বেওয়ারিশ
ওই ওই বিষণ্ণতা যেন একটি ময়ূর, চারদিকে যৌন পেখম মেলেছে
-রুগ্ন কবি, তুমি শুধু এই পেখমের কথা বল
-বহুদিন লাশের ওপর বসে বারবার হিক্কা তুলেছি আমরা
-বহুদিন মর্গের ভেতরে শুয়ে চাঁদের মুখাগ্নি করেছি আমরা
-অন্ধ মেয়ের মউচাক থেকে স্বপ্নগুলো উড়ে চলে গেছে
-জিরাফের লম্বা গলায় দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতার শিকল আটকে যায়
উটেদের লম্বা গলায় আমাদের ক্লান্ত মেয়েরা আত্মহত্যা করে….
(পেখম, জহর সেনমজুমদার)
‘নিন না এক প্যাকেট। টক ঝাল মিষ্টি। বিশ্ববাংলা চানাচুর। মাত্র পাঁচ টাকা’ সন্ধে হয় হয়। হাজিনগর গভর্নমেন্ট কোয়ার্টার স্টপ ছাড়িয়ে আরও খানিকটা এলে জে পি পি, জুবিলি পেপার অ্যান্ড পাল্প। তিয়াত্তর নম্বর বাস থেকে সেই স্টপেজে নেমেছে তিনজন, না না দুজন, আর একজন তো হেঁটে হেঁটে আসছিল। এখন খুব ব্যস্ত পায়ে তারা হেঁটে যাচ্ছে জে পি পি র গেটের দিকে।
‘এই রে, ভোঁ বেজে গেল!’
‘নতুন ম্যানেজারটা হারামি মাইরি, শালা গেলেই উদুম খিস্তি করবে’
‘একটা প্যাকেট নেবেন স্যার, টক ঝাল মিষ্টি, বিশ্ববাংলা চানাচুর, মাত্র পাঁচ টাকা’
নীল উর্দি পরা লোক তিনটে একটু থমকে দাঁড়ায়। চানাচুর হাতে লোকটার গায়েও একই ইউনিফর্ম, ওদেরগুলোর থেকে শুধু আরও বেশি রংচটা, ছেঁড়াও এখানে ওখানে। তারপর তারা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করে শুধু এই মিলের নয়, লোকটার গায়ে আরও অনেকগুলো জামা, আর সবকটাই ওদের চেনা। এই এলাকায় যত মিল আছে, তাদের ইউনিফর্ম এগুলো। গেটের ঠিক মুখটায় দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। এখানে আলো নেই, থাকার কথাও নয়। একটা কত কালের ঝুরি নামানো বট, জায়গাটা আরও ঝুপসি অন্ধকার করে রেখেছে। তবু বুঝতে অসুবিধে হল না ওদের। ওরা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। ওদের মধ্যে যে একটু নেতা গোছের, সে বলল ‘হাঁ করে দেখছিস কী? দেখে বুঝছিস না পাগল? শালা যত মিলে চাকরি করেছি, গেটের সামনে একটা পাগল থাকবেই।’
‘আর সবাই চানাচুর বিক্রি করে, তাই না শিবুদা?’
‘না, সবাই চানাচুর নয়, গরম পানু নিয়েও থাকে কেউ কেউ’
এই কথায় হেসে গড়িয়ে পড়ে অন্য দুজন। ‘শালা আমাদের কারুর দাঁড়ায় না, আবার পানু!’
এগোতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ে একজন।
‘কী হল?’
‘এক প্যাকেট কিনব? শালি বউটা দিনরাত ঘ্যানঘ্যান করে কিছু খাওয়াই না’
‘বউ!’ চমকায় বাকি দুজন।
‘আবার বিয়ে করলি কবে?’
কথা বলতে বলতে ওরা ফার্স্ট ইউনিটের সামনে এসে গেছে। ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। সাদা কাগজের রোল এখনো দু-একটা পড়ে আছে। সেটুকুতেই যা আলো হয়।
ওরা পছন্দ মতো মেশিন বেছে একেকজন একেকটায় চড়ে বসে।
‘এই চল হ্যাট হ্যাট’
‘আরে এ কি গরু পেয়েছিস? সাধে কি বলে গোবলয়!’ বলে কথাটা গিলে ফেলে শিবু, শিবেন্দ্র ভটচায, জেপিপির ভূতপূর্ব ফোরম্যান। তারপর সে আস্তে আস্তে বলে ‘মেশিন হচ্ছে ঘোড়া। হর্স পাওয়ার শুনিস নি?’
