| 15 এপ্রিল 2024
Categories
ধারাবাহিক

ইরাবতী ধারাবাহিক:ফুটবল (পর্ব-১০) । দেবাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

অষ্টম শ্রেণির দুই বন্ধু রাজ আর নির্ঝর। রাজ আর অনাথ নির্ঝরের সাথে এইগল্প এগিয়েছে ফুটবলকে কেন্দ্র করে। রাজের স্নেহময়ী মা ক্রীড়াবিদ ইরার অদম্য চেষ্টার পরও অনাদরে বড় হতে থাকা নির্ঝর বারবার ফুটবল থেকে ছিটকে যায় আবার ফিরে আসে কিন্তু নির্ঝরের সেই ফুটবল থেকে ছিটকে যাবার পেছনে কখনো বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নির্ঝরের জেঠু বঙ্কু। কখনো বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় বঙ্কু ও তার ফুটবলার বন্ধু তীর্থঙ্করের বন্ধুবিচ্ছেদ। কিন্তু কেন? সবশেষে নির্ঝর কি ফুটবলে ফিরতে পারবে? রাজ আর নির্ঝর কি একসাথে খেলতে পারবে স্কুল টিমে? এমন অনেক প্রশ্ন ও কিশোর জীবনে বড়দের উদাসীনতা ও মান অভিমানের এক অন্য রকম গল্প নিয়ে বীজমন্ত্রের জনপ্রিয়তার পরে দেবাশিস_গঙ্গোপাধ্যায়ের নতুন কিশোর উপন্যাস ফুটবল আজ থাকছে পর্ব-১০।  


 

সাড়ে তিনটে মতো বাজে বোধহয়। মাঠ বসে এখন রাজ এসব কথা ভাবল।  মাঠে নামার জন্য তৈরী হচ্ছে রাজ। মাঠে হালকা রোদ।এখনও সবাই আসে নি। এমন কি স্যার আসতেও দেরী করছেন। মাঠের একধারে একটা  অর্ধেক গ্যালারি আছে। সেখানেই বসেছে। সে স্যারকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল,“স্যার, গ্যালারিটা এমন কেন স্যার?”

“কেমন?”

“অর্ধেক হবার পর এটা কি আর হয় নি? মোটে এইটুকু গ্যালারি?“

স্যার বলেছিলেন,“হু। হয় নি। মোটে একদিকে হয়েছে।“

“কতবছর আগে স্যার?”

“আমাদের ছোটবেলায়।“

রাজ বলেছিল,“হল কেন না স্যার? এত বছর ধরে ।“

স্যার বলেছিলেন,“আমিও মাঝে মাঝে ভাবি কেন হল না! হয়ত টাকাপয়সার অভাবে হয়ে ওঠে নি। গ্যালারিটা পুরো হলে বেশ হত।“

রাজ মাথা নেড়েছিল।

মাঠটাও নাকি আগের মত যত্ন পায় না।  রাজরা  প্র্যাকটিশ করার সময় বোঝে।একএকদিকে বড় বড় ঘাস জমে আছে।   বল মারলে তা  যেতে চায় না। স্যার লোক রেখে কিছুটা ঠিক করেছেন।আ সলে এখন মাঠে তেমন ভাবে খেলা হয় না। যে যেমন পারে টিম করে কেউ ফুটবল, কেউ ক্রিকেট খ্যালে। রাজের যদি অনেক টাকা থাকত সে মাঠটাকে সুন্দর করে সাজাত। চারপাশ ঘিরে দিয়ে একটা গ্যালারি করে দিত।

“কি রে? আগে চলে এসছিস?”

