অনুবাদ উপন্যাস: সুবালা (পর্ব-১৩) । হোমেন বরগোহাঞি
লেখক পরিচিতি-১৯৩২ সনে লখিমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোটো গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়। সুবালা লেখকের প্রথম উপন্যাস।
দ্বিতীয় পর্ব
২
বুড়ি যে দিকে এগিয়ে গেল, সেদিকে চোখ ঘুরিয়ে আমি দেখলাম– একটা দোতলা টিনের বাড়ি খুব জীর্ণ দশায় কোনোমতে দাঁড়িয়ে রয়েছে।বাড়িটা কিন্তু পরিত্যক্ত নয়; বাইরে থেকে দেখে বলা যায়, সেটি একটি হোটেল। প্রথমে আমার মনে হল, বুড়ি হয়তো হোটেলের দিকেই এগিয়ে চলেছে।রাস্তার পাশের এক হাতের মতো চওড়া নর্দমা একটা প্রায় লাফ দিয়ে পার হয়ে আমি হোটেলটার পশ্চিম দিকের বেড়ার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ আগেই আমি দেখেছিলাম, সেই বেড়ার পাশ দিয়ে একটি উঁচু বাঁশের বেড়া আরম্ভ হয়ে রাস্তার সমান্তরাল ভাবে প্রায় দশ-বারো হাত লম্বা হয়ে এগিয়ে গেছে কিন্তু তার ভেতরে যেতে পারার মতো হোটেলের কাছে যে একটি ছোট্ট দরজা খুব কৌশলে তৈরি করা হয়েছে,সেটা আমার চোখেই পড়েনি। দরজাটা খুলে বুড়ি আমাকে ভেতরের দিকে ঠেলে দিল, আর নিজেও ঢুকে পুনরায় ভেতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
ভেতরে ঢুকেই হঠাৎ যেন আমার দৃষ্টি অন্ধ হয়ে গেল,নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হল। বেড়াটার পাশেই যে একটি ঘর সংলগ্ন রয়েছে সে কথা আমি ভাবতেই পারিনি।স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা খোলা জায়গার সন্ধানে আমি চোখ দুটো সামনের দিকে মেলে দিয়েছিলাম, হঠাৎ আমার দৃষ্টি একটি একচালা ঘরের বেড়ায় প্রতিহত হয়ে গেল। বেড়াটা আর ঘরের মধ্যে তিল মাত্র ফাঁকা জায়গা নেই। পেছনে ঘুরে তাকিয়ে আমি দেখলাম– বাইরে থেকে সামান্য যেন দেখা সেই বাঁশের বেড়াটি এবার যেন মূর্তিমান হয়ে উঠল তার স্বকীয় সত্তার অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য;বাইরের সমস্ত পরিচিত জগতের সঙ্গে একটা দুস্তর ব্যবধান। আমি এই সমস্ত ভেবে থাকতেই বুড়ি তালা খুলে দরজাটা মেলে আমাকে ডাকল,’ দাঁড়িয়ে আছ কেন সুবালা,ভেতরে চলে এসো।’ আমি এক পা দু পা করে এগিয়ে গিয়ে ঘরের বারান্দায় দাঁড়ালাম, আর চার পাশে চোখ বুলিয়ে ঘরটা এবং তার আশ্চর্য পরিবেশটা নিরীক্ষণ করতে লাগলাম। ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমার প্রথম মনে হল যে বিকেল হতে বোধহয় বেশি সময় নেই। কিন্তু চট করে আমার মনে পড়ল যে এখন তো ভর দুপুরবেলা, কিছুক্ষণ আগে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার সময় সূর্যের তাপে সমস্ত শরীর পুড়ে যাচ্ছিল, তাহলে হঠাৎ এত অন্ধকার এল কোথা থেকে?বাস এসে গুয়াহাটিতে দ্রুতগতিতে প্রবেশ করায় আমি তার গতির মধ্যে এভাবে ঢুকে গেছি যে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু বা ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে যেন সমানে তাল রেখে চলায় আমার বুদ্ধি বা চেতনা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে পড়েছে,আমার মনে কেমন যেন সমস্ত কিছু জট পাকিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ কোনো কিছুই না ভেবে আমি মনটাকে প্রকৃতিস্থ অবস্থায় আনার চেষ্টা করলাম।