বলেই সে ভাবল ঘোড়া চালাতে গেলে মুখে কী রকম শব্দ করতে হয় তার জানা নেই। তাই বলল ‘যাকগে, ঘোড়ায় চড়া তোর কম্ম নয়। তোদের জন্যে গরুই ভাল। গরু। গরু। গো গাবৌঃ গাবঃ’
দুজন যখন মেশিনে চড়ে মুখে বিচিত্র আওয়াজ করতে থাকে, তৃতীয় জন তখন একটা ঝুলিতে লোহা লক্কড় ভরতে ব্যস্ত। হঠাৎ সে সেই স্ক্র্যাপের মধ্যে একটা চকচকে কী দেখে। একটা মেশিনের নেমপ্লেট। ইংরেজি পড়তে না পারলেও সে জানে এটায় জার্মান কম্পানির নাম লেখা আছে। নাম, তৈরির সাল আর মেশিনের ক্ষমতা, তাগদ। সে প্লেটটার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে ভাবে, যেমন মানুষ মরে গেলেও নামটা থেকে যায় , তেমনই মেশিন মরে গেলেও… কিন্তু এই মেশিনগুলো তো মরতে চায়নি। ওই যে তার সঙ্গী দুজন রোজ এসে হ্যাট হ্যাট করে মেশিন চালাবার চেষ্টা করছে, ওরা বিশ্বাস করে এই মেশিনগুলো একদিন জেগে উঠবে, গোটা এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে ঘটাঘট শব্দ। সামনের চা রুটি ঘুগনির দোকানটা আবার ঝাঁপ খুলবে, ঠোঁট টিপে কাচের গ্লাসে চা ঢালতে ঢালতে রমণীধর বলবে, ‘হ্যাঁরে শিবু, কাল রাতে নাকি ননীবাবু এক হিরোইনকে এনে তুলেছিল? মাগী তো মদের পিপে। আব্দুল সাপ্লাই দিতে দিতে থেকে গেছে’ এই আব্দুল ছিল জেপিপি বাংলোর গল্পের খনি। টালিগঞ্জের কাকে না দেখেছে সে, আর সে দেখাও যাকে বলে সুতো ছাড়িয়ে… বাংলোর বাথরুমেও নাকি ঠান্ডা মেশিন আছে, আব্দুল বলেছিল। আর্দালির কাজ ছাড়াও আরও কত কাজ যে করতে হত আব্দুলকে। তার মধ্যে একটা নৌকো বাওয়া। জেপিপির গা ঘেঁষেই তো গঙ্গা। ঘাটে একটা নৌকো বাঁধা থাকত। এক এক রাতে ননীবাবুর সঙ্গিনীর শখ হত নৌকো চড়ার। তখন আব্দুলকেই বৈঠা নিয়ে বসে পড়তে হত। পেছনে না তাকিয়ে সে শুধু আস্তে করে বলত ‘বেশি উথালপাথাল করবেন না সাহেব। এই অন্ধকারে তাইলে আমি নৌকো সামলাতে পারব না।’ তা কি ওরা শোনে?
মদ তো মাথায় চড়ে গেছে ততক্ষণে। আর মদের চেয়েও মারাত্মক এক মাদক। মেয়েমানুষের গলায় এইসময় কীরকম সব আওয়াজ বেরোয়, সে শুনে মাথা ঠিক রেখে নৌকা চালানো কী যে কঠিন! এক রাতে পেছনে বড় বেশি নৈঃশব্দ্য টের পেয়ে কৌতূহল সামলাতে না পেরে আব্দুল পেছনে ফিরে এক মায়া দেখেছিল। দেখেছিল সেই নায়িকা, গায়ে একটা সুতো পর্যন্ত নেই, হাওয়ায় উড়ছে, আর ননীবাবু, তিনিও উদোম, বাক্যরহিত হয়ে দেখছেন সে দৃশ্য। সে কি অপূর্ব শরীর, জিনপরীদের এমন শরীর হয় শুনেছে আব্দুল। বুক দুটো যেন চাঁদের জোছনা দিয়ে তৈরি…
তার হাতের নেমপ্লেটটায় যেন ওমনি জোছনার ফিনিক। কোথাও একটা আওয়াজ হল নাকি? ঝরা পাতার রাশের ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে কেউ? সে তাড়াতাড়ি নেমপ্লেটটা পকেটে ঢোকায়। এটা সে বেচবে না, ঘরে সাজিয়ে রেখে দেবে। কিন্তু ঘর, ঘর তো তার কবেই চলে গেছে সোনপরীর সঙ্গে সঙ্গে । ছেলে মরে যাবার পরপরই সোনপরীও চলে গেল। গভর্নমেন্ট কোয়াটারে ঢোকার ডান ধারে হনুমান মন্দিরের পাশে এলা রঙের একসারি এককামরা ঘরগুলোর একটায় তার সংসার ছিল। সোনপরী যাবার সঙ্গে সঙ্গে সে ঘর সে ছেড়ে দিয়েছে। ছাড়তে হত এমনিতেই। ভাড়া দিত কীভাবে? কিছুদিন এক দেশোয়ালি দাদার ঘরে ছিল। বারান্দায় পড়ে থাকত, কারো অসুবিধে হবার কথা নয়। শুধু ঘরের মধ্যে থেকে ওদের লদকা-লদকির আওয়াজ ওকে উন্মনা করে দিত। তার ওপর কলঘরে যাবার ছুতোয় সেই বউটি, রামদুলারী না কী নাম তার, এসে চড়াও হত তার ওপর। ভেতরে যখন লখন পাসোয়ান ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোত, তখন সেই রামদুলারী তাকে জড়িয়ে ধরত পাকে পাকে। শাড়ি জামা না খুলেই সব পাওনা গণ্ডা বুঝে নিত, এমনি খেলুড়ে মেয়েমানুষ। তার মোটেই খারাপ লাগত না, কিন্তু ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত সারাক্ষণ। লখন জানলে যে শুধু এ ঘর থেকে তাড়িয়ে দেবে তাই নয়, হাজিনগরে কোথাও সে মুখ দেখাবার লায়েক থাকবে না। তাই এক রাতে রামদুলারি তাকে শুষে নিয়ে চলে যাবার পর সে মাথার কাছে রাখা পুঁটলিটা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ল। হাঁটতে হাঁটতে কোয়ার্টারের গেটের সামনে থমকে দাঁড়াল একবার। এখানে তিনটে ঘরে কাজ করত সোনপরী। ছেলেটাকে নিয়ে আসত বিকেলের টেইমে। মাঠে ছেড়ে দিত, টলমল পায়ে দৌড়ত ছেলেটা.. মাঠের বড় বড় ঘাসগুলোর মধ্যে সে সেই কচি পায়ের দৌড়টাকে খুঁজল খানিক ক্ষণ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে, তারপর নিজেকে জোর করে ধাক্কা দিয়ে জুবিলি ব্রিজের দিকে হাঁটতে লাগল।
২
সোনপরী নৌকোয় ভাসতে ভাসতে ননীবাবুকে বলল ‘এবার ফিরবে না, ও বাবু?’
