গীতরঙ্গ: রবীন্দ্র সঙ্গীতের স্বাতন্ত্র্য । সুধীর চক্রবর্তী
(ধৈবত – এর ৪০ তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত “রবীন্দ্রসংগীত কর্মশালা”- এ দেওয়া বক্তৃতা “রবীন্দ্র সঙ্গীতের স্বাতন্ত্র্য” – এর অনুলিখন। ধৈবত -এর অনুমতিক্রমে প্রকাশিত। )

আমি এক্ষুনি একটা শব্দ তৈরি করলাম, রবীন্দ্রজন। সমবেত রবীন্দ্রজন। এখানে যারা উপস্থিত আছেন, তাদের একটাই টান, রবীন্দ্রনাথ। কারণ, আমাদের জীবনে যা যা পাওয়া, তার বেশিরভাগটাই রবীন্দ্রনাথের থেকে পাওয়া। এই প্রথম আমি এমন জায়গায় বক্তৃতা করতে এসেছি, যেখানে প্রায় সকলেই গান জানেন, বা গান বোঝেন, গাইতেও পারেন। প্রমথ চৌধুরী এক জায়গায় বলেছিলেন, গলায় বা যন্ত্রে যে কোনোদিন সপ্তসুরের চর্চা করেনি, তার গান সম্বন্ধে কিছু না বলাই ভালো। আমি সেদিক থেকে এই দাবী করতে পারি যে দু-একটা কথা বলার অধিকার হয়তো আমার আছে। কিন্তু, গান জিনিসটা জানতে গেলে সবচেয়ে বেশি যেটা দরকার, সেটা মনে হয় গান শোনা। সেদিক থেকে হয়তো আপনাদের থেকে আমার অভিজ্ঞতা বেশি, এবং তা বয়সের কারণেই। আমি এমন অনেকের গান শুনেছি যারা আজ বেঁচে নেই, বা যাদের গান ধরে রাখা হয়নি। যেমন, অমিয়নাথ সান্যাল। মহা ধুরন্ধর ব্যক্তি ছিলেন গানের। আমরা ধুরন্ধর শব্দটা খারাপ অর্থে বলি, কিন্তু ধুরন্ধর মানে কিন্তু গভীর জ্ঞানী। সংগীতের গভীর জ্ঞান আমি ওনার কাছেই পাই। এই বিষয়ে একটা গল্প বলি, তখন আমি কলেজে পড়ি। আমাদের কলেজে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রতিযোগিতায় উনি বিচারক হয়ে এসেছিলেন। সেখানে আমি শ্রোতা, কিন্তু আমি যার কাছে গান শিখেছিলাম, ড. গোবিন্দ মুখোপাধ্যায়, তিনি বলেছিলেন, যে তুমি ওখানে নাম দেবে না, কারণ আমি ওখানে বিচারক হিসেবে থাকব। যিনি অধ্যক্ষ, সুধাংশু গুহ ঠাকুরতা, তার মেয়ে ফার্স্ট হল। কিন্তু আমাদের মনে হল যে বিচারটা ঠিক হয়নি।
অমিয়নাথ সান্যাল এর ঘরে আমি ঢুকে পড়লাম, তিনি বললেন, “কী ব্যাপার?”
আমি বললাম, “ আপনি যে আজ কলেজে গিয়েছিলেন বিচারক হয়ে, তার বিচারে আমার আপত্তি আছে”।
তিনি বললেন, “কেন আপত্তি কিসের?”
আমি বললাম, “ যে গানটা গাইল মেয়েটি, তাকে আপনি ফার্স্ট করলেন কী জন্য?”
উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কেন, ব্যাপারটা কি?”
আমি বললাম, “গানটার সুর ঠিক ছিল না। স্বরবিতানে ওই সুর নেই”
উনি বললেন, “ ও! স্বরবিতানের সুর যে ঠিক সুর সেটা আপনাকে কে বলল?”
এটা শুনে তখন একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম, উনি আরও বললেন, “গান জিনিসটা আপনার আসে?”