তারপরে পুনরায় আমি ধীরে ধীরে পরিবেশটা নিরীক্ষণ করতে শুরু করলাম। ভর দুপুরবেলা জায়গাটা কেন এত অন্ধকার এবার আমি বুঝতে পারলাম। পূবদিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে দোতলা হোটেল ঘরটা, বুড়ির একচলা ঘরটার চালটা হোটেলের পশ্চিম দিকে পাকা বেড়ার অর্ধেকটা উঁচু থেকেই জড়াজড়ি করে শুরু হয়েছে। দক্ষিণ দিকে ঘিরে আছে ঘর গুলির চেয়ে উঁচু একটি ইটের দেওয়াল। পশ্চিম দিকেও কয়েকটি উচু উঁচু ঘর। উত্তর দিকে আমি এইমাত্র পার হয়ে আসা বাঁশের উঁচু বেড়াটা। অর্থাৎ ঘরটা বা তার সামনের ছোট্ট বারান্দাটায় কোনো দিক থেকেই একটুও সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না, এটা যেন একটি চির অন্ধকারের রাজ্য। কোনোদিন সূর্যের আলো বা উত্তাপ না পড়ার ফলে ঘরের মেঝেটা এবং তার সামনের ছোট্ট জায়গাটার মাটিগুলি কালো এবং ভেজা, চারপাশ বন্ধ থাকার ফলে মুক্ত বাতাস বেরোতে ঢুকতে না পারার ফলে ভেতরের বন্ধ বাতাসটুকু এক ধরনের দুর্গন্ধের বাষ্পে ভারী হয়ে উঠেছে। নিঃশ্বাস নিতেও কেমন যেন ঘৃণা হয়, বুকের ভেতরে বিষ বাষ্প ঢুকে যাচ্ছে বলে মনে হয়। আমি নিজে পৃথিবীর চরমতম দারিদ্র্যের কোলে বড়ো হওয়া মেয়ে, চালের ফুটো দিয়ে আকাশ দেখা ঘরে আমার সারা জীবন অতিবাহিত হয়েছে,সেই আমিও কোনোদিন কল্পনা করতে পারিনি যে পৃথিবীতে এই ধরনের মানুষও আছে– যে এমনকি ঈশ্বরের দান মুক্ত এবং পবিত্র বায়ু সেবন থেকেও বঞ্চিত। সূর্যের আলো এবং মুক্ত বাতাস প্রবেশ করতে না পারা, কোনোদিন আকাশ না দেখা এই নরক কুণ্ড সদৃশ্ জায়গায় বেচারী বুড়ি কীভাবে দিনের পর দিন অতিবাহিত করছে,সে কথা ভেবে আমার মনটা গভীর দুঃখে ভরে গেল। নিজের ক্ষেত্রে এই বলেই সান্ত্বনা লাভ করলাম যে আমি তো এখানে চিরকাল থাকব না, আশ্রমে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি এখান থেকে চলে যাব।
কিছুক্ষণ পরে বুড়ি বেরিয়ে এল। দেখেই বুঝতে পারলাম যে তিনি স্নান করে এসেছেন। আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘তুই বাইরে এভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছিস কেন? ভেতরে যা। তোকে একটা আলাদা ঘর দিয়েছি। কাপড়চোপড় ছেড়ে স্নান করে নে। আমি রান্না ঘরে যাচ্ছি।’
আরো পড়ুন: সুবালা (পর্ব-১২) । হোমেন বরগোহাঞি
আমি ভেতরে ঢুকে গেলাম। অন্ধকারে ভেতরটা ভালোভাবে আন্দাজ করা যায় না। তার মধ্যে আমার চোখে পড়ল,বুড়ির অবস্থা আমাদের ঘরের মতোই।একই ঘরের মধ্যে এক কোণে বড়ো উনুন, অন্যদিকে বেড়ার পাশে বুড়ির বিছানা। বুড়ি যে একেবারে নিঃসঙ্গ সে কথা আমি ভাবতেই পারছিলাম না বা তিনি আমাকে বলেননি। বুড়ির ঘরের এক কোণে একটি দরজা দেখে আমি সেদিকে ঢুকে গেলাম।