আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিটপ্রথমে ছিল বার জন রাজ-বন্দী, প্রত্যেকেই যুবক, সকলেই সম্ভ্রান্ত বংশীয়।
প্রতি বৎসর রাজার জন্মদিনে এক একজন করিয়া খালাস পাইয়া তখন ছিল মাত্র তিন জন।
রক্ষীদের সঙ্গে কথা বলিবার হুকুম নাই। প্রকাণ্ড এই দুর্গে তাদের সঙ্গী ছিল তারা নিজেরা আর ছিল গাছের পাখি, আকাশের তারা, চন্দ্র-সূর্যের আলো।
পূর্বে রাজ-বন্দীদের রাখা হইত পৃথক পৃথক কুঠরিতে কিন্তু সংখ্যা কমিয়া যাওয়ায় এবং এতদিন কারাগারের নিয়ম-কানুন ভালভাবে প্রতিপালন করায় কর্তৃপক্ষ খুশি হইয়া তাদের একসঙ্গে থাকিবার হুকুম দেন।
গল্প-গুজব করিয়া, তাস ও পাশা খেলিয়া, দৌড়-ঝাঁপ করিয়া সময় তারা একরূপ কাটাইয়া দেয়। কখনও প্রেমের গল্প করে, কখনও আলোচনা করে রাজনীতি ও সাহিত্যের।
রাজশেখর মাঝে মাঝে গান গায়, কোন সময় স্তোত্র আবৃত্তি করে, কখনও বা বন্ধুদের শোনায় তার স্বরচিত চম্পুকাব্য একটি বৎসর এইভাবে কাটিয়া গেল। একদিন সন্ধ্যার সময় কারাধ্যক্ষ আসিয়া খবর দিলেন, রাত্রি প্রভাতে রাজশেখর মুক্তি পাইবে।
জয়ন্ত ও জীমূতবাহন সমস্বরে বলিয়া উঠিল, জয় রাজশেখরের!
তাদের আনন্দের আর সীমা নাই, জয়ধ্বনি করিয়া, চেঁচাইয়া, গান গাহিয়া তারা ঘরখানাকে সরগরম করিয়া তুলিল।
জয়ন্ত বলিল, মুক্তি তো পাচ্ছ, কিন্তু মনে থাকে যেন চম্পার খবর আমাকে দিতে হবে।
জয়ন্ত একটু হাসিল। মুক্তিপ্রাপ্ত আরও দুই একজন বন্ধুকে এইরূপ অনুরোধ করায় তারাও কথা দিয়াছিল চম্পার খবর পাঠাইবে। কিন্তু খবর সে পায় নাই।
রাজশেখর জীমূতবাহনকে জিজ্ঞাসা করিল, তার কোনও সংবাদ দিবার আছে কিনা?
প্রভাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্ষী দরজা খুলিয়া দিলে তিন জনেই উঠানে আসিয়া সারি বাঁধিয়া দাঁড়াইল। প্রথমে জয়ন্ত, মধ্যে রাজশেখর, শেষে জীমূতবাহন রাজশেখরের গলায় একটা ফুলের মালা।
চলিতে চলিতে সে গান ধরিল, নমস্তে সতে তে জগৎকারণায়।
বন্ধুরা মধ্যে মধ্যে বলিতে লাগিল, নমস্তে—
দুর্গের ফটকে আসিয়া রাজশেখর দুই বন্ধুকে আলিঙ্গন করিল তিন জনেই নির্বাক। তিন জনেরই চোখ আর্দ্র।
বাষ্পকুল-কণ্ঠে রাজশেখর কহিল, আসি ভাই।
বিদায়ের পালা বোধ হয় আর একটু দীর্ঘ হইত, কিন্তু প্রহরী বলিয়া উঠিল, সময় সংক্ষেপ।
প্রহরীরা রাজশেখর ও তার বন্ধুদের মধ্যে লৌহকপাটের যবনিকা টানিয়া দিলে জীমূতবাহন ও জয়ন্ত পরস্পরের দিকে চাইল। সে দৃষ্টিতে ছিল গভীর হতাশা এবং একের প্রতি অপরের একান্ত নির্ভরতা।