তখনকার দিনে “গান আসে” এভাবেই বলা হত।
আমি বললাম, “হ্যাঁ, আসে”।
তিনি বললেন, “তাহলে একটা গান করুন। গান নিয়ে কথা বলতে গেলে, গান না গাইলে চলে না”।
আমি খুব ভয়ে ভয়ে “আমার নিশীথ রাতের বাদল ধারা” গাইলাম।
শুনে বললেন, “ গানটা তো ভালোই গাইলেন, কিন্তু গানটা আসলে এরকম নয়”।
তারপর তিনি এস্রাজ পেড়ে নিলেন, এবং বাজিয়ে গানটি শোনালেন। আমি দেখলাম, সত্যিই, অসামান্য গাইলেন, কিন্তু আমার সুরের সাথে মিল নেই। কারণ আমি তো স্বরবিতানের সুর গাইলাম।
আমি জিগেস করলাম, “আপনি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখলেন কোথায়?”
তিনি বললেন, “রবীন্দ্রনাথের কাছেই শিখেছি। আমি তো শান্তিনিকেতনে অধ্যাপনা করতে গেছিলাম, তারপর চলে এলাম। ওখানকার আইন কানুন আমার ভালো লাগত না।”
তিনি বলে চললেন, “ আসলে দিনু ঠাকুর সঠিক স্বরলিপি করতেন না সবসময়, উনি তার নিজস্ব অনেক কাজ রেখে যেতেন। ”
এর পর মাঝে মাঝেই ওঁর কাছে যেতাম। একদিন জিগেস করলাম, “আচ্ছা, রবীন্দ্রনাথের গানে কথা ও সুর নাকি সমান সমান, বহু জায়গায় শুনেছি, বহু জন বলেছেন, আচ্ছা এর মানেটা কি?”
উনি বললেন, “আপনি কখনও ভালো কাপ-ডিশে চা খেয়েছেন?”
আমি বললাম, আমরা তো ব্রিটিশ আমলের লোক, “তা একটু খেয়েছি।”
“দাঁড়ান দেখাই” বলে উঠে দেশি কাপ ডিশ নিয়ে এসে কাপে জল ভর্তি করলেন, করে সেটা ডিশে ঢাললেন। জল উপচে বেড়িয়ে গেল। বললেন, “দেখলেন? এবার আবার দেখুন।” বলে ঘরের ভেতর থেকে জাপানি কাপ-ডিশ নিয়ে এলেন, নিয়ে একই জিনিস করলেন, কিন্তু একটুও জল উপচালো না। “এবার বুঝলেন কথা ও সুর সমান সমান? অনুপাত টা সমান হওয়া যায়। কাপে যদি ফুল আঁকা থাকে, তাহলে ডিশে হাতি আঁকা থাকলে হবে না, প্রজাপতি আঁকা চাই। রবীন্দ্রনাথের গানে সেই কথা ও সুর মিশে গেছে তাই না, তার থেকে একটা নন্দনের সৃষ্টি হয়েছে।”
রবীন্দ্রনাথ প্রথম থেকেই জানতেন, উনি কী কারণে পৃথিবীতে এসছেন। তিনি জানতেন, তাই নির্মোহ ভাবেই বলেছেন, “আমার গান তোমাদের গাইতেই হবে”। এবং এই বুঝতে পারার কারণ তার ভাগ্য, এমন একটা বাড়িতে জন্মেছিলেন তিনি, যে বাড়িতে পিয়ানো ছিল, এবং পিয়ানো বাজানোর দক্ষ লোক ছিল। তাঁর দাদা, ভাইঝি, বোনঝি রা। তাদের কাজই ছিল সুর তৈরি করা।

একটি নতুন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপিকার প্রায় ৩০২ জন ! অথচ রবীন্দ্রনাথ নিজে কেবলমাত্র একটি গানে স্বরলিপি করেছিলেন। আকারমাত্রিক স্বরলিপি তে। তার মানে তিনি নিজে স্বরলিপি করতে যে পারতেন না যে তা নয়।