কোথায় ফেরার আছে? ফেরার জায়গা কি আছে আদৌ তার? সোনালি, মিতুল, সিক্তা- গনগনে নক্ষত্র নয় কেউ, টুইঙ্কল টুইঙ্কল লিটল স্টার। একটা দুটোর বেশি সিনেমায় নায়িকার রোল পায়নি। বেশিরভাগই বন্ধু বা বোন, এমনকি বউদি পর্যন্ত। কিন্তু তারাও কেউ ফিরল না এখানে। তাইতো তার নৌকায় শেষ পর্যন্ত সোনপরী! ননীবাবু নিচু হয়ে ওর পেটে চুমু খেল একটা। তার মনে হল কম খেতে পেলেই মেয়েরা সুন্দর হয়। এরকম পেট সোনালি বা মিতুলের জিন্দেগিতে হবে না। ওয়াইন গ্লাসের মতো মুঠোয় ধরা যায়। সোনপরীর গায়ের রংটাও মদের মতো। নাকি কাস্তের মতো? কাস্তে বলতেই সেই বিচ্ছিরি মেয়েগুলোকে মনে পড়ে ননীবাবুর। সেই গামছা নিংড়োনো চেহারার খয়াটে মেয়েগুলো যারা মে দিবসে লাল পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে হারমোনিয়াম বাজিয়ে বেসুরো গলায় গাইত-
‘সাথিদের খুনে রাঙ্গা পথে পথে হায়নার আনাগোনা’। বমি আসত ওদের দেখে। ননী যদিও তখন হোলটাইমার, কিন্তু তার নজরটা বরাবরই উঁচু, তার ওপর তার জামাইবাবু মুখ্যমন্ত্রীর আপ্ত-সহায়ক। ইচ্ছে করলে বড় চাকরি হতে পারত ননীবাবু আর একটু ঝুঁকে সোনপরীর দুই স্তনে দুহাত রাখল। আঃ এই তো সেরা শিল্প! পুঁজি বলো, নারী বলো, সরকার বলো- সব তার হাতের মুঠোয় ছিল সেদিনও। কী যে হল হঠাৎ…
ননীবাবু আচমকা সোনপরীকে বলল ‘তুই হায়না দেখেছিস কখনো?’ সোনপরীর তখন তার ঘরটা মনে পড়ছিল। অন্ধকার মতো ঘরটা, দেওয়ালে ঝোলানো গোল আয়নাটার গায়ে লাল কোঁকড়ানো ফুল, আয়নার পেছনে কায়দা করে সে তার চিরুনিটা রাখে। সে যে বাড়িগুলো ঠিকে কাজ করে, তার একটা শিবুবাবুর। শিবুবাবুর মা, বুড়ো মাসীমা চিরুনিকে বলে চিরুন। ‘এই মেয়ে আমার চিরুন আর চুলের দড়িটা দিয়ে যাবি?’ এখনো কত লম্বা চুল, তেমনি কালো, একটা দুটো পাকা বড়জোর। চিরুনি আর চুলের দড়িতে একটা মেথি-মেথি গন্ধ কী সুন্দর। এখনো বুঝি তেলে মেথি ফুটিয়ে মাখে মাসীমা? বউদিকে জিগ্যেস করতে বলেছিল ‘না না, ওরকম তেল কিনতে পাওয়া যায় বাজারে’ সেই থেকে সোনপরীর মনে দুটো ইচ্ছে।
এক- সে ওরম মেথির গন্ধে ভুরভুর নারকেল তেল কিনবে এক শিশি
দুই- তার একটা মেয়ে হবে। তার নাম রাখবে চিরুন।
সে হুড়মুড়িয়ে উঠে বসে বলল ‘আমাকে একশিশি মেথি দেওয়া তেল কিনে দেবে , ও ননীবাবু?’