রাজ তাকাল।– ইমন। তবে সে একা। কল্লোল দুএকদিন খেলেই মাঠে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু কল্লোল নয়। আরো চারপাঁচজন এখন খেলা ছেড়ে দিয়েছে। রাজরা এখন সবমিলিয়ে চোদ্দ-পনেরজন আছে।

রাজ একবার ওর দিকে তাকিয়ে আলগোছে মাথা নাড়ল।সেদিন থেকে  ইমনের সঙ্গে তার সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেছে। স্কুলে বা খেলার মাঠে সে ওকে পারতপক্ষে এড়িয়ে যায়। ইমনও তার সঙ্গে খুব একটা কথা বলে না। 

তবে স্কুলে এখনই ইমনরা ইদানিং চুপচাপ হয়ে গেছে। বেশ কিছদিন ধরেই ওরা তিনজন স্কুলে খারাপ কাজ করছিল।  ইমনরা অফ পিরিয়ড বা টিফিন আওয়ার্সে  ফাইভ-সিক্সের ঘরে ঢুকে পড়ছিল। ওদের ব্যাগ থেকে খাবার কেড়ে নিচ্ছিল, কখনো টাকাপয়সাও চুরি করছিল। ছোটদের আবার ভয় দেখিয়ে এসে ছিল স্যারদের না বলতে। ছোটরা প্রথম কদিন ভয়ে চুপ করেছিল। তারপর স্যারদের বলেছে। স্যাররা বলেছিলেন, “ অন্য কোন ক্লাসের ছেলেদের অকারণে ঢুকতে দেবে না। “ ছোটরা এরপর তৈরী হয়েছিল। কদিন আগে  টিফিন আওয়ার্সে ইমনরা যেই  ফাইভে ঢুকেছে, ওমনি ছেলেরা সবাই মিলে ওদের আটকে রেখে স্যারদের ডেকে এনেছিল। হেডস্যার গার্জিয়ান কল করেছিলেন। তিনজনকে কদিনের জন্য সাসপেন্ড করে দিয়েছিলেন।মৈনাকস্যারও  ইমনকে খেলাতেও নিতে চাইছিলেন না। ক্ষমা চাওয়ার পর স্যার নিয়েছেন। ওকে সাবধান করে দিয়েছেন, স্কুলে বদমায়েসী করলে আর খেলতে নেবেন  না।

 তবে কদিন ওরা শান্ত থাকবে বলা মুসকিল।  রাজ ভাবে।কেন কে জানে ওরা নির্ঝরের উপর খুব খাপ্পা। আর কোন ঘটনা ঘটে নি ঠিকই কিন্তু ইমনদের হাবভাবে তা বুঝতে পারে রাজ।

কয়েকজন দাদা চলে এসেছে। তারা মাঠে  বল নামিয়েছে। রাজ ইমনের দিকে তাকিয়ে একবার মাথা ঝাঁকিয়ে   জুতো পড়তে শুরু করল। 

ইমন  তার পাশে ঝুপ করে বসে পড়ল।রাজ বলল,“ড্রেস কর। দেরী হয়ে যাবে তো।“

“স্যার আসুক।“

“স্যারের দেরী হচ্ছে কেন আজ?”

“কিসের মিটিং চলছে। ওইজন্য।“

রাজের মনে পড়ল। স্যার বলেছিলেন। তাদের মিটিং আছে। তবে স্যার পরে এলেও অসুবিধা নেই। তীর্থজেঠু আছেন। এখন তিনি রোজ আসছেন। এমনি কারুকেই কিছু বলেন না। কিন্তু  ভুল করলে মাঠের সাইড থেকেই চেঁচাতে শুরু করেন। সে বলল,-“স্যারের জন্য বসে লাভ নেই। ওই তো তীর্থজেঠু রয়েছেন।“

ইমন মুখ বেঁকিয়ে বলল,“ওই পাগলাটা। দুর! দেখলেই তো কেমন খেপচুরিয়াস লাগে।“

“কিন্তু খেলার হেভি সেন্স।“

“কবে কি খেলেছে তাই নিয়ে এখনও কপচে কি হবে? ছাড়।উনি  খেলা ছেড়ে দিয়েছিলেন কেন জানিস?”

“কেন?”

“কোন বন্ধুর সাথে কিসের জন্য গোলমাল হয়েছিল তাই জন্য!”

“তাই?”

