Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,ইরা

শারদ সংখ্যা গল্প: হাসপাতাল হ্যালুসিনেশন । ক্ষমা মাহমুদ

Reading Time: 8 minutes

‘আমি আমার বান্ধবীদের নিয়া আসতেছি, তারা রক্ত দিবে, যারা রক্ত দিবা তারা দশতলায় যাও, তোমরা দুজন আসো আমার লগে, নীচে ক্যান্টিনে গিয়া খাইয়া আসি’-

হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে লিফটের দিকে যেতে যেতে বেশ উচ্চস্বরে বলা কথাগুলো কানে ভেসে আসাতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে একটু দেখলো ইরা। মহিলা, পুরুষ মিলিয়ে ছয় সাত জনের একটা জটলা, তার মধ্যে মধ্যবয়সী একজন নারী হাত,মুখ নেড়ে নেড়ে অনবরত কথা বলছে।

লিফট থেকে বের হয়ে ক্যাফের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবলো, এইসব কর্পোরেট হাসপাতালগুলোতে খুব যত্ন করে সব ব্যবস্থা বিদ্যমান। অপেক্ষারত স্বজনেরা যত কষ্টেই থাকুক, যারা তাদের সাথে থাকে, তাদেরও সময় মত খাওয়া দাওয়া লাগে, সেটা হাসপাতাল কতৃপক্ষ খুব ভালোমতোই বোঝে, আর সে জন্যে সবরকমের বন্দোবস্তোই তারা করে রেখেছে। ফাস্টফুডের যাবতীয় আয়োজন থেকে শুরু করে রোগীর জন্য সবরকম পথ্য সবই মিলবে এখানে পকেট ভারী থাকলে। খাওয়ার কথা শুনে ওর নিজেরও অবশ্য খুব চায়ের তেষ্টা পেলো।

দুই ফ্লোর নীচে ক্যাফেটেরিয়া। ভেতরে ঢুকে একটা খালি চেয়ার দেখে বসলো ইরা। এখানকার এলাহী কারবার দেখে এ কদিনে অভ্যাস হয়ে গেছে। এ ধরণের হাসপাতালে প্রথম আসা কোন মানুষ সোজা যদি এই ক্যাফেতে এসে ঢোকে তাহলে ভিমড়ী খাবে, এটা রেঁস্তোরা না কি আসলেই কোন হাসপাতাল সেটা ভেবে। বেশ বড়সড় জায়গা নিয়ে রেঁস্তোরার মত করেই একপাশে বসার ব্যবস্থা। অনেকগুলো আয়েশী সোফা বিছানো একদিকে, অন্যদিকগুলোতে বেশ কিছু চেয়ার টেবিল দেয়া আছে, সবরকমেরই ব্যবস্থা বলবৎ। লোকজন গিজগিজ করছে সবখানেই, জায়গা পাওয়াই ভার। ইরা উঠে গিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে একটা কফির বিল মিটিয়ে কফি নিয়ে এসে দেখলো চেয়ারটা দখল হয়ে গেছে। দুমিনিট গরম কফি হাতে নিয়ে দাড়িয়ে থাকতে থাকতেই পাশের একটা সোফা খালি হতে সেখানে কফি নিয়ে বসে চারদিক দেখতে লাগলো। খাবারের সামনে মানুষের লম্বা লাইন। নানা রকমের খাবার সাজিয়ে রাখা আছে কাচের বক্সগুলোতে। স্ন্যাকসের সাইডে কাচের জারের মধ্যে সাজানো বার্গার, পিৎজা, চিকেন ফ্রাই  আর সেইসাথে ব্লেন্ডারে করে দেয়া ফ্রেস জুস কেনার জন্যে ছোট খাটো লাইন লেগে রয়েছে । সাদা ভাত দেখে নিজেও একটু উঁকি দিয়েছিলো, কিকি আছে দেখার জন্যে। সব্জি, মুরগীর মাংস, ডাল সবই থরে থরে সাজানো। পকেট ভর্তি টাকা থাকলে হাসপাতালে এসে আগের মত শুকনো মুখ করে আর বসে থাকার দরকার হয়না এখন। টাইম টু টাইম চা, কফি, ফ্রেস জুস, খাবার সবই অপেক্ষার কষ্টগুলো কমিয়ে দেয়। আর বসে বসে এর সাথে তার সাথে ফোনে কথা বলে বা অন্তর্জালের জগতে ঘুরে বেড়িয়ে মানুষের সময়গুলো কেটে যায় অনায়াসে। রোগী যত আপনই হোক আর সে যত কষ্টই পাক না কেন, এসব আয়োজন মানুষের কষ্টের তীব্রতা যেন বা একটু হলেও কমিয়ে দেয়। রোগাক্লান্ত স্বজনের পাশে বসে থাকা আত্মীয় স্বজনের জন্যে নানারকম পসরা সাজানো হাসপাতালগুলো তাই কিছুটা হলেও বিনোদনও বটে। কারো কোন কাজ না থাকলেও এখানে এসে বসে থেকে এসির মধ্যে একটু আরাম করতে ভালেবাসে, এমন মানুষও সে দেখেছে। এ কয়দিনে অসুস্থ খালার পাশে বসে থেকে হাসপাতালের এই জীবন খুব আগ্রহ ভরেই সে খেয়াল করছে। জীবন আর মৃত্য যেন এখানে হাত ধরাধরি করে হেঁটে চলেছে!