৩
শিবুর বাবা ছিল গাইয়ে। বিষ্ণুপুরের যদু ভট্টের বংশ নাকি। শিবুর দু কামরার ঘর, বাইরে ঘরের একফালি তক্তোপোশের ওপর ইক্কতের ছক কাটা চাদর পেতে রেখেছে রত্না। রথের মেলায় কেনা একটা বুককেসে, দু চারটে বই রেখেছে, বিয়েতে পাওয়া ভারত প্রেমকথা, চৌরঙ্গী আর আমি সুভাষ বলছি। জন্মের মুড়ি কম্মে একবার যাওয়া পুরী থেকে আনা শাঁখ, আর এর ওর তার দেওয়া টুকিটাকি- ছোট্ট পোড়ামাটির ঘোড়া, কৃষ্ণনগরের একথালা মাটির ফল, আর একটা কাচের লাঠি শোয়ানো এগুলোর পেছনে, নাড়াচাড়া করলে নানারকম রঙ দেখা যায়। পাঁচ টাকা দিয়ে দক্ষিণেশ্বর থেকে কিনে দিয়েছিল পাপাইকে। একটা ঘড়িও আছে, তার ডায়ালে লেখা ‘মাধ্যমিকে কৃতিত্বের জন্য অর্ণব ভট্টাচার্যকে হাজিনগর ব্যবসায়ী সমিতি থেকে।’ এই ঘড়িটা সারাদিনে কতবার দেখে রত্না, দেখলে ওর মনে একটা জোর আসে, ভাবে পাপাই কোনদিন মিলে কাজ করবে না শিবুর মতো। এই ঘড়িটা ছাড়া তার আর একটা বড় ভরসা, একটা ছবি। মানে বহু পুরনো একটা খবরের কাগজের ছবির কাটিং ফ্রেমে বাঁধানো। গান্ধীজির হাতে ফুলের তোড়া তুলে দিচ্ছে তার শ্বশুর, শিবুর গাইয়ে বাবা। গানের জন্যে যার সরকার বাহাদুরের দেওয়া আবগারি, মানে গাঁজা আপিমের দোকান উঠে গেছিল, গলা কাটলেও সুর বেরোবে না, এমন সব মেয়েকে বিয়ের বাজারে পার করানোর জন্য ‘এসো মা লক্ষ্মী বসো ঘরে’ শিখিয়ে যাকে চোদ্দ পনেরোটা পেট চালাতে হত। দোকান উঠে গেলেও বহুদিন পর্যন্ত শিবুকে লোকে বলত ‘গেঁজা বেপারির ছেলে’। পাপাইকে কি লোকে এখনই বলে ‘বন্ধ মিল শ্রমিকের ছেলে?’ ভাবলে ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায় রত্নার। শিবুর চাকরিতে তার এই কোয়াটার পাবার কথা নয়। তার এক মামা বাড়ি করে চলে গেল নীলগঞ্জ, তাদের বসিয়ে দিয়ে গেল এখানে। কেউ তুলতে পারবে না, ঠিকঠাক পার্টি ধরে থাকলে। এই দু কামরার ঘর সে তকতকে করে রাখে সবসময়, সামনের ঘরে তক্তোপোশের বিছানায় ইচ্ছে করে ফেলে রাখে আধখোলা ম্যাগাজিন, নকশাল মামাতো দেওরদের কাছ থেকে চেয়ে আনা দুরূহ সব বই। কেউ যেন বলতে না পারে এটা মিলের বন্ধ শ্রমিকের ঘর। শ্বশুরের গান্ধিজীর সঙ্গে ছবির পেপার কাটিং আর পাপাইয়ের উপহারের ঘড়ি –এই দুটি ধ্রুবক ছুঁয়ে বসে থাকতে থাকতে রত্না শোনে শাশুড়ি বলছেন ‘একটু চিরুন আর চুলের দড়িটা দিয়ে যাবে বউমা?’ রত্না শুনেও শোনে না। ওঁর কথা উপেক্ষা করে একধরনের আনন্দ পায় সে। সে একটা পত্রিকা হাতে করে ভেতরের উঠোনে চলে আসে। এখানে একটা মস্ত আম গাছের তলায় একটা মাচা বানিয়ে নিয়েছে সে, চুল শুকোতে, চুল না শুকোতে, মিল বন্ধ থাকলে, মিল খোলা থাকলে, – সব রকম কাজে অকাজে সে এখানে এসে বসে থাকে। বই কি পত্রিকা খোলা থাকে কোলে, সে পড়ে কি পড়ে না। কিন্তু এই ঘরের বাইরে বসে থাকাটা সে উপভোগ করে। একটা ধপ করে শব্দ হল। দেখল সোনপরী পাঁচিলের গর্ত দিয়ে ঢুকে এসেছে তার বাড়ি। তাদের এই কোয়ার্টারের চারপাশ উঁচু পাঁচিলে ঘেরা, কিন্তু সে পাঁচিল শেয়ালের ভাঙা বেড়ার মতো, অনেক জায়গায় মানুষ গলে আসবার মতো যথেষ্ট গর্ত। সোনপরী যখন একা আসে, তখন এই গর্ত দিয়েই আসে। ছেলে নিয়ে এলে গেট দিয়ে। গর্তটা একটু উঁচুতে বলে ওকে একটু লাফিয়ে নামতে হয়, আর তাতেই একটা ধপ শব্দ হয়। অবশ্য সে শব্দটা শুধু রত্নাই পায়, এখানে এত পাতার রাশ জমেছে যে শব্দ শুষে নেয়। রত্নার মনে হয় একটা সময় জেপিপি মিলের চত্বরে একটা কুটোও পড়তে পেত না, ঘড়ির কাঁটা ধরে সাফাই চলত। আর মেশিনের কী কানফাটানো