সেদিন আর তাদের বিশেষ কোন কথাবার্তা হইল না।
এতদিন তবু ছিল তিনজন। জীবন আজ আরও সঙ্কীর্ণ হইয়া গেল।
দুইটি প্রাণী থাকে পরস্পরের ছায়ার মত গোপন তাদের কিছুই নাই, চিন্তায়, কর্মে সকল বিষয়েই একটা খোলাখুলি ভাব।
সকালে ঘুম ভাঙ্গিলে মাঠে দৌড়ায়, দুপুরে সাঁতার কাটে, খাওয়ার পর তাস খেলে, কখনও বা নিদ্রা যায়।
জীমূতবাহন চাপা ধরনের লোক, এতদিন নিজের প্রেমের ইতিহাস সে গোপন করিয়াই আসিয়াছে। এবার একদিন জয়ন্তের কাছে সে ধরা দিল, বন্ধুকে বলিল—তার প্রেমের গল্প, জীবনের প্রথম ও শেষ প্রেমের ঘটনাটি এইরূপ—
জীমূতবাহনের প্রেমাস্পদ ছিল তারই কোন এক বন্ধুর আত্মীয়া। পাছে বন্ধুর প্রাণে আঘাত লাগে, পাছে তার উপর বিশ্বাসঘাতকতা করা হয় সেই জন্য প্রেমের প্রতিদান পাইয়াও সে পিছাইয়া আসিল।
সেই হইতে নারী সম্বন্ধে কোন ঔৎসুক্য কি কৌতূহল তার নাই।
ব্যথা সে পাইল খুবই কিন্তু উপায় ছিল না, একদিকে বন্ধুত্বের মর্যাদা, আর এক দিকে প্রেম।
জীমূতবাহনের উপর জয়ন্তের অনুরাগ সেই হইতেই যেন আরও বাড়িয়া গেল। সেও যে প্রেমিক, সেও যে তার সহধর্মী!
আগে মনে করিত, লোকটা বেরসিক তাই চম্পার কথা ততটা প্রাণ খুলিয়া বলিত না। কিন্তু এখন আর দ্বিধা নাই, সঙ্কোচ নাই।
কিছুদিন পরে জীমূতবাহনের অসুখ করিল—জ্বর, বমি, মাথায় যন্ত্রণা!
প্রথমে মনে হইল, অল্পেই সারিয়া যাইবে। কিন্তু উপসর্গ উত্তরোত্তর বাড়িতে লাগিল।
রাজধানী হইতে বিচক্ষণ বৈদ্য আসিলেন। নাড়ী পরীক্ষা করিয়া তিনি ঔষধের ব্যবস্থা করিলেন বটে কিন্তু বলিলেন, ব্যাধি গুরুতর, জীবনের আশা কম।
জয়ন্ত জননীর মত সেবা করিতে লাগিল। বিশ্রাম নাই, ক্লান্তি নাই, নিজ-হাতে সে মল-মূত্র পরিষ্কার করে, রোগীর শয্যা ছাড়িয়া বড় একটা ওঠে না।
রাত্রে ঘুম নাই, অনেক সময় খাইতেও ভুলিয়া যায়।
তার নিরলস এই সেবা দেখিয়া কারারক্ষীরাও মুগ্ধ হয়, পরস্পর বলাবলি করে, এই দৃশ্য অপূর্ব।
বৈদ্য তার এইরূপ সেবার জন্য ভীত হইয়া পড়িলেন বলিলেন, এরূপ ভাবে চললে তোমারও অসুখ করবে।
কিন্তু জয়ন্ত ভ্রুক্ষেপ করে না। সেবার নেশা তখন তাকে পাইয়া বসিয়াছে। তার শুধু চেষ্টা কিসে জীমূতবাহন একটু আরাম পায়।
বন্ধুর শুশ্রুষা-গুণে দু’মাস ভুগিয়া জীমূতবাহন নীরোগ হইয়া উঠিল, পথ্য পাইল। জয়ন্তের আনন্দ আর ধরে না। সে যেন একটা অকূল-পাথারে পড়িয়াছিল, এবার তার কূল মিলিয়াছে।
জীমূতবাহন কহিল, আর জন্মে তুমি আমার ভাই ছিলো।
জয়ন্ত হাসিয়া উত্তর করিল, এ জন্মেই বা কম কিসে?
