি আবার জিজ্ঞেস করি, ‘আপনি কে? আমার পিছু কেনো নিয়েছেন?’
“পিছু তো নিই নি। আমি এসেছি পাশে থাকার জন্য! আপনার পাশে। আমি এইখানে, আপনার গ্রহে – আপনার জন্য এসেছি! ঘটনাচক্রে আপনি বিপন্ন হয়ে পড়েছেন। সেটা সামাল দিতে তো আমাকেই আসতে হবে!”
‘এই কথাটা সেইদিনও শুনছি! ঘটনা কি? ভেঙে বলেন। আপনি কে?’ বুঝদার মানুষের মতো কথা বলতে পেরে আমার অনেক স্বস্তি লাগতে থাকে।
“দূর থেকে যতোরকমে চেষ্টা করা সম্ভব, করেছি! হুসনা জাহান! কিছুতেই আপনাকে সম্পূর্ণ সারিয়ে তোলা যায়নি। কেনো যে ওই রশ্মি আপনার রক্তের সাথে এমন জড়িয়ে গেছে, সেটার মীমাংসা করতে পারিনি আমি! তাহলে আপনাকে রক্ষা করার জন্য আমার না এসে আর কী কোনো পথ ছিলো! আবার, এসেও তো বিশেষ কোনো উপকার করতে পেরেছি বলে মনে হচ্ছে না আমার! আপনাকে সম্পূর্ণ বিষমুক্ত করতে পারছি কই!”
ওহ! লোকটা তবে আমার ক্যানসারের বিষয়টা জানতে পেরেছে? জেনে গেছে সেটা? কিন্তু কেমনে পারলো?
হা হা হা হা হা!
ওমা! আজকে দেখি ঠিক আমাদের মতো করেই হাসছে লোকটা! আমাদের মতো শব্দ করে! কিন্তু তারপরেও হাসিটা আমাদের হাসির মতো শোনাচ্ছে কই! শোনাচ্ছে তো ভিন্ন রকম!
আমি লোকটার হাসি- বাতাসে ছড়ায়ে পড়তে শুনতে পাই। কলেজের সেই চিপা গলিটা থেকে সেই হাসি ছড়িয়ে যেতে থাকে আকাশের দিকে। যেনো এটা হাসি না, ঝাঁক ঝাঁক পাখি! ওই কোন দূরে উড়ে যায়-উড়ে যায়!
উড়ে যেতে থাকা হাসিদের দেখতে দেখতে আমি আবার হাঁটা শুরু করি! দাঁড়িয়ে থেকে কী হবে! বাসায় তো যেতে হবে, তাই না?
আমি চলতে থাকি! চলতে চলতে খুব ইচ্ছা হতে থাকে, লোকটা এইবার এসে আমার পাশে পাশে হাঁটুক! একটু আগুপাছু করে হলেও – হাঁটুক সে আমার পাশে পাশেই!
কিন্তু আজগুবি লোকটা আমার পেছনে পেছনেই হাঁটতে থাকে। পাশে আসে না।
এখন, এমন বোবা মুখে হেঁটে যাওয়া যায় নাকি? কেমন অস্বস্তিকর লাগে কিনা বিষয়টা! আমার অস্বস্তি লাগতে থাকে। তখন না পেরে আমিই ঘাড় ঘোরায়ে ঘোরায়ে সেই লোকের সাথে কথা বলাটা চালাতে থাকি।
সুবিধা হচ্ছে, ঘাড় ঘোরায়ে আমার কথাটুকু বললেই চলে এখানে! তার জবাব শোনার জন্য আবারও ঘাড় ফেরানোর কোনো দরকার নেই! সামনে- পেছনে যেদিকেই চেয়ে থাকি না কেনো, এই লোকের কথা আমার ঠিক শোনা হয়ে যাবে!
যাবেই তো!
সেই লোকের আবার কথা বলা কী! আমার মতো তো ঠোঁট নাড়ানাড়ির ব্যাপার নেই তার! মুখ তার কিছুমাত্র নড়ে না, কিন্তু পরিষ্কার শোনা যেতে থাকে তার সব কথা!
আচ্ছা, আমার কিনা মনে মনে আমার ক্যান্সারের বিষয়টা নিয়ে এমন মন খারাপ হলো, সেইটা বুঝে উঠতে পেরে এই লোক কিনা হাসে! আজব রকমের নির্দয় তো!
‘কেনো হাসছেন আপনি?’ আমার গলা তেতো হয়ে যায়!
“হাসবো না কেনো? এতো ভুল ভয় কেনো পেতে হয় আপনাকে?”
‘আমি ভুল ভয় পাই? আপনি কিছু বোঝেন দুনিয়ার?’ আমার গলা কান্না-ধকধকা হয়ে যেতে থাকে।
“কে বললো আপনার অসুখ করেছে, হুসনা জাহান? কিচ্ছু হয়নি আপনার! যে যন্ত্রণাটা পাচ্ছেন শরীরে, সেটা আমার কারণে! আমি তার জন্য দায়ী! আগে আপনাকে মুক্ত করি, তারপর দ- নেবো! ক্ষমা তো এখন চাইবোই না!” তার গলাটা খুব লজ্জামাখা যেনো শোনায়!
‘কি? কি করেছেন আপনি? কেনো করেছেন? আমি আপনার কি করেছি? আমার শরীরের এই অসুখটার জার্ম তাইলে আপনি ঢুকায়ে দিছেন? আপনি? কেনো?’
“হ্যাঁ, আমি!” সে বলে; “সবটা যখন আপনি শুনবেন, এতোটা রাগ হবে না তখন আমার ওপর! এটা একটা দুর্ঘটনা! ইচ্ছাকৃত অপরাধ নয়! তবে অপরাধ তো বটেই। সেটার জন্য আমিই দায়ী, হুসনা জাহান!”
ও! তার মানে হচ্ছে, লোকটা কোনো রোগজীবানু নিয়ে কাজ করা সায়েন্টিস্ট! শয়তান কোথাকার! আমারে তুমি গিনিপিগ বানাতে গেছো, তাই তো?
‘আপনি আমার চক্ষের সামনে থেকে দূর হয়ে যান! অমানুষ লোক কোথাকার!’ আমি রাগ দেখাতে যাই, কিন্তু কান্নায় গলা ধরে আসে।
আমাকে না জানায়ে আমারে নিয়েই এক্সপেরিমেন্ট করেছে যেই লোক, তার সাথে কিসের কথা! আহ! কোন সর্বনাশা এক্সপেরিমেন্ট না জানি করেছে আমারে নিয়ে, এই বদমাশ লোকে! আহ!
আর কী! আমার আর বাঁচন নাই! ভালো হইছে, মরে যাবো। ঝামেলা যাবে। কিন্তু এই বদমাশটারে কোনো সাজা দিয়ে যেতে পারবো না? আর কিছু না পারি, পায়ের স্যান্ডেলটা খুলে দুইটা বাড়ি তো দিতে পারি!
এতো এতো দিন ধরে, খালি না আমি সহ্যই করে গেছি সবখানে? খালি না সহ্যই করা লাগছে? আজকে এই শয়তানের ওপর দিয়ে সমস্ত কিছুর উশুলটা নেবো আমি! মরবোই যখন, তখন মেরে- তারপর মরার কথা! চলে গেছে নাকি শয়তানটা?
পেছনে দেখি কোনো পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় না! চলে গেছে?
আমি ঘাড় ঘোরাই। দেখি, সেই লোক যেমন হাঁটছিলো; তেমনই হাঁটছে। চলে যায় নাই তো! বরং কেমন উতলা চোখে তাকায়ে আছে আমারই দিকে।
এমন কাতর এমন মায়ামাখা চোখে কোনো বদমাশ লোক তাকায় নাকি? বুঝলাম না তো বিষয়টা!
“ভেবেছিলাম আগে আপনাকে যন্ত্রণামুক্ত করবো! তারপর পুরো বিষয়টা আপনাকে খুলে জানাবো! কিন্তু যা পরিস্থিতি দেখছি-আমার জন্য আপনার ভেতরে ঘৃণা আর রাগের যে ঘূর্ণিপাক জন্ম নিচ্ছে দেখছি-সেটা থেকে তো আগে আপনাকে বাঁচাতে হবে! আগে তো বাঁচাই!” লোকটা বলে।
‘আমাকে আর বাঁচাতে হবে না! আপনি দূর হন!’ আমি কেঁদে ফেলি।
“দূর হবার কোনো উপায় নেই আমার, হুসনা জাহান! আপনার পাশেই থাকতে হবে আমাকে। সম্ভবত অযুতনিযুত বছর ধরে থাকতে হবে! আমি বুঝে উঠেছি! এইই আমার নিয়তি লিখন! যদিও আমার দেশে এই নিয়তি লিখনের বিশ্বাসটা নেই! কিন্তু এখানে এসে মনে হচ্ছে, এমন একটা বিশ্বাস থাকা খুব ভালো! খুব! সেকথা থাকুক। বরং আরো বিস্ময়কর একটা কথা আপনাকে শোনাই। শুনবেন?”
আমি তার কথা শুনতে শুনতে দেখতে পাই, সে আনমনা পায়ে পায়ে এসে দাঁড়ায়ে গেছে আমার পাশে!
ওমা! পাশে হাঁটার ইচ্ছাও তবে জাগে, এই এমন জ্বীন বা ভুল মানুষের মধ্যে! নাকি ভুল করে এসে গেছে পাশে? হবেও হয়তো!
“শুনুন তো কথাটা”, সে একটু যেনো কাতরে ওঠে; “কথাটা আপনাকে নিয়েই। আপনি চমৎকার এক মেয়ে তো! বড়ো চমৎকার এক মেয়ে আপনি! আপনার মনোবিশ্বে যে উপাদানরাশির সমাহার দেখতে পাচ্ছি, সে সবের ভিত্তিতে বলতে পারি; আপনি অবিশ্বাসের ভঙ্গী দেখাবেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে বিশ্বাস করবেন! আপনি বাইরে বিমুখ দেখাবেন, কিন্তু ভেতরে গাঢ় উন্মুখ থাকবেন! হুসনা জাহান, আমি এও জানি; আমার সাথে গত সাঁইত্রিশ ঘণ্টা দেখা হয়নি বলে-আপনি কষ্ট পেয়েছেন!”
‘একদমই ভুল কথা! চিনি না জানি না এমন একজনের জন্য-কষ্ট পায় নাকি লোকে?’
“সাঁইত্রিশ ঘণ্টা আপনার থেকে দূরে ছিলাম কিন্তু- আপনার জন্যই! চেষ্টা করছিলাম এই গ্রহের পদার্থগুলোর যে কোনো-একটাকে কোনোভাবে কাজে লাগিয়ে আপনাকে দূষণমুক্ত করা যায় কিনা-সেটা বার করতে! কতো ভাবে কতো কিছু নিয়ে কাজটা করতে গেলাম! কিছুই হলো না! পারিনি কিছুই! তবে দূরে থেকেও আমি কিন্তু নিজেকে- আপনার কাছেই রেখেছিলাম! বুঝতে পেরেছিলেন?”
‘ওই যে স্বপ্ন দেখার বিষয়টা? এইভাবে সাথে থাকা!’
আবার তার হাসিকে উড়ে যেতে দেখি আকাশের উঁচুতে। উড়ে যেতে দেখি পুবে পশ্চিমে উত্তরে দক্ষিণে! দেখে দেখে মন খুশী হয়ে যেতে থাকে আমার! মন ভালো হয়ে যেতে থাকে আমার!
মাহবুব শরীফ, আপনি কে?
“চলুন এগোই?” সে বলে।
ও! কথার ঝোঁকে তবে আমি দাঁড়িয়ে পড়ছিলাম? কিন্তু এগিয়ে গিয়ে তো শান্তি নাই। এই গলিটাই যা একটু ছায়ায় ঢাকা! তারপরেই তো বড়ো রাস্তা! খা খা রোদ। গাড়ির হর্ন আর গ্যাঞ্জাম।
কোনোমতে ফুটপাতে দাঁড়ায়ে রিক্সা মুলামুলি করবো তখন, না কথা বলবো? তারপর রিক্সা পেলে তো আমাকে চলে যেতে হবে। তখন?
এই লোক তো এইসবের কিছুই বোঝে না। এগিয়ে গেলে- রাস্তা যে ফুরায়ে যাবে, বোঝে?
“এগিয়ে গেলে রাস্তা ফুরায়, সেটা আপনার হিসেব। আমার হিসেব যে অন্য!”
সেইটা আবার কেমন!
“এগোতে থাকলে নতুন পথ আসে। ক্রমে আরো নতুন পথের খোঁজটা মেলে! আরো পথ-আরো! অফুরান!”
মা মা! কী বলে এইসব! আমার যে মাথা-চক্কর দেওয়ার অসুখ বাঁধায়ে দিতে চায় এই লোক! তবে, মনে মনে কথা বলেই বা লাভ কী আমার! আমার মনের কোন কথাটা অজানা থাকছে এই লোকের? কোনোটাই তো না!
“চলুন তো!” সে এবার আমাকে পেছনে ফেলে এগোতে থাকে। আমি চলতে থাকি পিছু পিছু। কোনো কথা নেই, একটুও পেছন ফিরে দেখা নেই; লোকটা এগোতে থাকে। আমি যেতে থাকি তার পেছনে পেছনে।
চলতে চলতে লোকটার ড্রেসের দিকে নজর যায়। ওমা! সেই যে সেদিন রাতে সাদা শার্টপরা দেখেছিলাম, আর কালচে ধূসর জিনস; সেই একই পোশাকে আজকেও! লোকটার আর কাপড়চোপড় নাই নাকি?
“আপনি তো অন্য কোনো রঙের – অন্য কোনো জামার কথা মনে আনেননি, হুসনা জাহান! আমার তবে ড্রেস বদলটা হবে কীভাবে?”
লোকটা ঘাড় ফেরায় না। যেমন আধা ধীর ভঙ্গীতে হেঁটে চলছিলো, তেমনই যেতে থাকে! আর আমি স্পষ্ট শুনতে পেতে থাকি তার কথা!
এমন কথা শুনলে হাসি সামলানো যায়? বলে কিনা, আমি অন্য ড্রেসের কথা মনে করলে, তবেই তার ড্রেস বদল হবে! পাগল!
তবে এট্টুক সময়ের মধ্যেই, লোকটার কীর্তিকা-ে, এখন আমার আর তেমন অবাক লাগছে না! বরং মনে হচ্ছে, এই লোক তো এমন উল্টা-পাল্টাই করবে! অমন করাটাই এর সঙ্গে যায়! তো করুক না! আমার প্রবলেম কি?
মনে মনে এই কথা নাড়াচাড়া শেষ করি আমি। ওইটা শেষ করে আমার মনে একটা ফাজিল কথা লাফ দিয়ে ওঠে। আচ্ছা, এই আমি বলছি ড্রেসের কথা। নতুন ড্রেসের কথা! দেখি তো এই পাগলে কী করে এখন?
‘হালকা বেগুনী আর হলুদে মেশানো টি-শার্ট পরবেন নাকি আপনি? সঙ্গে বাদামী গ্যাবার্ডিন প্যান্ট? মাহবুব শরীফ?’ মনে মনে এই কথাটা জিজ্ঞেস করি, আর মনে মনেই হেসে অস্থির হতে থাকি। পাগল রে!
তারপর মন থেকে ওই কথাগুলা মুছে যায়। কারণ তখন হঠাৎই খেয়ালে আসে, কলেজের গলিটা আজকে যেনো ফুরাচ্ছেই না! আজিমপুরের বড়ো রাস্তায় না অন্যদিন হুট করে এসে পড়ি? আজকে এতো লম্বা লাগছে কেনো গলিটারে? এই না আকাশে গপগপা আগুন আগুন সূর্য ছিলো? এখন এমন মেঘ-ঘোলাটে মেঘ-ঘোলাটে লাগছে কেনো আকাশ!
কখন মেঘ জমলো? এখন তো তাইলে রিক্সা পাওয়া আরো কঠিন হবে! কেমনে কী হবে! আচ্ছা, থাকুক চিন্তা! জোরে হেঁটে বড়ো রাস্তায় তো যাই এখন।
কিন্তু লোকটা আমার আগে আগে হাঁটছে তো হাঁটছেই। ভাব দেখে মনে হচ্ছে, কোথাও কোনো তাড়াহুড়া নাই তার। জগতের কোনোকিছুতেই যেনো তার কিছু আসে যায় না!
পেছন থেকে কঠিন রকম ঋজু দেখাচ্ছে লোকটার শরীরটাকে। আমার মতো ঝুঁকে-বেঁকে হাঁটছে তো নাইই সে! তারপরেও কেমন যেনো হু হু উদাসীন দেখাচ্ছে লোকটার চলাটা! একটু মন দিয়ে ওর দিকে তাকালে, মনের ভেতরটা ধু ধু করে উঠতে চায় যেনো! এমন লাগে কেনো!
আর দেখো সে এগোচ্ছে এমনভাবে, যেনো আমি তাকে কোনোরকমেই পাশ কাটিয়ে না যেতে পারি। যেনো আমাকে আটকে রাখারই প্ল্যান ওর। যেতে দেয়ার নয়। এমন করছে কেনো?
“আমাদের আজকে গল্প করার কথা না? তাহলে বাড়ি যাবার জন্য এমন তাড়া পেলে চলবে?” লোকটার গলায় এবার আর হাসি বাজতে শুনি না আমি। বরং কেমন বিষণ্ণ শোনায় তাকে।
এই দুপুরে কোথায় বসবো গল্প করতে? কোনো রেস্টুরেন্টে যে নিয়ে যাবো একে, আমার সঙ্গে কী অতো টাকা আছে? নাই।
কখনোই আমার সঙ্গে রিক্সাভাড়ার বেশী টাকা থাকে না! না, ভুল বললাম! আরো থাকে দশ বিশ টাকা। চায়ের দাম দিতে হয় তো ক্যান্টিনে। বা ভুল করেও যদি একটা সিংগারা খেয়ে ফেলি-তার দামটাও তো দেওয়ার থাকে! সেইটা সামাল দেওয়ার জন্যই অই বাড়তি দশ বা বিশ টাকা সাথে থাকে আমার!
এমন হিসাবের মধ্যে থাকে আমার জীবন! মাসের পর মাস-এই এমনই! সামান্য কয়টা টাকা বেতন পাওয়া! রোজ কলেজে সেই এককাপ চা খেতে খেতে এক গভীর গোপন বাসনায় পুড়ে যেতে থাকা!
একদিন-একদিন-ঠিক পারবো! একসাথে চা ও সিংগারার স্বাদ নিতে পারবো একদিন! টাকার সেই সামর্থটা একদিন ঠিক এসে যাবে!
একদিন সরকারী টাকাটাও পেতে থাকবে আমার কলেজ। তখন কলেজের আমাদের সবার বেতন এক লাফে বেড়ে যাবে অনেকখানি! এখন তো পাই আড়াই হাজার! শুধু কলেজ থেকে ওইটুকই দিতে পারে বড়ো আপা! আড়াই হাজার টাকায় কোনোরকমে এই তো আমার কাঁচুমাচু বেঁচে থাকা!