আওয়াজ! এখন ঝরা পাতার রাশ জমে জমে একটা টিলার মতো, কিন্তু কোথাও কোন শব্দ নেই যে শুষে নেবে! রত্না ভাবল সোনপরীর দিকে তাকাবে না, হাজার হোক সে ফোরম্যানের বৌ আর ওর বর একটা লেবার। এখানে বসে বসেই সে নির্দেশ দেবে। সিরিয়ালে যেমন দেখায়, চকচকে শাড়ি পরা বউদিমনি আর ঘসা ঘসা রঙ ওঠা শাড়ি পরা কাজের লোক। তবু সে না তাকিয়ে পারল না, এমন একটা টান এ মেয়ের। আর তাকিয়ে রত্না কী দেখল? দেখল সেই ঝরা পাতার রাশের ওপর চিতাবাঘের মতো ওত পাতার ভঙ্গিতে বসে আছে সোনপরী । তার গায়ে সত্যি সত্যি চিতাবাঘ ছাপ হলদে সিন্থেটিক শাড়ি, এটা দু চারবার পড়ার পর রত্নাই ওকে দিয়ে দিয়েছিল। এই শাড়িটা তাকে দিয়েছিলেন শাশুড়ির ভাই, যিনি গরিফায় থাকেন। সেটা দিয়ে দিতে দেখে আপাত উদাসীন শাশুড়ি একটু ব্যথিত স্বরে জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘ শাড়িটা পছন্দ হয়নি? দামি শাড়ি দেবার ক্ষমতা অবিশ্যি অমুর নেই’
রত্না গম্ভীর মুখে বলেছিল ‘দামের জন্যে নয় মা। এরকম লাউড শাড়ি ওদেরই মানায়।’ ইচ্ছে করেই চিপ শব্দটা উচ্চারণ করেনি সে। ভেবেছিল লাউড মানে বুঝতে পারবেন না শাশুড়ি। কিন্তু ক্লাস ফোরে বৃত্তি পাওয়া মাধবী, যিনি চালের ড্রামে প্যারীচরণ সরকারের ফার্স্ট বুক অব ইংলিশ লুকিয়ে রেখে পড়তেন, তিনি একটুখানি রত্নার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন ‘হ্যাঁ একটু চকরাবকরা, ওদেরি মানায়, তবে কি জানো বউমা, মেশিনের কাছে সবার জাতই সমান। আর মিল বন্ধ হলে ওরা ছাতু খেয়ে কাটিয়ে দিতে পারবে, কিন্তু পাপাইয়ের পাতে একটুকরো মাছ তুলে দিতে না পারলে তোমার মন উঠবে না’ রত্নার মুখ লাল হয়ে গেছিল অপমানে। সে আর সোনপরী তাহলে সমান? মাচায় বসে সেই সোনপরীকে দেখতে দেখতে ওর বুকে কেমন গুড়গুড় শব্দ হল। কী মারাত্মক লাগছে আজ সোনপরীকে। ওর কপালে ত্রিভুজের মতো তিনটে কালো ফুটকি, থুতনিতেও কালো টিপ, চোখে গহন কাজল। ঈষৎ লাল চুল একটা লাল কাঁকড়া ক্লিপ দিয়ে ঘাড়ের ওপর তোলা, তাতে ঘাড়ের ওপর করা উল্কিটা বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট করে। দেবনাগরী হরফে যেটা লেখা আছে, সেটা পড়তে পারে না রত্না। সোনপরীর এলা রঙের এককামরার ঘর, ওদের লিট্টি, ঠেকুয়া আর ভোজপুরী গানের মতো এই হরফটা দেখলেও কেমন বিবমিষা জাগে রত্নার। সোনপরী বলেছিল ওখানে হনুমানজীর মন্ত্র লেখা আছে খুব ছোট্ট করে ‘সংকট সে হনুমান ছুটবাই/ মন করম বচন ধ্যান যো লাভাই’ মন্ত্রটা আওড়ে সে রত্নাকে পরামর্শ দিয়েছিল মংগলবার করে হনুমানজীর ব্রত রাখতে। এমনিতে শনিবার বড়ঠাকুরের বার তো মানেই রত্না। বৃহস্পতি মা লক্ষ্মীর জন্য রাখা। বিয়ের আগে সে শুক্রবার শুক্রবার সন্তোষী মাও করেছে, সেই অলকা সিনেমা হলে গিয়ে কিছুতেই ফুচকা না খাওয়ার আত্মপীড়ন মনে পড়লে হাসি পায় আজ। কিন্তু হনুমানের পূজা সে মরে গেলেও করতে পারবে না। তাহলে সে তো সোনপরীই হয়ে গেল। যদিও একদিন সে রাস্তার ধারে বসা কানখুস্কি, ধনেশ পাখির ঠোঁটের লকেট, নজরকাঠি আর হরেক দেবদেবীর পাঁচালির মধ্যে থেকে হনুমানজীর পাঁচালী কিনে এনেছে চুপি চুপি। আর দু একটা মন্ত্রও মুখস্থ হয়ে গেছে তার। এই যে সে মামাতো দেওরের কাছে চেয়ে নিয়ে এসেছে সলঝেৎসিনের ‘ক্যানসার ওয়ার্ড’ বইটা। এর এক বর্ণও সে বোঝেনা, তবু পাতা উল্টোয়, আর পাতা উল্টোতে উল্টোতে তার ঠোঁট নড়ে। সে আসলে বলছে
‘জয় হনুমান জ্ঞান গুণ সাগর
জয় কাপিস তিহুন লোক উজাগর
সঙ্কট সে হনুমান ছুটবাই
