আধুনিক যুগের জন্ম কাহিনি (পর্ব -৫)। হোমেন বরগোহাঞি
১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ‐– বাসুদেব দাস
নবজাগরণের যুগ তথা আধুনিক যুগের মর্ম বাণী ছিল এটাই: কল্পিত পরকাল থেকে আমরা আমাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনতে হবে এই বাস্তব মাটির পৃথিবীতে। আমাদের পার্থিব জীবনটাকে অসাড় এবং অনিত্য বলে ভেবে তাকে অবহেলা করার পরিবর্তে আমরা আমাদের সমস্ত শক্তি এবং সময় প্রয়োগ করতে হবে মানুষের পার্থিব অস্তিত্বের পরিপূর্ণতম বিকাশের জন্য। ভারতীয় সভ্যতার স্বর্ণযুগে রামায়ণের শ্রীরামচন্দ্রও দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলঃ’ এই পৃথিবীই হল আমাদের আসল কর্মভূমি।’ ঠিক তারই যেন প্রতিধ্বনি শোনা গেল নবজাগরণের যুগের ইউরোপের মানুষের কন্ঠে।
নবজাগরণের যুগে মানুষের এই নতুন বিশ্ব-বীক্ষাতথা জীবনবোধের আসল তাৎপর্য বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ইউরোপের ইতিহাসের তার পূর্ববর্তী প্রায় এক হাজার বছরে। এই এক হাজার বছর(৫০০খ্রিঃ–১৪৫০ খ্রিঃ পর্যন্ত) ইউরোপের ইতিহাসে ‘মধ্যযুগ’ নামে পরিচিত।
মধ্যযুগের ইউরোপে যে মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশের সাধনা একেবারেই হয়নি বা জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কাজ কিছুই হয়নি এমনটা নয়। কিন্তু সাধারণভাবে মধ্যযুগের বৈশিষ্ট্য ছিল ইহকালের চেয়ে পরকালের প্রতি এবং যুক্তিবাদ তথা মুক্ত বিচারবুদ্ধির চেয়ে অন্ধ বিশ্বাস এবং ধর্মের প্রতি মানুষের আসক্তির প্রাবল্য। মধ্যযুগে ধর্মের প্রভাব এত সুগভীর এবং সর্বব্যাপী ছিল যে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল শাস্ত্রীয় অনুশাসনের দ্বারা। তার ফল কী হয়েছিল– খুব অল্প কথায় তার একটা সুস্পষ্ট এবং উজ্জ্বল বর্ণনা আমরা পাই হেন্ড্রিক বিলেম ভান লুন নামের একজন ঐতিহাসিকের লেখা নিচের কথা গুলিতেঃ–
প্রথমেই আমাদের একটা কথা মনে রাখতে হবে যে মধ্যযুগের মানুষ কখনও নিজেকে স্বাধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করা নাগরিক বলে ভাবতে পারেনি। তারা একথাও ভাবতে পারেনি যে নিজের ইচ্ছা অনুসারে যেখানে খুশি যাওয়ার বা নিজের সামর্থ্য বা শক্তি বা অদৃষ্ট অনুসারে নিজের ভাগ্যকে গড়ার তার অধিকার আছে। বরং তারা এই বলে ভেবেছিল যে, যে সাধারণ ব্যবস্থা সম্রাট এবং ভূমিদাস, ধর্মগুরু এবং অধর্মী, বীর এবং অত্যাচারী, ধনী এবং দরিদ্র, ভিখারি এবং চোর– এই সবকিছুকে ঘিরে রেখেছে, সেই সাধারণ ব্যবস্থার তারা একটি অংশ মাত্র। এই ঐশ্বরিক অধ্যাদেশ তারা নতশিরে মেনে নিয়েছিল এবং সেই বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করত না। এটাই হল আধুনিক মানুষের সঙ্গে তাদের প্রধান পার্থক্য। আধুনিক মানুষ বিনা প্রশ্নে কোনো কথাই মেনে নেয় না এবং তারা নিজের আর্থিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি উন্নত করার জন্য অবিরাম ভাবে চেষ্টা করে থাকে।
‘তেরো শতকের ইউরোপীয় নর-নারীর জন্য পরকালের তথা বিস্ময়কর আনন্দে পরিপূর্ণ স্বর্গ এবং অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় পরিপূর্ণ নরক কেবল অর্থহীন শব্দ বা অস্পষ্ট ধর্মতাত্ত্বিক উক্তি মাত্র ছিল না। তাদের জন্য এটা ছিল একটা বাস্তব সত্য। মধ্যযুগের মানুষের জীবনের বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত হয়েছিল পরকালের জন্য প্রস্তুতির কাজে। প্রাচীন গ্রীক এবং রোমানরা একটা সুযাপিত জীবনের শেষে মহৎ মৃত্যুকে যে স্থির প্রশান্তিতে গ্রহণ করে, আমরা আধুনিক মানুষও মৃত্যুকে ঠিক সেভাবেই গ্রহণ করি। তিন কুড়ি বছরের পরিশ্রম এবং সাধনার শেষে আমরা এই শান্ত প্রত্যয় নিয়ে নিদ্রার কোলে ঢলে পড়ি যে এরপরে যা হওয়ার আছে তা সমস্তই ভালোর জন্যই হবে। কিন্তু মধ্যযুগে বিকট- দর্শন মাথার খুলি এবং টিঙ টিঙ শব্দ করতে থাকা হাড়ের সঙ্গে আতঙ্কের সম্রাটরা