কিন্তু একদিন এমন থাকবে না! একদিন ঠিক চা ও সিংগারা একসাথে নিয়ে- সুখী চোখে- চেয়ে চেয়ে দেখা হবে দুপুরের চলে যাওয়াটা! ঠিক এসে যাবে সেই দিন একদিন!
এখন এমন আশায় এমন বাসনায় পুড়ে পুড়ে যাওয়া শুধু! রোজ রোজ! আর কিছু নেই!
আজকে মনে হতে থাকে, কেনো আমি সঙ্গে অনেক বেশী টাকা রাখিনি! কী হতো সাথে বেশী কিছু টাকা থাকলে? মাসের শেষে বেদম টান পড়তো তো?
পড়তো না হয়! না হয় আসা-যাওয়া-দু বারই হাঁটতাম! না হয় ক্যান্টিনে চা-খাওয়াও বাদ যেতো! তাতে কী ক্ষতি হতো!
আজকে আমার সাথে যদি অনেকখানি টাকা থাকতো, তাইলে এই অদ্ভুত মানুষটারে নিয়ে যাওয়া যেতো নিউমার্কেটে। ওইখানে একটা সুন্দর রেস্তোরাঁ খুলেছে না? ওই যে বিদ্যাসাগর, জিনাত-ওই বইয়ের দোকানগুলার উল্টাদিকে? সেইখানে বসা গেলে, আরামে শোনা যেতো এই লোকের কথা। চা-ও তো খাওয়া যেতোই!
“বরং আমরা এইখানে বসি! এই যে এই গাছটার কাছে। দারুণ ছায়া আছে এইখানে। আপনার কষ্ট হবে না একটুও, হুসনা জাহান!”
গাছের ছায়া? আজিমপুরের বড়ো রাস্তায় গাছের ছায়া আসবে কোনখান থেকে?
“ও! এ-জায়গাটাকেও আপনি আজিমপুর নামে ডাকতে চান? তাহলে তাই হোক!”
এ জায়গাটা মানে? আমি হতচকিত হয়ে আশপাশের দিকে তাকাই।
এটা কী হলো! হাঁটতে হাঁটতে কখন, এমন এক অচেনা জায়গায় চলে এসেছি! কেমন করে!
একটা নদীর পাড়ে-উঁচু পাড়ে- এসে দাঁড়িয়ে আছি আমরা দুইজন। কখন এসে গেলাম এমন দেশে! কোন সময়? কিচ্ছু খেয়ালে আসে নাই তো!
এই তো খাড়া পাড়! সেইখান থেকে সিঁড়ি নেমে গেছে নিচে! কোন নিচে! নেমে গেছে একদম নদীর কাছে। ভাঙা ভাঙা সব সিঁড়ি।
এই যে এমন বিজন পাড়! জনমনিষ্যি চোখে পড়ছে না এইখানে, কোনোদিকে! এই নিরালা পাড়ে খাড়া হয়ে আছে একটা শুধু গাছ। বিশাল ঝাঁকড়া এক গাছ। পাতায় পাতায় ভরা। ডালে ডালে তার বেগুনী বেগুনী ফুল।
অতো সবকিছু নিয়ে সেই গাছ- ঝুঁকে আছে নদীর দিকে। সেই কারণে ভাঙা সিঁড়িগুলাতে অনেক অনেক ছায়া।
নদীটা সরু। হাতের মুঠায় নিয়ে নেয়া যাবে-এমন সরু!
স্বপ্নে দেখা নদীটাই কি এটা? না। সে নদী মস্ত চওড়া ছিলো। জল টুপটুপা ছিলো। তাতে জোরালো স্রোত ছিলো। এটা সে নয়!
এ নদী অন্য কেউ!
এই নদীতেও স্রোত আছে। ওই দেখা যায়, স্রোত বয়ে বয়ে যায়। কিন্তু একদম হালকা পাতলা, ধীর স্রোত।
‘বসি যদি, তাহলে এই গাছের কাছে কেনো বসবো? ওই নিচে, ওই যে ছায়াঢাকা বাঁকাচোরা সিঁড়িরা, ওদের ওখানে বসি না? ওইখানে?’ নিজেকেই এই কথা শুনিয়ে দিয়ে আমি সিঁড়ি ভাঙা শুরু করি।
ধুড়ধাড় নেমে যেতে থাকি আমি। নদীর একেবারে কাছে নেমে যেতে চাই। ওইখানে বসাটাই আজ আমার খুব দরকার।
কিন্তু অর্ধেকটা নেমে দেখি, একদম নদীর কাছটাতে যাবার কোনো উপায় নাই।
নিচের দিকের সিঁড়িরা কবে যেনো ভেঙেচুরে খ- বিখ- হয়ে গেছে। এখন ভাঙা টুকরাগুলো অই তো- দূরে দূরে পড়ে আছে। সিঁড়ির জায়গায় সেখানে এখন, মাথা তুলে আছে স্যাঁতস্যাতে মাটি। পিচ্ছিল খাড়াই। নদীরই কাছের নিচু পাড়ের অংশটা সেটা। তাকে পেরুনো বড়ো সহজ নয়!
খুব আশ্চর্য রকমের সিঁড়ি তো! এমন ঘাট, এমন ঝুঁকে থাকা বেগুনী ফুলভরা গাছ, এমন নির্জন একা একটা নদী! আমি আমার এই বত্রিশ বছরের জীবনে কখনো দেখি নাই তো!
কোনোদিন যে কিনা- নিজের দাদার দেশটাতেই যাওয়ার কপাল পায় নাই; তার কিনা ভাগ্য হবে এমন অচেনা কোনো জায়গায় যাওয়ার! ঘুমের মধ্যেকার স্বপনেও তো- এমন জায়গাকে দেখার সাহস তার নাই!
এদিকে দেখো, আমি তো নেমে এলাম ফড়ফড়িয়ে; ওই লোক সেই যে উঁচুতে দাঁড়ায়ে আছে; আছেই।
‘নামুন!’ আমি ডাকি।
“একটা পাখিকে আসতে বলেছিলাম। ওর দেরি কেনো হচ্ছে, সেটা দেখছি! আপনি বসুন! আমি আসছি!”
আল্লা তুমি জানো! এই লোক কে! কেমন পাগল কেমন কী-তুমিই ভালো জানো! এ না আবার হেমায়েতপুর থেকেই পালান্তি দিয়ে ঢাকা শহরে চলে আসছে! সেইটা একমাত্র তুমিই ভালো জানো আল্লা গাফুরুর রহিম!
কী সব অদ্ভুত কথা বলে রে এই লোক! বলে তো বলে-সেটা আবার এমন ভঙ্গীতে বলে, যেনো এর চেয়ে স্বাভাবিক বিষয় আর নাই!
সেইসব কথা যখন শুনছি, তখন এমন সহজ এমন নরমাল লাগছে! কানে কোনো খটকা লাগছে না! কিন্তু তারপরে তো প্রাণটা ছাঁৎ করে উঠছে! ভয় ধরে যাচ্ছে একেবারে অন্তরে!
কে কবে শুনেছে, কোনো মানুষ কোনো পাখিকে আসতে বলতে পারে? বললে আবার পাখি চলেও আসে? কোনো গল্পের বইয়েও এমন পড়ি নাই। কোনো সিনেমায়ও তো এমন বিষয় দেখি নাই। এইটা তবে লোকটা কি বললো এখন?
নিজেকে এই কথার কী উত্তর দেবো আমি! কার পাল্লায় পড়ে কই চলে এসেছি-আল্লায়ই জানে। আমারে না খুন করে ফেলে এই লোক! আমার কী চলে যাওয়া উচিত?
এইসব নিয়ে খুব থতমত খেতে খেতে আমার মন আচমকাই শোনে; বেগুনীফুল নিয়ে ঝুঁকে পড়া সেই গাছটা থেকে একটা পাখি ডেকে উঠছে! কুহু কুহু কুহু কুউ কুউ-
কোকিল ডাকছে! কোকিল!
মনে পড়ছে তোমাকে, বেগুনী ফুলেভরা গাছ! তোমাকে তো আমি চিনি!
বাইরে বাইরে ভুলে গিয়েছিলাম তোমার কথা! কিন্তু তোমাকে আমি মনের খুব নিরালায় লুকিয়ে রেখেছিলাম! তাইলে, তুমি তো আমার সঙ্গেই ছিলে! সব সময় আমার সঙ্গেই তো আছো! আজকে কতোকাল হয়Ñ আছো!
জারুল গাছ-জারুল গাছ! সেই যে সেই দিনটার পর থেকে এখন পর্যন্ত-তোমাকে আমার সঙ্গেই রেখেছি গো গাছ!
সেইদিনও তো এমনই আচমকা কোকিলটা ডেকে উঠেছিলো! তাই না? সেই দুপুরে! রোকেয়া হলের সামনের ফুটপাতে জারুল ফুলের ছায়া বিছানো ছিলো। এমনই গভীর ছায়া।
আমি জানতাম না, তার সাথে দেখা হবে কিনা! আমি তো তার রুটিন জানতাম না। জানতাম না তো কখন, কোন জায়গায় গেলে, শুধু এক ঝলক দেখা পাওয়া যাবে তার! কিছুই তো জানতাম না!
তাও আমি ইডেন কলেজে আমার ক্লাশ শেষ করে, সেই দিন বাসায় যাওয়ার জন্য রিক্সা নেইনি। একা একা হেঁটে হেঁটে ইউনিভার্সিটির দিকে চলে গিয়েছিলাম! যদি একটু দেখতে পাই তাকে! এক ঝলকের জন্যও শুধু যদি দেখতে পাই?
ফুলার রোডকে ডানে রেখে কলাভবন আর রেজিস্ট্রার্স অফিসের সামনের মাঠটাতেও একটু ঘুরান দিতে ছাড়ি নাই। কতো জনই তো বসে আছে ওইখানে! সে যদি থাকে!
নাই সে।
তারপর অপরাজেয় বাংলার আশপাশটা। নাই সে ওইখানেও।
আবার বাইরের ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকি আমি। এইপাশে শিখদের মন্দির। তারপর লাইব্রেরির গেট। ওইপাশে রোকেয়া হল।
রাস্তা তো শেষ হয়ে যাচ্ছে! সে কী এই সময় ক্যাম্পাসের কোথাও থাকে না? নাকি টিএসসির ভেতরে কোনোখানে আছে? কিন্তু সেই ভিতরে যেতে আমার কুণ্ঠা লাগে। একা একা এতোসব পোলাপানের ভিড়ে! কেমন করে যাবো আমি?
থাক তবে। দেখা হলো না!
এমন করে কী কাউকে দেখতে পাওয়া যায়?
আহা! পাওয়া যেতো যদি!
এতোসব কথা, নাকি কান্না নিয়ে একটু একটু করে এগোতে এগোতে হঠাৎ চোখ যায় রোকেয়া হলের ফুটপাতের দিকে। কী ভীষণ ফুল ফুটে আছে জারুল গাছে!
ওরে ব্বাস! ফুলের আড়ালে সবপাতা একদম ঢাকা পড়ে গেছে মনে হচ্ছে! সেই গাছে বসেই তবে কোকিলটা ডাকছে এখন? কুহু কুউ কুউ কুহু কুহু!
ওই ছায়াভরা ফুটপাতে কারা দুজন বসা? কে? দেখে, প্রাণ আমার ধ্বক করে ওঠে!
ওই যে মাহবুব শরীফ! তার পাশে এক মেয়ে। লাল পাড় শাদা শাড়ি পরা। দূর থেকেই সেই মেয়েকে দেখতে এমন মিষ্টি লাগছে; এমন মিষ্টি! তাকে কাছে থেকে না দেখেই চলে যাবো?
আমি লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে ঠিকই রাস্তা পার হয়ে যাই।
রাস্তা পার হয়ে গিয়ে, হাঁটা শুরু করি রোকেয়া হলের দিকের ফুটপাত ধরে। একটুখানি কেবল দেখবো দুইজনকে। চুপ করে দেখবো, চুপ করে হেঁটে চলে যাবো।
মাহবুব শরীফ জানতেও পারবে না-কে তাকে দেখার জন্য- এই রোদ মাথায় করে- হেঁটে হেঁটে পেরিয়ে গেছে পুরাটা কলাভবন চত্বর।
না জানুক। না জানুক! আমি তো জানি। আমি জানলেই হবে!
আমার না নীরবে মাহবুব শরীফদের পেরিয়ে টিএসসির দিকে চলে যাবার কথা? একদম নীরবে না ওই রাস্তাটুকু পার হয়ে যাবার কথা?
তার বদলে কি হলো? কেমন একটা যাচ্ছেতাই ঘটনা ঘটলো!
আমি নীরবেই তখন এগোচ্ছি এগোচ্ছি, আর লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে নিচ্ছি এলোমেলো ভঙ্গীতে বসে থাকা মাহবুব শরীফকে। ফিকে বেগুনী হলুদে মেশানো টি-শার্ট আজকে তার পরনে। বাদামী গ্যাবার্ডিনের প্যান্ট। ওই তো কেমন ঢিলেঢালা স্যান্ডেল শু-পরা দুই পা রাস্তার দিকে একটু উঁচানো!
এতো ভালো লাগছে দেখতে! এতো ভালো!
আর সঙ্গের মেয়েটা! এতো মিষ্টি দেখতে কেনো সে! লাল সিঁদুরের টিপ পরতে জানে এই মেয়ে! পাড়ের সঙ্গে একদম মেলানো লাল। কতো যে সুন্দর! আর, তার খোলা চুল!
এ মেয়ের সঙ্গে আমার তুলনা হয়? এর কাছে আমি দাঁড়াতে পারি? কোনোদিন পারি না! কোনোদিন পারি না। একে রেখে আমার দিকে তাকাবে মাহবুব শরীফ? জীবনেও না!
চোখে কেনো পানি জমে উঠতে থাকে? পানি আসে কেনো?
আমি তো শুধু একটুখানি দেখতে এসেছিলাম তাকে! একনজর দেখতে চেয়েছিলাম। ভাগ্য ভালো। দেখতেও তো পেলাম! আর কী!
চোখভরা পানি নিয়ে ধীর পায়ে যেতে থাকি আমি। ভেবেছিলাম ঠিকঠাক মতোই ওদের পেছন দিয়ে অন্যসব মানুষের মতোই চলে যাওয়া হবে আমার।
মাহবুব শরীফের আমাকে খেয়াল করার কোনো কারণ নাই। ওরা দুইজন এমনই কথায় ডুবে আছে, আশেপাশের কিচ্ছু ওদের নজরে আসছে না। কিচ্ছু খেয়াল করছে না কোনোজন। আমাকেও খেয়াল করার প্রশ্নই ওঠে না!
তার মধ্যে কিসের থেকে কী হয়ে যায়! খুব সাবধানেই না যাচ্ছিলাম আমি! তাও কেমন করে জানি হাত থেকে কলমপেন্সিল রাখার বক্সটা পড়ে যায়!
ওটা ফুটপাতে পড়ে গিয়ে খালি ভম্ করে একটা বিশ্রী আওয়াজই তোলে না, খুলে ছত্রখানও হয়ে যায়। ভেতরে রাখা পেন্সিল কলম কয়টা ছিটকে যায় এদিক ওদিক। ভাংতি পয়সাগুলা ঝনঝন্নাত করে ছিটকে পড়ে চারপাশে।
উফ! কী যে বাজে একটা ব্যাপার ঘটায়ে ফেললাম! কী যে বাজে! জিনিসপাতি সামলাবো কী, লজ্জায়ই মাথা কাটা যেতে থাকে আমার! ওদের সামনে এমন আনস্মার্ট একটা কাজ কেমনে করলাম আমি!
মাহবুব শরীফ কী মনে করবে! মনে করবে না, ইডেন কলেজে পড়া মেয়ে তো এমন খ্যাতের মতোই কাজ করবে? ইস!
পয়সাপাতি খুঁজে পাওয়া দূরে থাক, এখন আমি যদি কোনোরকমে কলম-পেন্সিল কয়টা তুলে নিতে পারি; তাইলেই বাঁচি।
উপুড় হয়ে আগে পেন্সিল বক্সটা হাতে নেই।
টের পাই যে, আরেকজন কে জানি আমার সাথে সাথে কলম পেন্সিলগুলা কুড়ানো শুরু করেছে! কুড়িয়ে কুড়িয়ে আমার হাতে দিয়ে দিচ্ছে।
আমি ভাবি, পথ চলতে থাকা কোনো দরদঅলা মানুষ বুঝি আমাকে হেল্প করছে!
কোনো কোনো মানুষ তো থাকে, এমন দরদবান! আহা! কেমন দুড়দাড় আমাকে সবকিছু গুছায়ে দিলো! আমার মনটা কৃতজ্ঞতায় খুব নড়ে ওঠে। সোজা হয়ে দাঁড়ায়ে তাকে ধন্যবাদ বলতে যাই!
আহ! কে এটা এইভাবে, আমার পাশে?
মাহবুব শরীফ!
কখন উঠে এসেছে ও? এটা কীভাবে সম্ভব!
‘কেমন আছেন হেনা?’ আমি ধন্যবাদ দেবার আগেই সে কথা বলে ওঠে! ‘আর যে এদিকে আসা হয় না আপনার? চা খাবেন?’
আমি তার কথার কী উত্তর দেই, কোন কথার জবাবে কী বলি-কিচ্ছু খেয়াল করতে পারি না! আমার কান ঝাঁ ঝাঁ করতে থাকে। মুখে হঠাৎ খুব গরম একটা ঝাপটা এসে লাগে। গলা শুকিয়ে যায়। হাতের আঙুলগুলা কাঁপতে থাকে।
শুধু শুনতে পেতে থাকি-কোকিলটা ডাকছে। এই তো আমার মাথার উপরের জারুল গাছটার উঁচু কোনো ডালে বসে, ডেকে যাচ্ছেÑকুউ কুউ কুহু কুহু কুহু!
ওর কাছ থেকে আমি কীভাবে বিদায় নেই, মনে করতে পারি না। শুধু শুনতে পাই ও বলছে, ‘আপনাকে রিক্সা করে দেই?’
না না না! এতো বেশী মায়া আমি নিতে পারবো না! আবার, অন্য আরেকজনের সাথে বসা আপনার সুখী মুখের হাসিটাকেও আমার নেওয়ার উপায় নাই! আমার সহ্য হবে না। সহ্য করার কোনো উপায় নাই আমার মাহবুব শরীফ, আপনার প্রেম! অন্য কারো সাথে এই যে এমন সুখী হয়ে আছেন আপনি, আমার সহ্য হচ্ছে না! আমার কষ্ট হচ্ছে! মাহবুব শরীফ! আমার সইছে না!
রিক্সায় উঠে ঠিকমতো বসবো কী, হাউমাউ কান্দন বেরিয়ে আসে মুখ দিয়ে!
না না! আমি আর আসবো না। আমি আর আসবো না এইদিকে। আমার আসার কোনো উপায় নাই! এমন সুন্দর একজনের পাশে বসে আছেন আপনি, মাহবুব শরীফ!
কিন্তু এই বসে থাকাটাই আমি আর দেখতে পারবো না! আমার সহ্য হবে না! সহ্য হচ্ছে না আমার! আর, আমি কী আমি আছি নাকি! আমার বিবাহ হয়ে গেছে মাহবুব শরীফ। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়ার পরে পরেই আমার বিবাহ হয়ে গেছে!