মন করম বচন ধ্যান যো লাভাই’
সোনপরীকে চোখের সামনে দেখে ওর ঠোঁট নড়া বন্ধ হয়ে গেল। এই তো মূর্তিমতী সঙ্কট। তার মনে হল সোনপরীর সাজে শুধু একটিই অভাব আছে। ওর খোঁপায় থাকা উচিত ছিল অগ্নিশিখার মতো লাল ফুল। তার মনে হল এরকম একটা মেয়ে পাঁচিলের ওপাশে নয়, এপাশেও থাকতে পারত। ও শ্বাসরুদ্ধ খসখসে গলায় শুধু বলতে পারল ‘কাল থেকে তুই আর আসিস না সোনপরী। আবার মিলে লক আউট। তোর মাইনে দিতে পারব না আমি’
৪
কদিন ধরে গরিফার সুভাষ পল্লীতে খুব উত্তেজনা। অমিয়বাবুরা একটা বাড়ি কিনেছিলেন। পোড়ো বাড়িই বলা চলে। একটা বড় ঘর কোনরকমে ঠিকঠাক করে উঠে আসা। মেয়ের নাহয় আগেই বিয়ে হয়ে গেছিল, কিন্তু দুই ভূতপূর্ব নকশাল ছেলের বড়জন কলকাতায় একটা পাবলিশারের কাছে কাজ করে আর ছোটটা সার্জিকাল জিনিসপত্র-এর এজেন্ট। তারা অনেক দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে এখন একটা সজল, শ্যামল, ভরা-বুকের মেয়ে চায়, তার ভেজা ভেজা জরায়ুতে স্থায়ী চিহ্ন রেখে যাবে। ছোট ছেলে অবশ্য বাবার অপেক্ষায় বসে থাকেনি। সে তুফানগঞ্জের এক ওষুধের দোকানীর মেয়েকে বিয়ে করে, সেখানেই আপাতত থাকে। উত্তরবঙ্গ জুড়ে তার কারবার ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমশ। সে নাকি খুব শিগগির শিলিগুড়িতে ফ্ল্যাট নেবে। কিন্তু বড় তো বিয়ে করবে পাড়ার মেয়েকেই। হাফ প্যান্ট থেকে প্রেম। তাই পাশের একটা ভাঙা ঘর পরিষ্কার হচ্ছিল, আর তা করতে গিয়েই কীসে লেগে ঠং করে শব্দ হল কোদালে। গুপ্তধন! জেপিপি মিলের অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকের বাড়িতে গুপ্তধন!
পাড়ার লোকজন আপিস, ইস্কুল, রান্নাবাড়ি ছেড়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ কেউ চা নিয়ে আসে মিস্ত্রিদের জন্যে। দুপুরের দিকে এত ভিড় হয়, যে ঝালমুড়ি আর ফুচকাওলা এসে বসছে এখানে।
কেউ বলল ‘হবে না? কম পুণ্যের জায়গা এটা? এখন তো মিল হয়ে যত রাজ্যের খোট্টা এসে জুটেছে। এর নাম তো আদতে ছিল গৌরীভা। স্বয়ং মা গৌরী এসে শ্রীমন্ত সদাগরকে ভাত দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন। এই পথেই তো শ্রীমন্ত গেছিলেন সিংহলে। তা কয়েক ঘড়া মোহর কি আর দেবীর পায়ে দেননি শ্রীমন্ত?’
কেউ বলল ‘ কাছেই তো রামকমল সেনের বাড়ি। টাঁকশালে কাজ করতেন রামকমল। দেখো হয়তো কলসী ভর্তি কম্পানির টাকা। দানধ্যানের জন্যে সরিয়ে রেখেছিলেন। এই সব বাড়ি তো ওঁদেরি ছিল একসময়।’
কেউ বলল নকশালদের খুব দাপট ছিল এখানে। নির্ঘাত তাদের অস্ত্রশস্ত্র লুকোনো আছে। এইরকম কত জল্পনা কল্পনা চলতে লাগল, যার কোনটাই ফেলনা নয়। বাস্তবিক এ জায়গাটার একটা ইতিহাস আছে, একটা নয়, অনেক রকমের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের খুদকুঁড়ো জুটে গেলেও জীবনটা কেটে যায় দিব্যি, ভাবছিলেন অমিয়। তিনি ভাগ্নে শিবুকে কত ঈর্ষা করেছেন, সে কেমন সরকারি কোয়াটার পেয়েছে ফাঁকতালে। আর একটা পোড়ো বাড়ি কিনে তিনি এখন রাজা!
কেউ কেউ চাঁদু-বিশুর মাকে বলে গেছে একটা মোহর অন্তত যদি দেন। চাঁদু অবশ্য বলেছে সেরকম কিছু পাওয়া গেলে সরকার এসেই সব নিয়ে যাবে শুধু না, এ বাড়িটাও তারা দখল করবে। বলেছে বটে, কিন্তু এত বড় খবরটা সে অন্তত ভাইকে ফোন করে দিতে পারেনি।
অমিয়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। তখনই মিস্ত্রিরা চিৎকার করে ওঠে ‘বাবু একবার দেখে যান!’
ছুটে যেতে যেতে কানে আসে আতঙ্কিত ফিসফাশ ‘লাশ লাশ!’