এইরূপ সৌহার্দের আনন্দে তাদের দিন কাটিয়া যায়। তারা ভুলিয়া থাকে অনেক দুঃখ-কষ্ট।
জীমূতবাহন বলে, এই বন্ধুত্ব আমাদের কারা-ক্লেশের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।
মাঝে মাঝে হয় মুক্তির কথা সেই প্রসঙ্গ উঠিলে একজন অপরের মুক্তি কামনা করে।
জীমূতবাহন বলে, একজন নারী তোমার জন্য অপেক্ষা করছে অতএব মুক্তি পাওয়া উচিত তোমার।
এতদিন যখন করেছে আরও এক বছর না হয় করুক। তোমার মুক্তির বিনিময়ে আমি খালাস হতে চাই না।
জীমূতবাহন বলে, প্রেমিকের জীবনে এক বছরের মূল্য তো বড় কম নয়।
সময় কাটাইবার আর পাঁচটা উপাদানের মধ্যে একটা উপায় তারা অবলম্বন করিল! নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা। রাজার জন্মদিনে মুক্তি মিলিবে কার?
পরীক্ষা করে তা কি রৌপ্য মুদ্রা ঘুরাইয়া, পাশার খুঁটি চালিয়া এবং আরও অনেক কিছুর সাহায্যে।
ভাগ্য-লক্ষ্মী কখনও প্রসন্ন হন এক জনের উপর, কখনও অপরের প্রতি। যার নাম ওঠে সে অপরকে বলে, না ভাই আমি চাই, এ বছর তুমি খালাস হও।
মুক্তির দিন ঘনাইয়া আসে, মাত্র মাস দেড়েক বাকি।
একদিন জয়ন্ত শৌচাগার হইতে ফিরিতেছিল, তার কানে গেল দুইটি প্রহরীর কথোপকথন।
একজন বলিল, এবার বন্দী ত খালাস পাবে এক জন, আর এক জন থাকবে কি করে?
একা থাকা যে ভারী কষ্টের। এখানেই বছর পনের আগে একটি বন্দী নিঃসঙ্গ কারাবাসের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিল, ঐ ওদেরই ঘরে।
কিন্তু এই কথা কয়টা তার হৃদয়ে পাথরের দাগের মতন গাঁথিয়া রহিল।
সে অনেক চেষ্টা করিল এই দুর্ভাবনাটাকে ঝাড়িয়া ফেলিবার। কিন্তু যখনই একা থাকে তখনই মনে পড়ে প্রহরীদের সেই কথাবার্তা
ব্যাপারটাকে সে এভাবে কখনও ভাবিয়া দেখে নাই। অবশ্যম্ভাবী নিঃসঙ্গ কারা-জীবনের বিভীষিকার কথা মনে হয় নাই দু’জনের কাহারও।
জয়ন্তের মনে পড়িল, তাদের গ্রামের এক ভূস্বামীর কথা নির্জন কারাবাসের ফলে ছয় মাসের মধ্যে তার মাথা এতদূর খারাপ হইয়া যায় যে নিজের পুত্র-কন্যাকেও সে চিনিতে পারে নাই।
জয়ন্ত মানুষটাকে দেখিয়াছিল—আজন্ম মস্তিষ্ক-হীনের চেয়েও কৃপার পাত্র। অথচ এই মানুষই বিদ্যায়, বুদ্ধিমত্তায়, ধন-দৌলতে, প্রভাব-প্রতিপত্তিতে একদিন সমাজের শিরোমণি ছিল।
জয়ন্তের ভয় হয়, তারও ত এইরূপ হইতে পারে। মাঝে মাঝে একলা বসিয়া কি যেন ভাবে।
জীমূতবাহন ব্যাপারটা লক্ষ্য করিল। সে বলিল, কি হয়েছে তোমার?