তারপর আমি তো আর কখনো যাই নি কলাভবন চত্বরে। ওই সব পথ ধরে ধরে, ওকে একনজর দেখার আশা করে করে, আর তো হাঁটিনি কোনোদিন!
শেষে একদিন ভুলে গেছি সব। আমি জানি তো- আমাকেও ভুলে গেছে সে। কে আর আমি? না রূপে না বিদ্যায় না ধনেগৌরবে! সেই মেয়েটার সাথে কিছুমাত্র তুলনা করা যায় আমাকে? যায় না।
আমি না ভুলে গেছি তাকে? এখন তবে, তার জন্য মনের ভেতরে, আর দুই চোখে এতো কান্না আসে কোত্থেকে? কেমন করে আসে?
“কে বলেছে সেও আপনাকে ভুলে গেছে? ভুল জানেন, হুসনা জাহান! একদম ভুল!” মাহবুব শরীফের রূপ ধরা মানুষটা আমাকে বলে।
দেখো কী কা-! এই এতোক্ষণ ধরে আমি যে হাঁটুতে মুখ গুঁজে গুঁজে কাঁদছি; এই মানুষটা একটা শব্দ পর্যন্ত করে নাই।
সে আমার থেকে একটু নিচের সিঁড়িতে বসে আছে তো আছেই। আমাকে কোনো সান্ত¡নার কথা বলে নাই ঠিক; ওদিকে নিজে এমনকী বিরক্তও হয় নাই!
যে কিনা আমাকে এমন দূর সুন্দর একটা জায়গায় নিয়ে এলো, তার সাথে দুচারটা কথা বলার ভদ্রতাসুদ্ধ করার হুঁশ থাকলো না আমার! এতোক্ষণ পড়ে থাকলাম নিজের দুঃখ নিয়ে! এটা কেমন বাজে কাজ করলাম আমি!
“বাজে কাজ মনে হচ্ছে নাকি? এটাও আপনার একটা ভুল অনুমান! আপনি আমাকে অযুত নিযুত দুর্লভ রশ্মি ও অপরিমেয় শক্তিতে ভরিয়ে দিচ্ছেন হুসনা জাহান! বেঁচে থাকাকে এমন সার্থক-কখনো তো মনে হয়নি আমার! আগে কোনোদিন মনে হয়নি! কোনোদিনই তো নয়!”
বলতে বলতে এই নতুন মাহবুব শরীফ ভাঙা সিঁড়িগুলার ওপরেই সটান শুয়ে পড়ে।
‘আরে! এটা কী হচ্ছে! জায়গাটা তো নোংরা!’ তাকে জানাতে গিয়ে তার দিকে চোখ ফেরাই আমি।
ও মা! কী পরে আছে এই লোক!
পরে আছে নতুন পোশাক! সেই ফিকে বেগুনী আর হলুদে মেশানো টি-শার্ট! বাদামী গ্যাবার্ডিন প্যান্ট। পায়ে সেই ঢিলেঢালা স্যান্ডেল শু!
এই না তার পরনে ছিলো সাদা শার্টটা? এই না একটু আগেও? তাহলে এক্ষণই কেমনে বদলে ফেললো সব? কেমন করে? কে? কে এইজন?
‘মাহবুব শরীফ! কে আপনি?’
“এই নদীটার একটা নতুন নাম দিলে কেমন হয়, হুসনা জাহান?”
‘এর এখনকার নামটাই তো জানি না আমি! নতুন নামের কথা তো পরে!’
“এই নদী ইছামতী।”
‘ওহ! এমন দারুণ নাম কেনো বদলাতে হবে? এ নামই থাকবে ওর!’
“তাহলে আমার নামটা বদলে দিন!”
‘বাহ! আপনার নিজের নামটা বলুন না! সেই নামে ডাকলেই তো আর মাহবুব শরীফ বলা লাগে না আপনাকে!’
“আমার কোনো নাম নেই তো! আমাদের ওইখানে নাম ধরে ডেকে ওঠা নেই। সেখানে সবার জন্য বরাদ্দ আছে নানা সংখ্যা! আমরা তাতেই সুখী ছিলাম। কিন্তু এখন কেনো যেনো আমার ভেতরে একটা কম্পন জাগছে! নীল আর সাদায় মেশানো কম্পন! একটা লাগাতার কম্পন! এমন কম্পন- আমি আগে কোনোদিন পাইনি! আমার ওই কম্পনটাকে আপনাদের আবেগের বিষয়গুলোর সাথে মিলিয়ে দেখলাম। দেখা গেলো, এমন কিছুকে আপনারা ব্যাকুলতা নামে ডাকেন! তার মানে আমার ভেতরে নিজের একটা নাম পাবার ব্যাকুলতা-কম্পন জেগেছে!”
‘আমার আপনাকে মাহবুব শরীফ বলেই ডাকতে সাধ হচ্ছে, মাহবুব শরীফ।’
“তবে তাই হোক!”
‘আপনি কে?’
“ধরে নিন না আমি আপনার অতিথি?”
‘অতিথি হলে বাসায় নিতে হবে তো? আর কিছু না হোক, চা তো খেতে বলতে হবে! আমি তো কিছুই করছি না! কোনো সমাদর করতে পারছি না! এটা লজ্জার!’
“ঢের বেশী আতিথ্য করার আরো কিন্তু পথ আছে, হুসনা জাহান!”
‘সেটা কেমন?’
“আপনি যদি আমাকে একটু বিশ্বাস করতেন! মনে মনে এতোটা তাচ্ছিল্য – পরিহাস না করতেন যদি! কৃতার্থ হতাম! অথচ আমি দেখতে পেয়েছি, আমার জন্য ভালোলাগা জন্ম নিচ্ছে আপনার ভেতরে। আমাকে দেখতে না পেয়ে সেদিন সন্ধ্যায় ছাদে, আপনার মন দুঃখী হয়ে উঠেছিলো! অথচ দেখা হলে মনে মনে আমাকে নিয়ে আপনার অবিশ্বাস আর উপহাসের শেষ থাকে না! কেনো?”
‘এতোই যদি বুঝে উঠতে পারেন, তবে এটাও তো ধরতে পারার কথা! পারছেন না কেনো?’
“পারছি না, কারণ পারছি না!”
‘আপনি কে? বলেছেন সেটা? কোথায় থাকেন, হঠাৎ করে কোথায় চলে যান, আবার কোত্থেকে হঠাৎই এসে হাজির হন? আমার কাছেই বা কেনো আসেন?
আমি তো সাধারণের চেয়েও সাধারণ একজন।’ আমি এক নিঃশ্বাসে কথাগুলা বলি। তারপর তার উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। কিন্তু সে কিছুই বলে না!
তখন কেনো জানি আমার অনেক রাগ হতে থাকে। সেই ঝিলিক দিতে থাকা রাগ নিয়ে আমি ঝাঁজিয়ে উঠি; ‘আমার কাছে আপনার দরকারই বা কি? আমি তো সেসবের কিছুই জানি না! তাহলে আমার ভেতরে ভয় আর অবিশ্বাস না এসে আর কী আসবে? তারপরেও আমি কিনা একটা মাথাখারাপ হয়ে যাওয়া মেয়ে! আপনাকে আমার ভালো লাগছে! ভালো লাগছে আপনার এইসব যাদু! হয়তো এসবের কিছুই সত্য না! হয়তো আপনিও সত্য না! একদিন হয়তো জানা যাবে, আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো বলেই আমি এমন আবোল-তাবোল সব কিছু দেখেছিলাম! আপনাকেও দেখতে পেয়েছিলাম!’
আমি আমার কথার উত্তর আশা করতে থাকি খুব, কিন্তু নতুন মাহবুব শরীফের দিক থেকে কোনো উত্তর আসে না। বরং দেখা যায়, সে তার হাতের ঘড়িটা নাড়াচাড়া করা নিয়ে মেতে উঠেছে! অদ্ভুত লোক তো! একে নাকি পাগল মনে করা যাবে না!
“ব্যস! আজকের মতো কাজ শেষ! চলুন ফিরি আমরা!” সে ওঠার তাগাদা দেয়।
কাজ? কি কাজ করা হলো এইখানে? আমি কিনা সিঁড়িতে বসে আছি। সে কিনা সিঁড়িগুলাতে লম্বালম্বি পড়ে আছে। কিছু কথা হচ্ছে, কিছু ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। এইখানে কাজটাজ কী করা হলো কখন!
আবার দেখো ওঠার তাগাদা দিচ্ছে ঠিক, কিন্তু নিজে যেমন পড়ে ছিলো, তেমনই পড়ে আছে। ওঠার তো গরজ দেখা যায় না। কি ব্যাপার?
“কালকে কলেজ যাওয়া বাদ। আপনাকে বিস্তর কথা বলা বাকি। আপনার কাছ থেকে বিস্তর গালমন্দ শোনার বাকি। কলেজ ফেরতা সময়টুকুতে কুলাবে না! কাজেই কলেজ বাদ!” মাহবুব শরীফ সিদ্ধান্ত দেয়।
‘এমন খেয়ালখুশী মতো চললে চাকরিটা থাকবে? এই বুদ্ধি নিয়ে চলেন?’
“আচ্ছা হুসনা জাহান! চা তো খাওয়াতে পারছেন না, সেটা মানলাম! কিন্তু অতিথিকে কিছু একটা উপহারও কি দেবার নেই?”
‘উপহার?’ জিজ্ঞেস করতে গিয়ে মন কেঁপে ওঠে। দামী কিছু হলে, কেমনে দেবো? কয় টাকা হাতে থাকে আমার? থাকে কিছু? থাকে না তো!
“সেই রাতে আপনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকতে হয়েছে।
এমন ভেতরে বসে, এমন বিশদ রকমে, এমন দূরের কোনো গ্রহকে পাঠ করে নেয়ার এমন সুযোগ – আগে কখনো আসেনি আমাদের কারো! আমাদের দেশের কারো জীবনে আসেনি কোনোদিন! আমি সেই ভাগ্য পেয়েছি! কী বিস্ময়! ভাগ্যিস! আপনাদের মতো আমাদের ঘুমাতে হয় না! ঘুমাতে হলে, এতো অল্প সময়ে এতোটা দেখে নেয়া সম্ভব হতোই না।”
ঠিক আছে, এইবার আমি এই কথার উত্তরে কিচ্ছু বলবো না। ওর ধরণটা তো বোঝা গেছে। প্রশ্ন করবা, কোনো উত্তর পাবা না। আবার যখন ইচ্ছা হচ্ছে, নিজ থেকেই হড়বড় করে কতো কী বলে চলছে! তো বলুক, বরং আমি চুপ থাকি।
“সব দেখে নিতে নিতে, কাজগুলো সেরে উঠতে উঠতে বারবার কি হচ্ছে জানেন? বারবার আপনার জন্য একটা সবুজ-সোনালী কম্পন বোধ করতে থাকছি আমার ভেতরে। আপনাদের হিসাবে ওটাকে কৃতজ্ঞতা বলে। বারবার মনে হয়েছে- খুব ভালো হয়েছে! এই যে আপনার আক্রান্ত হওয়াটা- এটা খুব এক স্বাস্থ্যকর ঘটনা হয়েছে আসলে!”
‘রাতে কোথায় থাকেন আপনি? বললেন তো আপনাকে খেতে হয় না, কিন্তু কিছু না খেয়ে মানুষ কি বাঁচে?’
“রাতে হয়তো আজকে এখানেই, এমন করেই, নিজেকে এলিয়ে রাখবো। যদি ফুরসত পাই তবেই। চেয়ে চেয়ে তারাদের দেখবো। বিস্ময়ের কথা হচ্ছে- এইখানে, এমন যে একা আমি; তাও কিন্তু বাড়ির জন্য মনখারাপের কোনো কালো কম্পন আসছে না আমার।”
“বরং মন খারাপের কম্পনটা আসছে-থেকে থেকে কেবল আসছে- আপনার জন্য! কাল রাতে ফাঁকা মাঠের কিনারের তালগাছের গুঁড়িতে ভর দিয়ে দিয়ে-এই কথাটা মনে আসছিলো বারবার। অবাক হচ্ছিলাম! আপনার জন্য মনখারাপ লাগে আমার, হুসনা জাহান! সেটা আপনার কাছেই থাকি বা দূরেই যাই-একই রকম কালো কম্পন! পেতেই থাকি!”
‘কতো তো হোটেল আছে থাকার জন্য! আপনার কাছে কি একেবারেই টাকাকড়ি নাই? মাঠে ধূলায় কতো সাপখোপ! কোনখান থেকে কী বিপদ এসে যাবে শেষে!’
“ওহ, শুনুন! আমার জন্য আপনার পৃথিবীতে সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা হচ্ছে এটা! এই ধুলো-নদী-গাছভরা মাঠপ্রান্তর, বা নিদেন শহরের রাস্তা-ফুটপাত! এইসবের মধ্যে যতো থাকতে পারছি আমি, ততো বেশী করে গবেষণাটা করে উঠতে পারছি। তার মধ্যে আবার আপনাকে সময় দেয়া আছে! এটাই বড়ো একটা ঝামেলা!”
‘এটা আবার কেমন কথা হলো? আমি তো বলিনি আমাকে সময় দিতে? আপনি নিজেই না গায়ে পড়ে পড়ে মিশছেন আমার সাথে?’ ঠা-া গলায় কথা কয়টা বলি ঠিক, কিন্তু ভেতরে আমার আগুন-রাগ জ্বলে ওঠে।
এই লোক তো মস্ত উল্টাপাল্টা ধরণের একজন! এই না বললো, আমার কাছে কৃতজ্ঞ বোধ করে? এই না বললো আমার জন্য মন-খারাপ লাগে তার? এখনই আবার কথা কেমন পালটে নিচ্ছে দেখো! বলছে কিনা- ঝামেলা!
এটা কেমন লোক?
“খেপার তো কিছু নেই!” বলতে বলতে লোকটা হেসে ওঠে। এবার তার হাসিকে আর আকাশে উড়ে যেত দেখি না আমি। তার হাসিটাকে নিচের নদীটার ধীর পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখি। যেনো নতুন এক জলধারা আছড়ে আছড়ে পড়ছে নিচের নদীস্রোতে। অদ্ভুত সুন্দর তো!
“খেপছেন কেনো?” সে বলে; “এমন করে বাঁকা কথা বলার শক্তিটাকে শনাক্ত করা গেলো একটু আগে। এই যে আপনার ভেতরেই পাওয়া গেছে তাকে। সেটা যদি আমি একটু মকসোই করি, আপনার রাগ হবে কেনো? এটা তো আপনার কাছ থেকে পাওয়া জিনিসই -আপনাকে দেখানো!”
আমি এই কথার আর কী উত্তর দেবো! হায় রে! এই লোক জানে না, বাঁকা কথা বলা তো অনেক পরের ব্যাপার; আমি সোজা সহজ কথাও বলার অবস্থায় নাই! সব কথা জমা করে রাখি এই মনের ভেতরে।
যেটুক কথা বললে ছাত্রীদের পড়ানোর কাজটা চালানো যায়, কলিগদের সঙ্গে দরকারটা মেটানো যায়; সেইটুকু কথা বলি কলেজে।
যেইটুক কথা বললে দাদাভাইয়ের মন শান্ত থাকতে পারে, সেইটুক বলি দাদাভাইয়ের সাথে। আর যা আছে, সব মনের ভেতরে। শক্ত করে দরোজা আটকে রেখেছি। মনের দরোজা।
এই লোক বাঁকা কথাকে দেখতে পেলো, আর সেইসব দুঃখ-পোড়া কথাগুলাকে দেখতে পেলো না? তাইলে অর্ধেকটা দেখতে পায় সে? দেখুক, অর্ধেকটাই দেখুক।
এই যে মনে মনে এতো কিছু বলছি, লোকটা কি আমার মনের কথা পড়ে ফেলছে নাকি? নাহ! ভঙ্গী দেখে তো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না!
“কাজ সেরে যতো দ্রুত সম্ভব আমাকে ফিরে যেতে হবে, হুসনা জাহান!
সবকিছু নেড়েচেড়ে দেখলাম, এইখান থেকে এককণা ধুলোও যদি আমি নিয়ে যেতে চাই, নেবার কোনো উপায় নেই। একবিন্দু ধূলিকণাও যদি নিই, তাতেও এই গ্রহে, বস্তুর যে সুষম বিন্যাসটা আছে; সেটাকেই ধ্বংস করা হবে! যদি নিতে চাই একটি কচুরিপানার ফুল, পদার্থের ভারসাম্যে এমন ধস আসবে, যার পরিণাম হবে ভয়াবহ। বস্তুকে কোনোভাবেই স্পর্শ করা যাবে না! কিন্তু জানেন, মজাটা কোথায়?”
‘কি?’ আমি জিজ্ঞেস করি।
“মজা হচ্ছে, নিয়ে যাওয়া যাবে শক্তি। কোথাও যদি কিছু বাড়তি শক্তি অকাজে পড়ে থেকে থাকে; সেটাকে আমার সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া যাবে! আমি সেটা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাই!”
‘এইসব অদ্ভুত কথা আমাকে বলে কি হবে, বলুন তো? আমি সাইন্সÑএর কিচ্ছু বুঝি না। আর, পৃথিবীর কোনখানে কেমনে বাড়তি এনার্জি অকাজে পড়ে আছে; আমি তার খোঁজ কীভাবে পাবো? আমি সেই কথা জানার কে? আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি না, মাহবুব শরীফ!’
“সেই শক্তি আপনার কাছে আছে! আপনার মনের ভেতরে! হুসনা জাহান, আপনি জানেন সেটা! আপনার লুকানো কথারা- সেই শক্তি! যাদের আপনি মনের ভেতরে আটকে রেখেছেন। ওদের আমাকে দিন। কথা যে শক্তিরই একটা ধরণ! অকাজে ফেলে রেখেছেন যে শক্তিকে, সেটা আমাকে দিন! অতিথিকে এই উপহারটা তো দেয়া যায়, তাই না? দেবেন?”
কথা আবার কেমন করে আরেকজনকে দিয়ে দেয়া যায়? কেমন করে দেবো? এটা কি হয়? কিভাবে হতে পারে? আমি তো বুঝতে পারছি না।
“দেবেন?”
‘কথা আবার কেমন করে দেয়া যায়? আমি যে জানি না!’
“আপনি আমাকে শোনাবেন। আপনি বলবেন, আর আমি আওয়াজ থেকে শক্তিকে আত্মস্থ করে নিতে থাকবো। এইভাবে ওরা আমার অংশ হয়ে যাবে। আমার সাথে থাকবে। থাকবে আমার অস্তিত্বের অংশ হয়ে। আপনারা তো তাকেই স্মৃতি বলে ডাকেন?”
কালকে সেই কথা শোনাবার দিন। অথচ মনটা কেমন খচমচ খচমচ করছে। কেনো করছে ধরতে পারছি না!
১৭ এপ্রিল ১৯৯৫
তার কথা আর আমার কথা
“মাহবুব শরীফের সাথে প্রথম দেখা হলো কবে? সেই কথাটা শোনা যাবে না?” ক্ষেতের আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে নতুন মাহবুব শরীফ আমাকে জিজ্ঞেস করে।
তার কথার কী উত্তর দেবো! চোখ এদিকে চমকে চমকে উঠছে একটু পর পর, পুরাটা শরীর ধাক্কা খাচ্ছে থেকে থেকে! বিস্ময়ে!