ছিল মানুষের মৃত্যু সহচর। সকালবেলা তারা মানুষকে ঘুম থেকে জাগাতো ওদের ঘড় ঘড় শব্দ করা একতারায় বীভৎস সুর বাজিয়ে; তারা উপস্থিত থাকত মানুষ খেতে বসার সময়; কোনো একটি মেয়ে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে যেতে দেখলে তারা গাছের আড়াল থেকে মাথা নাড়িয়ে হাসত। শৈশবে তোমাকে যদি গ্ৰিম এবং আন্ডারসনের রূপকথা শোনার পরিবর্তে সব সময় শুধু শ্মশান এবং কফিন আর ভয়ঙ্কর রোগ-ব্যাধির লোমহর্ষক গল্প শুনে থাকতে হয়, তাহলে তোমারও জীবনে প্রতিটি দিন অন্তিম প্রহর এবং ভয়ঙ্কর শেষ বিচারের দিনের আতঙ্কে অতিবাহিত হতে বাধ্য। ঠিক এটাই ঘটেছিল মধ্যযুগের ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে। তারা বিচরণ করত ভূত প্রেতে পরিপূর্ণ একটি জগতে; সেই জগতে কদাচিৎ দুই একজন দেবদূতকে দেখতে পাওয়া যেত। ভবিষ্যতের ভয়ে কখন ও হয়তো নম্রতা এবং ধর্মভাবে তাদের আত্মা পরিপূর্ণ করে তুলত; কিন্তু বেশিরভাগ সময় তার ফল হয়েছিল বিপরীত। ভবিষ্যতের ভয়ে তাদের করে তুলেছিল নিষ্ঠুর এবং আবেগপ্রবণ। কোনো একটি নগর অধিকার করার ঠিক পরে তারা সর্বপ্রথম প্রতিটি মহিলা এবং ছেলে মেয়েদের হত্যা করত। তারপরে যেকোনো একটি পবিত্র স্থানে গিয়ে তারা নিরপরাধ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হাত দুটি জোড় করে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করত । পরের দিনই কিন্তু হৃদয়ে এক বিন্দু করুণা অনুভব না করে তারা শত্রু শিবির আক্রমণ করে নির্বিচারে সমস্ত মানুষকে কচুকাটা করত।’
আরো পড়ুন: আধুনিক যুগের জন্ম কাহিনি (পর্ব -৪)। হোমেন বরগোহাঞি
শতাব্দীর পরে শতাব্দী ধরে এটাই ছিল মধ্যযুগের মানুষের জীবন। ধর্ম মানুষকে যে সদাচার করুণা এবং নৈতিকতার শিক্ষাদান করে, সে সবের চেয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছিল পরকালের ভয়, অনন্ত নরকের ভয়, ভূতপ্রেত এবং শয়তানের ভয়। গির্জা মানুষকে এই শিক্ষা দিয়েছিল যে বিশ্বজগত এবং মানব জীবন সম্পর্কীয় সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে ধর্মশাস্ত্রের মধ্যে।কেউ স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে চেষ্টা করলেই তার আর রক্ষা ছিল না; তার জন্য অবধারিত ভাবে অপেক্ষা করছিল ভয়ঙ্কর যন্ত্রণাময় শাস্তি। ধর্মশাস্ত্র যদি বলেছে যে পৃথিবী এক জায়গায় স্থির হয়ে রয়েছে এবং সূর্য পৃথিবীর চারপাশে প্রদক্ষিণ করছে, তাহলে সেই সম্পর্কে এটাই শেষ সত্য।তাতে নতুন করে প্রশ্ন করার কারও অধিকার নেই। ধর্মশাস্ত্র যদি বলেছে যে পাপের শাস্তি স্বরূপ মানুষ রোগব্যাধির কবলে পড়ে, তার বাইরে রোগ ব্যাধির অন্য কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ নেই, তাহলে ধর্মশাস্ত্র বলা কথার বাইরে রোগ -ব্যাধির অন্য কারণ অনুসন্ধান করার মানুষের কোনো অধিকার নেই। এভাবেই শতাব্দীর পরে শতাব্দীর ধরে মানুষের সমস্ত প্রশ্নকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল – যার ফলে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশের সমস্ত পথই রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। মানুষকে গির্জার বশ করে রাখার জন্য ধর্মগুরুরা নানা ভীতি প্রদর্শনের আশ্রয় নিয়েছিল। জীবন্ত পুড়িয়ে মারার মতো দৈহিক শাস্তির ভয় তো ছিলই, সঙ্গে ছিল অনন্ত নরকের ভয়। প্রার্থনার সময়ে গির্জায় দেওয়া ধর্মোপদেশ সমূহে মানুষকে আধ্যাত্বিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার পরিবর্তে বেশিরভাগ সময় চেষ্টা করা হয়েছিল নরকের বীভৎস বর্ণনায় মানুষকে ভীতগ্রস্ত করে তোলা। অধর্মী পাপীকে নরকে কীভাবে শাস্তি দেওয়া হয় তার জীবন্ত চিত্র গির্জার দেওয়ালে দেখে দেখে মানুষ এক মুহূর্তের জন্য ও নরকের কথা ভুলে থাকতে পারত না। ফলে মধ্যযুগের মানুষের চেতনায় জীবনের চেয়ে মৃত্যু এবং ইহকালের চেয়ে পরকালের চিন্তা ছিল বেশি প্রবল।

অনুবাদক