জয়ন্ত সব কথা খুলিয়া বলিল।
জীমূতবাহন উত্তর করিল—আচ্ছা, দু’জনের কারও যদি মুক্তি না মেলে?
জয়ন্ত উৎসাহের সঙ্গে বলিল—সে খুব ভাল কথা, তবুও এক সঙ্গে থাকতে পারব।
কিন্তু ভীতি তার কাটে না। সে ভাবে জিনিসটা কি সম্ভব? উভয়েরই মুক্তি অথবা উভয়েরই আর এক বৎসর একত্র কারাবাস যেন কল্পনারও অতীত।
তার এই হতাশ ভাব জীমূতবাহনের মনেও ধীরে ধীরে সংক্রামিত হয়। সেও মনে করে, সত্যই ত, এদিকটা একেবারে উপেক্ষার নয়।
একদিন প্রাতে সূর্যকরোজ্জ্বল আকাশে একটা বাজ উড়িয়া যাইতেছিল।
জয়ন্ত বলিল, ওটা যদি দক্ষিণ দিকে যায় আমি মুক্তি পাব, বাঁয়ে গেলে তুমি।
উড়িয়া উড়িয়া পাখিটা প্রান্তরের শেষ সীমায় পৌঁছিয়া বাঁ দিকে চলিয়া গেল।
সঙ্গে সঙ্গে জয়ন্তের মুখখানা ম্লান হইল। ঐ যে পাখীটা—অনন্ত নীল আকাশে একটা শিশিরকণার মতো, সেও মুক্ত, সেও বিচরণ করে স্বাধীনভাবে
ঐ পাখির সঙ্গে তুলনায় তার নিজের জীবন?
কিন্তু এইখানেই ত ইহার শেষ নয়। গভীরতর দুঃখ লইয়া ভবিষ্যৎ তাকে গ্রাস করিবার জন্য প্রস্তুত হইয়া আছে।
ঠিক এই সময় জীমূতবাহন গলা ছাড়িয়া আবৃত্তি আরম্ভ করিল—
‘প্রলয় পয়োধি জলে ধৃতবানসিবেদং
বিহিত বহিত্র চরিত্ৰখেদং’—
সেও ভাবিতেছিল মুক্তির কথা ভগবানকে স্মরণ করিয়া মেঘের মত নিজের মনের গ্লানিটুকুকে উড়াইয়া দিবার জন্যই স্তোত্র আবৃত্তি করিল।
কিন্তু কারও মন হইতে সেই কালো মেঘটুকু উড়িল না। বরঞ্চ ক্রমেই উভয়ের মধ্যে একটা ব্যবধানের সৃষ্টি হইল।
সেই হইতে আর তারা ভাগ্য পরীক্ষা করিতে সাহস করে নাই, মুক্তির কথা পর্যন্ত মুখে আনে নাই।
সেই অকপট বন্ধুত্ব, প্রাণ খুলিয়া মেলামেশা একে একে সবই নষ্ট হইয়া গেল, রহিল ভদ্রতার একটা বহিরাবরণ মাত্রা
সেদিন দুপুরে তারা দাবা খেলিতেছিল।
খেলাটা বেশ জমিয়াছে, দু’ঘণ্টা চলিয়াছে একটা বাজি, শেষ আর হয় না।
জয়ন্ত একটা বোড়ের চাল ফেরত চাহিলে জীমূতবাহন বলিয়া ফেলিল, শুধু এ ব্যাপারে নয়, তোমার প্রকৃতির পরিচয় পাই প্রতি মুহূর্তে
তুমি মনে কর, আমি তোমার মুক্তির প্রধান অন্তরায়।
জয়ন্ত কাষ্ঠ-হাসি হাসিয়া বলিল—যাক, নিজের পরিচয় তুমি ভাল করেই দিলে।
খেলা আর শেষ হইল না। এই ঘটনা অবলম্বন করিয়া তাদের বাক্যালাপ পর্যন্ত বন্ধ হইল।
কথা বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে সকল বিষয়েই পূর্ব নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিল। তারা স্নান করে পৃথক। সময়ে, আহার করে পৃথক স্থানে, যথাসম্ভব একে অপরকে এড়াইয়া চলে।