এসবের মধ্যে কথা কীভাবে বলি! কথা আসছে না তো মুখে! যা দেখছি, তাকে কি বিশ্বাস করবো? নাকি বিশ্বাস করবো না? এসব কি সত্য? নাকি চোখের ভুল?
এইসব ভেবে ভেবে তখন আমি কাঁপছি। আবার কেমন একরকম আনন্দও হচ্ছে! আমার সমস্তটা জীবনে এমন কিছু তো ঘটে নাই কোনোদিন!
আজকেও কলেজের জন্য বের হয়েছি প্রতিদিনের মতোই, সকাল সাড়ে ছয়টায়।
আমি জানি, কলেজে অফিস সহকারী অপেক্ষা করবে আটটা পর্যন্ত। তারপর আমার নাম লেখা উপস্থিতির খাতায় আজকের তারিখে সি, এল লিখে দেবে! ক্যাজুয়াল লিভ! কিন্তু বড়ো আপা বিষয়টাকে এতো সহজে যেতে দেবে না।
কলেজের এখন কোনোমতে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলার সময়! এখন দেখাতে হবে, এইখানে ক্লাশ হয় শতভাগ। তাই এই সময়ে কোনো ছুটি নেওয়া-নেওয়ি নাই! বড়ো আপার এইটাই হুকুম। আমিও তো এতোদিনের মধ্যে কোনোদিন ছুটি নেই নাই! তার মধ্যে কিনা আজকে কোনো খবর না দিয়েই আমি হাওয়া!
একবার একটুখানি ভয় বাড়ি দিয়েছিলো আমার ভেতরে। বাসায় যদি ফোন করে? তখন? ভাবী জেনে তো অনর্থের শেষ রাখবে না!
এই ভয়টা এসেছিলো বাড়ি থেকে বেরুবার পর পর। শুধু একরকমের একটা ভয় না! অনেক ধরণের ভয়। কই যাচ্ছি-জানা নাই! মোটের ওপর অচেনাই তো লোকটা! তার সাথে যে যাচ্ছি, কিছু যদি ঘটে? তখন?
কালকে হঠাৎ করে যা হয়েছে, সেটা তো হয়েই গেছে। আজকে আবার কেনো? কালকে গোলমালের কিছু হয় নাই; কিন্তু আজকে যে হবে না-তার গ্যারান্টি আছে কোনো?
কালকে যে লোকটা কীসব অদ্ভুত কথা বললো, সেগুলা কি বিশ্বাসযোগ্য? কেনো মনে করতে হবে যে, সে যা বলেছে ওইগুলা সত্য কথা? আমাকে ভ্যাবলা পেয়ে, অই অচেনা চালাক লোকটা যে-কোনো ফন্দিফিকিরের মতলবে অমন গল্প বানায় নাই, সেই কথা কে বলতে পারে?
ও মা রে! আমার তো ভয় পাচ্ছে বড়ো!
নাকি যাওয়াটা ক্যানসেল করে দেবো? রিক্সা নিয়ে সোজা চলে যাবো কলেজে?
এতোসব কুকথা মনের মধ্যে প্রথমে শক্ত খামচি দিচ্ছিলো ঠিক; কিন্তু তারপর কেমন করে জানি মনের মধ্যে অন্য আরেকটা নরম ভাবনাও খচমচ করে উঠেছিলো।
আরে! এমন মন্দ কথা আমার মনে আসে কী করে! ওই লোকটার বিষয়ে এমন বাজে কথা ভাবি কেমন করে আমি! লোকটাকে বুঝতে পারি না এইটা ঠিক, কিন্তু তার নরম ভদ্রতাকে কি বুঝতে পারি না?
এমনই কি ভোঁতা পাটা-পুতা হয়ে গেছে আমার বুদ্ধি? ভালো একজনকে ভালো ভাবতে ভয় পাই এখন তবে? আর যতো পাগলাই থাক ওই লোকের চলাচলতি, তারে কি সিরিয়াস মানুষ ছাড়া অন্য কিছু মনে হয় একবারও? হয় না!
তারে না জানায়ে যদি প্রোগ্রামটা ক্যানসেল করি, লোকটা কিছুই জানতে পারবে না। ওদিকে অকারণে ওয়েট করতে থাকবে! করতেই থাকবে। সেইটা করা কি ঠিক হবে আমার?
তারপর মহল্লার রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে আরেক অশান্তিতে মনটা ডুকুর-পুকুর করে ওঠে। লোকটাকে খুঁজে পাবো কেমনে? সে কোথায় আমার জন্য ওয়েট করবে, সেটা তো বলে নাই। কিছুই বলে নাই। আমি এখন কোথায় খুঁজবো তারে? কী করবো!
এমন সব ভয়-ডর-অশান্তি নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে, একটুখানি এগিয়েও সারি নাই; দেখি মাহবুব শরীফ হেঁটে আসছে।
সুন্দর আমার দিকে তাকায়ে, হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে! বোঝো অবস্থা! মহল্লায় এই বিষয়টা কেউ দেখে ফেললে, আমার উপায় থাকবে?
এইদিকে না এসে, বিশ্বরোডে দাঁড়ায়ে থাকলেই তো হতো! আমি খুঁজে নিতাম তাকে! তখন নিজের ওপরেই রাগটা হয় কিনা! আমিও তো তাকে ওইখানে, ওই বিশ্বরোডেই, ওয়েট করার কথাটা বলে রাখতে পারতাম! আমি বলি নাই কেনো?
“এমন দারুণ ভোরে, এমন একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মন তেতো করতে নেই, হুসনা জাহান! কেউ দেখতেই পাবে না!” মাহবুব শরীফ আমাকে অভয় দেয়।
হুহ! বললেই হলো! আস্ত একটা মহিলা আস্ত একটা বেটাছেলের সাথে যাচ্ছে! মহিলাটা আবার এই মহল্লার উকিল সাহেবের বোন! ঘটনা কি? লোকে বলতে ছাড়বে নাকি!
“আমি আমাদের ঘিরে কুয়াশা সৃজন করে দিয়েছি! অনেকক্ষণ আগেই! আমাকে বিশ্বাস করুন! সেটা ভেদ করে আপনাকে কেউ দেখতে পাবে না!”
‘কীসব যে বলেন না আপনি মাহবুব শরীফ!’ আমি রিঅ্যাক্ট করতে যাই, কিন্ত কথা থেমে যায়।
কারণ আমি দেখতে পাই, আমি আর বাসাবো কদমতলার গলিতে নাই!
আমি দেখতে পাই, আমার পায়ের তলায় ঘাস। আমার শরীরে ফুলের গন্ধমাখা বাতাসের হালকা স্পর্শ পাচ্ছি আমি। চারপাশে দেখতে পাচ্ছি ক্ষেত। সর্ষে ক্ষেত। হলুদে হলুদ। শীত শীত বাতাস।
কোনোখানে একটা কোনো মানুষের চিহ্ন মাত্র নাই। শুধু আমরা দুই জন।
দুই জমির মাঝখানে চওড়া অনেকখানি জায়গা। দুইজন পাশাপাশি হাঁটা যায়-এতোটা চওড়া! আমরা দুইজন পাশাপাশি হাঁটছি!
পলকে কোথায় এলাম!
“কথা বলার দেশে!” মাহবুব শরীফ উত্তর দেয়। তারপর জিজ্ঞাসা করে ওই কথা, “মাহবুব শরীফের সাথে কীভাবে যেনো প্রথম দেখা হয়েছিলো?”
আমি অনেকক্ষণ কোনো উত্তর করি না। করতে ইচ্ছা হয় না। মনে হতে থাকে, এখন আর কথা বলার কোনো দরকার নাই। বরং, এইসব ক্ষেতের কোনো একটা কিনারে স্থির হয়ে বসে পড়া যাক এখন। সারা দিনের জন্য বসে যাওয়া যাক।
আমি কোনোদিন আসল সর্ষে ক্ষেত দেখি নাই। দেখার সুযোগ আসে নাই। তবে পেপারে ছবি দেখেছি, টিভিতেও ছবি দেখেছি। ফসলী জমিও তো তেমন একটা দেখার পরিস্থিতি হয় নাই আমার। জমিদের মাঝখানে যে এমন এমন রাস্তা থাকে, সেটাও জানতাম না কোনোদিন।
“এর নাম আল! তবে রাস্তা যদি বলতে চান, তাহলে রাস্তা!” মাহবুব শরীফ বলে; “হাঁটতে যদি চাই আমরা, হাঁটবো। বসতে যদি চাই, ওই যে বটগাছ!”
সেই কোন দূরে, ক্ষেতের এক শেষ মাথায়, একটা বটগাছ দেখা যায়। দেখে ভালো লাগে। সর্ষে ফুলদের দেখতে থাকি। মনের মধ্যে কী জানি ওড়াউড়ি শুরু করে।
“এর নাম আনন্দ!” মাহবুব শরীফ আপনা থেকেই আমাকে বলে।
ক্ষেতভরা সষের ফুল দেখলেই শুধু এমন আনন্দ হতে পারে মনে? তাহলে, কেনো কোনোদিনও সর্ষেফুলের ক্ষেত দেখতে যাওয়ার চিন্তা পর্যন্ত করি নাই একটা বার? ওরা যে কোনোখানে আছে, সেইটাই তো মনে করি নাই কোনোদিন! কেনো?
তারপর হঠাৎই আমার মনে হতে থাকে, আমার ভেতরে আমি আর নাই! আমার ভেতরটা একদম ফাঁকা, একদম শূন্য।
মনে হতে থাকে, একটা আসবাবপত্রহীন ঘরের মতো খালি- আমার ভেতরটা। সেখানে শুধু বাতাসের আসা-যাওয়াটা আছে। শীতল বাতাস! সেই বাতাস খুশীর বাতাস। খুশীরা আসছে যাচ্ছে, সেই শূন্য ঘরে। আমার ভালো লাগছে! ভালো লাগছে! অনেক ভালো!
এই রকম ভালো- জীবনে একবার শুধু লেগেছিলো! সেইটাও এমনই এক সকাল বেলায়। অনেকদিন আগে!
সেইদিন কী এক কারণে ক্লাশ বাতিল হয়ে গেছে।
নাজমা বলে, ‘আজকে ক্লাশ হউক চাই না হউক, ঢাকা ইউনিভার্সিটিত যাইতেই হইবো! আবু মঈনউদ্দিন ভাইয়ের কাছে দরকারী কয়টা নোট আছে। সেইগুলা নিয়া আসি গা চল, হেনা!’
‘ইউনিভার্সিটত যামু? অতো বড়ো জায়গায় যাইতে ডর করে আমার, নাজু!’
‘ধুর! কেমন খ্যাতের মতন কথা কস! দুনিয়ার হ্যান্ডসাম ছেলেগুলা ওইখানে! দেখলেই তো ফূর্তি লাগে! চল চল!’ নাজমা আমার কুণ্ঠাকে এক ফুঁয়ে উড়ায়ে দিয়ে, আমাকে টেনে নিয়ে রিক্সায় ওঠায় । ইডেন কলেজ থেকে কলাভবন যেতে আর কতোক্ষণ!
সকাল দশটায় বাংলা ডিপার্টমেন্টের করিডোরে লোক বলতে কেউই নাই। দক্ষিণ দিকের মেইন করিডোরে একটা স্টুডেন্টেরও চিহ্ন নাই। নাজমা এইদিকে ওইদিকে বিতিবিতি করে খোঁজে ওর আবু মঈনউদ্দিন ভাইকে। তাকে কোথাও দেখা যায় না।
‘চল তাইলে, যাই গা আমরা!’ আমি ফেরার তাগাদা দেই।
‘রাখ! গেলেগাই তো গেলাম গা! আরেকটু খুইজ্জা দেখি!’ নাজমা আমাকে পাত্তা দেয় না।
আস্তে পায়ে হাঁটতে হাঁটতে শেষে আমরা পশ্চিম দিকের করিডোরে আসি। টিচারদের সারি সারি রুম। তালা বন্ধ। তবে সেই করিডোর একেবারে ফাঁকা নয়! সেইখানে একজনকে দেখা যায়। রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো। এক হাত তার পকেটে ঢোকানো। অন্য হাতটা রেলিংয়ে রাখা।
তাকে দেখতে পেয়ে নাজমা বলে, ‘বাপরে বাপ! বাঁচলাম! পাওয়া গেছে চিনা একজনরে!’
নাজমা আমাকে পেছনে ফেলে জোর কদমে হেঁটে যায় ওই ছেলের দিকে। এইই তাহলে নাজমার আবু মঈনউদ্দিন ভাই! আমি দূর থেকে তাকে দেখি।
তারপর মনে হয়, আমি তাহলে আর ওইখানে গিয়ে কী করবো। দরকারী কথাগুলা নাজমা সারুক। আমি বরং এইখানে, এই দূরেই, অপেক্ষা করি। আমিও তখন হাঁটা থামায়ে, কাছের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়াই।
নাজমা ওর ভাইয়ের কাছে গিয়ে কীসব জিজ্ঞেস করে। ভাই হালকা-পাতলা রকমে উত্তর দেয়। তারপর অনেক অনেক কথা- নাজমা বলতে থাকে, ওর ভাই শুনতে থাকে!
আর, আমি যে আছি সেইটা একদম ভুলে যায় নাজমা।
আমি দাঁড়ায়ে থাকি দাঁড়ায়ে থাকি, কিন্তু একটু পর পর আমার চোখ খালি নাজমার আবু মঈনউদ্দিন ভাইয়ের দিকে চলে যেতে থাকে।
খুব হ্যান্ডসাম তো দেখতে এই আবু মঈনউদ্দিন ভাই! চোখ সরানো যায় না-এমন! নাকি আবু মঈনউদ্দিন ভাই আসলে বিষয় না? বিষয় হচ্ছে তার পরনের পোশাক?
সে পরে আছে কালচে ছাইছাই প্যান্ট! সাদা ফুল শার্ট। হাতা একটুখানি গোটানো। খুব অযতেœ গোটানো। কিন্তু সেই কারণেই অনেক বেশী ভালো লাগছে! জুতা পরেছে, কেডস!
মাথা বোঝাই চুল তার! দূর থেকে দেখেই যেখানে – আমার চোখ ভরে যাচ্ছে! কাছে থেকে দেখতে তাইলে নাজমার কেমন লাগছে! এই জন্যই তো কথা ফুরাচ্ছে না!
আমি আর কতোক্ষণ এমনে দাঁড়ায়ে থাকবো! নোটের কথা কী মনে আছে ওর? বলেছে? নাকি আলাপই করে যাচ্ছে শুধু? এতো কী বলে! আমি বুঝতে পারি না।
তারপর যেনো হঠাৎ আমাকে খেয়ালে আসে আবু মঈনউদ্দিন ভাইয়ের। সে যেনো নাজমাকে কিছু একটা বলে। নাজমা তখন আমাকে হাত ইশারায় ডাকা শুরু করে। আমিও ইশারায় জানাই, না! আমি ঠিক আছি। এখানেই থাকি!
কিন্তু আমার এই একা ঠিক থাকাটা যেনো বরদাস্ত হয় না আবু মঈনউদ্দিন ভাইয়ের। আমি যাই না বলে, সে-ই নাজমাকে নিয়ে আমার দিকে চলে আসে।
এসে বলে, ‘একা এমন দাঁড়ায়ে থাকতে নিশ্চয়ই ভালো লাগে নাই আপনার? স্যরি! আগেই খেয়াল করতে পারতাম!’
কী কা- রে বাবা! আমি গেলাম না বলে, আমার এখানেই চলে আসতে হবে? আমাকে না জানি কী মনে করলো! আমি লজ্জায় কাঁচুমাচু খেতে খেতে শেষ হতে থাকি!
‘হইছে হেনা, এতো শরম পাইতে হবে না! এইটা মাহবুব শরীফ ভাই! মঈনউদ্দিন ভাইয়ের ক্লাশমেট।’ নাজমা আমাকে পরিচয় করায়ে দেয়।
গলার ভেতর কথা আটকে যেতে থাকা অবস্থা নিয়ে আমি কোনোমতে বলি, ‘ভালো আছেন?’
সে উত্তর দেয়, ‘আপনার নামটা তো নজরুলের গানকে মনে করিয়ে দিচ্ছে! নাই চিনিলে আমায় তুমি- রইবো আধেক চেনা! শুনেছেন গানটা, হেনা?’
কী কথার কোন উত্তর আসে! আমার থতমত খাওয়া কেমনে শেষ হবে! এই রকম করে কথা বলে এরা? এমন সুন্দর করে? আমাদের ইয়ারেরই তো ওরা! কলেজের কোনো একটা মেয়েও তো এমন করে, একটা কোনো কথা বলে না! আমিও না! বলতেই তো জানি না!
আমি বুঝতে পারি, ওরাÑওরা- আমাদের চেয়ে ভিন্ন। আমাদের চেয়ে ভালো! অনেক ভালো! মনটা ভেতরে ভেতরে এতো ছোটো হয়ে যায় আমার! ওদের কারো সাথে একটা কোনো কথা বলার আর শক্তি পাই না।
টিএসসিতে চা খেতে খেতে মাহবুব শরীফ আবার গানের কথাটা পাড়ে; ‘গানটা শোনা হয়নি আপনার?’
আমি কোনোরকমে মাথা নাড়ি। না! শোনা হয় নাই!
‘ঠিক আছে তাহলে! আমি ক্যাসেট করিয়ে আপনাকে দেবো! শুনে দেখবেন! ভীষণ চমৎকার!’
এর উত্তরে কী বলতে হয়? আমি আসমান জমিন খুঁজেও কোনো কথা পাই না বলার জন্য। শুধু অপ্রস্তুত চোখে একটু তাকাই মাহবুব শরীফের দিকে।
এমন আবার হয় নাকি! বলতে গেলে আমি তো অচেনাই একজন! তার জন্য ক্যাসেট করাবে? কতো টাকা না জানি লাগবে!
আমাদের বাসায় টেপ রেকর্ডার আছে। আম্মার ঘরে। আবু ধাবি থেকে আনা! নূর হোসেন ভাই নিয়ে আসছিলো। সঙ্গে বাংলা হিন্দী গানের অনেকগুলা ক্যাসেটও দিয়েছে।
ওই গানগুলাই তো বাজে বাড়িতে। দাদাভাইয়ের যখন শুনতে ইচ্ছা হয়, তখন! গানের ক্যাসেট করাতে কতো টাকা লাগে, আমি তো জানি না!
আমার জন্য মাহবুব শরীফ আবার এতোগুলা টাকা খরচ করবে! আমি সেটা উশুলই বা দেবো কেমন করে! একবার ইচ্ছা করে তাকে বলি, থাক! লাগবে না! আমিই করে নেবো সময় করে। কিন্তু আমার মুখ দিয়ে একটা কথাও বের হয় না!
এর মধ্যে চা-খাওয়া শেষ করে মাহবুব শরীফ বলে, ‘আমি উঠলাম! ক্লাশ আছে!’