আমি বুঝতে পারলাম– সেটা আমাকে দেওয়া ঘর। ঘরটিতে ঢুকেই যে জিনিসটা প্রথম আমার বিস্মিত দৃষ্টি আকর্ষণ করল, তা হল বেশ বড়োসড়ো একটি খাটে সুন্দর করে পেতে রাখা একটি পরিষ্কার ধবধবে বিছানা। বুড়ির জরাজীর্ণ অন্ধকার ঘরটিতে সেই সুন্দর বিছানাটা এতটাই বেমানান বলে মনে হচ্ছিল যে কিছুক্ষণের জন্য আমি কী করব কিছুই স্থির করতে না পেরে হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার প্রতি এরকম বিশেষ আদর যত্ন করার জন্য বুড়ির প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা অনুভব করলাম।সেখানে কাপড়চোপড় ছেড়ে স্নান কোথায় করব জিজ্ঞেস করার জন্য আমি পুনরায় বুড়ির কাছে এগিয়ে গেলাম।
তিনি তখন ভাতের হাড়িতে আগুন দিচ্ছিলেন। আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, ‘ তুই বোধহয় পায়খানায় যাবি তাই না? চল তোকে পায়খানা এবং স্নান করার জায়গা দেখিয়ে দিই।’ বুড়ির পেছন পেছন আমি দক্ষিণের ইটের দেওয়ালটার দিকে এগিয়ে গেলাম। হোটেলের পেছনে পায়খানা একটার দিকে দেখিয়ে বুড়ি আমাকে বললেন, ‘ ওইখানে চলে যা। সেই টিনটাতে জল আছে ।ওটা হোটেলের পায়খানা, কিন্তু আমাকে ব্যবহার করতে দেয়। স্নান করার জন্য আমাদের ঘরের পশ্চিম দিকে যাবি। সেখানে আমি জল রেখে দিয়েছি।’
পায়খানার অভিজ্ঞতা আমার এই প্রথম। পায়খানার দরজাটা ছিল টিনের, মরচে ধরে তাতে মাঝেমধ্যে কিছুটা জায়গা খসে পড়েছে। পায়খানার ভেতরে ঢুকে সেই দরজার দ্বারা যে মানুষ কীভাবে আত্মগোপন করে, সে কথা ভেবে আমি বেশ অবাক হলাম। যাই হোক, কাছে কোনো মানুষ-জন না দেখে আমি ধীরে ধীরে পায়খানায় ঢুকে গেলাম। ভেতরে ঢুকে আমি যে নরকুণ্ড দর্শন করলাম তার অবর্ণনীয় বীভৎসতার মধ্যে নিঃশ্বাস নিতে না পেরে আমার সর্ব শরীর ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল।পায়খানাটার নিচে উপরে অনেক দিনের পুঞ্জিভূত ময়লা গলে পচে পোকা হয়ে এরকম অবস্থা হয়েছে যে আমার ধারণা হল, নরক নিশ্চয়ই এর চেয়ে বেশি বীভৎস হতে পারে না। আমি চোখের চারপাশে অন্ধকার দেখতে লাগলাম, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল, আর আমার মনে হল যে দুর্গন্ধ বিষাক্ত বাতাস আমার গায়ে লেগে আছে, সাত সাগরের জলে স্নান করলেও আমি আমার শরীর থেকে দুর্গন্ধ দূর করতে পারব না।লাফ দিয়ে উঠে দরজা খুলে আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম।
পশ্চিম দিকের স্নান করায় জায়গাটায় যাবার জন্য আমি ইটের দেওয়ালটার পাশ দিয়ে এগিয়ে গেলাম।কিন্তু সেদিকে গিয়েও দেখলাম,দেওয়ালের পাশের একটি নালা দিয়ে পায়খানার গলিত ময়লার ধারা এগিয়ে এসে পা রাখার মত জায়গা নাই করেছে, তার দু একটি ধারা ঘরটার দক্ষিণ দিকের বেড়ার পাশে ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ বেড়াটার ঠিক ওপাশেই ভাতের উনুন।
গর্তে পরে নিশ্চিত জীবন্ত সমাধির বুকে ঢুকে যাওয়া মানুষের মতো আমার সমস্ত শরীরটা নিজে থেকে প্রচন্ডভাবে ধড়ফড় করে উঠল।আমার কেবল মনে হল,বুড়ি আমাকে উদ্ধার করার নামে এখানে নিয়ে এসেছে,কিন্তু তাকে এই নরকুন্ড থেকে কে উদ্ধার করবে?

অনুবাদক