রাত্রে একা ঘরে না থাকিলেই নয়, তাই থাকে, কিন্তু পৃথক থাকিতে পারে না বলিয়াও পরস্পরের প্রতি রাগিয়া যায়।
মন তাদের বিষাইয়া ওঠে প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি অবলম্বন করিয়া।
বিস্ময়ের বিষয় এই যে, কেহই ভাবে না যে সে নিজেও মুক্তি পাইতে পারে। একে ভাবে মুক্তি মিলিবে অপরের।
কাল রাজার জন্মদিন আজ সন্ধ্যার পর মুক্তির সংবাদ আসবে। দু’জনেই সাগ্রহে সূর্যাস্তের প্রতীক্ষা করিতেছে। মুক্তি এক জনের হইবেই, যার হয় হউক কিন্তু এ সংশয় আর ভাল লাগে না।
সন্ধ্যার কিছু পরেই কারাধ্যক্ষ আসিয়া ঘোষণা করিলেন, ‘অশেষ গুণালঙ্কৃত শ্ৰীমন্মহারাজের পবিত্র জন্মতিথি উপলক্ষ্যে জীমূতবাহন মুক্তি পাইবেন। প্রভাতে কারা-গৃহ হইতে বাহিরে যাইবার জন্য তিনি যেন প্রস্তুত থাকেন।’
রাজাদেশ শুনাইয়া কারাধ্যক্ষ চলিয়া গেলেন।
জীমূতবাহন কেমন যেন বিহ্বল হইয়া পড়িল। সে বুঝিতে পারিল না, মুক্তির এই বাণী আনন্দের না বিষাদের।
প্রথমে সে যেন ঘোষণা-বাণীর অর্থই উপলব্ধি করিতে পারে নাই। ধীরে ধীরে কথাগুলি দুই দুইবার আওড়াইয়া সে হাসিয়া ফেলিল, নিজের অন্তহীন দুঃখের প্রতি একটা তীব্র বিদ্রুপের সুরে।
বাহিরে চাঁদের আলোর উপর শীতের কুয়াসা একটা পর্দা টনিয়া দিয়াছে। প্রকৃতির রূপ সদ্য শোকাতুরা শ্বেত-বসনা বিধবার মত
জয়ন্ত এবং জীমূতবাহনের মনের উপরও কুয়াশার পর্দারই মতন একটা আবরণ দু’জনে দু’টা জানালায় দাঁড়াইয়া। একজন পূবের, একজন দক্ষিণের জয়ন্তের কাছে সবই অর্থহীন, সবই অস্পষ্ট, রাত্রি প্রভাতে মাতাল যেমন জড়তা বোধ করে তার মন ও শরীরের অবস্থাও ঠিক সেইরূপ।
পরদিন প্রাতঃকাল হইতেই সে স্বাধীন ইহা ভাবিয়াও তার শান্তি নাই। জয়ন্তের নিকট সে যেন কত অপরাধী। ইচ্ছা হয়, একবার তার হাত ধরিয়া ক্ষমা ভিক্ষা করে, কিন্তু ভাষা যোগায় না।
দু’জনেই নির্বাক। একজন হতাশায়, অপরে সৌভাগ্যের সঙ্কোচে।
জয়ন্তের চোখের সামনে তখন ভাসিয়া উঠিল নিঃসঙ্গ কারাবাসের ছবি।
তার মনে পড়িল, নিজের পরিচিত সেই হতভাগ্য ভূস্বামীকে, মনে পড়িল, এই কক্ষে যে বন্দী গলায় দড়ি দিয়া আত্মহত্যা করিয়াছিল, তাহাকে।
ভাবিতে ভাবিতে জয়ন্তের চোখ দু’টো লাল হইয়া উঠিল।
তার দিকে চাহিয়া জীমূতবাহনের আশঙ্কা হইল—মানুষটা বুঝিবা পাগল হইয়া গেল।
ঘণ্টার পরে ঘণ্টা কাটিয়া গেল, কতক্ষণ তার হিসাব নাই।
একটা পাখির ডাক শুনিয়া দু’জনেরই চমক ভাঙ্গিল। এই পাখি ডাকে প্রতি প্রহরে।
এটা কোন প্রহরের ডাক, প্রথম না দ্বিতীয় প্রহরের?