ইরা দেখলো উপরে জটলা করা গ্রুপটা একসাথে ক্যাফেতে ঢুকলো। জোরে জোরে কথা বলতে বলতে একটা টেবিল দখল করে বসলো সবাই। ‘এ্যাই, কি কি খাবা বলো, অর্ডার দিয়া আসি’- সেই নেতা গোছের সবুজ কলাপাতা রঙের সালোয়ার কামিজ পরা মহিলাই সবাইকে লক্ষ্য করে বললো। ইরা’র মনে হলো এরা মনে হয় ভাবছে এটা একটা রেস্তোরাই, হাসপাতাল না, অন্তত আচার আচরণে তাই মনে হচ্ছে।

মোবাইলের ঘড়িতে চোখ রেখে কফিতে শেষ চুমুকটা দিল। উঠতে হবে, আধাঘন্টা প্রায় পার হয়ে গেছে। খালুকে খালার পাশে বসিয়ে রেখে এসেছে। মানুষ যতক্ষণ চলে ফিরে বেড়াচ্ছে, ততক্ষনই বলা যায় জীবন উদযাপন করতে পারছে। কিন্তু এর এতটুকু ব্যত্যয় হলেই বোঝা যায় এই উদযাপন কত স্বল্পস্থায়ী, কত ঠুনকো আর কখনও কখনও কত অর্থহীন। হাসপাতালের কেবিনে ঘুমন্ত অসুস্থ খালার মুখের দিকে তাকিয়ে বেডের এক পাশের চেয়ারে বসতে বসতে ইরা এসব ভাবতে থাকে। খালু যেন কোনদিকে আবার গেছে। যদিও এ্যাটেনডেন্টরা ভালোই খেয়াল রাখে তবু নিজেদের কেউ না কেউ খালার কাছে না থাকলে খালার হয়তো মন খারাপ হতে পারে, ভেবে ইরা চেষ্টা করছে যতটা সময় সম্ভব খালার পাশে থাকতে। কড়া সব ওষুধের প্রভাবে খালা অধিকাংশ সময়ই ঘুমিয়ে থাকছে। কিন্তু ঘুমের প্রভাব কমে গেলে সে ঠিকই খোঁজে তার পাশে ছেলেমেয়েরা কেউ আছে কিনা।

খালার বাড়ী একসময় কি জমজমাটই না ছিল! সকাল-সন্ধ্যা আত্মীয়স্বজনের আসা যাওয়া, রান্নাবান্না, নানা কান্ডে সরগরম হয়ে থাকতো বাড়ীটা। এই যে বিছানায় নিথর হয়ে পড়ে আছে মানুষটা, সে যে কত মানুষকে দিনের পর দিন রান্নাবান্না করে খাইয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। খালার বাড়ী ছিল সব আত্মীয় স্বজনের নানা প্রয়োজনের অন্যতম আশ্রয়স্থল। দেশের নানা প্রান্ত থেকে নানা কাজে এই বাসায় আশ্রয় নেয়া কাছের দূরের আত্মীয় স্বজনেরা যেন তাদের কাজ ঠিকঠাক মত করতে পারে তার পেছনের যাবতীয় যোগান দাত্রী ছিল এই নিথর হয়ে থাকা মানুষটা। কে কখন কি খাবে তার পেছনে কাজের মেয়েদের নিয়ে সারাদিনের ব্যতিব্যস্ততায় তার সময় কেটেছে জীবন ভোর। গোটা জীবনটাই খরচা হয়ে গেল এইভাবে! নিজের সংসারের দায় দায়িত্বের পাশে পাশে ছোট ভাই বোনদের মানুষ করার জন্যেও যা যা করা দরকার সবই করেছে। একজন একজন করে ভাই বোন নিজের কাছে রেখে তাদের লেখাপড়া করিয়েছে। লেখাপড়া শেষে তারা চাকরী, বিয়ে শাদি করে যার যার জীবনের পথে পা বাড়িয়েছে।