৩৬ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ, তাঁর ভ্রাতুস্পুত্র গিরিন্দ্রনাথের বিবাহ উপলক্ষে এক অভিনব অনুরোধ পান। কী সেই অনুরোধ, না বিয়েতে ব্যান্ডপার্টি থাকবে, সেই ব্যান্ডপার্টির পড়ার উপযুক্ত স্বরলিপি তৈরি করে দিতে হবে। অর্থাৎ, Staff Notation বানিয়ে দিতে হবে। তাই করলেন রবীন্দ্রনাথ। “শান্তি করো বরিষণ” আর “শান্ত হ’ রে মম চিত্ত নিরাকুল” এই দুটি গানের Staff Notation বানিয়ে দিলেন। এর থেকে বোঝা যায়, তিনি আকারমাত্রিক স্বরলিপি ও Staff Notation দুটোই ভালোই বুঝতেন। কিন্তু করেননি। কারণ হয়তো তিনি কোন কিছুতে স্টিক করতেন না। তিনি ভাবতেন, তিনি সুর করেবন, স্বরলিপির কাজটা অন্য কেউ করবে। তিনি যখন সুর করতেন, অর্থাৎ তার মনে যখন কোন সুর আসত, তিনি কাউকে না কাউকে ডাকতেন। বেশিরভাগ সময় দিনেন্দ্রনাথ কেই ডাকতেন। এছাড়া ডাকতেন, কাঙ্গালিচরণ সেন, অমিতা সেন প্রমুখকে, গানটি গলায় তুলে নেওয়ার জন্য। কারণ তিনি সুর ভুলে যেতেন।

এ প্রসঙ্গে বিজয়া রায়, সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে বলেছেন, যে সত্যজিৎ রায় ও আগেরদিন রাতে কোন গানের সুর ঠিক করে, পরদিন সকালে সেটা ভুলে যেতেন।
রবীন্দ্রনাথ, এই কারণে পরবর্তীকালে, শান্তিদেব ঘোষ দের ডেকে বলতেন, তোরা আমার এখন কার গান গুলো গা। এখনকার সুর গুলো মনে থাকে না। পুরোনোগুলো মনে থাকে। কিন্তু আধুনিক রচনাগুলো মনে থাকে না।
অর্থাৎ, পুরোনো সৃষ্টি গুলো ওঁর মাথায় stored হয়ে গেছে, কিন্তু নতুন যা সৃষ্টি, অর্থাৎ চণ্ডালিকার গান, শ্যামার গান, যেগুলো নিয়ে উনি experiment করছেন, সেগুলো মনে রাখতে পারছেন না।
তখন সবরমতী আশ্রমে গান্ধী উপবাস করছেন। রবীন্দ্রনাথ অনুরোধ করেন তাঁকে, যে অনশন ত্যাগ করুন আপনি, জাতির আপনাকে দরকার। বলে টিকিট কেটে উঠে পড়লেন আমেদাবাদ এর উদ্দেশ্যে। যখন পৌঁছলেন, তখন জানতে পারলেন সেদিনই ভোরবেলা মহাত্মা অনশন ত্যাগ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ আশ্রমে পৌঁছে গান্ধীর সাথে দেখা করলেন। মহাদেব দেসাই, গান্ধীর সেক্রেটারি রবীন্দ্রনাথকে একটি গান গাইতে অনুরোধ করলেন, বললেন বাপুজি আপনার গান খুব ভালবাসেন, আপনি যদি জীবন যখন শুকায়ে যায় গানটি শোনান। বাপু খুব পছন্দ করেন। গানটি গাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ পরে মন্তব্য করেন, “সুরটা সম্পূর্ণ ভুলে গেছিলাম, তখনকার মতো একটা সুর দিয়ে গেয়ে দিলাম।”
আচ্ছা, তাহলে সেই সুরটা কোথায় গেল? তখন কেউ ধরে রাখলেন না সুর টা? রবীন্দ্রনাথ যখন দক্ষিণ আফ্রিকায় বা দক্ষিণ আমেরিকায় গেছেন, সেই সময়ের গানগুলোর স্বরলিপি কে করল? তার মানে কী তিনি দেশে ফিরে আবার সুরগুলো করলেন, তারপর স্বরলিপি হল? এই প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।