অন্যবার এইদিন কত উৎসব, কত আনন্দ হয়। বন্দীরা আনন্দ করে, মুক্তিপ্রাপ্তের জয়ধ্বনি করে।
জীমূতবাহন একটা তোরঙ্গের উপর বসিয়া ভাবিতেছিল, বাহিরে যাইয়া জয়ন্তর মুক্তির জন্য কি কি পন্থা অবলম্বন করিবে, কাহাকে ধরিবে, কোন প্রতিপত্তিশালী অভিজাতের মারফত রাজার নিকট আবেদন করিবে ভাবিতে ভাবিতে রাত্রি তৃতীয় প্রহরের পাখীর ডাকের পর সে ঘুমাইয়া পড়িল।
জয়ন্ত তখনও ঘরের মধ্যে পদচারণা করিতেছিল।
মাথা একটু নাড়িতে নাড়িতে আপন মনে কি বকে, একবার ঘরের এদিক হইতে ওদিক যায়, আবার ফেরে।
কখনও হাত তার মুষ্টিবদ্ধ হইয়া আসে, কখনও বা ওষ্ঠপ্রান্তে ফুটিয়া ওঠে একটু হাসি।
হাঁটিতে হাঁটিতে জয়ন্ত একবার জীমূতবাহনের দিকে চায়, কি যেন ভাবিয়া দেওয়ালের ওপর ঘুষি মারে, হাত ক্ষত-বিক্ষত হয়।
জয়ন্ত দরজার কাছে একটা চারপাইর উপর বসিয়া আছে। পরনে জীমূতবাহনের পোশাক। মাথায় তারই উষ্ণীর।
দরজা খোলা মাত্রই সে বাহির হইয়া যাইবে। যদি কেহ বাধা দেয়, তবে রক্তগঙ্গা বহাইবে।
অন্যবার ভোরের সঙ্গে সঙ্গে প্রহরীরা দরজা খুলিয়া দেয়। এবার এত বিলম্ব কেন?
ঘর যে আলোয় ভরিয়া গেল, এ আলো ত তার সহ্য হয় না।
একদৃষ্টে সে চাহিয়া রহিল দরজার দিকে।
দূরে পদ-শব্দ শোনা গেল, একজন, দু’জনবহু লোকের পদশব্দ।
শব্দ ক্রমে স্পষ্টতর হইল, একেবারে দরজার বাহিরে।
লৌহকপাট ঝন ঝন শব্দে খুলিয়া গেল।
প্রথমে রাজার জন্মোৎসবের উপযুক্ত উজ্জ্বল পরিচ্ছদে ভূষিত কারাধ্যক্ষ, পিছনে প্রহরীর দল।
চৌকাঠের উপর পা দিয়াই কারাধ্যক্ষ বলিলেন, শ্ৰীমন্মহারাজ তাঁর আদেশ পরিবর্তন করিয়াছেন। আপনারা দু’জনই মুক্ত।
জয়ন্ত ফ্যাল ফ্যাল করিয়া তার দিকে তাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিল—দু’জনেই? কারাধ্যক্ষ তার ভাব দেখিয়া বিস্মিত হইলেন। একটু আগাইয়া আসিয়া দেখিলেন, মেজের উপর জীমূতবাহনের দেহ পড়িয়া আছে তার মুখে, বুকের উপর এবং চোখের কোণে জমাট বাঁধা রক্ত। একটা কষ বাহিয়া রক্ত গড়াইয়া কালো শিরার মত দাগ পড়িয়াছে। জয়ন্ত তখন ধীরে ধীরে আপন মনে বলিতেছিল—আমরা দু’জনেই মুক্ত!