আবু মঈনউদ্দিন ভাই বলে, ‘আমি ওদের সঙ্গে আরেকটু থাকি। আজকে ক্লাশ করমু না আমি!’
হয়তো তাড়াই ছিলো তার, ঝটপট পায়ে বেরিয়ে যায়। আমি একা একা চোখে তাকায়ে তাকায়ে তার চলে যাওয়া দেখি।
দেখতে দেখতে আচমকাই টের পাই, আমার ভেতরটা একদম ফাঁকা লাগছে! আসবাবপত্র না থাকা একটা ঘরের মতো খালি খালি লাগছে।
এই যে সর্ষে ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার- এখন যেমন- শূন্য শূন্য লাগছে, ঠিক তেমনটাই লেগেছিলো সেই দিনও! এমনই ফাঁকা এমনই খালি! যেনো আমার ভেতরে আমিও নাই। কিচ্ছু নাই। শুধু খুশীর একটা বাতাস আছে!
খুশী খুশী! বাতাসে বাতাসে! সে যে চলে গেলো, আবার কবে যে দেখা হবে, কেমন করে যে দেখা হবে-সেইসবের কিচ্ছু মনে এলো না! শুধু মনে এলো, আমাদের দেখা হয়েছে! আমাদের দেখা হয়েছে। তার সঙ্গে দেখা হয়েছে!
তখন চারপাশের সব লোক যেনো নাই গেলো। সব কথা যেনো থেমে গেলো। শুধু আমার একদম শূন্য বা ফাঁকা হয়ে যাওয়া ভেতরটাতে, বাতাস উড়তে লাগলো। খুশীর বাতাস!
মাহবুব শরীফ চলে যাবার পরে, আমার এমন যে কোনো লাগতে থাকে! কেনো যে লাগতে থাকে!
অথচ আরো একটু পরে, যখন নাজমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রিক্সায় উঠি; যখন মাথাটা ঠা-া হয়ে আসে একটুখানি; তখন কিন্তু আমার ঠিক মনে আসে, এমনটা করতে পারি না আমি! আমার জীবনে একটা বিরাট ঘটনা আছে। একটা কঠিন সত্য আছে!
‘এই তো, এইভাবে মাহবুব শরীফের সাথে আমার প্রথম দেখা!’ হলুদ ফুলদের দিকে চেয়ে থেকে থেকে আমি কথা শেষ করি।
“তারপর?” সে জিজ্ঞেস করে।
‘এইবার আপনার বলার কথা না?’ আমি মুখ ফেরাই তার দিকে।
তারপর ভয়ে অবশ হয়ে যাই। গলা দিয়ে গোঙানির মতো কিছু একটা বেরিয়ে আসে আমার। অন্ধকার হয়ে আসে চোখের সামনে।
এক ঝলকের জন্য, এটা কী দেখলাম আমি! এটা কেমন একজন-এই নতুন মাহবুব শরীফ? সে কি মানুষ?
দেখলাম তার শরীরটা যেনো মানুষের শরীর না! মানুষের শরীরের কাঠামোটা আছে, কিন্তু সেইখানে ঝিলিক দিয়ে উঠছে যেনো আগুন।
না না! এটা ঠিক বলা হলো না। মেঘে মেঘে যেই বিদ্যুৎ চমকায়, তেমন বিদ্যুৎ যেনো চমকে চমকে যাচ্ছে-তার পুরাটা শরীরে! এটা কী!
কী দেখলাম এটা! এটা কী! এটা কী! আমি কি উঠে দৌড় লাগাবো? আমি কী করবো!
“ওহ! ভয় পাইয়ে দিলাম আপনাকে?” বলতে বলতে আমার সামনে এসে হাঁটু মুড়ে বসে সে! এখন দেখতে অবিকল সে আমার মতন মানুষ! “যখন গুরুতর কিছু গ্রহণ করতে থাকি, তখন এমনই দেখায় আমাদের। আমার দেশে আমরা এমনই, হুসনা জাহান!”
‘আপনি-আপনি-মানুষ নন?’
“আমি দুঃখিত। আপনার কথাগুলোকে আত্মস্থ করার কাজে একটু বেশী মন দিয়ে ফেলেছিলাম। সেই জন্য এই বিপত্তিটা ঘটেছে। ভয় পেয়েছেন, তাই না?”
আমি কোনো উত্তর করতে পারি না।
“আর আমাকে একটুও ভালো লাগবে না, তাই না? শুধু ভয় লাগবে, তাই না?” তার কণ্ঠ ঝড়ো বাতাসের মতো হু হু শোনায়; “আমি চেয়েছিলাম, আপনার মনকে সর্বাংশে তৈরি করে, তারপর নিজের পরিচয়টা খুলে বলবো। তার আগে তো আপনাকে সুস্থ করে তোলার কাজটাও সারতে হবে আমাকে!”
আমার দৃষ্টি মাটিতে নামানো। হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতে বলতে একসময় আমরা এসে বসেছিলাম সেই বটগাছটার নিচে। একটু ফারাকে থেকে সর্ষে ক্ষেতেরা বটগাছ ও আমাদের দুজনকে ঘিরে রেখেছে। বাতাসে শীত। নরম এক রকমের শীত।
এটা কি শীতকাল? কোনোমতেই না। আমি জানি, রাইসরিষার আবাদের টাইম কোনটা। শীতকাল। আমাদের স্কুলের পাঠ্যবইয়ে ছিলো এই কথাটা। আর, এখন সত্যি সত্যি কোন মাস যায়, আমি কী সেইটা জানি না! জানি, বৈশাখ মাস যায়।
আমার চোখের সামান্য পানিকে মুক্তা আর জোনাক বানায়ে, আমার দুনিয়াটা কে টলিয়ে দিয়েছিলো সেইদিন? অবিকল মাহবুব শরীফের রূপ ধরে ধরে, আমার সাথে হেঁটে হেঁটে হেঁটে; আমার না-মেটা সাধগুলো- কে পূরণ করে চলেছে?
গনগনা তাপের বৈশাখ মাসে, এমন নরম শীতকে কে এনে দিয়েছে?
এমন নরম শীত দেখার ইচ্ছা আমার কতোকালের? চিরকালের!
চিরকাল ধরে এই ইচ্ছাকে মনে রাখতে রাখতে তারপর কোনদিন জানি ভুলেও গিয়েছিলাম! কে জানি, সেটা আজ আমার জন্য সত্য করে তুলেছে?
একটা কোনো নদী, আর তার ভাঙাঘাটও দেখার ইচ্ছা নিয়ে নিয়ে কতো দুপুর একা একা আউলা-বাউলা হয়ে গেছি! সেইটাও আমার জন্য এই জনই তো নিয়ে এসেছে।
আমার ভেতরের কথা কে কবে শুনতে চেয়েছে? কেউ কোনোদিন না! কোনোদিন না। এতো দরদ আব্বা ছাড়া আমাকে কে কবে করেছে? কেউ করেনি। কোনোদিন করেনি।
একে ভয় পাবো আমি?
এখন যদি সে আমাকে মেরেও ফেলতে চায়, খুশী মনে আমি মরতে রাজি হয়ে যাবো। আমি কেমন করে তাকে ভয় পাবো?
আমি প্রথমে ভড়কে যেতে পারি। ভড়কে গেছি। অনভিজ্ঞ না? ভীতুর হদ্দ ভীতু একজন না?
কিন্তু একটু একটু করে বুঝে নিতে পারছি তো। সয়ে যাচ্ছে তো বিষয়টা। কেনো ভয় পাবো? সে কি আমার সাথে এক বিন্দু অভব্য ব্যবহার করছে? করে নাই তো!
না না না! তাকে আমি কোনোদিন ভয় পাবো না। একটুও না!
মনে মনে এতোসব কথা নিজেকে শোনাতে থাকি! শুনতে শুনতে কেনো জানি হঠাৎই আমার চোখ ভেসে যাওয়া শুরু করে।
অভ্যাস মতোই হাতের পাতা তুলে আনতে যাই চোখের সামনে। মুছতে হবে তো!
আমার আগেই সে তার হাতের পাতা এগিয়ে আনে আমার চোখের কাছে। তারপর ফিসফিস করে চোখের পানিদের ডাকে, “এসো!”
আশ্চর্য! পাতা ঝরার মতো করে আমার চোখের পানিরা তার হাতের পাতার ওপরে পড়তে থাকে। এক দুই চার ছয় সাত! পড়ে পড়েÑ একরকমের সবজে আলোর রূপ নিতে থাকে তারা! সুন্দর!
আমি মনে করি, আজকেও বুঝি সে আমার হাতেই তুলে দেবে ওদের! সেই সেদিনের মতো! না! আজকে সে ওই চোখের জল বা আলোগুলাকে আলগোছে নিজের বুক পকেটে ঢোকায়।
আমি দেখতে পাই, আবার তার পুরোটা শরীরে ঝিলিক দিচ্ছে নীলচে-সাদা আলো। সেই আলোর মধ্যে কেমন আস্তে করে মিশে যাচ্ছে গোলানো সবজে-সাদা আলোরা! এতো সুন্দর!
কেনো তবে তাকে আর মাহবুব শরীফ বলে ডাকা? ভুল হচ্ছে আমার। একদম ভুল।
‘আলোকুমার!’ আমি তাকে ডেকে উঠি!
“আলোকুমার?” সে এবার হেসে ওঠে; “আমার নাম? আমার জন্য নাম?”
‘এইবার আপনার কথা বলুন, আলোকুমার!’
“তার আগে আপনার কথা আরেকটু হোক?” সে বলে।
আবারো আমার কথা
আমার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা তখন মাত্র শেষ হয়েছে।
এর মধ্যেই আব্বাকে চুপেচাপে বলাও শেষ করেছি যে, আমার অনেক ইচ্ছা ভার্সিটিতে পড়ি। আব্বাকেও অরাজি মনে হয় নাই। আব্বা বলেছে, ‘আইচ্ছা! আগে তো রেজাল্ট বাইর হউক!’
আম্মাকে পড়ালেখা বিষয়ে কিছু বলা বৃথা। কারণ আম্মা- আমাদের দুই বোনকে বেশী পড়ানোর কোনো দরকার আছে বলে – কোনোদিন মনে করে নাই। তাও হয়তো বিষয়টা আব্বাকে বলার সাথে সাথে আম্মাকেও ঘুরিয়ে ঘারিয়ে, একটু- সেকটু বলা যেতো, কিন্তু বলার সুযোগই আসে না।
আমি মানবিকের ছাত্রী। আমার এমন কোনো সাবজেক্ট ছিলো না, যেটাতে প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা দেওয়া লাগে। সেই কারণে আমার পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়, চোখটা না ফেরাতেই।
পরীক্ষা যেইদিন শেষ হয়, তার পরের দিনটা থেকে আম্মা যাওয়া শুরু করে বড়ো খালার বাড়িতে।
তারা এই দুই বোন। আগে তো সপ্তাহে সপ্তাহে দুই বোনের আনা-যানা ছিলোই, তবে আমার পরীক্ষার পরের দিন থেকে আম্মা খালি একলাই যেতে থাকে। আমাকে বলে, ‘চুলার ভালাবুরা অখন তর! যেমনে পারস করবি। আমার ঠেকার কাম আছে বুজির লগে! অইটা শান্তি হালে করতে দে!’
চুলা সামলাতে পারি আমি। একেবারে ছোটোকাল থেকেই পারি। কাজেই সেইটা কোনো প্রবলেম না!
কিন্তু এখন যে এমন নিত্য আম্মারে বড়ো খালার বাড়িতে যাওয়া লাগছে, সেইটাই কেমন জানি একটু প্রবলেম প্রবলেম লাগতে থাকে আমার। এতো যায় ক্যান? খোদার প্রতিটা দিন কেনো যাইতাছে এখন?
ঠিক বিশদিন আসা-যাওয়া করার পরে, বিষয়টা পরিষ্কার হয়।
বড়ো খালা আর খালু একদিন সন্ধ্যার সময় আব্বার সাথে দেখা করতে আসে। বিষয়টা আব্বারেও অনেক তাজ্জব করে দেয়। বড়ো খালা বা খালু এমন সন্ধ্যাকালে আমাদের বাড়িতে জীবনেও আসে না। তারা আসে দুপুরের টাইমে। দুপুরের দাওয়াত খেতে।
তখন আব্বা বাড়িতে থাকলে দেখা হয়, না থাকলে দেখা হয় না। তারা তাদের মতন করে আসে যায়। আব্বারে কোনোদিন দরকার পড়ে না তাদের।
হঠাৎ সেই সন্ধ্যায় তারা দুইজনে কেনো আব্বার কাছেই আসে? সাথে আবার অনেক মিষ্টির পোটলা! বিষয়টা কেমন জানি লাগে!
তো, তারা ঘরে বসে কীসব কথা বলে; আমি কিছুই শুনতে পাই না! কারণ আমার তখন চুলা সামলানোর ঠেকাটা ছিলো।
আম্মা তাইলে দুপুরে মুরগীর রেজালা রান্না করে ফ্রিজে তুলে রেখেছিলো, এগো দুইজনের জন্য? এই কথা চিন্তা করতে করতে আমি তখন পোলাওয়ের চাল ধোওয়া, পেয়াজ কাটা – এইসব নিয়ে হুড়াহুড়িতে ছিলাম।
তার মধ্যেও দূর থেকে আবছা মতো যেনো- আব্বার গলাটা একটু উঁচা হয়ে যেতে শুনি আমি। আবার সেই উঁচা গলাটাকে একটু কাহিল হয়ে, কেঁপে উঠতেও শুনি।
অনুমান করি, হয়তো বিষয় সম্পত্তির কথা চলছে। আম্মা হয়তো কোনো জায়গা কেনার জন্য আব্বাকে চাপ দিচ্ছে! আব্বার ওপর আম্মার এমন চাপ, এমন জোরাজুরি চিরকালের বিষয়-এই বাড়িতে। নতুন তো কিছু না!
কাজেই ব্যাপারটা থেকে কান উঠিয়ে নিয়ে, আমি পোলাও রান্নার দিকে খেয়ালটা দিয়ে দেই।
গরম তেলে পেয়াজ মাত্র ছেড়েছি, এমন সময় আম্মা কিনা আমাকে আর দাদাভাইকে ডাকতে থাকে। ধুম ডাকতে থাকে! সেই ডাকের মধ্যেই যেনো আম্মার গলাটা কেমন জিতে-যাওয়া, জিতে-যাওয়া শোনায়। ব্যাপার কী!
গ্যাসের চুলার চাবি এক ঘুরানি দিয়ে বন্ধ করে দেই আমি। তারপর যাই আব্বা-আম্মার ঘরে।
গিয়ে দেখি ততোক্ষণে বড়ো খালা আর খালুকে সালাম করা শেষ করে ফেলেছে দাদাভাই। এখন আমাকে করতে হবে। ঈদ না কিছু না, সালাম করা ক্যান?
এইভাবে সেই সন্ধ্যায়, আমাদের দুই ভাইবোনের বিবাহ একেবারে পাকাপাকি হয়ে যায়। বড়োখালার একমাত্র যে মেয়ে Ñবকুল; তার সাথে দাদাভাইয়ের। আর বড়ো খালার বড়ো ছেলে- আমাদের গুষ্টির সকলের যে বড়ো ভাই-নূর হোসেন ভাই- তার সাথে হেনার। নূর হোসেন ভাই আবুধাবিতে চাকরি করে।
এইবার সে দেশে এসেছেই বিবাহ করার জন্য। কিন্তু মানে-মর্যাদায় মিলসই মেয়ে আর পায় না পায় না; শেষে বড়ো খালার খেয়ালে আসে, মেয়ে তো হাতের কাছেই আছে।
নূর হোসেন ভাইয়ের আবুধাবিতে ফেরত যেতে আর পাঁচদিনও নাই! সেই কারণে হুড়াহুড়ি করে সরা-কাবিন সারতে হয় দুই বাড়ির লোকদের। হোক হালকার মধ্যে করা কাজ, কিন্তু দুই দুইটা সরা-কাবিন তো। দাদাভাইয়েরটা হয়ে যায় সকালে, হেনারটা বিকালে।
কথা থাকে, এক বছর পরে নূর হোসেন ছুটি নিয়ে দেশে আসবে যখন, তখনই দুই বাড়ির মেয়ে তুলে আনার বড়ো কাজটা করা হবে।
তারপর এক সময় আমার ভার্সিটিতে ভর্তির সময় আসে। আবুধাবি থেকেও অনেক আপত্তি আসতে থাকে। না না! ভার্সিটিতে ছেলেমেয়ে একসাথে পড়ে। সেইখানে দেওয়া যাবে না।
পড়ালেখা করানোতে তার কোনো আপত্তি নাই, কিন্তু পড়লে- পড়তে হবে কোনো মহিলা কলেজে।
বড়ো খালা আর আম্মা জোর গালাগালি দিতে থাকে। ‘আর পড়োনের কী কাম! আই.এ পাশ তো হইছে! নূর হোসেনে ম্যাট্টিক ফেল! বউ তার খসমের উপরে দিয়া গেলে গা, কেমুন হইবো? মাইনষে কি কইবো?’
এখন আমার কী হবে!
আব্বা আমাকে কিছুই বলে না। নিজে কোন ফাঁকে, চুপচাপ গিয়ে, ইডেন কলেজ থেকে ফর্ম নিয়ে আসে। ভর্তি পরীক্ষার দিন সঙ্গে যায়। আমার বাংলা অনার্স পড়া শুরু হয়।
তারপর কী মনে করে বলে, “লোকে জিজ্ঞাস করলে কইস, তুই ডিগ্রি পড়স! পারবি না কইতে?”
দিনে দিনে একবছর পার হয়ে, দুই বছরও চলে যায়। নূর হোসেনের আর ওদিকে সুবিধা হয় না – ছুটি ম্যানেজ করার।
এখন, একজনের জন্য অন্য দুইজনের জিন্দিগী আটকে রাখা কি চলে?
আত্মীয়রা সকলে বলে, এমন করে ফায়দা নাই কোনো। নূর হোসেনের জন্য বসে না থেকে, বকুলরে তুলে আনাই উত্তম। বিশেষত পোলা- মাইয়া দুইজনেরই এমন ভরাভরন্ত বয়স। আটকায়ে রাখা গুনাহ্-র কাজ হবে!
আমাদের সংসারে যেট্টুক ধুমধাম করার টাকার জোরটা থাকে, ততোটুক করে আব্বা।
দাদাভাই কোর্টে যায়, তার বউ দরোজা বন্ধ করে ঘুম লাগায়। শরীর তার ম্যাজম্যাজ করে, টনটন করে, জ্বালাপোড়া করে। এতো আদরের বোনঝির কষ্ট আম্মার দীলে একদমই সয় না। সে নিজেই তারে যত্ন-সেবা করতে থাকে! অইসব করতে করতে সুখে একেবারে থইমই হতে থাকে আম্মার অন্তর!
আর, আমাকে কেবল নানা রকমে বুঝ দিতে থাকে আম্মা! বলতে থাকে, দিনের মধ্যে পারলে যেনো- তিনটা করে চিঠি লিখি আমি। আবুধাবিতে। মেয়ে মাইনষের হাতেই সকল ছলাকলা। আমি ডাকতে জানলে, সে না আইসা পারে?