এর চেয়েও মারাত্মক ব্যাপার আছে। অমল হোম আর চারু বন্দ্যোপাধ্যায়, দুই রবীন্দ্রনাথের অনুরাগী, শান্তিনিকেতন গেছেন। কবি বললেন, তোমরা দোতলায় থেকো, আমি তিনতলায় আছি। রাত্রিবেলা হঠাৎ চারু বললেন, “ অমল, শুনতে পাচ্ছ?”। রবীন্দ্রনাথ গান গাইছেন। চুপিচুপি তাঁরা ছাদে উঠে দেখেন, কবি ছাদে বসে আছেন, বসে গাইছেন, অন্ধজনে দেহ আলো, মৃতজনে দেহ প্রাণ। গানটা তিনি গাইছেন, প্রায় পাছ-ছয় বার গাইলেন। তারপর চুপিসারে তাঁরাও নিচে নেমে আসেন। পরদিন সকালে কবিকে জিগেস করলেন, “আচ্ছা গুরুদেব, কাল রাতে অন্ধজনে দেহ আলো গানটা প্রায় পাঁচ-ছ বার গাইলেন, হয়তো তারপরেও গেয়েছেন, আমরা নেমে এসেছিলাম, হঠাৎ ওই গানটা গাইছিলেন কেন?”
কবি বললেন, “কী জানো, সন্ধ্যেবেলা খুব দুঃখের খবর পেয়েছি। মনে বড় কষ্ট হয়েছিল। সেই কষ্টটা কেটে গেল এই গানটা গাইতে গাইতে।”
সন্ধ্যেবেলা খবর এসেছিল তাঁর ছোট মেয়ে মীরাদেবীর বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। সেই দুঃখ প্রশমিত করতে এই গান! কিন্তু প্রশ্ন সেটা নয়, প্রশ্ন, রবীন্দ্রনাথ কি সত্যিই সুর মনে রাখতে পারতেন না? অন্ধজনে দেহ আলো প্রায় আঠেরো বছর আগের লেখা, আঠেরো বছর আগে লেখা গানের বাণী ও সুর সবটাই মনে ছিল, একটুও তো ভোলেন নি?
রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয় মানুষ ছিল, সুকুমার রায়। রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয় পাত্র ছিলেন। সুকুমার তখন কালাজ্বরে আক্রান্ত এবং মৃত্যুশয্যায়। রবীন্দ্রনাথ এসে দাঁড়ালেন তাঁর পাশে। সুকুমার বললেন, “দুঃখ এ নয়, সুখ নহে গো– গভীর শান্তি এ যে, ”এই গানটা গাইবেন? প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ লিখছেন,“ গুরুদেব বারান্দায় চলে গেলেন কিছুক্ষণের জন্য, গিয়ে কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে গান ধরলেন। ”গানটি গীতিমাল্যের গান, সুরটি ওনার মনে ছিল না। তৎক্ষণাৎ সুর দিয়ে গানটি শোনালেন সুকুমার কে। সুকুমার বললেন, “ আহ, শান্তি হল।” সেই সুর আর পাওয়া যায় না।
আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের গানের এই যে বিপুল সম্ভার, এ নিয়ে আমাদের দায়িত্ব ঠিক কী? আমি এর সমর্থনে কিছু পরিসংখ্যান দিই।
গীতবিতান যখন তিন খণ্ড বেরিয়েছিল, তখন সম্পাদনা করেছিলেন সুধীর কর। সুধীর কর লিখেছেন, সেই প্রথম তিন খণ্ড গীতবিতানে আছে ১৪৮৫ খানা গান। অথচ এখনকার গীতবিতানের সাথে সংখ্যাটা মেলে না। এখনও অবধি প্রকাশিত স্বরবিতান এর গানের সংখ্যা ১৭৮১। ১৯৪ টি গানের সুর পাওয়া যায় না।