জন্ম কলকাতায় ১৮৯৪ সালের ২৪শে আগস্ট। তাঁদের পৈতৃক নিবাস ছিল অধুনা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়া পরগনার পিঞ্জরী গ্রামে। পিতা ক্ষীরোদচন্দ্র সেন পেশায় ছিলেন কবিরাজ। তিনি কলকাতায় ২০১ মুক্তারাম বাবু স্টীটের ভাড়া বাড়ীতে থাকতেন। জ্যেষ্ঠপুত্র রমেশচন্দ্রের জন্ম এবং সমস্ত জীবন কাটে কলকাতাতেই। ১৯৬১ সালের ৪ঠা নভেম্বর রমেশচন্দ্রকে সপরিবারে সেই বাড়ী ছেড়ে চলে আসতে হয় বরানগরের ২৪, ডাক্তার নীলমণি সরকার স্ট্রীটে। ১৯৬২ সালের ১লা জুলাই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
পণ্ডিত সীতানাথ সংখ্যাতীর্থের চতুষ্পাঠীতে রমেশচন্দ্রের শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ১৯১১ সালে সংস্কৃত ব্যাকরণের দ্বিতীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯১৩ সালে, টোলে পাঠরত অবস্থাতেই, প্রাইভেটে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করেন। এর পর ১৯১৭ সালে কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে ইংরেজীতে অনার্স নিয়ে বি.এ. পাশ করেন। বাংলা সাহিত্যের পত্রে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। পিতার আকস্মিক মৃত্যুতে ইংরেজীতে এম.এ. পড়া তাঁর মাঝপথেই থামিয়ে দিতে হয়। গ্রহণ করেন পৈতৃক কবিরাজী পেশা কে। হাল ধরেন পরিবারের প্রধানরূপে।
১৯১৮ সালে মাদ্রাজ শহরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত আয়ুর্বেদ সম্মেলনে তিনি বাংলার একজন প্রতিনিধি ছিলেন। সেই সম্মেলন-কালে তাঁর দেওয়া সংস্কৃতে আয়ুর্বেদ শাস্ত্র সংক্রান্ত তথ্য সমৃদ্ধ ভাষণ যথেষ্ট চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। সেই সম্মেলনেই তাঁকে “বিদ্যানিধি” উপাধিতে ভূষিত করা হয়। কিছুকালের জন্য তিনি “বৈদ্যশাস্ত্রপীঠে” অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন কিন্তু পরিচালক-মণ্ডলীর সাথে মতানৈক্য হওয়াতে তিনি তাঁর স্বাধীন কবিরাজী পেশায় ফিরে আসেন। তিনি পিতার মতই চিকিত্সক হিসেবে এক দুর্লভ খ্যাতির অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন।
চিকিৎসা-শাস্ত্রের চেযে রমেশচন্দ্রের সাহিত্যচর্চায় বেশী আগ্রহ ছিল। সাহিত্যে তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্থপতি আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তিনি শুধু অমূল্য সাহিত্যই সৃষ্টি করেন নি, তিনি তৈরী করে গেছেন বহু বাঙালী সাহিত্যিককেও। ১৯১১ সালে তাঁর পিতার কয়েকজন ছাত্রের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন “সাহিত্য সেবক সমিতি”। এই সমিতি হয়ে ওঠে লেখক তৈরীর কারখানা! বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কামিনী রায় প্রমুখ তখনকার যুগের খ্যাতনামা লেখক-কবি-সাহিত্যিকরা সেখানে তাঁদের রচনা পড়তেন। অনেকে আরম্ভও করেছিলেন এই সভায় – অর্থাৎ হাত পাকিয়েছিলেন এখানেই।
