অনুবাদ উপন্যাস: উচ্চাকাঙ্ক্ষা (পর্ব -১)। হোমেন বরগোহাাঞি
লেখক পরিচিতি-১৯৩২ সনে লখিমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোটো গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।
এক
আমি তখন গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। বয়স নয় দশ বছর। যে শিক্ষক আমাদের সাহিত্য পড়াতেন তিনি মাঝেমধ্যে পাঠ্যপথিক একপাশে রেখে আমাদের গল্প বলতেন। যখন তার পাঠ্যপুথি পড়াতে ইচ্ছা করত না এবং গল্প বলতে ইচ্ছা করত না, তখন তিনি আমাদের সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলতেন ;আমাদের পরিবারের খবরা-খবর নিতেন। স্কুলের অন্য সমস্ত শিক্ষকদের চেয়ে এই শিক্ষকটি একটু আলাদা প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। সেই জন্য আমরা ছেলেরাও তাকে খুব ভালোবাসতাম।
একদিন তিনি আমাদের পাঠ্যপুঁথি পড়াতে পড়াতে কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়ালেন। আমরা ভাবলাম যে তিনি বোধহয় এখন পাঠ্যপুঁথি সরিয়ে রেখে আমাদের কোনো একটি গল্প বলতে আরম্ভ করবেন। আমরা প্রত্যেকেই আমাদের মনের মধ্য দিয়ে আনন্দের বিদ্যুৎ স্রোত বয়ে যাওয়া যেন অনুভব করলাম। এতক্ষন বিরক্তির বোঝা আমাদের কুঁজো করে রেখেছিল।কিন্তু স্যার পাঠ্য পুঁথিটা বন্ধ করে সামনের টেবিলে রেখে দিয়ে নীরবে আমাদের মুখের দিকে চাওয়া মাত্র আমরা নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসে গল্প শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইলাম।
আমাদের কিছুক্ষণ কৌতূহলে রেখে স্যার অবশেষে বললেন—’তোরা বোধহয় ভেবেছিস যে আমি এখন তোদের কাছে গল্প বলব ।কিন্তু আজ আমার গল্প বলতে ইচ্ছা করছে না। আজ আমি তোদের সঙ্গে একটা সম্পূর্ণ নতুন বিষয়ে কথা বলতে চাই। কিন্তু কথা বলার আগে আমি তোদের প্রত্যেককে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করব। তোদের উত্তরগুলি শোনার পরে আমি সেই বিষয়ে তোদের সঙ্গে কিছু কথা আলোচনা করব। এখন প্রশ্নটি ভালো করে মনোযোগ দিয়ে শোন,কারণ এই ধরনের প্রশ্ন আমি এর আগে তোমাদেরকে কখনও জিজ্ঞেস করিনি। আমার প্রশ্নটি হল: ‘তোরা বড়ো হয়ে জীবনে কী হতে চাস?’