ইরা নিজেও এই খালার বাড়ীতে থেকেই মানুষ। নিজের মা তার মাত্র তেরো বছর বয়সের সময় অকালে চলে যাওয়ার এক বছরের মধ্যেই বাবা যখন আবার বিয়ে করলো তখন এই খালাই বাবার নতুন সংসারে অবান্চিত কিশোরী তাকে নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে নিজের ছেলেমেয়ের সাথে মানুষ করার দায়িত্ব তুলে নিয়ে বাবাকে বাঁচিয়েছিল।  বাবা তার দায়িত্ব মাসে মাসে শুধু টাকা পাঠিয়েই শেষ করেছে।

দূর থেকে পান চিবুতে চিবুতে খালুকে আসতে দেখলো ইরা। আশি পেরোনা খালু বড় অসহায় হয়ে পড়েছেন স্ত্রীর এই অবস্থায়। সারাটা জীবন স্ত্রী অ‌ন্তপ্রাণ খালাকে সব দিক দিয়ে সাপোর্টই দিয়ে গেছেন ভদ্রলোক। দুজনের বোঝাপড়াটা সবসময় ভালো থাকার কারণেই খালা পেরেছে অন্যদের ভরসাস্থল হয়ে উঠতে। কিন্তু খালাকে যতই ভালোবাসুক না কেন খালার এই অবস্থায় খালু টানা অনেকক্ষণ হাসপাতালে বসে থাকতে পারেনা, এক দুই ঘন্টা বসে থেকেই বাসায় যাওয়ার জন্যে ছটফট করা শুরু করে দেয়। শুধু ইরাই  নিজের সংসার, কাজকর্ম নানাভাবে ম্যানেজ করে খালার এখানে সময় দিচ্ছে। আজকে যে সে একটা মোটামুটি শক্ত মাটির উপর দাড়িয়ে আছে, তার সেই জীবনের কারিগরই এই খালা, সেটা সে ভোলেনা কখনও। এই অসুস্থতার সময় সেই ঋণের এতটুকুও প্রতিদান যদি সে দিতে পারে তবেই সে ঋন কিছুটা হলেও শোধ করা হয়তো যায়, ইরা মনে মনে ভাবে।

আত্মীয় স্বজনেরা যে যখন পারছে এসে দেখা করে যাচ্ছে, এর বেশী তাদেরও আর কিই বা করার আছে। শুধু ইরা একাই গোটা দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে সন্তানের মত। খালার চার ছেলেমেয়ের দুজনই জীবনের টানে বিদেশে বিভুঁইয়ে, অন্য দুই ছেলে মেয়ে তাদের চাকরী, সংসার ঠেলে সময় সুযোগ মত আসছে যাচ্ছে। খালা হঠাৎ অসুস্থ হওয়ায় তাদের নানারকম কাজ ফেলে সার্বক্ষণিকভাবে  কেউই থাকতে পারছেনা। ছোট মেয়ে সূচীতা কানাডা থেকে টিকেট কাটার চেষ্টা করছে কিন্তু ডিসেম্বরের এই পিক টাইমে কোন ভাবেই এখনও পর্যন্ত টিকেট ম্যানেজ করতে পারেনি। ছোট ছেলে মুন্নাও তার ব্যবসাপত্র ফেলে রেখে এখনও পর্যন্ত জার্মানি থেকে এসে পৌঁছাতে পারেনি, কবে পারবে সেটাও পরিষ্কার করে জানাতে পারছেনা। ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকে এই  ভাবনাটা খালুকে এতদিন খুব গর্বিত করলেও এখন তার  মনে হচ্ছে বরং তারা যদি কাছে থাকতো, গর্ব করার চাইতে সেটা বরং জীবনে কাজে লাগতো বেশী। যদিও টাকা পয়সা পাঠিয়ে ভালো হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা করার সব চেষ্টা তারা করছে, সেটাও বা কম কিসে, এটুকুই বা কজনের কপালে জোটে!

ইরা খালার দিকে তাকিয়ে দেখে অসংখ্য নলে আচ্ছাদিত হয়ে মানুষটা প্রাণপনে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যদি আবার ফেরা যায় জীবনের রঙ্গমঞ্চে। অসহায়ের মত বসে বসে ভাবে ইরা, জীবনভোর  এত লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি সব কিছু তবে কি শেষ হয় এই হাসপাতালের সাদা চাদরের বিছানায় এসে! এইই তবে জীবন! এত ক্ষুদ্র! ভেবে যেন ভিতরে ভিতরে খাবি খেতে থাকে সে । কেমন দম আটকে আসতে চায়। সেটা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যেই খালুকে খালার পাশে বসিয়ে আবার সে বাইরে বের হয়ে  আসে।

লবিতে নানা জন নানা ভাবে বসে আছে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা স্বজনদের জন্য;  যদি কিছু লাগে বা দরকার হয়, যদি ডাক্তারের সাথে কথা বলে কিছু জানা যায় যা একটু আশার আলো দেখাবে স্বজনের জন্যে চিন্তাক্লিষ্ট তাদের মনে। অনেকে ছুটোছুটি করছে নানা রকম রিপোর্ট হাতে নিয়ে। প্রত্যকের কাহিনীই কম বেশী একইরকম।

লবিতে বসে ইরা কতগুলো জরুরী ফোন সারে। অফিসে বসের সাথে কথা বলে অন্তত আরো তিনটে দিন ছুটি নিতে হবে। খালার বড় ছেলে খালেদ ভাই অফিস থেকে ফোন করে বলেছে, সে খুব চেষ্টা করছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আসার। অন্তত সেই পর্যন্ত ইরাকে খালার পাশে সার্বক্ষণিক থাকতে হবে। প্রতিদিনই ডাক্তারের সাথে কথা বলে রোগীর পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ফোনে ফোনে ছেলেমেয়েরা সারাক্ষণ তার কাছ থেকেই সবকিছু আপডেট জানতে পারছে। ছেলেমেয়েরা কেউ না কেউ একজন সেই দায়িত্ব না নেয়া পর্যন্ত তাকে থাকতেই হচ্ছে অথচ বেশ কদিন হয়ে গেল, সেই ভাবে কেউ আসলে এসে থাকতে পারছেনা। ইরার স্বামী রেজোয়ান ইতিমধ্যেই এটা নিয়ে কয়েকবার উষ্মা প্রকাশ করে বলেছে, ‘সব দায়িত্ব কি তোমারই নাকি! কি আশ্চর্য! তার নিজের ছেলেমেয়েরা আছেনা? তারা যেভাবে হোক ম্যানেজ করুক’। কিন্তু ইরা কোনকিছু গ্রাহ্য করছেনা। খালার প্রতি তার এই অনুভূতি, রেজোয়ান বুঝবেনা। ইরা বোঝে, সে বাসায় সময় দিতে পারছে না বলে রেজোয়ানের ঘাড়ে বাসার কিছু কাজ চলে আসাতে সে বিরক্ত। অফিস শেষে সন্ধ্যাবেলা গুলোতে বন্ধুদের আড্ডায় যেতে পারছে না বলে তার মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কেউই তার নিজস্ব সুবিধার জায়গাটায় ছাড় দিতে চায়না।

জরুরী ফোনকলগুলো  শেষ করে তাড়াতাড়ি খালার ওয়ার্ডের দিকে পা চালালো ইরা। কেবিন খালি না পাওয়ায় খালাকে ওয়ার্ডেই রাখতে হয়েছে। অনেক সময় টাকা পয়সা থাকলেও সবকিছু পাওয়া যায়না। অবশ্য এসব হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোও যথেষ্টই ভালো তবে রোগীর সাথে থাকা মানুষজনদের রাতে থাকার ব্যবস্থাটা একটু কঠিন। ফ্লোরে কোনভাবে ম্যানেজ করতে হয়, তো খালার জন্যে সে কষ্টটুকুও করতে রাজী আছে ইরা। ওয়ার্ডের কাছে এসে দেখে খালু নেই কিন্তু খালার বড় মেয়ে রোজী আপা বসে আছে তার মায়ের কাছে। ইরা কাছে যেয়ে দাড়াতেই বললো, “আব্বাকে একটু হেঁটে আসতে বললাম ওদিক থেকে। তুইও বোস। তোর ওপর দিয়েই তো যাচ্ছে সব কিছু, আমরাতো সন্তান হয়েও তোর মত করে করতে পারছিনা রে।’ ইরা বলে ওঠে, না না কি যে বলো! আমিওতো খালার আর এক মেয়েই। খালাই তোমাদের মধ্যে রেখে আমাকে বড় করেছে, একটা পরিবার দিয়েছে। সেই ঋণ তো কিছুটা হলেও শোধ করার সময় হয়েছে।’ রোজী মায়ের গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ইরার কথা শোনে। মায়ের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে হাত বোলাতে থাকে। হাতটায় এখনও কয়েক গোছা সোনার চুড়ি পরানো। মায়ের নাকে নল পরানো ক্লান্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে হাতে হাত বুলাতে বুলাতে রোজী হঠাৎ বলে ওঠে, ‘চুড়িগুলোতে মনে হয় আম্মার অসুবিধা হচ্ছেরে ইরু, আমি বরং খুলে আমার ব্যাগে রেখে দিই, কি বলিস? বাসায় ফিরে গেলে তারপর নাহয় আবার পরিয়ে দেবো।’ ইরার বুকের ভেতর ধব্বক করে উঠলো! রোজী আপা কি ধরেই নিয়েছে খালার এটা অন্তিম শয্যা! কি সাংঘাতিক বাস্তববুদ্ধি মানুষের! মুখে ওড়নাটা চেপে মাথাটা একটু নাড়ানোর ভঙ্গি করে ইরা। কি বলবে ভাষা খুঁজে পায়না। রোজী আপা তার  চাকরী থেকে নাকি কিছুতেই ছুটি নিতে পারছেনা, দুদিন পর পর ঘন্টাখানেকের জন্যে মাকে এসে দেখে যাচ্ছে এই কদিন ধরে।গতকাল খালেদ ভাই এর বউ লতা ভাবী এসেছিল খালাকে দেখতে। বাচ্চাদের স্কুল, কোচিং, সংসার  সামলানোর কারণে সেও একটা পুরো দিন এসে এখানে থাকতে পারছেনা। গতকাল বিকেলের দিকে এসে ঘন্টা দু তিন থাকাতে ইরা সেই সময়ে তার বাসার কিছু কাজ সেরে এলো। ভাবী যাওয়ার সময় বললো, ‘ইরা, হাসপাতালে তো রোগীর গায়ে কোন সোনার জিনিস রাখতে হয়না। আম্মার গলায়তো দেখি এখনও মোটা চেইনটা পরা। আমি খুলে আমার কাছে রাখলাম বুঝলি? পরে বাসায় গেলে আবার দিয়ে দেবো।’ ইরা তখনও শুধু মাথা নাড়িয়েছিল। ছেলের বউদের মধ্যে এই ভাবীই খালার বিশেষ কাছের মানুষ সবসময়।

