“আমার আবার উল্টো আর সোজা, রথ এলেই আমার কাজ বাড়ে‘ বিমলি পিসির বিলাপ শুরু হল।
মন্দিরের ভেতর লক্ষ্মীমাসীর এই কটাদিন বেশ ঢিলেঢালা ছিল কাজেকম্মে। দেখতে দেখতে এগিয়ে এল সেই দিন! মন্দিরের বাইরে এসে চেঁচিয়ে বলল লক্ষ্মীমাসী,
“দিদি গো, হয়ে গেল আমাদের গল্প করা। এবার কাজ করতে করতে পরাণ বেরিয়ে যাবে গো দিদি‘
বিমলিপিসি বলল, “কেন তোর তো খুব ভাল লাগে ওনার সেবাটেবা করতে। ঐ নিয়েই পড়ে থাক সারাটা জীবন‘
“দিদি অমন বোলোনা। উনি বহুরূপী। আজ পুণর্যাত্রা। মাসীর বাড়ি গেছেন সবেমাত্র আটদিন। যেতে না যেতেই মন উচাটন দিদি। তোমার হয়না এমন?’
“হলেই বা কি ! উনি কি আর আমার জন্যে ভাবেন? ওনার তুমি হলে কিনা খাস সুয়োরাণী। তারপর আছেন সেই মাসী আর বোন। তাদের জন্যে ভাবতে ভাবতে আমার কথা ভাববার আর সময় কই? তা বাপু, মাসীর বাড়ি গেছ ফূর্তি করতে, আরো কটাদিন থাকলেই পারতে!বুঝিনা কি আর? যদি পুরীর মন্দিরের সব ক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে যায়। অত কাঠখড় পুড়িয়ে যাওয়া আর আসাই সার! কথায় বলে না আসতে পাগল,যেতে ছাগল‘
“দিদি অমন বোলোনা। উনি সবজান্তা।‘
“কেন বাপু? মাসীর জন্যে দরদ উথলে উঠছিল তা আবার সেই দরদ বাষ্প হয়ে উবে গেল‘
আজ সকাল থেকেই বিমলিপিসি শুনতে পাচ্ছেন কানাঘুষো। খোলকত্তাল নিয়ে সব জগন্নাথ, জগন্নাথ করতে করতে ভাবে বিভোর হয়ে পুরবাসীরা পথে নেমেছেন । তিন মক্কেলে মাসীর বাড়ি থেকে এই রওনা দিল বলে।
“মাসীর বাড়িতে এই কটাদিন খাওয়াদাওয়ায় খুব অনিয়ম হয়েছে…কাজের মাসীটা আমার উঠোন ধুতে ধুতে বলছিল। কে জানে, বদহজম,গ্যাস, অম্বল হল কিনা! কত করে বল্লুম,ডাইজিনের পাতাটা, জেলুসিলের বোতলটা সঙ্গে রাখ। তা ওনার দাদা বল্লেন, তুমি অত চিন্তা কোরোনা বৌদি। আমাদের কিছু হবেনা। জামার পকেট নেই। কোথায় নেব ওষুধপালা। আমি বল্লুম, এই মহাস্নানের পর জ্বরজারি থেকে উঠলে সকলে। তা আমার কথা শুনবে কেন‘
“যার বিয়ে তার হুঁশ নেই, পাড়ার লোকের ঘুম নেই! কাজের মেয়ে অষ্টমীটা বলছিল,
“সকাল থেকে গুন্ডিচায় সাজো সাজো রব। তা বলি মাসীর বুঝি বোনপো,বোনঝিদের বিদেয় দিতে কষ্ট হবেনি?’
” এত রমরম করে তাদের পাঠিয়ে দিচ্ছে ক্যান রে অষ্টমী?’ তা অষ্টমী বলল,
” মা, রথের ঝাড়াপোঁছা, সাজসজ্জা নিয়ে মত্ত লোকজন। হরিনামে মাতোয়ারা তারা। চন্দনবাটা, অগরুর সুরভিতে ম ম করছে পথঘাট‘
বিমলিপিসি বলল,
“তুই থামবি অষ্টমী? কাজগুলো শেষ কর আগে। বলি এতই যদি মাসীর আহ্লাদেপনা তা আর কটাদিন থাকতে পারলনা তারা? শরীরটা বিগড়ে গেলে আর মাসী কোথায় ? তখন এই বিমলির কথা মনে পড়ে। আবার যত্ন–আত্যি করে, পথ্যি করে সারিয়ে তুলব তারপরে আর চিন্তে পারবেনা আমাকে।‘ অষ্টমী বললে,
“জানো মা? সেখানে পুজোর সব বাসনকোসন ঝকঝক করছে। তেনাদের রাজবেশ বিরাট ট্রাঙ্কে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে লোকজন। কেউ নারকোল কুরছে, কেউ ম্যাওয়া কুচোচ্ছে। দুধ ফুটে ঘন হয়ে ক্ষীর হচ্ছে। বড় বড় মাটির মালসায় কলাপাতায় ভোগরাগ প্রস্তুত হচ্ছে গো । রথের মধ্যে ঘড়া ঘড়া জল ঢেলে সাফ করছে‘
বিমলা কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন,আচমকা লক্ষ্মীমাসী এসে বল্লেন,
“দিদি, শূন্য এ মন্দির বেদীটা আর দেখতে ভাল লাগেনা গো। অপেক্ষায় আছি আমি। শুতে বসতে পারছিনা একমূহুর্ত। কেবল মনে হচ্ছে ঐ বুঝি রথ এল! কেন এমন হয় গো দিদি? এর নামই বুঝি বিরহ?’
“আদিখ্যেতা করিসনি ছোটো। পাড়ার লোকেদের আদেখলাপনা আর ভাল্লগেনা আমার। পুষ্পবৃষ্টি করবে,কেওড়া, আতর, অগরু,কর্পূরের জল ফোয়ারার মত ছেটাবে তাঁর সব্বো অঙ্গে। নাচ–গান–ওডিশী নৃত্যের মধ্যে দিয়ে তাঁকে বিদায় দেবে, সারাক্ষণ হাতপাখা দিয়ে বাতাস করবে, চামর দোলাবে,মাথার ওপর ছাতা ধরবে আর আমি বাপু জীবনে একটু যত্ন পেলুমনি! বেশ আছ বাপু তোমরা তিনটিতে মিলে। খাচ্চদাচ্ছ,লাইভ নাচাগানার প্রোগ্রাম দেখছ, এই বেশ হাওয়া বদল হল তোমাদের। আমার কথাটা ভেবেছ একবার? নিজেদের বেলায় আংটিশুটি, আমার বেলায় দাঁতকপাটি। কেন একবার আমাকে নিয়ে যেতে নেই বুঝি মাসীর বাড়ি?সারাবছর মাসীটা খবর নেয়না, ঝিঙের বাড়িও মারেনা আর এঁরা ঐ মাসীর বাড়ি যায় ফূর্তি মারতে।‘
লক্ষ্মীমাসী বলে উঠল, “এবার এলেই লিপিড প্রোফাইলটা চেক করাতে হবে দিদি। যে হারে মাখন, ননী খাচ্ছে এঁরা।‘
বিমলিপিসি বলল, “যাবার আগে বলেছিলুম পইপই করে। শুনলনা। এবার আসছে দুলকিচালে নাচতে নাচতে, আর আমার মাথাটা খেতে‘
– ঐ বুঝি রথ এসে গেল, দ্যাখ তো অষ্টমী।
বিমলিপিসির এই বয়েসেও মিনসেটার জন্য বুকের ভেতরটা কেমন জানি করে উঠছে।
– কেন এমন হচ্ছে রে লক্ষ্মী? তোরও হচ্ছে নাকি? তারা গ্যাছে মাত্র আটদিন হল, আর মনে হচ্ছে আট বছর।
– দেখেছ তো দিদি, কেন ওরা মাসীর বাড়িতে অতদিন থাকেনা? এই তোমার জন্য, বুঝেছ? তোমাকে ছেড়ে উনি এক মূহুর্ত থাকতে পারেন না।
বিমলিপিসি মুচকি হেসে, ব্লাশ করতে করতে বলল,
– তাই? তুই যেন সবজান্তা।

উত্তর কলকাতায় জন্ম। রসায়নে মাস্টার্স রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ থেকে। বিবাহ সূত্রে বর্তমানে দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা। আদ্যোপান্ত হোমমেকার। এক দশকের বেশী তাঁর লেখক জীবন। বিজ্ঞানের ছাত্রী হয়েও সাহিত্য চর্চায় নিমগ্ন। প্রথম গল্প দেশ পত্রিকায়। প্রথম উপন্যাস সানন্দা পুজোসংখ্যায়। এছাড়াও সব নামীদামী বাণিজ্যিক পত্রিকায় লিখে চলেছেন ভ্রমণকাহিনী, রম্যরচনা, ছোটোগল্প, প্রবন্ধ এবং ফিচার। প্রিন্ট এবং ডিজিটাল উভয়েই লেখেন। এ যাবত প্রকাশিত উপন্যাস ৫ টি। প্রকাশিত গদ্যের বই ৭ টি। উল্লেখযোগ্য হল উপন্যাস কলাবতী কথা ( আনন্দ পাবলিশার্স) উপন্যাস ত্রিধারা ( ধানসিড়ি) কিশোর গল্প সংকলন চিন্তামণির থটশপ ( ধানসিড়ি) রম্যরচনা – স্বর্গীয় রমণীয় ( একুশ শতক) ভ্রমণকাহিনী – চরৈবেতি ( সৃষ্টিসুখ) ২০২০ তে প্রকাশিত দুটি নভেলা- কসমিক পুরাণ – (রবিপ্রকাশ) এবং কিংবদন্তীর হেঁশেল- (ধানসিড়ি)।অবসর যাপনের আরও একটি ঠেক হল গান এবং রান্নাবাটি ।