স্যারের প্রশ্ন শোনার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ক্লাসরুম একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। এর আগেও স্যার অনেকবার পাঠ্যপুঁথিতি বন্ধ করে রেখে আমাদের নানা ধরনের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছেন। আজ স্কুলে আসার আগে তোরা বাড়িতে কি খেয়েছিলি? তোদের বাড়িতে কতগুলি গরু আছে? হালের গরু কয়টি এবং দুগ্ধবতী গাভী কয়টি? প্রতিদিন দুধ খেতে পাস তো? তোদের বাগানে কীকী ফলমূলের গাছ আছে? তোদের কেউ ভূত দেখেছিস? ভূত আছে বলে বিশ্বাস করিস কি?… স্যারের এই সমস্ত প্রশ্ন শুনে আমরা খুব খুশি হতাম, কারণ চটপট প্রশ্নগুলির উত্তরের উত্তর দিতে পারা ছাড়াও আমাদের উত্তরগুলি শোনার পরে স্যার সেই বিষয়ে দেওয়া মন্তব্যগুলিও আমাদের খুব আনন্দ দান করত। উদাহরণস্বরূপ দুধ বা ফলমূলের কথা উঠলে সেগুলি খাওয়ার উপকারিতা সম্পর্কে আমাদের যতটুকু কথা জানা দরকার সেই সমস্ত কথা তিনি আমাদের খুব ভালো করে বুঝিয়ে দিতেন। ভূতের কথা উঠলে তিনি নিজে জানা এবং অন্যের কাছ থেকে শোনা ভূতের বিচিত্র কাহিনি আমাদের শোনাতেন। সত্যি কথা বলতে গেলে আমরা স্যারের মুখে গল্প শুনতে যতটা ভালোবাসতাম তার চেয়েও বেশি খুশি হতাম এই প্রশ্নগুলি শুনে, কারণ প্রশ্নের জিজ্ঞেস করার ছলে তিনি আমাদের পাঠ্যপু
থি এবং শ্রেণী কোঠার ক্ষুদ্র জগতের সীমা পার করিয়ে বাইরের একটি বিশাল পৃথিবীতে নিয়ে যেতেন। তিনি প্রায়ই আমাদের একটা কথা বলতেন —মানুষের কাজ হল প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা এবং তার উত্তর খোঁজা। তোরা এখন খুব ছোটো, সেই জন্য আমি বলা কথাটা তোরা এখনই ভালোভাবে বুঝতে পারবি না। কিন্তু কথাটা তোরা সব সময় মনে রাখবি। অবশ্য একটা কথা তোরা এখনই নিশ্চয় বুঝতে পারবি। মানুষ ছাড়া অন্য কোনো ইতর প্রাণী—পশু পাখি বা কীটপতঙ্গ— কখনও কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে না।একমাত্র মানুষই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে। লক্ষ লক্ষ বছর আগে মানুষ এবং পশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না ।কিন্তু যেদিন মানুষ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে এবং তার উত্তর খুঁজতে শুরু করল সেদিন থেকেই মানুষের মানুষ হওয়ার যাত্রা আরম্ভ হল। মানুষ যখনই বেশি করে প্রশ্ন করে তখনই সে উন্নতির পথে বেশি দ্রুত এগিয়ে যায়। প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকলেই মানুষ এক জায়গায় থমকে থাকে। তোরা বড়ো হয়ে যখন বড়ো বড়ো বই পড়বি ,মানুষের ইতিহাস পড়বি ,তখন তোরা এই সমস্ত কথা বেশি ভালো করে বুঝতে পারবি। এখন কেবল এই কথাটা জেনে রাখ : প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা এবং তার উত্তর খোঁজাটাই হল মানুষের প্রধান কাজ।’
‘তোরা বড়ো হয়ে জীবনে কী হতে চাস?’
স্যারের প্রশ্নটা শুনে আমরা কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে মুখের বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম।তারপরে আমরা একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগলাম। তখনই স্যার পুনরায় বলে উঠলেন—’সদানন্দ প্রথমে তুই বলতো– তুই ভবিষ্যতে কী হতে চাস?’
সদানন্দকে শ্রেণীর সবচেয়ে গাধা ছাত্র বলে ধরা হয়। প্রত্যেক শ্রেণিতে দুই তিন বছর বিশ্রাম নিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণী পৌঁছাতে পৌঁছাতে সে প্রায় যুবক হল। শ্রেণির একেবারে শেষের বেঞ্চে বসে সে শিক্ষকের দৃষ্টি থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চায়। শিক্ষকরাও তাকে কদাচিৎ কখনও প্রশ্ন করে।এরকম ক্ষেত্রে আজ যে স্যারের চোখ সর্বপ্রথমে তার উপরে পড়বে —তার মধ্যে এরকম একটি কঠিন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য —সে কথা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
স্যার সদানন্দের নামটা নেওয়া মাত্র আমরা শ্রেণির প্রতিটি ছেলে মাথা ঘুরিয়ে তার মুখের দিকে তাকালাম। সে ইতিমধ্যে স্যারের প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু আত্মবিশ্বাসের অভাবে সে সম্পূর্ণ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেনা। তার চোখে মুখে একটা আতঙ্ক এবং বিহ্বলতার ভাব ফুটে উঠেছে।স্যারের এই প্রশ্নটা শুনে আমরাও প্রথমে হতবুদ্ধি হয়েছিলাম।যদিও প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার জন্য স্যার প্রথমে সদানন্দকে নির্বাচিত করার জন্য পুরো কথাটির মধ্যে আমরা হঠাৎ একটা খেলার উত্তেজনা খুজে পেলাম।শ্রেণির সবচেয়ে গাধা ছাত্র সদানন্দ বড়ো হয়ে কী হতে চায় সে কথা জানার জন্য আমরা প্রত্যেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
সদানন্দ বলার মতো কিছুই খুঁজে না পেয়ে কয়েক মুহূর্ত মাথা নিচু করে চুপ করে রইল। কিন্তু স্যার পুনরায় ’ সদানন্দ’ বলার সঙ্গে সঙ্গে সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ইতস্তত করে উত্তর দিল —’স্যার, আমি সিপাহি হব।’
এতক্ষণ আমরা ছেলেরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে একদৃষ্টিতে সদানন্দের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কিন্তু তার উত্তর শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা পুনরায় নিঃশ্বাস নিতে আরম্ভ করে হো হো করে হাসতে লাগলাম। স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম —তিনিও মুখ টিপে হাসছেন।
সদানন্দ সিপাহি হতে চাওয়ার কারণটা বুঝতে আমাদের বেশি সময় লাগল না। তার পিতা দর্জি। যে সময়ের কথা বলছি সেই সময়ে আমাদের জকাই–চুকিয়া গ্রামের চাষিদের বা তাদের ছেলেমেয়েদের কাপড়-চোপড় পড়ার শখ খুব কম ছিল।। তাই দর্জি হিসেবে তার উপার্জন ছিল খুবই সামান্য; কোনোমতে জীবনধারণ করার মতো। এরকম অবস্থায় সদানন্দ বড়ো হয়ে দর্জি হতে না চাওয়াটাই বেশি স্বাভাবিক। অনযদিকে সদানন্দদের বাড়ির ঠিক সামনে ছিল থানাটা। তখন দেশে ব্রিটিশের শাসন চলছে। বিদেশি ব্রিটিশ শাসক সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল আইন-শৃঙ্খলা করার বিষয়টাকে ,কারণ তারা ধরে নিয়েছিলেন যে সর্বসাধারণ প্রজাকে আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে পারলেই এই দেশে ব্রিটিশের শাসন স্থায়ী এবং নিরাপদ হতে পারবে।এইজন্য তাঁরা থানার দারোগাকে যথেষ্ট ক্ষমতা দিয়েছিল;প্রতিটি থানাই হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশ শাসনের প্রতিভূ। সর্বসাধারণ মানুষ থানাকে এরকম সমীহের দৃষ্টিতে দেখত যে দারোগাটি মাত্র ছয় জন সিপাহির সাহায্যেই একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজের কর্তৃ্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল।নিজের বাড়ির সামনে থানাটা হওয়ার জন্য সদানন্দ সিপাহিদের কুচকাওয়াজ এবং দাদাগিরি দেখার সুযোগ পেয়েছিল।সেইজন্য সে হয়তো নিজের অজান্তেই তার মনে সিপাহি হওয়ার বাসনা ঠাঁই করে নিয়েছিল;শিক্ষকের প্রশ্নটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই স্বতঃস্ফুর্তভাবে তার মুখ দিয়ে উত্তরটা বেরিয়ে এসেছিল—বড়ো হয়ে সে সিপাহি হতে চায়।