ডিউটি ডাক্তার এসে পড়লো এ সময়েই। খালার সবকিছু চেক করে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তে দেখে ইরা। জরুরী কিছু টেস্ট করতে দিলো আবার। খালেদ ভাইকে ফোনে সব জানিয়ে নিজে দৌড়াদৌড়ি করে খালার টেস্টগুলোর তদারকি করতে থাকে। বিকালের মধ্যেই খালার অবস্থা বেশি খারাপ হওয়াতে আই সি ইউতে নেয়া হলো। গভীর রাত পর্যন্ত আই সি ইউ এর সামনে একটা খবরের আশায় ওরা ঠাঁই দাড়িয়ে। অবশেষে ডাক্তার এসে জানালো রোগী শংকা মুক্ত নন, তবে তারা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। খালেদ ভাই খালুকে নিয়ে বাড়ীর দিকে রওনা দিল আর ইরা নিজের বাসায়। একটা চাপা বেদনা বুকে বয়ে নিয়ে চার পাঁচটা দিন পার হয়ে গেল। রোবটের মত সব কাজই করে যেতে হচ্ছে। ভিজিটিং আওয়ারের সময় হলেই সব কাজ ফেলে রেখে আই সি ইউ এর সামনে হাজির হয় ডাক্তারের মুখে ভালো কিছু শোনার আশায় কিন্তু খালার কোন পরিবর্তন হচ্ছেনা। আই সিই ইউ এর ভেতরে খালাকে দেখতে গিয়ে প্রতিদিন শীর্ণ থেকে শীর্ণতর হওয়া মুখটা দেখে ফিরে আসে। হাসপাতালে মোটা অংকের বিল আসছে প্রতিদিন।  ফোনে খালার ছেলেমেয়েদের সাথে ইরার নিয়মিত কথা চলছে। সবার  কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়া শুরু হয়েছে। এত খরচ হচ্ছে সে ব্যাপারে কারো কারো চাপা উসখুশ করা দেখে ইরা অবাক হয়। খালার নিজেরও সহায় সম্পত্তি ভালোই আছে। কিছু হয়ে গেলে ছেলেমেয়েরাই পাবে। তবুও তাদের মায়ের চিকিৎসায় হাত উজাড় করে খরচ করতে কি তাদের কষ্ট হচ্ছে! ইরার মাঝে মাঝে ধন্ধ লেগে যায়! সম্পর্কগুলো আসলে কি!

প্রায় সাতদিন হয়ে গেল। অফিস শেষ করে বাড়ীর জরুরী কাজগুলো সেরে সন্ধ্যা নাগাদ আই সি ইউতে ভিজিটিং আওয়ারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে ইরা। ওদিক থেকে খালেদ ভাই এরও আসার কথা। দুজনে মিলে আজকে ডাক্তারের সাথে বসে  খুব ভালোভাবে কথা বলতে হবে চিকিৎসার পরবর্তী করণীয় হিসাবে।

ইরা বাসা থেকে বের হতে যাবে, তার আগেই খালেদ ভাই এর ফোন, ‘একটু তাড়াতাড়ি চলে আয়, মায়ের অবস্থা ভালো না।’  ইরা একটুও দেরী না করে বাসা থেকে বের হয়ে পড়ে।হাসপাতালটা ওর বাসা থেকে বেশী দূরে না। কিন্তু সেই স্বল্প দূরত্বটুকুই অলস পাইথনের মত লম্বা করে তুলেছে নিথর জ্যাম। উবার ছেড়ে দিয়ে হেঁটেই চলে এলো ইরা হাসপাতালে। লিফটে লম্বা লাইন। লাইনের শেষ মাথায় দাড়িয়ে এগারো তলার আই সি ইউতে পৌছানোটা মনে হচ্ছে সুদূরতম পথ! প্রতিটা মুহূর্ত মূল্যবান অথচ সে যেতে পারছেনা খালার কাছে।

কতটা সময় লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইরার মনে পড়েনা। পনেরো মিনিট কিংবা আধাঘন্টাও হতে পারে। অন্য কোন একটা লিফট নষ্ট হয়েছে তাই এই লিফটের সামনে এত ভিড়! ইরার নাকে আতর আর আগরবাতির গন্ধ ভেসে আসে। দূরের কোথাও থেকে সুর করে কোরান তেলাওয়াতের আওয়াজ ভেসে আসছে। কোন  এক গোলকধাঁধাঁর একটার পর একটা দরজা খুলে যাওয়ার মত করে স্মৃতির পাতাগুলো খুলে খুলে যাচ্ছে। ‘ইরা, তুই এত চিন্তা করিস কেন, আমি আছিনা! সব ঠিক হয়ে যাবে মা!’ খালার গলা ভেসে আসে। ইরার বুকটা খাঁ খাঁ করে ওঠে একজন মানুষের সাথে আজ কতদিন ধরে আর কথা বলা হয়না সেই শূন্যতায়।

হঠাৎ ঘোর ভাঙে  ইরার। এদিক ওদিক তাকায়, চারপাশে মানুষ গিজগিজ করছে। লিফটটা খুলে গেল। পিলপিল করে মানুষ ঢুকছে। ইরা এখনও লাইনের বেশ পেছনে!

লিফটটা আবার বন্ধ হয়ে যায়।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>