ইঁটের পাঁজা থেকে বেরিয়ে এসেছে মেয়েমানুষের কঙ্কাল। কারণ হাতে মোটা মোটা বালা। এতেই গাঁইতি লেগে ঠং করে আওয়াজ হয়েছিল।
শিবানী নিঃশ্বাস চেপে দাঁড়িয়েছিলেন একপাশে। সারাজীবন কত বাড়ি যে পাল্টাতে হল। তিনি অমিয়বাবুর হাত চেপে ধরে খানিকটা হাঁফ ছাড়া গলায় বলেন ‘হ্যাঁগো, লাশ বেরোলে সরকার নেবে কেন? লাশ নিয়ে কী করবে সরকার?’
৫
সে এখন রোজ রাতে জুবিলি ব্রিজের ধারে ঘুরে বেড়ায় আর গঙ্গার দিকে তাকায় থেকে থেকে। যদি নৌকোটা ভেসে যায় এদিক দিয়ে, তাহলে সে ছুটে গিয়ে ধরবে, তারপর নৌকোয় উঠে সোনপরীর মাথাটা কোলে নিয়ে বসবে। আব্দুল বলেছিল সোনপরীকে গলা টিপে খুন করেছে ননীবাবু, তারপর নিজে কোথায় চলে গেছে। যাক গে। কোথায় আর যাবে? ননীবাবুদের পার্টির সে জোশ নেই আর। নতুন কোথাও ননীবাবু মানাতে পারবে নাকি? এক যেতে পারে ওই হিরোইন সোনালির কাছে, তিনি এখন আমার বর তোমার বর, চিতার আগুনে চৈতালি, কাকে ফেলে কাকে রাখি?- এইসব সিরিয়ালের এক নম্বর কুচক্রী শাশুড়ি। সে কিন্তু সোনপরীকে নিয়ে স্বর্গে যাবে সোজা।। দেবতাদের হাতে পায়ে ধরে জিয়ন্ত করে তুলবে সোনপরীকে। তারপর আদরে আদরে ভাসিয়ে দেবে। একটা মেয়ের বড্ড শখ ছিল সোনপরীর…
‘একটা চানাচুর নেবেন স্যার? বিশ্ববাংলা চানাচুর’
সেই লোকটা আবার এখানে জুটেছে? এত রাতে মাতালরাও ঘুমিয়ে পড়েছে,আর ও চানাচুর বেচতে এসেছে! মজা মারবার আর জায়গা পারেনি।
‘শালা বালের চানাচুর!’
লোকটা নির্বিকার মুখে বলে ‘আমি কিন্তু এ লাইনে নতুন নই স্যার। সেই কবে থেকে বিক্রি করছি। প্রথমে ছিল বঙ্গলক্ষ্মী চানাচুর, তারপর এল আজাদ হিন্দ চানাচুর, তারপর একের পর এক বিপ্লব চানাচুর, সর্বহারা চানাচুর, উন্নততর সর্বহারা চানাচুর, এখন চলছে বিশ্ববাংলা। এখানেই কি ভাবছেন গল্প ফুরিয়ে গেল? এবার আসছে একে ফিফটি সিক্স চানাচুর। নাম যাই হোক, সোল এজেন্ট আমি। চোখ বন্ধ করে নিতে পারেন’
‘মরতে এখানে কেন? তুমি না রোজ জেপিপির সামনে চানাচুর বেচো?’
‘ঠিক বলেছেন স্যার। কিন্তু আজ আর সাহস পেলাম না। কীরকম সব আওয়াজ হচ্ছে, অদ্ভুত। একটু ঘাবড়ে গেলাম। মনে হল মেশিনগুলো এগিয়ে আসছে’
সে লোকটার কলার চেপে ধরে বলে ‘ ইয়ার্কি মারার জায়গা পাওনি? মেশিন হেঁটে হেঁটে এগিয়ে আসছে? আর এক নম্বর ইউনিটে তো শিবুদা আর নোলের থাকার কথা। পাতা টেনেছ, না শালা?’
‘বিশ্বাস করুন, আমি নেশা করিনি। চেষ্টা করে দেখেছি, নেশা হয় না আমার। সত্তর আশি বছর ধরে দেখছি, মেশিনরা কোনদিন টুঁ শব্দ করেনি। আজ কী যেন হয়েছে ওদের’
সে খানিকক্ষণ স্থির চোখে দেখে লোকটাকে, তারপর ওর কলার ছেড়ে দৌড়য় জেপিপির দিকে। লোকটাও ওর পেছন পেছন ছোটে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে ‘ওরা মনে হয় বুঝতে পেরেছে, জানেন?’
সে ছুটতে ছুটতেই বলে ‘কী?’
‘বুঝতে পেরেছে এখনো অব্দি এই দেশ চানাচুর ছাড়া কিছু তৈরি করতে পারেনি। বুঝতে পেরেছে পড়ে থাকতে থাকতে ওদের শেকড় গজিয়ে যাবে, হয়তো পাতা গজাবে। হয়তো কেউ ওদের কাঠে আবার কাগজ বানাবার চেষ্টা করবে আর হেরে যাবে, হয়তো ওদের কাঠে আবার নৌকো বানাবে কেউ, মেয়েমানুষ নিয়ে ফূর্তি করার নৌকো’
সে হিসহিস করে বলে ‘তুমি কী করে জানলে?’