সে যে আসছে না, তার কারণ, আমার জন্য তার দীলে কোনো মায়া-মহব্বত জন্মায়ই নাই! কোন টানে আসবো সে?
এইদিকে প্রাণের বোনঝি-কে নানামতে যত্ন দিতে দিতে, সংসারের নানা ছলাকলা বোঝাতে বোঝাতে, একদিন কিছুর মধ্যে কিছু না-আম্মা হার্টফেল করে।
চুলার মালিক তখন কে হবে? বকুলে হবে। সে একমাত্র ছেলের বউ। শাশুড়ীর পরে ছেলের বউই না মালিক হয়? এইই না নিয়ম? নিয়ম মোতাবেক নতুন মালিক সংসারের দখল বুঝে নেয়।
কিন্তু তার জমজ দুই ছেলে। কাজের মেয়ের সাহায্য নিয়েও বাচ্চা সামলাতে তার দুনিয়া আন্ধার হয়ে থাকে, সর্বসময়! তার ওপর শ্বশুর এবং গলার কাঁটা ননদটার বোঝা সে কেমন করে টানে?
আব্বা রান্না করার লোক রাখে। আমি বলি, ‘আব্বা, আমিই তো পারমু!’
“না! তরে যেমনে যা কইতাছি, তাই কর মন দিয়া- আব্বায় থাকতে থাকতে! পড়ালেখার কর্মটা ঠিক রাখ তুই, মাইয়া!”
আমার মাস্টার্স হয়ে যাবার পরে, আমি বড়ো ধন্দে পড়ে যাই। আমি এখন কী করবো! নূর হোসেন আসে না তো আসেই না।
এদিকে বড়ো খালা আর খালু প্রায় নিত্য এসে, আমাকে নিয়ে যাবার জন্য্ চাপ দিতে থাকে। ‘আইবো নে নূর হোসেনে ওর সুবিধা বুইজ্জা! আমরা মুরুব্বিরা তো আছি! জামাই না-ই তো কী হইছে! বিয়া করা বউ না? বিয়া করা বউ তো! সেয় অখন খসমের সংসারে আইয়া হউর-হাউরিরে খদমত করুক!’
আব্বা বলে, “এইটা পারমু না, আপা! হাজার হউক আমার বড়ো মাইয়া! অরে সমাদর কইরাই তুইল্লা দিমু, আপনেদের হাতে!”
তারা গলা উঁচায়ে গালি দিতে দিতে বের হয়ে যায়। তবে তারা আর কী বকাবাজি করে, ভাবী করে তার দশগুণ বেশী।
সে নিজের ঘরে বসে বসে গলা চড়িয়ে আব্বাকে শোনাতে থাকে, ‘বুইড়ার ঘরের বুইড়া! বান্দরের গুষ্টী! মাইয়ারে খাম্বা কইরা থুইস! এই গলার কাঁটারে আমার সংসারে রাইক্ষা- আমারে অশান্তি দেওনের মতলবেই তো- তুই এইটা করতাছস? তর বিছার খোদায় করবো!’
আব্বা সব শোনে, আর আমাকে ঠেলে ঠেলে পাঠায় ভার্সিটিতে। ‘যা! জলদি এম.ফিলে ভর্তির কাজগুলা শেষ কইরা আয়! এই ডিগ্রিগুলা হইলো তোর লাঠি! নাইলে তুই পিছলা জমিন পার হইতে পারবি না রে, মাইয়া!’
কিন্তু সেই ডিগ্রিটাও কি দেখে যাওয়ার ভাগ্য হয় আব্বার? হয় না। আব্বা থাকতে থাকতেই এম.ফিল প্রথম পর্বের পরীক্ষা দিয়ে ফেলি আমি।
শোনা ছিলো, একটা স্টুডেন্টের যদি সব কয়টা পেপারের পরীক্ষাতেই আশি করে করে নাম্বার থাকে; তাহলে সে এম.ফিল না করে সরাসরি পিএইচডি-তে ট্রান্সফার হয়ে যেতে পারে।
ওমা রে! এই কথা শুনে কী পড়া যে পড়েছি! কী যে পড়াটা দিয়েছিলাম! কিন্তু আমার পিএইচডিতে ট্রান্সফার হওয়া হয় নাই।
এম.ফিল ডিগ্রি হয়ে যাওয়ার পরে সুপারভাইজার স্যার একদিন কী মনে করে আমাকে বলে “মরিয়ম! তোমার কিন্তু তিন পেপারেই গড়ে আশি ছিলো! কিন্তু কী আর করা, বিভাগীয় প্রধান তোমার ট্রান্সফারের বিষয়টা কানেই তুললো না। বলে, আমাদের এতো পিএইচডি লাগবে না!”
তো, এইভাবে আছে আমার একটা এম.ফিল ডিগ্রি! তবে সেইটা নিয়ে আমারে যে দুর্দশাটা ভোগ করতে হচ্ছে-তার কোনো লেখাজোখা নাই!
রোজ টিফিন পিরিয়ডে কলেজ সেকশনের কোনো না কোনো আপার সাথে চা নাস্তা খেতে আসে স্কুল সেকশনের সেই সাদেকা আপা।
আমি তখন ছাত্রীদের নোট দেখার কাজ নিয়ে হুড়াতাড়ার মধ্যে থাকি। তাকে একটু হাসি সালাম দিয়ে, আমি থাকি আমার কাজে! সে যায় টেবিলের উত্তর দিকে বসা বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের টিচারদের সাথে আড্ডা দিতে।
কী গল্প কোন আড্ডা তারা করে, সেটা তারাই জানে। আমি শুধু দূর থেকে হঠাৎ হঠাৎ জোরে ছিটকে ওঠা তাদের হাসির আওয়াজটা শুনি।
আর ভাবি, এমন করে হেসে ওঠার কোনো একজন কলিগও আমার নাই! এখনও হলো না সেটা! অথচ, ওদের আছে! কী এমন মজার কথা আছে, যা নিয়ে এমন হাসতে পারে তারা! আহা!
একদিন ছুটির পরে পুরা টিচার্স রুমে আমি একা। সকলে দল বেঁধে বেঁধে আগেই নেমে গেছে। আমি যাচ্ছি ধীরেসুস্থে।
আমাকে একা পেয়ে, আয়শা বুয়া আমাকে বলে; ‘কতাখান কইলাম আপনেরে আর না-কইয়া থাকতে পারতাছি না! হেরা কিন্তুক আপনেরে লইয়া দুনিয়ার আসি-ঠাট্টা করে! আপনে খ্যাল করেন না ক্যান কিছু? আপনের ডিগ্রি বোলে মিছি ডিগ্রি! বড়ো আপার কাছেও কিন্তুক হেরা কইয়া আইছে কতাখান!’
‘আমার ডিগ্রি? মিথ্যা? আপনে কেমনে বুঝলেন তাদের কথা?’ আমি হতভম্ব মুখে জিজ্ঞেস করি।
‘ওম্মা! কয় কি? বুজমু না ক্যান? আমি কি পরালেহা না জানা মানুষ নি? আমি দি ফোর তরি পরছি! আপনের ইম.পিল ডিগ্রির কতা কয় হেরা। কয় কী, এই ডিগ্রি হইল মিছা কতা! এইটা যুদি সত্যই থাকতো, তাইলে এইনে পইড়া রইতো নি!’
তারপর বড়ো আপা আমাকে আবার সব অরিজিনাল সার্টিফিকেট নিয়ে তার সামনে হাজির হতে ডাকে! আমি বলি, ‘ইন্টারভিউ-র সময় তো বোর্ডের সবাই দেখছে অরিজিনাল সার্টিফিকেটগুলা! আপনিও তো দেখেছেন?’
“দেখো! আমার সন্দেহ হইতাছে এখন! এখন মনে হইতাছে – কী দেখাইতে কী না জানি দেখাইছো তুমি, মরিয়ম! কোনো গ-গোল যদি না-ই থাকবে, ওরা এই কথা তুলবে ক্যান!”
আলোকুমার! আমার ইচ্ছা হয়েছিলো-ওই মহিলার মুখ বরাবর রেজিগনেশন লেটারটা ছুঁড়ে দিয়ে আসি। ইচ্ছা হয়েছিলো, আর কোনোদিন একটা কদমও না রাখি ওইখানে!
কিন্তু আমি কিচ্ছু করতে পারি নাই! চোখের পানি লুকানোর জন্য মাথা নিচু করে রাখতে হয়েছিলো আমাকে! আর ওইটাকে ওরা বলছে আমার ছল-চাতুরী! বলেছে, আমার দুই নম্বরী ধরা পড়ে যাবার ভয়েÑ আমি ওইসময় মাথা হেঁট করেছিলাম!
আমার-আমার- যাবার কোনো জায়গা নাই!
“তারপর?” আলোকুমার জিজ্ঞেস করে।
‘আরো বলবো? আর তো কিছু নাই!’
“নূর হোসেন বৃত্তান্ত? ওটার শেষ নেই কোনো? উপসংহার?”
আমার কথা, আরো!
আব্বার ক্যান্সারের তখন একদম লাস্ট স্টেজ এসে গেছে!
দুই বছর ধরে তো আব্বার কাহিল শরীরটাকে আমিই নাড়ছি, আগলাচ্ছি। ভালো মন্দ সব দেখে রাখছি। আগের বছর দেখেছি, আব্বার কানের লতি দুইটা কেমন তাজা তাজা দেখায়। একদম অন্যসব নীরোগ মানুষের মতোই তাজা তাজা।
কিন্তু ৯৩ সালের মে-জুন মাসে, ওই যে ওই সময়-যখন আব্বা আমাদের তিন ভাইবোনরে ডেকে মোরাকাবার দায়-দায়িত্ব দিলো-সেই সময়কার কথা। সেই সময় আমি আব্বার মুখ মুছাতে গিয়ে, একদিন হঠাৎই দেখি, কানের লতি দুইটা একদম নেতানো! একেবারে মরা মরা যেনো দেখায়।
ভালো মতো খেয়াল করি বারেবারে। তারপর নিজেই বুঝে যাই, আব্বার শরীরটা ছেড়ে দিচ্ছে। হাল ছেড়ে দিচ্ছে!
তখনই আরেক রকমের উৎপাত দেখা দেয় আব্বার শরীরে। তখনও উঠে বসতে পারে আব্বা! তাকে ধরে বিছানা থেকে নামায়ে, মেঝেতে রাখা বেডপ্যানের সামনে বসালে, সুন্দর নিজে থেকেই পেশাব সারতে পারে।
সেইদিন পেশাবের জন্য বসায়ে, আমি পিঠের দিকে দিয়ে ধরে বসে আছি; আব্বা ভয় পাওয়া গলায় আমাকে ডাক দেয়; “মা রে! মা! দেখ তো দেখ তো! পেশাবের বদলে এইগুলা কী আসতাছে! ও রে মা!”
আমি আব্বাকে জাবড়ে ধরতে ধরতে দেখি, পেশাবের রাস্তা দিয়ে পূঁজ বেরিয়ে আসছে। কোনোরকম একটুখানি কিছু না। বেরিয়ে আসছে পূঁজের নহর। সরু থিকথিকে ধারা! বেরিয়ে আসছে যে আসছেই।
বেলা যেতে থাকে, আমি পূঁজ মুছতেই থাকি। মুছলে কিছুক্ষণ শুকনা থাকে। তারপর আবার আসতে থাকে ধারা। মুছতে থাকি, শুকাতে থাকি, আবার আসতে থাকে।
“ওমা! মা! এমনে হইবো না মা! তুমি আমার পেশাবের রাস্তায় ফেটি বাইন্ধা দেও! তেনা ভিজতে টাইম লাগবো। তুমি তো ততখোন একটু জিরাইতে পারবা!”
‘বান্ধলে আপনের ব্যথা লাগে যুদি, আব্বা?’
“নরম কাপড় যুদি জোগাড় করতা মা! আরাম পাইতাম!”
আমি আমার পুরানো সুতির শাড়ি ধুয়ে সাফসাফা করে, টুকরা টুকরা করি। ফেটি বাঁধি। সরাই। ধুই সেই তেনাগুলা। শুকাই, গুছাই।
তার মধ্যেই ফাঁকে ফাঁকে, আব্বার শরীর মোছানো আছে! তার জন্য জাউ রান্না করার বিষয়টাও আছে!
এমন যখন তুফান খারাপ আব্বার শরীর, তখন নূর হোসেন ভাই দেশে এসে খবর পাঠায়; সে এখন হেনারে তাদের বাড়িতে নিয়ে যাবে! বৌরে তো আর চিরকাল বাপের বাড়িতে ফেলে রাখা যায় না!
সরা-কাবিন তো করা আছে- সেই কোন আগের কালেই! এর মধ্যে বহু বছর আবার চলেও গেছে। কাজেই এখন আর কোনো অনুষ্ঠান করতে যাওয়াটা হবে -আজাইরা টাকা নষ্ট।
এদিকে মেয়ের বাপেরও তো যায় যায় অবস্থা। এইসব সকল দিক বিবেচনা করে, এখন কোনোরকমে কেবল, মেয়েরে তুলে নিয়ে যেতে চায় জামাই বাড়ির লোকে!
দাদাভাই আমারে জিজ্ঞেস করে, ‘কবে আসতে বলমু?’
“আব্বার অবস্থা দেখতাছস?” আমি জিজ্ঞেস করি, “এমন মানুষরে এক মিনিটের লেইগা একলা রাখোন যায়? তুই বোজস না কিছু?”
‘নাইলে-নাইলে-একটা নার্স ভাড়া করমু নে? আব্বার লেইগা একটা নার্স! সংসার তো করোন লাগবো তরে, বইন!’ দাদাভাই তোতলাতে থাকে।
“আব্বারে এমুন পানিতে ফালাইয়া দিয়া, আমি সংসার করতে যামু? এই চিনছস তুই তর বইনেরে? এইটা করোনের আগে নিজের গলা নিজে কাইট্টা ফালামু! তহন তুই বুজবি!”
‘আমারও মোনে সায় দেয় না! এই শালার পোয়ে, আঁতকার মিদে কইত্থেইক্কা আইসা, অখন সংসার দেখাইতাছে! কিন্তু কি কমু?’ দাদাভাইয়ের গলা দিশাহারা হয়ে যায়!
“কইয়া দে, এই বাড়ির দিগে একটা পাও যুদি বাড়ায়, তাইলে বটির কোপ খাইবো!”
তারপর বহু হুমকি ধামকি, মামলা মোকদ্দমার ভয়ডর দেখানো- চলতেই থাকে চলতেই থাকে। আত্মীয়-স্বজনদের চাপ আসতেই থাকে আসতেই থাকে!
দুই বাচ্চা নিয়ে বকুল ভাবী বাপের বাড়ি গিয়ে হুমকি পাঠায়। ‘যেই লোকের বইনের কারণে তার ভাইয়ের জীবন বরবাদ হইতে যাইতাছে, সেই লোকের ভাত খাওয়ারও কোনো ইচ্ছা বকুলির নাই!’
‘আমাগো বাপটায় তাইলে শান্তিতে মরতেও পারবো না?’ দাদাভাই আমার হাত ধরে কাঁদতে থাকে। ‘আয়, দুই ভাইবোনে একটা বুদ্ধি করি! আমি তর শত্রু পক্ষ। তর লগে আমি নাই আজকা থেকে। কিন্তু চিরদিন একলগে আছি দুই ভাইবোনে! বুঝলি?’
আলোকুমার, সেই থেকে দাদাভাই প্রকাশ্যে আমার অমিত্র!
ছোটো মুহুরী বাচ্চু মিয়া চুপে চুপে, কেমনে কেমনে কীসব কাগজ রেডি করে আনে। ডিভোর্স পেপার। দাদাভাই উঁচা গলায় ঘোষণা দিতে থাকে, সে ওইসবের কিচ্ছু জানে না!
এই তো আমরা- দুটা মাত্র ভাইবোন! এক বাড়িতে থাকি, কিন্তু এক হাড়িতে খাওয়ার ভাগ্য নাই।
আমার রান্না আমাকে করতে হয়। সেই খাবার আবার নিজের ঘরে তালা বন্ধ করে রাখতে হয়। খুব সাবধানে। নাইলে সেই খাবারে হারপিক মিশে যায়। নয়তো ডেটল মিশে যায়। নাইলে গুঁড়া সাবান মিশে যায়!
তবে, এখন বড়ো শান্তি পাচ্ছি! আলোকুমার! এখন আর নিজের জন্য কোনোরকম ভয় হচ্ছে না! প্রথমে যদিও ভয় পেয়েছিলাম! কিন্তু ক্রমে মন শক্ত করে নিতে পেরেছি! এখন বড়ো শান্তি!
“কেনো? কেনো শান্তি পাচ্ছেন?” আলোকুমার কান্নার মতো একরকম হাসি হাসতে হাসতে শুধায়।
‘মনে হচ্ছে, আমার ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে! আমার রক্তরা লাল আর সবুজ হয়ে গেছে! তার মানে পঁচে গেছে! প্রথম দিকে ভয়ানক যন্ত্রণা হচ্ছিলো। এখন কম। মানে আস্তে আস্তে মরে যাচ্ছি আর কী!’
“এমন মনে হচ্ছে?” আলোকুমার হা হা হেসে ওঠে!
কী জানি! ওদের দেশে মনে হয়, মরণ কোনো কষ্টের বিষয় না! সেই কারণে এমন দুঃখের কথা শুনে- এমন হাসি হাসতে পারে ওরা!
‘মরে যাওয়ার আগে আপনার সাথে দেখা হয়েছিলো, আলোকুমার! অনেক ভালো লাগছে!’ আমি বলি।
“ব্যস! ব্যস! এখন আমি বলবো! আপনি শুনবেন!” আলোকুমার আমাকে থামিয়ে দেয়।
এইবার তার কথা
“আপনার শরীরের এখনকার সকল যন্ত্রণার জন্য আমি দায়ী, হুসনা জাহান! কাজেই কোন কোন শাস্তি আমাকে দিলে, আপনার মন শীতল হবে-সেগুলো ভেবে রাখুন! আমি দ- ভোগ করতে প্রস্তুত আছি! খুবই প্রস্তুত করে রেখেছি নিজেকে!”
“তার আগে হুসনা জাহান, আমাকে বলুন; আপনি কদিন ধরে ধ্যান করছেন না কেনো? এটা ঠিক হচ্ছে না!” আলোকুমার একটু শাসনের সুর তোলে তার গলায়; “ধ্যানটা একদম নিয়ম ধরে, নিত্য না করে গেলে, আমাদের আবার দেখা হবার পথটা সুগম থাকবে না!”
‘মোরাকাবা?’ আমি চমকে উঠি তার কথা শুনে! ওই বিষয়টা তো আমার আব্বার দেয়া একটা আমানত! আমাদের বংশের বিষয় একটা! ওটার সাথে আমাদের দেখা হবার কী সম্পর্ক!