রবীন্দ্রনাথ জানতেন তাঁর গানই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে। এইজন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন সঙ্গীত ভবন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল তাঁর গান কীরকম করে গাইতে হবে, প্রকৃত রাবীন্দ্রিক গায়ন কেমন, তার প্রশিক্ষক তৈরি করা। তাহলে, প্রথম ধাপ ছিল সঙ্গীত ভবন, দ্বিতীয় ধাপ গীতবিতান ছাপা, তৃতীয় ধাপ স্বরবিতান ছাপা, এবং চতুর্থ সঙ্গীতভবনে সঙ্গীত-শিক্ষক দের আনা।
রবীন্দ্রনাথ জানতেন, তাঁর গান বাঁচাতে হলে গানকে জনপ্রিয় করতে হবে। শুধু শান্তিনিকেতন-কেন্দ্রিক রাখলে চলবে না। তখন রেকর্ডের যুগ। তাঁর জীবিত অবস্থায় প্রচুর গান রেকর্ড করা হয়। যে সুযোগ অতুলপ্রসাদ বা রজনীকান্ত বা দ্বিজেন্দ্রলাল রায় পাননি। তিনি পূর্ণ-মাত্রায় এই গণমাধ্যমকে তাঁর গানের প্রচারের কাজে ব্যবহার করলেন। রেডিও। তখন রেডিওতে প্রায়শই রবীন্দ্রনাথের গান বাজানো হত। সবশেষে সিনেমা। পঙ্কজকুমার মল্লিক রবীন্দ্রনাথের কাছে এলেন তাঁর গান সিনেমায় ব্যবহারের অনুমতি নিতে। ১৯৩৭ সাল। এর আগে তিনি কিছু সিনেমার পরিচালককে ফিরিয়েছেন। কিন্তু পঙ্কজকুমার মল্লিককে ফেরালেন না। অনুমতি দিলেন। এই প্রথম রবীন্দ্রনাথের গান একজন “performer” পেল। এমনকী, তিনি পঙ্কজ কে তাঁর লেখা গানে সুর করার অনুমতি অবধি দেন, যেটা আর কাউকে দেননি।
রবীন্দ্রনাথ জানতেন, বাংলাদেশের সবাইকে দিয়ে তাঁর গান গাওয়াতে গেলে, গানের প্রচার দরকার। রবীন্দ্রনাথ এই দিক থেকে ভাগ্যবান, যে তিনি তাঁর গানের বহুল প্রচার, জীবিত অবস্থায় না পেলেও, পরবর্তীকালে পেয়েছেন। সিনেমায় সত্যজিত রায়, ঋত্বিক ঘটক, তপন সিনহা, তরুণ মজুমদার। পেয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর মতো performer এবং দেবব্রত বিশ্বাস এর মতো শিল্পী। এমনকি, আশা ভোঁসলে, লতা মঙ্গেশকর, কিশোরকুমার এর মতো পেশাদারি শিল্পী রাও প্রচুর রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে গেছেন, এবং তাতে বিশ্বভারতীর আপত্তি থাকলেও কিছু করেননি তাঁরা। কারণ একটাই, বিক্রি হবে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর, বিশ্বভারতীর বাইরে, গীতবিতান, দক্ষিণী, সুরঙ্গমা, ইন্দিরা, রবিতীর্থ এই প্রতিষ্ঠানগুলো কেবলমাত্র রবীন্দ্রনাথের গান এর প্রশিক্ষণের জন্য স্থাপিত হয়। এই সুরের বিরাট ভাণ্ডারের প্রতি আমাদের দায়িত্ব অপরিসীম। আর কোনো বাংলা গীতিকারের গান এবং সুর এভাবে সংরক্ষিত নয়, যেভাবে রবীন্দ্রনাথের।
আমরা যদি বাকি রবীন্দ্রসাহিত্য ছেড়েও দিই, শুধু গীতবিতান নিয়ে থাকি, ওটাই পড়ি, আর স্বরবিতান যদি আমাদের গলায় থাকে, তাহলে মনে হয় জীবন কাটানোর জন্য আর কিছুর প্রয়োজন হয় না।

অনুলিখন : প্রীতম চৌধুরী