১৯৪৫ থেকে ১৯৬২ তে তাঁর মৃত্যু কাল অবধি তিনি নিয়মিত লিখে গেছেন। লিখেছেন নানা তত্কালীন প্রসিদ্ধ পত্র-পত্রিকায় যেমন বসুমতী, ভারতবর্ষ, যুগান্তর, দেশ, প্রভাতী, সর্বহারা, নবশক্তি। তিনি বারোটি উপন্যাস লিখেছেন যা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। তাঁর একটি উপন্যাস “সেলিরানা” শারদীয় “মধ্যবিত্ত” পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম উপন্যাস শতাব্ দী (১৯৪৫)। অন্য উপন্যাসের মধ্যে আছে চক্রবাক (১৯৪৫), কুরুপালা (১৯৪৬), কাজল (১৯৪৯), গৌরীগ্রাম (১৯৫৩), মালঙ্গীর কথা (১৯৫৪), পূব থেকে পশ্চিমে (১৯৫৬),
সাগ্নিক (১৯৫৯), নিঃসঙ্গ বিহঙ্গ (১৯৫৯), অপরাজেয় (১৯৬০), পূর্বরাগ (১৯৬১), দীপক, সেলিরানা। আছে “সাদা ঘোড়া”, “ডোমের চিতা”-র মত বহু গল্প। তাঁর লেখা সাতটি গল্প গ্রন্থ। দেশ পত্রিকায় ১৯৩৬ সালের জুন মাস থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্যাটায়ার ধর্মী রম্যরচনা “টিকি বনাম প্রেম”। ১৯৯৪ সালের ২৮শে আগস্ট স্টেটসম্যান পত্রিকা তাঁকে “Bengal’s Maxim Gorky” আখ্যা দেয়।
এমন মানুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই পরাধীনতার গ্লানি থেকে দেশকে মুক্ত করতে চাইতেন। তিনি দীর্ঘকাল জাতীয় কংগ্রেসের উত্তর কলকাতার জেলা কমিটির সম্পাদক ছিলেন। তিনি সে যুগের বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। এরই ফলে তাঁর মুক্তারাম বাবু স্ট্রীটের বাড়ীতে বেশ কয়েকবার ইংরেজ পুলিশ হানা দেয়। শ্রী অরবিন্দ ঘোষের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিল। ১৯৪৫ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস “শতাব্দী”, তিনি শ্রী অরবিন্দ ঘোষকে উত্সর্গ করেছিলেন।
সীমিত আর্থিক ক্ষমতার মধ্যেও তাঁর মনের কোমল দিক আমরা দেখতে পাই যখন তিনি বাংলার পূর্বাঞ্চল থেকে কোনো পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণে আসা এক বালককে, কলকাতার ফুটপাথ থেকে তুলে নিয়ে গৃহে আশ্রয় দেন। সেই ছেলেটিও তাঁদের পরিবারের একজন এবং রমেশচন্দ্রের কবিরাজী পেশার অন্যতম সহকারী হয়ে ওঠেন এবং রমেশচন্দ্রের সন্তানদের কাছে পিতৃব্য-সম ভালবাসার অধিকারী হন।
Behind every man there is a woman কথাটা রমেশচন্দ্রের ক্ষেত্রে একশো ভাগ সত্যি। সেই নারী তাঁর প্রেরণাময়ী স্ত্রী বনলতা দেবী। ১৯১৬ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি বিবাহসূত্রে পরিণীতা হয়ে এসেছিলেন। শশুরবাড়ীতে এসে সবার মনে তিনি জননীর স্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁদের পাঁচ পুত্র এবং নয় কন্যার পরিবারের সমস্ত দায় তিনি একা হাতে সামলেছেন। এই মহিয়সী নারীর সহযোগিতা এবং সহমর্মিতা রমেশচন্দ্রকে, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মানবতার প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে সামান্য সময়ের জন্যও সংকুচিত
হতে দেয় নি।
Related