“ধ্যানের মধ্যে আপনি যখন থাকেন; আপনার মন তখন, মহাজগতের সকল কিছুর সাথে মিশে যায়! ধ্যান এটাই করে! মিলিয়ে-মিশিয়ে দেয়!” আলোকুমার বলে। “সেই দিন, যখন রাত্রির প্রথম প্রহরে আপনি- খোলা আকাশের নিচে ধ্যান করছিলেন; তখন আপনার ইচ্ছার সাথে মিশে গিয়েছিলো চরাচরের সকল বস্তু ও শক্তির সূক্ষ্ম ইচ্ছা কণা! সেই কারণেই আমার পাঠানো ইচ্ছা-রশ্মি এমন তেজালো ভাবে আপনার ভেতরে ঢুকে যেতে পেরেছিলো এবং হয়ে উঠতে চাচ্ছিলো আপনার রক্তকণিকা! কিন্তু কৃত্রিমভাবে তৈরি করা ইচ্ছারশ্মির সাধ্য নেই জীবন্ত রক্তকণার অংশ হয়ে ওঠে! সেই কারণেই আপনার শরীরে এতো যন্ত্রণা হচ্ছিলো! ওই ইচ্ছারশ্মি এই গ্রহের দিকে পাঠিয়েছিলাম আমি!”
‘কেনো? এমনটা কেনো করতে হয়েছে আপনাকে?’
“তার আগে বরং আমার ঠিকানাটা পরিষ্কার করে বলি আপনাকে! আমি যে গ্রহে বাস করি, তাকে আমরা ডাকি কয়েকটা সংখ্যা ধরে।”
“আজ কয়দিন ধরে সেই সংখ্যা গুলোকে শব্দে রূপান্তরিত করার একটা চেষ্টা চালাচ্ছিলাম আমি! আপনার জন্য। আপনি ডাকবেন বলে। অবশেষে আমি পেরেছি একটা চলনসই নাম দাঁড় করাতে। এখন ওকে ডাকা যেতে পারে- প্রক্সিমা ওয়ান নামে!”
“মনে থাকবে না নামটা?” আলোকুমার জিজ্ঞেস করে।
‘ওটা ভুলে গেলে, বেঁচে থাকতেও ভুলে যাবো আমি!’ এই কথা বলতে ইচ্ছা করে আমার! কিন্তু মুখে আটকে যায়! লজ্জা লাগে।
“আপনার পৃথিবী থেকে তিনশো কোটি আলোকবর্ষ দূরে, আমার গ্রহ! প্রক্সিমা ওয়ান! আমার যে গ্যালাক্সি, সেটা অবিকল আপনার গ্যালাক্সির মতো। অবিকল একই রকম! দেখলে মনে হবে যেনো দুই জমজ গ্যালাক্সি- তুমুল গতিতে ছুটছে। ছুটে বেড়াচ্ছে। দুইজন দুজনের কাছে আসবে বলে! এবং তারা একসময় কাছে আসেও!”
“আমার গ্যালাক্সিকে আপনি সান ফ্লাওয়ার গ্যালাক্সি বলে ডাকতে পারেন, হুসনা জাহান!”
‘এটাও কি আপনার বানানো নতুন এক নাম?’ আমি বলি!
“নিশ্চয়ই! আপনার জন্য!”
“তবে দেখতে একদম একরকম হলে কী হবে, এই দুই গ্যালাক্সির স্বভাবে কোনো মিল নেই। এরা স্বভাবে একদম ভিন্ন! আপনার মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির আছে, কোটি কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্র এবং আরো বহু কিছু।”
“ওদিকে, সান ফ্লাওয়ার গ্যালাক্সি যেনো এমন নিযুত-কোটি গ্রহ-নক্ষত্র পাবার ভাগ্য করে আসেনি! এর প্রায় পুরোটা জুড়ে আছে গ্যাস! অবর্ণনীয় বাহারী সেই সব গ্যাস।”
“তারা নানারকমে ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া করে করে, যখন তখনই অযুত অযুত শিশু নক্ষত্র জন্ম দিচ্ছে। কিন্তু জন্ম নেয়ার পর পরই সেসকল শিশু নক্ষত্র মারা যাচ্ছে। অতি অকালেই তারা মারা যাচ্ছে। কেউই দীর্ঘজীবী হচ্ছে না! কখনোই না! এমনটাই হয়ে চলছে ওইখানে, চিরকাল ধরে।”
“তার মধ্যেই কেমন করে একটা বিস্ময়কর ব্যতিক্রমও ঘটতে দেখা গেছে!”
“ব্যতিক্রমটা হচ্ছে, এই গ্যালাক্সিরই একটা বাহুর ভেতরের দিকে জন্ম নেয়া একটি নক্ষত্র কোন এক কারণে দীর্ঘজীবী হয়ে ওঠে। সেই নক্ষত্রটি আপনার সূর্যের চেয়ে কোটি কোটি গুণ তরুণ, হুসনা জাহান! সে কালে কালে একটি গ্রহকেও পেয়ে যায়! সেই গ্রহটাই আমাদের প্রক্সিমা ওয়ান।”
“অযুত নিযুত শিশু নক্ষত্র যেখানে জন্মের পর পরই মরে যাচ্ছে; সেখানে কেমন করে এই ব্যতিক্রমটা সম্ভব হয়, আমরা এখনও সেটা খুঁজে বার করতে পারিনি। কেমন করে কেবল একটা নক্ষত্র এবং একটি গ্রহই টিকে যেতে পারে, সেটা এখনও ব্যাখ্যাতীত। আমাদের অতি অগ্রসর বিজ্ঞান সেটাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হয়নি এখনও!”
“আমাদের জানা আছে; সত্তর লক্ষ বছরে একবার, মহাশূন্যে, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি আর সানফ্লাওয়ার গ্যালাক্সি- একদম সমান্তরাল হয়ে ওঠে।”
“সেই সময় আরো একটা ইনটারেস্টিং ঘটনাও ঘটে, হুসনা জাহান! মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির যেই বাহুর দিকে আপনার এই সৌরম-ল, সেই সৌরম-লটিও তখন আমার সৌরম-লের সমান্তরাল হয়ে যায়।”
“আমরা বহুকাল হয়, ওই সমান্তরাল হয়ে ওঠার ঘটনাটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। পৃথিবী নামের গ্রহটাতে প্রাণ আছে। আমাদের কাছে তথ্য্ ছিলো।”
“কিন্তু ওইসব প্রাণের বিষয়ে, আসলে বলতে চাচ্ছি বুদ্ধিমান প্রাণীদের বিষয়ে, আমাদের আগ্রহ এখন আর কিছুমাত্র নেই! আছে ওরা ওদের মতো। আমরা আছি আমাদের মতো।”
“বুদ্ধিবৃত্তি কী চিন্তার অগ্রসরতার এলাকায়- এরা এখনও আমাদের চেয়ে পিছিয়ে আছে। শোচনীয় রকম পিছিয়ে থাকা এরা! একটু এগিয়ে, অনেকখানি পিছিয়ে যাবার ঝোঁকসম্পন্ন- এইসব প্রাণীর বিষয়ে ভাবনা করার অবকাশ আমাদের এখন মোটেও নেই। আমাদের কিছুমাত্র আগ্রহ নেই, পৃথিবী গ্রহের অই বুদ্ধিমান প্রাণীদের বিষয়ে।”
“তবে বলে রাখি; আমাদের মহাকাশ গবেষণার প্রথম পর্যায়ে এই বিষয়ে-এই গ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীদের বিষয়ে- পর্যাপ্ত কৌতূহল ছিলো! এই নিয়ে বিস্তর গবেষণাও সম্পন্ন করে গেছে আমাদের পূর্ববর্তীরা।”
“সেটাও হয়েছে বহু বহু আগে। আপনাদের হিসাবে প্রায় বহু সহস্র বছর আগের ব্যাপার সেটা! এখন আর ওটি নিয়ে কোনো গবেষণার আগ্রহ নেই। কারোরই নেই।”
“এখন আমরা কৌতূহলী হয়ে উঠেছি অন্য বিষয়ে। আমাদের সকল আগ্রহ এখন কেন্দ্রীভূত শুধুÑ একটা জটিল শক্তির বিষয়ে। সেটার নাম- ইচ্ছাশক্তি। ইচ্ছাশক্তির ভর ও তীব্রতার গতি-প্রকৃতি বিষয়ে মীমাংসিত হতে চাই আমরা। ওই নিয়েই গবেষণারত এখন প্রক্সিমা ওয়ান গ্রহের সকল বিজ্ঞানী!”
“আমি-আমি সেই গবেষণা প্রকল্পের প্রধান বিজ্ঞানী!”
“আমাদের অতি পুরোনো এক বিজ্ঞান বইয়ে পাওয়া একটি সূত্রের ভিত্তিতে আমি পৃথিবী গ্রহটির ব্যাপারে অতি উৎসাহী হয়ে উঠি।”
“কি ছিলো সেই বইয়ে?”
“সেই বইয়ে বলা ছিলো, আমাদের গ্যালাক্সির অবিকল জমজের মতো দেখতে অই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিটির পৃথিবী নামের গ্রহটি শুধু উন্নত বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন প্রাণীর জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়! ওই গ্রহটি ইচ্ছাশক্তির ক্রিয়া ও বিক্রিয়ার উচ্চ নিদর্শন ধারণ করে আছে বলেও অতি গুরুত্বপূর্ণ!”
“মহাবিশ্বের অন্য কোথাও ইচ্ছাশক্তির ক্রিয়া ও বিক্রিয়ার এমন অগাধ নিদর্শন পাওয়া সম্ভব নয়।”
“আমি জানতাম, কবে কখন এই দুই গ্যালাক্সি সমান্তরাল হতে যাচ্ছে।”
“পৃথিবী গ্রহটি থেকে ইচ্ছাশক্তি বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত ও নমুনা সংগ্রেহর জন্য যতো রকমের ইচ্ছা-রশ্মি পাঠানো প্রয়োজন হতে পারে, সবই প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিলো বহু বহু দিন ধরে।”
“তারপর ছিলো শুধু সেই সমান্তরাল হবার ক্ষণটার জন্য অপেক্ষা!”
“শেষে একসময় আসে সেই ভীষণ প্রতীক্ষিত সময়টা! দুই গ্যালাক্সি সমান্তরাল হয়ে ওঠে। মনিটরে ধীরে ধীরে, পৃথিবীকেও তার সৌরম-লসহ প্রক্সিমা ওয়ানের সমান্তরাল ও নিকট হতে দেখি আমি।”
“তখন কিছুমাত্র বিলম্ব না করে আমি ইচ্ছারশ্মি পাঠিয়ে দেই, পৃথিবীর দিকে।”
“কিছুক্ষণের ভেতরেই মনিটরে দেখা দিতে থাকে নানা তথ্য। এবং বিবিধ উপাত্ত! আমি সফল হবার গৌরবে বিস্ফারিত হবার অবস্থায় পৌঁছে যাই প্রায়!”
“আমি ধরে নিই, আমার ওই প্রজেক্টের সব কিছুই অত্যন্ত নিঁখুত রকমে সম্পন্ন হবে। কারণ, আমার প্রেরিত রশ্মিরা নির্ভুল রকমে কাজ করে চলছিলো। কোথাও কিছুমাত্র গড়বড় দেখা দেয়নি। গড়বড় দেখা দেয়ার কোনো লক্ষণও শনাক্ত করা যায়নি!”
“আমি বুঝতে পারি, আমি সফল হতে যাচ্ছি! কেননা ইচ্ছাশক্তির গতি-প্রকৃতি বিষয়ে সাম্প্রতিক কোনো গবেষণা – এমন শতভাগ সাফল্য- এর আগে কোনোদিন লাভ করেনি!”
“গরিমার একটা রশ্মি আমাকে জানান না দিয়েই, আমার ভেতর থেকে ছিটকে ছিটকে বেরিয়ে আসতে থাকে। নিজেকে কেমন একটু সুখী একটু ক্লান্তও লাগতে থাকে। মনে মনে ঠিক করি, এই গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলটা নিখুঁত রকমে গুছিয়ে-আমি ইচ্ছা-নিদ্রায় চলে যাবো এবার। অন্তত পৃথিবীর হিসাবে-এক হাজার বছরের জন্য ইচ্ছা-নিদ্রায় যাবো। সেটাই আমাদের ওখানে ইচ্ছা-নিদ্রা নেবার সবচেয়ে কম সময়।”
“প্রক্সিমা ওয়ানের আমাদের জীবনে- আপনাদের মতো- মৃত্যুর কামড়টা এসে লাগে না। আমাদের মৃত্যু নেই। জন্মও নেই আপনাদের মতো। আমাদের আছে ইচ্ছানিদ্রা। আমরা দীর্ঘদিন কাজ করি। তারপর যখন ইচ্ছা হয়-ইচ্ছানিদ্রা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেই। কেউ কেউ নেয় আপনাদের হিসাবের এক হাজার বছরের ইচ্ছানিদ্রা। কেউ কেউ হয়তো নেয় লক্ষ বছরের।”
“ইচ্ছা নিদ্রার ওই সময় শেষে, আবার জেগে উঠি আমরা। আলোয় গড়া শরীরটাকে মেরামত করি। জীবন-চক্র আবার শুরু হয়ে যায়; অন্তত এক হাজার বছরের জন্য।”
“যাক! সে কথা। আমরা জানি; দুটি গ্যালাক্সির সমান্তরাল থাকার সময়টা খুব বেশী নয়! ওটা হচ্ছে-পৃথিবীর হিসাবে মাত্র একশো ঘণ্টা।”
“তবে যে গতিতে আমার যন্ত্রে পৃথিবী থেকে আসা উপাত্ত জমা হতে থাকে; তাতে আমি নিশ্চিত হয়ে যাই যে, এ যাত্রা আমার পুরো একশো ঘণ্টা ব্যবহার করার প্রয়োজন হবেই না। বড়ো জোর চব্বিশ ঘণ্টা লাগলেও লাগতে পারে!”
“এমন যখন খুবই আত্মবিশ্বাসী আমি এবং সাফল্যের সুখে খানিকটা অন্যমনস্কও আমি; তখন আচমকাই আমার মনিটরে কিছু কিম্ভূত রেখা দেখা দিতে থাকে! একটা কেমন কিম্ভূত শব্দও শুনতে পেতে থাকি আমি! এমন বিকট শব্দ্ কেনো করে উঠবে আমার যন্ত্র?”
“আমি কারণ খুঁজে বের করার জন্য- দ্রুত কাজ শুরু করি। এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বুঝে উঠতে পারি, একটা মস্ত গোলমাল হয়ে গেছে।”
“আমি ইচ্ছারশ্মি পাঠিয়েছিলাম পৃথিবীর বস্তুরাশি থেকে উপাত্ত সংগ্রহ করতে। বুদ্ধিমান প্রাণীরা আমার লক্ষ্য ছিলো না মোটেও। কিন্তু ঘটনাচক্রে আপনি আক্রান্ত হয়ে পড়েন তখন, হুসনা জাহান!”
“কেন না আপনি তখন ধ্যানে ছিলেন। ওই যে বলেছিলাম তখন, সেই কথাটা এখন আবার বলি!”
“সেই সময়ে আপনার ইচ্ছাশক্তি – চরাচরের সকল বস্তু ও শক্তির সূক্ষ্ম ইচ্ছাকণার সাথে একাকার হয়ে গিয়েছিলো! সেই কারণেই আমার পাঠানো রশ্মি- এমন তেজালোভাবে আপনার ভেতরে ঢুকে যেতে পেরেছিলো। এবং আপনার রক্ত কণিকা থেকে উপাত্ত সংগ্রহের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলো!”
“প্রক্সিমা ওয়ানে আমার গবেষণা কক্ষে বসে বিষয়টা অনুধাবন করে আমি মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যাই। এ কী সর্বনাশ ঘটেছে! আমি কী করবো এখন! বিষয়টাকে ইগনোর করার তো প্রশ্নই আসে না। আমি কী করবো তবে এখন! আতঙ্কের সবুজ কম্পন আমাকে একটামাত্র ধাক্কা দেয়! আমি বুঝতে পারি, আমাকে-আমাকেই অনতিবিলম্বে রওয়ানা দিতে হবে পৃথিবীর দিকে। মানুষটাকে নিরাময় দিতে হবে। যতোটা দ্রুত সম্ভব, তাকে সারিয়ে তুলতে হবে।”
“তার আগে এই দীর্ঘযাত্রার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবার ব্যাপারটাও তো আছে! সেই আয়োজন সম্পন্ন করতে করতে, পলকে পলকে, উদ্বেগে, আমি স্তম্ভিত হয়ে যেতে থাকি। মনুষ্যদেহ যে অতি ভঙ্গুর উপাদানে গঠিত-সে তথ্য তো আমার জানা!”
“আমার কারণে যার দেহ এই দুর্গতি ভোগ করতে বাধ্য হচ্ছে, আমি গিয়ে পৌঁছুতে পৌঁছুতে সে বেঁচে থাকতে পারবে তো! মানব দেহের জন্য তো ওই ত্বরিৎ-চুম্বক রশ্মি অতি ক্ষতিকর। অতি ভয়াবহ। আমি পারবো তো তাকে রক্ষা করতে!”
“তারপরের সবকিছু তো আপনার জানা, হুসনা জাহান!”
‘কিচ্ছু জানি না!’ আমি তার কথা একেবারে উড়িয়ে দেই। ‘কখন জানলাম?’
“আপনার জানালা দিয়ে ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টি পাঠিয়েছিলাম! সেই ভোর রাতে, মনে পড়ে?” আলোকুমার বলে।
‘এখন বুঝতে পারছি, কেনো সেই বৃষ্টি আমার জানালা দিয়ে ঢুকে অমন তীব্র হয়ে আমাকে ভেজাচ্ছিলো! ওর সাথে আপনার উদ্বেগ মেশানো ছিলো বলেই তো? তেমন বৃষ্টি আর কী কখনো আসবে, আমার জন্য?’ আমি হাসতে থাকি।
আলোকুমার সে কথার কোনো উত্তর করে না। বরং অন্য কথা বলে।
“চৌদ্দই এপ্রিলের ভোরবেলার বাঁকা-তেরা বৃষ্টির কথা কি মনে আসে? আপনার রক্তের সাথে মিশে যেতে চাওয়া ত্বরিৎ-চুম্বক তরঙ্গদের নিস্তেজ করে দেয়ার জন্য, ওই নিরাময় তরঙ্গ পাঠিয়ে চলছিলাম আমি! তারপর একশো পঁচিশটা গোলাপের রূপ দিয়ে পাঠায়েছিলাম যন্ত্রণানাশক তরঙ্গ। নদীজল থেকে পাঠানো সাদা বেলীফুল তেমনই আরেক যাতনামুক্তির তরঙ্গ ছিলো! কিন্তু কী কা-! কোনোটাই যথার্থ নিরাময় এনে দিতে পারছিলো না!”
“ভেবেছিলাম ওভাবেই যদি আপনাকে সারিয়ে তোলা সম্ভব হয়, তাহলে আড়াল থেকেই কাজটা শেষ করে-আমি ফিরে যাবো! কিন্তু সেটা আর শেষে হলো কই! নিরাময় দেবার সব উদ্যোগই দেখলাম আংশিক সফল হচ্ছে! সম্পূর্ণ নয়। তখন সামনে না এসে উপায় কী!”