আমার যতদূর মনে পড়ে,আমাদের শ্রেণিতে তখন ছাত্র ছিল মাত্র পনেরো-ষোলজনের মতো।প্রতিটি ছাত্রের উত্তর এখন আমার নেই।এত বছর পরে মনে থাকাটাও সম্ভব নয়।কিন্তু সদানন্দের সিপাহি হতে চাওয়া কথাটা যেভাবে আমার মনে গভীরভাবে ছাপ বসিয়ে রেখে গেল,ঠিক সেভাবেই অন্য কয়েকটি উত্তর আমি আজ পর্যন্ত ভুলতে পারিনি।উত্তর গুলির বিশেষত্ব নিশ্চয় তার একমাত্র কারণ।
উদাহরণ স্বরূপ,পদ্মনাথের কথা বলতে পারি।পড়াশোনায় সে মাঝালি ধরনের ছাত্র ছিল,কিন্তু তার স্বভাব-চরিত্র খুব ভালো ছিল।শিক্ষক-ছাত্র সবাই তাকে সমান ভালোবাসত।যখন তার উত্তর দেবার পালা এল,সে একবার শিক্ষকের মুখের দিকে তাকিয়ে আর একবার মাথা নিচু করে কিছুসময় নীরব হয়ে রইল।প্রতিটি ছাত্রের উত্তর শোনার জন্য যেভাবে আমরা বাকি ছাত্ররা নিশ্বাস বন্ধ করে এবং কান খাড়া করে অপেক্ষা করছিলাম,পদ্মনাথের উত্তর শোনার জন্যও আমরা ঠিক সেভাবে তার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। অবশেষে আমাদের প্রত্যেকের কৌতুহলের অবসান ঘটিয়ে সে ঘোষণা করল—’ স্যার আমি দোকানি হতে চাই।’
সদানন্দের উত্তর শুনে আমরা যেভাবে হেসে উঠেছিলাম, পদ্মনাথের উত্তর শুনে কিন্তু আমরা কেউ সেভাবে হাসার কথা ভাবলাম না। বরং আমরা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে নীরবে মাথা নেড়ে এরকম একটি ভাব প্রকাশ করলাম যে পদ্মনাথ একটা বড়ো কিছু বলেছে। পদ্মনাথের বড়ো দাদার একটি মুদির দোকান ছিল । সকালের দিকে মাঠে হাল চাষ করে দুপুরের দিকে তিনি দোকানে বসতেন। রবিবার এবং বন্ধের দিনে পদ্মনাথ ও দোকানে গিয়ে দাদাকে একটু সাহায্য করে দিত। গ্রামের চাষার জীবন অত্যন্ত কষ্টকর। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তাদের মাঠে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু পদ্মনাথ দাদার দোকানে বসে বসে একটা কথা আবিষ্কার করেছে যে মাঠে কাজ করার তুলনায় দোকানে বসে বসে নুন তেল বিক্রি করার কাজটাকে স্বর্গসুখ বলা যেতে পারে।আসলে গ্রামের ছেলে বুড়ো প্রত্যেকেই দোকানিদের কিছুটা ঈর্ষার চোখে দেখে।। বোধ হয় সেই জন্যই গ্রামের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের একটি অতি প্রিয় খেলা হল দোকানি দোকানি খেলা।আমি নিজেও আমার ভাই বোন এবং প্রতিবেশী সমবয়সী ছেলে মেয়েদের সঙ্গে বহুদিন এই খেলা খেলেছিলাম, আর নিজেকে দোকানি রূপে কল্পনা করে তীব্র আনন্দ পেয়েছিলাম। সেই জন্য পদ্মা নাথের দোকানি হওয়ার ইচ্ছার কথা শুনে আমরা কেউ আশ্চর্য তো হইনি— বরং আমরা প্রত্যেকেই এই বলে অনুভব করলাম যে সে যেন আমাদের প্রত্যেকের মনের ইচ্ছাই ব্যক্ত করেছে।
কিন্তু তা বলে আমার নিজের যখন উত্তর দেবার পালা এল, তখন আমি কিন্তু বললাম না যে আমি বড়ো হয়ে দোকানি হতে চাই।শ্রেণির প্রথম বেঞ্চে বসা ছেলে হিসেবে আমার উত্তর দেবার পালা পড়েছিল সবার শেষে। তাই আমি আমার উত্তরটা চিন্তা করার জন্য অনেক সময় পেয়েছিলাম। অন্য ছেলেগুলোর উত্তর দেবার সময় আমার মন ঘড়ির দোলকের মতো দোলায়িত হয়েছিল দুটো চিন্তার মধ্যেঃ আমি ডাক্তার হব না সম্পাদক হব?
আমি ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম এবং সম্পাদকও হতে চেয়েছিলাম। দুটোই হতে চাওয়ার বিশেষ কারণও ছিল। আমাদের গ্রামে তখন ম্যালেরিয়া , কলেরা, গ্রহণী এবং বসন্ত আদি রোগের প্রাদুর্ভাব ছিল অত্যন্ত বেশি। বিশেষ করে ম্যালেরিয়া ছিল গ্রামীণ মানুষদের চিরসঙ্গী। আমি নিজে প্রায় জন্মের পর থেকে যৌবনে পা দেওয়া পর্যন্ত একনাগারে বহু বছর ধরে ম্যালেরিয়ায় ভুগেছিলাম ।জ্বর যখন আমার মাথায় উঠে ছিল এবং আমার প্রায় যাই যাই অবস্থা হয়েছিল, তখন ডাক্তার ডাকা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না ।যেহেতু বছরে অনেকবার এরকম অবস্থা হয়েছিল, সেই জন্য ডাক্তারকেও আমাদের বাড়িতে ঘনঘন আসতে হত।ডাক্তার ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরে কিছুদিনের জন্য, কখনও কয়েক সপ্তাহের জন্য , আমি জ্বরের যন্ত্রণা এবং বিভীষিকা থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম। সেই জন্য যন্ত্রণায় বিহ্বল হয়ে থাকা চোখে ডাক্তারকে দেখা মাত্রই আমি মনে গভীর শান্তি অনুভব করতাম এবং তাকে সাক্ষাৎ ঈশ্বর বলে ভাবতাম। সেই সমস্ত মুহূর্তে নিশ্চয়ই আমার মনে ডাক্তার হওয়ার বাসনা জায়গা করে নিয়েছিল।
আমাদের বাড়ির ছোটো গ্রন্থাগারটিতে কয়েকশো বইয়ের সঙ্গে কয়েকটি অসমিিয়া- বাংলা পত্র-পত্রিকা ও ছিল। শৈশব থেকেই সেই সব নাড়াচাড়া করে আমি খুব আনন্দ পেতাম। সেই সময় আমি দ্বিতীয় বিভাগের ছাত্র হয়ে থাকতেই আমার কাকাবাবু আমাকে’ তরুণ অসম’ নামের একটি খবরের কাগজের গ্রাহক করে দিয়েছিল। তরুণ অসমের সম্পাদক ছিলেন অসমিয়া ভাষার অন্যতম ব্যক্তিত্ব বেনুধর শর্মা।কী জন্য বলতে পারিনা, ‘তরুণ অসম’ পড়তে পড়তে সেই শৈশবেই আমার খবরের কাগজের সম্পাদক হতে ইচ্ছা হল। খবরের কাগজটি আমাদের বাড়িতে আসার পর থেকেই কাগজটা আমার নিঃসঙ্গ খেলার একটি নতুন সঙ্গী হল। সময় পেলেই আমি ঘরের একটি নির্জন কোণে বসে নিয়ে ‘তরুণ অসম’ নকল করে একটি হাতে লেখা খবরের কাগজ করি। কাগজটার নাম দিই কখনও ‘সোনার অসম’ কখনও বা ‘মাতৃভূমি’। সম্পাদক হিসেবে প্রথম পৃষ্ঠায় বড়ো বড়ো অক্ষরে নিজের নামটা লিখি । কিন্তু শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি যখন উঠে দাঁড়ালাম, আমার মুখ থেকে স্বতঃস্ফুর্তভাবে বেরিয়ে গেল— ‘স্যার, আমি বড়ো হয়ে একজন ডাক্তার হতে চাই।’

অনুবাদক