লোকটা ওর কথার কোন উত্তর না দিয়ে আপন মনে বলতে থাকে ‘তাই ওরা একটা শেষ চেষ্টা করে দেখছে’
ওরা ততক্ষণে জেপিপির গেটে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রচণ্ড আওয়াজে কানে তালা লেগে যায়, অনেকে যেন এগিয়ে আসছে। সে ফিসফিস করে বলে ‘সরে যাও, ওরা আসছে।’ কিন্তু নিজে সরে না, চানাচুরের প্যাকেট হাতে অগুন্তি ইউনিফর্ম পরা লোকটাও না। দুজনে এগিয়ে যায় আরও, আরও। এক নম্বর, দু নম্বর, তিন নম্বর , সব কটা ইউনিট ভেঙে মেশিনগুলো এগিয়ে আসে। একজোট হয়ে এগিয়ে আসে ডান্ডি রোল, ক্যালেন্ডারিং, সুপার ক্যালেন্ডারিং, অজস্র রোলার। ওদের বুকের ওপর দিয়ে চলে যায়। সমস্ত চানাচুর ছড়িয়ে যায় ইতিহাসের ছেঁড়া পাতার মতো। জেপিপি মিলের সামনে যখন সেই দুটো ছিন্নভিন্ন লাশ পাওয়া যায়, তখন তারা শনাক্তকরণের মতো অবস্থায় ছিল না। শুধু পাশে পড়ে ছিল অসংখ্য নেমপ্লেট, হয়তো কোন এক বা অগণিত নৌকাবিহারের জোছনাদাগ লেগে ছিল তাদের গায়।

এই সময়ের বাংলা সাহিত্যের একজন একনিষ্ঠ কবি ও কথাকার। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, কল্পবিজ্ঞান, মৈথিলী অনুবাদকর্মে তিনি প্রতিমুহুর্তে পাঠকের সামনে খুলে দিচ্ছেন অনাস্বাদিত জগৎ। জন্ম কলকাতায়। শৈশবে নাটক দিয়ে লেখালেখির শুরু, প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘সামগন্ধ রক্তের ভিতরে’, দেশ, ১৯৯২। প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘আবার অমল’ রবিবাসরীয় আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯৯৫।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক তৃষ্ণা পূর্ণসময়ের সাহিত্যকর্মের টানে ছেড়েছেন লোভনীয় অর্থকরী বহু পেশা। সরকারি মুদ্রণ সংস্থায় প্রশাসনিক পদ, উপদেষ্টা বৃত্তি,বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শী অধ্যাপনা, সাহিত্য অকাদেমিতে আঞ্চলিক ভাষায় অভিধান প্রকল্পের দায়িত্বভার- প্রভৃতি বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁর লেখনীকে এক বিশেষ স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে।
প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে- পূর্ণেন্দু ভৌমিক স্মৃতি পুরস্কার ২০১২, সম্বিত সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩, কবি অমিতেশ মাইতি স্মৃতি সাহিত্য সম্মান ২০১৩, ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার (বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ) ২০১৩, ডলি মিদ্যা স্মৃতি পুরস্কার ২০১৫, সোমেন চন্দ স্মারক সম্মান (পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি) ২০১৮, সাহিত্য কৃতি সম্মান (কারিগর) ২০১৯ ও অন্যান্য আরো পুরস্কার।
প্রকাশিত গ্রন্থ
কবিতা
বেড়াল না নীলঘন্টা?, একুশ শতক, ২০০২
উলটে মেলো, একুশ শতক, ২০১৩
অজাতক সমগ্র থেকে, কলিকাতা লেটারপ্রেস, ২০১৭
গোপন ট্যাটু, কৃতি, ২০১৮
লাইব্রেরি শার্ট খোলো, কৃতি, ২০১৯
অনুবাদ কবিতা
অজিত আজাদের কবিতা, নবারম্ভ প্রকাশন, ২০১৮
মূল মৈথিলী থেকে অনুবাদ- তৃষ্ণা বসাক
গল্প
ছায়াযাপন, একুশ শতক, ২০০৯
দশটি গল্প, পরশপাথর, ২০১১
নির্বাচিত ২৫টি গল্প, একুশ শতক, ২০১৪
ইয়াকুবমামার ভারতবর্ষ, প্রশাখা প্রকাশনী, ২০১৮
গল্প ৪৯, কৃতি, ২০১৯
উপন্যাস
বাড়িঘর, একুশ শতক, ২০১১
অনুপ্রবেশ, এবং মুশায়েরা,২০১৭
এখানে টাওয়ার নেই, একুশ শতক, ২০১৭
স্বপ্নের শিকারা, এবং মুশায়েরা, ২০১৯
অগ্নিবলয়, আকাশ, ২০২০
প্রবন্ধ
প্রযুক্তি ও নারী- বিবর্তনের প্রতি-ইতিহাস, গাংচিল, ২০১০
মেয়েদের একাল, সেকাল ও চিরকাল, সোপান, ২০২০
প্রযুক্তি
ছাপাখানার অ-আ-ক-খ, শিশু কিশোর আকাদেমি, ২০১০
সহলেখক- সৌমেন বসাক
সম্পাদনা
ভারতীয় ভাষার গল্প, এবং মুশায়েরা,২০১৭
মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্প, এবং মুশায়েরা, ২০১৭
চমৎকার। ঈর্ষণীয় গদ্য।
ধন্যবাদ
এ-তো অণু উপন্যাস!
ভালো লাগলো।
অসাধারণ লেখা