“যন্ত্র দিয়ে যখন আপনাকে সারিয়ে তোলার চেষ্টাটা বিফল হলো; তখন আমি বুঝতে পারি, আপনার ভেতরে লেপ্টে যাওয়া রশ্মিগুলোÑতরঙ্গগুলো- শুষে নিতে হবে আমাকেই। আমার শরীর দিয়েই।”
“ইছামতীর ভাঙা ঘাটে আমাকে অমন এলিয়ে যেতে দেখে আপনি বিরক্ত হয়েছিলেন। আমার হাতের ঘড়িটাকে খুব নাড়তে চাড়তে দেখেও আপনার বিরক্তি লেগেছিলো। কিন্তু কী করে বোঝাই তখন আপনাকে, ওটা ঘড়ি নয়।”
“ওটা দিয়ে আমি তখন শুষে নিচ্ছিলাম আপনার রক্তে জড়িয়ে যাওয়া বিষ। তারপর সেই বিষ জমা করছিলাম আমার দেহে।”
“অমনটা করতে গিয়েই আমি ভালোমতো বুঝে উঠতে পারি, কেনো আপনাকে সারিয়ে তোলাটা এমন কঠিন হয়ে উঠেছিলো! কেনো এমন ব্যর্র্থ হচ্ছিলাম বারে বারে!”
“আপনার অন্তরে তো আপনিই স্বয়ং জমিয়ে রেখেছেন মহাবিষ। কতো কতো বিষ! লাঞ্ছনা ও দুর্গতি সহ্য করে যাবার বিষ! নিত্য মৌনমুখে অসম্মানকে মেনে নেয়ার বিষ! অকারণে নিজেকে বঞ্চনা করে চলার বিষ! এতো এতো বিষ কেমন করে বহন করে চলতে পারে একজন! এ তো ভয়াবহ ব্যাপার! এভাবে তো চলতে পারে না!”
“হুসনা জাহান! আপনার ভেতরের অবস্থাটা দেখে-বুঝে আমি আমার ভেতরে কালচে-খয়েরা রঙের এক কম্পনকে গর্জে যেতে দেখি! ক্ষণে ক্ষণে গর্জে যেতে দেখি! আপনার পৃথিবীতে তেমন কম্পনকে ক্রোধ নামে ডাকা হয়ে থাকে! শুনছেন হুসনা জাহান?”
‘তারপর?’ জিজ্ঞেস করতে গিয়ে আমার গলাটা কেনো যেনো ভেঙে আসতে থাকে।
“তারপর আর কী”, সে বলে ওঠে, “আমি বুঝতে পারি আমার মধ্যে একটা অন্য আমি কাঠামো নিতে যাচ্ছি! বুঝতে পারি, এইভাবে এমন অগাধ অসহায়তার মধ্যে ফেলে রেখে যেতে পারি না আমি- আপনাকে! তবে সবকিছুর আগে আপনার অন্তরের ভেতরে থলথলাতে থাকা বিষগুলো শুষে নিতে হবে আমাকে! শরীরে ঢুকে যাওয়া কৃত্রিম বিষ-রশ্মি সরিয়েই আমার কাজ শেষ হবে না! আরো যতো বিষ আপনি জমা করেছেন, সেগুলাও সরাতে হবে! তবেই আমার ছুটি মিলবে! তার আগে তো কিছুতেই নয়!”
“আপনাকে এমন বিষ জর্জর রেখে যাবো এইখানে, আমিও? সেটা কখনো হতে পারে, হুসনা জাহান? কখনোই হতে পারে না! কিছুতেই পারে না।”
আলোকুমার কথা বলা বন্ধ করে।
আমি তো জানি তার ওই শেষের কথাগুলার কী মানে হয়! সেই মানেটা শুধু আমার মনই জানুক। মুখে তারে না আনি? কোনোদিন না আনি?
মুখ তবে অন্য কথা বলুক এখন।
‘আপনার রকেটটা কই রেখেছেন, আলোকুমার?’ আমার মুখ এই কথা বলে ওঠে।
“গ্যালাক্সি থেকে গ্যালাক্সিতে আসতে যেতে নভোযান কেনো লাগবে? ওটা তো আদিম একটা ধারণা! এক সময় বিশ্বাস করা হতো, নভোযান ছাড়া মহাশূন্যে চলাচল অসম্ভব! কিন্তু সেই আদিম প্রযুক্তি নির্ভরতার কাল- এক কোটি বছর আগে আমরা পেরিয়ে এসেছি।”
“আমি এসেছি মনপবনের নাওয়ে ভেসে। ইচ্ছাতরঙ্গে চেপে। আপনাদের প্রাচীন অনেক গ্রন্থে আমি এইবার, এই মনপবনের নাওয়ের রেফারেন্স দেখতে পেয়েছি! আপনাদের প্রপিতামহেরা সম্ভবত এর ব্যবহার জানতেন! কী ভাগ্যবান আপনারা, হুসনা জাহান!”
‘আমরা শুধু এইসব কথাই বলবো?’ আমি জিজ্ঞেস করি।
“না। এসব ছিলো কেবলই ভূমিকা! আসল কথাটা বলার ভূমিকা এইগুলো!”
‘বলবেন?’
“মনুষ্য দেহ ধারণ করে – আপনার সামনে এসে দাঁড়াবার পর থেকে- এই এখন পর্যন্ত, আমি গূঢ় একটা কম্পন পেয়ে যাচ্ছি আমার ভেতরে। এই কম্পনটা অন্য কোনো কম্পনের মতো নয়। কিছুমাত্র মিল নেই এরÑঅন্য কম্পনগুলোর সাথে!”
“হুসনা জাহান! কেমন একটা অচেনা রকমের কাঁপন জাগে আমারÑআপনার সামনে এলেই! এ কম্পনের একটা বিশেষ কোনো রঙ নেই! আমি বলতে পারি না এর রঙ লাল বা গাঢ় হলুদ! বরং থেকে থেকে যেনো মনে হতে থাকে – এটি আপনাদের আকাশে দেখা দেওয়া রঙধনুর মতো! সপ্তবর্ণা। রঙে রঙে থই থই করতে থাকে আমার ভেতরটা! আপনার সামনে এলেই! হুসনা জাহান! এই রঙ আপনি সৃজন করেছেন! আমার ভেতরে এটা আসলে আপনি! কেমন করে এটা হলো! আমি এখনো বুঝে উঠতে পারছি না!”
“আবার যেনো শুধু রঙই নয়। এই কম্পনের ভেতরে আরো কিছু যেনো আছে! এটা যেনো খানিকটা আপনাদের পাখির ডাকের সাথে ছড়িয়ে পড়া কম্পনের মতো! খানিকটা যেনো ফুলের ফুটে ওঠার সময়কার কম্পনের মতো লাগে একে! আপনাদের পৃথিবীতে একে কী বলে ডাকে-সেটা ধরতে পারছি না আমি কিছুতেই! পারছি না! এইই হচ্ছে আসল কথাটা! এটা আসলে একটা সমস্যা!” আলোকুমার খুব গম্ভীর গলায় তথ্যটা জানায়।
কিন্তু তার চোখ, তার ঠোঁটের ভাজ খুব স্পষ্ট করেই জানানি দিতে থাকে যে, সে জানে এই কম্পনটার নাম। পরিষ্কার রকমে জানে! কিন্তু আমাকে বলবে না বলেই মন স্থির করেছে সে!
কেনো?
এই যে কথাটা সে গোপন করছে, এইটা বুঝতে পেরে- আমার মনই বা কেনো এমন টনটন করছে?
কেনো মনে হচ্ছে – এখন ওকে একটু জড়িয়ে ধরি। একটু ওর কাঁধে মাথা রাখি? কোনো অধিকার তো নাই আমার এসব করার! তবুও কী যে ইচ্ছা করছে!
আলোকুমার, জানতেন যদি আপনিÑআমার এই পাগল পাগল ইচ্ছাটার কথা!
১৮ এপ্রিল ১৯৯৫
রাত ঘন হয়ে আসছে। আমি জেগে আছি।
ঘুম আসতো যদি! একটু কি ভুলতে পারতাম তাকে? একটুখানি ভুলতে পারলে কি ভালো লাগতো? কী জানি!
শুধু থেকে থেকে মনে আসছে তার মুখ। সে মুখের অর্ধেকটা মানুষের মুখ। অর্ধেকটা বিদ্যুতের ঝিকিমিকি। চলে যাবার আগে সে এইভাবে এসে দাঁড়ায়েছিলো, আমার সামনে! একদম এইভাবে!
সামনে এসে, সেই পুরোনো কথাটাই নতুন করে জিজ্ঞেস করেছিলো; “আমি কি ভয় পাইয়ে দিলাম আপনাকে?”
আমি কলকল হেসে উঠে, ছুটে গিয়েছিলাম তার বিদ্যুৎ মুখে একটুখানি হাত ছোঁয়াতে! সে তড়িঘড়ি সরে গিয়েছিলো দূরে। আর বলেছিলো, “আমাকে এমন যখন-তখন ছোঁয়া যায় না। ছোঁয়া যায় না! মনুষ্য স্পর্শের অতীত আমি! শুধু বিশেষ একভাবে, বিশেষ নিয়ম ধরে আমাকে ছোঁয়া যাবে! একবারের জন্য শুধু! অথচ যখন-তখন, একটুখানি করে করে, আপনার স্পর্শ পাবার জন্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছি আমি, প্রিয় হুসনা জাহান!”
আমি তার সরে যাওয়া দেখে রাগ করবো কী! সম্বোধন শুনেই যে বিবশ হয়ে আসে আমার শরীর আর মন! এমন করে ডাকা যায় নাকি? শুধু অমন ডাক দিয়েই পৃথিবী কাঁপিয়ে দেয়া যায়?
যায় তো! এই যে আমার পৃথিবী কাঁপিয়ে দিয়েছে সে!
তারপর চলে গেছে।
আজ রাতের প্রথম প্রহরে চলে গেছে আলোকুমার।
ফিরে গেছে তার নিজের দেশে। যেই দেশের নাম প্রক্সিমা ওয়ান! যেই দেশে যেতে হলে মনপবনের নাও লাগে! আমার তো অমন কোনো নাও নাই! আমার কোনো মনপবনের নাও নাই!
কোনোদিন যাওয়া হবে না আমার, সেই দেশে!
কিন্তু তার তো আছে সেই নাও। সে কি শিগগির আবার আসতে পারে না? আসতে পারে না?
সে বলে গেছে, শিগগির আসবে! সেই শিগগিরটা কবে? কবে?
কবে?
আজকে সন্ধ্যায় দুজনের দেখা হওয়ার কথা, সেই প্রথম দেখা হবার জায়গায়! সেই আমাদের ছাদে!
আমি ছাদে গিয়ে দেখি, আমার আগেই সে এসে দাঁড়ায়ে আছে। দেখে আমার খুশী লাগতে থাকে। কিন্তু তার মুখ কেনো উদাসী উদাসী দেখায়!
“হুসনা জাহান! প্রিয় হুসনা জাহান! যখন এসেছিলাম, তখন জানা ছিলো না-আমার এই জীবনটা- এমন অচেনা আলোয় ভরে উঠবে! এতো এতো আলো-আমারও পাওয়ার বাকি ছিলো-আমি জানতাম না! কিছুমাত্র জানতাম না!”
‘আলোকুমার, কি হয়েছে?’
“আমার ফিরে যাবার সময় হয়ে গেছে!”
‘ফিরে যাওয়া মানে?’ আমি থইহারা হতে হতে বলি!
“দুটো গ্যালাক্সি সমান্তরাল থাকে মাত্র একশো ঘণ্টা! বলেছিলাম মনে আছে?”
‘কিছুই কি ভুলেছি আমি? কিচ্ছু ভুলি নাই!’ আমি জানাই।
“সেই সময়টা ফুরিয়ে আসছে দ্রুত! ওরা সমান্তরাল থাকতে থাকতেই আমাকে প্রক্সিমা ওয়ানে পৌঁছুতে হবে! নয়তো আমার ফেরার পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে!”
‘মনপবনের নাও না আছে বলেছেন? তাহলে কেনো রুদ্ধ হবে ফেরার পথ? আর, রুদ্ধ হলে হবে। আপনি পৃথিবীতে থাকবেন! আমি-আমি তো আছি। আপনার অসুবিধা হবে কেনো!’ আমি তাকে বুঝ দিতে চাই।
“আহ! সেটা যদি করতে পারতাম! যদি থেকে যেতে পারতাম আপনার এখানে, আপনার পাশে! হতো যদি সেটা!” তার গলা হাহাকার করে ওঠে, “কিন্তু পৃথিবীর পরিম-লে দীর্ঘসময় বাস করার কোনো প্রস্তুতি তো নিয়ে আসতে পারিনি আমি! এখন, সেই প্রস্তুতিহীন অবস্থায় যদি আমাকে এখানে থাকতে হয়, আরো দীর্ঘসময়ের জন্য যদি থাকতে হয়; তাহলে নিজেকে ক্ষইয়ে ফেলতে হবে আমাকে। ক্রমে নিভিয়ে ফেলতে হবে আমাকে! সেটা আমি পারবো না হুসনা জাহান!”
“আমাকে চির না-নিভন্ত থাকতে হবে! আপনার জন্য হুসনা জাহান! আপনার পাশে থাকার জন্যই এমন না-নিভন্ত থাকতে হবে যে আমাকে!”
‘মনপবনের নাও তো আছে? তাহলে ফিরে যাওয়া নিয়ে চিন্তা কেনো!’ আমি তাকে অভয় দিতে থাকি।
“মনপবনের নাও আছে, সেটা ঠিক। কিন্তু আমার জটিলতার কোনো শেষ নেই, প্রিয়। এই যে আমার মনপবনের নাও, এটা শুধু ব্যবহার করা যাবে, দুই গ্যালাক্সির এই সমান্তরাল থাকার সময়ের দূরত্বটুকু পার হওয়ার জন্য। একশো ঘণ্টা পরে দূরত্ব বেড়ে যাবে বহুগুণ! সেটা সামাল দেবার মতো পোক্ত নয় আমার এখনকার মনপবনের নাও! তখন প্রক্সিমা ওয়ানে ফিরে যাবার আশা করাটা হবে দুরাশা মাত্র। অতো পথ পাড়ি দেবার প্রস্তুতি নিয়ে তো আসি নি! হায়! আমি কী জানতাম, এমন অভাবিত কম্পন- শেকলে বাঁধা পড়ে যেত হবে? আমি কী জানতাম!”
‘তাহলে বেশ তো! আপনি যাত্রা শুরু করুন!’ আমি ধীর কণ্ঠে তাকে পরামর্শ দেই!
এই তো ভেতরে, আমার মন- কতোভাবে ডাকা শুরু করেছে তাকে। পাগল গলায় ডাকছে! আমাকে নিয়ে যেতে পারেন আপনার সাথে, আলোকুমার? আপনি না থাকতে পারলে সমস্যা কী! আমিই বরং চলে যাই আপনার সাথে? নেবেন আমাকে?
কিন্তু সেই ডাক আমি মোটেও বাইরে আসতে দেবো না! একদম দেবো না! যে যাবার সে চলে যাক! আমার কী! আমার কিচ্ছু হবে না। কোনো কষ্ট হবে না কারো জন্য!
আমি চুপ করে দাঁড়ায়ে থাকি। দাঁড়ায়ে থাকা ছাড়াÑ আমার আর কী করার আছে। যে যাবার সে যাক। যাক!
সেও কেনো অমন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এমন ক্লিষ্ট দেখায় কেনো তার মুখ? যাবেই যদি, তাহলে দেরী করে ফায়দা কী!
“আমার একটা বাসনা ছিলো, হুসনা জাহান!” অকস্মাৎই আমার সামনে এসে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে আলোকুমার। “বাসনা ছিলোÑ ওই দুই হাতে- এই মুখটাকে গুঁজে রাখবো একটুক্ষণ! দেবেন রাখতে? একটুখানি?”
‘কিন্তু ওই যে তখন বললেন, মনুষ্য স্পর্শের অতীত আপনি? অই যে বললেন, আপনাকে যখন-তখন কিছুতেই ছুঁতে নেই? তাহলে কেমন করে-কেমন করে- আমার এই দুই হাত আপনাকে ছোঁবে, আলোকুমার? কেমন করে?’
আমার শরীর দাউদাউ জ্বলে উঠতে উঠতে- কোনো প্রকারে -এই শব্দকয়টা উচ্চারণ করে!
“তার জন্য আমাকেই আমার বদলে নিতে হবে প্রিয় হুসনা জাহান! সেই বদলে যাওয়া আমি আর এমন দেহ-কাঠামোধারী থাকবো না! হয়ে যাবো অন্য কিছু! তবু-তবুও আজ আমি চাইÑ ওই দুই হাতের স্পর্শ! একবার শুধু চাই! প্রক্সিমা ওয়ানে হাজার হাজার বছর বেঁচে দেখেছি তো! এবার একবার শুধু ভেঙে গুঁড়িয়ে ছড়িয়ে মরে যেতে চাই! আপনার জন্য! তারপর আবার আমি কাঠামো নেবো! আমি শিগগির ফিরে আসবো!”
এই তো আমার দু হাতের পাতা! সেইখানে কেউ যদি তার ক্লিষ্ট মুখটাকে গুঁজে দিতে চায়, দিক! না দিলে না দিক!
কেউ না জানুক, এই পোড়া হাতের পাতারা তো জানে; ওই একই সাধ নিয়ে তারাও কেমন দগ্ধ হচ্ছে! ক্ষণে ক্ষণে দগ্ধ হচ্ছে!
“আমি শিগগির ফিরে আসবো! আমার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে! খুব ঘন খুব কান্না-মাখানো অপেক্ষা! মনে থাকবে তো?” বলতে বলতে আমার অপেক্ষা করতে থাকা দুহাতের পাতায়- নিজের মুখটা গুঁজে দেয় আলোকুমার!
আমার হাতেরা উতলা অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিলো মনুষ্যমুখের পরশ পাবার জন্য। কিন্তু তার বদলে তারা পায় খানিকটা আগুনের স্পর্শ।
খানিকটা পায় ঝুরঝুরে মাটির ছোঁয়া!
খানিকটা পায় পানির ছলাৎ ছল!
ফিনফিনে বাতাসের একটু স্পর্শও পায়।
তার সঙ্গে পায় আকাশের শূন্যতার একটা হিম ঝাপটা!
সেইসব কিছু ক্রমে, ধীরে ধীরে, ঢুকে যেতে থাকে আমার শরীরের ভেতরে।
আমি- আমি- বুঝতে পারি, আমার ভেতরের আমিটার সাথে মিশে যাচ্ছে ওরা! আমি হয়ে উঠছি অন্য আরেক আমি! অন্য একজন!
‘আলোকুমার!’ আমার অন্তরাত্মা ডুকরে ওঠে; ‘ফিরে এসো!’

পেশায় শিক্ষক আকিমুন রহমান জন্মগ্রহণ করেছেন ১৪ জানুয়ারি ১৯৬০ সালে, নারায়ণগঞ্জে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি সম্পন্ন করেছেন স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘদিন। এরপর কাটিয়েছেন প্রবাসজীবন। আকিমুন রহমানের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : পুরুষের পৃথিবীতে এক মেয়ে (১৯৯৭), এইসব নিভৃত কুহক (২০০০), বিবি থেকে বেগম (১৯৯৬) প্রভৃতি।