ইমন বলে ,“হ্যাঁ। আমি পুরোটা জানি না। তবে এমনই শুনেছি।

 ইমনের কথা রাজের বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না।  তাছাড়া এসব শোনার আগ্রহ  তার নেই। সে  কথাটা উড়িয়ে দিয়ে বলল,“কে জানে? বাদ দে ও কথা। চল মাঠে নামি।“

“নির্ঝর এল না?”

তাই তো! নির্ঝর এখনো মাঠে পৌছাল না। রাজ ভ্রু-কুঁচকাল। ওর সঙ্গেই একসঙ্গে স্কুল থেকে বেরিয়েছিল।  তাকে মাঠে  যেতে বলে গেল। ও বাড়ি ঘুরে আসবে। বাড়ি থেকে চলে আসার কথা অনেকক্ষন আগে।  ওর জেঠু কি ওকে আবার বাড়িতে আটকে দিল?রাজ ভাবল। জেঠু এখন খুব কাজ করায় ওকে দিয়ে।  ঘর মোছা, বাসন মাজা, এমনকি রান্না করা সব কাজই এখন নির্ঝরকে করতে হচ্ছে। তবে জেঠু নাকি আগে  এমন ছিল না !

সে বলল,“দেখছি না তো। আসবে হয়ত।“

ইমন বলল,“না এলেই ভাল।“

 রাজ ওর দিকে  তাকিয়ে বলল, “মানে?”

ইমন পট করে খানিক ঘাস ছিড়ে বলল,- “না মানে। নির্ঝর না খেললে আমাদের লাভ আছে।“

রাজ অবাক হয়ে তাকাল। সে  বলে, “লাভ? কিসের লাভ?”

 ইমন বলে, “হিসেব কর! স্যার বলেছেন এবার রিজার্ভ প্লেয়ারদের চান্স দেবেন।এখন আমরা আছি চোদ্দজন। রিজার্ভে আছি তুই  আমি, ক্লাস টেনের সিরাজদা। কিন্তু  স্যার মুখে যাই বলুন অনীকদা, সন্তোষদাদের  সবার চান্স পাকা। নির্ঝরের চান্সও পাকা। কিন্তু  যদি ও না খালে তাহলে আমরা একজন ঢুকে যেতে পারব। তাই না?

রাজ মন দিয়ে ওর কথা শুনল। ইমন অনেকদুর ভেবে ফেলেছে। ও চাইছে নানির্ঝর খেলুক। তবে ইমনের হিসেবও খুব একটা ভুল নয়। এটা ঠিক স্যার কখনোই নির্ঝরকে টিম থেকে বাদ দেবেন না। ও থাকলে খেলবেই। সে বলল,কিন্তুনির্ঝর খেলবে না কেন?

ইমন বলল,-  নির্ঝর কি আর নিজের ইচ্ছেয় খ্যালে? তোর ইচ্ছায় খ্যালে। ও তো খেলতেই চায় না।

  এটা ঠিকই বলেছে ইমন। খেলায় এখনও পর্যন্ত  নির্ঝরের কোনও আগ্রহ আসে নি। সত্যিই ও যদি না জোর করে নির্ঝর হয়ত খেলতেই আসবে না। রাজ বলল,- সে জানি না।ও কেমন খ্যালে বল?

ইমন মুখ বেঁকিয়ে বলল,“ ছাড়। সেদিন  বাইচান্স গোল করে ফেলেছিল।

রাজ চটে উঠে  বলল, “ কি বলছিস তুই! ও এমনি এমনি গোল করল। ওমন গোল করা সহজ ব্যাপার? শোন  ও আমাদের থেকে অনেক  বেশী ভাল খেলে।“

ইমন   বিরক্তির স্বরে বলল, “ তুই বেশী মহান সাজছিস কেন বল তো? সবসময় দেখছি ওকে তুই আগলে রাখিস। তোর ওকে নিয়ে অত ভাবার কি আছে? নিজের কথা ভাব।“

রাজ গম্ভীর মুখে উঠে দাঁড়াল। সে বলল, “তোরই বা ওর উপর এত রাগ কেন?”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত